Home আমার আলাদিন আমার আলাদিন পর্ব ৩৫

আমার আলাদিন পর্ব ৩৫

আমার আলাদিন পর্ব ৩৫
জাবিন ফোরকান

লঞ্চের ভেতরটা কোনো রাজকীয় প্রাসাদের থেকে কম কিছু মনে হলোনা ইরামের কাছে। বিস্তৃত ডেক, ছাদে কারুকার্যঘেরা সিলিং। একপাশে সিঁড়ির সাথে লিফটের ব্যবস্থা আছে। লঞ্চের ভেতরে লিফট! ব্যাপারটা রমণীকে বিস্মিত করল। এই জগৎটাকে তার লঞ্চ কম ক্রুজশিপ বেশি মনে হচ্ছে। অভিজাত এবং ভ্রমণপিপাসুদের উপস্থিতিই বেশি, যারা মূলত অভিজ্ঞতা নিতেই এসেছে। কিছু বিদেশি ব্লগারদেরও চোখে পড়ল, ক্যামেরা নিয়ে ভিডিও করতে ব্যস্ত।

ইরামদের একজন স্টাফ সসম্মানে লিফটে করে তৃতীয় তলায় নিয়ে গেল। এখানেই ভি আই পি কেবিন এরিয়া। খানিকটা রেসিডেন্সিয়াল হোটেলের মতন ব্যবস্থা। একপাশে গ্লাস দিয়ে ঘেরা বারান্দার মতন জায়গা। সেখানে বসার জন্য সোফা দেয়া। কেউ কেউ ইতোমধ্যে জায়গা করে নিয়েছে নদীর দৃশ্য উপভোগ করার জন্য। সাইবান দুটো কেবিন নিয়েছিল। একটা ভি আই পি ফ্যামিলি কেবিন, অন্যটা রয়েল কেবিন। রয়েলটা দুইতলা, সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলে আরেকটা বিছানা আছে। তাই সেখানেই অনুরাগ, সারিকা, সুগন্ধা এবং তিতলির থাকার ব্যবস্থা হলো। অপরদিকে ইরাম, সাইবান আর ইযান তিনজন উঠল ফ্যামিলি কেবিনে।
ফ্যামিলি কেবিনটা একেবারে হোটেল রুমের মাস্টার স্যুইটের মতন। ঢুকতেই বসার জন্য সোফাসেট এবং টিভির ব্যবস্থা। একপাশে বারান্দার কাছে বিছানা। বারান্দা থেকে আবার নদীর দৃশ্য স্পষ্ট দেখা যায়। আলমারি, ফ্রিজের মত বেশকিছু আসবাব আছে। ইরাম ইযানকে নিয়ে বিছানায় বসতে বসতে সাইবান তাদের ব্যাগপত্র আলমারিতে তুলে রাখল। ইযান এর মধ্যেই ঘুমে ঢুলুঢুলু হয়ে পড়েছে প্রায়। ইরাম ছেলেকে বুকে নিয়ে পায়চারি করতে লাগল,

“আয় আয় চাঁদ মামা টিপ দিয়ে যা, চাঁদের কপালে চাঁদ টিপ দিয়ে যা~”
ইরামের মৃদু কণ্ঠের ঘুমপাড়ানি গান সাইবানের কানে যেতেই সে পকেটে দুহাত গুঁজে হেলেদুলে এগিয়ে এলো। চোখের সামনের দৃশ্য দেখতে দেখতে বলল,
“আরে, লঞ্চে এসব গানের ভ্যালু আছে? কি সব গাচ্ছেন? চাঁদের কপালে চাঁদ টিপ দেবে কেন? সতীন কেউ সহ্য করে? চাঁদও আরেকটা চাঁদকে কখনোই সহ্য করতে পারেনা, জেলাস হয়! তাই কপালে টিপ না, ঘুষি দিতে পারে!”
ইরাম একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করল। ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে, আর সাইবান পাতালে থাকলেও মুখ চালায়। তার বেহুদা কথা আর অদ্ভুত ব্যাখ্যা কোনোদিন বন্ধ হবেনা। ইযানকে কাঁধে ঠেকিয়ে ইরাম ঘুরে দাঁড়িয়ে স্বামীর দিকে তাকিয়ে বলল,

“তাই বুঝি? তবে তুমি শোনাও তো, লঞ্চের জন্য উপযুক্ত ঘুম পাড়ানি গান।”
“নেকি অর পুছ পুছ!”
সাইবান গলা খাঁকারি দিল। তার হাতটা কানের উপরে এমনভাবে রাখল, যেমন করে বিজ্ঞ ওস্তাদরা শাস্ত্রীয় সঙ্গীত পরিবেশনের সময়টায় করে। ইরাম প্রথমটায় অবাক হয়ে রইল, পরক্ষণেই তার কানে ভেসে এলো সাইবানের ভাঙাচোরা গলার মারাত্মক বেসুরো গান,
“বরিশালের লঞ্চে উইঠ্যা লইসি কেবিন রুম~ আম্মারে বুকে নিয়া আব্বায় দিব ঠাইস্যা ঘুম, হায়রে দিব রসের ঘুম~”
ঘুমে ঢুলুঢুলু ইযান মহান সঙ্গীত শুনে তড়াক করে লাফিয়ে উঠল। মাথাটা কাত করে সামনের দিকে চেয়ে শব্দ করে উঠল,

“গু!”
ইরাম হতবিহ্বল। তার কোলে ইযান সেকেন্ডের ভেতর সজাগ হয়ে গিয়ে এখন লাফাচ্ছে। সে কি উত্তেজনায় এমন করছে নাকি পিতাকে গালাগাল করছে সেটা বোঝা মুশকিল।
“এটা ঘুম পাড়ানি গান ছিল নাকি ঘুম জাগানি গান?”
ত্যাক্ত হলো ইরাম। তবে অজান্তেই তার ঠোঁটে ছোট একটা হাসির উৎপত্তি ঘটল। এদিকে ইযানকে ধরে রাখা যাচ্ছেনা। কিলবিল করছে কই মাছের মতন। সাইবান এগিয়ে এসে ছেলেকে কোলে তুলে নিল,
“ঐযে, জানতাম, বাপের রোমান্সের কথা শুনলেই তুই একটা না একটা বাগড়া দিবিই। এত বজ্জাত জীবনে দুইটা দেখিনি আমি। বলি তোর কি বড় ভাই হওয়ার কোনো ইচ্ছা, আশা, আকাঙ্ক্ষা নেই নাকি? কেবিনে এক ঘুম দিবি, ঢাকা টু বরিশাল গিয়ে একেবারে চোখ খুলবি তা না, বাপের বুকে সাপটা সাপটি করতে হবে তোর!”
“বাপের মতন হয়েছে না, বজ্জাত তো হবেই!”
চোখ উল্টে মন্তব্য করল ইরাম। তারপর উল্টো ঘুরে গিয়ে বিছানায় বসল। সাইবান ইযানকে একেবারে কাঁধের উপর তুলে পিছন বরাবর একটা চাপড় দিয়ে বলল,

