আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ৫৬
নাবিলা ইষ্ক
আজিজুল তালুকদার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। চিন্তা যে তারও কম না। তারপরও স্ত্রীর চিন্তিত মুখে চেয়ে বললেন –
‘মেয়ে তোমার রাজরানির মতো আছে। দেখলা তো? শান্ত হও এবার। এবার অন্তত বিশ্রাম নাও।’
নিপা বেগম স্বস্তি পেয়েছেন একটু। রোযার জ্বলজ্বল চোখমুখ, গায়ের পোশাক, আচার-আচরণ বোঝাচ্ছে সে ভালো আছে। তারপরও মায়ের মন তো! মেয়েটা তাদের নাগালের একেবারে বাইরে আছে। আবার আছেও কোনো সাধারণ জায়গায় না। কোনো সাধারণ কারও কাছে না। ভাবলেও কেমন অস্বস্তি হয় নিপা বেগমের। ভয় হয়! কিছু হলেও বুঝি খবর পাবেন না। বললেন ধরে আসা গলায় –
‘একটাবার নিজ চোখে দেখে এলে শান্তি পেতাম।’
এক গ্লাস পানি নিয়ে রুমে প্রবেশ করল রাজু। নিপা বেগমের কথায় ছেলেটা চঞ্চল কদমে ছুটে এলো কাছে। গ্লাস হাতে ধরিয়ে বড়ো আকাঙ্খা নিয়ে বলল –
‘আপু বলে গেল কি শোনোনি? আমরা ও বাড়িতে যাব বেড়াতে। আপু দুলাভাইয়ের পারমিশন নিয়েই আমাদের নেবে।’
দুলাভাই শব্দটা শুনে আজিজুল সাহেব গলাটা পরিষ্কার করে নিলেন। তার চোখে এখনো ভাসছে তার জামাইবাবাজির সেই দানবীয় আগমন। তাদের বাড়ি ঘেরাও করে, তাদের মাথাতেই বন্দুক ধরে, তারই মেয়েকে জোরপূর্বক বিয়ে করে চলে গিয়েছিল! আজিজুল সাহেব আড়চোখে ছেলের মুখে চেয়ে দেখলেন রাজুও থতমত খেয়েছে। দুলাভাই শব্দটা স্বাভাবিক এক সম্বোধন।
অথচ আদিল মির্জাকে এমন সম্বোধনে ডাকার কথা ভাবতেও গা শিরশির করে উঠল রাজুর। পরমুহূর্তেই উত্তেজনায় গা কাটা দিয়ে উঠল। সবে ষোলোতে পড়েছে সে। নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি প্রবল আকর্ষণ। তেমনি এই আদিল মির্জা নামক তাণ্ডবের প্রতি তার আগ্রহের, আকর্ষণের শেষ নেই। বরাবরই অ্যাকশন তার অতি পছন্দের। সেবার যখন বডিগার্ড সহ আদিল মির্জা এলো, রাজুর মনে হয়েছিল সে ফিল্ম দেখছে, অ্যাকশন ফিল্ম। তার ওমন হতে ইচ্ছে করে। ভীষণ! পরমুহূর্তেই ভয়ে আঁটসাঁট হলো এতটুকু হৃদয়টা। বলল –
‘সম্পর্কে তো দুলাভাই হয়। সামনাসামনি দুলাভাই ডাকলে কি পিস্ত লের গু লি আমার মাথায় ঢোকাবে? নাকি পাছায়? কী মনে হয় তোমার বাবা?’
আজিজুল সাহেব চোখ ছোটো করে ফেললেন। এখনো কল্পনা করতে পারেন না ওমন এক লোক তার মেয়েজামাই। তার গরীবি ঘরে এসে সবার দমবন্ধ করে যে গিয়েছিল তা তো তিনি ভোলেননি। অন্যদিকে নিপা বেগম এইদিকে ভীষণ স্বাভাবিক। চোখ রাঙিয়ে বললেন –
‘কথার ধরন দেখো পোলার! চটকানা দিব। এসব কেমন কথা? দুলাভাই নাহয় ভাইয়া ডাকবি। এতে এতো ভাবার কী আছে!’
