আবির ভাই পর্ব ১
উর্মিলা মজুমদার
আকাশের মুখ আজ ভার। অক্টোবর মাস। মেঘেরা দল বেঁধে ছন্নছাড়া বালকের মতো আকাশের এপাশ-ওপাশ ছুটে বেড়াচ্ছে। সারাদিন টিপটিপ করে বৃষ্টি হলো, এখন কিছুটা ধরেছে। এই সময়টাতে মাটির শরীর থেকে একটা তীব্র গন্ধ বের হয়। যাকে কবিরা বলেন ‘সোঁদা গন্ধ’। আমার ধারণা, এই গন্ধে এক ধরনের নেশা আছে। নেশাটা মানুষের মস্তিকের লজিক সেন্টারকে সাময়িকভাবে অকেজো করে দেয়।
আমি খান বাড়ির বারান্দায় গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে বৃষ্টির দাপট দেখছিলাম। গ্রাম থেকে এসএসসি দিয়ে ঢাকায় এসেছি মাসখানেক হলো। কলেজে ভর্তি হয়েছি ঠিকই, কিন্তু জগতটা হঠাৎ করে বড্ড ছোট হয়ে গেছে। এই বাড়ির বড় ছেলে আবির ভাই! সম্পর্কে আমার আপন চাচাতো ভাই। একেই বোধহয় শহুরে ভাষায় বলে ‘ওভার পসেসিভ’।
নিচে একটা গাড়ি এসে থামল। আবির ভাই অফিস থেকে ফিরলেন বোধহয়। আমাদের চোখাচোখি হতেই আমি এক দৌড়ে নিজের রুমে চলে এলাম। কেন পালালাম জানি না। মানুষের অবচেতন মন মাঝে মাঝে যুক্তি ছাড়াই কাজ করে। একটু পরেই পড়ার নাম করে আবির ভাইয়ের রুমে ঢুকতে হলো। তিনি ফ্রেশ হয়ে গায়ে একটা সাদা গেঞ্জি জড়িয়ে বসে আছেন। চুলে লেগে থাকা পানির কণাগুলো হিরের কুচির মতো চিকচিক করছে। লোকটা অসম্ভব সুদর্শন, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। সুন্দর মানুষের ওপর রাগ করা কঠিন কাজ।
আমি গাইড আর নোটসগুলো টেবিলের ওপর রাখতেই তিনি গম্ভীর গলায় বললেন, “বারান্দায় দাঁড়িয়ে কোন ছেলেকে দেখেছিস রে, মেঘ? আমাকে দেখতেই চোরের মতো দৌড়ে রুমের ভেতর চলে আসলি যে?”
আমার কান দুটো ঝা ঝা করে উঠল। অস্বস্তিতে মাথার ওড়নাটা আরেকটু টেনে দিয়ে বললাম।
“কাউকে দেখছিলাম না, আবির ভাই। আপনি ভুল বুঝেছেন।”
আবির ভাই চেয়ারটা টেনে আমার মুখোমুখি বসলেন। তিনি মৃদু হেসে বললেন, “ভুল? মেঘ, আমার লজিক খুব পরিষ্কার। তুই দাঁড়িয়ে ছিলি আকাশের দিকে মুখ করে নয়, গেটের দিকে তাকিয়ে। আর আমাকে দেখামাত্রই পালালি কেন তাহলে?”
আমি মাথা নিচু করে বললাম।
“বৃষ্টির ছিটে লাগছিল, তাই চলে এসেছি।”
“মিথ্যা বলছিস।”
আবির ভাই শান্ত গলায় বললেন।
আমি চুপ করে রইলাম। এই লোকটার সাথে তর্ক করা মানে নিজের বিপদ ডেকে আনা। তিনি আমার পড়ার গাইডটা হাতে নিয়ে পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে বললেন।
“শোন, কাল থেকে তোর ওই কোচিংয়ে যাওয়া বন্ধ। মাস্টারের দরকার হলে আমি বাসায় টিচার রেখে দেব। কিন্তু বাইরের ওই বখাটে ছেলেদের ভিড়ে তোকে আর পাঠানো যাবে না। শহরটা ভালো না রে মেঘ। এখানে মানুষের চেয়ে ছায়া বেশি ঘোরে।”
আমার ভেতরটা হু হু করে উঠল। গ্রামে ছিলাম সেটাই বোধহয় ভালো ছিল। সেখানে অন্ততঃ খোলা আকাশ ছিল, আর ছিল না এমন সারাক্ষণের জেরা। বাইরে আবার ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামছে।
ঠিক এক মাস আগের কথা–
মানুষের জীবনে কিছু কিছু মুহূর্ত আসে যখন যুক্তিবুদ্ধি জট পাকিয়ে যায়। আমার বেলাতেও ঠিক তাই হলো। সেদিন ঘরটা বেশ অন্ধকার ছিল। সেই অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে কেউ একজন আমাকে পেছন থেকে জাপ্টে ধরল। আমি বেশ চমকে গেলাম। গায়ের স্পর্শে বুঝলাম কোনো এক যুবক। কিন্তু এই ভরদুপুরে কার এত বুকের পাটা যে আমাকে মায়া হরিণের মতো জড়িয়ে ধরবে? আমি লোকটার হাত খামচে ধরলাম। মনের ভেতর তখন রাগের চেয়ে বিস্ময়টাই বেশি। দাঁতে দাঁত চেপে বললাম,
“কোন কিসিমের হতচ্ছাড়া লোক রে বাবা?”
