Home আমার আলাদিন আমার আলাদিন পর্ব ৫২

আমার আলাদিন পর্ব ৫২

আমার আলাদিন পর্ব ৫২
জাবিন ফোরকান

গাড়ির বনেটে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে দূর গগনে চেয়ে আছে অনুরাগ। রোদ ঝিকিমিকি করছে। সাদা মেঘের ভেলার আড়ালে অচেনা পাখির দল উড়ে বেড়াচ্ছে। সময়টা সকাল ১০ টার কাছাকাছি। তবে নেই রোদের তেজ। হালকা মেঘলা আকাশ ছাপিয়ে ঠান্ডা বাতাস রাঙিয়েছে প্রকৃতিকে। এমন দৃশ্য ঢাকা শহরের ইট পাথরের ফাঁদে মেলেনা। মন ভরে দেখল অনুরাগ। তবে সবকিছু পেরিয়ে তার কানে বাজল একটি মোহনীয় কন্ঠস্বর,

—মনমত উষ্টা খান, বাঁচিয়ে নেয়ার জন্য নাহয় আমি এভাবে প্রতিবার হাত বাড়িয়ে দেব?
গতকাল বিকালে মন্দিরের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে সুগন্ধা যা বলেছে, তার অর্থ উদঘাটন করতে পারেনি অনুরাগ। মেয়েটা কি মজা করেছে? সেই সম্ভাবনাটাই বেশি। এরপরেও কেন এমন অনুভূত হচ্ছে অনুরাগের? কেনই বা সে গত বিকালে পূজার সময় ক্ষণে ক্ষণে মেয়েটার দিকে ফিরে তাকিয়েছে? এটা কি কৌতূহল? নাকি অন্য কিছু? অন্তরে এমন অবাধ্য দ্বৈরথ কেন সৃষ্টি হলো? হুট করে ভিন্ন একটি মুখচ্ছবি মনের পর্দায় নেমে এলো। হাস্যোজ্জ্বল সারিকা, তরুণী সারিকা, ডেন্টিস্ট সারিকা, অতঃপর বধূর সাজে সারিকা। শক্তভাবে চোখ বুঁজে ফেলল অনুরাগ। তৎক্ষণাৎ মাথা ঝাড়া দিল। মন তাকে দারুণভাবে শাসাল, ন্যাড়া বেলতলায় একবারই যায়।
উদ্ভট চিন্তা দূর করতে হাতঘড়ির দিকে চেয়ে পরমুহূর্তে বাড়ির গেটের দিকে তাকাল অনুরাগ। কাউকেই এখনো বেরোতে দেখা যাচ্ছেনা। এদিকে গাড়ির ভেতর সবকিছু প্রস্তুত। গতকাল রাতে শহর থেকে তিতলির দুজন কাজিন এসেছে। মিস্টার চৌধুরী নাকি পাঠিয়েছেন মেয়েকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। তিতলি বিনা বাক্য ব্যয়ে দূর্বল শরীর নিয়েও চলে গিয়েছে তাদের সাথে। অনুরাগ অনুরোধ করেছিল ভালোমত সুস্থ হলে তারপর যেতে। মেয়েটি কারো কথা শোনেনি। তিতলি চলে যাওয়ার পর অনুরাগ ভেবেছিল, বরিশালের দিন ফুরিয়েছে। তারাও এবার শহরের পথে রওনা দেবে। তবে হুট করে কাল মাঝরাতে সাইবান রুমে গিয়ে জানাল, ব্যাগ গুছিয়ে নিতে। সকালে কুয়াকাটার উদ্দেশ্যে যাত্রা করবে তারা।

আজ সকালে কল করে ভার্সিটি থেকে অতিরিক্ত তিন দিনের ছুটি নিতে বাধ্য হয়েছে অনুরাগ। এমনিতে সে খুব বেশি ছুটি কাটায়না, তাই আগের অনেক ছুটি জমা আছে। লাভ হয়েছে তাতে। ভাবতে ভাবতে পায়ের শব্দ শুনল সে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছে সুগন্ধা। মেয়েটার পরনে ফ্রকের মতন গোল জামা, ওড়না কাঁধের একপাশে ঝুলিয়ে রাখা। হাতে কয়েকটা টিফিন বক্স। খুব সম্ভবত সড়কপথে নাস্তার জন্য। অনুরাগ চেয়ে দেখল মেয়েটাকে আপাদমস্তক, পুনরায় তার কুচবরন দীঘল চুলে দৃষ্টি আটকাল। সঙ্গে সঙ্গে চোখ ফিরিয়ে নিল সে। সুগন্ধাও তাকে কিছু বললনা। বিশেষ মনোযোগ না দিয়ে নিঃশব্দে গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে উঠে বসল।
“সাইবান! হলো তোদের? জলদি আয়!”

