আকাশপ্রিয়া পর্ব ৫৭
দুর এ দিলশাদ্ দুআা
গতানুগতিক ধারার জীবন দিব্যি কেটে যাচ্ছে সকলেরই। সিলেট জার্নি শেষে আকাশ -প্রিয়া চট্টগ্রাম ফিরে এসেছে প্রায় মাসখানেক পার হয়ে গিয়েছে। নিয়মমাফিক ব্যাস্ত জীবন শুরু হয়েছে সবার। অন্তসত্ত্বা হওয়া সত্ত্বেও অয়নের দেওয়া ছুটি মঞ্জুর করেনি শিয়া। সবে চার মাস চলে। এখনই সব কাজ বাদ দিয়ে ঘরে বসে থাকলে চলে? তাছাড়া এখন না হয় চাকরি করে নিজের স্বামীর আন্ডারে। অন্য কোথাও চাকরি হলে? সেই তো অফিস করতেই হতো!
এ নিয়ে একদফা মনোমালিন্য হয়ে গিয়েছে অয়নের সাথে। সে বেচারা মুখ গোমরা করে ঘুরেফিরে বউয়ের আশেপাশেই আসছে। শিয়া যতবার দেখে ওই মলিন মুখ, ততবার হাসি পায় তার। বাপ হতে গিয়ে বাচ্চা বাচ্চা ব্যবহার বেড়েছে লোকটার!
ভার্সিটির সেমিস্টার পরীক্ষা শুরু হবে কয়েকদিন পর থেকে। ভীষন ব্যাস্ত প্রিয়া। ছোটাছুটির ওপরেই থাকতে হয়। বাদবাকি সময় বইয়ে মুখ গুঁজে রাখে। তাদের গোপনীয় দাম্পত্যজীবন চলছে মহাসমারোহে। আকাশ অবশ্য আজকাল বেশ দুরত্বই বাড়িয়ে রাখে। বিশেষ করে সিলেট ট্যুর থেকে আসার পর থেকেই। গত একমাসে একটু হলেও বদলেছে তাদের সম্পর্ক।
প্রিয়া এসেছে ভার্সিটিতে। আজকে রিমিরও আসার কথা। মেয়েটা এখনো এসে পৌছায়নি। এই ভাবাভাবির মধ্যে পিছন থেকে ডাক পরলো রিমির। সে মেয়েও উড়ছে আজকাল। রাতুল ভাইয়ের সাথে এনগেজমেন্ট হয়ে আছে কয়েকমাস যাবৎ। আকাশ, অয়নদের নিদারুণ প্রচেষ্টায় অবশেষে মেনেছেন রিমির বাবা। অতি বিনয়ের সাথে আগের বিয়ে স্থগিত করে, রাতুলের সাথে নিজে দাঁড়িয়ে বিয়ের বন্দবস্ত করেছেন। আপাতত এভাবেই থাকবে। ওদিকে রিমির অনার্স শেষ হলে তারপর যা করার করবেন বয়জেষ্ঠরা সবাই মিলে। তাতে অবশ্য কোনো আপত্তি নেই কারোরই। রাতুল বাদে! সে ভীষন দুঃখ পেয়েছে বউকে পারমানেন্ট তার হাতে তুলে না দেওয়ায়৷ বউয়ের অনার্স পাস হতে আরও বছর চারেক। মানা যায়! এদিকে আকাশ টা তো দিব্যি সবার চোখে ধুলো নিয়ে রোজ বউকে বুকে জড়িয়ে ঘুমায়, তার বেলায়! রিমিকে কতবার হাতে পায়ে ধরেছে, অন্তত আকাশ-প্রিয়ার মতো করে বিয়েটা যদি করে ফেলা যায়। ততবার রিমির ধমকে– থমকেছে ছেলেটা৷ নারীসঙ্গ জীবনে আসলেই পুরুষমানুষের স্বাধীনতা শেষ! বেচারা পুরুষমানুষ!
রিমি পাশে এসে দাঁড়াতেই তার হাত আকড়ে ধরলো প্রিয়া। হাপিত্যেশ করে বলে উঠলো,
—’এতো দেরি হয় এতটুকুন পথ আসতে? কত ইম্পরট্যান্ট কথা আছে জানিস?’
রিমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে। মোটেও দেরি হয়নি। বরং প্রিয়া যে সময়ের কথা বলেছিলো, সে সময় রেখে প্রায় আধঘন্টা আগে এসে পৌছেছে। রিমি মুখ ভাড় করে বললো,
—’তুই আগে এসে দাড়িয়ে আছিস। সময় দেখেছিস?’
