আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৪৪ (২)
ইসরাত জাহান দ্যুতি
একদমই একটা ছোট্ট নামাজ ঘর শোবার ঘরের পাশেই সাজানো। জন তিনেক মানুষ সে ঘরে জায়নামাজে বসে আল্লাহ পাকের ইবাদতে মশগুল ছিল এতক্ষণ।৷ আজকে শুক্রবার। তিনটি পুরুষ পাশাপাশি বসে লম্বা সসয় ধরে মোনাজাত শেষ করে তারপর লিভিংরুমে এলো। নাওফিল আর তাওসিফের মাঝে বসা মানুষটি মেহরাব। আসরের নামাজের কিছু সময় আগেই এসেছে সে এখানে৷ সকালে তার সঙ্গে যোগাযোগ করার পরই নাওফিল জানতে পারে মেহরাব ঢাকাতেই থাকছে। মেহরাবের সঙ্গে মাদ্রাসাতে পড়াকালীন সুসম্পর্কই ছিল ওর তার সঙ্গে। যেটা আজও রয়েছে বেশ। তাই নাওফিলের সঙ্গে কলে কথা বলার পর ওর সমস্যার কথা সংক্ষেপে শুনে সে নিজেই বাসার ঠিকানা নিয়ে চলে আসে বিনা আপত্তিতেই।
নাওফিল আর তাওসিফ দুজনকেই উদ্দেশ্য করে সে জানাল, ‘জুমার দিনটা কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ, বুঝলে? আজকের পুরো দিনের কিছু সময়ে আল্লাহ তাঁর বান্দার দোয়া ফিরিয়ে দেন না। জুমার দিনে বারো ঘণ্টা রয়েছে। তাতে এমন একটা সময়ে আছে, যাতে আল্লাহর বান্দা আল্লাহর কাছে যা চায় আল্লাহ তা-ই দেন। তবে হাদিসে অনেক জায়গায় আছে আছরের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত দোয়া কবুল হয়। তারপরও শুক্রবারের দিনটা পুরোটাই তোমরা কাজে লাগানোর চেষ্টা কোরো।’
নাওফিল বলল তখন, ‘আমি তো তাহাজ্জুদ থেকে পুরো মাগরিবের ওয়াক্ত পর্যন্ত দোয়ায় থাকি।’
-‘আমার তো তাহাজ্জুদ পড়া হয় না তেমন। কিন্তু ট্রাই করি জুমার নামাজে, আসর আর মাগরিবের নামাজে।’ তাওসিফ বলল।
মেহরাব টি টেবিল থেকে পানির গ্লাসটা তুলে নিয়ে জিজ্ঞেস করল নাওফিলকে, ‘সমস্যাটা যতটুকু বলেছিলে ফোনে, শুধু ততটুকুই?’
-‘বাকিটা আপনি দেখেন তো বুঝতে পারেন কি না, ভাই?’
নাওফিল ইচ্ছা করেই দুজনেরই সমস্যা হওয়ার কথাটা খোলাখুলি জানাল না৷ মেহরাবের মাঝে কতটুকু যোগ্যতা আছে এমন সমস্যার চিকিৎসা দেওয়ার ব্যাপারে তার দাদার মতো, সেটা তো জানা নেই। তাই মেহরাবকেও যাচাই করার প্রয়োজনবোধ করল সে। মেহরাব হাফেজ একজন। হাফেজ পাস করার পরই তাকেও স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া হয়েছিল। বাংলা মাধ্যমে পড়াশোনা করলেও ইসলাম চর্চা করে গিয়েছে সে নিজ তাগিদেই। আর তা দেখেই তার দাদা মাওলানা সাহেব নিজের জানা সকল কিছুই নাতিকে উৎসর্গ করে গেছেন। কিন্তু কখনও মেহরাব এসব ব্যাপারে তেমন চিকিৎসা দিয়ে থাকে না মায়ের হুকুমে। আজ প্রথমই সে এমন একটি জটিল সমস্যার সমাধান করতে নেমেছে। আর তা শুনেই নাওফিল কিছুটা সংশয়ে ভুগছে। নাওফিলের মনে আছে, মাওলানা সাহেব ওকে সামনে বসিয়েই কিছু দোয়া পাঠ করে পানির মাঝে ফুঁ দিয়ে পানিতেই দেখেছিলেন ওর সমস্যার ব্যাপারে। যদিও সে ব্যাপারে আজও ওর অজানা।
