Home আবির ভাই আবির ভাই পর্ব ২০

আবির ভাই পর্ব ২০

আবির ভাই পর্ব ২০
উর্মিলা মজুমদার

বিকেলবেলা। তবে সময়টাকে ঠিক বিকেল বলা যাচ্ছে না, আবার সন্ধ্যাও নামেনি। একটা মাঝামাঝি সময়। এই সময়টাতে প্রকৃতির মনমেজাজ বোঝা বড় দায়। আকাশে মেঘ জমছে। গুরুম গুরুম শব্দ হচ্ছে। একে বলে মেঘের গর্জন, যেন নীল আকাশটা একটা বিশাল দামামা নিয়ে বসেছে। একটু পরেই আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামবে। যাকে বলে ‘বৃষ্টি আসবে আসবে’ বেলা।
​মেঘ তৈরি হয়ে নিয়েছে। আজ তার পরনে একটা টু-পিস। সাদার ওপর গোলাপি সুতোর কারুকাজ। ভারী চমৎকার হাতের কাজ। ড্রেসটা দিয়েছে আবির ভাই। আবির ভাইয়ের রুচি আছে মানতে হবে। সাদার ভেতর গোলাপির এমন মাখামাখি সচরাচর দেখা যায় না। মেঘ নিজেকে আয়নায় দেখল। তাকে কি একটু বেশি সুন্দর লাগছে? সুন্দরের একটা সমস্যা হলো, সুন্দর মানুষরা নিজের সৌন্দর্য সব সময় টের পায় না।
​মেঘের সঙ্গী হলো অরু। অরু মেয়েটা অদ্ভুত। সাধারণত মেঘ তৈরি হওয়ার আগেই সে তার দরজায় এসে দাঁড়িয়ে থাকে। একটা বাঁদর টাইপ মেয়ে, চটপটে আর অস্থির। কিন্তু আজ অরুর কোনো দেখা নেই। মেঘ একটু অবাক হলো। মেঘের দল তো আকাশে ঠিকই কোচিংয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, কিন্তু ঘরের অরু আজ স্থির কেন?
​মেঘ নিজের ঘর থেকে বের হয়ে অরুর দরজায় টোকা দিল।

“অরু, ও অরু!”
​ভেতর থেকে একটা অস্পষ্ট শব্দ এল, “হ্যাঁ, আয়।”
​মেঘ রুমের ভেতর পা দিতেই থমকে গেল। অরু বিছানায় গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে। মেঘ দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে অরুর কপালে হাত রাখল।
“কী হয়েছে তোর? এমন ভাবে শুয়ে আছিস কেন?”
​অরু খুব নিচু স্বরে কথা বলছে। যেন কথা বলতেও তার খুব কষ্ট হচ্ছে। সে বলল, “শরীরটা ভালো লাগছে না রে মেঘ। আজ তুই একাই যা।”
​মেঘের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ল। সে বলল, “আমি তো যাবই। কিন্তু তোর হঠাৎ কী হলো? বাড়ির কাউকে বলেছিস?”
​অরু মিহি গলায় উত্তর দিল, “বলেছি। ওষুধও খেয়েছি। তুই চিন্তা করিস না, চলে যা। দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
​মেঘ আর কথা বাড়াল না। অরুর গায়ের ওপর কাঁথাটা ভালো করে টেনে দিয়ে সে রুম থেকে বেরিয়ে এল। সাবধানে দরজাটা ভিড়িয়ে দিল। খান বাড়ির পার্কিং লটে মেঘের সাইকেলটা একা দাঁড়িয়ে আছে। মেঘ সাইকেলে চড়ে বসল। রাস্তাঘাট জনশূন্য হওয়ার উপক্রম। আকাশে মেঘের ঘনঘটা আরও বেড়েছে।
​মেঘ সাইকেল চালাতে চালাতে একবার নয় কয়েকবার আকাশের দিকে তাকাল। আকাশটা আজ বড্ড গম্ভীর। মেঘ লুকিয়ে রেখেছে তার বুক পকেটে। বৃষ্টির ঘ্রাণ নাকে আসছে। তাকে কোচিংয়ে যেতে হবে। একা, অনেকটা নির্জন রাস্তার বুক চিরে।