প্রিয়া সে কথা কানে নিলো না। রিমিকে একপ্রকার টেনেহিঁচড়ে নিয়ে বসালো ভার্সিটির লাইব্রেরিতে। আজকে সোমবার। সোমবার বেশিভাগ সেমিস্টারেরই ক্লাস বন্ধ। সুতরাং লাইব্রেরিতে হাতেগোনা কয়েকজন বসা আরকি! রিমি নিজের হাতের ব্যাগটা সাইটে রাখতে রাখতে বললো,
—’বল এখন। কি তোর দরকারি কথা। যেটা বলার জন্য তুই ভার্সিটির লাইব্রেরিতে টেনে নিয়ে আসলি।’
প্রিয়া ইতস্তত করে খানিকটা। তারপর আমতা আমতা গলায় বলে,
—’তোর আর রাতুল ভাইয়ের তো কাবিন করে রাখা।’
—’হু। তো?’
—’না মানে, কি বলছিলাম বল তো… তোরা কি একসাথে থাকিস?’
এই প্রশ্নটা নিতান্তই অ-মূলক! প্রশ্নই ওঠার কথা না। তাদের কাবিনের পর থেকে রিমি একপ্রকার আকাশদের কটেজে যাওয়াও বন্ধ করে দিয়েছে। পরিপূর্ণ বিয়ের আগে রাতুলের থেকে দূরেই থাকতে চায় সে। প্রিয়াও সেটা জানে। রিমি গম্ভীর গলায় বললো,
—’কাহিনি কি সেটা বল। তোর ঘটনা কি?’
প্রিয়া ঠোঁট কামড়ে তাকিয়ে থাকে রিমির দিকে। তারপর ইতস্তততা কাটিয়ে বলে ওঠে,
—’ না মানে তুই তাহলে বুঝবি কি করে? তোরা তো আর স্বাভাবিক স্বামী স্ত্রীর মতো লাইফ লিড করিস না।’
—’তবুও বুঝবো আমি। তোর মতো গাধা না। বলে ফেল।’
পেটের কথা কিছুতেই মুখে আসছে না প্রিয়ার। কিছুতেই লজ্জা কাটিয়ে বলে ফেলতে পারছে না। ব্যাক্তিগত বিষয় নিয়ে এভাবে আলাপ আলোচনা দৃষ্টিকটু দেখায়। তারপরও…
—’আমাদের বিয়ের তো হলো ছয়-সাত মাস। অনেকদিন বল…’
—’তা হলো। তাতে কি?’
—’ আপুও প্রেগন্যান্ট। ওদের…’
রিমি প্রিয়ার মুখের কথা কেড়ে নিলো একপ্রকার। চোখজোড়া বড় বড় করে বললো,
—’আর ইউ প্রেগন্যান্ট? ‘
চোখবুঁজে দু হাতে মানা করলো প্রিয়া। ব্যাতিব্যাস্ত কন্ঠে বললো,
—’আরেহ্। কখন বললাম সেটা। শেষ করতে দে সবটা।’
—’বল।’
—’ মানে এতগুলো দিন বিয়ে। লাস্ট এক মাস উনার মতিগতি কেমন জেনো।’
—’কেমন জেনো মানে!’
কেমন অস্থির দেখয় প্রিয়ার মুখটা। লাজে লাল হয়ে আসে। তবে আজ ভেবেই এসেছে রিমিকে সবটা বলবে সে। তাছাড়া আর কাকেই বা বলা যায়! কেই বা সমাধান দেবে। প্রিয়া মাথা নুয়ে শান্ত গলায় বললো,
—’সিলেটে থেকে ঘুরে আসার পর উনি একদিনও আর আমার কাছে আসেনি।’
থমকে তাকিয়ে থাকে রিমি। প্রিয়ার ইতস্তত করার কারণ টের পায়। সে বড্ড স্বাভাবিক কন্ঠে মেয়েটাকে ইজি করার জন্য বলে,
—’একদিনও না মানে?’
—’মানে একদিনও কাছে টানেনি।’
—’তুইও যাসনি? আই মিন কাছে আসতে বলিসনি?’
লজ্জারা এসে ভিড় করেছে প্রিয়ার দু গালে। ফুলো ফুলো গাল টমেটোর মতো রক্তিম। প্রিয়ার ঠোঁট উল্টে বললো,
—’আমি কি করে কাছে ডাকবো? আজব। ‘
—’আগে?’
—’আগে মানে?’
—’আগে সব নরমাল ছিলো?’
—’সব। ‘
—’জিজ্ঞেস করিসনি?’
