Home আবির ভাই আবির ভাই পর্ব ৩৩

আবির ভাই পর্ব ৩৩

আবির ভাই পর্ব ৩৩
উর্মিলা মজুমদার

রাত। বৃষ্টি পড়ছিল কিন্তু ঢাকা শহরের বৃষ্টি না। সিলেটের বৃষ্টি। টিনের চালে যখন বৃষ্টি পড়ে, তখন মনে হয় কেউ একটানা তবলা বাজাচ্ছে। বিয়েবাড়ির সানাই থেমে গেছে অনেকক্ষণ। আবির ভাইকে সেলে ঢোকানো হলো, সে কিছু বলল না। হিমুরা যেমন কিছু বলে না। হিমুদের চুপ থাকতে হয়। কারণ কথা বললেই পৃথিবীটা বড্ড বেশি বাস্তব হয়ে যায়। সেলটা ছোট। চারপাশে কংক্রিটের দেয়াল। দেয়ালগুলো এত ঠান্ডা যে ছুঁলেই মনে হয়, এই বুঝি কোনো মৃত মানুষের গা ছুঁয়ে ফেললাম। বাতাসে পুরোনো ঘামের গন্ধ, মরচে ধরা লোহার গন্ধ, আর সিগারেটের পোড়া গন্ধ। এই তিনটা গন্ধ একসাথে মিশে গেলে যে গন্ধটা হয়, তার নাম দেওয়া যায় অসহায়ত্ব।

আবির ভাই গরাদ ধরে দাঁড়িয়ে আছে। হাতকড়া খুলে নিয়েছে। কিন্তু কবজিতে লাল দাগটা রয়ে গেছে। মানুষের শরীর অদ্ভুত জিনিস। দাগ সহজে মুছতে চায় না। সাদা শার্টের বাম পাঁজরে একটা কালচে ছোপ। রক্ত শুকিয়ে গেলে কালচে হয়ে যায়। ঠিক বিশ্বাসের মতো। ভেঙে গেলে আর আগের রঙে ফেরে না। আবির নিজের হাত দুটোর দিকে তাকাল। এই হাত দিয়েই সে একটু আগে মেঘকে জাপটে ধরেছিল। মেয়েটা কাঁদছিল। বৃষ্টির মতো কাঁদছিল। আর এখন এই হাতেই নাকি খুনের দাগ। পৃথিবীটা বড় বিচিত্র। একই হাতে কেউ ফুল দেয়, একই হাতে কেউ ছুরি চালায় বলে লোকে সন্দেহ করে। দারোগা সাহেব এলেন। মানুষটার চোখে ঘুম নেই। পুলিশদের চোখে ঘুম থাকে না। ঘুম থাকলে তারা আসামির চোখের ভেতর লুকিয়ে থাকা সত্যিটা ধরতে পারে না। তিনি চেয়ার টেনে বসলেন। খাতা খুললেন। কলমের নিবটা খাতার উপর রাখলেন। তারপর এমনভাবে তাকালেন, যেন আবির কোনো মানুষ না, একটা অঙ্কের প্রশ্ন।

“নাম?”
“আবির।”
“মাস্টার মশাইকে আপনি চিনতেন?”
বাইরে বৃষ্টি বাড়ছে। টিনের চালের উপর বৃষ্টির শব্দটা এখন আর তবলা না, মনে হচ্ছে কেউ ঢোল পিটাচ্ছে। বিয়েবাড়ি আর শ্মশান দুটোর শব্দ নাকি কাছাকাছি। আবির চুপ করে রইল। চুপ করে থাকা একটা আর্ট। সবাই পারে না। যারা পারে, তাদের সবাই সন্দেহ করে।
“চুপ করে থাকলে বাঁচবেন না, মিস্টার খান। আপনার শার্টে ভিক্টিমের রক্ত। লোকে বলছে ঘটনার সময় আপনি ওখানেই ছিলেন। মোটিভও পরিষ্কার। মেয়ে নিয়ে পালানোর প্ল্যান। মাস্টার মশাই বাধা দিলেন, আর আপনি…”
আবির এবার মুখ তুলল। চোখ দুটো লাল। লাল চোখের অনেক মানে হয়। ঘুম না হওয়া, কান্না চাপা, অথবা রাগ। পুলিশরা সবসময় শেষেরটা ভাবে।
“আমি মাস্টার মশাইকে মারিনি। উনি আমার ছোটো চাচা হয়।”
কথাটা বলার সময়ও গলায় কোনো জোর ছিল না। সত্যি কথার গলায় জোর থাকে না। জোর থাকে মিথ্যার গলায়।

