আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৮৭
ইসরাত জাহান দ্যুতি
নাওফিলের নীরবতায় স্যামুয়েল যা বোঝার তা বুঝে ফেললেন৷ ওর মুখটার দিকে তাকিয়ে আজ বহু বছর পর কারও জন্য খুব মায়া আর করুণা অনুভব করলেন তিনি৷ কতটা ছন্নছাড়া হয়ে গেছে জায়িনের পরিবারটা! দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘কিছু ক্লু নিয়ে হাজির হয়েছিল ও৷ যেগুলো ওর কাছে ধাঁধা মনে হচ্ছিল৷ আর সেই ধাঁধার সমাধান পেতেই ছুটে আসে আমার কাছে৷’
-‘কীসের ক্লু?’ বুকটা দুরুদুরু করছে নাওফিলের। ওর ষষ্ঠেন্দ্রিয় জানান দিচ্ছে, এতগুলো বছরে ও যা খুঁজে পায়নি তা ওর বোন পেয়েছে নিশ্চয়ই৷
স্যামুয়েল ওকে হাতের ইশারায় শান্ত হতে বললেন। ‘আমি ব্যাপারটা আমার মতো করে সাজিয়ে বলছি, জান। বুঝতে পারছি তুমি অনেক কিছুই জানো না বা সে সুযোগটা পাওনি যেটা মারিহাম পেয়েছে। তুমি নিশ্চয়ই জানো, তোমার আন্ট আলিয়া তোমার কাছে যেতে পথে তোমার চাচা জাহিদের হাতে ধরা পড়ে? আর তারপর কী হয়?’
-‘আপনিই বলুন। আপনার বক্তব্যটা মারিহামের বয়ান। তাই সেটা জানতে চাই।’
-‘আলিয়া মৃত্যুর মুখে এসে নিজের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে গিয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু বেচারি দুর্ভাগ্যক্রমে মুখোমুখি হয় তোমার চাচার। তার কাছে মারিহামের পরিচয়টা আগে জানায় সে প্রমাণসহ। তারপর তোমার সঙ্গে দেখা করতে চায়৷ তোমার চাচা তাকে ভালোমানুষি দেখিয়ে হোটেল রেখে আসে আর আশ্বস্ত করে তোমাকে সব জানিয়ে তারপর তোমাকে নিয়ে সে হোটেল আসবে৷ কিন্তু সে তা করেনি৷ তোমাদের সম্পত্তির আরও একজন ভাগিদার হোক, এটা সে কোনোভাবেই চায়নি৷ তাই বেচারি আলিয়াকে হোটেল থেকে কিডন্যাপের ব্যবস্থা করায়। ফলাফল ওর ভাগ্যে জীবনের শেষ সময়েও অসহনীয় কষ্ট জুটে যায়। ওকে গুম করে, খুন করে তোমার চাচা ভেবেছিল পার পেয়ে যাবে। কেউ কিচ্ছু টের পাবে না৷ কিন্তু… ‘ থামলেন স্যামুয়েল। বিদ্রুপের হাসি হাসতে হাসতেই বললেন, ‘তোমার চাচা জানত না সে এক সময়ের ভয়ঙ্কর টেরোরিস্ট আর কন্ট্র্যাক্ট কিলারকে জালে আটকিয়েছিল। আলিয়া সবরকম আশঙ্কার কথা মাথায় রেখে সবরকম ব্যবস্থা করেই বাংলাদেশে গিয়েছিল, জান। কিন্তু মারিহাম তার নিখোঁজ হয়ে যাওয়ায় বোকার মতো দেশে গিয়ে ছোটাছুটি করে মাকে খুঁজতে৷ এর মাঝেই আলিয়ার হাজবেন্ড লোকটা আলিয়ার রেখে আসা সেই ক্লু পায়। তারপরই তোমার চাচাতো ভাইও ইনভেস্টিগেশনের সাফল্য পায়।তোমার চাচা আলিয়াকে মারার পর ডেডবডিটা নাকি কবরও দেয়নি। ফেলে দিয়েছিল নদীতে। কিন্তু তোমার চাচাতো ভাইটা কোনো আইনি পদক্ষেপ নেয়নি তার বাবার বিরুদ্ধে। যার জন্য মারিহাম তোমার সাথে কোনো যোগাযোগ না করেই দেশ ছেড়ে চলে যায়।’