—’এটা জিজ্ঞেস করা যায়?’
—’কেনো যায়না। তুই স্ত্রী ওনার। জিজ্ঞেস করবি না? আগে রোজ আসতো কাছে? ‘
—’কাইন্ড অফ।’
—’বাঁধা দিতি? আই মিন এমন নয় তো? তুই বাঁধা দেওয়ায় মনোমালিন্য? ‘
—’সেরকম তো মনে হয়নি।’
রিমি খানিকক্ষণ চুপ করে রয়। ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতা কম হলেও এসবে জানাশোনা কম নেই তার। প্রিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে বললো,
—’ রাতে কি করে আজকাল?’
প্রিয়া মলিন মুখে বলে,
—’অফিস থেকে ফেরে। ফ্রেশ হয়, ডিনার করে। তারপর কাগজপত্রে মুখ গুজে। আমি ঘুমানোর পর, বেশিরভাগ রাতেই আমার ঘুম ভাঙে ওনার শাওয়ারের শব্দে। মাঝরাতে ঘন্টাভর শাওয়ার নিয়ে তারপর শুতে যায়।’
রিমির মুখখানা দেখে বোঝার উপায় নেই সে এই মূহুর্তে ঠিক কি ভাবতে ব্যাস্ত। আঙুলে ঠোঁটের চামড়া টানতে মগ্ন। প্রিয়ার কথা শেষ হওয়া মাত্র বললো,
—’আই থিংক তোর এক্সাম সামনে। তোকে ডিসট্রাকশন করতে চাচ্ছে না। অথবা তোর কোনো ছেলেমানুষীতে আপসেট সে।’
প্রিয়াকে হতাশ দেখালো বড্ড।
—’কিন্তু আমি তো ডিসট্রাক্টেড হচ্ছি। ওনার এই রুপ দেখে অভ্যস্ত আমি? একদিন কাছে না পেলে উন্মাদ হয়ে যায়। সে মানুষ দিনের পর দিন কিভাবে দূরে থাকতে পারে!’
রিমির কাছ থেকে হাজার একটা জ্ঞান, পরামর্শ নিয়ে প্রিয়া যখন কটেজে ফিরলো তখন দুপুর গড়িয়েছে। দু’দুটো প্র্যাকটিকাল ক্লাসও ছিলো সাথে। এই মূহুর্তে গোটা কটেজ ফাঁকাই থাকার কথা। যদি না বুয়া রাতের রান্নার জন্য না আসে। সদর দরজায় তালা। কেউ সত্যিই আসেনি। দীর্ঘশ্বাস ফেললো মেয়েটা। জানা কথা এটা! সবার ফিরতে ফিরতে সেই রাতই হবে।
চৌধুরি বাড়িতে বিশাল গোল মিটিং বসেছে এইমাত্র। চৌধুরীদের বড় কর্তার কানে গোপন সূত্রে খবর এসেছে–তার গুনধর ছোট ছেলে এরইমাঝে বিয়েশাদি করে ঘরসংসার গুছিয়ে নিয়েছে। থমথমে মুখে বসে আছেন খবর টা শোনার পর থেকেই। এ বাড়িতে বাকিদের মধ্যে অবশ্য চাপা উচ্ছ্বাস উতরিয়ে পরছে। সবাই বেশ খুশি। শাহজাহান চৌধুরী সরু দৃষ্টি ফেলে খুঁজলেন স্ত্রীকে। সে চোখের সামনেই আসছে না। বাধ্য হয়ে দু’বার হাক ছাড়তেই আমেনা চৌধুরী এসে দাঁড়ালেন স্বামীর সামনে। কোনো ধরনের নরম কন্ঠস্বর নয়, বরং স্বামীর ডাকের প্রতিত্তোরের মতোই শোনালো গলার স্বর।
—’কি সমস্যা? চা তো দিয়েই গেলাম।’
—’কি সমস্যা বুঝতে বাকি এখনো তোমার?’
—’না বললে বুঝবো কি করে?’
শাহজাহান চৌধুরী বড্ড বিরক্ত হন। বাকিরা হি হি, হা হা করতে ব্যাস্ত। সে যখন তাকাচ্ছে একমাত্র তখনই মুখে আঁচল চাপা দিয়ে হাসি থামাচ্ছে সকলে। সেটাও জোর করে। শাহাজাহান চৌধুরী কড়া গলায় বললেন,
—’ বড় বউমার কাছে গিয়ে যে গোটা মাস থেকে এলে, ছোট ছেলের মতিগতি কিচ্ছু টের পাওনি তুমি?’