‘দুলাভাই ডাকমু। এতে আমি নিষেধাজ্ঞা শুনব না।’
পরপরই হাহাকার করে উঠল, ‘হৃদিকে দেখি না কতকাল! আমার মামণিটাকে পেলে গালে দুটো চুমু খাব। কুটুবুড়িটার ইংরেজি একদিন না শুনলে মনে হয় জনমভর শুনি না।’
নিপা বেগমের চোখমুখ নরম হয়ে এলো। সারাজীবন শুনে এলেন, বুঝে এলেন র ক্তের সম্পর্কে চেয়ে বড়ো কোনো সম্পর্ক নেই। তবে ওই বাচ্চাটার সাথে তাদের কীসের এতো মায়া জন্মাল? যখন তোতাপাখির মতো নানু নানু ডাকে, নিপা বেগমের হৃদয় আনন্দে দিশেহারা হয়ে ওঠে। সেই কী সুখময় অনুভূতি! সব সম্পর্কে আসলে র ক্তের মিলনের প্রয়োজন হয় না। কিছু সম্পর্কে গড়ে ওঠে আত্মার মাধ্যমে। অস্তিত্বে মিশে যায়। আজিজুল সাহেব নিজেও সামান্য হাসলেন কল্পনা করে মিঠা কণ্ঠের ডাকখান, নানুভাই! বললেন –
‘গত পরশু স্বর্ণালী জুয়েলার্সে কথা বলে এসেছিলাম একটা সোনার চেইনের জন্য। ভাবছিলাম একটা চেইন নানুভাইয়ের জন্য নিব। কিছুইতো দেয়া হলো না।’
নিপা বেগম মুহূর্তে হাহুতাশ করে কপাল চাপড়ালেন, ‘খেয়াল ছিলো না চিন্তায় চিন্তায়। দুটো আংটি আছে। আঙুলে হয় না। ওগুলো ভেঙে বানাব। কাল নিও। সকাল সকাল যাব তবে।’
আজিজুল সাহেব সহমত পোষণ করেন। রাজু একদণ্ড স্থির থাকে না। ছুটে বেরিয়ে গিয়েছে। আজিজুল সাহেব ছেলের যাওয়ার পথে চেয়ে থাকলেন। নিপা বেগম হঠাৎ বললেন, ‘মেয়েটাকে একটু ভিন্ন লেগেছে।’
সামন্য ইতস্তত করে বাকিটুকু বলেন, ‘মনে হচ্ছে, মেনে নিচ্ছে।’
আজিজুল সাহেব বুঝলেন। তিনিও লক্ষ্য করেছেন। তার আদরের মেয়ে যে। পরিবর্তন লক্ষ্য করাটাই স্বাভাবিক। আস্তে করে বলেন শুধু –
‘সুখ চাই মেয়ের। আর কিছু না।’
সকালের মিষ্টি রোদের ঝলমলে আলোর একটুকরোও প্রবেশ করতে পারেনি রুমের ভেতর। থমথমে নীরবতা আর অন্ধকারে ডুবে থাকতো যদি না বেডসাইড টেবিল ল্যাম্প থেকে মৃদু আলো ছাড়াতো। হলদে আলোয় দেখা গেল গোলগাল বেডে ঘুমন্ত শরীরটা নড়ছে সামান্য। রোযা পিটপিটিয়ে চোখ মেলে তাকাল। মুখের খুব সামনে একটা ছোটোখাটো মুখ দুগাল ভরে হাসছে।
‘গুড মর্নিং, মাম্মা!’
রোযার ঘুমটা পুরোপুরি ভাঙল। হেসে ফেলল নিঃশব্দে। হৃদিকে টেনে বুকে নিয়ে বিড়বিড় করল, ‘মর্নিং মাই চাইল্ড।’
হৃদি মায়ের বুকে আষ্ঠেপৃষ্ঠে মিশে গিয়েছে বিড়ালছানার মতন। নাক ভরে মায়ের শরীরের ঘ্রাণ টেনে নিয়ে চোখ বন্ধ করে বলে যায়, ‘আমিও ওপরে ঘুমাব। তোমাদের সাথে। আমি একা ঘুমাব না, মম। আমি এখানেই ঘুমাব। ড্যাডের রুমে।’
রোযা থমকাল। মনে পড়ল গতকাল রাতের ঘটনা গুলো। তারা যখন বাড়ি ফিরেছে ততক্ষণে হৃদি ঘুমিয়ে পড়েছিল। রোযাকে একরকম ঘাড়ে তুলেই আদিল ওপরে, তাদের বেডরুমের বেডে এনে ফেলেছিল। অগত্যা রোযা এখানেই ঘুমিয়েছে গতরাতে। আদিল তাকে অবশ্য জ্বালায়নি। ওইতো শুধু দৈত্যের মতন শরীরটা তার শরীরের ওপরে নির্দ্বিধায় ছেড়ে দিয়েছিল। যেন তার শরীরের ভারে রোযা ভর্তা হয় না রীতিমতো।
ওসব ভেবে রোযা অন্যমনস্ক হলো ফের। আশেপাশে চেয়ে বুঝল আদিলের অস্তিত্ব নেই। কখন উঠেছে রোযা জানে না। সবে আটটা উনিশ। এতো সকালে উঠে পড়ে লোকটা! রাজ্যের কাজ বোধহয় তার একারই! চোখ বুজল ফের। এই বেডরুমই তার ঠিকানা তা মেনে নিয়ে হৃদির এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে দিতে দিতে বলল –
‘আচ্ছা, ঘুমোবে.. এখানে মায়ের সাথেই ঘুমাবে।’
হৃদি খুশিতে পাখির মতো কিচিরমিচির করে রাজ্যের আলাপ তুলে বসল। আলাপে আলাপে জানাল, ‘আমি নানু, নানুভাই, মামাকে মিস করছি। তারা এখানে কেনো আসে না, মম?’
‘তুমি চাও তারা আসুক?’
হৃদির চোখ দুটো চিকচিক করে উঠল। রোযার মুখে চেয়ে বলল, ‘হু, খুউব চাই। মামাকে চাই।’
রোযা মুখটা দুহাতে আদর করে দিয়ে বলে, ‘আচ্ছা, আসবে। তোমার ড্যাডকে জানাই আগে?’
‘ওকে, তুমি আজকে আমার সাথে গাছ লাগবে বলেছো। মনে আছে তো?’
রোযা ওমনি মেয়ের পেটে সুড়সুড়ি দিতে দিতে শব্দ করে হেসে বলল, ‘তোমার ইন্টারেস্ট তো গাছ লাগানোতে নেই মাম্মা। মাটি ছানার এতো তাড়া!’
হৃদি পাগলের মতো হাসছে। হাসতে হাসতে চোখে জল জমে গেছে। বারবার বলছে, ‘ইট টিকলজ, মম। ইট টিকলজ।’
থমথমে নীরবতা আর নেই রুমে। মিষ্টি হাসির আওয়াজে ভরে উঠেছে। তখুনি দরজায় করাঘাত পড়ল। নূরজাহানের গলা শোনা গেলো –
‘আসব ম্যাডাম!’
রোযা উঠে বসতে বসতে বলে, ‘আসুন….’