“যাই হোক না কেন, হানিমুনকে বেবিমুন না করলেই হলো।”
ইরাম ভ্রু তুলল সাইবানের উদ্দেশ্যে,
“কি হানিমুন হানিমুন লাগিয়ে রেখেছ? তুমি কাজে যাচ্ছ, আমরা বাকিরা ঘুরতে যাচ্ছি। এর মধ্যে হানিমুন শব্দটা এলোই বা কি করে? এটা কীভাবে হানিমুন হয়?”
বাঁকা হাসল সাইবান, চকচকে চোখে জানাল,
“রাত হোক। লঞ্চ যখন মাঝ পদ্মার উথাল পাথাল ঢেউয়ে দুলবে, তখন আমি ব্যক্তিগতভাবে আপনাকে বুঝিয়ে দেব হানি আর মুন দুটোই কীভাবে হয়!”
চোখ টিপ দিল সে এমন কুটিলভাবে, যে ইরাম একটি শক্ত ঢোক গিলল। সাইবান কেবিনে দাঁড়িয়ে থাকলনা আর,
“পোটলা যখন উঠেই পড়েছে, ওকে একটু ঘুরিয়ে আনছি। চুপটি করে কেবিনে বসুন, জরিনার আম্মা সকিনা তার লেটেস্ট চুং চাং চাইনিজ মুভি নিয়ে এই এলো বলে, আপনার সাথে দেখতে।”
“আই…উই গা…”
“গাই গুইয়ের দিন শেষ, এবার সোজা আব্বা ডাকা শিখবি। বল, আ ব বা, আব্বা!”
“আ…আগু!”
“ধুরু ব্যাটা, হাগু হবে তোর ডি এন এ দানবীর! আমি আব্বা, রিয়েল আব্বা।”
ছেলেকে নিয়ে খুনসুঁটি করতে করতে কেবিনের বাইরে চলে গেল সাইবান।

বেশ কিছুক্ষণ পর।
লঞ্চ ছেড়েছে প্রায় ঘণ্টাখানেক হয়ে গিয়েছে। রাত নেমে এসেছে চারপাশে। শীতল বাতাসের তীব্র ঝাঁপটা আসছে করিডোরে দাঁড়ালেই। অদূরে ঝাপসা শহুরে বাতি দেখা যাচ্ছে। আর কিছুক্ষণ বাদে তাও মিলিয়ে যাবে। রয়ে যাবে শুধু তারা ভরা আকাশ এবং নদীর কলকল ঢেউ।
ভি আই পি এরিয়ায় সকলের বসার জন্য আলাদা ব্যবস্থা আছে। সোফাসেট রাখা, মাঝখানে ছোট ছোট টেবিল। এখান থেকে বাইরের নদীর দৃশ্য স্পষ্ট উপভোগ করা যায়। এই মুহূর্তে অনুরাগ এবং তিতলি ছাড়া কেউ নেই আশেপাশে। ক্যান্টিন থেকে বেশ কয়েক ক্যান এনার্জি ড্রিংক কিনে এনেছে অনুরাগ। সেগুলো টেবিলের উপর। একটা হাতে তুলে ছিপি খুলতে না খুলতে হঠাৎ করে তিতলি বলে উঠল,
“এই অনু, চল, দুটো শট হয়ে যাক?”
তিতলির হঠাৎ কথায় অনুরাগ খানিক চমকে উঠল। মাথা কাত করে তাকাল।
“কি বলছিস তুই?”

বাঁকা হেসে রমণী নিজের পকেটের ভেতর ঠেসে রাখা একটা ছোট বোতল বের করে নিল। কালচে বোতলে চকচকে লেবেল। অনুরাগের ভ্রু উঁচু হয়ে উঠল বিস্ময়ে।
“তুই লঞ্চে এসব এনেছিস?”
তিতলি চোখ ওল্টালো,
“ওহ কাম অন, মজা করতে এসেছি তো করবনা?”
“কিন্তু এসব কি অ্যালাউড?”
“হু কেয়ার্স?”
তিতলি বোতলের ছিপিটা কামড়ে খুলল। গোলাকৃতির বস্তুটা দেখতে খানিকটা ছোট্ট কাপের মতন। সেটাতেই কিছুটা তরল ঢেলে অনুরাগের দিকে বাড়িয়ে দিল তিতলি। অনুরাগ খানিকটা বিব্রত হয়ে গ্রহণ করল। বোতলটা তুলে নিজের মুখে খানিকটা ঢেলে দিল রমণী, তারপরই মাথা ঝাঁকিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠল,
“উমমম! একটা খাসা মাল!”
অনুরাগ নিজের হাতের ছিপিতে খানিক দ্বিধা নিয়ে হালকা একটা চুমুক দিল। ঝাঁঝ একটু বেশি, সরাসরি মুখে দেয়া উচিত হয়নি। সে খানিকটা এনার্জি ড্রিংক ঢেলে আবার চুমুক দিল। তিতলি বিনা দ্বিধায় আরও বেশ খানিকটা গলায় ঢেলে বলল,
“আফনান আর নীরবকে মিস করছি। ওরা থাকলে জাস্ট জমে ক্ষীর হয়ে যেত। এখনি ড্রিংকিং গেম স্টার্ট করতাম। সে যাক, আমরা আমরাই খেলি। যা, জিনিকে ডেকে নিয়ে আয় কেবিন থেকে।”
“কিসের জন্য আমাকে খোঁজা হচ্ছে?”
অপ্রত্যাশিত কন্ঠস্বরটি ভেসে আসতেই উভয়ে ঘুরে তাকাল। সাইবান এসে ঢুকেছে। উজ্জ্বল চেহারা এবং তীক্ষ্ণ দৃষ্টি চোখে। ভ্রুতে পিয়ার্সিং চিকচিক করে দ্যুতি ছড়াচ্ছে। তাকে দেখেই তিতলি একটি হেঁচকি তুলে খিলখিলে কন্ঠে ডেকে উঠল,

