Home আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৫০ (২)

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৫০ (২)

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৫০ (২)
অরাত্রিকা রহমান

রুদ্র আপন মনে যখন গান গাইছিল রিমি দরজায় দাঁড়িয়ে অসীম মুগ্ধতায় রুদ্রর দিকে তাকিয়ে তার শুনছিল। তবে এক পর্যায়ে আর দরজায় দাঁড়িয়ে না থেকে ঘরে প্রবেশ করতেই রুদ্রর নজর গেল রিমির দিকে। রিমি পায়ে আঘাত পেয়েছিল তাই একটু খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছিল, রুদ্র রিমি কে দেখে তাড়াতাড়ি গিটার টা রেখে রিমির দিকে এগিয়ে গিয়ে রিমির হাত দুটো ধরে ঘরে ভিতর আনতে আনতে একটুও আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলো-

“রিমি! আপনি এখানে? কিছু লাগবে আপনার?”
রিমি রুদ্রর দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়লো-“উঁহু, তেমন কিছু না। একা একা একটু বোর লাগছিল তাই এলাম।”
রুদ্র রিমির কথা একটু মুচকি হাসল, তার নিজের ও বোর লাগছিল। রুদ্র রিমিকে বিছানায় বসিয়ে বলল-
“ভালো করেছেন? এবার বলুন তো বাড়িটা কেমন লেগেছে?”
রিমি একটু হেসে উত্তর করলো-“বাড়ি তো অনেক সুন্দর। কিন্তু আপনার কন্ঠ তার থেকে অনেক সুন্দর। আমাকে ডাকলেন না কেন? নিজে থেকে না এলে এতো ভালো দৃশ্য মিস করে যেতাম।”
রুদ্র একবার গিটার টার দিকে তাকালো, একটু লাজুক হেসে বলল-“আসলে, গিটার টা খুব পুরোনো। দেয়ালে ঝুলানো ছিলো ভাবলাম একটু বাজাই। ভালোই পারর্ফম করছে এখনো।”
রিমি সম্মতি দিয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল-“অনেক ভালো পারফর্ম করছে। তা তো শুনতেও পেলাম আর দেখলাম ও।”
রিমি একটু গিটার টা হাতে নিয়ে ছুঁয়ে দেখতেই রুদ্র একটা অপ্রত্যাশিত আবদার করে বসলো-“Rimi, would you like to jam?‌” (একসাথে গান গাওয়া)
রিমি একটু আশ্চর্য হয় হঠাৎ এমন প্রস্তাবে। তবে তার অনেক দিন গানের সাথে যোগাযোগ নেই বলে মাথা নিচু করে বলল-

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“Sure. তবে বেশ কিছু দিন ধরে প্র্যাক্টিস নেই। গলা বসে গেছে। মনে হয় না গাইতে পারবো।”
রুদ্র রিমির কথা কানে না তুলে উল্টো উৎসাহ দিয়ে বিছানায় রিমির ঠিক পাশে বসে বলল-“চেষ্টা তো করুন। আমার বিশ্বাস আছে আপনি ঠিক পারবেন। এই কথাটুকু রাখুন অন্তত।”
রিমি বুঝতে পারলো রুদ্র হয়তো আগের একটা কথা রিমি রেখেনি তাই রুদ্র এমন করে বলল। শুরুতে একটু অস্বস্তিতেই
রুদ্রর কথায় রাজি হলো। রুদ্র গিটার বাজাচ্ছে আর রিমি গাইছে যেহেতু রিমির হাতেও যথেষ্ট আঘাত ছিল তাই রিমিকে গিটার দেয়নি রুদ্র। একপর্যায়ে দুজনই সময়টা উপভোগ করতে শুরু করলো। রিমি রুদ্রর দিকে তাকিয়ে গান গাইছিল যেন গানের প্রতিটি লাইন তাদের দুইজনের মাঝে বাক আদান প্রদান করছে। রুদ্র ও রিমির গলার সুরে মন ভুলে গিয়ে ডুব দিয়েছে তার চোখে- এই প্রথম তার কাছে গানের লিরিক্স গুলো এতো জীবন্ত মনে হচ্ছে। গানের এক কলি রিমি খুব আড়ষ্টতার সাথে রুদ্রকে উদ্দেশ্যে করেই গাইলো হয়তো বাস্তবতা প্রকাশ করতে-

“Tum yu mile ho jabse mujhe,
aur sunehri mai lagti hu.. Sirf ladon se nehi ab toh,
poore badan se hasti hu …
Mere din rat salone se, sab hai tere hi hone se.
Ye saath hamesha hoga nehi,
Tum aur kahin mai aur kahi..
Lekin jab yaad karoge tom, Mai banke hawa aajaungi….Ooooooooo
Mai fir bhi tumko chahungi, Mai fir bhi tumko chahungi..Is chahat meee..”
পরের লাইন গাওয়ার আগেই রুদ্র হঠাৎ গিটার বাজানো থামিয়ে দিলো যেন চাইছে না সেই লাইনটা গাওয়া হোক। চোখে মুখে হালকা বিরক্তি রুদ্রর, এইদিকে রিমি রুদ্রর দিকটা বুঝতে পারছে ভালোই তাই আর কথা বাড়ালো না। রুদ্র বিছানায় গিটার টা রেখে উঠে দাঁড়ালে রিমি রুদ্রহাত আকড়ে ধরলো আচমকা। রুদ্র রিমির দিকে তাকালো না এবার। রিমি নিজের থেকে প্রশ্ন করলো-