প্রবেশ করল নূরজাহান। হাসিমুখে ‘গুড মর্নিং’ বলতে বলতে রুমের ভারি পর্দাগুলো সরিয়ে দিলো। পর্দাগুলো সরাতেই সকালের ঝলমলে আলোতে ভরে উঠল রুমের ভেতরটা। রোযা বিশাল রুমের ভেতরটা দেখতে দেখতে শুধাল –
‘কখন বেরিয়েছেন তিনি?’
নূরজাহান বুঝল। ত্বরিত জানাল, ‘ভীষণ ভোরে। সূর্যও ভালোভাবে ওঠেনি তখন।’
রোযা দুহাতে এলোমেলো চুলগুলোয় খোঁপা করতে করতে বিছানা ছাড়ল। হৃদিকে কোলে নিয়ে ওয়াশরুম চলে গেল। মা-মেয়ে ফ্রেশ হয়ে এসে দেখল নূরজাহান রুমটা ভালোভাবে গুছিয়ে গিয়েছে। হৃদিকে নিয়ে রোযা নিচে নেমে এলো।
দরজার কাছে ক্লান্তকে দেখা যাচ্ছে। সটানভাবে দাঁড়িয়ে আছে। দৃষ্টি নোয়ানো। মরিয়ম বেগম ডাইনিং সাজাচ্ছেন। চেয়ার টেনে বসতে বসতে রোযার আচমকা প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করল, ব্রেকফাস্ট করতে আসবে কি-না লোকটা! মানুষটার খাওয়াদাওয়ার কোনো শৃঙ্খলা নেই। আসাযাওয়ার কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি নেই। হৃদি পাশেই বসে মুখ খুলে বসে আছে। মা তাকে মুখে তুলে খাইয়ে দেবে তাই।
রোযা সবেই প্লেট উল্টেছিল নিজের সামনে তখুনি ক্রমান্বয়ে গাড়ির আওয়াজ ভেসে এলো। রোযা তৎক্ষণাৎ দিশেহারা উঠে দাঁড়াল। নিজের কার্যকলাপে পরমুহূর্তেই তাজ্জবও হলো। ততক্ষণে আদিল লম্বা কদম ফেলে প্রবেশ করেছে। তার হাতে ফাইলস, পেছনেই শান্ত। পরনে স্যুট না, খুব সাধারণ পোশাক। ঢোলা ফর্মাল প্যান্টের সাথে ফুলহাতার টার্টলনেক গেঞ্জি।
এসব পোশাকে তাকে সচরাচর দেখা যায় না। রোযা হয় তাকে স্যুটে দেখেছে নয়তো নগ্ন দেহে। উহুঁম! গলাটা পরিষ্কার করে রোযা দৃষ্টি ফেরাল। বসবে নাকি দাঁড়িয়েই থাকবে তা নিয়ে দ্বিধা করতে করতে আদিল এসে দাঁড়িয়েছে ডাইনিংয়ের সামনে। ততক্ষণে হৃদিও চেয়ার থেকে নেমে ঝাপিয়ে উঠেছে বাবার কোলে। মিষ্টি করে জিজ্ঞেস করল –
‘কোথায় গিয়েছিলে এত্তো সকাল সকাল?’
আদিল হাতের ফাইলগুলো শান্তর হাতে দিয়ে মেয়েকে নিয়ে চেয়ারে বসতে বসতে বলল –
‘কাজে গিয়েছিলাম, সোনা।’
হৃদি বাবার ঊরুতে বসে দু-পা দুলিয়ে প্লেট নাড়িয়েচাড়িয়ে ডাকল –
‘মম, আমাদের খাবার দাও।’
রোযা তাকাল, সঙ্গে সঙ্গে চোখাচোখি হলো আদিল তাকিয়েই ছিলো বলে। রোযা দৃষ্টি ফেরাল। ব্যস্ত হলো খাবার বেড়ে দিতে। হৃদি বাবার হাতে খেতে খেতে বলল –
‘ড্যাড, নানু, নানুভাই, মামা কেনো আসে না আমাদের বাড়িতে?’
আদিলের হাত থামল। সে দৃষ্টি তুলে তাকাল রোযার দিকে। রোযা তখন কাচের জগ থেকে গ্লাসে পানি ভরতি করে সামনে রেখেছে মাত্র। না তাকিয়েই বলল –
‘মা এসে দেখতে চাচ্ছে আমি কেমন আছি। তার মনের শান্তির জন্য ভাবছিলাম একদিন তারা আসুক। আপনি কী বলেন?’
আদিলের জবাব এলো সময় নিয়ে, ‘তাদের মেয়ের বাড়িতে আসবে, এতে এতো পারমিশনের কী আছে?’
রোযার নোয়ানো চোখের পাপড়িগুলো কাঁপল। কিছু বলতে পারল না বিপরীতে। আদিলই বলে গেল –
‘শান্ত গিয়ে নিয়ে আসবে। কবে আনতে চাচ্ছেন?’
রোযা তাকাল। আদিল মেয়েকে খাওয়ানোর পাশাপাশি নিজেও খেতে ব্যস্ত। রোযা ভেবে বলল, ‘আগামীকাল, ফ্রাইডেতে? সাথে ঝুমুরকেও দাওয়াত করতে চাচ্ছিলাম। শান্তর স্ত্রী!’
আদিল তাকাল রোযার মুখের দিকে। নিপুণ দৃষ্টিতে। সুন্দর নাকে নাকফুলটা জ্বলজ্বল করছে। চুলগুলোতে খোঁপা করে রাখা। দুহাতে চুড়ি। ব্যস্ত হাতে এটা-ওটা এগিয়ে দেয়া রোযাকে এইমুহূর্তে ঠিক কেমন লাগছে তা কী রোযা নিজে জানে? বুঝতে পারছে?
