আবির ভাই পর্ব ১৭
উর্মিলা মজুমদার
ইন্সপেক্টর রহমান উদ্দিন তখনো রাগে ফুঁসছিলেন। আরিশান মৃধার ওপাশ থেকে কোনো উত্তর দেওয়ার সুযোগ না দিয়েই তিনি হুট করে ফোনের লাইনটা কেটে দিলেন। অত্যন্ত বিরক্ত মুখে অরির দিকে তাকিয়ে টেবিল চাপড়ে বললেন,
_“এবার আপনার ওই মহান স্বামীর নম্বরটা দেন।”
অরি কাঁপা কাঁপা গলায় সারিমের পার্সোনাল নম্বরটা মুখস্থ বলল। রহমান সাহেব বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে নম্বরটা ডায়াল করলেন। মাত্র দুবার রিং হতেই ওপাশ থেকে সারিমের সেই গম্ভীর গলার আওয়াজ ভেসে এলো,
_“হ্যালো, কে বলছেন?”
ইন্সপেক্টর রহমান ওনার কর্কশ স্বরে ফোনের ওপর পাশে বলে উঠলেন,
_“ আপনি কি অরিয়া নামক মেয়েটির হাসব্যান্ড বলছেন? আমি থানা থেকে বলছি, ইন্সপেক্টর রহমান উদ্দিন।”
ফোনের ওপাশে সারিম মাত্র তখন মন্ত্রণালয়ের উদ্দেশ্যে যাওয়ার জন্য গাড়িতে উঠছিল। থানার নাম আর অরির নাম একসাথে শুনে ওনার ভ্রু কুঁচকে গেল। সে অত্যন্ত ধারালো গলায় বলল,
_“হ্যাঁ, আমি ওর স্বামী বলছি। কী হয়েছে আমার বউয়ের?”
_“কী হয়েছে মানে? আপনারা কি নিজেদের মগের মুল্লুকের বাসিন্দা ভাবেন?”
রহমান সাহেব ওনার টেবিলের ওপর রাখা ফাইলটার দিকে তাকিয়ে বললেন,
_“বাড়িতে খুব আরামে ফ্যান ছেড়ে ঘুমাচ্ছেন, তাই না? লাইসেন্সবিহীন এক নাবালিকা স্ত্রীর হাতে আস্ত একটা প্রাইভেট কার ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে বসে আছেন! আপনার স্ত্রী এখানে ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করে মস্তবড় এক এক্সিডেন্ট ঘটিয়েছেন। সাথে আরেকটা মেয়েও আছে, নাম জেবা। আপনাদের কি কোনো দায়িত্ববোধ নেই? গাড়ি চালানোর মতো বিপজ্জনক কাজ কি এভাবে বাচ্চার হাতের মোদকের মতো ছেড়ে দিতে হয়? আপনি এখনই থানায় হাজির হোন। আপনাদের এই দায়িত্বজ্ঞানহীনতার হিসাব এখনই দিতে হবে! আপনাদের মতো এমন পুরুষদের আমি রহমান জেলের ভাত খাইয়েই ছাড়বো। দ্রুত থানায় আসুন!”
সারিম ওপাশ থেকে কিছু একটা বলতে চাইল, ওর গলা উঁচিয়ে বলল,
_“মুখ সামলে কথা বলুন…”
কিন্তু রহমান সাহেব ওকে কোনো কথা বলার সুযোগই দিলেন না। ওনার স্বভাবসুলভ তড়িৎ গতিতে খটাস করে ফোনের লাইনটা কেটে দিলেন। ওনার ধারণা, এই দুই মহান স্বামী হয়তো কোনো সাধারণ ব্যবসায়ী বা চাকুরিজীবী, যারা ভয় পেয়ে এখনই থানায় ছুটে আসবে।
লাইনটা কেটে যাওয়ার পর, রহমান সাহেব এর নিদের্শ অনুযায়ী,থানার অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে লকআপের পাশের বেঞ্চে বসতে দেওয়া হলো অরি আর জেবাকে। দুজনের মুখই চুন হয়ে গেছে। জেবা ওড়নার খুঁট আঙুলে জড়িয়ে অনবরত দোয়া ইউনুস পড়তে লাগল। ও অরির দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
_“দোস্ত… এখন কী হবে রে? তোর বাপ—আই মিন উনি এসে যদি আমাকে এই থানার মধ্যেই কাঁচা চিবিয়ে খেয়ে ফেলে? তোর বাপের যা রাগ, না জানি উনি এসব দেখার পর আমাকে বাড়ি থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে উষ্ঠা মেরে বের করে দেবে!”