“সেদিন কথা রাখিনি বলে খুব রাগ হয়েছিল তাই না? আপনি আমাকে কিছু জিজ্ঞেস কেন করছেন না? প্রশ্ন কেন করছেন না? এমন চুপচাপ এতো দিন পর কিভাবে আমার উপস্থিতি আবার মেনে নিচ্ছেন?”
রুদ্র রিমির কথায় কোনো উত্তর করলো না কেবল একটা ঢোক গিলে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল, নিজের হাত ছাড়ানোর চেষ্টাও করছে না। কিন্তু রিমির মন অনেক উত্তেজিত। রিমি আঁতকা বিছানা থেকে উঠতে গেলে পায়ের ব্যথায় চাপ পাড়ায় ব্যালেন্স হারালে রুদ্র সাথে সাথে রিমির কোমর জড়িয়ে ধরে বলল-
“রিমি…! শান্ত হন। আপনার পায়ে লেগে যাবে। আমার মনে কোনো প্রশ্ন নেই, কোন দ্বিধা নেই। আপনার উপস্থিতি আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, doesn’t matter কতদিন পর এলেন। আপনি আমার সাথে আছেন এটা যথেষ্ট। I am okay with everything as long as you are with me.. Got it?”

রিমির চোখ গুলো বড় বড় হয়ে উঠলো এই প্রথম কোনো পুরুষের ছোঁয়া গাঁয়ে লাগলো এভাবে, কি অদ্ভুত অনুভূতি। রুদ্র এমন কিছু বলবে সে ভাবে নি। রিমি হয়তো এই প্রথম নিজের জন্য কারো চোখে এতোটা ডেস্পারেশন দেখছে। কারণ অজানা হলেও আন্দাজ করতে পারছে পৃথিবীর কারো কাছে তার অস্তিত্বের মূল্য আছে। রুদ্রকে একটু গম্ভীর হতে দেখে রিমির প্রথম দিনে তার ভাইয়ের সাথে রুদ্রর ঝামেলা হওয়ার ঘটনা মাথায় এলো।
একটু ভয়ে ভয়েই বলল-“Got it. এবার আপনি শান্ত হন প্লিজ। আমার ভয় করছে।”
রুদ্র রিমির কথায় হঠাৎ শান্ত হয়। তার হাত রিমির কোমর জাড়িয়ে ছিল একটু অস্বস্তি রিমির মুখে স্পষ্ট ভেসে উঠেছিল কিন্তু রুদ্রর কাছে সেই অস্বস্তি ভরা মুখ আরো আকর্ষণীয় লাগছে। নিজের নিয়ন্ত্রণ হারানোর কথা মাথায় আসতেই রিমিকে সোজা দাঁড়া করিয়ে নিজের হাত সরিয়ে নেয় রুদ্র। রিমি নিজেকে একটু ঠিক ঠাকই করে নিয়ে রুদ্র কে পাল্টা প্রশ্ন করলো-

“আচ্ছা আপনি আমার উপর রাগ করেন না কেন? আমি
আপনাকে কতো অপেক্ষা করিয়েছি।”
রুদ্র রিমির দিকে তাকালো এক নজর আর পর মুহূর্তেই
বলল-
“রিমি আমি বিশ্বাস করি আপনার কাছে কোনো কারণ অবশ্যই আছে যার জন্য আপনি সেদিন আসেননি। আর
তা ছাড়া সত্যি বলতে…!”
নিজের সম্পূর্ণ কথা শেষ করলো না রুদ্র। তবে রিমি কৌতুহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল-“সত্যি বলতে কি…?”
রুদ্র সত্যি টাই স্বীকার করে নিল-
“সত্যি বলতে, আমার কখনো আপনার উপর রাগ করতে ইচ্ছে করেনি। আপনাকে দেখলে আমার রাগ আসে না, বরং ..!”

রুদ্র আবার অর্ধেক বলেই থেমে গেলে রিমি কিছু সময় থ মেরে দাঁড়িয়ে থেকে আবারো পাল্টা প্রশ্ন করলো-“বরং..?”
রুদ্র একটু লজ্জায় মাথার চুলে হাত দিয়ে বিড়বিড় করলো-
“কেমন যেন মায়া মায়া লাগে। আদর আদর পায়!!”
রিমি রুদ্রর কথা বুঝলো না তাই আবারো প্রশ্ন করতে যাবে তখনি রুদ্রর ফোন বাজলো। রিমি আর কিছু বলার সুযোগ পেলো না। রুদ্র ফোনটা হাতে নিতেই দিখলো রায়ান কল করেছে। রুদ্র তাড়াতাড়ি কলটা রিসিভ করল-
-“হ্যালো ভাইয়া! কোথায় তোমরা? কতক্ষন লাগবে আর আসতে?”
-“পৌঁছাতে খুব একটা সময় লাগবে না চলে এসেছি আমরা। সব ঠিক ঠাক তো?”
রুদ্র রায়ান কে আশ্বস্ত করে বলল-“হ্যাঁ এখানে সব ঠিক ঠাক আছে। তোমাদের রুম ও রেডি আছে। কেয়ারটেকার কাকা রাতের খাবারের আয়োজন করছেন।”
রায়ান স্বাভাবিক ভাবে উত্তর করলো-“আচ্ছা ঠিক আছে।”
রায়ান পরমুহূর্তেই একবার মিরায়ার দিকে তাকালো-মেয়েটার এখনো জ্ঞান ফেরেনি তাই রায়ান একটু চিন্তায় ছিল। এভাবে তো আর থাকতে দেওয়া সম্ভব না।
রায়ান রুদ্র কে আবার বলল-