নূরজাহান পাশেই দাঁড়ানো ছিল। আদিল তার উদ্দেশ্যে বলে গেলো পরপরই, ‘তারা প্রথম আসবে, আয়োজনের কোনো ত্রুটি চাই না। নূরজাহান!’
ডাকেই সাড়া দিলো দ্রুতো নূরজাহান, ‘আমি দায়িত্ব নিচ্ছি। চিন্তা করবেন না, স্যার।’
খাওয়া শেষ করে আদিল সঙ্গে সঙ্গে গেল না। দাঁড়িয়ে আছে ডাইনিংয়ের সামনে। নূরজাহান বুদ্ধিমতী নারী। সাথে সাথে হৃদিকে নিয়ে বেরিয়ে গেল। ভেতরে নেই শান্তও। ফাঁকা ডাইনিং এরিয়া। রোযা সতর্ক চোখ তুলে বুঝল আদিল এগিয়ে আসছে। সঙ্গে সঙ্গে দু কদম অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে পিছিয়ে থেমে গেল ডাইনিংয়ে পিঠ স্পর্শ করায়। আদিলের লম্বা শরীরের মাঝে ঢেকে গেল রোযার ছোটোখাটো গড়ন। আদিল গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে মাথাটা ঝুকাল, রোযার চোখমুখে দৃষ্টি বুলিয়ে আওড়াল –
‘শাড়ি পরলে কেমন হয়?’
রোযা মাথা তুলে তাকাল না। শুধু বুঝল হৃৎপিণ্ড লাফাচ্ছে। বাজেভাবে লাফাচ্ছে। কোনোরকমে উচ্চারণ করে, ‘শাড়ি?’
‘হুম…শাড়িতে আপনায় আমার আমার লাগে। আমার হৃৎপিণ্ড থমকে আসে।’
রোযা চোখল মুখে উষ্ণ শ্বাসপ্রশ্বাস অনুভব করে। আদিলের ঠোঁটের স্পর্শ পড়ল কপালে। রোযা আরও শক্ত করে চোখ বুজল –
‘শহরের বাইরে থাকব আজ। শান্তকে রেখে যাচ্ছি। খুশি হবো আমার পারমিশন ছাড়া বাইরে কদম না ফেললে।’
রোযা মাথা দোলাল। বড্ড বাধ্য। ফটাফট জিজ্ঞেস করে বসল, ‘কাল কখন ফিরবেন?’
আদিলের হাত থমকাল। দৃষ্টি পড়ল না অনেকক্ষণ। পরমুহূর্তেই তার রুক্ষ হাতটা পেঁচিয়ে ধরল রোযার গলা। ফর্সা, লম্বা, নরম গলা রোযার। ক্রমশ শক্ত হলো গলায় থাকা হাতটা। রোযা নড়ল না, শুধু গুঙিয়ে বোঝাল ব্যথা পাচ্ছে সে। তৎক্ষণাৎ হালকা হলো আদিলের মুঠো। কণ্ঠ অচেনা লাগল একমুহূর্তের জন্য –
‘তোমার এই পরিবর্তন নেশার মতো লাগছে। আমাকে ডুবিয়ে ফেলছে। শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে এইমুহূর্তে। এই তুমি আমার না হলে… আমি ম রে যাব।’
রোযা চমকে তাকাল। ধূসর চোখ দুটো লালচে দেখাল। সেখানে চেয়ে রোযা আর চোখ ফেরাতে পারল না। কয়েকমুহূর্ত শ্বাস নিলো না। শুধু বুঝল ভেতরে কিছু একটা ভেঙেচুরে গিয়েছে। মুক্তি পেয়েছে অনেক অনেক প্রজাপতি। রোযা ওই দৃঢ়, গভীর চোখে আর বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারল না। চোখ বুজতেই বুঝল চোখের কোণ ঘেঁষে একফোঁটা জল গড়াল গাল বেয়ে। কেনো পড়ল রোযা জানে না। শুধু বুঝতে পারছে তার কিছু একটা হয়েছে। অনুভূতি এতটাই গাঢ় হয়ে ছুঁয়েছে যে চোখ ভিজে উঠেছে। পরমুহূর্তেই একজোড়া ঠোঁট ভীষণ অধিকারের সাথে শুষে নিলো গালের জলটুকু।
শুক্রবার আজ।
চমৎকার রূপে সাজানো গোছানো হয়েছে মির্জা ভবন। প্রতিদিনের তুলনায় আজ একটু বেশি চাকচিক্যময় সব। নূরজাহান বাড়ির প্রত্যেককে কাজে লাগিয়েছে। সবকিছুতেই তার নজর আছে। রান্নাবান্নায় নতুনত্বতার সাথে সাধারণ খাবারের আয়োজনও সে করেছে। কয়েক দেশীয় খাবার রান্না করা হয়েছে। রোযার থেকে শুনে নিয়েছে তার বাড়ির লোকের পছন্দ-অপছন্দ গুলো।
চোখের সামনে হৃদি সেজেগুজে টৈটৈ করে ঘুরছে। তার পরনে খুব সুন্দর একটি প্রিন্সেস ফ্রোক। চকচকে, আরামদায়ক এক ফ্যাব্রিকের। এটা গতবছর যখন তাকে আদিল ডিজনিল্যান্ডে নিয়ে গিয়েছিল ওখান থেকে কিনে আনা হয়েছিল। হৃদি দুয়ারে এসে বারবার বাইরে নজর রাখছে। অপেক্ষা করছে গাড়ি এসে পৌঁছানোর। হতাশ হয়ে যখন ফিরবে বলে কদম ঘোরাবে তখুনি আলিশান লোহার দরজাগুলো খোলার আওয়াজ ভেসে এলো। পরপরই গাড়ি প্রবেশ করার শব্দ শোনা গেল।
হৃদি শব্দ করে হেসে ছুটতে চাইলে ক্লান্ত চটপট তাকে ধরে ফেলল। নিজেই নামিয়ে দিলো সিঁড়িগুলো।ততক্ষণে এসে থেমেছে বাড়ির সামনে গাড়ি দুটো। শান্ত বেরিয়ে চটজলদি মেলে ধরেছে গাড়ি দরজা। বেরিয়ে এলেন নিপা বেগম। সামান্য যা ইতস্তত ভাব ছিলো হৃদির উচ্ছ্বাস দেখে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। বাচ্চাটা রোদের চেয়েও ঝলমলে আলো নিয়ে এসে ঝাপিয়ে পড়ল তার বাড়িয়ে দেয়া কোলে –
‘নানুউউউউ! হাউ আরে ইউ? আই মিসড ইউ সোওও মাচ!’