অরি নিজের কপাল চেপে ধরে একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এরপর শুকনো গলায় বলল,
_“তুই বাবার কথা বাদ দে বাদামনী। আমি চিন্তা করছি, ওই নির্লজ্জ বেটা সারিম যদি এখানে আসে, তাহলে থানার ভেতর সবার সামনে যে কী নাটক শুরু করবে, তা ভেবেই আমার কলিজা শুকিয়ে যাচ্ছে।”
জেবা আর অরি দুজনে মিলে মনে মনে সমস্ত জানা দোয়া-দরুদ পড়তে পড়তে স্বামীদের আগমনের ভয়ঙ্কর মুহূর্তটির জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। ঠিক তার বিশ মিনিট পর-
থানার সদর দপ্তরের বাইরে হুট করে একটা কালো রঙের, দামি ফ্ল্যাগস্ট্যান্ডসহ মার্সিডিজ গাড়ি এসে থামল। গাড়ি থেকে ধীর পায়ে নেমে এলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরিশান মৃধা। পরনে নিখুঁত ফর্মাল স্যুট, চোখে পাওয়ারি চশমা। বয়স পঞ্চান্ন হলেও ওনার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, লম্বা অবয়ব আর অসাধারণ গ্ল্যামারাস রূপ দেখে যে কেউ ওনাকে চল্লিশের কোঠার কোনো সুপুরুষ ভেবে ভুল করবে। ওনাকে দেখলে বোঝার উপায় নেই যে ওনার আস্ত একটা দামড়া ছেলেও আছে।
আরিশান মৃধা থানার প্রধান ফটক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেন। ওনাকে দেখামাত্রই বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা কনস্টেবল আর ডিউটিরত অফিসারদের হাতের কলম যেখানে ছিল,সেখানেই জমে গেল। স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ওনাদের থানায় পদধূলি দিয়েছেন! এটা ওনাদের কল্পনারও অতীত ছিল।
ডিউটি অফিসার জলদি করে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে স্যালুট ঠুকলেন,
_“জয় বাংলা স্যার! ওয়েলকাম টু আওয়ার স্টেশন স্যার!”
থানার ভেতরে থাকা কিছু নারী কনস্টেবল ফাইল হাতে নিয়ে ঘুরছিল, তাদের দৃষ্টি আরিশান মৃধার দিকে পড়তেই হা করে ওনার দিকে তাকিয়ে রইল। স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নিজ চোখে এখানে দেখতে পাবে, তা কারও কল্পনায় ছিল না। আরিশান মৃধার ব্যক্তিত্বময় রূপ আর বয়সের তুলনায় এই অবিশ্বাস্য গ্ল্যামার দেখে নারী কনস্টেবলরা আকৃষ্ট হয়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে হাসতে লাগল। একজন তো বলেই ফেলল,
_“ঐ দেখ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে! একেই বলে আসল পুরুষ! বয়স যাই হোক, গ্ল্যামার দেখছিস ওনার? পুরো ক্রাশ খাওয়ার মতো চেহারা!”
