Home আমি অভিশাপ পৃথ্বীর আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৮২

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৮২

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৮২
ইসরাত জাহান দ্যুতি

মায়ের মতো কেবল উচ্চতাটুকুই। আর এই যে গায়ের রং, চুলের রং, চোখ, নাক, ঠোঁট, সবকিছুই তো সেই সর্বনাশা লোকটির নকল। মেয়ে না হয়ে ছেলে হলে দীধিতিকে পুরোপুরিই স্যামুয়েলের জেরক্স কপি বলে দেওয়া যেত। অথচ নাওফিল বলার পূর্বে কেন চিনতে পারলেন না তিনি? সেই ছবিটা দেখেই তো চিনে ফেলা উচিত ছিল তার। আচ্ছা স্যামুয়েলকে শেষ দেখেছিলেন যেন কবে? অন্তত সাতাশ বছর আগে, তাই না? লোকটা কখনই তার মুখোমুখি হওয়ার প্রয়োজনবোধ করেনি এতগুলো বছরে। ওই চার জানোয়ারতুল্য মানুষের চেহারাগুলো যেন তার প্রতি রাতের ঘুম না হারাম করতে পারে, সেজন্য কতদিন যাবৎ কাউন্সিলিংয়ের মাঝে ছিলেন! সর্বোচ্চ চেষ্টা করে গেছিলেন ওদের মুখগুলো ভোলার জন্য। দুর্ভাগ্য, সেই সঙ্গে ভুলে গেলেন নিজের গর্ভজাত মেয়েটির মুখটাও৷ কতবার চেষ্টা করেও এতগুলো বছরে স্মরণ করতে পারেননি দীধিতির মুখটা৷

কীভাবে এই অসম্ভবকে সম্ভব করল নাওফিল, তা জানার ইচ্ছাও হলো না জেরিনের। কান্না দমিয়ে রাখার চেষ্টা করা দীধিতির গালে হঠাৎ হাত ছোঁয়ালেন ভীষণ কোমলভাবে, যেন ব্যথা পেতে পারে দীধিতি তাই সতর্কতা। আটাশ বছর আগে সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুটিকে ঠিক এভাবেই তো ছুঁয়েছিলেন প্রথমবার। আর কি আশা করেছিলেন, তার হারানো রাজকন্যাকে রূপকথার গল্পের মতো এই শেষ বয়সে এসে ফিরে পাবেন?
দীধিতির মাথা থেকে শরীর এমনকি হাতজোড়াও বিস্ময়-বিমূঢ়তা নিয়ে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখতে থাকলেন। দুজনেই নীরবে অঝরে অশ্রুপাত করছে। কিন্তু কেউ-ই মুখ ফুটে কোনো শব্দ উচ্চারণ করতে পারছে না। ওদের এই স্তব্ধি-ভূত পরিস্থিতি থেকে বের করে আনার উদ্যোগটা নিলো দীধিতির পাশে বসে থাকা কিরণই। ‘আপু?’ দীধিতিকে ডেকে ফিসফিসিয়ে বলে দিলো, ‘আম্মু বলে ডাক ওঁকে।’

সাড়া পেলো দীধিতির বোধশক্তি। এই শব্দটাই তো এতক্ষণে খুঁজছিল সে লক্ষ, কোটি শব্দমালার ভিড়ে। কিরণের মুখে কাঙ্ক্ষিত শব্দটা শুনে তা ডেকে ওঠার আগে অস্ফুটে কেবল পুনরাবৃত্তি করল, ‘আম্মু!’
তা-ই শুনতে পেলেন জেরিন৷ চোখের তারায় ঝিলিক দিয়ে উঠল তার৷ ‘আম্মু!’ তিনিও পুনরাবৃত্তি করে উঠেই আচমকা হাউমাউ করে কেঁদে দীধিতিকে বুকে টেনে আনলেন। ‘আমার মা! ও আমার মাআআআ…!’
দুজনের আকুল কান্নার আওয়াজ গোটা বাড়িতে ছড়িয়ে পড়ল। প্রলাপ বকে যাওয়ার মতো করে জেরিন বলে যাচ্ছেন, ‘আমি খুব খারাপ আম্মু! তোমার আম্মু খুব পাষাণ, মা৷ তুমি বাংলাদেশেই ছিলে— তা জেনেও আমি যাইনি… যাইনি তোমাকে খুঁজতে… যাইনি ফিরিয়ে আনতে তোমাকে। কত ভীরু তোমার আম্মু… কত বাজে!’
জবাবে কিছুই বলতে পারল না দীধিতি। নেতানো ফুলের মতোই পড়ে রইল শুধু মায়ের বুকে৷ এমন পরিবেশের জন্য আগে থেকেই প্রস্তুতি ছিল তিন ভাই৷ কিন্তু তবুও ওদের বুক ভার হয়ে আসছে। কিরণ কাঁদছে, মাভিশার মুখখানিও কাঁদো কাঁদো। এরকম একটা পরিবেশে কারও কিছু বলা উচিত কি-না, কিংবা কী বলা উচিত, তা তিনভাইয়ের কারোরই জানা নেই। তাই হাল ধরলেন ডেভিডসনই। এগিয়ে এসে জেরিন আর দীধিতির মাথাতে সস্নেতে হাত বুলিয়ে বলতে থাকলেন, ‘কাম ডাওন, গার্লস। যথেষ্ট কান্নাকাটি হয়েছে৷ থেমে যাও এবার।’ আরও বহু কথা বলার পর পর ওরা দুজন সামলে উঠল।