“জিনিইইই!”
সাইবান এগিয়ে এলো। ড্রিংকের কারণে তিতলির ফর্সা চেহারায় লালচে ভাব ফুটে উঠতে শুরু করেছে। এর মধ্যেই দৃষ্টি কেমন যেন ঘোলাটে দেখাচ্ছে। টেবিলের কাছে অপর একটা সোফায় পায়ের উপর পা তুলে বসে পড়ল সাইবান।
“আমি আর অনু মিলে ড্রিংকিং গেম খেলার কথা ভাবছিলাম। আমার কাছে কার্ডও আছে।”
অপর পকেটে রাখা তাসগুলো বের করে টেবিলে ছড়িয়ে রাখল তিতলি। সাইবান এক নজর কার্ড এবং পরবর্তীতে ড্রিংকের বোতলের দিকে তাকাল। তিতলি বেশ উৎফুল্ল হয়ে বোতলটা এগিয়ে দিল তার দিকে, কিন্তু সাইবান মাথা নাড়ল।

“জার্নি করতে এসেছিস, এসব ছাড়াও এনজয় করার অনেক উপায় আছে।”
বলে নিজের পকেট থেকে সিগারেট আর লাইটার বের করে নিল সাইবান। তিতলি আর অনুরাগ একে অপরের দিকে তাকাল, বন্ধুর মাঝে সূক্ষ্ম পরিবর্তনটুকু কারোরই নজর এড়ালনা। সিগারেট ধরিয়ে হেলান দিয়ে বসে অদূরে নদীর দিকে চেয়ে রইল সাইবান। অন্ধকার, ঘন কালো ছাড়া কিছু চোখে পড়ছেনা। শুধু ঠান্ডা বাতাসটুকু টের পাওয়া যাচ্ছে। তামাটে ধোঁয়া ছাড়ল সে বাতাসে। তারপর হঠাৎ ঠান্ডা গলায় বলে উঠল,
“সত্যি করে বল তো তিতলি, তোর কি আমার ওয়াইফের সাথে বাইরে কোথাও দেখা হয়েছিল?”
ভ্রু তুলল তিতলি। এমন প্রশ্ন আশা করেনি সে। অনুরাগ দুজনের মাঝে হস্তক্ষেপ করলনা। নিজের এনার্জি ড্রিংকের ক্যানে চুমুক দিয়ে সতর্ক দৃষ্টিতে দেখতে লাগল শুধু। তিতলি খানিক হেসে পরিস্থিতি সামাল দিয়ে হাত বাড়িয়ে দিল, সাইবানের ঠোঁটে গুঁজে রাখা সিগারেটটা নিজের হাতে নিল,
“হঠাৎ এমন প্রশ্ন কেন করছিস? দেখা হলেও বড় আপুকে সালাম কালাম আমি ঠিকই দেই। হাহাহা!”
যেন বেশ এক মজার বিষয় বলেছে এমন ভঙ্গি নিয়ে সাইবানের আধখাওয়া সিগারেটটা নিজের ঠোঁটে ছোঁয়াতে গেল তিতলি। ঠিক ওই মুহূর্তেই খপ করে তার কব্জি চেপে ধরল সাইবান। কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, শক্তি প্রয়োগ করেই ধরেছে। খানিক হিসিয়ে উঠল তিতলি,

“আহ্, জিনি! লাগছে!”
“বড় আপু না, তোর জন্য হবে ভাবী!”
তিতলির কাছ থেকে নিজের সিগারেটটা ছিনিয়ে নিল সাইবান, নিজেও খেলনা, সামনে রাখা অ্যাশট্রেতে ঘষে নিভিয়ে ফেলল। বুকপকেট থেকে আরেকটা সিগারেট বের করে নতুন করে ঠোঁটে পুরল। এমন কান্ডে ভ্রু কুঁচকে ফেলল তিতলি। ঝাঁঝ নিয়ে বলল,
“হোয়াট দ্যা হেল? এমন করছিস কেন, জিনি?”
“আমার সিগারেটে হাত দিবি না।”
“কেন? আগে তো কখনো এমন করিসনি।”
“আগে বিবাহিত ছিলাম না। এখন বিবাহিত।”
টেবিলে না পারতে একটা চাপড় দিয়ে নিজের রাগ প্রকাশ করল তিতলি। ফুঁসছে সে রীতিমত। পাশের অ্যালকোহলের বোতলটা চেপে ধরল শক্তভাবে।
“এখন সামান্য সিগারেটের ভাগটুকুও কপালে জুটবে না? এই তোর বন্ধুত্বের নমুনা?”
“বন্ধুত্বের ভয়ংকর নমুনা আমি আরও অনেক আগেই দেখিয়ে ফেলেছি, তোকে নিজের দাম্পত্য সম্পর্ক নিয়ে বলে। তুইও বন্ধুত্বের নমুনা দেখিয়ে ফেলেছিস, আমার ওয়াইফকে পাল্টা সেসব কথা বলে।”
অতীব শান্ত সাইবান। তার কন্ঠস্বর গুরুগম্ভীর। তিতলি ফোঁস করে উঠল,

