আবির ভাই পর্ব ২২
উর্মিলা মজুমদার
মেঘের পরনে খুব সাধারণ একটা সাদা-কালো থ্রি-পিস। সাধারণ পোশাকে সাধারণ মেয়েদেরও কখনো কখনো খুব রহস্যময়ী লাগে। মেঘকে এখন ঠিক তেমনই লাগছে। বাইরে হিমহিম হাওয়া বইছে। শীত যে দরজায় কড়া নাড়ছে, সেটা এই হাওয়ার ঝাপটাতেই বোঝা যায়। প্রকৃতি এখন একটা থমথমে অপেক্ষায় আছে।
আবির ভাই ড্রাইভিং সিটে বসে আছেন। পরনে একটা কালো রঙের শর্ট টি-শার্ট। মানুষটার মেজাজ বোঝা পৃথিবীর কঠিনতম কাজগুলোর একটা। তিনি পার্কিং লট থেকে নিজের প্রিয় সাদা রঙের মার্সেডিজ বেঞ্জটা বের করলেন। মেঘ পাশে বসে আছে গুটিসুটি মেরে।
তাড়াহুড়োয় নিজের মোবাইল ফোনটাও সঙ্গে আনতে পারেনি। বৃষ্টির ছাঁট আসা ফাঁকা রাস্তায় গাড়িটা খুব মন্থর গতিতে চলছে। আবির ভাইয়ের মুখভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে তিনি গভীর কোনো ঘোরের মধ্যে আছেন।
হঠাৎই আকাশ ভেঙে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি নামল। উইন্ডশিল্ড ভিজে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে, আর ওয়াইপার দিয়ে তিনি বারবার সেটা পরিষ্কার করছেন। হঠাৎই মেঘের নজর পড়ল আবির ভাইয়ের বাম হাতের দিকে। স্টিয়ারিংটা তিনি খুব শক্ত করে চেপে ধরে আছেন। হাতের ওপরের চামড়াটা থেঁতলে নীল হয়ে আছে। ঠিক যেন কারো শক্ত চোয়ালে অনেকবার সজোরে ঘুষি মারার পর মানুষের হাতের অবস্থা যা হয়।
মেঘের চোখ কপালে উঠল। সে মনে মনে ভাবল আবির ভাই আবার কাকে মারল? আজ মানুষটা এমন অদ্ভুত শান্ত কেন? মেঘের হঠাৎ একটা কথা মনে হয়ে নিজের গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। আজ রাতে সে একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছিল।
সেই স্বপ্নটার সাথে কি কোনোভাবে বাস্তবের মিল ঘটে যাচ্ছে? আবির ভাই কোনোভাবে ঐ বখাটে ছেলেদের পেটান নি তো। মেঘ নিজের মাথায় একটা আলতো টোকা দিল। অবাস্তব কুসংস্কার মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলার এই এক অদ্ভুত ভঙ্গি।
পুরোটা রাস্তা আবির ভাই একটি শব্দও করলেন না। মেঘ ঠোঁট উল্টে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইল। বৃষ্টির দিনে কে আবার ঘুরতে বের হয়? কিন্তু মন বলছে, আবির ভাইয়ের সাথে এই ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে একটা লং ড্রাইভ মন্দ হয় না। কিংবা যদি বৃষ্টিতে ভেজা যেত!
হঠাৎ ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে গাড়িটা ব্রেক কষল। সামনেই রমনা পার্ক।
মেঘ এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করল না। সুযোগ যখন এসেছে, তখন তাকে হেলায় হারানো ঠিক হবে না। গাড়ি থেকে নেমেই সে দিল এক দৌড়। সোজা রমনার সেই বিখ্যাত বটমূলে। ল্যাম্প পোস্টের ঘোলাটে হলদে আলো। বৃষ্টির শব্দ মেঘকে ডাকছে। সে দুহাত ছড়িয়ে দিয়ে খুশিতে চিৎকার করে উঠল। হিমু ভাই হলে হয়তো এই অবস্থায় একটা গান গেয়ে উঠত, কিন্তু মেঘ গান জানে না, সে শুধু জানে এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবটুকু আনন্দ তার বুকের ভেতর জমিয়ে নিতে।
মেঘ এখন আর সাধারণ কোনো মেয়ে নেই, সে এখন জলবালিকা। দুই হাত মেলে দিয়ে সে আকাশ থেকে ঝরে পড়া প্রতিটি বৃষ্টির বিন্দুকে আলিঙ্গন করছে। ঘোরের মধ্যে সে দৌড়াচ্ছে। মানুষের জীবনে সুখের মুহূর্তগুলো খুব সংক্ষিপ্ত হয়, কিন্তু সেই সংক্ষিপ্ত মুহূর্তই কখনো কখনো অনন্তকাল হয়ে ধরা দেয়। মেঘ বৃষ্টিতে ভিজছে আর শব্দ করে হাসছে। সেই হাসির শব্দে রমনার গাছপালাও যেন একটু নড়েচড়ে বসল না?