গলা উঁচু করে ডাক দিল অনুরাগ। বাড়ির ভেতর থেকে কোনো জবাব এলোনা। সে ট্রাংক খুলে আরেক দফায় পর্যবেক্ষণ করল। সবার লাগেজ আর জিনিসপত্র তোলা হয়েছে ঠিকঠাক। তারা আর বাড়িতে ফিরবে না। কুয়াকাটা থেকেই সোজা ঢাকায় রওনা দেবে। এমন সময় বাড়ির ভেতর থেকে একসঙ্গে বেরিয়ে এলো সাইবান আর ইরাম। ইরামের পরিধানে নেভি ব্লু রঙের শাড়ি, তার উপরে ছোট ছোট সাদা ফুলের প্রিন্টের কাজ। চুলগুলো বেণী করে একপাশে ঝোলানো। ইযান সাদা সুতির ফতুয়া এবং প্যান্টে সজ্জিত। পায়ে ছোট্ট কুশিকাটার কাজের মোজা দেখতে ভীষণ আদুরে লাগছে। মায়ের বুকে লেপ্টে আছে সে। তাদের ঠিক পিছনেই সাইবান। ইরাম আর ইযানের স্নিগ্ধ বেশভূষার সঙ্গে তার কোনো মিল নেই। রিপড জিন্স আর ঢোলা হুডি পড়েছে, হুডির টুপিটা মাথায় তুলে রেখেছে ঘোমটার মতন। একপাশে দেশ, আরেকপাশে বিদেশ। বাহ্যিক দৃষ্টিতে তাই মনে হয়। বন্ধুর হাতে একটি মেয়েলী পার্স ঝুলতে দেখে মুখ টিপে হাসল অনুরাগ। ওটা যে ইরামের তাতে সন্দেহ নেই, সাইবান নিজের কব্জিতে সেটা ঝুলিয়ে রেখেছে। স্ত্রী সন্তান বেরোতেই সে ঘুরে ভালোমত দরজা টেনে ইয়া বড় বড় কয়েকটা তালা আটকে দিল। অতঃপর হাত ঝেড়ে পার্স দোলাতে দোলাতে স্ত্রীর পিছু গাড়ির দিকে এগোল। অনুরাগ এই অদ্ভুতুড়ে প্রদর্শন দেখতে দেখতে ভাবল, এমন পরিবার লাখে একটা হয় কিনা সন্দেহ।
গাড়িটা চার সিটের। ইযানের জন্য আলাদা সিট বসানোর জায়গা নেই বিধায় সে মায়ের কোলেই থাকবে। তার পাশে বসেছে সুগন্ধা। সাইবান ড্রাইভ করছে তাই সে সামনে। তার সঙ্গে অনুরাগ। বিনা বাক্য ব্যয়ে গাড়ি চলতে শুরু করতেই ইরাম ব্যাগ থেকে একটা বই বের করল। বাচ্চাদের জন্য কার্টুন আঁকা বই। এতে নানান প্রাণী, খাবার, জ্যামিতিক আকৃতি ইত্যাদির রঙিন ছবি দেয়া। শুরু থেকেই বাচ্চাদের কালার সেন্স এবং ব্রেইন পাওয়ার বাড়াতে বেশ কাজে দেয়। সে কোলে ইযানকে বসিয়ে বইটা খুলল।

