আবির ভাই পর্ব ৪
উর্মিলা মজুমদার
পরদিন সকালবেলা। জানালার কপাটগুলো বাতাসের হুমকিতে অস্থির হয়ে আছে। বাইরে বৈরী আবহাওয়া। বাতাসের একটা হু হু শব্দ আসছে। মেঘের ঘুম ভাঙল হঠাৎ। চোখ মেলেই সে বিমূঢ় হয়ে বসে রইল। একেই বোধহয় বলে ‘চড়ক গাছ’ হওয়া। সে শুয়ে আছে একটা বিশাল খাটে, গায়ে নকশা করা সুতি কাঁথা। অথচ তার স্মৃতি বলছে অন্য কথা। তার মনে আছে, কাল রাতে সে গাড়ির সিটে গুটিসুটি মেরে শুয়েছিল। ক্লান্তিতে চোখ বুজে এসেছিল ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শুনতে শুনতে। তাহলে এই পালঙ্ক আর এই ঘর কোত্থেকে এল? সে কি তবে শূন্যে ভেসে এখানে পৌঁছেছে? মানুষের পক্ষে কি ঘুমের ঘোরে টেলিপোর্টেশন সম্ভব?
মেঘ দ্রুত বিছানা ছেড়ে নামল। পায়ের নিচে শীতল মেঝে। ঘরটা বেশ বড়, কড়িবরগার ছাদ। দেয়ালের চুনকাম কিছুটা পুরনো। এটা কি তবে দাদুর বাড়ি? সেই বিখ্যাত ‘খান বাড়ি’?
মেঘ পা টিপে টিপে ঘরের বাইরে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। নিচে তাকাতেই তার বিস্ময় আরও এক ধাপ বেড়ে গেল। দোতলার রেলিং ধরে সে দেখল, নিচে বিশাল ডাইনিং টেবিলে এলাহি কারবার। সবাই খেতে বসেছে। বাড়ির বড় চাচি তিনি মেঘকে দেখেই মুখভর্তি হাসি নিয়ে বললেন, “কি রে মেঘ মামুনি? ঘুম ভাঙল তোমার? উঠে পড়েছ তবে?”
মুহূর্তেই টেবিলের সবার চোখ যেন সার্চলাইটের মতো মেঘের ওপর এসে পড়ল। মেঘ খানিকটা কাচুমাচু হয়ে গেল। এই অস্বস্তিতে মেঘের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমল। সে আমতা আমতা করে একটা বোকা প্রশ্ন ছুড়ে দিল, “ইয়ে… এটাই কি তবে খান বাড়ি?”
প্রশ্নটা শোনামাত্র ডাইনিং টেবিলে হাসির রোল পড়ল। হাসির রেশ থামিয়ে একটা যুবক ছেলে প্লেট থেকে মুখ তুলে বলল, “জি মিস মেঘ, এটাকেই পনডিতেরা খান বাড়ি বলে থাকেন। আপনার কোনো সন্দেহ আছে?”
মেঘ ম্লান হাসল। বড় চাচি তাড়া দিলেন, “এখন ওসব ভাবার দরকার নেই মা। ঝটপট হাত-মুখ ধুয়ে নিচে এসো। নাস্তা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। তোমার প্রিয় ভুনা খিচুড়ি করা হয়েছে।”
মেঘ দ্রুত ওখান থেকে সরে এল। তার মাথায় হাজারটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। তাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দোতলার এই ঘরে কে নিয়ে এল? আবির ভাই কি? কিন্তু ডাইনিং টেবিলে আবির ভাই নেই। মানুষটা কি তবে মানুষের অলক্ষ্যে যাতায়াত করার বিদ্যা রপ্ত করে ফেলেছে?