“তাহলে রক্ত এলো কোত্থেকে?”
এই প্রশ্নটার উত্তর আবিরের নিজেরও জানা নেই। স্মৃতি জিনিসটা অনেকটা পুরোনো আয়নার মতো। সব ঝাপসা। দাঙ্গার ভিড়, ধাক্কাধাক্কি, তারপর হঠাৎ মেঘের মুখ। ভেজা চোখ, এলোমেলো চুল। সে তো শুধু মেঘকে বাঁচাতে গিয়েছিল। মাঝখানে কখন রক্ত লাগল, কে জানে।
(#আবির_ভাই বইটি প্রি-অর্ডার করুন যেকোনো বুকশপ অথবা রকমারি ডটকম থেকে মাত্র ৩৭৫ টাকায়।)
ওদিকে সিলেটের বিয়ে বাড়ি এখন আর বিয়ে বাড়ি নেই। মানুষ মরে গেলে ঘরের চেহারা বদলে যায়। মাস্টার মশাই মরে যাওয়ায় পুরো উঠানটাই এখন শ্মশান হয়ে গেছে। মেঘের জ্ঞান ফিরল মাঝরাতে। মা পাশে বসে নিঃশব্দে কাঁদছেন। মায়েরা শব্দ করে কাঁদে না। তাদের কান্নার শব্দ শুধু মেয়েরা শুনতে পায়। মেঘ উঠে বসতেই প্রথম চোখ গেল নিজের লাল লেহেঙ্গার দিকে। লালের উপর আরও গাঢ় লাল ছোপ। এটা আলতা না। আলতার রঙ এত গাঢ় হয় না। এটা অন্য কিছু। এমন কিছু, যা ধুয়ে ফেললেও মন থেকে ওঠে না।
মেঘের জ্ঞান যখন ফিরল, প্রথমে সে বুঝতে পারল না কোথায় আছে। চোখ মেলতেই একটা অদ্ভুত নিস্তব্ধতা টের পেল। না, নিস্তব্ধ ঠিক না। চারপাশে মানুষ আছে, ফিসফাস আছে, কান্নার শব্দ আছে। কিন্তু সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে যেন দুনিয়াটা হঠাৎ করে সাউন্ড কমিয়ে দিয়েছে। কেউ যেন রিমোটের ভলিউম বাটন চেপে ধরেছে।

মেঘ চোখ পিটপিট করল। উপরে সিলিং ফ্যান ঘুরছে। খুব ধীরে। যেন ফ্যানটারও মন খারাপ। বাতাসে একটা ভারী গন্ধ। আগরবাতির গন্ধ, নাকি কাফনের কাপড়ের গন্ধ, মেঘ ঠিক বুঝল না। তারপর সে টের পেল, তার লেহেঙ্গাটা ভিজে আছে। হাত দিয়ে ধরতেই চটচট করল। চোখ নামিয়ে তাকাল মেঘ। লাল। গাঢ় লাল র*ঙ লেগে আছে জরির কাজের ফাঁকে ফাঁকে। র*ক্ত।
মেঘের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। এই রঙ তার চেনা। বিয়ের রঙ লাল, কিন্তু এই লালটা অন্যরকম। এই লালে উৎসব নেই। এই লালে শুধু ভয়। সে ধড়মড় করে উঠে বসতে গেল। পারল না। পা দুটো অবশ। যেন কেউ পা দুটো খুলে নিয়ে গেছে। শরীরে এক ফোঁটা শক্তি নেই। মনে হচ্ছে কেউ একজন তার শরীরের সব ব্যাটারি খুলে নিয়ে গেছে। মেঘ অবাক হলো না। হিমু বলত, দুঃসংবাদের নিজস্ব একটা ওজন আছে। সেই ওজন কাঁধে চাপলে মানুষ হাঁটতে ভুলে যায়।
চারপাশে তাকাল মেঘ। ছোট্ট আম্মু মেঝেতে বসে আছেন। তার ছোট্ট আম্মু, যে সবসময় নিজেকে হাসিখুশি রাখে, আজ তার ঠোঁট সাদা। ফ্যাকাশে। তিনি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন। শব্দ নেই, কিন্তু শরীর কাঁপছে। যেন ভেতরের কান্নাটা বের হতে পারছে না, গলার কাছে আটকে আছে।
মেঘ হামাগুড়ি দিয়ে আম্মার পাশে গিয়ে বসল। গলা শুকিয়ে কাঠ। তবু জিজ্ঞেস করল, ‘আম্মা, তুমি কাঁদছো কেন? কী হয়েছে?’