“এইযে আব্বু…এটা কি বলো তো? উম…আপেল! লাল লাল আপেল।”
“আ!”
শব্দ করে উঠল ইযান। মজা পেয়ে জোরে জোরে বইয়ের পৃষ্ঠায় হাত দিয়ে ঘুষি বসাতে লাগল। ওটাই তার খেলা। ইরাম মুচকি হাসল। ঝুঁকে ছেলের সঙ্গে ওসব কর্মকান্ডে ডুবে গেল। অপরদিকে সুগন্ধা হেলান দিয়ে আয়েশ করে হাতে ফোন আর কানে এয়ারবাড গুঁজে বসেছে। নতুন একটা জাপানিজ সিরিজ দেখতে শুরু করেছে সে। অসামান্য মনোযোগ নিয়ে তাই দেখে যাচ্ছে। সাইবান স্টিয়ারিং সামলে লুকিং গ্লাসে পিছনের দিকে তাকাল। অর্ধাঙ্গিনী আর সন্তানের খুনসুঁটি তার উজ্জ্বল চেহারায় উষ্ণতা ভরিয়ে তুলল। অজান্তেই ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটল তার।
“একটা কম পড়ে যাচ্ছে না? আরেকটা নিয়ে নে।”
পাশ থেকে অনুরাগের দুষ্টু কন্ঠ ভেসে এলো। সাইবান ভ্রু উঁচিয়ে এক দফায় বন্ধুর দিকে তাকাল। সিটে হেলান দিয়ে বসে মিটিমিটি হাসছে সে। পুনরায় সড়কে দৃষ্টি ফিরিয়ে সাইবান বলে উঠল,
“একটায় আর পোষাবে না, সোজা হ্যাটট্রিক মারব।”

অনুরাগ খিলখিল করে হাসল। এই ছেলেকে কিছুতেই লজ্জায় ফেলা যায়না, বিব্রত করা যায়না। উল্টো সে অপর পক্ষের মানুষটাকেই অস্বস্তিতে ফেলে দেয়।
“একটা নিয়েই কান্নাকাটির পর্যায়ে আছিস, আরও তিনটা সামলাতে তো নাকানিচুবানি খাবি।”
বন্ধুর কথায় সাইবান সূক্ষ্ম হাসল, স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে খানিক শীষ বাজিয়ে বলল,
“তুই পেলেপুষে দিস তাহলে।”
“ইশ! হ্যাটট্রিক করবি তুই আর পালব আমি? মগের মুল্লুক? এতগুলো লাগবেই বা কেন? দেশের জনসংখ্যা একাই বাড়িয়ে দিবি নাকি?”
“শোন দাদা, আমি হলাম বুদ্ধিমান মানুষ। বারবার কষ্ট করিনা, যা করব এক ধাক্কায়!”
“সেই এক ধাক্কাটা কি সেদিন পুকুরে দিতে পেরেছিস?”
“অ্যাই! কি নিয়ে কথা বলছ তোমরা?”
হুট করে পিছন থেকে বলে উঠল ইরাম। তাতে দুই বন্ধুই জমে গেল। অনুরাগ বিব্রত হয়ে মুখ ফিরিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল। অপরদিকে সেই একই দুষ্টুমিভরা চেহারায় লুকিং গ্লাসের দিকে চাইল সাইবান। ইরাম কৌতূহলী হয়ে তাকিয়ে আছে, কোলে ইযান ইচ্ছামত হাতের বইটা থাপড়ে বেড়াচ্ছে। সাইবান স্ত্রীর চোখে চোখ মিলিয়ে জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,

“পরিবার পরিকল্পনা। ওয়ানা জয়েন?”
ইরামের গাল দুটো উষ্ণতায় ছেয়ে উঠল হঠাৎ। অপরদিকে অনুরাগ ঠাস করে বন্ধুর ঘাড়ে থাপ্পড় দিল। শব্দ করে হাসল সাইবান, এমনভাবে রাস্তার বাঁক কাটল যে সবাই একটা ঝাঁকি খেল।
“অসভ্য! কোলে বাচ্চা আছে।”
ইরাম নরম সুরে স্বামীকে ধমকাল। অপরদিকে সুগন্ধা কান থেকে এয়ারবাড খুলে খেঁকাল,
“নেন নেন, দেখেন আশেপাশে শ্মশানঘাট আছে নাকি, চিতায় ঢুকাই দেন এক্কেবারে!”
সুগন্ধার বেফাঁস কথায় ইরাম পর্যন্ত রাগ ঝেড়ে হাসতে বাধ্য হলো। সাইবান ঘাড় বাঁকিয়ে একনজর মেয়েটার দিকে চেয়ে পরক্ষণে ড্রাইভিং সিটে এমন আয়েশ নিয়ে বসল যেন গাড়ি অটোপাইলট মুডে আছে। তারপর হঠাৎই হেড়ে গলায় গেয়ে উঠল,