আমেনা চৌধুরী সঙ্গে সঙ্গে জবাব দেয়না। টের পায়নি সে? কেনো পাবে না। মা সে। তাছাড়া তার ছেলেরা এ জীবনে কিছু লুকিয়েছে তার থেকে! লুকায়নি তো। যাওয়া মাত্র পরের বেলার মধ্যেই টের পেয়েছে। ছেলে মেয়ে দুটো ভালোবাসে একে-অপরকে। থাকতে হয় এক বাড়িতে। কঠিন সংযম যে তার নিজের ছেলের আছে, এ খবর তিনি জানতেন। তবে প্রিয়া কে দেখা মাত্র অভিজ্ঞ দৃষ্টি অনেক কিছু টের পেয়েছে। তবে আগেই ছেলে মেয়েকে ভুল বোঝার মতো ভুল সে করেনি। এধরণের পরিবর্তনের একটাই বিষয় দাড় করিয়েছিলেন তিনি। ছেলে আর অবিবাহিত নেই, সম্ভবত গোপনে প্রনয় সেরে ফেলেছে। প্রিয়া কে ডেকে আড়ালে জিজ্ঞেসও করেছিলেন তিনি, মেয়েটা লাজে এতটুকুন হয়ে গেলেও শাশুড়ীর থেকে লুকায়নি। পরে আকাশও নির্দ্বিধায় স্বীকার করেছে। তিনি হাফ ছেড়ে বেঁচেছেন। একে অপরকে ভালোবাসে। আজ বাদে কাল বিয়ে হতোই। হারামে না থেকে হালাল হয়েছে। তাছাড়া মেয়েটার ওপর যে শকুনের ছায়া পরেছিলো এ খবরও পেয়েছেন তিনি।সুতরাং তার ছেলে যা করেছে একদম ঠিক করেছে বলেই তার মনে হয়েছে।
আমেনা স্বামীর কথার জবাব দিলো বড্ড অনিহার সাথে।
—’এতোটা বোকা আমি?’
—’তার মানে টের পেয়েছিলে?’
—’টের পাওয়ার কি আছে? আমি তো জানতামই। আমিই অনুমতি দিয়েছি।’
অশান্তি এড়াতে এই প্রথম সম্ভবত স্বজ্ঞানে মিথ্যাে কথা বললে ফেললেন তিনি। স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছেন।
—’কবে বিয়ে করেছে ওরা?’
—’অয়ন – শিয়ার বিয়ের দিন পনেরোর মাথায়।’
মাথায় বাজ পরলো মানুষটার! অবাক কন্ঠে বললো,
—’সাত মাস?’
—’হ্যা।’
—’আমরা রাজি ছিলাম না সবাই? বলিনি, বউমার বাবা মা ফিরে এলেই ওদের বিয়েটা দেবো। এখন…এখন ওনারা কি মনে করবেন? কেমন ছেলের সাথে বিয়ে ঠিক করেছে তারা! তারা যেতে না যেতেই, মেয়েটাকে পটিয়ে বিয়ে অবধি করে ফেলেছে। সাত মাস যাবৎ সংসারও করছে। আর ছেলের মা সেটা জানতো!’
—’এতে দোষের কি আছে? এক বাড়িতে থাকে দু’জন। হারাম জিয়িয়ে রাখার থেকে ধর্ম মতে বিয়ে করে রেখেছে। সমস্যা কোথায়?’
কিছু শক্ত কথা বলতে গিয়েও বলা হলো না স্ত্রীকে। কি এক জঘন্য বিষয় ঘটিয়ে ফেলেছে তার ছেলেটা। বেয়াই এর কাছে মুখ দেখবো কি করে!