আম্মা উত্তর দিলেন না। শুধু মেঘের দিকে তাকালেন। সেই চোখে রাজ্যের শূন্যতা। মেঘের মনে হলো, আম্মার চোখ দুটো কেউ শাবল দিয়ে খুঁড়ে নিয়ে গেছে। ভেতরটা খালি।
বিয়েটা ঘরোয়া ছিল। লোকজন হাতে গোনা। বড় আয়োজন আব্বা পছন্দ করতেন না। বলেছিলেন, ‘বেশি মানুষ ডাকলে বিয়েবাড়ি আর বিয়েবাড়ি থাকে না, মাছবাজার হয়ে যায়।’ সেই হাতে গোনা মানুষগুলোই এখন ঘরের কোণায় কোণায় জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে। কারও মুখে কথা নেই।
ভিড় ঠেলে মামী এগিয়ে এলেন। মেঘের মাথায় হাত রাখলেন। তার হাত কাঁপছে। ‘মেঘ, মা আমার। এদিকে আয়। শোন।’

মামীকে দেখে মেঘের বুকের ভেতর হঠাৎ হুহু করে উঠল। একটা অজানা ভয় গলার কাছে দলা পাকিয়ে গেল। হিমুরা ভয় পায় না, কিন্তু মেঘ তো হিমু না। সে রক্তমাংসের মানুষ। তার ভয় লাগে। খুব ভয় লাগে।
‘কী হয়েছে মামী?’ মেঘ ফিসফিস করে বলল। তার নিজের গলাই নিজের কাছে অচেনা লাগল।
মামী মুখ খুললেন, আবার বন্ধ করলেন। শব্দ বের হলো না। কিছু কিছু কথা থাকে, যা মুখ দিয়ে বলা যায় না। বলতে গেলে জিভ জড়িয়ে যায়। গলার স্বর আটকে যায়। মামী কীভাবে বলবেন যে মেঘের আব্বা আর নেই? খুন হয়েছেন। ‘খুন’ শব্দটা এত ভারী যে মামীর ঠোঁট কাঁপছে, কিন্তু শব্দটা বের হচ্ছে না।
মেঘের চোখ তখন চারপাশে ঘুরছে। পাগলের মতো খুঁজছে। আব্বা কোথায়? বিয়ের আসরে আব্বা থাকবেন না, তা কী করে হয়? আর আবির ভাই? সে কোথায়?
বুকের ভেতর হাহাকারটা আরও তীব্র হলো। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে মেঘের। সে আবার জিজ্ঞেস করল, এবার একটু জোরে, ‘আবির ভাই কোথায় মামী? আব্বা কোথায়?’
‘আবির ভাই’ নামটা শোনামাত্র ছোট্ট আম্মু যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলেন। এতক্ষণ যে কান্না গলায় আটকে ছিল, সেটা হঠাৎ চিৎকার হয়ে বেরিয়ে এল। তিনি চেঁচিয়ে উঠলেন। গলার শিরা ফুলে উঠল। চোখে আগুন।
‘খবরদার! ঐ নাম তুই মুখেও উচ্চারণ করবি না! খবরদার!’