“আরেহ! আমি কি করলাম? আমি তো সাহায্যই করতে চেয়েছিলাম। ইরাম আপু…”
“ভাবী!”
শুধরে দিল সাইবান তৎক্ষণাৎ। দাঁতে দাঁত পিষে তিতলি উচ্চারণ করল,
“ভা…ভাবী! কাকতালীয়ভাবে সুপার শপে দেখা হয়ে গিয়েছিল। আমি তো শুধু চিন্তা থেকেই ওনাকে বলেছিলাম তোকে বুঝতে শিখতে, সবাইকে একরকম না ভাবতে। এটাও ওনার তোকে গিয়ে অভিযোগ জানাতে হয়? আনবিলিভেবল!”
অনুরাগের দিকে তাকাল রমণী, সাহায্যের আশায়,
“এইযে অনু, তুই কিছু বল, ভুল কিছু বলেছি আমি? বন্ধু হয়ে এটুকু করাও পাপ নাকি?”
“বন্ধু!”
হুট করে বাঁকা হাসল সাইবান। মৃদু শব্দ হলো, একইসাথে শিহরণ জাগানিয়া আবার মনোমুগ্ধকর। সোফায় সোজা হয়ে বসল সাইবান, হাঁটুতে কনুই ঠেকিয়ে সিগারেট দুই আঙুলের মাঝে ধরে সরাসরি তাকাল তিতলির দিকে,
“তুই সত্যিই আমার বন্ধু তো, তিতলি?”
তিতলি দৃশ্যমানভাবে কেঁপে উঠল খানিক। অনুরাগ এবার হস্তক্ষেপ না করে পারলনা। দুহাত তুলে সে দুজনের কাঁধে রাখল,

“ওকে গাইজ, অনেক হয়েছে। তোদের কারোরই মাথা ঠিক নেই। শান্ত হ। আমরা একটা পাবলিক প্লেসে আছি, জার্নি করছি। এর মাঝে এসব নিয়ে আলোচনা না করি প্লীজ?”
“আলোচনা করবনা কেন?”
কাঁধ ঝাঁকিয়ে অনুরাগের হাতটা সরিয়ে দিয়ে মৃদু গলায় গর্জে উঠল তিতলি। রেগে গিয়েছে স্পষ্টত। হুট করে উঠে দাঁড়াল সে। টেবিলে হাত রেখে ঝুঁকে এলো সাইবানের কাছে,
“ঠিকই বলেছিস তুই, আমি তোর বন্ধু না। বন্ধুর চাইতেও বেশি কিছু। যদি পরিস্থিতি মাঝখানে বাঁধ না সাধতো, তাহলে আজ তুই আমার থাকতি। এই কথাটা কি তুই অস্বীকার করতে পারিস? ওয়ায নট আই ইওর সিচুয়েশনশিপ, ডিয়ার?”
জমে গেল সাইবান। ক্ষণিকের জন্য তার চোখে অচেনা ঝিলিক খেলে গেল। ঠোঁটের সিগারেটটা অলসভাবে ঝুলে রইল। এমন সমর্পণ দেখে তৃপ্ত হলো তিতলি। অনুরাগ তার কব্জি পাকড়াও করে থামাতে চাইলেও নিজেকে ছাড়িয়ে নিল সে। একটি লতানো হাত বাড়িয়ে সাইবানের চিবুকে তর্জনী ঠেকাল। মোলায়েম হাসল,
“আমি তোর সাথে তখন থেকে আছি, যখন তোর কেউ ছিলনা। আমি তোর প্রথম, ছিলাম, আছি এবং থাকব। এই সত্যিটা তুইও অস্বীকার করতে পারবিনা। পারবি, বল আমার জিনি?”

“আলাদিন। আমার নাম….আলাদিন।”
গভীর স্বরটি তিতলিকে থমকাতে বাধ্য করল। অবাক হয়ে সে চেয়ে রইল সাইবানের মুখপানে। নিজের চিবুক থেকে তিতলির হাতটা সরিয়ে দিল সে, উঠে দাঁড়াল। সুঠাম, সুগঠিত, পুরুষালী ভারিক্কি শরীরের সামনে নিজেকে তুচ্ছ কিছু মনে হলো তিতলির। সাইবানের ছায়া যেন তাকে গ্রাস করে ফেলল সম্পূর্ণ। সরাসরি রমণীর চোখের দিকে তাকাল সাইবান, কন্ঠে আদেশসূচক ভাবটি ধরে রেখে বলল,
“তোকে আমি নিজের কাছের মানুষ মনে করি। তোর কাছে আমি কৃতজ্ঞ ছিলাম এবং থাকব। তোর প্রতি আমার যতটুকু বন্ধুত্বের টান বেঁচে আছে সেটুকু নষ্ট করিস না।”
একটু থেমে সে যোগ করল,
“পরিস্থিতি মাঝখানে বাঁধ না সাধলেও আমি কোনোদিন তোর হতাম না, তিতলি। তুই আমার বন্ধু হতে পেরেছিস ঠিকই, কিন্তু আত্মার সঙ্গী হতে পারিসনি। যদি তোকে আমার অন্যভাবে পাওয়ার বাসনা থেকেই থাকত, আমি তোকে কমিটমেন্ট ইস্যুতে জড়াতাম না। অথচ প্রথম থেকে বারংবার তোকে আমি বলে এসেছি, ভালোবাসা আমার দ্বারা হবেনা। তুই শুধু আমার শরীরী খোলসটাকে চেয়েছিস, মনটাকে চাসনি। চাইলে ঠিকই বুঝে যেতিস, এই মন কি চায়, এই হৃদপিন্ড কার নামে স্পন্দিত হয়।”

নিষ্পলক চেয়ে রইল তিতলি, চেহারায় ফুটল অত্যাশ্চর্য এবং বিষণ্নতা। অনুরাগ অবধি প্রসারিত নয়নে চেয়ে আছে। সাইবান সরে দাঁড়াল, সিগারেটে লম্বা একটা টান দিয়ে তামাটে ধোঁয়া ছেড়ে জানাল,
“বারবার শুরু থেকে পাশে থাকার যে দোহাই দিচ্ছিস, সেই দোহাইয়ের সম্মান রেখেই বলছি, এই শেষবারের মতন আমি তোকে টলারেট করে নিলাম। আর একবার তোর মুখে যদি আমি আমার স্ত্রীর সম্পর্কে কোনো মন্তব্য শুনি, সে ভালো হোক কি খারাপ, আমি বাছবিচার করবনা কোন কালের কোন হনু তুই। শুধু মেয়েমানুষ বলেই যে আমি কাউকে তার পাওনা উত্তম মধ্যমের ভাগ থেকে বঞ্চিত করিনা, সেটা তুই ভালো করেই জানিস! ফিমেল ভিকটিম কার্ড সুশীলরা শোঁকে, আমি সুশীল না।”
উল্টো ঘুরে গেল সাইবান, আর পিছনে ফিরে তাকালনা। বেরিয়ে গেল বাইরে। তিতলি ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইল নিজের জায়গায়, যেন বজ্রাহত হয়েছে। অনুরাগ কপালে হাত চেপে দীর্ঘশ্বাস ফেলল, অস্ফুট স্বরে বলল,
“এবার শান্তি হয়েছে তোর?”
অথচ তিতলি যেন তার কথাটা শুনতেই পেলনা। কেউ খেয়ালও করলনা, বাইরের এক কোণায় এতক্ষণ যাবৎ দাঁড়িয়ে কথাগুলো শুনেছে এক রমণী।