মিনিট দুয়েক ধুম ধরে বসে কি সব ভাবলেন পৌঢ়। অতঃপর খুক খুক করে গলা পরিষ্কার করে সোজা হয়ে বসে বললেন,
—’আমি একটা সিদ্ধান্ত নিলাম। এইমাত্রই নিলাম। আশা করবো এই সিদ্ধান্ত চৌধুরী বাড়ির বাইরে যাবে না। মন দিয়ে শুনবে সকলে, মানবেও। আদেশ এটা।’
গোটা বিছানায় একাত ওকাত করে যাচ্ছে প্রিয়া। তলপেট খিঁচে আসছে ব্যাথায়। বমি বমি ভাব হচ্ছে সেই তখন থেকে। ভার্সিটি থেকে এসে কোনোমতে খেয়ে, শাওয়ার নিয়ে সেই যে শুয়েছে! সবার আগে ফিরলো আকাশই। অয়ন গিয়েছে শিয়াকে নিয়ে চেকআপএ। মেয়েটার চারমাস চলে। অথচ খাওয়াদাওয়া শিকেয় উঠেছে। রাতুলদের আজকাল কাজের চাপে এমনিতেও ফিরতে দেরিই হয়। গোটা বাড়ি অন্ধকার। এমন সচরাচর থাকে না। প্রিয়ার অভ্যাস গোটা কটেজের সব ঘরের আলো জ্বেলে রাখা। দ্রুত পায়ে নিজের ঘরে যেতেই দেখলো বালিশে মুখ গুঁজে শুয়ে আছে মেয়েটা। হুড়মুড়িয়ে এগিয়ে গেলো আকাশ। বাহুতে শক্তপোক্ত হাতের স্পর্শ পেতেই বর্ণহীন মুখটা তুললো প্রিয়া। আকাশের ধারনা ছিলো ঘুমিয়ে গিয়েছে। সে ঠিকঠাক করে বালিশে শুয়িয়ে দিতে এসেছিলো। কিন্তু মেয়েটা ঘুমায়নি। বরং এই মূহুর্তে এমন মুখাবয়ব দেখো ধক করে উঠলো খানিকটা। এলেমেলো চুলগুলো মুখের ওপর থেকে সরিয়ে গুছিয়ে ব্যাস্ত স্বরে ডাকলো,
—’কি হয়েছে, পাখি? শরীর খারাপ তেমার?’
আলতে হাত রাখলো মেয়েটার ললাটে। নাহ্, কপাল ঠান্ডা, জ্বরের রেশ মাত্র নেই। তবে মুখচোখ এমন শুকনো লাগছে ক্যানো! হঠাৎ মাথায় এলো কিছু একটা। দুই দুইয়ে চার মেলাতেই মাথায় এলো কিছু একটা। পিরিয়ডের ডেট চলছে মেয়েটার। বিবাহিত জীবনের এই কয়মাসে খেয়াল করেছে এ সময় মেয়েটা কাবু হয়ে যায়। কিন্তু এতটা তো নয়!
আকাশ কথা বাড়ালো না সেখানে বসে। হাত ঘড়িটা দ্রুত হাতে খুলতে খুলতে উঠে পরলো বিছানা থেকে। শার্টের আস্তিন গোটাতে গোটাতে দ্রুত পায়ে নেমে এলো নিচতলায়। এখনো কেউ-ই ফেরেনি। রাতও খুব একটা হয়নি। গরম পানি নিয়ে ফিরে এলো ওপরে।
—’ সোজা হয়ে শুয়ে পরো একটু। গরম পানি নিয়ে এসেছি। ভালো লাগবে।’
প্রিয়া কথা শুনলো। ধীরেসুস্থে ঘুরে শুলো এদিকে। পেটের ওপরের জামাটা সরিয়ে হট ব্যাগ টা আকাশ ধরলো তলপেটের ওপর। খানিকটা শিথিল হলো প্রিয়া। সত্যিই ভালো লাগছে। এর আগে কখনো এতটা পেইন হয়নি তার। এবারই সম্ভবত এতো কাবু করে ফেলেছে।
প্রিয়া চোখ মেলতেই দেখলো,আকাশের চোখেমুখে সারাদিনের নিদারুণ ক্লান্তি। বাইরের পোষাকও এখনো ছাড়েনি লোকটা। গভীর মন দিয়ে যত্ন করে যাচ্ছে তার। প্রিয়া চোখ বুজে পরে রইলো আরও খানিকটা সময়। ব্যাথা বেশ কম টের পাচ্ছে এখন। তবে হাত পা,কোমড়ের খিঁচুনি কমেনি একদমই। প্রিয়া শান্ত গলায় বললো,
—’আপনি এসে তো জামাকাপড় ও পাল্টাননি। ফ্রেশ হয়ে নিন। এটা থাকুক এখানে। আমি করে নিতে পারবো।’
আকাশের মধ্যে ওঠাউঠির কেনো লক্ষন দেখতে পাওয়া গেলো না। প্রিয়ার মুখ দেখে যা বোঝার বুঝতে পারছে সে।
—’আর কোথায় খারাপ লাগছে?’