“রুদ্র শোন, মিরার জ্ঞান নেই। কোনো ডক্টরর কে খবর দিয়ে বাগান বাড়িতে নিয়ে আয়। ডক্টর দেখাতে হবে মিরাকে।”
রুদ্র মিরায়ার জ্ঞান নেই জানতে পেরে অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো রায়ানকে-
“মিরার জ্ঞান নেই মানে কি? কি হয়েছে? জ্ঞান হারালো কি করে ওর?”
রায়ান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল-
“মিরা না মিরা ভাবি। তুই করে বলিস সেটা মানা যায় কিন্তু ভাবি ডাকা কম্পালসারি।”
রুদ্র রায়ানের এই কথায় পাত্তা না দিয়ে বলল-
“হ্যাঁ ঠিক আছে মিরা ভাবি… জ্ঞান হারিয়েছে কিভাবে তাই বলো।”
রায়ান নিজেকে খুব কষ্টে সামলে রেখেছিল এতোটা সময়। একে তো পুরুষ মানুষ তার উপর প্রথম বার এতো বছর পর বউয়ের ঠোঁটের স্বাদ পেয়েছে। শরীর, মস্তিষ্ক বা অনুভূতি কিছুই ঠিক নেই। সর্বত্রই এক ধরনের অস্বস্তি বোধ বয়ে বেড়াচ্ছে ছেলেটা। এর মধ্যে রুদ্রর এমন প্রশ্নে রায়ানের বিরক্ত হলো-

“তোর বোনের যে শরীর, পাতাকাঠি ফেইল করবে ওর কাছে। এখন আমি চাইলেও কিছু করতে পারবো না ওকে। তাই এতো চিন্তা করতে হবে না তোর আমি কিছু করি নি এখনো। দুর্বল শরীর তাই নিতে পারে নি।”
রুদ্র বুঝতে পারছে রায়ান কি বোঝাতে চাইছে কিন্তু মনের সন্দেহ এখনো দূর হলো না তার-
“সে না হয় বুঝলাম কিছু করো নি। কিন্তু নিতে পারেনি মানে কি? কি নিতে পারেনি?”
রায়ান এবার দাঁত কিড়মিড়িয়ে উত্তর করলো-
“আমার আদর নিতে পারেনি। এতো বছর পর প্রথমবার একটু ছুঁয়েছিলাম। তোর বোনের সহ্য হলো না আমার সুখ- অজ্ঞান হয়ে গেছে একটা চুমুতেই। আল্লাহ ভালো জানেন কি আছে আমার কপালে। একটার পর একটা ঠাডা পড়ে যখনি বউয়ের কাছে যাই, বাল।”
রুদ্র রায়ানের কথায় যেমন হতাশ তেমন আশ্চর্য। ভাই হিসেবে কি বলবে আর দেবর হিসেবেই বা কি বলবে কিছুই মাথায় এলো না। রায়ান রুদ্র কে রেগেই বলল-

“আমার বউ আমি দেখে নিবো। তোকে ডক্টর ডাকতে বলেছি সেটাই আপাতত কর।আর হ্যাঁ অবশ্যই মেয়ে ডাক্তার আনবি। ওখানে এসে যেন ডক্টর দেখতে পাই। বুঝতে পেরেছিস?”
রুদ্র রায়ানের কথায় সম্মতি দিয়ে বলল-“ওকে। তোমরা এসো। আমি ব্যবস্থা করছি।”
রায়ান কলটা কেটে দিলো। তার মাথায় যে কি ঘুরছে সে নিজেও জানে না। মিরায়ার দিকে নজর দেওয়ার পর রায়ান খেয়াল করলো মিরায়া হালকা কাঁপছে। বান্দরবানের রাস্তা তার উপর শীতের আগমনী বাতাসের কাছে মিরায়ার জীর্ণ শীর্ণ শরীর টা বেশ দূর্বল। রায়ান গাড়ির কাচটা উঠিয়ে দিয়ে, অল্প সময়ের জন্য গাড়ি থামালো। মিরায়ার কাঁপতে থাকা শরীরটাকে নিজের কাছে নিয়ে একটু জড়িয়ে গরম করে নিজের কোর্ট টা মিরায়ার শরীরে মুড়িয়ে দিলো। এরপর আস্তে করে বসার জায়গায় একটু হেলিয়ে শুইয়ে দিয়ে একবার করে সম্পূর্ণ মুখে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে আদর করে মিরায়ার পা নিজের উরুর উপর নিয়ে হালকা ঘসে মালিস করে গরম করে দিল। তার পর আবারো গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে বিড়বিড় করলো-

“খোদা জানে কি করেছে একমাসে, যে এই ভাবে ওজন কমেছে। বুকে জড়ালে মনেও হচ্ছে না কিছু আছে আমার আয়ত্তে। ডাক্তার কি বলবেন কে জানে। আল্লাহ আমার বউটা কে ঠিক করে দাও। আর ভালো লাগে না।”
রায়ানের এই কিছু সময়ের যত্ন মিরায়ার জন্য হয়তো ভালোই কাজ করলো। মেয়েটা চুপচাপ পড়ে আছে। শরীরের উপর রায়ানের কোর্ট আর রায়ানের কোলে তার পা।