মাথা নুইয়ে পুরোটা শুনতে শুনতে নাওফিল চার বছর আগের সেই দিনটির কথা স্মরণ করল– নিজের মৃত্যুর নাটক সাজিয়ে ইয়াসিফকে ফাঁসিয়ে যাওয়া। কিন্তু মারিহাম বুঝতে পারেনি ইয়াসিফের অক্ষমতা আর সীমাবদ্ধতা কোথায় ছিল? জাহিদ শেখ আলিয়ার খুনের সঙ্গে সরাসরি কোনোভাবেই জড়িত ছিল না৷ অন্যায়টা সে করিয়েছিল ঢাকার বড়ো বড়ো সন্ত্রাস দলের মাধ্যমে। কিন্তু এর পেছনে কলকাঠি যে ওর বাবা মানুষটিই ছিল, তা খুব ভালোভাবে বুঝতে পেরেছিল ও৷ আর সেটা মারিহামকে জানানো ছিল ওর বোকামি। কারণ, তার আগে মারিহামকে বোঝানো উচিত ছিল ওর অক্ষমতা কোথায়! এবং সেই সাথে ও যে হাল ছেড়ে দেওয়া বা নিজের বাবা বলে তার অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়ার মানুষও না, সেটাও মারিহামকে বোঝানোর সময়টা ওকে দেয়নি মারিহাম। এই চার বছরে ইয়াসিফ একটু একটু করে প্রতিদিন পরিবর্তন হয়েছেই কেবল নিজের বাবা আর মায়ের ভেতরের কলুষিত রূপটা দেখার পর থেকে৷ জাহিদ শেখ আজ অবধি যা যা ভুল করেছে, তার পেছনের পরামর্শ আর বুদ্ধিদাতা ছিলই তো ইয়াসিফের মা মানুষটি। এমনকি জাকির শেখের স্ত্রী খুশিই যে বহু আগে থেকে নাওফিলের ক্ষতির উদ্দেশ্য কালোজাদু করছিলেন, তাও শুরু থেকেই বুঝতে পেরেছিলেন ইয়াসিফের মা৷ তবুও তিনি কখনো তা প্রকাশ করেননি কারও কাছে। আর একইভাবে নিজের মেয়েও খুশি বেগমের সঙ্গে যুক্ত হলে চুপ থেকেছিলেন তিনি।
ইয়াসিফ চার বছর আগেই এসবের শাস্তি বাবা-মাকে দিতে চেয়েছিল বটে। কিন্তু নাওফিল তখন দীধিতি, মারিহাম, এ দুজনের সমস্যার সমাধানটা আগে করতে চেয়েছিল। কেননা ওই একই সময়ে দীধিতির ভালো থাকা আর ওকে কঠোরভাবে প্রস্তুত করার দায়িত্বটা সে সঁপেছিল ইয়াসিফকেই। সেই সাথে মারিহামকে খুঁজে বের করার দায়িত্বও ঘাড়ে নিয়েছিল সে নিজ উদ্যোগে।
-‘কী ক্লু পেয়েছিল?’
-‘চাবি। চাবিটা ছিল একটা ব্যাঙ্কের ভল্টের চাবি। কোন ব্যাঙ্ক তা খুঁজে নিতে খুব সময় লাগেনি ভদ্রলোকের৷ সেই ভল্টের সন্ধান পাবার পর সেখানে দেখে, একটা ছোটো নোটপ্যাড রাখা। সেখানে প্রথম পৃষ্ঠাতেই লেখা তুরস্কের কুসকয় গ্রামের একটি ঠিকানা। আর কিছু লেখা ছিল কিনা বলেনি আমাকে। মারিহাম সেই ঠিকানাতে গিয়েছিল। কিন্তু যেজন্য গিয়েছিল তা সে পায়নি৷’
-‘আব্বু আম্মু?’ স্বগতোক্তি করে উঠল নাওফিল।
-‘হুঁ। কিন্তু তোমার বোন হাল ছেড়ে দেয়নি। তাই আমাকে সহ আমার আরও তিন বন্ধুর খোঁজ আরম্ভ করে সে। অবশেষে আমার অবধি পৌঁছতে সক্ষম হয়। তখনই পুরো ব্যাপারটা খুলে বলে আমাকে।’
-‘তুমি ধাঁধার সমাধান দিয়েছিলে?’
