Home আবির ভাই আবির ভাই পর্ব ২১

আবির ভাই পর্ব ২১

আবির ভাই পর্ব ২১
উর্মিলা মজুমদার

বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নয়, ঝিরঝিরে ইলশেগুঁড়ি। এই ধরনের বৃষ্টিতে একটা মন-খারাপ-করা ব্যাপার থাকে। মনে হয় আকাশটা বুঝি অনেকদিন ধরে জমানো কোনো দুঃখ খুব ধীরে ধীরে বিলিয়ে দিচ্ছে।
​পদ্মাপাড়ের এই গ্রামটায় রাত নামলে অন্ধকার হয় ঘন, যেন কেউ চারদিকে কালো মখমল বিছিয়ে দিয়েছে। ছোট আব্বু বসে আছেন তার শোবার ঘরের পুরনো কাঠের চেয়ারটায়। শরীরে একটা খয়েরি রঙের শাল জড়ানো। শালের এক কোণে একটু তামাকের গন্ধ। চোখের চশমাটা নাকের ডগায় ঝুলে আছে।
ঘরের কোণে একটা টিমটিমে আলো জ্বলছে। ​ছোট আম্মু ঘরে ঢুকলেন এক গ্লাস জল হাতে। পা টিপে টিপে এসে পাশে বসলেন। ছোট আব্বুর মুখ থমথমে। মানুষ যখন খুব বেশি চিন্তা করে, তখন তার কপালে তিনটি ভাঁজ পড়ে। ছোট আব্বুর কপালে এখন চারটি ভাঁজ। ​ছোট আম্মু জলের গ্লাসটা এগিয়ে দিয়ে মৃদু স্বরে বললেন, “একটু জল খান। আর চিন্তা করবেন না তো, সব ঠিক হয়ে যাবে।”

​ছোট আব্বু জলের গ্লাসে হাত দিলেন না। শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, “কীভাবে সব ঠিক হবে? নদী যেমন সাগরে গিয়ে মেশে, মেঘেরাও কি ঠিক তেমনি একদিন দিগন্তে মিলিয়ে যায় না?”
​ছোট আম্মু জোর দিয়ে বললেন, “মেঘ আমাদের ছেড়ে কখনো যাবে না। আপনি দেখে নিবেন। রক্ত কখনো বেইমানি করে না।”
​ছোট আব্বু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। নিচু গলায় বললেন, “যাবে না বললেই হলো? কিন্তু মেঘ কি কখনো আমাদের ক্ষমা করবে? তোমার মনে হয় ওর মনে আমাদের জন্য আর এক ফোঁটা মায়া অবশিষ্ট থাকবে?”
​ঘরটা হঠাৎ করেই একদম নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কারণ ছোট আম্মু চুপসে গেলেন। এই প্রশ্নের উত্তর কোনো অভিধানে লেখা নেই। উত্তরটা হয়তো আকাশের মেঘেরাই জানে। ​ছোট আব্বু টেবিলের ড্রয়ারটা খুললেন। যেন অনেক যত্নে রাখা কোনো পবিত্র কিছু স্পর্শ করছেন। ভেতর থেকে বের করে আনলেন মেঘের ছোটবেলার একটা সাদাকালো ছবি। গোলগাল মুখ, বড় বড় দুটো চোখ। সে চোখে রাজ্যের আদর। তিনি ছবিটা দুই হাতে বুকের কাছে চেপে ধরলেন।