আবির ভাই গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। বুকের ওপর দুই হাত ভাঁজ করা। তাঁর চোখের দৃষ্টি মেঘের ওপর নিবদ্ধ। ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়েছে যাকে বলে ‘মুষলধারে বৃষ্টি’। এই বৃষ্টিতে চারপাশ উথাল-পাতাল হয়ে যায়, দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে। কিন্তু আবির ভাইয়ের ভেতরের উথাল-পাতাল খবর কি কেউ জানে? বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা যেমন মাটিকে স্পর্শ করার জন্য ব্যাকুল হয়ে থাকে, আবির ভাইয়ের অস্থির মনটাও হয়তো ঠিক তেমনি কোনো আশ্রয়ের খোঁজে হাহাকার করছে। অথচ বাইরে তিনি পাথরের মূর্তির মতো শান্ত।
মেঘ হঠাৎ বৃষ্টির ভেতর দিয়ে দৌড়ে এল। বৃষ্টির তোড়ে তার চোখ মুখ প্রায় বোজা। সে আবির ভাইয়ের হাত জাপটে ধরল। চপল গলায় বলল, “চলুন না আবির ভাই, আজ সব নিয়ম ভেঙে দুজনে মিলে ভিজি!”
আবির ভাই কি মেঘের আবদার ফেলতে পারেন? যদিও তিনি ততক্ষণে ভিজে একাকার। মেঘ তার ছোট ছোট দুই হাত দিয়ে আবির ভাইকে টানছে। আবির ভাইয়ের বিশাল দেহটা এক চুল নড়ানোর ক্ষমতা মেঘের নেই, অথচ মেঘের ধারণা সে বিশাল এক পাহাড়কে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আবির ভাই শব্দহীন হাসলেন। সে এক বিচিত্র হাসি, যা কেবল খুব কাছের মানুষরাই চিনতে পারে।
হঠাৎ কড়কড় শব্দে আকাশ চিরে বিদ্যুৎ চমকে উঠল। সেই আলোয় চারপাশটা এক মুহূর্তের জন্য সাদা হয়ে গেল। মেঘ চমকে গিয়ে ভয়ে আবির ভাইকে শক্ত করে খামচে ধরল। ঠিক সেই মুহূর্তেই আবির ভাইয়ের ভেতরটা যেন পাল্টে গেল। তিনি এক ঘোরের মধ্যে চলে গেলেন। যে ঘোরে মানুষ ভুলে যায় পৃথিবীটা নশ্বর।
তিনি মেঘের কোমরে দুই হাত রাখলেন।
ল্যাম্পপোস্টের সেই ম্লান হলদে আলো আর বৃষ্টির আবছা পর্দার আড়ালে দুজন দুজনা মুখোমুখি। আবির ভাই মেঘের একদম ঘনিষ্ঠ হয়ে এসেছেন। মেঘের ঠোঁট কাঁপছে শীতে নাকি আশঙ্কায়, সে জানে না। তার সমস্ত শরীর অবশ হয়ে আসছে। আবির ভাইকে সরিয়ে দেওয়ার মতো কোনো শক্তি তার ভেতরে অবশিষ্ট নেই। বরং এক আকর্ষণে সে স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
আবির ভাই মেঘের ঠোঁটের খুব কাছাকাছি মুখ নামিয়ে আনলেন। মেঘ আবেশে আর ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল। সে ভাবল, হয়তো এখনই কোনো নিষিদ্ধ জাদুমন্ত্র তাকে গ্রাস করবে। কিন্তু না, তাকে ভুল প্রমাণ করে দিয়ে আবির ভাই পরম মমতায় মেঘের কপালে এক দীর্ঘ চুমু এঁকে দিলেন।
মেঘের সারা শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। সে আবির ভাইয়ের ভেজা টি-শার্টটা খামচে ধরল। চোখ খোলার সাহস পাচ্ছে না, শরীর থরথর করে কাঁপছে। আবির ভাই খুব আলতো করে মেঘের কপালে লেপ্টে থাকা ভেজা চুলগুলো কানের পেছনে গুঁজে দিলেন। এই স্পর্শে কামনার চেয়ে মায়া ছিল বেশি।
মেঘ অতি কষ্টে চোখ মেলল। আবির ভাইয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে সে স্তব্ধ হয়ে গেল। যে আবির ভাইকে সে চেনে ‘উন্মাদ’ হিসেবে, আজ সেই মানুষটা কোন জাদুবলে এমন স্নিগ্ধ প্রেমিকের রূপ ধারণ করল? মেঘের বোধোদয় হলো না। এই রহস্যের সমাধান কি লজিক হতে পারে? হয়তো পারত, হয়তো না। প্রকৃতি তখন বৃষ্টির ছন্দে কেবল বলে যাচ্ছিল। সব রহস্যের সমাধান পেতে নেই। কিছু রহস্য অমীমাংসিত থাকাই সুন্দর।
শ্রাবণ মাসের বৃষ্টি। আকাশ থেকে ঝমঝমিয়ে জল নামছে। মেঘ কাঁপাকাঁপা গলায় ডাকল, “আবির ভাই?”