খান বাড়ির ডাইনিং টেবিলটা অনেকটা ছোটখাটো কুরুক্ষেত্রের ময়দান। তবে এই ময়দানে তলোয়ার চলে না। পরিবারের দুই দিকপাল পুরুষ তখন টেবিলে আসীন। বড় কর্তা যাকে পুরো ঢাকা শহর এক ডাকে ‘বড় খান সাহেব’ বলে চেনে। তিনি গম্ভীর মুখে ভাতের লোকমা মুখে তুলছেন। তাঁর গাম্ভীর্য হিমালয় সদৃশ। মেজো কর্তা হলেন অরু আর প্রেমার বাবা। আর ছোট কর্তার পরিচয় দিতে গেলে একটু নড়েচড়ে বসতে হয়। খান বাড়ির অন্দরমহলে একটা গোপন কথা ঘোরে। মেঘের দাদাজান ইন্তেকাল করার আগে দুই কূল রক্ষা করে গিয়েছিলেন। অর্থাৎ, তাঁর দাদি দুইজন। ছোট কর্তা হলেন সেই দ্বিতীয় পক্ষের সন্তান। এই ‘পক্ষ’ভেদ নিয়ে ভাইদের মধ্যে চোরাবালির মতো কিছুটা টানাপোড়েন আছে।
বড় খান সাহেবের একমাত্র ছেলে সুপুরুষ আবির ভাই। সে এই বংশের নয়নমণি, যাকে ঘিরে রাজ্যের যত আদিখ্যেতা। সে সবার বড়। তার ঠিক নিচেই আছে প্রেমার অবস্থান। প্রেমা আর সাদিফ সমবয়সী। সাদিফ হলো এই বাড়ির বড় বুয়া, যিনি বর্তমানে সুদূর কানাডায় তাঁর সুযোগ্য পুত্র। সাদিফ এদেশেই থাকে, খান বাড়ির অবিচ্ছেদ্য অংশ। একটু আগে মেঘের সাথে যে ছেলেটা কথা বলেছিল সেই সাদিফ। অরু আবার মেঘ সমবয়সী। আর সাদিফ এখন মাস্টার্সের পাঠ চুকোচ্ছে।
বড় খান সাহেবের কপালে চিন্তার তিনটি রেখা ফুটে উঠেছে। বড় খান সাহেব হলেন সেই শ্রেণীর মানুষ, যারা দুনিয়ার সব চিন্তাকে ভাতের থালায় নিয়ে বসেন। তিনি চামচ দিয়ে ডিমের পোচটা আলতো করে কাটতে কাটতে বললেন, “আবির কোথায়? তাকে তো দেখছি না। আজ কি তার অফিস যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই? সে না গেলে মিটিংগুলো সব পেন্ডিং পড়ে থাকবে। ব্যবসার বারোটা বাজবে।”
বড়ো আম্মু, অর্থাৎ আবিরের মা, চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে সরু গলায় শুধাল, “বলতে পারছি না। ছেলেটা হয়তো এখনো ঘুমাচ্ছে। তুমি তো জানো কাজের ব্যাপারে সে কতটা মনোযোগী। যদি আজ গুরুত্বপূর্ণ মিটিং থাকে, তবে সেগুলো আপাতত স্থগিত করে দাও। ছেলেটা কাল রাতে অনেকটা সময় ড্রাইভ করেছে। ক্লান্ত শরীর, একটু ঘুমাক না।”
বড় খান সাহেব আর কথা বাড়ালেন না। তিনি মাথা নাড়লেন। হিমালয়ের মতো গাম্ভীর্য নিয়ে খাবার পর্বের ইতি টানলেন।
অরু মেয়েটা চঞ্চল প্রকৃতির, অনেকটা কারেন্ট শকের মতো। মেঘের সাথে গতকাল তার মোলাকাত হয়নি, তাই আজ সে বিনামেঘে বজ্রপাতের মতো মেঘের ঘরে হানা দিল। মেঘ প্রথমে চমকে গেলেও পরক্ষণেই তার মুখে শরতের আকাশের মতো হাসি ফুটে উঠল। ছোটবেলার ঝাপসা স্মৃতিরা যেন দল বেঁধে ফিরে এল। মেঘ হেসে অরুকে জড়িয়ে ধরল, “অরু, কেমন আছিস তুই?”