রাত একটা পার হচ্ছে দেখে সবাইকে ফ্রেশ হতে পাঠিয়ে দিলেন ডেভিডসন। মেয়েকে তখনও ছাড়ছিলেন না জেরিন। তাই তাকে কৃত্রিম এক ধমক বসিয়ে দীধিতিকে হাত ধরে উঠিয়ে বললেন, ‘দীর্ঘ জার্নির পর এই মুহূর্তে তোমার আগে বিশ্রায় প্রয়োজন, ডিয়ার। যে হারে কাঁদলে, তাতে অসুস্থও যদি হয়ে পড়ো সেটা অস্বাভাবিক হবে না।’ তারপর জেরিনকেও আদেশ গলায় বললেন, ‘আর তুমি। হ্যাঁ, জেরিন, তুমি বোকার মতো এখন বসে থাকতে পারো না। ওদের সবার জন্য ঘরগুলো গুছিয়ে দিতে আরম্ভ করো জলদি।’
-‘হ্যাঁ, এক্ষুনি যাচ্ছি।’ বলে দীধিতির কাছে এসে কপালে আর গালে আরও একতরফা চুমু খেলেন। নিজের শোবার ঘরটা দেখিয়ে ওকে বললেন, ‘তুমি আমার ঘরেই যাও, সোনা।’
দীধিতি নীরবে শুধু নিষ্পলক দেখতে থাকে মা’কে। দেখায় যেন ফুরচ্ছে না ওর। মেয়ের মনের ভাব বুঝতে পেরে জেরিনের চোখদুটো ভিজে উঠল আবারও। এমন আদুরে মুখের মেয়েটা কোথায়, কীভাবে থেকেছে এতদিন? কীভাবে বড়ো হয়েছে? এ ভাবনায় আরও আবেগী করে তুলছে তার হৃদয়কে৷ তক্ষুনি ডেভিডসন তাড়া দিলেন তাকে, ‘যাও যাও, দ্রুত ওদের শোবার ঘর গুছিয়ে ফেলো, জেরিন।’

Lily was a little girl
Afraid of the big, wide world
She grew up within her castle walls
Now and then, she tried to run
And then on the night, with the setting Sun
She went in the woods away
So afraid, all alone

সূর্যের দাপুটে রশ্মি আর অ্যালান ওয়াকারের গান দীধিতিকে বিছানা ছাড়তে বাধ্য করল৷ বেলা বারোটা বাজতে চলেছে। চোখ মেলে বসার পর পাশের জায়গাটিতে শূন্যতা দেখে আর ঘরটা দেখে গতরাতের সমস্ত ঘটনা ফ্ল্যাশ ব্যাকের মতো মানসপটে এসে ভিড়তে থাকল। মায়ের পাশেই ঘুমিয়েছিল সে। যেভাবে ছোটোবেলায় কিরণকে ঝুমুর বুকের কাছে নিয়ে, গায়ের ওপর হাত রেখে ঘুমাতেন, ঠিক সেভাবেই গতকাল ঘুমিয়েছে ও-ও। ও টের পেয়েছে, মা ওকে একটু পরপরই শুধু চুমু খেয়েছেন, ওর মুখের দিকে অপলক চেয়ে থেকেছেন। জেট ল্যাগের কারণে ও অবশ্য খুব বেশিক্ষণ জেগে থাকতে পারেনি। কিন্তু বুঝতে পেরেছে, প্রায় পুরোটা রাতই মা নির্ঘুম ছিলেন। এই আটাশ বছর বয়সে এসে ও জানতে পেরেছে, মা আর মায়ের ভালোবাসা ঠিক কতটা অপূর্ব হয়। সবকিছু এখনও স্বপ্নই লাগছে ওর কাছে।
বাথরুমে যাওয়ার তাগিদ অনুভব করে বিছানা ছাড়তেই হঠাৎ গানটার কথা খেয়াল হলো৷ এমন গান বাজানোর কী মানে? বাজাচ্ছেটা কে? মা কি এমন সিনেমাটিক কাণ্ড করতে পারেন? কই, ওরকম ছেলেমানুষি ব্যক্তি তো মনে হলো না তাকে।
ওদিকে নাওফিলের ঘরে কানের ওপর বালিশ চাপা দিয়ে ইয়াসিফ ঘুমাতে চেষ্টা করে যাচ্ছে। চোখ বুজেই সুন্দর গানটার উদ্দেশ্যে চিবিয়ে চিবিয়ে কতগুলো খিস্তিখেউড় করে শেষমেশ উঠে বসল সে। ‘জাদ?’ চেঁচিয়ে ডাকল নাওফিলকে।