বেরিয়ে এসেছে রাজু। মন খারাপের ভণিতা ধরে জিজ্ঞেস করল, ‘আর আমাকে? আমাকে মিস করেনি আমার পাখিটা?’
হৃদি দ্বিগুণ উচ্ছ্বাসে গিয়ে চড়ল রাজুর কোলে। দুহাতে গলা জড়িয়ে কেমন আদর নিয়ে তাকিয়ে থাকল রাজুর মুখের দিকে। বলে গেলো –
‘অন্নেক মিস করেছি মামা। তোমাকে আমি বেশি মিস করেছি।’
আজিজুল সাহেব হাসছিলেন তাদের দিকে চেয়ে। নিপা বেগম আশেপাশে তাকালেন। শান্ত এসে হাত বাড়িয়ে ভেতরে যাওয়ার ইশারা করে বলল –
‘আসুন….’
রাজু হৃদিকে কোলে নিয়ে আগে আগে প্রবেশ করল। পিছুপিছু ঢুকলেন নিপা বেগম, আজিজুল সাহেব। নূরজাহান তাদের সালাম জানাল। আপ্যায়ন করল। তখুনি শব্দ শুনে তাকালেন সবাই। রোযা তাড়াহুড়ো কদমে নামছে। নিজের পরিবার দেখে তার মুগ্ধতা, আনন্দ থামছে না। রোদের আলোর চেয়েও ঝলমলে মুখ একমুহূর্তে তার। নামার তালে তালে দুলল সোনালি রঙের একরঙের সিল্কের শাড়ির পাড়। কোনো নবাববাড়ির বড়ো বউয়ের মতোই লাগল। নিপা বেগম মুগ্ধ হলেন, মুগ্ধ হলেন আজিজুল সাহেবও। রোযা নেমে এসেই জড়িয়ে ধরল মাকে, একেক করে বাবাকে। রাজু তখন হৃদিকে নিয়ে ফাজলামো করছে সোফায় বসে।
নিজের পরিবার বসিয়ে রোযা ব্যস্ত হয়ে নাস্তার ট্রে এনে রাখল টি-টেবিলের ওপরে। নিপা বেগম আর যেতে দিলেন না মেয়েকে। পাশে বসালেন। আলাপ শুরু করলেন। একপর্যায়ে আশেপাশে চেয়ে শুধালেন –
‘বাড়িতে নেই?’
রোযা বুঝল আদিলের কথা জিজ্ঞেস করছে। মাথা নাড়িয়ে বলে, ‘শহরের বাইরে গিয়েছে গতকাল। আজ ফিরবে।’
আজিজুল সাহেব আড়চোখে নিপা বেগমের মুখের দিকে তাকালেন। ভদ্রমহিলাও। খবরাখবর জানা মানে সম্পর্ক ঠিক হচ্ছে। এই এক স্বস্তি! রোযা কথা বলতে বলতে তাকাল অদূরে। শান্ত নেই। রোযা উঠে এলো দরজার কাছে। দেখল বাগানে শান্ত, ক্লান্ত সহ আরও কয়েকটা দাঁড়িয়ে আছে। শান্ত কেবলই একটা সিগারেট ধরিয়েছিল। রোযাকে দেখে দ্রুতো লোকাল তা। রোযা চোখমুখ ভার করে এসে দাঁড়াল তাদের সামনে। দুহাত বুকে গুঁজে বলল –
‘ঝুমুর কোথায়?’
শান্ত বাধ্য ভাবে দৃষ্টি নুইয়ে দাঁড়িয়ে আছে, ‘বাড়িতে।’
‘তা তো আমিও জানি। কিন্তু কেনো? ও আসবে কখন? আনোনি যে?’
‘বাড়ি থেকে আসবে!’
রোযা থমথমে হয়ে শুধাল, ‘কীভাবে?’
‘আমার লোক নিয়ে আসবে।’
রোযা চুপচাপ কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে বিরক্ত হয়ে বলল, ‘তা সোজা না বলে বাঁকালে কেনো?’
ক্লান্ত টুপ করে শব্দ করে হেসে ফেলল। শান্তর মুখটা স্বাভাবিক। সে আরেকটু দূরত্বে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। শান্ত যে ফাজলামি করল বেশ বুঝেছে রোযা। নাক ফুলিয়ে আওড়ে গেল, ‘এই, তুমিই, তোমার নাম তো শান্ত না অশান্ত হওয়া উচিত ছিলো!’