অরু কোনো উত্তর দিল না, পরিবর্তে মেঘের গালে শব্দ করে একটা চুমু খেল। তার চোখমুখ খুশিতে চিকচিক করছে। অরু বলল,”আমি বেশ ভালো আছি। তোকে পেয়ে আরও ভালো আছি, বুঝলি? এখন থেকে এই পুরো বাড়িটা হবে আমাদের রাজত্ব। আমরা দুই রানী মিলে এই কেল্লা চালাব।”
মেঘের চোখগুলো খুশিতে পিটপিট করতে লাগল। সে অবশেষে মরুভূমিতে মরূদ্যানের দেখা পেয়েছে। এই বিশাল বাড়িতে তার মনের মতো কাউকে খুঁজে পাওয়া কঠিন ছিল। অরুও এবার মেঘের সাথে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। রেজাল্ট বেরোলে দুজনে একসাথে কোনো নামী কলেজে ভর্তি হবে। মেঘ হঠাৎ অরুর হাত ধরে টান দিল। “শোন, আমাকে পুরো বাড়িটা একবার ঘুরে দেখাবি? নয়তো আমি এই গোলকধাঁধায় প্রায়ই হারিয়ে যাব।”
অরু মাথা দুলিয়ে মেঘকে টেনে নিয়ে গেল। তাদের প্রথম গন্তব্য হলো ছাদ। ঢাকার নিকুঞ্জ-২ এর এই এলাকায় আকাশটা একটু বেশিই খোলা। ছাদের এক কোণায় একটা বিশাল দোলনা। পাশে বসার জন্য কাঠের বেঞ্চি। ছাদজুড়ে হরেক রকমের ফুলের টব সন্ধ্যা মালতী, বেলী, লাল গোলাপ। মেঘের মনটা মুহূর্তেই ভালো হয়ে গেল। সে চট করে একটা ছোট লাল গোলাপ ছিঁড়ে নিজের কানের পেছনে গুঁজে দিল।
আকাশটা আজ ভীষণ মেঘলা। ঠিক মেঘের নামের মতোই আকাশ জুড়ে মেঘেদের মেলা বসেছে। মেঘ আকাশের দিকে তাকিয়ে আপনমনে হাসল। নিচে লেকটা দেখা যাচ্ছে। কলকল শব্দ শোনা না গেলেও পানির ঝিলিক চোখে পড়ে। মেঘের খুব ইচ্ছে হলো এখনই লেকের পাড়ে গিয়ে পা ডুবিয়ে বসে থাকে।
অরু পেছন থেকে ডাকল, “চল এবার নিচে যাই। আরও অনেক কিছু দেখার বাকি।”
অরু একে একে প্রতিটা ঘর ঘুরে দেখাতে লাগল।
“এটা প্রেমা আপুর ঘর। আপু এখন ভার্সিটিতে। সাদিফ ভাইও হয়তো চলে গেছে।”
অরু গাইডদের মতো হাত উঁচিয়ে গেস্ট রুম আর বাকি সবার ঘর দেখাল। সে মেয়েটা ভীষণ মিশুক। ঘুরতে ঘুরতে তারা একটা বন্ধ দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। অরু হঠাৎ তার ঠোঁটে আঙুল দিয়ে ‘চুপ’ করার ইশারা করল।
ফিসফিস করে বলল, “এটা আবির ভাইয়ের রুম। একদম নিঃশব্দে ভেতরে ঢুকবি। তিনি এখন ঘুমাচ্ছেন। একদম আওয়াজ করবি না। যদি তিনি বুঝতে পারেন যে আমরা তার ঘরে ঢুকেছি, তবে আমাদের দুই বোনকেই আজ শূলে চড়াবেন। আবির ভাইয়ের মেজাজ সবসময় আসমানের উপরে থাকে।”
মানুষের নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি এক আদিম আকর্ষণ আছে। মেঘের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হলো না। আবির ভাইয়ের রুমে প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত, সেখানে পা রাখা মানেই রোমাঞ্চকর বিদ্যুৎস্পন্দন। অরু যখন দরজার নবটা অতি সাবধানে ঘোরাল, মেঘের মনে হলো তার বুকের ভেতর কেউ একজন অবিরাম ঢোল বাজিয়ে চলেছে। ঘরটা অন্ধকার। জানালার পর্দাগুলো মেঘলা দিনের আলো আটকে রেখেছে। এসি-র হিমশীতল বাতাস আর দামী পারফিউমের একটা মৃদু গন্ধ নাকে এসে ধাক্কা দিল। মেঘ ঢোক গিলল। তার চোখ গেল ঘরের মাঝখানে রাখা বিশাল সাদা পালঙ্কটার দিকে। সেখানে উপুড় হয়ে শুয়ে আছেন আবির ভাই। বলিষ্ঠ হাত দুটো বালিশ আঁকড়ে ধরে আছে, । গলার খানিকটা নিচ পর্যন্ত টানা সাদা ধবধবে কম্বল। মেঘের দৃষ্টি সরছে না। তার মনে হলো, কোনো এক গ্রীক দেবতার ভাস্কর্য যেন এখানে জীবন্ত হয়ে ঘুমিয়ে আছে। সে একের পর এক ঢোক গিলছে। বুকের সেই ঢোল বাদ্যের গতি এখন চরমে। ঠিক তখনই পাশের অরু তার হাতে একটা কড়া চিমটি কাটল।মেঘের ঘোর কাটল। অরু ইশারায় বলছে, “পালা, জলদি পালা!”