ঠিক সেই মুহূর্তে দরজায় পায়ের শব্দ শোনা গেল। আমাকে জাপ্টে ধরা লোকটা মুহূর্তেই স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। আমি অবাক হয়ে তাকালাম। লোকটা বেশ লম্বা-চওড়া, চেহারায় একটা ‘কেয়ারলেস’ ভাব আছে। গালে চাপ দাড়ি, পরনে ধবধবে সাদা শার্ট, যার হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো। আমি লোকটার দিকে তাকিয়ে আছি, আর সে নির্বিকার ভঙ্গিতে জানালার বাইরে বৃষ্টির অপেক্ষা করছে বোধহয়। ঠিক তখনই ঘরে ঢুকল আমার খালাতো বোন পাখি। পাখিকে দেখামাত্র লোকটা কোনো কথা না বলে গটগট করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। যেন কিছুই হয়নি। পাখি ঘরে ঢুকে আমার দিকে ভুরু কুঁচকে তাকাল। বলল,
“কীরে, তুই এখানে আবির ভাইয়ের সাথে কী করছিস?”
আমি আকাশ থেকে পড়লাম। হড়বড় করে বললাম, “আবির ভাই? কোন আবির ভাই?”
পাখি হাসল। সে বলল, “আশ্চর্য, তুই নিজের কাজিনকেও চিনতে পারিস না? ওটাই তো আবির ভাই। শহর থেকে এসেছে”
আমি নিজের কপালে একটা থাপ্পড় মারলাম। ও আচ্ছা, এই তাহলে সেই বিখ্যাত আবির ভাই! যাঁর গুণকীর্তনে বাড়ির সবাই সারাক্ষণ পঞ্চমুখ। আমি সবে এসএসসি পরীক্ষা শেষ করেছি। গ্রামের বাড়িতে অলস সময় কাটাতে কাটাতে যখন বোর হচ্ছিলাম, তখনই খবর এল শহর থেকে একগাদা মেহমান আসছে। আবির ভাইও তাঁদেরই একজন। অনেক বছর পর তাঁকে দেখলাম, তাই হয়তো চিনতে পারিনি।
কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায়! আবির ভাই হুট করে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন কেন? কোনো মানুষ কি বিনা কারণে কাউকে জাপ্টে ধরে? নাকি তিনি আমাকে অন্য কেউ ভেবে ভুল করেছিলেন? নাকি এটাও কোনো লজিক?
আমাদের গ্রামের বাড়িটা দুই তলা। বাবা এই বাড়িটা কামড়ে একাই গ্রামে পড়ে থাকেন। অথচ আমার অন্য চাচারা সবাই এখন শহুরে মানুষ। ভাইদের মধ্যে কোনো একটা গোপন মন-মালিন্য আছে। বড়দের জগতের সেইসব অন্ধকার গলি আমরা ছোটরা চিনি না, চিনতে চাইও না।
অক্টোবর মাসের শুরু। বৃষ্টির যেন আজ ছুটি নেই। সন্ধ্যায় আমি, পাখি আর মিনু মিলে গ্রামের মেঠো পথে হাঁটতে বেরোলাম। আমার পরনে টিয়া রঙের একটা থ্রি-পিস। রংটা একটু বেশিই চড়া কি না, তা নিয়ে বারবার পাখিকে জিজ্ঞেস করছিলাম। পাখি অবশ্য পাত্তা দিল না, সে ব্যস্ত ছিল কদম ফুল খোঁঁজায়।
ফেরার পথে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল। বাড়ির উঠোনে যখন পা রাখলাম, তখন আমরা প্রত্যেকেই একেকটা জলজ প্রাণী! একেবারে কাকভেজা। ভেতরে ঢুকতেই লিভিং রুমে এক এলাহি কাণ্ড। সোফায় বসে আবির ভাই আর অন্য কাজিনরা লুডু খেলছে। আমাদের এই অবস্থায় দেখে সবাই হো হো করে হাসিতে মেতে ওঠল। হাসির সেই জোয়ারে কেবল একজন ভাসল না! আবির ভাই। তিনি হাতের ছক্কাটা মুঠো করে অদ্ভুত এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। আমি আর দাঁড়ালাম না। চট করে ড্রেস পাল্টে ফ্রেশ হয়ে ফিরে আসলাম আড্ডায়। বারান্দার মাদুরে সবাই বসেছে গোল হয়ে। আমি যেই না বসলাম, অমনি আবির ভাই কোনো কথা না বলে রোবটের মতো উঠে দাঁড়ালেন। তারপর গটগট করে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে চলে গেলেন।
মিনু ফিসফিস করে বলল, “কীরে মেঘ, তুই আসতেই আবির ভাই ভেগে গেল কেন? তুই কি পকেটে করে ভূত নিয়ে এসেছিস?”