করিডোরের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে সাইবান। মাঝনদীতে থাকায় এখন হাড়হীম করা শীতল বাতাস গায়ে লাগছে দারুণভাবে। সমস্ত লঞ্চ অত্যন্ত আলতো তালে দুলছে ঢেউয়ের সঙ্গে। এই দিকটা ছাদের কাছাকাছি হওয়ায় বেশি মানুষ নেই। অধিকাংশ নিজেদের কেবিনে, নাহলে ক্যাফে আর ক্যান্টিনের দিকে আড্ডা দিচ্ছে। দূর থেকে একদল বন্ধুদের বাজানো গিটার আর গানের সুর ভেসে আসছে মৃদুভাবে। সাইবান নীরবে দাঁড়িয়ে দূরে তাকিয়ে আছে, যেখানে এখন শুধুই কালো, কোনো আলো নেই। এই মহতী নদীর মাঝে একাকী এই লঞ্চ, লঞ্চের ভেতরে ছোট্ট শহর। কি অসহায় মানবজাতি! একটা ঝড় উঠলে কি আর কিছু বাকি থাকবে? ভাবতে ভাবতে বাতাসে তামাটে ধোঁয়া উড়িয়ে দিল সাইবান। এটা তার চতুর্থ সিগারেট। নিজের শরীরের অশেষ ক্ষতির মাঝেও যে কি শান্তি, সিগারেটই যেন তার প্রমাণ! তার মতন কত অদ্ভুত মানুষই না আছে দুনিয়ায়!
হুট করে সাইবানের হাতে একটা চাপড় পড়ল। ভড়কে গেল সে। হাতের সিগারেটটা ছিটকে নিচের নদীর পানিতে পড়ে গেল। সাইবান হতভম্ব হয়ে পাশে তাকাতেই আবিষ্কার করল ইরামকে।
“আম খাও, জাম খাও, ভাত খাও, বিরিয়ানি খাও, সিগারেটই কেন খেতে হবে?”
নরম গলায় বলল ইরাম, স্বামীর পাশে রেলিংয়ে হাত রেখে দাঁড়াল। সাইবান প্রথমটায় অবাক হয়ে থেকে শেষে মুচকি হেসে জবাব দিল,

“আমি সিগারেট খাই না, সিগারেট আমাকে খায়।”
“নিজেকে না খাওয়ালে হয়না?”
“ছেড়ে দিতে বলছেন?”
”যদি বলি হ্যাঁ, ছেড়ে দেবে?”
“আপনি বললে শুধু সিগারেট কেন? পৃথিবীটাও ছেড়ে দিতে রাজী আছি।”
ইরাম এবার চোখ ওল্টালো,
“তুমি আমার সঙ্গে ফ্লার্ট করছ, তাইনা আলাদিন?”
সাইবান রেলিংয়ে পিঠ ঠেকিয়ে হেলান দিয়ে বুকে দুবাহু বেঁধে বলল,
“ওমা! কি শিক্ষিত! আপনি ফ্লার্টিং কি বোঝেন? ভালো ভালো। এখন আর অবুঝ অবোধের সাথে তর্ক করতে হবেনা।”
“আমি শুধু বুঝি না, খুব ভালো করেই জানি ফ্লার্ট তুমি আরও কত জনের সাথে করেছ। এমনিতে তো আর সিচুয়েশনশিপ আর বেঞ্চিংয়ের লিস্ট বাড়েনি।”

“আপনি এটাও জানেন আমি সবার সাথে ফ্লার্ট করি? বাহ্!”
“যাক। স্বীকার করলে তাহলে।”
“অবশ্যই। স্বীকার না করার কি আছে? আপনি আমার সাথে ফ্লার্ট করলে আমিও ফ্লার্ট ব্যাক করব। পার্থক্য শুধু একটাই। দিনশেষে আপনি প্রেমে পড়ে যাবেন, কিন্তু আমি পড়ব না।”
ইরাম শান্ত চেয়ে দেখল সাইবানকে। ছেলেটা দুষ্টুমির হাসি হাসছে। নদীর উপর দিয়ে ধেয়ে আসা শীতল বাতাসের ঝাঁপটায় চুলগুলো এলোমেলো হয়ে উড়ছে তার। হঠাৎ একটি হাত বাড়িয়ে দিল ইরাম, সাইবানের বুকে বেঁধে রাখা বাহুর উপর রাখল। নরম কন্ঠে শুধাল,
“আর কতকাল নিজেকে এমন মিথ্যা খোলসে ঢেকে রাখবে বলে পণ করেছ?”
সাইবানের ঠোঁটের হাসি মিইয়ে এলো। ইরামের দিকে সে খানিকটা বিস্ময় এবং কৌতূহল নিয়ে তাকাল। অর্ধাঙ্গিনী তার ছোট একটি নিঃশ্বাস ফেলল। অতঃপর তার কাঁধ ঘেঁষে দাঁড়াল। নদীর দিকে দৃষ্টি ফেলে বলল,

“আমাকে একটা প্রশ্নের উত্তর দেবে, আলাদিন?”
“কি প্রশ্ন?”
“তোমাদের জেনারেশনে প্রেমের এত নাম প্রকার কেন?”
ভ্রু কুঁচকে ফেলল সাইবান। বুঝতে পারছেনা স্ত্রীকে। ইরাম শান্ত গলায় বলল,
“সিচুয়েশনশিপ, বেঞ্চিং, ব্রেডক্রাম্বিং, পকেটিং, গোস্টিং, অরবিটিং, কুশোনিং! এত এত অনুভূতির ধরন দিয়ে কি বোঝায় আসলে?”
এবার সত্যিই সাইবান ভীষণ রকমের অবাক হলো। ইরাম এতকিছু জানল কবে? সে তো কয়েকটা ছাড়া অন্যগুলো কখনো ব্যবহারও করেনি! তবে কি নিজে নিজে জেনেছে?
“কখনো ভেবে দেখেছ, এটা আসলে বৈধভাবে চিটিং করা নয়ত?”
ইরামের কথায় সাইবান চমকে উঠল। বড় বড় চোখ মেলে তাকাল,
“চিটিং?”