“আমি হেলেদুলে যাব শ্মশান ঘাটে গো, হেলেদুলে যাব শ্মশান ঘাটে~”
“গাড়ি থামা! তুই এক্ষণ গাড়ি থামা সাইবান, আমি গাড়ি থেকে নামব!”
অনুরাগের আতঙ্কিত কথায় সাইবান ভ্রু দুলিয়ে ভাব নিল। অপরদিকে সুগন্ধা সন্দিগ্ধ চোখে চেয়ে নিজের সিটে তটস্থ হয়ে রইল। পরের মিনিট বিশেক সে আর নিজের মোবাইলে মনোযোগ দিতে পারলনা। বরং পেঁচার মতন বড় বড় চোখ করে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সাইবানের গাড়ি চালনা পর্যবেক্ষণে রাখল। এই ছেলের সত্যিই কোনো বিশ্বাস নেই! বাকিদের অবস্থা দেখে মনে মনে হাসল ইরাম।
বেশ অনেকটা সময় পর পায়রা সেতুর উপর উঠল গাড়ি। বিশাল সেতু, তার নিচে কলকল নদী। যতদূর চোখ যায় সারি সারি নৌযান। পাড়ে ব্যাস্ত নদীর জনজীবন। বিশুদ্ধ বাতাসের প্রবাহ জাদুর কাঠির ন্যায় ছুঁয়ে যাচ্ছে চারিপাশ। ইরাম জানালা খুলে দিল। ইযানকে নিয়ে খুব একটা বের হওয়া হয়না তাই বাইরে বেরোলেই ছেলে তার ভীষণ উত্তেজনায় থাকে। তার ছোট্ট শরীরটা টেনে হাঁটুর উপর দাঁড় করিয়ে বাইরে দেখার সুযোগ করে দিল ইরাম। ইযানের চেহারায় বিস্ময়, মুগ্ধতা। নরম লালচে ফোলা ঠোঁটে মায়াবী হাসি। ছোট্ট দাঁতটা নজরে আসছে। আঙুল তুলে সে মায়ের কোলে লাফিয়ে উঠল,

“উই! উই!”
“উই বাবা, ওটা হলো নদী। ওইযে, নৌকা। ঢেউ, অনেকগুলো ঢেউ।”
“আই…গু!”
“ওকে ধরে ল্যাট্রিনে ফালানো হোক। ব্যাটা বদ খাবার দেখলেও বলবে গু! দুধের বদলে গু খাওয়ানো শুরু করুন।”
সামনে থেকে আদুরে ভঙ্গিতে শাসালো সাইবান। তার কথার প্রতিবাদে মুখ ফুলিয়ে গলা কাঁপিয়ে ইযান চিৎকার দিল,
“গু! বা…গু!”
“হয়, বাপে তোমার দামড়া গুয়ের ঢেলা, ঠিকই বলছ।”
নিজের সিরিজ দেখার ফাঁকে ইযানের সঙ্গে সংহতি জানাতে ভুললনা সুগন্ধা। তাতে নাক কুঁচকে গলা তুলে সাইবান জোরে জোরে বলল,

“শোন অনুরাগ। বাঁশপাতার উপর টিকটিকির লেজ, উটপাখির কাঁচা ডিম, দুইদিনের বাসি কচুর লতি, কুকুরের পায়ের তলার পশম আর গুয়ের ট্যাংকিতে জমা থাকা সাড়ে তিন কেজি গু ভচভচ করে মেশালে সখিনা নামে এক পদার্থ তৈরি হবে। বছর পঞ্চান্ন আগে তার নাম দেয়া হয়েছিল, দুর্গন্ধা।”
অনুরাগ হাসি আটকাতে মুখে হাত চাপা দিল। অপরদিকে ভ্রু কুঁচকে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে সুগন্ধা চেঁচাল,
“আমিও কইতে পারি, গাঞ্জাপাতা ঘইষা বাইট্টা ওর মধ্যে জাউরামি, ফাত্রামি, মাতলামি ভইরা শিরীষ কাগজ দিয়া প্যাচাইয়া দিনে তিনবার মূত্র বিসর্জন করলে যা তৈরি হইব, ঐটারে কয় চেরাগুদ্দিন!”
এবার আর পারলনা অনুরাগ। অট্টহাসি হেসে উঠল। হাঁটু চাপড়াতে চাপড়াতে বলল,
“ভাই তোরা থাম। কুয়াকাটা পৌঁছানোর আগেই আমার ধৈর্য্য কেটে যাবে তোদের বাকবাকুম শুনতে শুনতে।”