মেহরাবও ঠিক তেমনই করল। বেশ অনেকটা ক্ষণ ধরেই সে পানিতে তাকিয়ে থাকল দোয়া পাঠের মাঝেই। তাওসিফ বেশ আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। আর নাওফিল গাঢ় চোখে দেখছে মেহরাবের ঠোঁট নড়ানো। ওর জানার ভীষণ ইচ্ছা, কী এমন দোয়া জানলে তা পাঠ করার পর স্বচক্ষে পানিতে দেখতে পাওয়া যায়।
-‘নাওফিল, তোমার বউয়ের কাছ থেকে একবার ঘুরে আসো। শরীর বন্ধ করে রাখার দোয়া তো জানো।’ হঠাৎ করেই বলে উঠল মেহরাব।
-‘গতকাল রাত থেকে বহুবার করেছি। কোনো কাজে দিচ্ছে না, ভাই।’ হতাশ কণ্ঠ নাওফিলের।
-‘এখন গিয়ে আরেকবার চেষ্টা করো। আর তাকেও বলো নিজে নিজেই পাঠ করতে থাকে যেন।’
নাওফিল উঠে দ্রুত নিচে চলে গেল। কিরণের সঙ্গে রান্নাঘরেই ব্যস্ত ছিল এত সময় দীধিতি। কিন্তু নিচে আসার পরই দেখা গেল, কিরণ দীধিতিকে জড়িয়ে ধরে বসে আছে। নাওফিলকে দেখতে পেয়েই কিরণ যেন প্রাণ ফিরে পেল।
-‘ভাইয়া, দেখেন কী হচ্ছে আবারও আপুর সঙ্গে।’ ভয়ার্ত স্বর কিরণের।
দীধিতি কাঁধ চেপে ধরে বসে আছে। চোখে-মুখে ভয়ের চেয়েও তার ব্যথা অনুভবের অভিব্যক্তি। নাওফিল সামনে এসে দাঁড়ালে দীধিতি কাঁধের কাছ থেকে হাতটা সরাল। ফর্সা কাঁধে বিভৎস বিশাল একটা আঁচড় কাটার দাগ। যে ক্ষততে রক্তও বেরিয়ে এসেছে। চিহ্নটা দেখা মাত্রই হঠাৎ করেই নাওফিলের নিজের প্রতি প্রচণ্ড রাগ হলো। এ যাবৎ কাল এমন বিপদ থেকে নিজেকে যেখানে সে নিজেই প্রতিরক্ষা করে এসেছে, সেখানে বউয়ের বেলাতে কেন ব্যর্থ হচ্ছে সে? ইমাম সাহেব তো সব সময় ওর প্রশংসায় বলেছেন যে, কিশোর কাল থেকে যুবক কাল অবধি যতটা আমল করেছে সে এবং করে যাচ্ছে, তাতে এসব ধরনের সমস্যা ওকে ছুঁতে অবধি পারবে না। ওর আমলের থলেটা এতটাই ভারী, আল্লাহ পাক স্বয়ং ওর বিপদে রুখে দাঁড়াবেন। তবে কেন দীধিতিকে সে বিপদমুক্ত করতে পারছে না?
-‘জায়গাটা ক্লিন থেকে এন্টিসেপটিক ক্রিম লাগিয়ে দাও, কিরণ। ঘরেই আছে। একটু কষ্ট করে নিয়ে এসো বোন।’
-‘আপনি আপুর কাছে বসেন, ভাইয়া।’ বলেই কিরণ চলে গেল।
দীধিতির পাশে বসে নাওফিল পরাজিত চোখে আঘাতটা দেখতে থাকল৷ দীধিতি বলল, ‘মেহরাব ভাই আসার পর থেকে আরও বেশি বেশি দেখছি ওইসব৷’
নাওফিল কোনো জবাব দিলো না। অনেকক্ষণ সময় ধরে আয়তুল কুরসি, সূরা বাকারার আয়াত, সূরা ফাতিহা, সূরা জিনের আয়াত আর তিন ক্কুল পড়ে গায়ে ফুঁ দিয়ে দিলো দীধিতির। তাকেও বলল, ‘আয়তুল কুরসির সঙ্গে তিন ক্কুল পড়তে থাকো সব সময়৷ আল্লাহ জলদি মাফ করবেন আমাদের।’
দীধিতি মাথা নেড়ে সম্মতি দিলে নাওফিল আরেকটা কথা বলল, ‘অসুখ তোমার। সে অসুখের মেডিসিন আমি নিলে কি তুমি সুস্থ হবে? যদি হত তাহলে সব আপনজনই নিজের লোকের অসুখ নিজে বহন করত। আমল করা জানতে হবে তোমাকে, স্মরণ। একবার, দু’বার করেই ছেড়ে দিলে হবে না। আমল না করা অবধি রাতের ঘুম ভালো হবে না, এমন করেই আমলের অভ্যাস করতে হবে৷’