​মানুষ যখন খুব একা বোধ করে, তখন সে ছবির সঙ্গেই কথা বলতে চায়। ছোট আম্মু আলতো করে ছোট আব্বুর কাঁধে হাত রাখলেন। তখন দেখা গেল, ছোট আব্বুর চশমার কাঁচ ছাপিয়ে দুই ফোঁটা জল গড়িয়ে ছবির ওপর পড়ল। সেই অশ্রু মেঘের ছোটবেলার হাসিমুখটাকে আরও একটু ঝাপসা করে দিল।​
চারদিকে ঝমঝম বৃষ্টি। মেঘ দৌড়াচ্ছে ফাঁকা রাস্তায় হায়েনার হাত থেকে বাঁচতে। সে হোচট খেয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়ল। মেঘের শরীরের সবটুকু শক্তি নিঃশেষ হয়ে এল। যখন মনে হলো আর এক কদমও সামনে যাওয়ার সাধ্য নেই, ঠিক তখনই চোখের সামনে দুটো আলোর গোলক জ্বলে উঠল। একটা গাড়ি ব্রেক কষল মেঘের ঠিক সামনে। ​মেঘ রাস্তায় পড়ে আছে। পেছনে শিকারি হায়েনার দল, আর সামনে এক দানব। মেঘ ঝাপসা চোখে গাড়ির দিকে তাকাল। তার ভ্রু কুঁচকে এল। এই গাড়ি তার চেনা। ধবধবে সাদা একটা মার্সেডিজ বেঞ্জ। গাড়ির নেমপ্লেটের ওপর রুপালি হরফে খোদাই করা— “Khan Industries”।

​মেঘের আত্মা কেঁপে উঠল। ঝিরঝিরে বৃষ্টি হচ্ছে, যেন আকাশের কান্না। গাড়ির দরজাটা হঠাৎ এক ঝটকায় খুলে গেল। ভেতর থেকে বেরিয়ে এল এক দীর্ঘদেহী যুবক। মেঘের উন্মাদ ‘আবির ভাই’। বৃষ্টির তোয়াক্কা না করে তিনি দৌড়ে এলেন। মেঘের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন কাদার ওপর। কোনো সামাজিকতা নেই, কোনো দ্বিধা নেই। তিনি দুই হাতে মেঘের ভিজে যাওয়া চিবুক দুটো শক্ত করে চেপে ধরলেন।
​”তুই? তুই এখানে কেন? তুই কি ঠিক আছিস?”
​আবিরের কণ্ঠস্বরে শাসনের চেয়ে উদ্বেগ বেশি। কথা শেষ করেই তিনি মেঘের মাথাটা সজোরে নিজের পাঁজরের সাথে চেপে ধরলেন। মেঘ মুহূর্তের জন্য পাথরের মতো জমে গেল। তার জ্ঞানত সে কখনও কোনো পুরুষের এত ঘনিষ্ঠ হয়নি। বৃষ্টির শব্দের চেয়েও তীব্রভাবে সে শুনতে পাচ্ছে আবির ভাইয়ের হৃদপিণ্ডের ধুকপুকুনি। সেই স্পন্দন যেন কোনো এক অজানা বিপদের সংকেত দিচ্ছে, আবার একই সাথে দিচ্ছে নিরাপত্তা। ​

মেঘের ঠোঁট দুটো থরথর করে কাঁপছে। ঠান্ডায় নাকি অন্য কোনো আবেগে, সে জানে না। মনের অজান্তেই মেঘের ডান হাতটা গিয়ে ঠেকল আবির ভাইয়ের ভিজে যাওয়া বুকের ওপর। আবির সাহেব তখন হিতাহিত জ্ঞান হারিয়েছেন। তিনি মেঘের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে অবিরত বলে চলেছেন, ​”বল তুই ঠিক আছিস? কোথায় লেগেছে তোর? আমাকে দেখা… এখনই আমাকে দেখা!”
​আবির ভাইয়ের স্পর্শে যে পাগলামি মিশে আছে, তা মেঘের মেরুদণ্ড বেয়ে শিহরণ নামিয়ে দিল। ঢাকার এই নির্জন জলমগ্ন রাস্তায় এক উন্মাদের বুকে মাথা রেখে মেঘের মনে হচ্ছে। ভয় আর নির্ভরতা এই দুইয়ের মাঝে সীমারেখাটা বোধহয় খুব পাতলা। ঠিক সেই মুহূর্তে বাইকটা এসে থামল। আবির ভাইয়ের ভেতরকার ঘুমন্ত দানবটা আচমকা জেগে উঠল। তিনি মেঘকে নিজের থেকে ছাড়িয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন।
তিনি উন্মাদ ভঙ্গিতে পরনের নেভি ব্লু শার্টের হাতা কনুই অব্দি গোটালেন। তারপর গলার টাইটা টেনে আলগা করলেন। যখন কোনো মানুষ খুব শান্ত হয়ে খুনের নেশায় মেতে ওঠে, তখন তাকে দেখতে সবচেয়ে ভয়াবহ লাগে। বখাটেদের একজন সাহস সঞ্চয় করে চিৎকার দিয়ে উঠল, “ঐ কে রে তুই? সুন্দরীর রোমিও নাকি?”