গাড়ির ভেতর মুহূর্তেই হাসি ঠাট্টার উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়ল। সবার আড়ালে সাইবান ছেলের নদী দেখার উত্তেজনা লক্ষ্য করে ঠিকই গাড়ির গতি খানিকটা কমিয়ে আনল। যেন সেতু পার হতে কিছুটা দেরী হয় আর ইযান চোখেমুখে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস নিয়ে মায়ের কোলে দাঁড়িয়ে নদী দেখতে পারে।
পায়রা সেতু পার হওয়ার পর একটা হোটেলের সামনে গাড়ি থামাল সাইবান। দুপুর হয়ে এসেছে। তাছাড়া একটানা গাড়িতে বসে থেকে সবার অবস্থাও খানিকটা নাজেহাল। একে একে সকলে বেরোল। ইরাম আর সাইবান ইযানকে নিয়ে হোটেলের ভেতর ঢুকতে ঢুকতে হুট করে অনুরাগকে পিছন থেকে সুগন্ধা বলে উঠল,
“শুনেন?”
অনুরাগ থামল। মাথা কাত করে মেয়েটার দিকে তাকাল। এক হাতে মাথার উপরের সূর্যের তপ্ত রোদ ঢেকে রেখেছে,

“বাকি পথ গাড়ি আপনে চালাইয়েন। নাইলে যমরাজের সাথে মিলনে বেশি দেরী নাই।”
এটুকু বলেই সুগন্ধা গটগট করে হেঁটে হোটেলের ভেতরে ঢুকে গেল। অনুরাগ থম মেরে কিছুক্ষণ নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল। পরমুহূর্তেই সামান্য হেসে মাথার চুলে আঙুল চালিয়ে মেয়েটার পথ অনুসরণ করল সে।
সাইবান সকলের জন্য দুপুরের খাবার অর্ডার করেছে। সকলে টুকটাক গল্প করতে করতে আধ ঘন্টার মাঝেই খাবার হাজির হয়ে গেল। ইলিশ ভাজা, গরম ভাত, আলু – বেগুন – টমেটো দিয়ে তিন পদের ভর্তা আর চুঁইঝাল দিয়ে খাসির ভুনা। তরকারির বাটিতে চুঁইঝাল দেখে ইরাম ভ্রু তুলে শুধাল,
“এই ঝাল জিভে সইবে?”
“আপনার না সইলে আপনি মুড়ি খান। দিতে বলি?”