কিরণ দীধিতির পাশে এসে দাঁড়িয়েছে অনেকক্ষণ ধরেই। কথাগুলো বলে নাওফিল উঠে পড়ল৷ উপরে যাওয়ার আগে কিরণতেও বলে গেল, ‘তুমিও নামাজে নিয়মিত হতে চেষ্টা করো, কিরণ।’
মেহরাবকে তাওসিফ সাদা একটা কাগজ আর লাল কালির কলম এনে দিয়েছে৷ নাওফিল এসে দেখল, কাগজে ডান পাশ থেকে আরবিতে ছোটো ছোটো করে কিছু লিখে চলেছে মেহরাব৷ নাওফিল তার পাশে বসতেই সে লেখা শেষ করল৷ কাগজটা ভাঁজ করে নাওফিলের হাতে তুলে দিয়ে বলল, ‘যে বালিশটাতে ঘুমায় সে, ওই বালিশের কভারের ভেতরে কাগজটা রেখে দিয়ো সব সময়। এখন যা বলি তা শোনার জন্য প্রস্তুত হও।’
তাওসিফের সাথে চোখাচোখি হলো নাওফিলের৷ দুজনেরই মনে হচ্ছে, মেহরাব যেটা বলবে সেটা ওদের কাছে অপ্রত্যাশিত মনে হবে হয়ত৷
-‘আমি বিশ্বাস করো অবাক হয়েছি, শিক্ষিত সভ্য সমাজে বসবাস করা মানুষের মাঝেও এসব চর্চা হয়ে থাকে। গাজীপুরের গ্রামাঞ্চলে যা ঘটে থাকে সেটা তোমাদের সাথে ঘটছে, নাওফিল। সেহর বোঝো?’
নাওফিলের কপাল কুঁচকে গেল৷ মেহরাব উত্তরের আশা না করে বিস্তারিত জানাল, ‘জাদু-টোনাকে আরবিতে বলা হয় সেহর৷ অনেক জাদুকর আছে যারা তন্ত্র টোনার কুফর শিরক ও পাপাচারের প্রতি নির্ভর করে দুজন মানুষের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করা বা তাদের মাঝে সম্পর্ক ছিন্ন করার চেষ্টা করে। যারা এ কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত তারা শয়তান অনিষ্টকারী জিনকে সন্তুষ্ট করে কার্যসিদ্ধি করার চেষ্টা চালায়। জাদু-টোনার প্রভাবে মানুষের মারাত্মক ক্ষতিও হয়। এমনকি জীবনহানিও ঘটে। জাদু করতে কোনো মানুষের শরীরের পশম, চোখের পাপড়ি, নখ, চামড়া, ব্যবহৃত পোশাক সংগ্রহ করা হয়। ফলে জাদু-টোনার শিকার ব্যক্তি অসুস্থ কিংবা মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। একটা হাদিস আছে। বনি জুরাইক গোত্রের লাবিদ বিন আসিম নামক এক ইয়াহুদি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মাথার চুল মোবারক এবং তাঁর ব্যবহৃত চিরুনির ভাঙা দাঁতের মাধ্যমে তার ওপর জাদু করেছিল।’
-‘স্মরণকেও কি জাদু করার মাধ্যমে ক্ষতি করা হচ্ছে?’ তাওসিফ জিজ্ঞেস করল।
নাওফিল তখনও আগের রূপেই স্তম্ভিত। মেহরাব বলল, ‘শুধু স্মরণকে নয়। নাওফিলকেও করা হয়েছে। নাওফিলকে করা হয়েছে আরও বহু আগে থেকে। ওর নিজের নেক আমলের জন্যই আল্লাহর রহমতে এখনও পুরোপুরি সুস্থ হয়ে আছে। কোনো ক্ষতিই ওকে করা সম্ভব হয়নি৷’
-‘স্মরণকে কবে থেকে করা হচ্ছে আর কে করছে?’ প্রচণ্ড গম্ভীর হয়ে গেল নাওফিল। তাওসিফ, মেহরাব, দুজনই খেয়াল করল ওর চেহারায় ক্রোধ জেগে উঠেছে।