-‘প্রায় ত্রিশ বছরের ব্যবধানে গ্রামের অনেক কিছুই পালটে যাওয়া কি স্বাভাবিক না? ঠিকানাটা সঠিকই ছিল৷ কিন্তু পরিবেশ, পথ, জায়গা, সবই বদলে গেছে প্রায়৷ জেইন আর আয়মান খুব একটা ওখানের মানুষের সঙ্গে মিশত না৷ বরং লোকারণ্য থেকে দূরে থাকারই চেষ্টা করে গেছে৷ এজন্য ওখানের বসতিরাও মারিহামকে কোনো কিছু বলতে পারেনি ওদের সম্পর্কে। আমার পক্ষেও সমাধান দেওয়াটা সহজ ছিল না৷ কিন্তু একটুখানি চেষ্টা করলে তা কঠিনও না৷ হ্যাঁ, পেরেছিলাম দিতে সমাধান।’
-‘এজন্যই তবে মারিহাম তুরস্কে থেকে গেছে! আব্বু আম্মু তো আমারও। আমাকে কেন জানাল না একবারও?’ মনঃকষ্ট নিয়ে কথাগুলো নাওফিল বলে উঠতেই স্যামুয়েল আবারও সান্ত্বনার হাত রাখলেন ওর কাঁধে৷ কিছু একটা ওকে বলতে উদ্যত হচ্ছিলেন। কিন্তু হঠাৎ পেছন থেকে ডেকে উঠল লিয়াম। ব্যাকইয়ার্ডে দাঁড়িয়ে সে। ‘ড্যাড? বৃষ্টি শুরু হচ্ছে৷ খেয়াল নেই তোমাদের?’
লিয়াম বলতেই যেন অনুভব করল ওরা, গায়ে পড়ছে ইলশেগুঁড়ি। নাওফিলকে নিয়ে স্যামুয়েল চলে এলেন কটেজে। বসার ঘরে বসবে কিনা জিজ্ঞেস করলেন ওকে৷ নাওফিল না জানিয়ে তাকে আপাতত বিদায় দিয়ে চলে এলো দীধিতির কাছে৷
ঘড়িতে রাত সাড়ে আটটা। ইচ্ছা করলে এখনই বেরিয়ে পড়া যায়৷ কিন্তু আচমকাই নাওফিলের মনটা নিস্তেজ হয়ে এসেছে। ইয়াসিফ, মাভিশার খোঁজ নিতে ইচ্ছা করল না ওর৷ জেরিনকে কল করতেও মন চাইলো না। ঘরে ঢুকতেই চোখের সামনে অন্ধকার দেখে সম্বিৎ ফিরে পাবার মতো চমকে উঠল ওর দৃষ্টিজোড়া। জানালা খোলা। ধূ-ধূ সবুজ মাঠটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে জানালায় দাঁড়িয়ে। মাঠের শেষ কোথায়? এমন মুহূর্তে এই অবাঞ্ছিত প্রশ্নটা মনে আসতেই বিরক্ত হলো ও। ঘরের দরজা বন্ধ করতে করতে ডাকল, ‘স্মরণ?’
ঘরে নেই দীধিতি। তাই জবাব এলো না। আবারও তাকে ডেকে উঠতেই বাথরুমের দরজা খোলার শব্দ হলো৷ পাশ ফিরে তাকাতেই দেখা পেলো দীধিতির।
-‘কী হয়েছে? আলো নিভিয়ে রেখেছ কেন? জানতে চাইলো নাওফিল।
-‘ভালো লাগছে না আলো।’ স্পষ্ট সুরে জানিয়ে বিছানায় এসে বসল দীধিতি।
নিজের দহনের কষ্টে নাওফিল ভুলেই গিয়েছিল, দীধিতির মনের ওপর দিয়েও আজ কেমন ঝড় গেল। এ মুহূর্তে মেয়েটার কাছে থাকা দরকার ওর। কিন্তু তার আগে নিজেকে একটুখানি সময় দেওয়া দরকার যে!