আরিশান মৃধা মেয়েগুলোর এমন চটুল চাউনি আর ফিসফিসানি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ওনার স্বভাবসুলভ গম্ভীর মুখে সোজা এগিয়ে গেলেন ইন্সপেক্টর রহমান উদ্দিনের কেবিনের দিকে। ওনার পেছনে ওনার সশস্ত্র বডিগার্ডও তড়িৎ গতিতে ভেতরে ঢুকল।
রহমান উদ্দিন তখনো টেবিলে বসে ডায়েরি লিখছিলেন। হঠাৎ ওনার কেবিনের দরজাটা সশব্দে খুলে গেল। উনি বিনা পারমিশনে ওনার কেবিনে কারও উপস্থিতি টের পেয়ে রেগে তাকাতেই দেখতে পান স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ওনার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। উনি যেন আকাশ থেকে পড়লেন! আরিশান মৃধাকে বিনা নোটিশে এখানে আসতে দেখে ভূত দেখার মতো করে চমকে উঠলেন। হাতের বলপেনটা ছিটকে মেঝেতে সেই কখন পড়ে গেছে, তা খেয়ালই নেই ওনার। পা দুটো টেবিলের নিচেই কাঁপতে শুরু করল।
রহমান সাহেব এক লাফে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে ওনার হাত দুটো কপালে ঠেকিয়ে স্যালুট করলেন,
_“স্য-স্যার! আপনি এখানে স্যার? কোনো অর্ডার থাকলে আমাকে বলতেন স্যার, আমি নিজে গিয়ে ওনার সাথে দেখা করতাম!”
কেবিনের বাইরে জেবা আর অরি বসে ছিল। আরিশান মৃধাকে দেখামাত্রই জেবার মনের ভেতরের সমস্ত ভয় এক নিমেষে কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সে এক লাফে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে দৌড়ে গিয়ে আরিশান মৃধার ঠিক পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। ওনার কোটের পেছনের অংশটা দুই হাত দিয়ে শক্ত করে খামচে ধরল।
জেবা ওর ম্লান মুখটায় একটা মরিয়া এবং আদুরে ভাব ফুটিয়ে তুলে আরিশান মৃধার পিঠের আড়াল থেকে ইন্সপেক্টর রহমানের দিকে আঙুল উঁচিয়ে বেশ চড়া গলায় বলে উঠল,
_“হানি! দেখো না উনি আমাদের কেমন করে ধরে এনেছে! সামান্য একটা ভাঙা গাড়িতে ভুল করে একটু টাচ লেগেছে, সেজন্য উনি আমাদের কত বড় বড় ধমক দিচ্ছিলেন! কত বড় সাহস দেখেছ ওনার? মিনিস্টারের বউকে উনি থানায় তুলে আনে ! ওনাকে একদম আচ্ছা করে শাস্তি দাও তো হানি!”
হানি!জেবার মুখ থেকে এই সম্বোধনটা শোনামাত্রই আরিশান মৃধার চোখ দুটো প্রায় কপালে উঠে গেল। ওনার মাথাটা এক মুহূর্তের জন্য ঝিমঝিম করে উঠল। মেয়েটা ওনাকে প্রকাশ্য থানায়,হানি’ বলে ডাকছে! ওনার মনে হতে লাগল, এই মেয়ের সাথে আর কিছুদিন থাকলে ওনাকে নির্ঘাত হার্ট অ্যাটাক করতে হবে। না জানি সামনে ওনার কপালে আরও কী কী অদ্ভুত সম্বোধন লেখা আছে, তা আল্লাহই ভালো জানেন।
এক কোণায় দাঁড়িয়ে অরি জেবার এই চরম সাহসী আর বোকামি কাণ্ড দেখে নিজের মুখ চেপে ধরে মুচকি মুচকি হাসতে লাগল। মনে মনে বিড়বিড় করে বলল,
_“সাবাশ জেবা! বাঘের পিঠে সওয়ার হয়েছিস, এবার বাঘকে সামলা!”
এদিকে ইন্সপেক্টর রহমান উদ্দিনের অবস্থা তখন দেখার মতো। ‘মিনিস্টারের বউ’ জেবাকে আরিশান মৃধার পেছনে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ওনার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করল। ওনার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছিল। তিনি আমতা আমতা করে বললেন,
_“স্য-স্যার… আমি আসলে বুঝতে পারিনি… উনি আপনার… আপনার স্ত্রী স্যার?”