মাহিরের গাড়ি~
সোরায়া মাহিরের পাশে বসে আছে তবে মাথায় মাহিরের এমন উদ্ভট আচরণ নিয়ে হাজার টা প্রশ্ন। মনের অস্বস্তি চেহারায় প্রকাশ পাচ্ছে। এতো বাতাসের মাঝেও শরীর ঘামছে। মাহির হঠাৎ খেয়াল করলো সোরায়ার গলা ভিজে যাচ্ছে ঘামে। তবে কারণ টা যে সে নিজে তা না বুঝেই গাড়ির এসি চালিয়ে দিয়ে পানির বোতলটা খুলে সোরায়ার দিকে এগিয়ে দিলো। সোরায়া মাহিরের তার দিকে এগিয়ে আসা হাতটা দেখে মাহিরের দিকে অবাক হয়ে তাকালেন মাহির শান্ত গলায় বলল-
“পানি টা খেয়ে নাও। ভালো লাগবে।”
সোরায়ার গলা শুকিয়ে এসেছিল তাই কিছু না বলে মাহিরের হাত থেকে পানির বোতলটা নিয়ে পানি খেলো। মাহির সোরায়াকে রায়ান মিরায়ার অতীত সম্পর্কে সম্পূর্ণ টা রাস্তায় বলেছে। কিন্তু এতো দিন সোরায়ার কলেজে না আসা নিয়ে তার মনে যে ঝড় উঠেছিল সেটা এখনো পরিষ্কার হয়নি। মাহির পরিবেশ টা স্বাভাবিক করতে সোরায়াকে কলেজে না আসা নিয়ে প্রশ্ন করলো-

“কলেজে কেন আসো নি নবীন বরণের পর?”
সোরায়া হঠাৎ প্রশ্নে একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“জ্বি?”
মাহির আবারো নিজের প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি করলো –
“কলেজে না আসার কারণ জিজ্ঞাসা করেছি!”
সোরায়া এবার প্রশ্ন টা বুঝে উত্তর করলো-
“ওহ্! আসলে নবীনবরণের পর আমার নাচের ভিডিও ভাইরাল হয়ে যাওয়ার কারণে চাচা খুব রেগে গেছিল আর আমাকে চট্টগ্রামে ফিরতে বলেছিল। তাই বাধ্য হয়ে পরেরদিন সকালেই ঢাকা ছাড়তে হয়েছে। আর তার পর আপু এলো। সবকিছু উল্টোপাল্টা হয়ে গেলো।”
মাহির গম্ভীরভাবে বলল-
“একটাবার বললে কি হতো আমাকে? জানো কত টেনশন হচ্ছিল? তোমার প্রাণের বান্ধবীর কাছেও তোমার খবর পাইনি একটা।”
সোরায়া বড় বড় চোখ করে মাহিরের দিকে তাকালো। তার অনুপস্থিতিতে মাহির তার কথা মনে করেছে এটা অবিশ্বাস্য লাগছিল সোরায়ার।
মাহির না থেমে দ্বিতীয় বার বলল-

“একবার করেছ মেনে নিচ্ছি, দ্বিতীয় বার এমন হলে আমি ভুলে যাবো তুমি আমার স্টুডেন্ট।”
মাহিরের এই কথাটা সোরায়ার মাথার উপর দিয়ে গেলো-
“জ্বি?”
সোরায়া আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করলো। স্যার হয়ে স্টুডেন্ট কে স্টুডেন্ট মনে না করে তা ভুলে যাবে কেন! আর এতে টিচার স্টুডেন্ট এর সম্পর্ক কোথা থেকে এলো সেটা ঠিক বুঝলো না সোরায়া।
মাহির সোরায়ার প্রশ্ন সূচক চাহুনি দেখে দেখে মনে মনে বিড়বিড় করলো-
“ছাতার মাথা, এই চাকরি করবোই না আমি। টিচার হিসেবে না থাকলে তো তুমি আমার স্টুডেন্ট থাকবে না। তখন যা খুশি করা যাবে। এই প্রফেশন টা এখন আমার পথের কাঁটা।”
সোরায়া হা হয়ে আছে মাহিরের দিকে। আজ থেকে কয়েক মাস আগে অব্দি তার সামনের মানুষটা এমন ছিলো না অথচ এখন কি অদ্ভুত পরিবর্তন। সোরায়ার আর কিছু বলতে ইচ্ছা করলো না। সে মাহিরের আচরণে পরিবর্তন দেখে আশ্চর্য তবে তার খারাপ লাগছে এমন না। ভালোলাগার মানুষ যদি ভালোলাগা প্রকাশ করে তাহলে খারাপ লাগার কথাই বা উঠছে কোথায়!

বাগান বাড়ি~
রাত ৮টার দিকে রায়ানের গাড়ি বাগান বাড়ির সামনে থামলো। পিছন পিছন মাহিরের গাড়িও এসে পৌঁছালো। রায়ান গাড়ি থামিয়ে গাড়ি থেকে মাহিরের গাড়ির জানালার দিক থেকে মাহিরকে কিছু বলতে যায়। কিন্তু গাড়ির ভেতরে তাকাতেই তার চোখ বড় বড় হয়ে গেলো, রায়ান সাথে সাথে মাহির কে জিজ্ঞেস করলো জোর গলায়-
“হচ্ছে টা কি গাড়ির ভিতরে হ্যাঁ? বনু তোর সাথে এমন জড়িয়ে আছে কেন?”
মাহির হতাশায় অতি কষ্টে ভরা গলায় রায়ান কে বলল-
“দোস্ত আমি মনে হয় পাগল হয়ে যাব রে। সোরা রাস্তায় ঘুমিয়ে হঠাৎ এভাবে আমার হাত জড়িয়ে কাঁধে মাথা রেখে শুয়েছে। না ওকে সড়াতে পারছি। আর না নিজেকে সামলাতে পারছি।”
রায়ানের মাথায় হাত মাহিরের কথা শুনে। মাহির কে কিছু বলবে এই অবস্থা ও তো নেই, সে নিজেই ঠিক থাকতে পারে না মিরায়া কাছে থাকলে। রায়ান মাহিরের ব্যাথিত গলার অনুভূতি বুঝলো কিন্তু কিছু করার নেই। রায়ান যা বলতে চেয়েছিল তাই বলল মাহিরকে-