আবির ভাই কোনো উত্তর দিলেন না। উত্তর দেওয়ার প্রয়োজনও বোধ করলেন না। তিনি বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়লেন। চোখের পলকে দু’জনের কলার ধরে পেটে এমন এক লাথি বসালেন যে তারা কুঁকড়ে নর্দমার পানিতে পড়ে গেল। এরপর শুরু হলো পৈশাচিক তান্ডব। ছেলে দুটোর মুখে লাথি মারতে মারতে চামড়া ছিলে রক্ত বের করে ফেললেন। একজনের নাক দিয়ে ঝরঝর করে রক্ত গড়িয়ে বৃষ্টির পানির সাথে মিশে যাচ্ছে। মেঘ দূরে দাঁড়িয়ে ভয়ে কাঁপছে।
সে দেখছে এক জন মানুষ কতটা উন্মাদ হতে পারে। আবির ভাইয়ের মারের প্রতিটা শব্দ মেঘের কানে তলোয়ারের মতো বিঁধছে। তিনি যখন ছেলে দুটোকে রক্তাক্ত অবস্থায় ছেড়ে দিলেন, তারা তখন আর উঠে দাঁড়ানোর অবস্থায় নেই।

আবির ভাইয়ের গায়ের শার্ট বৃষ্টির পানিতে শরীরের সাথে লেপ্টে আছে। তিনি বড় বড় নিঃশ্বাস নিচ্ছেন। হঠাৎ তিনি কোনো কথা না বলে গটগট করে গিয়ে গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে বসলেন। ইঞ্জিনের গর্জন শোনা গেল। মেঘের বুঝতে বাকি রইল না কী হতে যাচ্ছে। আবির ভাইয়ের চোখের দৃষ্টি এখন লাল। তিনি এখন গাড়ি চালিয়ে ওদের ওপর দিয়ে চলে যাবেন। রাগের মাথায় মানুষ তো নয়, তিনি এখন আস্ত এক দানব। মেঘ আর স্থির থাকতে পারল না। সে নিজের শরীরের ব্যথার কথা ভুলে গিয়ে দৌড়ে গিয়ে গাড়ির সামনে দাঁড়াল।
“ভাইয়া, ছেড়ে দিন ওদের। প্লিজ!” মেঘ চিৎকার করে উঠল।
গাড়ির ভেতর থেকে আবির ভাইয়ের পাথরের মতো শক্ত কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “মেঘ, আমার সামনে থেকে সরে যা বলছি। সরে যা!”
“ভাইয়া, এরকমটা করবেন না। ওরা ওদের শাস্তি পেয়েছে। মেরে ফেলার মতো অপরাধ ওরা করেনি। প্লিজ ভাইয়া!”

আবির ভাই স্টিয়ারিং শক্ত করে ধরে আছেন। তাঁর রগ ফুলে উঠেছে। বৃষ্টির ঝাপটায় উইন্ডশিল্ড ভিজে একাকার, আর তার ওপাশে মেঘ দাঁড়িয়ে কাঁপছে। আবিরের চিৎকারটা যেন আকাশ চিরে আসছিল।
“মেঘ সরে যা! একদম সামনে আসবি না, সরে যা বলছি!”
​কিন্তু মেঘ সরতে পারল না। তার পা দুটো যেন মাটির গভীরে শেকড় গেড়ে বসেছে। মানুষ যখন খুব ভয় পায়, তখন তার স্নায়ুগুলো অবশ হয়ে যায়। মেঘের ঠিক তাই হলো। আবির গাড়ি থেকে নেমে সজোরে একটা লাথি মারল দরজায়। মেঘ উন্মাদের মতো দৌড়ে গিয়ে আবিরের সামনে দাঁড়াল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “আবির ভাই, প্লিজ চলুন। আমরা চলে যাই। এই নরকের মধ্যে আর এক মুহূর্ত না।”
​আবিরের ভেতরের জেদি মানুষটা জেগে উঠেছে। সে সহজে দমবার পাত্র নয়। পকেট থেকে মোবাইল ফোনটা বের করে কাকে যেন ফোন করল। হয়তো পুলিশ, হয়তো অন্য কেউ। রাস্তার ওপর কয়েকজন বখাটে যুবক কুঁকড়ে পড়ে আছে, যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে তারা। আবির নিস্পৃহ মুখে মেঘের হাত ধরে টেনে নিয়ে গাড়িতে বসিয়ে দিল। ​মেঘের চোখে লাল রঙ। চর্তুদিকে রক্ত।