আবিরের ঠোঁটে এক চিলতে হাসি লেগে রইল। যে হাসিতে কোনো লুকোছাপা নেই। সে মৃদু স্বরে বলল, “হুম, বল। শুনছি তো।”
”আমার খুব অস্বস্তি হচ্ছে।”
আবির বৃষ্টির শব্দের ওপর দিয়ে শান্ত গলায় বলল, “তোর সবটুকু অস্বস্তি আমার নামে করে দে। আজ থেকে ওগুলো আমার।”
মেঘ খানিকটা থমকে গেল। ভিজে একাকার, তবু সেই আবছা দৃষ্টিতে আবিরকে দেখার চেষ্টা করল সে। অবাক হয়ে বলল, “এই আবির ভাইকে তো আমি চিনি না। আপনি তো এমন ছিলেন না। হুট করে কী হলো আপনার?”
আবির একটু হাসল। মানুষ যখন সত্যি কথা বলে, তখন তাকে দেখতে খানিকটা অন্যরকম লাগে। সে বলল, “আমার ভেতরে একটা ভয় ছিল রে মেঘ। সেই ভয়টাকে তুই আজ টেনে বাইরে নিয়ে এসেছিস।”
মেঘের মাথায় কিছুই ঢুকল না। যুক্তিবিদ্যায় এই কথার কোনো মানে হয় না। হঠাৎ আবির মেঘকে আলতো করে নিজের দিকে ঘুরিয়ে দিল। মেঘের পিঠ ঠেকে গেল আবিরের প্রশস্ত বুকে। উন্মাদ হওয়ার পথে এ এক বিরাট বাধা, অথচ মায়াটা বড় অসহ্য। আবির ভাই বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে গুণগুণিয়ে উঠল–
বৃষ্টি ভেজা রাতে
আমি তোমায় নিয়ে যাবো
যতগুলো কথা হয় নি বলা
তোমাকেই বলে দিব
স্বপ্নীল এই পৃথিবীকে আজ তোমার রঙে রাঙাবো…”
মেঘ প্রতিটি শব্দ নিজের অস্তিত্ব দিয়ে শুনল। তার মনে হলো, পৃথিবীতে বোধহয় এই প্রথমবার সে নিজেকে ‘প্রেমিকা’ বলে ভাবতে শুরু করেছে। আর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা কোনো সাধারণ মানুষ নয় এক জনমজন্মান্তরের প্রেমিক।
রমনা পার্কে বৃষ্টি আর থামার নাম নেই। দুজনেই কাকভেজা। শরীরের উত্তাপ আর বৃষ্টি মিলেমিশে একাকার। জ্বরের ভয় তাদের নেই, কারণ আজ তারা নিয়ম ভাঙার খেলায় মেতেছে। অনেকটা সময় পর আবির ভাই ডাকল, “মেঘ।”
মেঘ মাথা নিচু করে বলল, “হুমমম।”
”চল, এবার বাড়ি যেতে হবে। রাত অনেক হলো।”
”আরেকটু থাকি না আবির ভাই? বৃষ্টিটা বড্ড মায়াবী।”
”নাহ, একদম নয়।”
আবির একরকম জেদ করেই মেঘকে গাড়িতে তুলল। পেছনের সিট থেকে শুকনো তোয়ালে দিয়ে খুব যত্ন করে মেঘের চুল মুছে দিল সে। সকালে যে ব্লেজারটা আবির ভাই সীটে ফেলে রেখেছিল, সেটা এখন পরম মমতায় মেঘের গায়ে জড়িয়ে দিল। মেঘের সারা শরীর শান্ত হয়ে এল। গভীর প্রশান্তি তাকে ঘিরে ধরল।
গাড়ি চলতে শুরু করেছে। জানালার বাইরে বৃষ্টির ঝাপটা। মেঘের দুচোখে ঘুমের আবেশ নেমে এল। কখন যে তার মাথাটা আবির ভাইয়ের কাঁধে হেলে পড়ল, সে নিজেও টের পেল না। আবির ভাই গাড়ি ড্রাইভ করছে, আর লুকিং গ্লাসে বারবার দেখছে সেই আদুরে মুখটা। কত বছর পর যে এই পরম প্রাপ্তি!