ওরা চুপচাপ দুজন দুজায়গা। জানালার সামনে এসে নাওফিল দূরের মাঠে চেয়ে মারিহামের চিন্তায় মগ্ন। ওর জমজ বোনটা মারা গিয়েছিল, তা জেরিন ইসলাম ওকে বলেছিলেন অতীতে। কিন্তু কেন যেন বিশ্বাস করতে চাইতো না ও৷ নিজেরই একটা অংশ ছিল বলেই হয়ত কোনোদিন না দেখেও খুব টান অনুভব করত ও৷ মনে প্রাণে বিশ্বাস করতে চাইতো, বোনটা নিশ্চয়ই বেঁচে আছে ওরই মতো। হয়তো পৃথিবীর অন্য কোথাও। মারিহামের কথা যেদিন জানল সে ইয়াসিফের থেকে সেদিন অসংখ্যবার বলেছিল ইয়াসিফ, মারিহাম নিজেকে চব্বিশ বছরের যুবতী বলেছে। অথচ নাওফিল বোকার মতো ভেবে নিয়েছিল তখনো, সেই ওর আরেকটি অংশ। হয়তো এখনো তা-ই বিশ্বাস করত, যদি না মাভিশা মেয়েটি এক বর্ণ মিথ্যা ছাড়া মারিহামের শৈশব থেকে যুবতী সময়ের সবকিছু ওকে জানাত। আর আজকে আবারও প্রমাণ পেলো ও, মারিহাম সত্যিই ওর জমজ বোনটি নয়৷ হলে তো ওরই মতো মারিহামও ওর প্রতি অদৃশ্য মায়ার টান অনুভব করত এতদিন। কিন্তু ওর এই বোনটি খুব নিষ্ঠুর, পাথর মনের। ঠিক যেন মায়েরই মতো। তাই তো ভাইয়ের সন্ধান পেয়েও একটিবার সে ভাইকে কাছে এসে ছুঁতে চাইলো না, একবার দেখাও দিলো না ভাইকে।
-‘ওরা আমাকে ওদের স্মৃতি, মন, সবখান থেকে মুছে ফেলেছিল, নাওফিল।’
নিঃশব্দ ঘরটায় দীধিতির থমথমে গলা বেজে উঠলে নাওফিল ঘাড় মুড়িয়ে তাকাল পেছনে। বিছানায় পা দুটো মেলে বসে দীধিতি হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে আছে। নিজের বাবা-মার কথা ভাবার ফুরসৎটুকু পেলো না নাওফিল। চিন্তার সমাপ্তি ঘটিয়ে এগিয়ে এলো বিছানার কাছে৷ চোখদুটো তখন বুজে আছে দীধিতি। বিছানায় এসে হঠাৎ তার কোলের ওপর মাথা পেতে শুয়ে পড়ল সে। একটু চমকে গেল দীধিতি ওর কাণ্ডে। ‘কী হলো তোমার?’
-‘আমরা খুব দ্রুত দেশে ফিরে যাব, ঠিক আছে? তারপর ডক্টরের কাছে যাব দুজনেই।’
-‘কীসের মধ্যে কী!’ হতবুদ্ধি দেখাল দীধিতিকে। ‘ডক্টরের কথা আসলো কোত্থেকে?’
-‘তুমি আমাদের কথা ভাবছ না কেন? সংসারটা কি সারাজীবন দুজনেরই থাকবে?’ কথাটা জিজ্ঞেস করে নাওফিল দীধিতির মুখপানে তাকাল, তার প্রতিক্রিয়া দেখার আশায়৷ দীধিতিও তাকিয়ে আছে ওর দিকে। বুঝতে পারল, নাওফিল কোনো মজা করছে না। আর তাতেই যেন চিন্তার গতিবিধি আশি ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে ঘুরে গেল৷ বাবা-মার কথা ভুলে ভাবতে বসল, বিয়ের প্রথম পাঁচটি মাসের মাঝে অন্তত কয়েকবারই নাওফিল চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সে কনসিভ করেনি। খেয়াল হলো, এবারও প্রতিবারই নাওফিল একই চেষ্টা করেছে। কিন্তু এখনো কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি তার মাঝে৷ রজঃস্রাবের সময় অবশ্য পেরিয়ে যায়নি। দেখা যাক, এ মাসটা। তারপর সত্যিই ডাক্তার দেখাবে সে। সমস্যাটা হয়ত ওরই৷ তাই বলল, ‘তোমাকে যেতে হবে না। আমিই যাব।’
-‘কেন? প্রেগন্যান্ট কি মেয়েরা পুরুষ ছাড়া হয়?’