হায়ার ম্যাথমেটিক্স বা উচ্চতর গণিত। গণিত বিষয়টাকে উচ্চতর বলা হয় কেন, মেঘ তা জানে না। সম্ভবত সাধারণ মানুষের নাগালের অনেক ওপর দিয়ে এর চলাচল বলে এর নাম উচ্চতর। মেঘ মাঝের বেঞ্চটাতে একা বসে আছে। তার মন পড়ে আছে অরুর নিকট। যদিও চারপাশের দৃশ্যপট ভিন্ন।
কোচিংয়ের ক্লাসরুম এখন কপোত-কপোতীদের অভয়ারণ্য। তারা জোড়ায় জোড়ায় বসে ফিসফিস করছে। জগতের কঠিন সব জ্যামিতিক সমস্যার চেয়েও তাদের প্রেমঘটিত সমস্যাগুলোই বোধহয় বেশি জটিল।
​মেঘের ঠিক উল্টো দিকের বেঞ্চে মুগ্ধ বসেছে। ছেলেটার নাম মুগ্ধ হলেও সে নিজেকে খুব একটা মুগ্ধকর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। সে বারবার তাকাচ্ছে মেঘের দিকে। মেঘ অবশ্য সেদিকে বিন্দুমাত্র কর্ণপাত করছে না। সে একমনে খাতায় বৃত্ত আঁকছে। মানুষের মনও বোধহয় এক একটা বৃত্ত, যেখান থেকে শুরু সেখানেই শেষ। মেঘের কেয়ারলেস ভঙ্গি দেখে মুগ্ধ সম্ভবত কিছুটা দমে গেল।
​কোচিং শেষ হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল। একেই বলে প্রকৃতির লীলা। চারপাশ ঘুটঘুটে অন্ধকার করে বিদ্যুৎ চলে গেল। আইপিএসের নিভু নিভু আলোয় কোচিং সেন্টার কেমন ভৌতিক দেখাচ্ছে। ক্লাস শেষ হলো নির্ধারিত সময়েই, কিন্তু কেউ বেরোতে পারল না। বৃষ্টি মানুষকে ঘরে ফেরায়, আবার কখনও কখনও ঘর থেকে দূরে আটকে রাখে।

​মাগরিবের আজান যখন পড়ল, তখন বৃষ্টি কিছুটা শান্ত হলো। তবে আকাশটা তখনও থমথমে। সবাই যে যার মতো হুড়োহুড়ি করে বের হচ্ছে। কেউ কেউ ফোন বের করে বাড়িতে খবর দিচ্ছে, ‘ফিরতে দেরি হবে’। কিন্তু মেঘের আজ অদ্ভুত দশা। সে উত্তেজনায় তার মোবাইল ফোনটা নিতে ভুলে গেছে। ফোনহীন মানুষ এই যুগে অনেকটা অঙ্গহীন মানুষের মতো অসহায়।
​মেঘ সাইকেলটা হাতে নিয়ে মূল সড়ক পর্যন্ত হেঁটে এল। অন্ধকার রাস্তা। বৃষ্টির জলে পিচঢালা পথ আয়নার মতো চকচক করছে।
হঠাৎ মেঘের মনে হলো, তার ঠিক পেছনে কেউ একজন আসছে। মেঘ পেছনে তাকিয়ে দেখল, সেই মুগ্ধ নামের ছেলেটা। ​মেঘ মাঝরাস্তায় সাইকেল থামিয়ে দিল। মুগ্ধও থমকে দাঁড়াল।
মেঘ কঠিন গলায় বলল, “হেই মিস্টার সিনিয়র! আপনি আমাকে ফলো করছেন কেন?”
​মুগ্ধর চেহারাটা আইপিএসের সেই ম্লান আলোর মতো ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে কাঁচুমাচু করে বলল, “না মানে, এমনি। অনেক সন্ধ্যা হয়ে গেছে তো। তুমি একা যেতে পারবে? সামনের গলিটা কিন্তু মোটেও ভালো না। ভাবলাম একটু এগিয়ে দেই…”

​মেঘ সাইকেলের স্ট্যান্ডটা মাটিতে ফেলে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়াল। ঠিক যেভাবে সিনেমার বীরাঙ্গনারা দাঁড়ায়। সে প্রশ্ন ছুড়ে দিল, “আমি কি আপনার কাছে কোনো সাহায্য চেয়েছি?”
​মুগ্ধ মিনমিন করে বলল, “নাহ।”
​”চাননি যখন, তখন রাস্তা মাপুন। নিজের চরকায় তেল দিন।”
​মুগ্ধ খুব বাধ্য ছেলের মতো মাথা নিচু করল। তারপর ধীর হয়ে উল্টো পথে হাঁটা ধরল। মেঘের একদিক থেকে মায়া লাগল, আবার বিরক্তিও লাগল। মায়া এবং বিরক্তি এই দুইয়ের মিশেলে মানুষের মন খিচুড়ি তৈরি করে। ​রাস্তায় একদম বিদ্যুৎ নেই। চারপাশ অন্ধকার। দোকানপাট সব বন্ধ। মানুষজন বোধহয় এই অকাল বৃষ্টির সুযোগে জলদি ঘুমিয়ে পড়েছে।