“হ্যাঁ। এই যেমন ধরো, সিচুয়েশনশিপের কথাই ধরি। তোমরা প্রেমিক প্রেমিকার মতন সম্পর্কে থাকবে ঠিকই, কিন্তু মুখে স্বীকার করবে না। কারো কাছে পরিচয়ও দেবে না। কমিটমেন্ট ছাড়া সম্পর্ক। সেক্ষেত্রে একজন যদি অপরজনকে ছেড়েও দেয়, অন্য কারো আকর্ষণে পরে যায়, তাহলে প্রতিবাদ করা যাবে না। কারণ সিচুয়েশনশিপ মানেই এমন। এটা মানেই এমন নাকি সহজ ভাষায় এক পার্টনারকে সময় পেরিয়ে আর ভালো না লাগলে যেন অন্য কাউকে ধরতে পারি বলে স্রেফ একটা টার্ম সৃষ্টি করে দেয়া হয়েছে? যেন চিটিং জিনিসটাকে চিটিং না বলা যায়?”
সাইবানের ঠোঁটজোড়া এক ইঞ্চি ফাঁক হলো, অথচ সে ইরামকে কোনো জবাব দিতে পারলনা। এই যুক্তির বিপরীতে যুক্তি কি? ভেবে পাচ্ছে না সে। ইরাম একদম শান্ত গলায় কথাগুলো বলে যাচ্ছে,
“বিয়ের আগে তুমি আমাকে বলেছিলে, তোমার নাকি একটা সিচুয়েশনশিপ আর একটা বেঞ্চিং ছিল। আচ্ছা, যাকে বেঞ্চিং করেছ তার মনের কথা ভেবেছ? তুমি আসলে চাইছ অন্য কাউকে, কিন্তু একজন তৃতীয় ব্যক্তির সাথে কথা বলে, গল্প করে, আশা দিয়ে রেখেছ যে হয়ত সেও তোমার জীবনে অর্থ রাখে। সে তোমার কাছে সেকেন্ড অপশন, যদি এটা না হয় তাহলে ওটা টাইপ। সে আদতে তোমার পছন্দেই ছিলনা কোনকাল। আলাদিন, যে মেয়েটাকে তুমি বেঞ্চিং করেছ, তার মনের অবস্থা কখনো ভেবে দেখেছ?”
সাইবান ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ফেলল। শব্দ হাতড়ে পেলনা। দৃষ্টি লুকিয়ে পায়ের দিকে চেয়ে রইল। ইরাম একটু সময় বিরতি দিয়ে বলল,

“আমার কি মনে হয় জানো? এই সবকিছুই আসলে মানুষের মনের ফ্যান্টাসি পূরণের জন্য সৃষ্টি করা মূর্খ কিছু শব্দমাত্র। নিজের প্রতারণাকে জাস্টিফাইড করার আধুনিক হাতিয়ার। এই সব শব্দের চক্করে পড়ে কত মানুষের জীবন ধ্বসে যাচ্ছে! ভালোবাসা শব্দটার উপর থেকেই মানুষ বিশ্বাস হারিয়ে ফেলছে। তাই আমি তিতলিকে পুরোপুরি দোষ দিতে পারিনা। দোষ তোমারও ছিল আলাদিন।”
বুকের ভেতর আটকে রাখা নিঃশ্বাসটা অবশেষে ফেলল সাইবান। ইরামের কথা অর্থবোধক হয়েছে শেষমেষ। বেশ লম্বা সময় জুড়ে কেউই কথা বললনা। ইরাম শান্তভাবে দাঁড়িয়ে দেখে গেল নদী, আর সাইবান বরফ হয়ে ওঠা মস্তিষ্কে ভেবে গেল তার কথাগুলো। অবশেষে প্রায় মিনিট দশেক পরে মুখ খুলল সাইবান।
“সরি। আমি কখনো এভাবে ভেবে দেখিনি।”
ইরাম এক নজর তার দিকে তাকাল, পরক্ষণে আবার নদীর দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে বলল,
“না ভাবলে, এখন ভাবো। তুমি জেনারেশন জেড এর ছেলে, আধুনিক হবে, ট্রেন্ড ফলো করবে স্বাভাবিক। কিন্তু এই ট্রেন্ড ফলো করতে গিয়ে যেন নিজের এবং অপরের ক্ষতি না করে বসো, সেটা খেয়াল রেখো। দুঃখকে যতই হাসি দিয়ে ঢেকে রাখার চেষ্টা করো না কেন, দুঃখ প্রশমিত হবে মাত্র, চিরতরে মুছবেনা।”
“আপনার কি মনে হয়? আমি হাসির মাঝে দুঃখ লুকাই?”

“হতেও তো পারে। ইংরেজিতে একটা কথা আছে, দ্যা ব্রাইটেস্ট স্মাইল হাইডস দ্যা ডিপেস্ট স্কার।”
সাইবানের হৃদস্পন্দন ক্ষণিকের জন্য সত্যিই থেমে গেল। ইরামের পাশে দাঁড়িয়ে তার মনে হলো, যেন এই রমণী তার শরীর ভেদ করে সরাসরি অন্তর পড়ে ফেলেছে! কিন্তু, ইরামের তো জানার কথা নয়! আন্দাজ করারও কথা নয়! কেউ কি কিছু বলে দিয়েছে কোনোভাবে? সারিকা? অনুরাগ? কিংবা তিতলি নিজে? ভেবে কূল পেলনা সে।
একদম সহজাত বৈশিষ্ট্যের কারণেই এবারেও ইরামের কাছে ধরা দিলনা সাইবান। ঠোঁটে সেই দুষ্টুমির হাসিটি ফুটিয়ে জাগতিক সকল জটিলতাকে ঢেকে ফেলল একটা খোলসের আড়ালে।
“আপনি হঠাৎ করে দার্শনিক হয়ে গেলেন আজ? লঞ্চ দেখছি সবার মাথা ঘেঁটে রেখে দিচ্ছে।”
“আমার মাথা ঠিকই আছে। ইযান ঘুমিয়েছে, সুগন্ধা পাশে বসে মনের সুখে নিজের পছন্দের চাইনিজ মুভি দেখছে। তাই শান্তিতে আছি। নদী দেখে দার্শনিক হতে মনে চাইলো, হয়ে গেলাম।”
সাইবান হুট করে ইরামের পিছনে দাঁড়াল। তার বড়সড় শরীর রমণীর পাতলা শরীরে ছুঁয়ে গেল, শক্তিশালী দুই বাহু পিছন থেকে ইরামের কোমর জড়িয়ে ধরল। নিজের মাথাটা সাইবান স্ত্রীর কাঁধে রাখল। লঞ্চ পানিতে বিশাল ঢেউ তুলে এগিয়ে যাচ্ছে। মৃদু আলো খেলা করছে টলটলে পানিতে। কচুরিপানা ভেসে আসছে, ঢেউয়ে ঢেউয়ে দোল খাচ্ছে। সেদিকে তাকিয়ে সাইবান কোমল গলায় ব্যক্ত করল,