ঘরের বাতাস স্তব্ধ। আগরবাতির গন্ধটা এখন আরও কটু লাগছে। মেঘ বোবা হয়ে বসে রইল। তার লাল লেহেঙ্গার দিকে তাকিয়ে রইল। মেঘের কানে সেটা এখনো বাজছে ‘ঐ নাম তুই মুখেও উচ্চারণ করবি না!’
আবির ভাই এই নামটার সাথে মেঘের কত সন্ধ্যা জড়িয়ে আছে। সেই মানুষটার নাম এখন নিষিদ্ধ? কেন?
মেঘের মাথা কাজ করছে না। হিমুরা বলে, পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল অঙ্ক হলো মানুষের মন। সেই অঙ্ক মেলানোর নিয়ম কোনো বইয়ে লেখা থাকে না। মামী মেঘকে জড়িয়ে ধরলেন। তার শাড়ির আঁচল দিয়ে মেঘের মুখ মুছিয়ে দিতে গিয়ে থমকে গেলেন। মেঘের গালে, কপালে, ঠোঁটের কোণে শুকিয়ে যাওয়া রক্ত। কার রক্ত?
‘মা রে,’ মামী ফিসফিস করলেন, ‘তোর আব্বা…’
বলেই মামী আবার চুপ। শব্দটা গিলে ফেললেন। যেন ‘আব্বা’ শব্দটার পর যে কথাটা আসবে, সেটা বললে পৃথিবী উল্টে যাবে।

বাইরে বৃষ্টির শব্দ বাড়ছে। টিনের চালে বৃষ্টি পড়লে যেমন শব্দ হয়, ঠিক তেমন। ঝমঝম। অথচ এটা পাকা দালান। তবু মেঘের মনে হচ্ছে টিনের চালেই বৃষ্টি পড়ছে। হিমুর জগতে বাস্তব আর কল্পনা প্রায়ই জায়গা বদল করে। হঠাৎ দরজায় ছায়া পড়ল। পুলিশ। দুজন। ইউনিফর্ম ভিজে চুপচুপে। একজনের হাতে খাতা। অন্যজনের কোমরে পিস্তল। মেঘ অবাক হয়ে দেখল, পিস্তল জিনিসটা কী অদ্ভুত। এই ছোট্ট একটা যন্ত্র মানুষের জীবন নিয়ে নিতে পারে। আব্বার জীবনও কি এমন কোনো যন্ত্র নিয়ে নিয়েছে?
বয়স্ক পুলিশটা গলা খাঁকারি দিলেন। ‘দেখুন, আমরা জানি সময়টা খারাপ। কিন্তু কিছু প্রশ্নের উত্তর লাগবে। মেঘ কে?’
সবাই মেঘের দিকে তাকাল। মেঘ নিজের দিকেও তাকাল। আমি কে? মেঘ? নাকি এই রক্তমাখা লেহেঙ্গা পরা অন্য কেউ, যে এক ঘণ্টা আগে কনে ছিল, আর এখন… এখন কী?

‘আমি,’ মেঘ বলল। গলাটা কাঁপল না। অবাক কাণ্ড। এত বড় বজ্রপাতের পরও মানুষের গলা কাঁপে না।
‘আপনার বাবাকে শেষ কখন দেখেছেন?’
মেঘ মনে করার চেষ্টা করল। সময় গুলিয়ে গেছে। বিয়ের আসর, আবির ভাই তারপর? তারপর তো অন্ধকার।
‘আবিরের সাথে আপনার সম্পর্ক কী?’
এইবার ছোট্ট আম্মু আবার ফুঁসে উঠলেন। ‘বললাম না ঐ নাম নিবা না! আমার মেয়ের সামনে ঐ খুনির নাম নিবা না!’

আবির ভাই পর্ব ৩২ (২)

খুনি।
শব্দটা ঘরের মধ্যে বোমার মতো ফাটল। মেঘের কানে তালা লেগে গেল। খুনি? আবির ভাই? যে আবির ভাই ফুল ছিঁড়তে পারে না গাছ ব্যথা পাবে বলে, সে খুনি?
মামী মেঘের কাঁধ চেপে ধরলেন। ‘মেঘ, শক্ত হ মা’
মেঘের বুকটা কেঁপে ওঠল। সর্বাঙ্গ কাঁপছে। অবশেষে মামী বলেই দিলেন, ‘তোর বাবাকে কেউ খুণ করেছে মেঘ

আবির ভাই পর্ব ৩৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here