-‘কী হয়েছে? বল।’ নাওফিল বাথরুমে। শেইভ করছে সে।
-‘তোর মনির কি মেয়েকে পাওয়ার আনন্দে মাথায় ছিট দেখা দিলো?’ নাকিসুরে গানটাকে ব্যঙ্গ করে গেয়ে উঠল তারপরই, ‘লিলি ওয়াজ আ লিটল গার্ল…! সিরিয়াসলি, ভাই?’
শেইভ করা শেষে মুখ ধুয়ে বেরিয়ে এলো নাওফিল৷ ‘মনিকে কি ড্রামাকুইন লাগে তোর? গান বাজিয়ে রেখে এসেছি আমি। স্যরি, ব্রো। তোদের ঘুম ভাঙানোর উদ্দেশ্য ছিল না আমার।’ বলতে বলতে লাগেজের ভেতর থেকে জামা-কাপড় বের করতে শুরু করল সে। ‘গতকাল দেখলি ওর কাণ্ড? মায়ের হবুকে বেমালুম ভুলে গেল। কোনো কথাও বলল না ডেভিডসনের সঙ্গে। আবার আমাকেও ভুলে গিয়ে মায়ের কোলের মধ্যে গিয়ে শুয়ে পড়ল কেমন কচি খুকির মতো। তাই ওর ঘুমের সঙ্গে আগে বোঝাপড়াটা করে এলাম লিভিংরুমে গান বাজিয়ে রেখে।’
কথা শেষ হওয়া মাত্রই উড়ো এক লাথি মেরে বসল ইয়াসিফ নাওফিলের কোমরে। ‘হারামজাদা!’ আরও দুটো অশ্রাব্য গালি কষে ইয়াসিফ চেঁচিয়ে উঠল, ‘এটা ওর মায়ের সঙ্গে প্রথম দেখা৷ ঘুমাবে কি এসে তোর কোলের মধ্যে?’

লাথিটা বাস্তবেই জোরে মেরেছে সে৷ মেঝেতে এতক্ষণ কোমর ধরে বসেই ছিল নাওফিল৷ এবং খিস্তি দেওয়াও তখনও শেষ হয়নি ইয়াসিফের৷ তার মুখে সব থেকে বেশি যে গালিটা উদ্ভট শোনালো সেটা হলো ‘হারামি কামুইক্কে’। যার অর্থ উদ্ধার করে নাওফিল বুঝল ‘কামুক’ শব্দটাকেই ইয়াসিফ তার পুলিশি পেশার শ্রেষ্ঠ গালি-গালাজের ভেতর থেকে নিয়ে প্রয়োগ করেছে ওকে। লাথিতে ব্যথা পেয়ে মেজাজ যতটা না ক্ষিপ্ত হলো, তার চেয়ে বেশি হলো বড়ো ভাইয়ের মুখ থেকে চরম সত্য কথাটা বেরিয়ে আসায়। ঘরের দরজাটা খোলা৷ যদি বাইরে থেকে কেউ শুনে ফেলত!

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৮১

লাথির বদলে লাথিটা ভাইকে না দিতে পারায় ভাইয়ের লাগেজ থেকে সব পোশাক বের করে বিছানার ওপর ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলে দিলো। ছয় মাসের বড়ো ভাইদের গায়ে হাত তোলা বাদ দিয়েছে সে বুঝজ্ঞান হওয়ার পর থেকেই। এজন্যই তো ওই দুটো ওকে মার দিয়ে পার পেয়ে যায় সব সময়।
চোখ মটকে নাওফিলের অকাজ দেখতে দেখতে ইয়াসিফ বাথরুমে ঢুকল৷ কিন্তু কিছুই বলল না কারণ, লাগেজটা ওর বউকে দিয়েই গুছিয়ে নেবে সে।

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৮৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here