আরিশান মৃধা জেবার হাতটা আলতো করে ওনার কোট থেকে সরিয়ে দিলেন। ওনার মুখে সেই চিরচেনা কঠোর গাম্ভীর্য। উনি রহমান উদ্দিনের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত শান্ত, ঠান্ডা অথচ ভারী গলায় বললেন,
_“ইন্সপেক্টর, আপনি নিজের নার্ভাসনেসটা আগে একটু কমান। আমি এখানে কোনো ক্ষমতার দাপট দেখাতে আসিনি। আপনি আমাকে ফোনে যা যা বলেছেন, একদম ঠিক বলেছেন। লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানো অত্যন্ত বড় অপরাধ। আপনি আপনার ডিউটি একদম পারফেক্টলি পালন করেছেন। গুড জব।”
আরিশান মৃধার মুখ থেকে এই প্রশংসা শুনে জেবা এক নিমেষে রেগে লাল হয়ে গেল। সে আরিশান মৃধার পিঠে একটা আলতো ধাক্কা দিয়ে বলল,
_“কী করছ তুমি? আমি ভেবেছিলাম তুমি এসে এই বেটা পুলিশকে একটু আচ্ছা করে ধোলাই দেবে—উনি আমাদের এত ধমকেছেন! আর তুমি উল্টো ওনার গুণগান গাইছ? এটা কেমন স্বামী গো তুমি?”
আরিশান মৃধা জেবার এই অবুঝ কথায় কান দিলেন না। উনি রহমান সাহেবকে বললেন,
_“ওদের গাড়ির এক্সিডেন্টের কারণে যে ক্ষতিপূরণ হয়েছে, সেটা আমার সেক্রেটারি এক্ষুনি ক্লিয়ার করে দিচ্ছে। আর এই কেসটা এখানেই ক্লোজ করুন। আমি ওদের নিয়ে যাচ্ছি।”
_“জি স্যার! নিশ্চয়ই স্যার! কোনো সমস্যা নেই স্যার!” রহমান সাহেব যেন ফাঁসির মঞ্চ থেকে মুক্তি পেলেন। উনি অনবরত মাথা নোয়াতে লাগলেন।
আরিশান মৃধা অরি আর জেবাকে নিয়ে কেবিন থেকে বের হয়ে থানার মেইন লবিতে এলেন। ঠিক তখনই থানার বাইরে এক বিশাল সাইরেনের আওয়াজ শোনা গেল। চার-পাঁচটা পুলিশের প্রোটোকল গাড়ি এসে পুরো থানা প্রাঙ্গণ অবরুদ্ধ করে ফেলল।
গাড়ি থেকে অত্যন্ত দাপটের সাথে, এক হাতে সানগ্লাসটা ঘুরিয়ে নামলেন দেশের তরুণ ও প্রভাবশালী শিক্ষামন্ত্রী মৃধা আবরার সারিম। পরনে কালো পাঞ্জাবি আর সাদা পায়জামা, চুলে জেল দিয়ে সেট করা। চোখে-মুখে চরম উগ্র ও রাগী ভাব ফুটে উঠছে।
সারিম ঝড়ের গতিতে থানার ভেতরে প্রবেশ করতেই ডিউটি অফিসাররা আবার সোজা হয়ে স্যালুট ঠুকল। সারিম লবিতে ঢুকতেই ওর বাবার পাশে অরিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই ওর সমস্ত ভাবগাম্ভীর্য ভুলে এক লাফে এগিয়ে এলো। সারিম আরিশান মৃধাকে সম্পূর্ণ পুতুলের মতো একপাশে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে সরাসরি অরিকে নিজের দুই বাহুর মাঝে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
_“বউ! চন্দ্রিমা সোনা আমার! আমার লক্ষ্মী বউটা, তুমি ঠিক আছো তো?” সারিম অরির পুরো পিঠে, মাথায় হাত বুলিয়ে ওকে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে ধরল। গলায় তীব্র আতঙ্ক আর গভীর ভালোবাসা মিশ্রিত সুর,
_“সরি বউ, সব আমার দোষ! তোমাকে একা ছাড়া আমার উচিত হয়নি। তুমি কোথাও চোট পাওনি তো সোনা? তোমার ওই নরম হাত-পায়ে কোথাও লেগেছে?”