তার নিজের ছোট ছোট হাতের তালুতে রক্ত, পায়ে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ, এমনকি আবিরের শার্টটাও ভিজে জবজবে হয়ে গেছে লাল রঙে। মেঘ আর সইতে পারল না। বুকের গভীর থেকে একটা চিৎকার বেরিয়ে এল তার। ​ঠিক সেই মুহূর্তেই চিৎকারটা মাঝপথে থেমে গেল। মেঘের ঘুম ভেঙে গেল।
​রুমের ভেতর ঘুটঘুটে অন্ধকার। মেঘের হৃৎপিণ্ডটা বুকের ভেতর ড্রাম পেটাচ্ছে। কপালে আর ঘাড়ের কাছে ঘামের বিন্দু। সে তড়িঘড়ি করে পাশের টেবিল থেকে জলের গ্লাসটা নিল। ঢকঢক করে জল খেল সে। জলটা গলায় নামতেই শরীরের ভেতরের আগুনটা একটু স্তিমিত হলো।
​”স্বপ্ন! ধ্যাত, এতোক্ষণ তবে স্বপ্ন দেখছিলাম?”

​মাথায় হাত দিয়ে মেঘ কিছুক্ষণ বসে রইল। আজ সন্ধ্যায় কোচিং থেকে ফেরার পথে যে বিভীষিকা ঘটেছিল, মস্তিষ্ক হয়তো সেটাকেই প্রসেস করতে গিয়ে এই জগাখিচুড়ি পাকিয়ে ফেলেছে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো আবির ভাই! স্বপ্নে আবির ভাই কেন আসবে? বাস্তবে তো আবির ভাই তাকে বাঁচাতে আসেনি। যে মানুষটা বাস্তবে ছিল না, সে কেন স্বপ্নে এসে বীরের মতো বখাটেদের মারধর করল? কিছু একটা গন্ডগোল আছে না তো?
​মেঘ নিজের মাথায় একটা আলতো টোকা দিল। অবান্তর চিন্তা দূর করার এটা তার পুরনো অভ্যাস। বিড়বিড় করে নিজেকেই শোনাল,
“মেঘ, তুই একটা গাধা। স্বপ্ন মানেই তো অবাস্তব। স্বপ্নের কোনো ব্যাকরণ নেই, কোনো ব্যাখ্যা নেই। এটা নিছক একটা নিউরনের খেলা।”
​কিন্তু মনের এক কোণে একটা কাঁটা খচখচ করছে। আবির ভাই কি বাড়ি ফিরেছেন? রাতের খাবার টেবিলে তার চেয়ারটা খালি ছিল। মেঘ ফোনটা হাতে নিয়ে দেখল ছোট আব্বু অনেকবার ফোন করেছেন। মিসড কলের সংখ্যাটা অশুভ সংকেতের মতো স্ক্রিনে ভেসে আছে। এত রাতে ফোন করা মানেই কোনো দুঃসংবাদ অথবা কোনো গভীর উৎকণ্ঠা।