মেঘ মাথা দুলিয়ে দ্রুত ঘর থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু উপরওয়ালা হয়তো অন্য কিছু লিখে রেখেছিলেন। দ্রুত বের হতে গিয়ে তার কানের পেছনে রাখা সেই ছোট লাল গোলাপটা টুপ করে খসে পড়ল আবির ভাইয়ের বিছানার ঠিক পাশেই। মেঘ তা টের পেল না। দুই বোন কোনোমতে করিডোরে এসে হাফ ছেড়ে বাঁচল। মনে হলো তারা এইমাত্র কোনো ভয়ংকর ড্রাগনের গুহা থেকে গুপ্তধন চুরি করে ফিরেছে।
করিডোরের একটু নির্জন কোণায় এসে অরু তার মুঠি খুলল। মেঘ পিটপিট করে তাকিয়ে দেখল এক গাদা কাজু বাদাম! মেঘ অবাক হয়ে বলল, “তোর হাতে ওগুলো কী?”
অরু খিলখিল করে হাসতে হাসতে জগত জয় করে ফেলল। চাপা গলায় বলল, “আবির ভাইয়ের টেবিলের ওপর রাখা ছিল। গোটা কয়েক মেরে দিলাম।”
মেঘ অরুর মাথায় একটা হালকা চাটি মেরে বলল, “তোর সাহস তো কম না! তুই কি ওই ঘরে শুধু এই বাদাম চুরি করতেই গিয়েছিলি? আর কিছু পাসনি?”
অরু তখনও হাসছে। তবে হাসি থামিয়ে গম্ভীর হওয়ার ভান করে বলল, “শোন মেঘ, আবারও বলছি, আজকে যে আমরা আবির ভাইয়ের ঘরে গিয়েছিলাম, সেটা যেন ঘুণাক্ষরেও কেউ জানতে না পারে। বিশেষ করে আবির ভাই যেন না জানে।”
মেঘ ভ্রু কুঁচকাল। তার ভেতরে তখন অন্য এক মেঘ ডাকছে। তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল, “কেন? জানলেই বা কী হবে? আমাদের কি কাঁচা চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে? আর ঘর থেকে এমন কী মহাভারত অশুদ্ধ করেছি যে জানলে পুরো বাড়ি মাথায় তুলবে?”
অরু বাদাম চিবাতে চিবাতে রহস্যময় গলায় বলল, “তোর কোনো ধারণা নেই মেঘ। আবির ভাই খুবই রাগী মানুষ। উনার ঘরে কারো প্রবেশাধিকার নেই। জানলে আজ আমাদের কপালে দুঃখ আছে।”
মেঘ মনে মনে বলল, ‘ইন্টারেস্টিং! লোকটা কি তবে সত্যি কোনো রাগী রাজপুত্র? রাগিয়ে দেখলে মন্দ হতো না!’ অরু বাদাম চিবানো থামিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কিছু বললি নাকি রে মেঘ?”