লবিতে তখন প্রায় জনা তিরিশেক পুলিশ অফিসার, কনস্টেবল আর সাধারণ মানুষ হাঁ করে সারিমের দিকে তাকিয়ে আছে। অরি সবার সামনে সারিমের এই লাগামহীন কথাবার্তা আর উগ্রভাবে জড়িয়ে ধরা দেখে চরম অপ্রস্তুত আর লজ্জায় লাল হয়ে গেল। সে সারিমের চওড়া বুকে নিজের দুই হাত দিয়ে জোরে ধাক্কা মারার চেষ্টা করে ফিসফিস করে বলল,
_“ছাড়ুন সারিম! কী করছেন আপনি? এটা থানা! চারপাশের মানুষ দেখছে, বাবা দাঁড়িয়ে আছেন! দোহাই আপনার, আমায় ছাড়ুন!”
কিন্তু সারিম ওর চন্দ্রিমাকে এত সহজে ছাড়ার পাত্র নয়। সে নিজের দুই হাত দিয়ে অরির মুখটা ওপরে তুলে ধরে, সবার সামনেই অরির ডান গালে শক্ত করে একটা শব্দযুক্ত চুমু খেয়ে বসল।
বুক টান করে চেঁচিয়ে বলে উঠল,
_“দেখুক গে দুনিয়ার মানুষ! নিজের বিবাহিত বউকে আদর করছি, এতে কার বাপের কী?”
ইন্সপেক্টর রহমান উদ্দিন বাইরের হট্টগোলের আওয়াজ শুনে কেবিন ছেড়ে বের হয়ে আসলেন।কিন্তু সামনের এই দৃশ্য দেখার পর ওনার মাথাটা সত্যি সত্যি চক্কর দিয়ে উঠল। নিজের কপালে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে তিনি বিড়বিড় করে বলতে লাগলেন,
_“কী অদ্ভুত সেলিব্রেটি পরিবার রে বাবা! বাপ বিয়ে করেছে আঠারো বছরের মেয়েকে, আবার ছেলেও বিয়ে করেছে একই বয়সের আরেকটা মেয়েকে! আজকালকার এই কচি ইয়াং মেয়েগুলোর নজর যে কেন সব এই ক্ষমতাশালী আর বয়স্ক পুরুষদের ওপর গিয়ে পড়ে, তা খোদা ছাড়া আর কেউ জানে না! আমার কপালটাই খারাপ যে এদেরকে থানায় তুলে আনলাম!”
সারিমের এমন প্রকাশ্য ও লাগামহীন কাণ্ড দেখে লবিতে উপস্থিত সবার চোখ তখন চড়কগাছ!আরিশান মৃধা ওনার এই গুণধর সুযোগ্য পুত্রের কান্ডকারখানা একপাশে দাঁড়িয়ে গম্ভীর মুখে দেখছিলেন। ওনার চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। নিজের ছেলেকে তিনি খুব ভালো করেই চেনেন। রাজনীতির মাঠে যে ছেলে বাঘের মতো গর্জে ওঠে, বউয়ের সামনে এসে সে এক্কেবারে ভেড়া! তবে শত হলেও তিনি দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, নিজের একটা আলাদা ব্যক্তিত্ব আর আত্মসম্মান বোধ আছে।
তিনি গলা ঝেড়ে একটু চড়া সুরে বললেন,
_”সারিম! একটু কি হুঁশ ফিরবে তোমার? চারপাশের মানুষজন দেখছে। এটা তোমার শোবার ঘর নয়, সরকারি থানা!”
সারিম অরিকে নিজের বুকের সাথে একহাতে জড়িয়ে রেখেই বাবার দিকে তাকাল।চোখে আবার ফুটে উঠল রাগের আগুন। বাবার কথার কোনো উত্তর না দিয়ে সে সরাসরি অরিকে জিজ্ঞাসা করল,
_”বউ, তুমি আগে আমাকে বলো, এখানে তোমাদের কোন পুলিশ ধরে নিয়ে এসেছে? কার এত বড় সাহস হলো আমার চন্দ্রিমাকে তুলে আনার?পুরো ঘটনা খুলে বলো আমাকে। আমি সবকটাকে দেখে নিবো”
অরি সারিমের বুকের মাঝে একটু আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। সবার সামনে এতক্ষণ লজ্জায় ওর মাথা কাটা যাচ্ছিল, কিন্তু সারিমের আশকারা পেয়ে এবার ওর ভেতরের নালিশ করার স্বভাবটা জেগে উঠল। সে একটু আদুরে আর কাঁদোকাঁদো ভাব করে ইন্সপেক্টর রহমানের দিকে আঙুল উঁচিয়ে বলল,
_”সকালে কোচিং যাওয়ার পথে ভুল করে একটা গাড়িতে একটু ধাক্কা লেগেছিল।এই আরকি!আমরা তো ইচ্ছা করে এক্সিডেন্ট করিনি, ঐটা ভুল করে হয়ে গেছে। কিন্তু এই লোকটা আমাদের কোনো কথা না শুনে ধরে এনেছে এখানে। শুধু তা-ই নয়, এই লোকটা আমাকে ধমকেছেও অনেক!”