শান্ত বেশ বাধ্য। দৃষ্টি নুইয়ে করুণ গলায় বলে গেলো, ‘ম্যাডাম, আপনি অশান্ত ডাকেন। আমি মাইন্ড করব না।’
‘ফাজিল! তাড়াতাড়ি আসতে বলো।’
রোযা চলে গিয়েছে। ফিক করে হেসে ফেলেছে ক্লান্ত। শান্ত নিজেও হাসছে। হাসতে হাসতে ফোন বের করে কল লাগাল। ঝুমুর কল রিসিভ করল সাথে সাথে। স্ক্রিনে ভাসছে ঝুমুরের হাস্যোজ্জ্বল অস্থির মুখ। ম্যাডামের সাথে দেখা করার জন্য অস্থির হয়ে আছে। শান্ত একটু দূরে এসে দাঁড়াল। স্ক্রিনে ভাসা সুন্দর মুখখানায় চেয়ে জিজ্ঞেস করল –
‘এতো খুশি?’
ঝুমুরের রিনরিনে কণ্ঠ ভেসে এলো, ‘ভাবিইইকে আমার ভীষণ পছন্দ!’
‘পছন্দ হবে না? তোর ভাবি আমার বসকে তড়পিয়ে এখন তোকেও সেই আদাপড়া পড়িয়ে আমাকে তড়পানোর পদ্ধতি শেখাচ্ছে। ঘাড়াব তোকে আর তার সুরে নাচলে!’
শান্ত যখন জেনেছে ওই বুদ্ধি ম্যাডাম দিয়েছে মাথাটাই চক্কর দিয়ে উঠেছিল! কী ধুরন্ধর মেয়েমানুষের পাল্লায় তারা পড়েছে! ওপাশে ঝুমুর হাসছে শব্দ করে।
ঝুমুর এসে পৌঁছাল দুপুরের আগে। এসেই সে নিপা বেগম আর আজিজুল সাহেবের সাথে সখ্যতা জুড়িয়ে বসেছে। তাদের দ্বিতীয় মেয়ে হয়ে গিয়েছে। বেশ আলাপে মশগুল তারা। নিপা বেগম সে কী আদর করছেন ঝুমুরকে! মিষ্টি মেয়ে বলে বলে মুখে ফ্যানা তুলে ফেলেছেন। একফাঁকে শান্তকে ডেকে আনল রোযা।
কাজের জায়গায় স্ত্রী মালকিন সেজে আছে বেশ বুঝল শান্ত। ঝুমুর পুরোটা সময় মুচকি মুচকি হাসছিল। অথচ শান্ত তাকাতে পারছে না। না পারছে মেয়েটাকে আচ্ছা করে মিষ্টি শাস্তি দিতে। অন্যদিকে নিপা বেগমের ভারি পছন্দ হয়েছে শান্ত আর ঝুমুরকে। উনি দুজনকে বেশ দোয়া করে দিয়েছেন। এরমধ্যে রোযা ফাঁকে ফাঁকে রান্নাঘরে গিয়ে রান্নাবান্নার অবস্থা দেখছে, সাহায্যও করছে। তার আশেপাশে রাজু আর হৃদি ছোটাছুটি করছে। হৃদিকে সঙ্গ দিতে রাজু বাচ্চাটাই হয়ে গিয়েছে।
দুপুরে সবাই একসাথে খাওয়াদাওয়া করেছে। বিকেল জুড়ে তাদের আলাপ চলল। রোযা পুরো বাড়ি ঘুরে ঘুরে দেখিয়েছে বাবা-মাকে। রাতের খাবার খেয়ে বিদায় নেবে সবাই।
তখন সন্ধ্যা। সবাই বাগানে আলাপ করছে। হাসাহাসি চলছিল। এরমধ্যে অন্যমনস্ক ভঙ্গিতেই রোযা আড়ে আড়ে চেয়েছে কবার প্রধান দরজার দিকে। তখুনি দরজা খোলার আওয়াজ ভেসে এলো। মুহূর্তে গাড়ি প্রবেশ করল বেশ কয়েকটি। রোযা দাঁড়িয়ে পড়ল চেয়ার ছেড়ে। রোযার দেখাদেখি নিপা বেগম, আজিজুল সাহেব বাকিরাও দাঁড়িয়ে গিয়েছে। হৃদির চোখমুখ জ্বলজ্বল করছে বাবার উপস্তিতিতে। ছুটেছে সে ডাকতে ডাকতে। গাড়িগুলো থেমেছে তখন। আদিল বেরিয়ে এলো। পরনে থ্রিপিস স্যুট, কুচকুচে কালো। মুহূর্তে উপস্থিত সবার হাবভাব আঁটসাঁট হয়ে গেল। হৃদি অবশ্য তার বাবার পাওয়ার সম্পর্কে ধারণা রাখে না। সে কোলে চড়ে তার মতন কিচিরমিচির করে গেলো
‘দেখো ড্যাড, নানুভাই, নানু, মামা এসেছে।’
আদিল মেয়ের থুতনিতে ঠোঁট ছুঁয়ে বলে গেলো, ‘ইউ হ্যাপি?’