“যা খুশি কর ওর গায়ে হাত দেওয়া ছাড়া। আমি মিরাকে নিয়ে ভেতরে যাচ্ছি। বনুকে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে আয় ভেতরে। আর হ্যাঁ খবরদার ঘুমিয়ে আছে বলে কোলে নিবি না। ডাক দিয়ে উঠিয়ে নিয়ে আয়।”
মাহির রায়ানের কথায় আহাম্মক হয়ে রইল আর এইদিকে রায়ান নিজের গাড়ি থেকে মিরায়াকে কোলে তুলে বাড়ির ভেতরে চলে গেলো। মাহির রায়ানকে মিরায়াকে কোলে করে ভেতরে নিয়ে যাওয়া দেখে দাঁত কিরমির করে বলল-
“ভালোই, তোয়াড্ডা কুত্তা- টমি, সাড্ডা কুত্তা- কুত্তা। হাহ! শালা তুই কোলে নিলি কেন তাহলে হ্যাঁ। আমাকে না করিস। একশো বার কোলে নেব।”
সোরায়ার হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল এই সময়। হালকা তাকিয়ে মাহিরের কাছে নিজেকে আবিষ্কার করে হকচকিয়ে দূরে চলে গেলো। মাহির ও অবাক, মনের মধ্যে আরেক হতাশা দেখা দিলো-“তোমারও এখনো ঘুম থেকে উঠতে হলো! ধুরু।”

সোরায়া বেশ লজ্জায় পড়ে গেছে। মাহির কিছু বলার আগেই নিজে নিজে গাড়ি থেকে নেমে এক দৌড়ে বাড়ির ভেতরে চলে গেল ন্যানো সেকেন্ডে। মাহির বোকার মতো চেয়ে থেকে বিড়বিড় করলো-
“এতো টা রাস্তা নিজের স্পর্শে আমাকে পাগল করে এখন পালিয়ে গেল?! মেয়ে মানুষ কি সাংঘাতিক স্বার্থপর! তবে যদি স্বার্থপরই হবে একটু বেশিই হতে সমস্যা কোথায় ছিলো? আরো একটু পাগল করতে আমাকে।”
বেচারার সঙ্গে যেন এক প্রকার ষড়যন্ত্র চলছে। ঠিক যে বিষয়ে রায়ানকে সে খেপাতো, যা নিয়ে মজা করতো হাসাহাসি করতো সেই সবকিছু তাঁর সাথে ঘটছে মনে হলো তার। দুই ঠোঁটের ফাঁক হতে প্রকৃতি গত ভাবেই বেরিয়ে এলো এক মহা ইংলিশ প্রবাদ-“karma is a b****.”

রুদ্র রায়ানের কথায় ডাক্তার ডেকে ছিল রাতে। মিরায়া বিছানায় শুয়ে আছে ডাক্তার নিজের মতো এক্সামিইন করছেন বেশ খানিকটা সময় ধরে। সোরায়া রিমির হাত ধরে পাশেই দাঁড়িয়ে আছে, চোখে মুখে হালকা ক্লান্তি আর ভয়। রিমি অনেক দিন পর মিরায়াকে দেখে অবাক, এতো অবনতি হয়েছে মিরায়ার শরীরের তা চোখে পড়ছিল খুব করে। রুদ্র নিজেকে দোষারোপ করতে ব্যস্ত, তার মনে হচ্ছিল সে যদি একটু সচেতন হতো তাহলে এসব হতোই না। মাহির চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে রায়ানের কাঁধে হাত রেখে। আর রায়ান একবার ডাক্তার আর একবার মিরায়াকে দেখে যাচ্ছে। তার শরীরে স্থিরতার লেশ নেই, অশান্ত মন মিরায়ার অবস্থা জানতে উৎসুক।
ডাক্তার সাহেবা হঠাৎ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন-

“প্যাসেন্ট খাবার খায়নি কত দিন?”
রায়ান ডাক্তারের প্রশ্ন শুনে অবাক-
“সরি? খাবার খায় নি কত দিন এটা কেমন প্রশ্ন হলো ডক্টর ?”
ডাক্তার সাহেবা বিরক্তি নিয়ে বললেন-
“মেয়েটির বয়স ১৮, উচ্চতা ৫.২ অথচ তার শরীরের শক্তি চাহিদার পরিমাণ অনুযায়ী তিনি খাবার খান নি। আপনারা কোথায় ছিলেন?”
রায়ানের শরীর জ্বলে উঠলো কথা গুলো শুনে। সোরায়ার দিকে একবার তাকিয়ে বলল-
“বনু ডক্টর কিছু জিজ্ঞেস করছে। উত্তর দে।”
সোরায়া একটু সংকচ করে সত্যি বলল-