প্রিয়া ইতস্তত করলো খানিকটা। তার জবাবের অপেক্ষায় আকাশ তাকিয়ে আছে। হট ব্যাগ টা উল্টেপাল্টে দিচ্ছে তলপেটের দিকে। প্রিয়া ইশারা করলো কোমড়ের দিকে।
আলতো হাতে বুকে ভর দিয়ে শুয়িয়ে ম্যাসাজ করে দিলো কোমড়ে। শিরশির করে উঠছে রমনীর গোটা শরীর। প্রজাপতি উড়ছে যেনো তলপেটে। ধনুকের মতো বাঁকানো কোমড় মেয়েটার। বৃদ্ধাঙুলি যতবার পিঠের শিরদাঁড়ায় ছোয়াচ্ছে আকাশের পুরুষ দেহ কম্পিত হচ্ছে ততবার। মোমের মতো শরীর মেয়েটার। চোখ বুজে শ্বাস নিলো আকাশ। কতদিন ছোঁয়া হয়না! আদর দেওয়া হয়না! মাসখানেক বোধহয় পার হয়ে গিয়েছে!
—’এখন ভালো লাগছে। আপনি যান, ফ্রেশ হয়ে নিন।’
—’খেয়েছো রাতে?’
—’নাহ।’
আকাশ উঠে গেলো। ফ্রেশ হয়ে খাবার নিয়ে আসবে মেয়েটার জন্য। ওষুধ না দেওয়া পর্যন্ত পুরোপুরি ব্যাথা যাবে না। এখনো যেহেতু খাবার খায়নি, শতভাগ নিশ্চিত ওষুধও নেয়নি।
গভীর রাত। প্রিয়ার ঘুম ধরেনি এখনো। আর না তো ওষুধেও কোমড়ের দিকের খিঁচুনি কমেছে। তবে মুখে প্রকাশ করলো না আর। সেই আসার পর থেকেই, আকাশ তাকে নিয়ে ব্যাস্ত। আপাতত ঘুমের ভান করে পরে আছে চোখমুখ বুজে। আকাশ ওদিকের স্টাডি টেবিলে। কাগজপত্রের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। রাত কত হয়েছে ঠাহর করতে পারলো না প্রিয়া। তবে অয়ন শিয়ারা যখন ফেরে তখন সাড়ে দশটা বাজে, সেটা মনে আছে। এখন তো তাহলে রাত একটা বোধহয় বাজেই। গত একমাসের হিসেব মতে কিছুক্ষণের মধ্যেই শাওয়ার নিতে ঢুকবে আকাশ। হলোও তাই। আকাশ বাথরুমে ঢুকতেই নিজের ক্লান্ত আখিজোড়া খুললো সে। ঘড়িতে সময় দেখলো। একটা বেজে দুই! দাঁতে দাঁত পিষে শুয়ে ছিলো এতক্ষণ। ছিড়ে যাচ্ছে তলপেটের দিকটা। এতো অসহ্য পরিস্থিতি আগে কক্ষনো হয়নি। প্রিয়া স্থির হয়ে শুয়ে থাকে তবুও। আকাশের কি হয়েছে জানা নেই তার। আজকাল তো কথাবার্তাও কম বলে লোকটা। সমস্যা কি! কি করেছে সে! তার জানা মতে সবকিছু দিব্যি স্বাভাবিক ছিলো। তবে! কিছু একটা মাথায় এলো প্রিয়ার। রিমি বললো প্রিয়ার পরীক্ষা, পড়াশোনা! তাই যদি হবে,তবে কথা বলতে সমস্যা কি? লোকটা তো ঠিকমতো কথাও বলে না..।
আকাশ বের হলো পাক্কা দেড় ঘন্টার মাথায়। এতক্ষন টানা শাওয়ার ছেড়ে রাখা ছিলো। এরকম করলে ঠান্ডা না লেগে যায়। হেমন্তের শেষদিক। রাত মানে হাড় হীম করা শীত পরে। এর মধ্যে এতক্ষণ ভর গোসল দেওয়ার মানে কি!
আকাশ কোমড়ে তোয়ালে পেঁচিয়ে বাইরে এসেই দেখলো আধশোয়া হয়ে বসে থাকা প্রিয়াকে। চোখমুখ অন্ধকার করে বসে আছে মেয়েটা। আকাশ ভ্রু কুচকালো। দ্রুত হাতে গায়ে টি শার্ট আর ট্রাউজার জড়াতে জড়াতে বললো,
—’উঠে পরেছো কেনো? আবার ব্যাথা করছে? ‘
প্রিয়া সে কথার জবাব দেয় না। মিহি কন্ঠে ডেকে বলে,
—’এদিকে আসুন।’
আকাশ আসে। হাতের তোয়ালে খানা চেয়ারে ঝুলিয়ে এসে বসে প্রিয়ার কাছে। প্রিয়া আচমকা জড়িয়ে ধরলো আকাশকে। সদ্য শাওয়ার নিয়ে আসায় কড়া বডিওয়াশের ঘ্রান। শরীরটাও সম্ভবত ভালো করে মোছা হয়নি। টি শার্ট ভিজে উঠেছে পানিতে। মাথা দিয়ে টিপটাপ পানি গড়িয়ে পরছে। প্রিয়া হাতের বাধন শক্ত করে ধরে আকাশের গ্রীবাদেশ। জোরে জোরে শ্বাস টানে। আকাশ স্থির হয়ে বসে রয়। বুকের ভিতরের ঢিপঢিপ টা জোড়ালো হয়ে এসেছে। বাঁ হাতটা কোমড়ে গলিয়ে দিতেই শুনতে পেলো প্রিয়ার মিহি কন্ঠ,
—’কিছু হয়েছে কি? ‘
—’কি হবে?’