আমি উত্তর দিলাম না। মনের ভেতর একটা খচখচে ভাব রয়ে গেল। লোকটা এমন কেন? আমি আসাতে কি উনার রাজত্বে ভাগ পড়ে গেল? বাইরে তখন বৃষ্টির বেগ বেড়েছে। ঝমঝম শব্দে জানালার পর্দাগুলো ভূতের মতো নড়ছে। সেই শব্দের তালে তালে আমরা খেলা চালিয়ে গেলাম।
রাত যখন গভীর হলো, বৃষ্টি তখন ক্লান্ত হয়ে ঝিরঝিরে রূপ নিয়েছে। অক্টোবর মাসের মাঝরাতের বাতাসে একটা হিমেল পরশ থাকে। ঘরের ভেতর দম বন্ধ লাগছিল। সবার অলক্ষ্যে আমি গুটি গুটি পায়ে ছাঁদে চলে গেলাম। মাঝরাতের ভেজা ছাঁদ, একাকী বৃষ্টি আর আকাশের মেঘেদের লুকোচুরি! আহা, এর চেয়ে সুন্দর আর কী হতে পারে!
কিন্তু ছাঁদে পা রাখতেই আমার শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। ছাঁদের এক কোণে রেলিং ধরে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। অন্ধকার ভেদ করে সিগারেটের আগুনের লাল বিন্দু মাঝে মাঝে জ্বলে উঠছে। আমি কিছুটা সাহস সঞ্চয় করে কাঠখোট্টা গলায় প্রশ্ন করলাম,
“কে এখানে? মাঝরাতে ছাঁদে কী করছেন?”
ছায়াটা ধীরলয়ে আমার দিকে ফিরে তাকাল। সিগারেটের শেষ টান দিয়ে আগুনের অংশটুকু নিচে ফেলে দিল সে। লোকটার অবয়ব স্পষ্ট হতেই আমি পাথরের মতো জমে গেলাম।
আবির ভাই! তিনি পকেটে হাত দিয়ে আমার দিকে কয়েক পা এগিয়ে আসলেন। আচমকাই! এক উদ্ভট কথা বলে বসল।
“মেঘ, তুই কি জানিস মধ্যরাতে ছাঁদে একা আসাটা বোকামি? বিশেষ করে যখন আকাশের মন খারাপ থাকে?”
আমি আমতা আমতা করে বললাম, “আমি তো জানতাম না আপনি এখানে।”
“জানলে কি আসতি না?”
বলেই আবির ভাই আমার খুব কাছে এসে দাঁড়ালেন। তার গায়ের থেকে বৃষ্টির ঘ্রাণ আর দামী সিগারেটের একটা মিশ্র গন্ধ আসছে। তিনি বললেন, “নিচে যখন সবাই হাসাহাসি করছিল, তুই তখন টিয়া রঙের পোশাকে ভিজে সপসপে হয়ে ছিলি। ওভাবে সবার সামনে আসাটা কি ঠিক হয়েছে?”
আমি অবাক হয়ে বললাম, “কেন, কী হয়েছে?”
আবির ভাই একটা লম্বা শ্বাস ফেলে আকাশের দিকে তাকালেন। তারপর খুব নিচু স্বরে বললেন, “সবকিছু লজিক দিয়ে বোঝানো যায় না। যা, নিচে গিয়ে ঘুমা। বৃষ্টিতে ঠান্ডা লেগে গেলে তোর বাবা আবার আমাদেরকেই ধরবেন।”
আমি চলে আসতে উদ্যত হতেই তিনি আবার ডাকলেন, “মেঘ!”