গাড়ির সাউন্ড সিস্টেমে তখন হালকা সুরে গান বাজছে। আবিরের ঠোঁট দুটোও নড়ে উঠল সেই সুরের সাথে তাল মিলিয়ে—
”মন রাখো পাঁজরে, সীমাহীন আদরে
চোখ রাখো গভীরে, ভালোবাসার নজরে
যতনে রাখিবো, জড়িয়ে থাকিব… সারাজনম ধরে।”
শুক্রবার। ছুটির দিন মানেই অলসতার দিন। প্রকৃতির নিয়ম মেনেই খান বাড়ির সবাই আজ বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। মানুষ যখন গভীর ঘুমে থাকে, তখন তার চেহারায় এক ধরণের শিশুতোষ সারল্য ফুটে ওঠে। কিন্তু চঞ্চল অরুর ডিকশনারিতে ‘অলসতা’ বলে কোনো শব্দ নেই। সে ঘুমকে রীতিমতো ফাঁকি দিয়ে বাগানে হাজির হয়েছে। শুধু হাজির হওয়া নয়, কোমরে দুই হাত দিয়ে মালি কাকার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রীতিমতো হুকুম জারি করছে।
”ও মালি কাকা, আপনি সরুন তো। আজ গাছে পানি আমি দেব।”
মালি কাকা আমতা আমতা করে বললেন, “না না মামুনি, আপনে কষ্ট করবেন ক্যা? আমিই পানি দিতাছি। বড় সাহেব দেখলে আমার চাকরি থাকব না, বকাঝকা করব।”
অরু ভ্রু কুঁচকে বলল, “উহুম! কেউ কিচ্ছু বলবে না। আপনি যদি এখন না যান, তবে আমি আপনাকে বকা দেব। কোনটা ভালো হবে শুনি?”
বেচারা মালি কাকা। অরুর জেদের সামনে হিমালয় পর্বতও হয়তো নুয়ে পড়ত। তিনি অনিচ্ছাসত্ত্বেও পানির পাইপটা অরুর হাতে দিয়ে বিদায় নিলেন। অরু এখন বাগানের একচ্ছত্র অধিপতি। গত রাতে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে, ঘাসগুলো এখনো ভেজা। মাটির সোঁদা গন্ধ। অরু গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে পাইপের মাথা আঙুল দিয়ে চেপে ধরছে, আর অমনি ঝর্ণার মতো পানি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। এর মাঝে সে হুট করে একটা ছোট কাঠ গোলাপ ছিঁড়ে কানের পেছনে গুঁজে নিল। আয়না নেই, কিন্তু ফুলের স্পর্শেই সে বুঝতে পারছে তাকে মন্দ লাগছে না।
বিপত্তিটা ঘটল খান বাংলোর গেটের কাছে। বাড়িটা কাগজে-কলমে ‘খান বাংলো’ হলেও পাড়ার মানুষের কাছে স্রেফ ‘খান বাড়ি’। অরু মনের সুখে পাইপ ঘুরিয়ে দূরে পানি ছুড়ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে গেট দিয়ে এক যুবক ভেতরে ঢুকতে যাচ্ছিল। অরুর লক্ষ্যভ্রষ্ট পানির ধারা সরাসরি গিয়ে পড়ল সেই আগন্তুকের গায়ে। একেবারে মাথা থেকে পা পর্যন্ত ভিজে একাকার।
ছেলেটা থমকে দাঁড়িয়ে গেল। পকেট থেকে রুমাল বের করে চুল মুছতে মুছতে অত্যন্ত বিরক্তির সাথে বলে উঠল, “হোয়াট রাবিশ!”
অরুর মেজাজ মুহূর্তেই সপ্তমে চড়ল। কেউ তাকে ‘রাবিশ’ বলবে, আর সে তা হজম করবে? অসম্ভব! পানির পাইপটা ধপাস করে ফেলে দিয়ে সে যুদ্ধংদেহী ভঙ্গিতে এগিয়ে গেল। ঝগড়া করার জন্য যে বিশেষ ধরণের মানসিক প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়, অরুর তা জন্মগতভাবেই আছে।
সে কপালে ভাঁজ ফেলে বলল, “কী বললেন? আবার বলুন তো!”