মেঘ একা সাইকেল চালিয়ে বাড়ির দিকে এগোচ্ছে। ল্যাম্পপোস্টের আলোগুলো জ্বেলে ওঠার কোনো লক্ষণ নেই। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক বৃষ্টির শব্দের সাথে পাল্লা দিচ্ছে। ​হঠাৎ একটা বিপত্তি ঘটল। যে বিপত্তিটা ঘটার জন্য বোধহয় এই সন্ধ্যাটা সাজানো হয়েছিল। আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামলে ঢাকার রাস্তাগুলোর চরিত্র বদলে যায়। পিচঢালা পথগুলো তখন আর পথ থাকে না, হয়ে ওঠে এক একটা ক্ষ্যাপাটে নদী।
মেঘ সেই নদীর ওপর দিয়ে সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছিল। মেঘের জন্য দিনটা ভালো ছিল না। সে নজর করল সামনে দিয়ে একটা বাইক আসছে। আরোহী দুজন। তাদের চোখেমুখে যে চাউনি, তাকে ঠিক ভদ্রলোকের চাউনি বলা যায় না। একে বলা যেতে পারে ‘শিকারী চাউনি’।
​মেঘ দ্রুত নজর সরিয়ে নিল সপাং করে। কিন্তু বিপদ তো আর নজর সরালে সরে যায় না, বরং সে আরও জাঁকিয়ে বসে। বাইকটা হঠাৎ একটা কোণাকুণি মোচড় দিয়ে মেঘের সাইকেলের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল।
​মেঘ তড়াক করে ব্রেক কষল। কিন্তু লাভ হলো না। সাইকেলটা কাইত হয়ে পড়ল রাস্তার জমা পানিতে। ঢাকার রাস্তার ড্রেন আর বৃষ্টির পানি মিলেমিশে একাকার। সেই নোংরা পানি গায়ে লাগতেই মেঘের শরীরের ভেতর কাঁপুনি দিয়ে উঠল। তার বুকের ধরফরানি তখন চরমে।
​বাইক থেকে অবিন্যস্ত হাসির শব্দ ভেসে এল।

“এই এই পড়ে গেছো, সুন্দরী? কী মুশকিল!”
অন্যজন হাত বাড়িয়ে দিল, “হাতটা দাও, টেনে তুলছি।”
​হাতটা সাহায্যের নয়, বরং লালসার। মেঘ নিজেকে সরিয়ে নিল। তার অন্তর আত্মা তখন ভয়ে শুকিয়ে কাঠ। কাঁচুমাচু গলায় কোনোমতে বলল, “কী… কী চান আপনারা? এরকম করছেন কেন?”
​ছেলে দুটোর হাসি তখন আরও চওড়া হলো। একজন দাঁত বের করে বলল, “আমরা তো তোমাকে চাই সুন্দরী।”