মেঘ থতমত খেয়ে গেল। সে নিজের ভাবনা লুকাতে চট করে প্রসঙ্গ পাল্টে বলল, “নাহ, কিছু না। আচ্ছা অরু, একটা কথা বল তো কাল রাতে আমাকে বাড়িতে নিয়ে এল কে? আমি তো গাড়িতেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, কিছুই মনে নেই।”
অরু চোখের কোণে দুষ্টুমি ভরা হাসি ফুটিয়ে মেঘকে একটা খোঁচা দিল। গলার স্বর নামিয়ে বলল, “তোর কী মনে হয় রে? আমাদের আবির ভাই বুঝি তোকে কোলে করে নিয়ে এসেছেন?”
বলেই অরু হাসল। মেঘের মেজাজ মুহূর্তেই চটে গেল। তার গাল দুটো রাগে লাল হয়ে উঠল। সে কি এই কথা শোনার জন্য প্রশ্নটা করেছিল? আশ্চর্য! সে কি ছোট বাচ্চা নাকি যে কেউ তাকে কোলে করে আনবে? মেঘ আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। ঠোঁট উল্টে গটগট করে নিজের ঘরের দিকে হাঁটা দিল।
অক্টোবর মাস। প্রকৃতিতে এই মাসটি বড় আধিপত্য বিস্তার করে থাকে। মেঘেরা দল বেঁধে আকাশে ঘুরে বেড়ায়, আর যখন তখন শুরু হয় ঝুম বৃষ্টি। খান বাড়িতে আজ সন্ধ্যার চিত্রটা বেশ ঘরোয়া। জানালার বাইরে বৃষ্টির শব্দ হচ্ছে ‘ঝমঝম, ঝমঝম’। মনে হচ্ছে আকাশটা ফুটো হয়ে গেছে, আর সেখান থেকে কেউ আনমনে জল ঢালছে। ডাইনিং টেবিলে এলাহি কারবার। খান বাড়ির অন্দরমহলের প্রধানা, বড় আম্মু বসেছেন অরুর মাথায় তেল মালিশ করতে। অরু মেয়েটা চিরকালই একটু আয়েশি। সে পরম তৃপ্তিতে চোখ বুজে তেল মালিশ নিচ্ছে আর খানিক পরপর প্লেট থেকে গরম গরম সিঙ্গারা মুখে পুরছে। পেয়ারি বানু আজ অসাধ্য সাধন করেছে। সিঙ্গারার খাস্তা আবরণ আর ভেতরের আলুর পুর থেকে যে সুগন্ধ বেরোচ্ছে, তা এই বৃষ্টির সন্ধ্যায় যেকোনো মানুষের মস্তিস্ক বিকল করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
এমন সময় মেঘ দোতলা থেকে নেমে এল। তার চোখমুখ ঘুমে লাল হয়ে আছে, চুল উস্কোখুস্কো। সে হাই তুলতে তুলতে ডাইনিং চেয়ারে বসল। সাদিফ বাইরে কোথাও আটকে পড়েছে বৃষ্টির কারণে, আর প্রেমা সম্ভবত নিজের ঘরে রয়েছে। মেঘ একটা সিঙ্গারা হাতে নিল। তার লক্ষ্য ছিল সিঙ্গারার ঠিক মাঝখানের অংশটা কামড় দিয়ে ছিঁড়ে ফেলা। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই বড় আম্মু বোমাটা ফাটালেন।
(#আবির_ভাই উপন্যাসটি বই হিসেবে বেড়িয়েছে। আপনারা চাইলে এক্ষুণি প্রি-অর্ডার করতে পারেন।)
“মেঘ, তোকে আবির খুঁজছিল। বলেছে একবার দেখা করতে।”
মেঘের হাতের সিঙ্গারাটা থমকে গেল। সিঙ্গারার গরম ভাপ তার আঙুলে লাগছে, কিন্তু তার সেদিকে খেয়াল নেই। তার হৃদপিণ্ড এখন একটা লাটিমের মতো বনবন করে ঘুরছে। সে ঢোক গিলে পিটপিট করে অরুর দিকে তাকাল। অরু মাথাটা সামান্য ঘুরিয়ে ঠোঁট কুঁচকে এক বিচিত্র হাসি হাসল। সে হাসির অর্থ, ‘বাছা, এবার তোর কপালে দুঃখ আছে।’
মেঘ কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল, “কেন চাচি? আমাকে কেন ডেকেছে?”