এই গভীর রাতে ফিরতি ফোন করার সাহস মেঘের নেই। নিস্তব্ধতায় ফোনের ওপাশ থেকে যদি কান্নার শব্দ আসে, তবে সেই শব্দ সহ্য করার ক্ষমতা তার এই মুহূর্তে নেই। মেঘ দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকাল। রাত একটা বাজে। এই গভীর রাতে সারা বাড়ি নিঝুম হয়ে থাকার কথা। মেঘের ভেতরটা কু গাইছে। ​ভয় আর কৌতূহল এই দুইয়ের লড়াইতে সবসময় কৌতূহলই জেতে। মেঘ বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। আলমারি থেকে ওড়নাটা টেনে নিয়ে মাথায় জড়াল। তার পা দুটো অবাধ্যের মতো আবির ভাইয়ের রুমের দিকে এগোতে লাগল। ​মেঘের বুকের ভেতর একটা ড্রাম বাজছে ঢিপ ঢিপ ঢিপ। ​সে আবির ভাইয়ের ঘরের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দরজায় হাত রাখতেই তার বিস্ময়ের সীমা রইল না। দরজা আগে থেকেই আধখোলা। রহস্য উপন্যাসে ঠিক যেমনটা হয়। দরজা খুলে ভেতরের রহস্য হাতছানি দেয়। মেঘ সাহস সঞ্চয় করে ঘরে ঢুকল। কিন্তু ঘর খাঁ খাঁ করছে। আবির ভাই নেই। বিছানার চাদর টানটান, যেন কেউ সেখানে বসেনিও।
​তবে কি আবির ভাই এখনো বাড়ি ফেরেননি? মানুষটা গেল কোথায়?

​মেঘ রুম থেকে বেরিয়ে নিঃশব্দে দরজাটা টেনে দিল। তার দুচোখ থেকে ঘুম কর্পূরের মতো উড়ে গেছে। বৃষ্টির পর রাতটা এখন স্নিগ্ধ, অনেকটা ভেজা মাটির গন্ধ মাখা। মনটা একটু শান্ত করার জন্য সে ছাদের দিকে পা বাড়াল। সন্ধ্যায় হাঁটুতে যে চোট পেয়েছিল, সেখানে একটা চিনচিনে ব্যথা জানান দিচ্ছে। সেই ব্যথাকে সঙ্গী করেই সে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠতে লাগল।
​ছাদের দরজাটা ঠেলে বাইরে আসতেই এক ঝলক হিমেল হাওয়া মেঘকে অভ্যর্থনা জানাল। কী আশ্চর্য শীতল প্রকৃতি! আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেছে, কোথাও কোনো মেঘ নেই। তবে পৃথিবীতে এক বিষণ্ণ ভেজা ভাব লেগে আছে।
​ঠিক তখনি মেঘের ভ্রু কুঁচকে গেল। ছাদের কার্নিশ ঘেঁষে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। অন্ধকার বলে চেহারা স্পষ্ট নয়, শুধু একটি দীর্ঘ অবয়ব দেখা যাচ্ছে। লোকটা বাইরের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে, আঙুলের ফাঁকে জ্বলন্ত একটা সিগারেট। আগুনের লাল বিন্দুটা অন্ধকারে জোনাকির মতো জ্বলছে আর নিভছে।
​মেঘ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল। লোকটা নিশ্চয়ই আবির ভাই। কারণ এই বাড়িতে জোয়ান বলতে সাদিফ আর আবির।

সাদিফ ভাই এত লম্বা নয়। এই দীর্ঘদেহী মানুষটি নিশ্চিতভাবেই আবির ভাই। ​মেঘের ভেতরটা হঠাৎ হিম হয়ে গেল। তার মানে আবির ভাই বাড়িতেই ছিলেন। কিন্তু মহাবিপদ! এই ঘোর রাতে মেঘকে ছাদে দেখলে আবির ভাই তুলকালাম কাণ্ড বাধিয়ে দেবেন। আবির ভাইয়ের মেজাজ আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাসের মতো। কখন যে ঝোড়ো হাওয়া বইবে কেউ জানে না। ​মেঘ একটা শুকনো ঢোক গিলল। তার এখন উচিত নিঃশব্দে প্রস্থান করা। বিড়ালের মতো পা ফেলে পেছনের দিকে সরতে চাইল সে। কিন্তু মানুষের কপাল খারাপ হলে যা হয় অসাবধানতায় একটি শুকনো পাতার মচমচে শব্দ হলো। পেছন ফিরে সিঁড়িতে পা রাখার ঠিক আগের মুহূর্তে শব্দটা কানে এল। খুব নিচু স্বরে বলা একটি শব্দ, কিন্তু মেঘের মনে হলো যেন কানের কাছে কেউ হঠাৎ বজ্রপাত ঘটাল।