​ভয় যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন মানুষ হয় স্থবির হয়ে যায়, নয়তো অপ্রকৃতিস্থের মতো কাজ শুরু করে। মেঘ দ্বিতীয়টি করল। সে বুঝল বখাটেদের উদ্দেশ্য ভালো নয়। সাইকেলটা ওখানেই পড়ে রইল, মেঘ দিল এক দৌড়। পেছনে বাইকের ইঞ্জিন স্টার্ট হওয়ার শব্দ আর সেই সাথে শিস।
​বৃষ্টিস্নাত অন্ধকার রাস্তা। চারপাশটা কেমন ভূতুড়ে হয়ে গেছে। সাহায্য করার মতো কেউ কোথাও নেই। মেঘ পানির মধ্য দিয়ে ছলাৎ ছলাৎ শব্দ করে দৌড়াচ্ছে আর চিৎকার করছে, “প্লিজ, হেল্প মি! কেউ আছেন?”
​কিন্তু কে শোনে কার কথা? বৃষ্টির শব্দের কাছে মেঘের কণ্ঠস্বর বড়ই ক্ষীণ। হঠাৎ পা পিছলে সে আছাড় খেল। এই নিয়ে দুবার। ঢাকার রাস্তার পিচ্ছিল কাদায় শরীরটা মাখামাখি। হাঁটু আর হাতের তালুতে তীব্র জ্বালা। নিশ্চয়ই ছিলে গেছে। মেঘ আবার উঠে দাঁড়াল। তার শরীরের সবটুকু শক্তি যখন নিভে আসছে। মেঘ শুধু চিৎকার করছে, “প্লিজ, হেল্প মি!”
বৃষ্টির নিজস্ব শব্দ আছে। সেই শব্দের অদ্ভুত এক ক্ষমতা। পৃথিবীর যাবতীয় আর্তনাদ সে খুব সহজে শুষে নিতে পারে। মেঘের গগনবিদারী চিৎকারও সেই ঝমঝম বৃষ্টির শব্দের কাছে পরাজিত হলো। নির্জন রাস্তায় কেউ কি সেই চিৎকার শুনেছে? মনে হয় না। এই শহরে কান পেতে আর্তনাদ শোনার মতো মানুষ খুব একটা পাওয়া যায় না।

​মেঘ দৌড়াচ্ছে। পানির ওপর দিয়ে দৌড়ানো সহজ কাজ নয়। সে দু-দুবার হোঁচট খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ল। পিচ্ছিল রাস্তার নোংরা পানি লাগল তার চোখে-মুখে। হাতের তালু আর হাঁটু ছিলে গিয়ে সেখান থেকে চুইয়ে রক্ত বের হচ্ছে। সেই ক্ষতস্থানে যখন বৃষ্টির লোনা পানি এসে লাগছে, মেঘের মনে হচ্ছে কেউ যেন জ্বলন্ত কয়লা চেপে ধরেছে তার শরীরে। অসহ্য সেই যন্ত্রণা! ​ঠিক তখনই শব্দের খেলাটা বদলে গেল। বৃষ্টির শব্দের ভেতর চিরে দিয়ে তীব্র এক সাইরেন বেজে উঠল।
পুলিশের গাড়ি। মেঘ যেন হঠাৎ করেই নিজের হারানো আত্মাটা খুঁজে পেল। সামনেই নীল বাতি জ্বলছে। সে দুই হাত উঁচু করে মাঝ রাস্তায় দাঁড়িয়ে পড়ল।
​পেছনের হায়েনারা থমকে দাঁড়াল। পুলিশের সাইরেন তাদের জন্য যমদূত। তারা কালবিলম্ব না করে বাইক ঘুরিয়ে উল্টো পথে চম্পট দিল। মেঘ এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বেঁচে যাওয়াটা মাঝে মাঝে বড় বেশি আকস্মিক হয়।
​সে কিছুটা পেছনে গিয়ে তার সাইকেলটা তুলে নিল। পুলিশের সামনে যাওয়া চলবে না। পুলিশের খপ্পরে পড়ার চেয়ে বড় ঝামেলার কাজ দুনিয়াতে আর নেই। তারা একবার ধরলে খবর বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছাবে। মেঘের আব্বু জানলে জল ঘোলা হতে হতে সমুদ্র হয়ে যাবে। মেঘ দ্রুত সাইকেল চালিয়ে দশ মিনিটের মাথায় বাড়ি পৌঁছাল।
​পার্কিং লটে সাইকেলটা রেখেই সে চোরের মতো নিঃশব্দে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠার চেষ্টা করছিল। তখনই পেছন থেকে বড় আম্মুর ডাক ভেসে এল,

“মেঘ?”
​মেঘের আত্মা শুকিয়ে কাঠ। মানুষের শরীরে আত্মা বলে কিছু আছে কি না এ নিয়ে তর্ক করা যেত, কিন্তু এখন মেঘের মনে হচ্ছে তার আত্মাটা শুকনো পাতার মতো খসখস করছে। সে ধীরে ধীরে পেছন ফিরল।
“হুম, বড় আম্মু?”
​বড় আম্মু তীক্ষ্ণ চোখে তাকালেন।
“তুই ফোন নিয়ে যাসনি কেন? আবির তোকে কোচিং থেকে আনতে মাত্রই বের হলো। আর তোর এই অবস্থা কেন? জামাকাপড় এত নোংরা কেন?”
​মেঘ কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে এসেছি বড় আম্মু, তাই এমন হয়েছে।”
​বড় আম্মু কিছুক্ষণ মেঘের দিকে তাকিয়ে থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বললেন, “ঠিক আছে। রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নে।”