“ঠিক খায় নি এমন না ডক্টর। মাঝে মাঝে খেতো। তবে বেশিরভাগ সময় খেত না।”
ডক্টর-“মাঝে মাঝে কখন খেতো? আর যখন খেত না উনাকে খাওয়ানো হয়নি কেন?”
রায়ান তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সোরায়ার দিকে তাকাতেই সোরায়া একটু চুপসে গেলো। কিভাবে বলবে সব বুঝতে পারছে না। মাহির রায়ানের কাছে এসে বলল-
“সোরায়া ভয় পাচ্ছে সত্যি টা জানা জরুরী ওকে শান্ত ভাবে কথা বলতে দে।”
রায়ান রাগে গিলে নিলো নিজের। সোরায়াকে স্বাভাবিক ভাবেই বলল-“যেটা সত্যি সেটাই বল। যা হওয়ার হয়েছে। মিরার ঠিক হওয়াটা জরুরি এখন।”
সোরায়া মিরায়ার কথা ভেবেই সবটা খুলে বলল-

“আসলে, আপু ডিপ্রেশড ছিলো। যার জন্য খাবার খেতে চাইতো না। জোর করলে ভাঙচুর করতো, রাগারাগী করতো। কিন্তু মাঝে মাঝে যখন খুব খিদে পেতো তখন…! ”
কথাটা অর্ধেক বলে সোরায়া রায়ানের দিকে তাকায়। বাকিটা তার বলতে অস্বস্তি হচ্ছিল।
ডক্টর সোরায়াকে একটু চাপ দিয়ে বললেন –
“Oh! Please for her sake..Tell me the truth.”
সোরায়া আমতা আমতা করে বলল-

“আপু মাঝে মাঝে আপু ভাইয়া কে নিয়ে হেলোসিনেট করতো। ওই সময়ই একটু খেতো ভাইয়াকে নিজের কাছে কল্পনা করে কিন্তু যখনই কল্পনা শেষ হতো আবার রাগারাগী করতো , বিরক্ত হতো। আর খাবারও ফেলে দিতো। জোর করেও খাবার খাওয়ানো যেতো না।”
সোরায়ার মুখে কথা গুলো শুনে রায়ানের খুব রাগ হলো নিজের উপর। ওইদিন তার এ্যাকসিডেন্ট টা না হলে, আজ সব ঠিক থাকতো। কিন্তু কিছু বলতেও পারছে না, করতেও পাড়ছে না সবার সামনে, ঘরের সবাই অবাক। এমনও হতে পারে কেউ আশা করে নি। ডাক্তার সাহেবা সোরায়া ও বাকি সবার উদ্দেশ্যে বললেন –
“আপনারা কি ভেবে মেয়েটাকে এই অবস্থায় বাড়িতে রেখেছিলেন। ডাক্তারের কাছে কেন নিয়ে যান নি?”
সোরায়া মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু রায়ানের জন্য আগে কি হয়েছে তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ঠেকলো সামনে কি হবে। তাই সে ডাক্তার সাহেবাকে সোজা প্রশ্ন করলো-
“কি হয়েছে, কি হয়নি তা দিয়ে কিছু যায় আসে না এখন। আপনি বলুন আমার বউয়ের হয়েছে কি? ঠিক কিভাবে হবে ও?”

ডাক্তার সাহেবা একটু বিরক্ত হলেন রায়ানের আচরণে-
“দেখুন মিস্টার চৌধুরী। বললেই সব ঠিক হয়ে যায় না। উনার মানসিক অবস্থা স্বাভাবিক নয় তবে অস্বাভাবিক ও নয়। উনি সম্পূর্ণ ঠিক আছেন। তবে মানসিক ট্রমা, না খাওয়া, না ঘুমানো উনার জন্য খুব বাজে এফেক্ট ফেলেছে। যার জন্য উনি হেলোসিনেশনের সাহায্য নিয়ে খাবার খেতেন। এতো ক্রিটিক্যাল চিন্তা মাথায় একদম না পারতে আসে।”
ডাক্তার সাহেবার কথায় সোরায়া বলল-
“কিন্তু ডক্টর আপু তো সারাদিন ঘুমাতো। শুধু কয়েকটা সময় উঠতো পরে আবার ঘুমাতো।”
ডাক্তার সাহেবা সোরায়ার কথায় তাচ্ছিল্যের স্বরে বললেন-
“মানুষের পক্ষে টানা এতোটা সময় ঘুমানো সম্ভব নয়। চোখ বন্ধ করে থাকা আর ঘুম এক নয়। না ঘুমিয়ে রাত জাগা এমন শুধু শুধু চোখ বন্ধ করে থাকার চেয়ে শ্রেয় বলে মনে করা হয়। ভাবতে পারেন মেয়েটার শরীরের কি পরিমান ক্ষতি হয়েছে?”

সোরায়া আবার চুপ করে যেতেই ডাক্তার সাহেবা রায়ান কে উদ্দেশ্য করে বললেন-
“মিস্টার চৌধুরী, আপনার ওয়াইফ সুস্থ তবে ঠিক কতোটা তা আন্দাজ করা মুশকিল। শেষ মুহূর্তে যখন উনার জ্ঞান ছিলো। তিনি কি বলেছিলেন আপনাকে দেখে? উনি কি স্বাভাবিক ভাবে রিয়েক্ট করেছিলেন?”
রায়ান চিন্তায় পড়ে গেল, হঠাৎ সব মনে করতে করতেই তার খেয়াল হলো শেষ বার মিরায়া রায়ানকে স্বাভাবিকভাবেই থামতে বলেছিল তার নিশ্বাস নিতে কষ্ট হওয়ায়। তাই রায়ান ডক্টর কে সেটাই বলল-
“হ্যাঁ ওর রিয়েকশন স্বাভাবিক ছিল আমি সত্যি ওর কাছে আছি বোঝার পর। ওর যেমনটা অনুভব হয়েছে তাই বলেছে- যে ওর নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।”