​”মেঘ।”
​মেঘের হৃদপিণ্ডটা একবার প্রবল বেগে লাফিয়ে উঠে থমকে গেল। সে কাচুমাচু হয়ে পেছন ফিরল। আবির ভাই কার্নিশ ছেড়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর চোখের দৃষ্টিটা অদ্ভুত। মেঘ হিমু সমগ্রের সেই পরিচিত রহস্যময় মানুষদের কথা ভাবল, যাদের চোখে তাকালে বোঝা যায় না ভেতরে কী চলছে আনন্দ নাকি গভীর কোনো কষ্ট। ​মেঘ বিড়বিড় করে জবাব দিল, “হ্যাঁ… জি আবির ভাই?”
​আবির ভাই এগিয়ে এলেন। তিনি নিচু গলায় বললেন, “ঘুমাস নি এখনো?”
​মেঘ চমকে উঠল। এই কণ্ঠস্বর তো আবির ভাইয়ের নয়! আবির ভাই মানেই তো শাসন, ধমক আর একরাশ বিরক্তি। কিন্তু এই কণ্ঠস্বর বরফশীতল। মেঘ আমতা আমতা করে বলল, “ঘুমিয়েছিলাম। কিন্তু হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে গেল। তাই ভাবলাম একটু ছাদ থেকে ঘুরে আসি।”
​আবির ভাই আরও কাছে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর গায়ের থেকে তামাকের কড়া গন্ধ আসছে। নিশ্চয়ই প্যাকেটকে প্যাকেট সিগারেট ধ্বংস করেছেন আজ। মেঘের তামাকের গন্ধে মাথা ঘোরে, সে অবজ্ঞাভরে নাক সিটকাল। কিন্তু আবির ভাই সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করলেন না। তিনি হুট করে এক অবান্তর প্রশ্ন করে বসলেন।
​ “ঘুরতে যাবি?”

​মেঘ আকাশ থেকে পড়ল। ভুরু কুঁচকে বলল, “এত রাতে? এখন তো একটা বাজে!”
​আবির ভাই নিস্পৃহ ভঙ্গিতে বললেন,”হ্যাঁ, একটা বাজে। তাতে কোনো সমস্যা?”
​মেঘ ইতস্তত করে বলল, “না মানে, বাড়িতে যদি সবাই জানতে পারে? বিষয় কেমন যেন দেখাবে না?”
​আবির ভাই এবার মেঘের খুব কাছে এসে থামলেন। তাঁর চোখ দুটো মেঘের চোখের দিকে নিবদ্ধ করে তিনি গম্ভীর গলায় বললেন,”শোন মেঘ, তুই শুধু আমি আবির ছাড়া অন্য কাউকে নিয়ে কোনোদিন চিন্তা করবি না। দুনিয়ায় আর কে আছে, কে কী ভাবল। এসব তোর দেখার বিষয় না।”
​মেঘ বিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে রইল। তার কণ্ঠস্বর আটকে গেছে। কোনোমতে বলল, “ক… কী বললেন?”
​আবির ভাই তাঁর কথার পুনরাবৃত্তি করলেন না, বরং আরও প্রগাঢ় স্বরে বললেন, “আমি আবির ছাড়া মেঘের জীবনে আর দ্বিতীয় কোনো কিছু থাকবে না। মনে থাকবে?”

আবির ভাই পর্ব ২০

​মেঘের মনে হলো চারপাশের বাতাস হঠাৎ স্থির হয়ে গেছে। সে আবির ভাইয়ের কথার আগামাথা কিছুই বুঝতে পারছে না। মানুষটা কি ঘোরের মধ্যে কথা বলছে? নাকি বিষণ্ণতা তাকে গ্রাস করেছে? মেঘ বুঝতে পারল, এই মুহূর্তে আবির ভাইয়ের যুক্তির চেয়ে আবেগ অনেক বেশি শক্তিশালী। তাঁর কন্ট্রোলে তিনি নেই।
​মেঘ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হ্যা-তে হ্যা মেলালো। বলল, “ঠিক আছে, চলুন।”

আবির ভাই পর্ব ২২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here