​অনুমতি পাওয়ার পর মেঘ আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না। নিজের রুমে ঢুকে দরজাটা শক্ত করে বন্ধ করে দিল। অনেকক্ষণ ধরে সে শুধু দম নিল। ফুসফুস ভরে বাতাস নিয়ে নিজেকে শান্ত করল সে। তারপর ওয়াশরুমে গিয়ে শাওয়ার নিয়ে নিল। ছিলে যাওয়া জায়গাগুলোতে মলম লাগানোর সময় আবার সেই আগুনের হলকা টের পাওয়া গেল।
​একবার অসুস্থ অরুর রুমে গিয়ে উঁকি দিল সে। অরু ঘুমাচ্ছে। মানুষের ঘুমন্ত মুখ দেখলে জগতের সব অশান্তি ভুলে যাওয়া যায়। অরুকে দেখে মেঘের ঠিক তা-ই মনে হলো।
​নিজের রুমে ফিরে মেঘ ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখা ফোনটা হাতে নিল। ফোনের স্ক্রিনটা নীল হয়ে আছে মিসড কলের ভিড়ে। অনেকগুলো কল। আবির ভাই আর প্রেমা আপু হন্যে হয়ে তাকে খুঁজেছে। বৃষ্টির এই রাতে সবাই কাউকে না কাউকে খোঁজে, কেউ পায়, কেউ পায় না। মেঘ ফোনটা রেখে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।

পার্কিং লটে আবির ভাইয়ের সাদা মার্সেডিজ বেঞ্জ গাড়িটা নেই। জায়গাটা খাঁ খাঁ করছে। আবির ভাই নিশ্চয়ই মেঘকেই খুঁজতে বেরিয়েছেন। মানুষটা মাঝেমধ্যে এমন অদ্ভুত কাণ্ডকারখানা করেন যে মেজাজ ঠিক রাখা দায়। এখন তাকে একটা ফোন করে জানানো দরকার যে মেঘ ফিরে এসেছে, কিন্তু জানাবে কীভাবে? মেঘের কাছে তার ফোন নাম্বার নেই। মেঘ কোমড়ে হাত দিয়ে রেখেছে সিক্সথ সেন্স কাজ করছে না।
ভীষণ বিরক্ত বোধ করছে। আজকের এই বিশ্রী ঘটনা মেঘের-জীবনে আগে কখনো ঘটেনি। মেঘ রুমে ফিরে বিছানায় ধপাস করে বসে পড়ল। শরীরটা কেমন যেন ম্যাজম্যাজ করছে। প্রচ্ছদ বা ভূমিকা যাই বলা হয় না কেন, শুরুটা ভালো হয়নি। এখন একদফা লম্বা বিশ্রাম প্রয়োজন। মায়াবতী মতো কোনো এক ছায়ার মতো ঘুম যদি মেঘের চোখের পাতায় এসে নামত, বেশ হতো।
রাত দশটা বাজল। ঘড়ির কাঁটার টিকটিক শব্দে বিষণ্নতা আছে। আবির ভাইয়ের কোনো খবর নেই। মেঘ ডাইনিং টেবিলে সবার সাথে পাথরের মূর্তির মতো বসে আছে। মেঝো আব্বু গম্ভীর মুখে অনেকবার কল করলেন তাকে, কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো সাড়াশব্দ নেই। আবির ভাই তবে কী করেছেন বৃষ্টির মধ্যে? কোথায় তিনি?

আবির ভাই পর্ব ১৯

বাইরে বৃষ্টির বেগ কমার কোনো লক্ষণ নেই। ঝমঝম শব্দে প্রকৃতি আদিম উৎসবে মেতেছে। সবার খাওয়া শেষ হলো। মেঘও রাতের খাবার খেয়ে নিজের রুমে ফিরে এল। শরীরটা আজ বড্ড অবাধ্য, ক্লান্তিতে ভেঙে আসছে। জাগতিক কোনো এক ঘুম মেঘকে টেনে ধরছে। বিছানায় শুয়ে মোবাইলটা হাতে নিল। আঙুল চলছে ফেসবুকের দেয়ালে, কিন্তু মন পড়ে আছে বৃষ্টির রিনঝিন শব্দে। স্ক্রল করতে করতে কখন যে ঘুমের অতল গহ্বরে তলিয়ে গেল টেরই পেল না মেয়েটা।

আবির ভাই পর্ব ২১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here