বউয়ের মুখ থেকে ‘অনেক গুলো ধমক দিয়েছে’ শব্দগুলো শোনামাত্রই সারিমের মাথার রগ দপ দপ করে জ্বলে উঠল। ওর চোখের মণি দুটো যেন রক্তবর্ণ ধারণ করল। সে অরিকে আলতো করে একপাশে সরিয়ে দিয়ে ইন্সপেক্টর রহমানের দিকে এগিয়ে গেল।
রহমান উদ্দিন তখন ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে প্রায় দেয়ালের সাথে মিশে গেছেন। সারিম ওনার সামনে গিয়ে পাশে থাকা টেবিলটায় দুই হাত দিয়ে সজোরে একটা চাপড় মারল। দড়াম করে শব্দ হতেই পুরো থানার মানুষ যেন কেঁপে উঠল।
সারিম ওনার দিকে আঙুল উঁচিয়ে অত্যন্ত ধারালো গলায় বলল,
_”কী বললি তুই? আমার বউকে ধমক দিয়েছিস? তোর এত বড় স্পর্ধা হয় কী করে,হ্যাঁ? জানিস ও কার স্ত্রী? মৃধা আবরার সারিমের বউ সে! কার পাওয়ারে চেয়ারে বসে এত বড় বড় কথা বলিস?”
রহমান সাহেব আমতা আমতা করে হাত জোড় করে বললেন,
_”স-স্যার… ভুল হয়ে গেছে স্যার! আমি তো জানতাম না উনি আপনার ওয়াইফ। আমি তো শুধু ট্রাফিক আইনের কথা বলছিলাম…”
_”চুপ একদম চুপ! কোনো কথা শুনব না আমি!” সারিম ওনার কথা মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে পকেট থেকে ফোন বের করল। অত্যন্ত দ্রুত গতিতে আইজিপিকে ডিরেক্ট কল লাগিয়ে স্পিকার অন করে দিল।ফোনের ওপাশ থেকে আইজিপি সাহেবের বিনীত গলা ভেসে এলো,
_”আসসালামু আলাইকুম, মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী! বলুন, কীভাবে সেবা করতে পারি?”
সারিম একটুও সময় নষ্ট না করে সরাসরি হুকুমের সুরে বলল,
_”আইজিপি সাহেব, আপনার আন্ডারে থাকা একটা থানার ইন্সপেক্টর,নাম রহমান উদ্দিন, আমি তাকে আর এক মিনিটও এই চেয়ারে দেখতে চাই না। সাধারণ জনগণের সাথে ওনার ব্যবহার অত্যন্ত খারাপ এবং উনি ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন। ওনাকে এক্ষুনি, রাইট নাও, চাকরি থেকে বরখাস্ত করুন! ওনার সাসপেনশন লেটার যেন আগামী দশ মিনিটের মধ্যে আমার মেইলে চলে আসে।”
ওপাশ থেকে আইজিপি সাহেব একটুও দ্বিধা না করে বললেন,
_”জি স্যার, অবশ্যই! আপনি যা বলছেন তা-ই হবে। আমি এক্ষুনি ওনার সাসপেনশনের ব্যবস্থা করছি।”
সারিমের ফোনের লাইনটা কেটে যেতেই ইন্সপেক্টর রহমান উদ্দিনের পায়ের নিচ থেকে যেন মাটি সরে গেল। ওনার এত বছরের চাকরিটা এক নিমেষে হাওয়া হয়ে গেল! ওনি কেঁদে ফেলার মতো মুখ করে আরিশান মৃধার দিকে তাকালেন, কারণ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীই ওনার শেষ ভরসা। ওনি আরিশান মৃধার পা জড়িয়ে ধরার মতো করে বললেন,
_”স্যার! আপনি তো সব জানেন! আপনি একটু স্যার কে বোঝান দয়া করে। আপনিই তো বললেন আমি ভালো কাজ করেছি! স্যার, আমার চাকরিটা বাঁচান স্যার!”