ডাক্তার সাহেবা আর কিছু জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন বোধ করলেন না। তিনি কয়েকটা ঔষধ লিখে দিলেন-
“স্যালাইন চলতে থাকবে যতক্ষণ জ্ঞান না ফিরছে উনার। এই ঔষধ গুলো ঠিক মতো দেবেন। আর হ্যাঁ, স্বাভাবিক আচরণ করবেন। অতিরিক্ত কিছু উনার জন্য খারাপ হতে পারে। আপনার কথা অনুযায়ী যদি সত্যি উনি স্বাভাবিক রিয়েক্ট করে থাকেন জ্ঞান ফেরার পর উনি তেমনি থাকবেন। উনাকে সময় দিন সবটা মাথায় কেচ করার। রাতের মধ্যে বা কাল সকালে জ্ঞান ফিরে আসবে হয়তো। প্রয়োজনে আমাকে কল করবেন অবশ্যই।”
রায়ান আর কিছু বলল না। ডাক্তার সাহেবা উঠে গেলে সে মিরায়ার কাছে গিয়ে বসল। ডাক্তার সাহেবা একটু আড় চোখে রায়ানের দিকে তাকালেন, তার অনুভব হলো যে তার প্রয়োজন মিটে গেছে। রুদ্র ডাক্তার সাহেবাকে বলল-
“ডক্টর, আসুন আপনাকে এগিয়ে দেই।”

রুদ্র ডাক্তার সাহেবাকে নিয়ে চলে গেলে রায়ান ঘরের বাকিদের উদ্দেশ্যে বলল-
“এই ঘরে আর কারো প্রয়োজন নেই। আমি সামলে নেব।”
রায়ানের কথা শুনে আর কেউ ওই ঘরে অবস্থান করার সাহস দেখালো না। রিমি সোরায়ার হাত ধরে ঘর থেকে বেড়িয়ে গেলো। মাহির রায়ানের কাছে এসে কাঁধে হাত রেখে বলল-
“চিন্তা করিস না । সব ঠিক হয়ে যাবে আল্লাহর উপরে ভরসা রাখ। আর শান্ত হ একটু।”
কথাটা বলে মাহির ও ঘর থেকে চলে গেলে। রায়ান উঠে গিয়ে দরজাটা লাগিয়ে দিয়ে সাথে সাথে সজোরে দরজার পাশের কাঁচের ফুলদানি টা ঘুষি মেরে ভেঙে ফেলল। হঠাৎ শব্দ দরজার অপর দিকের সোরায়া রিমি চমকে ঘুরে তাকালে মাহির ওদের বলল-

“তাকিয়ে লাভ নেই। এটা হওয়ারই ছিল। বাদ দেও, ঠিক হয়ে যাবে। ওটা ওর রাগের বহিঃপ্রকাশ মাত্র।”
মাহির রায়ান কে চেনে ভালো করেই। রাগ আর জেদ বরাবরই বেশি রায়ানের মিরায়ার ক্ষেত্রে তা খাটে না সেটা অন্য কথা তবে এর অস্তিত্ব আছে ষোলোআনা। মিরায়ার এমন অবস্থার জন্য রায়ান নিজেকে দায়ী করছে যার পরিণতি প্রকাশ পেল ফুলদানিতে। রিমি আর সোরায়া একে অপরের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো।
রুদ্র ডাক্তার সাহেবাকে এগিয়ে দিয়ে ফিরে এলে সবাই অল্প অল্প করে কিছু একটা খেয়ে নিল। তবে রায়ান আর মিরায়ার কাছ ছাড়া হয়নি। ঘর থেকে বেরোয়নি, কিছু খায়নি। ডেকেও লাভ হবে না সবাই জানে তাই কেউ ডাকলোও না। রাত গভীর হতেই সবাই যার যার ঘরে চলে গেলো ঘুমাতে। সবার শরীর ক্লান্ত এতো লম্বা একটা দিন পার করে। ক্লান্তির কাছে সবাই হাড় মানলেও শুধু একটা মানুষ নিদ্রাহীন রাত কাটাচ্ছে।

রায়ান মিরায়ার সাথে এই প্রথমবারের মতো এক বিছানায় শুয়েছে। সংসার জীবনে হয়তো সর্ব প্রথম পরিবর্তন টা এটাই- দুটো আলাদা মানুষের এক বিচানায় শোয়া। ছেলেটার মনের আকাঙ্ক্ষা গুলো অদ্ভুত ভাবে ধরা দিচ্ছে তার কাছে। এক বিছানায় শুয়ে আছে তবু কি দূরত্ব, পাশে যেন কেউ থেকেও নেই। সব নতুন নতুন ঠেকলো রায়ানের কাছে। সে চেষ্টা করেও যখন ঘুমাতে পাড়লো না ধীরে উঠে বসে মিরায়ার হাত নিজের দুই হাতের মাঝে নিয়ে মিরায়ার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখতে লাগলো। রায়ান মিরায়াকে খুব যত্ন করে ডাকলো-