জবাব দিলো না দীধিতি, ভ্রু কুচকে দেখতে থাকল নাওফিলকে। তা পাত্তা না দিয়ে বলতে থাকল নাওফিল, ‘সারোগেসির কথা বলতে চেয়ো না আবার। সেখানেও কোনো না কোনো পুরুষের ভূমিকাই থাকে৷ বাজে কথা ছাড়ি৷ সমস্যা একজনেরও হতে পারে আবার দুজনেরই। তাই দুজনই যাব। কিন্তু আমার কী মনে হচ্ছে জানো?’
-‘কী?’
-‘বল এবার গোলপোস্টে ঢুকে গেছে।’ মিটিমিটি হেসে বলল নাওফিল। অমনি একটা কিল বসাল দীধিতি ওর বুকের ওপর, ‘ঘরের মধ্যে মন্ত্রীদের কথা বলার ম্যানারস্ এত ডার্টি হয়!’
হাসিটা আরও চওড়া হলো নাওফিলের। ইচ্ছা করেই থামাল না হাসি৷ তা দেখে দীধিতি কয়েক দফা চিমটি কাটল। ওকে হুশিয়ারি দিলো, ‘আমি তোমাকে কিন্তু মাফ করিনি, বুঝেছ?’
-‘কীহ্!’ কপট আঁতকে ওঠা ভঙ্গি নাওফিলের। তারপরই চেহারায় মেকি অনুনয় ফুটিয়ে তুলে বলল, ‘রহম করো, স্মরণ! মাফ করে দাও না রে! আমার ধৈর্যক্ষমতা চলে গেছে৷ বয়স বাড়ছে কি-না। তাই বিছানায় ডিসট্যান্স মেইনটেইন করার মতো বীরত্ব দেখানোর ক্ষমতা আমার আর নেই।’
-‘এমনভাবে বলছ যেন আগেও ছিল?’ চকিতেই বক্রোক্তি করে বসল দীধিতি।
-‘ছিল না? ফার্স্ট নাইটের কথা ভুলে গেলে?’
-‘সে রাতে আমাকে উত্তেজক মেডিসিন খায়িয়েছিল তোমার ভাই আর বন্ধুরা। মনে নেই, না?’
-‘আর বিয়ের প্রথম দিনগুলো? সেই দিনগুলোতে কে ছটফট করত? কে কান্নাকাটি করত?’
সেদিনগুলো নাওফিলের উপেক্ষার কথা মনে পড়তেই চার বছর আগের অভিমানের মতোই আজও কিছুটা অনুভব করল দীধিতি। ওর সঙ্গে রাগের চোটে তখন সংযম দেখাতো নাওফিল। আর সুযোগ পেলেই দু’চারটা বাঁকা কথা শুনিয়ে দিতে ছাড়ত না৷ একবার তো বিছানায় আসার আহ্বান জানিয়ে কত বড়ো অপমান করে বসেছিল তাকে৷ কত বাজে কথাও শুনিয়েছিল সেদিন! বর্তমানের অভিমানগুলোই দূর হলো না এখন পর্যন্ত৷ সাথে যুক্ত হলো পুরোনো দিনের অপমানগুলো৷ এক ধাক্কায় নাওফিলকে কোল থেকে সরিয়ে পা গুটি বসল সে। জানিয়ে দিলো, ‘ভুলিনি দিনগুলো৷ ভুলবও না।’
আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৮৬
হকচকিয়েই গেল নাওফিল দীধিতির প্রতিক্রিয়ায়। ও তো স্রেফ বউয়ের মনটাকে অন্যদিকে ঘুরানোর চেষ্টা করছিল। কিন্তু পরিস্থিতি এমনভাবেই ঘুরে গেল যে, হিতে বিপরীত হলো। অস্ট্রেলিয়া আসার পর থেকে দুজনের মধ্যে একা মুহূর্ত আসছিলই না৷ গত কয়েকদিনে আজই ওরা একাকী হতে পারল। নাহ্, এমন সুযোগ আগামী কদিনেও আর না আসতে পারে৷ সুযোগটা কাজে লাগাতেই হবে। সত্যিই আজ-কাল সে নিয়ন্ত্রণহারা, অসহায় পুরুষ বনে গেছে। এই অসহায়ত্ব নিয়ে আজ রাতটা সে ঘুমাতেই পারবে না।