অবজ্ঞার হাসি হেসে সাইবান একেবারে পাত পেড়ে বসল। ছেলেটা ভালোই খেতে পারে। বাড়িতে থাকলে অবশ্য ডায়েটিং করতে দেখা যায়। সে আবার না খাওয়ার ডায়েট নয়, বরং জিম ট্রেনারের চার্ট ফলো করে সে। বরিশালে সেটার ব্যতিক্রম ঘটেছে। চামচের বালাই ঝেড়ে হাত ধুয়ে খেতে বসেছে সে। ইরাম দায়িত্ব নিয়ে বাটি থেকে সবাইকে খাবার বেড়ে দিল। সে যেন ঠিকমত খেতে পারে তাই ইযানকে সাইবান নিজের কোলে ডান উরুর উপর বসিয়ে রেখেছে। সুগন্ধা অবশ্য ইযানকে রাখার কথা বলেছিল যেন সবাই খেয়ে নিতে পারে, সাইবান ধমক দিয়ে তাকে সকলের সাথেই খেতে বসিয়েছে। সুগন্ধা এবং ইরাম দুজন চুপচাপ খাচ্ছে। কারণ সাইবান আর অনুরাগ দুজন নিজেদের কলেজ জীবনের গল্পে মেতেছে। সেসব শুনতে ভালো লাগছে।
সাইবানের দিকে আশেপাশের টেবিলে বসা বেশকিছু মানুষ মাঝে মধ্যে ফিরে তাকাচ্ছে। তাদের নজর মূলত ইযানের উপর। ইরাম আড়চোখে খেয়াল করল, এক তরুণীদের দল একে অপরের মাঝে সাইবান আর ইযানের দিকে নির্দেশ করে কি যেন ফিসফাস করছে। তাদের চোখেমুখে মুগ্ধতা স্পষ্ট। খাওয়ার সময়ে বাবার সন্তানকে আগলে রাখার দৃশ্যটা তাদের নজর কেড়েছে। ইরামের ঠোঁটে অতি সূক্ষ্ম এক তৃপ্তির হাসি ফুটল। সে নীরবে আবার খাওয়ায় মনোযোগ দিল। অপরদিকে ইযান আছে বেজায় খুশিতে। শুধু বসে থেকে তার হচ্ছেনা। মাঝে মধ্যেই সাইবানের হাতের উপর পা তুলে দিচ্ছে, নয়ত ওই একটুখানি দাঁত দিয়ে কামড়ানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। পিতার পরনের হুডির কাপড় তার বেশ পছন্দ হয়েছে বিধায় মুখে দিয়ে খানিক চুষল, সাইবান ধমকে সরিয়ে দিতেই ঠোঁট ফুলিয়ে এবার টেবিলে সাজিয়ে রাখা খাবারের দিকে তাকিয়ে লালা ঝরাতে লাগল।
অনুরাগের সঙ্গে কথা বলতে বলতে সাইবান সত্যিই মশগুল হয়ে গিয়েছিল। মাঝে মধ্যে ইরাম আর সুগন্ধা কিছু বলতেই হাসি ঠাট্টায় ভরে উঠছে টেবিল। এর মাঝে কেউ বিশেষ নজরপাত করলনা কখন টেবিলের উপর রাখা সাইবানের এঁটো হাতটার উপর নজর পড়েছে ইযানের। টেবিলের কোনা আঁকড়ে ধরে ঝুঁকল বাচ্চাটা, আঙুলের দিকে তাকাল বেজায় কৌতূহল নিয়ে। সাইবান চুঁইঝাল দিয়ে ভাত মাখিয়েছে, কিন্তু অনুরাগ কিছু একটা বলায় তার আর মুখে দেয়া হয়নি, হাসছে সে। তার কব্জিটা ধরে গন্ধ শুঁকে হুট করে ঝোল মাখা বৃদ্ধাঙ্গুলে মুখ বসিয়ে দিল ইযান। কেঁপে উঠল সাইবান,

“পোটলার বাচ্চা পোটলা!”
“উয়াআআ!”
ঝাল জিভে লাগতেই গলা ছেড়ে কেঁদে উঠল ইযান। সাইবান তৎক্ষণাৎ হাত সরিয়ে নিলেও বিশেষ লাভ হলনা। ইযানের মুখটা কুঁচকে গেল কান্নার তোড়ে।
“খাবি? আরও খাবি? সেই এক চামচ মুখে ভরে? যত্তসব!”
মুখে শাসালেও ছেলের কান্না দেখে বুকের ভেতর হাহাকার অনুভব করল সাইবান। সঙ্গে সঙ্গে টেবিল থেকে উঠে পড়ল সে। বাম হাতে ইযানকে বুকে চেপে ইতিউতি হাঁটতে লাগল। ইরাম উদ্বিগ্ন হয়ে নিজের চেয়ার ছেড়ে এগোতে চাইলেও ইশারায় মানা করল সাইবান, বলল,
“আপনি খান।”
পরক্ষণেই হাত তুলে সে ওয়েটারকে নির্দেশ করল,
“এক কাপ দই দেবেন প্লীজ, নরমাল টেম্পারেচার।”
দই আসতে আসতে সাইবান ইযানকে নিয়ে ঘুরতে লাগল। এক হাতে বুকে চেপে রেখে দোলাতে দোলাতে ফিসফিস করল,