“আমি অনেক রগচটা, জানেন তো? যাদের আপন ভাবি, তাদের সাথে কিছু হলে সইতে পারিনা। মাঝে মাঝে মনে হয়, আমার ভেতর বোধ হয় কোনো অশরীরী বাস করে। চরম বিপদের সময় হুট করে বেরিয়ে আসে। চাইলেও তখন নিজেকে রুখতে পারিনা। আমার কথা নয়, আফনানদের কথা। আমাকে নাকি তখন দেখতে ভূতের মত লাগে।”
এভাবে জড়িয়ে ধরায় ইরাম খানিকটা বিব্রত হলো বটে, তবে স্বামীকে সরিয়ে দিলনা। মাথাটা পিছনে হেলিয়ে সাইবানের বুকে ঠেকিয়ে চুপটি করে শুনে গেল।
“আমি নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনা। ঠিক তেমনি দায়িত্বের বেড়াজাল বইতে পারিনা। আমার সবসময় মনে হয়, জীবন, পরিবার, সংসার, দায়িত্ব বিষয়গুলো আমার জন্য না। দমবন্ধ লাগে নিজেকে এমনভাবে কল্পনা করতে গেলেও। অথচ, আপনি আসার পর সবটা কেন যেন বদলে গেল।”
“বদলে গেল? কীভাবে?”

ইরাম প্রশ্ন ছুঁড়ল। সাইবান মৃদু হেসে তার গালে নাক ঘষে জানাল,
“উত্তরটা নাহয় আমার মনের মাঝেই থাক? আজ শুধু আপনাকে এটুকু বলতে চাই, ইরাম আপু, আপনার ভয়, আপনার আশঙ্কা সবকিছুই আমি ইদানিং বুঝতে শিখেছি। তাই আশ্বাস জানাতে চাচ্ছি, আ’ম রিয়েলি সিরিয়াস অ্যাবাউট আওয়ার রিলেশনশিপ!”
এক লহমার জন্য থমকে গেল রমণী। মাথা সামান্য কাত করে জ্বলজ্বলে দৃষ্টিতে দেখল সাইবানের মুখটাকে। এতটা কাছ থেকে সবকিছুই যেন স্বপ্নীল সৌন্দর্যে ঘেরা। সাইবান ঝুঁকে তার নাকে নিজের নাক ছুঁইয়ে দিয়ে বলল,
“আমাকে দেখতে হয়ত উগান্ডার প্রাণী মনে হয়। একটা বাউন্ডুলে দায়িত্বজ্ঞানহীন ছেলে, চাল নেই, চুলো নেই, সারাদিন ডিজে গিরি করে বেড়ায়, মারামারিতে চৌষট্টি পা এগিয়ে, গুন্ডাদের মতন ভ্রুর মাঝে রিং ঝুলে, বাট ইউ শুড নো আ’ম ট্রায়িং। আই উইল ট্রাই টু বি আ বেটার হাসবেন্ড টু ইউ, আই উইল ট্রাই টু বি আ বেটার ফাদার টু মাই বেবি বয়। আমি চাই, আপনি একটুখানি জানুন, একটুখানি বুঝুন যে….আমি আপনার সেই ছোট খালাতো ভাইটা নেই। আপনি কি এখনো আমাকে ভাইয়ের মতোই দেখেন, ইরাম আপু?”
একদৃষ্টে চেয়ে রইল ইরাম। পরক্ষণে উত্তর করল,

“আমি তোমাকে কিসের মতো দেখি, তা আমি নিজেই জানিনা।”
সাইবানের চেহারা খানিক ঝুলে পড়ল। ইরাম নিজের কোমরের চারপাশে জড়ানো তার হাতের উপর নিজের একটা হাত রাখল, মৃদু হেসে বলল,
“কিন্তু তোমাকে এত ভাবতে দেখে আমি সত্যিই অবাক হলাম। শুরুতে যে ছেলে এই বিয়ে থেকে পাঁচশো হাত দূরে ভেগেছে, সে এখন আমায় বলছে, সে চেষ্টা করছে একজন ভালো স্বামী আর বাবা হওয়ার। ভালো টালো বেসে ফেলেছ নাকি?”
কথাটা ইরাম খোঁচা দিয়ে মজা নিতেই বলেছে। অথচ সাইবানের দুই বাহু তার সমস্ত শরীরে সজোরে চেপে গেল। তার ঘাড়ে মুখ ডুবিয়ে সাইবান ফিসফিস করে শুধাল,
“যদি বলি ভালোবাসি, তবে বিশ্বাস করবেন?”
ইরাম অজান্তেই সামান্য শিউরে উঠল, পরক্ষণে পাল্টা জবাব দিল,
“এক মুখে আপু ডাকো, আবার বলো ভালোবাসো। প্রিটি লিটল পারভার্ট, আরে’ন্ট ইউ?”
খিলখিল করে হাসল সাইবান, তার তপ্ত শ্বাস ছুঁয়ে গেল ইরামের ত্বক। মনে হলো প্রত্যেক লোম বুঝি দাঁড়িয়ে গিয়েছে শিহরণে।

“আমার আপু ডাকে খুব সমস্যা হচ্ছে নাকি আপনার?”
লজ্জা পেয়ে গেল ইরাম, গালজোড়া লালচে হয়ে উঠল।
“না…মানে…আমাদের বিয়ে হয়ে গিয়েছে এরপরও তুমি আপু ডাকো…এমনিতেই বলছিলাম। আমার ওসব সমস্যা টমস্যা হয়না।”
“হুম। বুঝতে পেরেছি। ইরাম আপু একটুও বিরক্তবোধ করেন না। ওকে ফাইন, ইরাম আপুকে তাহলে আমি এখন থেকে বারবার আপু ডাকব। ঠিক আছে আপু?”
ইরামের ভ্রুজোড়ায় তীব্র ভাঁজ পড়ল। দাঁতে দাঁত পিষে নাকের ডগায় ক্রোধ নিয়ে সে বলল,
“ভালো হচ্ছে না কিন্তু, আলাদিন!”
“কেন ভালো হচ্ছেনা, আপু?”
“আলা…উমম!”