-‘বিয়ের পর থেকেই। ওর পরনের কাপড় কেটে নিয়ে কাজটা করা। উন্মাদ করে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে একরকম। খুব সাংঘাতিক পর্যায়ের অনেকগুলো জিন চালান দেওয়া, নাওফিল। এজন্যই একেক রূপে দেখছে ও৷ এগুলো ভিন্ন ধর্মের। যে কারণে কোনো দোয়া-কালামেই ঠেকাতে পারছ না ওদের। তোমরা কেউ ওর কাছে থাকতে পারছ না কারণ, ওর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার ইচ্ছা ওদের৷ একবার ওকে আছর করতে পারলেই আর রক্ষা নেই। শুধু তোমার রুকইয়াহর জন্য এখনও আছর করতে পারছে না৷ আর এর জন্যই রেগে ওর শরীরের ওপর আঘাত চালাচ্ছে৷ আজকে রাতে বোধ হয় আরও খারাপ অবস্থা হবে স্মরণের৷ আমার পক্ষে আসলে জিন আটকানোর কাজ সম্ভব নয়৷ তার উপর সংখ্যায় অনেক। আমার মা আমাকে এই কাজ করতে দেয় না৷ তোমরা তো জানো শেষ বয়সে দাদা বিছানায় পড়ে গিয়েছিলেন। তার মৃত্যুটা কিন্তু খুব কষ্টের ছিল। এসব জিন যারা পোষে, একটা সময় তাদের অনেক বড়ো ক্ষতি করে দেয় এরা। কারণ, এরা স্বেচ্ছায় পোষ মানে না। মানানো হয়৷ তাই বৃদ্ধকালে সেই লোকগুলোর উপর ভয়াবহ অত্যাচার চালায়। তাই মৃত্যুটাও হয় কষ্টের। দাদা খারাপ, ভালো, দুরকমই পালতেন।’
-‘আমি জানান ভাই কাজটা করছে কে?’ অধৈর্য হয়ে উঠছে নাওফিল। কণ্ঠে শীতলতা থাকলেও ভেতর থেকে রাগে দিশাহারা হয়ে যাচ্ছে সে।
মেহরাব অপারগতা জানিয়ে বলল, ‘আমাকে জোর কোরো না, নাওফিল। আমি নিজেও ফিতনা থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করি সব সময়। আল্লাহর কাছে হত্যার থেকেও ফিতনা মারাত্মক। এসব কাজে নাম প্রকাশ করি না এজন্যই। তাই তোমাকেও বলতে চাই না।’
-‘আমি তাহলে সতর্ক হবো কী করে? আমার তো সেই ব্যক্তির থেকে ওকে আমাকে সাবধানে রাখা উচিত। নাম না বললেন। অন্তত এটা জানান সে দেখতে কেমন, সে কাছের লোক না দূরের লোক। তাহলেই আমি আন্দাজ করে নিয়ে সতর্ক থাকব। কোনো ঝামেলা করব না।’ ধৈর্যচ্যুত হয়ে নাওফিল কড়া স্বরেই বলল।
-‘একজন মহিলা। কালো বোরকা পরা আর নিকাবে মুখ ঢাকা। তাই চেহারা দেখিনি৷ কিন্তু তোমার খুবই কাছের মানুষ। এই মানুষটাই তোমাকেও সেই ছোটো থেকে ক্ষতি করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু তোমাকে রক্ষার জন্য গাজীপুরের বাড়িতে প্রোটেকশন দেওয়া ছিল। আবার তোমার নিজ আমলের জোরে তোমার কিছুই হয়নি এতদিনে।’
আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৪৪
তাওসিফ বিস্ময় গলায় বলে উঠল, ‘খুব কাছের বলতে কি ঘরের মানুষ বোঝাচ্ছেন?’
মেহরাব কথা বলল না। তাওসিফ বলে উঠল আবারও, ‘আমাদের ঘরে সারা বছরই কোনো না কোনো আত্মীয় থাকেই। দাদার গোষ্ঠী অনেক বিশাল। যার জন্য আত্মীয় স্বজনের অভাব নেই। তাহলে কি তাদের মধ্যে কেউ?’
-‘আমার খুব কাছের। বাড়িতে থাকলে আমি তার সঙ্গে কথা বলি সব সময়? মানে তার সঙ্গে সম্পর্কটা আমার কতটা গভীর?’ নাওফিল জিজ্ঞেস করল।
-‘খুব গভীর না। আবার একেবারে হালকাও না।’