বড় আম্মু অরুর মাথায় তালু ঘষতে ঘষতে বললেন, “আমি কি অত শত জানি? দরকার ছিল বোধহয়। ছেলেটা আবার জেদি, সময়মতো না গেলে একটা তুলকালাম কেঁচাল বাঁধাবে। যা, ঝটপট দেখা করে আয়।”
মেঘের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে। অক্টোবরের ঠান্ডা বাতাসেও তার ঘাম হচ্ছে, এটাই প্রকৃতির বিচিত্র লীলা। সে বিড়বিড় করে বলল, “আমাকে কি একাই ডেকেছে? অরুকে ডাকেনি?”
“না, একাই ডেকেছে। সাথে কি তুই ব্যান্ডপার্টি নিয়ে যাবি?”
মেঘ চেয়ার ছেড়ে উঠল। তার পা চলছে না, তবুও তাকে যেতে হবে। সকালে সে আর অরু মিলে আবির ভাইয়ের ঘরে এক দুঃসাহসিক অভিযান চালিয়েছিল। কোনোভাবে কি সে কথা ফাঁস হয়ে গেল? মেঘ দোয়া-দরুদ পড়তে পড়তে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগল। তার মনে হচ্ছে সে কোনো বধ্যভূমির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। যদি ধরা পড়ে যায়, তবে ফিরে এসে অরুর হাড়গোড় একটাও আস্ত রাখবে না এই প্রতিজ্ঞা সে মনে মনে কয়েকবার করে ফেলল। বাইরে বৃষ্টির বেগ বেড়েছে।
আবির ভাইয়ের রুমের দরজার সামনে এসে মেঘ থমকে দাঁড়াল। বুকটা ধড়ফড় করছে। সে লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে দরজায় আলতো করে ধাক্কা দিল। ভেতরে ঢুকতেই মেঘের চোখ ছানাবড়া। ঘরটা আধা-অন্ধকার। শুধু টেবিল ল্যাম্পের মৃদু আলো আর ল্যাপটপের স্ক্রিনের নীলাভ আভা। আবির ভাই সোফায় হেলান দিয়ে বসে আছেন। পরনে কুচকুচে কালো টি-শার্ট আর ট্রাউজার। তাকে দেখতে কোনো এক গম্ভীর উপন্যাসের বিয়োগান্তক নায়কের মতো লাগছে। তিনি ল্যাপটপে কী যেন টাইপ করছেন, মেঘের দিকে তাকালেন না। কিন্তু মেঘ জানে, আবির ভাইয়ের ইন্দ্রিয় অত্যন্ত প্রখর। তিনি ঠিকই টের পেয়েছেন কে ঢুকেছে। মেঘ দেয়ালের সাথে লেপ্টে দাঁড়িয়ে থেকে মিহি গলায় ডাকল, “আবির ভাই?”
আবির ভাই ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই ছোট করে বললেন, “বল।”
“আমাকে ডেকেছেন?”
আবির ভাই এবার ল্যাপটপটা বন্ধ করলেন। কোলের ওপর থেকে সেটা সরিয়ে পাশে রাখলেন। তারপর অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে মেঘের চোখের দিকে তাকালেন। সেই চাউনি দেখে মেঘের মনে হলো তার আত্মার অর্ধাংশ এখনই শরীর ছেড়ে পালিয়ে যাবে। সে ভাবল, এখনই বোধহয় সকালের প্রসঙ্গটা উঠবে। এখনই আবির ভাই বলবেন, ‘মেঘ, সকালে আমার রুমে এসে কী খুঁজছিলি?’
আবির ভাই পর্ব ৩
কিন্তু আবির ভাই তেমন কিছুই বললেন না। তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাইরের ঝোড়ো হাওয়ার দিকে তাকালেন। তারপর শান্ত গলায় বললেন, “জানালার ওই পাশটা দিয়ে বৃষ্টির ছিটে ভেতরে ঢুকছে। পুরো রুম ভিজে যাচ্ছে। তুই একটু জানালাটা বন্ধ করে দিয়ে আয় তো?”