“হৃদপাখি…!” মিরায়ার সাড়া নেই।
আবার ডাকলো-“heartbird….!” কোনো সাড়া এলো না।
রায়ান আবারো ডাকলো কয়েক বার বিভিন্ন আদুরে নামে-
“পাখি..! আমার জান…! ওই সোনা…..বউ!”
-“একটাবার সাড়া দেও। বুকের ভেতরটা জ্বলে যাচ্ছে তোমাকে এমন চুপ দেখে। আমার জন্য তোমার মনে যা আছে সব অভিযোগ আমি শুনবো চুপচাপ। কিচ্ছু বলবো না আমি প্রমিস। কেন আমার সাথে এমন করেছিস জান আমার। তোকে ছাড়া কিছু ভালো লাগে না আমার এর ফায়দা তো উঠাচ্ছিস তাই না?”
রায়ান মিরায়ার মুখের দিকে ঝুঁকে তার কপালে ঠোঁট ছুয়িয়ে কপালে কপাল ঠেকিয়ে বলল-
“খোদার কসম আর কখনো দূরে যাবো না। আমার সাথে রাগ করে থেকো না পাখি প্লিজ। কথা বলো একবার। একটা বার আমার নাম উচ্চারণ করো।”

অকপটে নিজের মনের মধ্যে থাকা কথা গুলো বলল মিরায়াকে কিন্তু আদতেও কি কিছু শুনেছে মেয়েটা কে জানে। রায়ান আরও অনেক টা সময় শুধু মিরায়ার মুখের দিকে তাকিয়ে আর একা একা বকবক করে কাটালো। তবে অবশেষে মাঝরাতের পর ভোর রাতে সেও ক্লান্তির কাছে হার মানতে বাধ্য হলো। রাতটা সবারই ঘুমের মধ্যেই পার হলো।

পরের দিন সকাল~
শীতের কালের আগমনের দরুন হালকা কুয়াশা কুয়াশা ভাব দেখা যাচ্ছে চারপাশে। যেহেতু পাহাড়ি এলাকা তাই ঠান্ডা আবহাওয়া অনুভব হচ্ছে। মিষ্টি সূর্যের আলো খোলা বারান্দা থেকে একটু একটু উকি দিচ্ছে ঘরের ভেতর। সূর্যের আলো চোখে লাগার পর মিটিমিটি চোখ খুলল মিরায়া। জ্ঞান ফিরেছে ভোরেই তবে শেষ মুহূর্তে রায়ানের অস্তিত্ব ঠাওর করতে পেরে একটু শান্তিতেই ঘুমিয়েছিল নিজের অজান্তে। চোখ গুলার পর মিরায়ার মাথা ঘুরিয়ে চারপাশটা দেখার চেষ্টা চালালো তবে চেনা পরিচিত জায়গা না এটা বুঝতে খুব একটা সময় লাগলো না। বিছানা থেকে উঠার চেষ্টা করল তবে বিছানা থেকে উঠার শক্তি হলো, মিরায়ার হঠাৎ নিজের পেটের উপর ভারী কিছু অনুভব করে ভ্রু কুঁচকে তাকালো পেটের দিকে। বলাবাহুল্য বিছানা থেকে উঠতে পারেনি মেয়েটা কি করেই বা উঠবে! কাল রাতে রায়ান মিরায়ার সাথে কথা বলতে মিরায়ার পেটের উপর মাথা রেখেই কখন ঘুমিয়ে গেছে সে নিজেও জানে না।

কিন্তু ঘুমের গভীরতা দেখা বলা যায় ভীষণ তৃপ্তির ঘুম ঘুমাচ্ছে ছেলেটা। মিরায়া রায়ানের বাচ্চা বাচ্চা চেহারাটার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলো- রায়ান এমন ভাবে তাকে জড়িয়ে আছে এটা তার নিত্যদিনের স্বপ্ন আজও তার কাছে সবটা স্বপ্নের মতো লাগছে। মিরায়ার একবার বড় পলক ফেলল যেন তার স্বপ্ন ভেঙে যায় তবে চোখ খোলার পর ও রায়ানকে একই অবস্থায় দেখতে পেল বলে মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেলো হঠাৎ। মিরায়া খেয়াল করলো তার এক হাতে ক্যানুলা লাগানো এবং অন্য হাত রায়ানের হাতের আঙ্গুলের ভাজগুলোতে আটকানো। মিরায়ার মন অশান্ত হয়ে উঠতেই রায়ানের হাতের মাঝে থাকা হাতটা ছাড়ানোর চেষ্টা করলো হালকা ভাবে কিন্তু রায়ানের বাঁধন অনেক শক্ত থাকায় পারলো না।

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৫০

রায়ানের হাতের স্পর্শ অনুভূত হতেই মিরায়া একটা ঢোক গিলে তার ক্যানোলা যুক্ত হাতটা ধীরে ধীরে রায়ানের মাথায় রাখলো। এবার সত্যি যখন রায়ান চুল গুলো নিজের হাতের আঙ্গুল দিয়ে অনুভব করতে পারছিল তখন হঠাৎ মিরায়ার চোখ ভরাট হলো নোনা জলে। মিরায়া অবিশ্বাসে রায়ানের চুলে হাত বুলানো কয়েকবার। সকাল সকাল মাথায় নরম ছোঁয়া পেয়ে রায়ান আবেশে মিরায়ার পেটে মুখ গুঁজে দিতেই মিরায়ার শরীর অদ্ভুত শিহরণে কেঁপে উঠলো। মিরায়ার শরীরের কাঁপুনিতে রায়ানের ঘুমের একটু বেঘাত ঘটতেই রায়ান বারবার মিরায়ার পেটে মাথা এপাশ ওপাশ করছে। মিরায়া শরীর যেন আরো উতলা হলো। মিরায়া বুঝতে পারছিল না রায়ানের নড়াচড়া কিভাবে কমাবে। অস্বস্তিতে শরীর ছেড়ে দিচ্ছে বারবার। না পারতে অবশেষে রায়ানকে উদ্দেশ্যে করে বলে উঠলো-
“আ..আমার অসহ্য লাগছে। নড়ছেন কেন? থামুন।”

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৫১