আরিশান মৃধা আর চুপ থাকতে পারলেন না। শত হলেও ওনার সামনে ওনারই ডিপার্টমেন্টের একজন অফিসারের চাকরি চলে যাচ্ছে। তিনি সারিমের দিকে তাকিয়ে একটু ধমকের সুরে বললেন,
_”সারিম!এটা কিন্তু একটু বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে।তুমি কী করছ এসব? ওনি নিজের ডিউটি পালন করছিল। লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানো অপরাধ, আর সেটার জন্যই ওনি অ্যাকশন নিয়েছে। তুমি এভাবে হুট করে ওনাকে চাকরি থেকে বের করে দিতে পারো না। নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ করো!”
বাবার মুখে এই কথা শুনে সারিম এক মুহূর্তের জন্য থামল। এরপর অত্যন্ত বাঁকা একটা হাসি হেসে চোখের সানগ্লাসটা কায়দা করে কপালে তুলল।এরপর আরিশান মৃধার একেবারে কাছাকাছি এগিয়ে গিয়ে অত্যন্ত নিচু অথচ স্পষ্ট গলায় বলল,
_”লাগবে নাকি তোমার সেই বিখ্যাত ‘হারবাল’? কোনটা খাবে বলো একবার?”
‘হারবাল’ শব্দটা শোনামাত্রই আরিশান মৃধার পুরো মুখটা অপমানে আর লজ্জায় থমথমে হয়ে গেল। জেবা ওনাকে একটু আগেই সবার সামনে ‘হানি’ বলে ডেকেছে, আর এখন এই বেয়াদব ছেলে ওনাকে ‘হারবাল’ নিয়ে খোঁচা দিচ্ছে! চারপাশে এত এত পুলিশ আর সাবঅর্ডিনেটদের সামনে নিজের এই গোপন বিয়ের কথা এবং মান-সম্মান পুরোপুরি ধুলোয় মিশে যাওয়ার ভয়ে আরিশান মৃধা এক ঢোক গিলে তৎক্ষণাৎ চুপ হয়ে গেলেন। তিনি নিজের চশমাটা ঠিক করে উপরের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে বললেন,
_”এই ছেলের সামনে কথা বলাই পাপ!”
সারিম বাবার নীরবতা দেখে বিজয়ের হাসি হাসল। এরপর অরির কোমর জড়িয়ে ধরে জেবাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
_”জেবা তুমি তোমার স্বামীর সঙ্গে এসো,
এরপর অরির দিকে তাকিয়ে বলল।
_চলো বউ আমার সঙ্গে। এই ফালতু জায়গায় আর এক সেকেন্ডও থাকার দরকার নেই।”
সারিম এরপর অরিকে নিয়ে স্টেশন থেকে সোজা বেরিয়ে আসলো।জেবাও এতক্ষণ আরিশান মৃধার পেছনে দাঁড়িয়ে মুখ চেপে হাসছিল। সে আরিশান মৃধার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে একটা চোখ টিপ মেরে বলল,
_”চলো হানি,বাসায় চলো। এখানে বড্ড গরম!”
আবির ভাই পর্ব ১৬
আরিশান মৃধা এতক্ষন যাবত জেবার সকল তামাশা সহ্য করছিলো।তবে এখন ওনার এসব ডাকে বেশ রাগ লাগছে। তিনি দাতে দাত চেপে জেবাকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠেন।
_”একদম ঠিক বলেছ!বাসায় তো এমনিতেই যেতে হবে এখন,তোমাকে মানুষ বানানোর জন্য।সারিমের ভুত মাথায় ভর করেছে তা ভালোই বোঝা যাচ্ছে। চলো!
বলেই তিনি জেবার হাত ধরে টানতে টানতে থানার বাহিরে নিয়ে এলেন। এরপর জেবাকে নিয়ে সোজা গাড়িতে উঠে বসলেন।