—’মনে হচ্ছে। ‘
—’নাহ তো। তোমার ব্যাথা কমেছে?’
—’একটুও না।’
আকাশ পুনরায় ব্যাস্ত হয়। প্রিয়ার কোমড় চেপে সোজা করে বসাতে চায়। কিন্তু হাতের বাঁধন আলগা করে না প্রিয়া। উল্টো আরও দৃঢ় ভাবে জড়িয়ে আকাশের কানের নরম অংশে ঠোঁট চেপে ফিসফিসিয়ে শুধায়,
—’আপনার কি হয়েছে সেটা বলুন।’
প্রিয়া বারবার এক প্রশ্নই করে যাচ্ছে। আকাশের অসুবিধা হচ্ছে এবারে৷ মেয়েলি শরীরের সবটুকু লেপটে আছে তার সাথে। খানিক গলা পরিষ্কার করে নরম গলায় বলে,
—’কিসের কথা বলছো?’
—’আপনি এমন করছেন কেনো? আজকাল বড্ড অচেনা ব্যবহার করেন। কাছে আসেন না, কথা বলেন না।’
মেয়েটা খেয়াল করেছে বিষয়টা! আকাশ শুকনো ঢোক গেলে৷ মনে পরে যায় মাসখানেক আগের কেনো এক রাতের কথা। হুশ খুয়িয়ে বসেছিলো সে। প্রিয়ার পরের দিন ভার্সিটির কোনো এক জরুরি পরীক্ষা ছিলো সম্ভবত। এদিকে একশ তিন জ্বর সারাদিন মেয়েটার। তার পাগলামির মাশুল এরকম আরও দিয়েছে মেয়েটা। তাছাড়া আরও কারণ আছে বইকি! মেয়েটার বয়স কম। হতে পারে এই বয়সে অঢেল মেয়ে বিয়ে করে স্বামী, সন্তান,সংসার সামলাচ্ছে। কিন্তু তাদের সাথে প্রিয়াকে সে এক কাতারে ফেলবে কেনো! চৌধুরী বাড়ির ছোট বউ হবে এই মেয়ে। ওর নিজের অনেক স্বপ্ন আছে। সেগুলো পূরণ করার দায়িত্ব তো আকাশেরই। মেয়েটার বাবা মা অল্প বয়সে বিয়ে দেবেন না বলে অপেক্ষা করতে বলে গেলো আরও দুটো বছর। এদিকে তারা সে-সব না মেনে সব এলোমেলো করে বসে আছে। আর আকাশের মায়ের বলা কিছু কথাও অবশ্যই এসবের পিছনে আছে।
মাসখানেক আগে,
—’ বোসো এখানে। তোমার সাথে কিছু কথা আছে আমার। ‘
আকাশ বসে। তার মা এসেছে দু দিন হলো। মায়ের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকতেই আমেনা চৌধুরী গম্ভীর গলায় বলেন,
—’তুমি পুরুষ মানুষ, আকাশ। এখন বিবাহিত পুরুষ। তোমার স্ত্রী সে হিসেবে বয়সে বেশ ছোট। তার পুরো দায়িত্ব তোমারই। না জানিয়ে বিয়ে টা সেরেছো। সবাই মেনে বসে আছে। তার পরও না জানিয়ে করার দরকার ছিলো না। আমাদের হতাশ করেছো তুমি। তোমার বাবা জানলে কি হবে জানা নেই আমার। তার থেকেও বড় কথা বউমার বাবা মায়ের কাছে কি জবাব দেবো?’