‘ভীষণ হ্যাপিই।’
হৃদিকে নিয়ে আদিল এগিয়ে গেলো কয়েক কদম। চোখের দৃষ্টি সেঁটে থাকল রোযার ওপরেই। শাড়িটাড়ি পরে সেজেগুজে আছে। গতকাল বলল, আর আজ শাড়ি পড়ল! কানে ছোটো ঝুমকো, গলায় ছোটো হাড়, নাকে নাকফুল, দুহাতে চুড়ি, শাড়ির আঁচলটা বড়ো। সব মিলিয়ে এই হলদে আলোয় অপ্সরা লাগল দেখতে। চোখ ফেরানো দুঃসাধ্যের মতো। আদিল নিষিদ্ধ চাওয়া গুলো আড়াল করে, সেদিক থেকে টেনেহিঁচড়ে দৃষ্টি সরিয়ে তাকাল উপস্থিত সবার দিকে। অবশেষে আজিজুল সাহেব আর নিপা বেগমের দিকে চেয়ে কণ্ঠ যথাসম্ভব নামানোর চেষ্টা করল। তারপরও থমথমে শোনাল –
‘আপনারা ভালো আছেন আশা করি।’
আজিজুল সাহেব আর নিপা বেগম কাঠের পুতুলের মতো মাথাটা ওপর নিচ করে বলে গেলেন, ‘জি, জি জি, ভালো আছি। ভালো আছি। ভালো আছি।’
রোযা ঠোঁটে ঠোঁট টিপে রেখেছে। বহু চেষ্টার পরেও ব্যর্থ হলো হাসি থামাতে। মৃদু শব্দে হেসেও ফেলল। তার হাসির শব্দে হকচকিয়ে ওঠে বাকিরা। আদিল গলা পরিষ্কার করল। মেয়েকে নামিয়ে দিয়ে আওড়ে গেলো –
‘থাকুন, এঞ্জয়।’
রাজু বাবার পেছন থেকে বড্ড সাহস সঞ্চয় করে সালাম জানাল তৎক্ষণাৎ, ‘আসসালামু আলাইকুম দুলাভাই।’
আদিল সঙ্গে সঙ্গে তাকাল। এমন সম্বোধন শুনে সামান্য চমকালও। চিনল রোযার একমাত্র ভাইকে। হাতের ইশারায় ডাকল সে। রাজু একটু সাহসী বটে। এগিয়ে গেলো সামনে। জিজ্ঞেস করল –
‘কী ডাকলে মাত্র?’
রোযা ভাবল মানুষটা রাগল কিনা! এগুবে, কিছু বলবে তার আগেই রাজু বলে গেলো, ‘দুলাভাই!’
‘গুড! কী চাই তোমার?’
রাজু খুশি হয়ে গেলো। সব ভয় যে কোথায় পালাল। মুহূর্তে আদিলের শক্ত, কাটকাট মুখে চেয়ে বলল –
‘যা চাইব, পাব দুলাভাই?’
‘হু, কী চাই?’
‘গান চালানো শিখতে চাই।’
আদিলের আদেশ তখুনি পড়ল, ‘ওকে, শান্ত!!’
শান্ত কাছেই ছিলো। সাথে সাথে এসে দাঁড়াল পাশে, ‘রাজুকে গান চালানোর পাশাপাশি আত্মরক্ষার যাবতীয় ট্রেনিং শিখিয়ে দিস।’
‘ইয়েস বস!’
রাজু খুশিতে আত্মহারা। আজিজুল সাহেব, নিপা বেগম সামান্য চিন্তিত হলেন। রোযা অবশ্য সেদিকে ধ্যান দেয়নি। সে চেয়ে আছে আদিলের দিকে। আদিল আদেশ করে ভেতরে চলে গিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে সবাই আটকে রাখা শ্বাস ফেলল। ধপাস করে চেয়ারে বসল নিপা বেগম। আজিজুল সাহেব কপালের ঘাম মুছলেন। রোযা চেয়ে থাকল বাড়ির দরজার দিকে। নূরজাহান ট্রে নিয়ে এলো তখুনি। চায়ের কাপ একেক করে সবার হাতে দিলো। রোযা অন্যমনস্ক হয়ে বসতে চাইলে নিপা বেগম তাড়া দিলেন –
‘জামাই আসছে, গিয়ে দেখ কিছু খায় কি না! সন্ধ্যার নাস্তাটা দিয়ে আয়!’
রোযা মাথা দুলিয়ে কদম বাড়াল অবশেষে। একপল তাকাল নিজের পরনের শাড়ির দিকে। শাড়িটা জ্বলজ্বল করছে। পরেছিলও কেনো তা জেনেই ওপরে যেতে ইচ্ছে করছে না! মরিয়ম বেগম নাস্তার ট্রে এনে ধরিয়ে দিয়েছে হাতে। অথচ রোযার চোখে ভাসল তখনকার আদিলের দৃঢ় দৃষ্টি! মুহূর্তে কেমন অস্থির লাগল। আর কদম বাড়াতেঅ ইচ্ছে করল না। অদ্ভুত এক ভয়ে গোটা শরীর পাথরের মতো শক্ত হয়ে জমে গেলো। মরিয়ম বেগম বললেন –
‘ম্যাডাম, যাবেন না?’
মাথা দোলাল রোযা। বাড়াল কদম সিঁড়ির দিকে। একহাতে ট্রে নিয়ে অন্যহাতে শাড়ির কুঁচি সামলে দোতলার পরে তিনতলার সিঁড়ি বেয়ে, তিনতলায় এসে পৌঁছাল। এতলা একটু থমথমেই থাকে। মালিকের মতন মালিকের থাকার জায়গা। কদম বাড়াতে থাকল রোযা। ভেতরের অস্থিরতা ভালোভাবেই চাপিয়ে রাখল। কদম থামল দরজার সামনে। অল্প খোলা, আদিলকে দেখা গেলো না রূমে। কথা ভেসে আসছে বারান্দা থেকে। ফোনে কথা বলছে, সিগারেটের গন্ধ নাকে এসে ছুঁয়েছে। রোযা নিঃশব্দে ট্রে রাখল টি টেবিলের ওপরে। পদচারণের আওয়াজও হয় না তার। ভেতরে এগুলো না আর। বেরিয়ে যেতে যেতে কোনোরকমে বলল –
‘নাস্তা করে নিয়েন।’
রোযা দরজা পেরিয়ে বেরিয়ে এসেছে দ্রুতো। কীসের ভয় তাকে তাড়া করেছে তা ভাবাও ভারি লজ্জার! কয়েকটা কদম এগুতেই কানে ভেসে এলো ভারি পায়ের আওয়াজ গুলো। কেউ তেড়ে আসছে। রোযা তটস্থ হয়। হৃৎপিণ্ডে বুঝি টান পড়ে। বুঝেও থামাল না কদম। উল্টো পারলে দ্রুতো চলে সে!