ইরাম মাথা কাত করে প্রতিবাদের সুরে কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু পারলনা। অত্যন্ত কাছাকাছি থাকায় সাইবানের ঠোঁটের সাথে তার ঠোঁট ছুঁয়ে গেল। কিন্তু প্রথমবারের মতন এবার সহসাই ছাড়া পেলনা সে। এর পরিবর্তে সাইবানের একটি হাত ইরামের ঘাড়ে জড়িয়ে গেল, অন্যটি চেপে ধরল কোমর। হ্যাঁচকা টানে নিজের শরীরের সাথে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলল সে অর্ধাঙ্গিনীকে। তার ঠোঁটের মাঝে ডুবিয়ে দিল নিজের ঠোঁট, মায়া আস্বাদন করতে লাগল নিগূঢ়ভাবে। ইরাম প্রথমটায় জমে গেল, হাত দিয়ে হালকা ধাক্কা দিল সাইবানের বুকে। কিন্তু পরমুহূর্তেই তার মস্তিষ্ক বুঝি থমকে গেল। সরিয়ে দিতে ইচ্ছা হলনা। বুকের ভেতর অনুভূতির উষ্ণতা ভর করল। এই নিরাপদ বাহুডোরে যেন তার কোনো ক্ষতি হবেনা। ইরাম তাই আজ নিজেকে রুখলনা, সঁপে দিল। চোখজোড়া বুঁজে এলো তার আবেশে। হাতের আঙুল খামচে ধরল সাইবানের জ্যাকেট। ধীরে ধীরে সাঁড়া দিল অনুভূতির ডাকে।
শীতল বাতাস ঝাঁপটা দিয়ে গেল গায়ে। অথচ দুটি সত্তা তা অনুভবই করলনা। লুটিয়েছে তারা একে অপরকে আজ আপন সত্তায়। সাইবান আদরের ছোঁয়া ক্রমশ গভীর থেকে গভীরতর করে তুলল। ইরামের প্রতিটি কম্পন, প্রতিটি প্রতিক্রিয়া তার অস্তিত্বে ঘূর্ণিপাক খেলিয়ে দিল। চোখজোড়া হালকা একটু খুলল সে, সম্মোহিত নয়নে দেখল কীভাবে অর্ধাঙ্গিনী নিজেকে সমর্পণ করে দিয়েছে তার দুয়ারে। একটুখানি থামল সাইবান, ইরামের ঠোঁটের উপর জড়ানো গলায় ফিসফিস করে বলল,

“নেশা তামাকে নেই, নেশা আপনার ঠোঁটে।”
ইরাম ভারী নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে জ্বলজ্বলে চোখ মেলে তাকাল। সাইবান পুনরায় তার ঠোঁটে চুমু খেল, এবার অত্যন্ত যত্ন নিয়ে, আলতোভাবে, দীর্ঘ সময় ধরে। এরপর হঠাৎ করেই থেমে গেল সে। আচমকা ঘাড় ঘুরিয়ে করিডোরের প্রান্তে তাকাল। ইরামের মনে হলো তার শরীর দুলছে। সাইবানের কাঁধে মাথা ঠেকিয়ে সেও তাকাল। অথচ ওদিকটায় কালিগোলা অন্ধকার ছাড়া কিছুই চোখে পড়লনা তার। ধড়ফড় করতে থাকা হৃদযন্ত্র সামলে সে জিজ্ঞেস করল,

“কি হয়েছে?”
সাইবান তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আরও কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে জবাব দিল,
“মনে হলো, কেউ আমাদের দেখছে।”
ইরাম সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে তাকাল সামনে ভালোভাবে। নাহ, কিছুই দেখতে পেলনা এবারেও। ওদিকটা একদমই ফাঁকা।
“কোথায়?”
পিছনে সাইবান মুহূর্ত কয়েক দাঁড়িয়ে থেকে শেষমেষ নিজের চেহারার ধার লুকিয়ে নমনীয় করে বলল,
“আমার মনের ভুল বোধ হয়।”
এগিয়ে এসে নিজের গায়ের জ্যাকেটটা খুলে ইরামের কাঁধে জড়িয়ে দিল সে,
“ঠান্ডা বাড়ছে, কেবিনে চলুন।”
ইরাম অবাক হয়ে সাইবানের দিকে তাকাল। একটা হাফ হাতা টি শার্ট পরনে ছেলেটার।

আমার আলাদিন পর্ব ৩৪

“একি! তোমার ঠান্ডা লাগবেনা?”
জ্বলজ্বলে ঠোঁটে জিভ বুলিয়ে তীর্যক হাসল সাইবান। হাত বাড়িয়ে ইরামের কাঁধে জড়ানো ওড়নাটা হাতড়ে নিয়ে জ্যাকেটটা ভালোমত পরিয়ে দিল। সেই ওড়নাটা নিজের গায়ে চাদরের মতো করে জড়ালো সে।
“এবার আর ঠান্ডা লাগছেনা। চলুন।”
ইরামের একটা হাত ধরে হাঁটতে শুরু করল সে। অর্ধাঙ্গিনী তাকে অনুসরণ করতে করতে অপলক চেয়ে রইল। বুকের ভেতর দামামা বাজল উভয়ের। হিমশীতল বাতাসও তাদের শরীরী উত্তাপ প্রশমিত করতে পারলনা আর।

আমার আলাদিন পর্ব ৩৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here