অরু তার দুই চোখ কপালে তুলে চিৎকার করে উঠল, “এই যে মশাই, এই! রাবিশ কাকে বললেন আপনি?”
ছেলেটা শান্ত ভঙ্গিতে চশমাটা নাকের ওপর ঠিকঠাক বসিয়ে নিল। তারপর চারপাশটা একবার নিরীক্ষণ করে অত্যন্ত নিস্পৃহ গলায় বলল, “আশেপাশে আপনি ছাড়া তো আর কোনো বাঁদর দেখতে পাচ্ছি না। কাজেই সম্বোধনটা যে আপনার উদ্দেশ্যেই করা হয়েছে, এটা বুঝতে কি খুব বেশি কষ্ট হচ্ছে?”
অরুর চোখ এবার সরু হয়ে এলো। রাগে তার কান গরম হয়ে যাচ্ছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “আপনি কি আমাকে ইন্ডিকেট করলেন? আপনি বলতে চাইছেন আমি বাঁদর?”
ছেলেটা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আকাশের দিকে তাকালো। যেন সে খুব জটিল কোনো দার্শনিক সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। তারপর বলল, “মাথায় যদি সামান্যতম ঘিলু থাকে, তবে সেটা বুঝে নেওয়ার কথা। নিশ্বাসে নিশ্বাসে এত প্রশ্ন জিজ্ঞেস করার কোনো মানে হয় না। এতে শরীরের ক্যালরি নষ্ট হয়।”
অরু পা ঠুকে বলল, “আপনার চেয়ে অনেক বেশি বুদ্ধিমতী আমি, বুঝেছেন?”
”হ্যাঁ, আপনার বুদ্ধির নমুনা তো দেখতেই পাচ্ছি। যাকে বলে একদম উপচে পড়া বুদ্ধি! তবে আপনার মধ্যে যে কমন ম্যানারস বলে কিছু নেই, সেটা এখন দিবালোকের মতো পরিষ্কার।”
অরু পাল্টা আক্রমণ করল, “ম্যানারস নেই! সেটা আপনি কীভাবে বুঝলেন?”
ছেলেটা ঘড়ির দিকে তাকালো। বিরক্তির চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে সে বলল, “এতসব প্রশ্নের জবাব দেওয়ার মতো অফুরন্ত সময় আমার হাতে নেই। আবির কি বাড়িতে আছে?”
আবির ভাইয়ের নাম শুনেই অরুর বেলুন থেকে যেন সব হাওয়া বেরিয়ে গেল। সে চট করে চুপসে গিয়ে মুখটাকে তেঁতো করলার মতো করে বলল, “হ্যাঁ, বাড়িতেই আছে। ঐ যে দোতলায়।”
ছেলেটা আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করল না। গটগট করে বাড়ির ভেতরে হাঁটতে শুরু করল। অরু পেছন থেকে তার বাঁদর স্বভাবটা সামলাতে পারল না। কিছুটা নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে সে খেঁকিয়ে উঠল, “খুব তো ম্যানারসের কথা বলছিলেন! ভদ্রতা থাকলে অন্তত একটা ‘ধন্যবাদ’ দিয়ে যেতেন।”
ছেলেটা চট করে থামল। পেছন ফিরে সোজাসুজি অরুর চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় প্রশ্ন করল, “আপনি কি আমাকে ‘সরি’ বলেছিলেন?”
আবির ভাই পর্ব ২১
অরু ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। তার মুখে কোনো কথা সরল না। মনে মনে ভাবল—বাবা গো! লোকটা তো দেখি মেয়েমানুষের মতো ঝগড়া করতে পারে! কী সাঙ্ঘাতিক পালটা যুক্তি!
ততক্ষণে পড়ে থাকা পাইপ থেকে উপচে পড়া পানিতে গেটের সামনের দিকটা ছোটখাটো একটা পুকুর হয়ে গেছে। মালি কাকা হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ে এলেন। দৃশ্য দেখে তার মাথায় হাত। অরুও পরিস্থিতি বেগতিক দেখে প্রমাদ গুনল। বড় আব্বু যদি এই কাদা আর পানির নহর দেখেন, তবে আজ কপালে অশেষ দুর্গতি আছে।
মালি কাকার ওপর সমস্ত দায়দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে চঞ্চল অরু এক দৌড়ে অকুস্থল থেকে পলায়ন করল। বিপদ দেখে কেটে পড়াই বুদ্ধিমানের কিংবা বুদ্ধিমতীর কাজ এটা বাঁদর অরু প্রমাণ করলো।