“না না, এইযে বাবা এখানে। একটুখানি ঝালে কেঁদে ফেললে হয়? বাবার মতন স্ট্রং বয় না আপনি?”
ইযান সাইবানের কাঁধে মাথা রেখে ফোঁপাতে লাগল। ইরাম আর খাওয়ায় মনোযোগ দিতে পারলনা, নিষ্পলক নয়নে স্বামী সন্তানকে দেখে গেল। ওয়েটার দই নিয়ে আসতেই সাইবান ইযানকে মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিল। ইরাম ততক্ষণে নিজের হাত ধুয়ে চামচে পানি নিয়ে ইযানের মুখে দিল খানিকটা। সেটা চুকচুক করে পান করা শেষ হতেই চামচের আগায় একটুখানি মিষ্টি দই লাগিয়ে ইযানের জিভে লাগাল সে। প্রথমটায় ইযান ফোঁপাতেই লাগল। তবে দইয়ের স্বাদটা মুখে লাগতেই ধীরে ধীরে তার টুকটুকে হয়ে ওঠা চেহারাটা শান্ত হয়ে উঠল। দইয়ের কাপটা হাত বাড়িয়ে ধরতে লাফিয়ে উঠল সে,

“উই!”
“ওই দেখেছ? আসল জিনিস দেখলেই চৌষট্টি পায়ে খাড়া হয়ে যায় পোটলাটা। নিজের ইচ্ছায় দেয়ালে মাথা ঠুকে নিজেই ভ্যাক ভ্যাক করে কাঁদে আবার, বেলাজ!”
সাইবানের কথায় বাকিরা হাসল। ইরাম ছেলেকে ধরে ফেলল,
“না না। এটা এখন খাওয়া যাবেনা। ঝাল গিয়েছে আব্বুটার? গিয়েছই বা কেন আব্বুর আঙুল চাটতে?”
“বাপের মতোই চাটাচাটির স্বভাব।”
অনুরাগের কথায় ঠাস করে বন্ধুর মাথা বরাবর চাটি দিয়ে সাইবান খেঁকিয়ে উঠল,
“কবে তোর কি চেটেছি রে?”
“মেয়ে মানুষের সামনে বলতে চাচ্ছি না।”
“মেয়ে? তোর পাশেরটাকে তোর মেয়ে মনে হয়? ওটা একটা খাম্বা খবিশ! তোকে তিনবার হাঁটে বেঁচে আসতে পারবে।”
শান্তমনে খেতে থাকা সুগন্ধা কোনো কারণ ছাড়াই নিজের নামে বদনাম শুনে চটে গেল। চোখমুখ কুঁচকে বলল,
“বারবার শুধু আমারেই পান! খাইলেও দোষ, না খাইলেও দোষ। তাইলে আমি খাইয়াই দোষ করমু! আফনে একটা খচ্চর!”

খুনসুঁটির মাঝেই সময় পেরোল। গর্ব করে চুঁইঝাল অর্ডার করলেও ঠিকই শেষমেষ চোখের পানি, নাকের পানি এক করল সাইবান। শুধু বাকিদের হাসাহাসির ভয়ে দাঁতে দাঁত পিষে সহ্য করে গেল।
বেশ কিছুক্ষণ বাদে ফ্রেশ হয়ে হোটেলের বাইরে গাড়ির দিকে এগোল ইরাম। ছেলে তার বুকে ঘুমিয়ে পড়েছে। সাইবান ইতোমধ্যে গাড়িতে বসেছে। অনুরাগ ড্রাইভ করতে চেয়েছে বিধায় ড্রাইভিং সিট ছেড়ে সে পিছনের প্যাসেঞ্জার সিটে বসেছে। ইরাম দরজা খুলতেই ভেতরে সাইবানকে থম মেরে বসে থাকতে দেখল। মুখভঙ্গি বোঝা মুশকিল। পাথরের মতন শক্ত চোয়াল। চোখজোড়াও হালকা লাল দেখাচ্ছে। ইরাম মজা নিতে ছাড়লনা,
“ঝাল কমেনি?”
সাইবান চোখ ঘুরিয়ে এমন এক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল যেন এক্ষুণি চোখ দিয়ে গিলে খেয়ে ফেলবে। ইরাম বেপাত্তা হয়ে পাশের সিটে উঠে বসল। ঘুমন্ত ইযানকে সাবধানে নিজের কোলে শুইয়ে রাখল।
“অনুরাগ কোথায়?”
সাইবানের প্রশ্নে ইরাম জানাল,