আকাশ চুপ করে শোনে মায়ের কথা। মা কি বলতে চাচ্ছে, সেটাই বুঝতে চেষ্টা করে জেনো। আমেনা চৌধুরী সময় নিলেন না বেশিক্ষণ। স্পষ্ট গলাতেই বললেন
—’ মেয়েটার গোটা ক্যারিয়ার পরে আছে। বিয়ের বন্ধনে বেঁধে সে-সব থেকে দূরে করে ফেলতে পারো না তুমি। তাছাড়া… স্পষ্ট করেই বলি। এখন ভুলেও মা হওয়ার সময় নয় প্রিয়ার। ও নিজেই বুঝে উঠতে পারে না। মা হলে সামলাবে কি করে? সব দিক বিবেচনায় রাখতে হয়, আকাশ। আমি তোমার মা, বলাটা উচিত কি-না জানিনা৷ তবে মা হলেও তেমার বন্ধু আমি। সোজাসাপটাই বলি। বাবা -মা কোনো একদিন নিশ্চয় হবে তোমরা৷ আল্লাহ সে তৌফিক দান করুন। কিন্তু, আমার মতে আপাতত তোমরা একটু দুরত্ব রেখেই চলাফেরা করো। একে তোমাদের বিয়ের বিষয়টা বড়রা কেউ জানেনা। বউমার পরিবার জানে না। তারা আশা নিয়ে বসেআছে,ফিরে এসে ধুমধামে বিয়ে দেবেন। তাছাড়া প্রিয়ার কিছু ফিজিকাল প্রবলেম হচ্ছিলো। এক মূহুর্তের জন্য আমি আর বড় বউমা ভেবে নিয়েছিলাম ও অন্তঃসত্ত্বা। ভয়ে হাত পা অসাড় হয়ে আসছিলো শিয়ার। ওর বাবা মা কে হার্ট করতে চায়না ওরা। শিয়া কথা বলে জেনেছে পিল নেয় মেয়েটা নিয়মিত। মেয়েদের উচিত নয় এটা। জানো নিশ্চয় ৷ না জানলে জানা উচিত এখন। পরে বাবা মা হওয়ার স্বাদ পেতে চাইলে সতর্ক হও। আর মেয়েটার সামনে মাসে পরীক্ষা, পাশাপাশি শরীরটাও খারাপ। একটু সময় দাও ওকে।’
বর্তমান,
কন্ঠদেশে প্রিয়ার নাকমুখের ঘর্ষনে বর্তমানে ফিরলো আকাশ৷ দু হাতে প্রিয়ার কোমড় চেপে সিথিতে আলতে চুমু এঁকে বললো,
—’শরীর খারাপ তোমার। কিভাবে কাছে আসবো?’
মুখ তুললো প্রিয়া। নড়াচড়াও কষ্টকর লাগছে। শান্ত গলায় বললো,
—’সে তো আজকের অযুহাত। গোটা মাস?’
এ-সময়, এই অবস্থায় এতোটা কাছাকাছি ঘনিষ্ঠ হয়ে প্রিয়ার করা আলাপ বড্ড জ্বালাতন করছে আকাশকে। এখন কি করে বলবে কেনো কাছে আসেনি। বা এখন চাইলেও কি সম্ভব! আকাশ মেয়েটার এলোমেলো চুলগুলো কাঁধের ওপাশে দিতে দিতে বললো,
—’ সুস্থ হও কাছে আসবো।’
—’এতদিন কি সমস্যা ছিলো?’
—’কি সমস্যা থাকবে? অফিসের কত ব্যাস্ততা, দেখছো না?’
—’আমার দিকে তাকানও না,কথাও বলেন না। আমি যা জিজ্ঞেস করি ততোদূরই।’
আকাশ দীর্ঘশ্বাস ফেলে। মেয়েটা একগুয়ের মতো প্রশ্ন করেই যাচ্ছে। আর তার শরীর কাঁপছে কেমন জানি। এই শীতেও আবার শাওয়ার নেওয়ার প্রয়োজন পরবে বোধহয়৷ আকাশ প্রিয়াকে ধীরেসুস্থে শুয়িয়ে দিলো। গায়ের ওপর কম্বল টা টেনে দিতে দিতে বললো,
আকাশপ্রিয়া পর্ব ৫৬
—’ এখন জবাব চেয়ো না। দিতে গেলে মাথা এলোমেলো হয়ে যাবে। অনেক দিনের অনাহারী। সহজে মস্তিষ্ক শান্ত হতে চায়না। অল্পতে ধৈর্য হারাই তোমার কাছে এলে। বুকে পাথর চাপা দিয়ে বউ না ছুঁয়েও নিজেকে শান্ত করতে এই শীতের রাতে এতোবার শাওয়ার নেওয়া যায়না। কষ্ট দিতে চাইনা তোমাকে। দ্রুত সুস্থ হও কেমন?’