পরপরই পাগলা ঝড়ের কবলে পড়ে তার শরীর। টান পড়ে হাতে। শক্ত, রুক্ষ হাতের স্পর্শে রোযা হকচকিয়ে ওঠে। মুখ ফসকে বেরোয় আর্তনাদ। দুপা পিছুতেই জোরসে গিয়ে তার পিঠ ঠেকল করিডোরের রেলিংয়ের ওপরে। মৃদু ব্যথাও পেলো সে। পুরোপুরি ঢলে পড়ে রেলিংয়ের ওপরে। ব্যথাটুকু হজমও হয়নি। পূর্বেই আদিলের আক্রমণ ঝড়ের গতিতে এসে পড়ল তার ওপরে। কোনো পূর্ব সংকেত ছিলো না এখানে। আদিলের রুক্ষ হাতটা তার গলা সহ মাথার একাংশ শক্ত করে ধরেছে। নিজের উষ্ণ, শক্ত ঠোঁট বসিয়ে দিয়েছে রোযার নরম ঠোঁটের ওপরে। অধৈর্য্য, অস্থির সে উন্মাদের মতোই ওখানেই মেতে উঠল ঘনিষ্ঠ এক চুম্বনে। ভেজা, নিষ্ঠুর আর দৃঢ় সেই আক্রমণ রোযা মেনে নিতে হিমশিম খেলো। চোখ বুজে শুধু বুঝল তার অস্তিত্ব কাঁপছে। কাঁপছে তার হাত, যা কোনোরকমে নিজেকে ব্যালেন্স করে রেখেছে রেলিং ধরে।
শাড়ির আঁচলটা পড়েছে নিচে। ঝুলছে, দুলছে তা হাওয়ায়। চুলগুলো ঝর্ণার মতন ঝরছে বলেই লাগছে দেখতে। আদিল মাথাটা ক্রমশ নুইয়ে গেল রোযার তালে তালে। ঠোঁটের গভীরতা বাড়িয়ে গেল। ওসময়েই ভেসে এলো নিপা বেগমের কণ্ঠ। ভেতরে আসছন বুঝি! রোযা পরমুহূর্তেই সতর্ক হয়। কোথায় এসব হচ্ছে বুঝতে পেরে চেহারার রং পাল্টে যায়। কম্পিত হাতে ঠেলতে চাইল আদিলের বুক। আদিল থামল তো নাই, উল্টো রোযার বিরোধিতা করা হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় ভরে নিলো। রোযা পারল না মাথাটা সরাতে, শক্ত এক থাবায় যে তার ঘাড়। অন্য হাতটাই দ্রুতো আদিলের মুখ চেপে ধরল।
তাদের দুজনার ঠোঁটের মধ্যে এখন রোযার হাত। তার নরম হাতের তালুটা চেপে ধরেছে আদিলের ঠোঁটজোড়া। রোযা ভেজা চোখে চাইতেই অনুভব করল আদিল তার হাতের তালুতে চুমু বসিয়েছে। কাঁপল হাতটা। পরমুহূর্তেই অধৈর্য আদিল বিদ্যুৎ বেগে তার কোমর জাপ্টে ঝড়ের গতিতে ঘুরিয়ে নিয়ে আটকে ধরল ওপর পাশের দেয়ালের সাথে। পরপরই ক্ষণিকের জন্য ছাড় পাওয়া রক্তাভ ঠোঁটজোড়া পুনরায় কারও ঠোঁটের ভাঁজে চলে গেলো। এবারে যে আরও দৃঢ় হলো, হলো সমুদ্রের চেয়েও গভীর। রোযা নড়েচড়ে ওঠে। তার বিরোধিতা স্পষ্ট এযাত্রায়। নড়চড় অব্যাহত বলেই হাতের স্পর্শে ভেঙে গুড়িয়ে গেল পাশের ফুলদানিটা। কোনোরকমে দুহাতে আদিলের বুক ঠেলে নিজের ঠোঁটজোড়া মুক্ত করল। র ক্ত লাল ঠোঁট জোড়া নড়াতেও লজ্জা লাগল রোযার। নিজেকে ছাড়াতে চেয়ে আস্তে করে আওড়াল –
আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ৫৫
‘বাড়িতে সবাই আছে। কী করছেন…’
আদিল তাকাল সময় নিয়ে রোযার পুরো মুখ জুড়ে। চোখ, নাক, ঠোঁট অবশেষে ফের চোখে। তার ধূসর চোখ নেশায় র ক্ত লাল হয়ে গিয়েছে। রোযা ওই চোখে চাইতেই তার শ্বাস আটকে গেল গলায়। পেটের ভেতর মুষড়ে উঠল।
‘ক্যান ইউ সারভাইভ দ্য ট্রুথ হিডেন ইন মাই আইজ, মিসেস মির্জা?’
রোযা বুঝল না সে প্রশ্নের মানে। কানে এলো রাজুর কণ্ঠ। লিভিংরুমে টেলিভিশনে গান ছেড়েছে। এমন মুহূর্তে ওই গান, রোযার মনে হলো আগুনে কেরোসিন ঢালার মতোই।
‘নাশা তেরা দিলকো লাগা….’