“সুগন্ধা বাথরুমে গিয়েছে, ওর জন্য দাঁড়িয়েছে।”
কোনো কথা বললনা সাইবান। পকেট থেকে টিস্যু বের করে ঝালে লালচে হয়ে যাওয়া নাকটা মুছে নিল। ইরাম লক্ষ্য করে খোঁচাল,
“কি যেন বলছিলে? ঝাল না খেতে পারলে মুড়ি খান!”
“আপনি চুপ করবেন?”
রাগে গজগজ করে উঠলেও ইরাম নাছোড়বান্দা। এমন সুযোগ হাতছাড়া করা যায় নাকি? সে রসিয়ে রসিয়ে বলল,
“হয়েছ তো একেবারে ছেলের মতন। ঝালে নেতিয়ে যাও। আর কটা টিস্যু খরচ করবে? এক গ্যালন পানি কিনে আনতে বলি অনুরাগকে, কেমন? কিন্তু, পরে যদি আবার ব্লাডার ভরে যায়? রাস্তার পাশে কি টয়লেট পাওয়া যাবে? হুম?”
“আপনি কিন্ত এবার বেশি বেশি করছেন!”
সাইবান ঠোঁট ফুলিয়ে শিশুদের মতন ক্ষোভ দেখাল। তাকে বাগে পেয়ে ইরাম বেশ উৎফুল্ল। এতদিনের সব হিসাব চুকিয়ে নেবে।
“মিষ্টি আনি? দই খাবে? আইসক্রিম? এক কাজ করি বরং, কুয়াকাটা গেলে সমুদ্র থেকে পানি তুলে খাইয়ে দেব। সমুদ্রের লবণ তোমার জিভের ঝাল ঘষে তুলে দেবে!”
“ঝাল মেটাতে লবণ নয়, মিষ্টি দরকার।”

সাইবানের কন্ঠটা এবার অস্বাভাবিক গভীর শোনাল। ইরাম কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখল হুট করে সিট ছেড়ে এগিয়ে এসেছে সে। এক হাতে ইরামের চিবুক শক্তভাবে ধরে ঝুঁকে নিজের ঠোঁট বসিয়ে দিল তার উপর। হতবিহ্বল হয়ে রইল ইরাম, প্রথম কয়েক সেকেন্ড কিছুই বোধগম্য হলোনা। ঠিক তারপরই চোখ বুঁজে এলো তার। এক হাতে সাইবানের হুডি খামচে ধরল সে। সাইবান গভীরভাবে ছুঁয়ে দিল তার ঠোঁট, বারংবার, লাগামহীন। শ্বাস নেয়াটাও কঠিন হয়ে উঠল, অথচ স্বামী তার ছাড়তে রাজী নয়। অপর হাতটা মাথার পিছনে নিয়ে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরে নিজের সকল তেজ মেটাতে লাগল সাইবান। শেষমেষ ইরামের হাতের একটা ধাক্কা খেয়ে একটুখানি ছাড়ল। রমণী ভারী নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে বলল,

আমার আলাদিন পর্ব ৫১

“ও.. ওয়েট…কুচুপু…”
সাইবান আবেশিত দৃষ্টি ফেলে ইরামের কোলে ঘুমন্ত ইযানকে দেখল। পরক্ষণে একটি হাত বাড়িয়ে সাবধানে বাচ্চার বদ্ধ চোখের উপর আলতোভাবে রাখল। অর্ধাঙ্গিনীর ঠোঁটে তীক্ষ্ণ কামড় বসিয়ে বলল,
“ঘুমাচ্ছে, ঘুমাক না? মায়ের দায়িত্ব তো পালন করেছেন, এবার স্ত্রীর দায়িত্বটাও করুন।”
ইরামের ঠোঁট জ্বলতে শুরু করেছে, ঝাল বুঝি ছুঁয়ে গিয়েছে তাকেও। সাইবান নিগূঢ় নয়নে দৃশ্যটা দেখল। কিশলয়ের মতন কাঁপতে থাকা ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে ফিসফিস করল,
“ছেলের আদরের বহু ভাগ যে আপনার স্বামীর পাওনা। আর কতকাল স্বামীকে অভুক্ত রাখবেন, মিসেস আলাদিন?”

আমার আলাদিন পর্ব ৫৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here