Home আমি অভিশাপ পৃথ্বীর আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৯০

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৯০

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৯০
ইসরাত জাহান দ্যুতি

কফি হাতে মারিহামকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে ওকে জিজ্ঞেস করল দীধিতি‚ ‘ভালো হয়নি কফি?’
প্রশ্নটাই বিব্রত হাসল মারিহাম‚ ‘ভালো হবে না কেন?’
‘খাচ্ছ না যে? তাই মনে হলো ভালো হয়নি বোধ হয়।’
কী বলে যে ব্যাপারটা এড়াবে মারিহাম! ভেবে পেলো না। তাই বলে দিলো‚ ‘স্যরি‚ স্মরণ। কফিটা এখন খেতে ইচ্ছে করছে না।’
‘ও আচ্ছা। কোনো ব্যাপার না’‚ বলে কফির মগটা মারিহামের হাত থেকে নিয়ে জিজ্ঞেস করল দীধিতি‚ ‘অন্য কিছু খেতে চাইলে বলো। বানিয়ে আনি?’
‘আরে না না। তুমি ব্যস্ত হইয়ো না প্লিজ।’

ভ্রু কুঁচকে মাভিশা দেখছে মারিহামকে সূক্ষ্ম নজরে। সকাল‚ দুপুরেও ঠিকমতো খেতে দেখেনি মারিহামকে৷ বিকাল হলেই টেরেসে বসে রোজই কফি খাওয়ার অভ্যাসও আছে ওর। তা জেনেই তো দীধিতি কফি করে নিয়ে এলো৷ কিন্তু সেটাও মুখে তুলছে না মারিহাম। কারণ কী? ওকে ভালোভাবে খেয়াল করতে গিয়ে লক্ষ করল মাভিশা‚ আজকে সব সময়ই গলায় স্কার্ফ পেঁচিয়ে ঘুরছে ও। ঘটনা কী তবে গলাতেই? ইয়াসিফের ঘর থেকে রাত দুটোর পরে ফিরেছিল। মাভিশা ভেবেছিল এতদিন বাদে দেখা হওয়ায় দুজন কাছাকাছি আসাটা নিশ্চয়ই আটকাতে পারেনি৷ কিন্তু এই মুহূর্তে সেই ভাবনা তার ভুল মনে হচ্ছে৷ এমন গুটিয়ে থাকার মেয়ে তো নয় মারিহাম। দীধিতির সামনেই জিজ্ঞেস করে বসল সে‚ ‘হয়েছে কী তোর? ঠিকমতো খাসনি আজ সারাদিন। আর গলায় স্কার্ফ জড়িয়ে ঘুরছিস কেন?’

কফির মগে চুমুক দিতে দিতে দীধিতিও উৎসুকভাব চাইলো। কিছু একটা হয়েছে মারিহামের‚ তা সেও বুঝতে পারছে৷ কিন্তু ননদ-ভাবীর সম্পর্কটা এখনো তেমন ঘনিষ্ঠ হয়নি বলেই কিছু জিজ্ঞেস করেনি সে।
মাভিশার প্রশ্নে নির্বিকারভাবে চোখ তুলে তাকাল মারিহাম। এ পলক দেখল মাভিশাকে‚ আরেক পলক দীধিতিকে৷ ব্যাপারটা বলবে কি বলবে না সেটাই ভাবল। আদৌ কি এ বলা সম্ভব ইয়াসিফ গতকাল ওর জানটাই বের করে নিচ্ছিল? গলাতে তার বলিষ্ঠ হাতের চাপ এতটাই কঠিন ছিল যে‚ আঙুলের ছাপও বসে গেছে গলাতে৷ সারাদিনেও সেই দাগ ম্লান হয়নি৷ দমটা বেরিয়ে আসার আগ মুহূর্তে ওকে ছেড়ে দিয়ে ঘর থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল। ওর নিজেরও ধারণাতে ছিল না এতটা হিংস্র আর ক্রুদ্ধতার শিকার হতে পারে সে ইয়াসিফের কাছে৷ কোনো উচ্চবাচ্য বা ফিরতি আঘাতও করতে পারেনি ও ভাইয়ের চিন্তা করে আর নিজের অপরাধবোধ থেকে। তবে সব থেকে বড়ো চিন্তা হচ্ছে ইয়াসিফ একবারেই থেমে থাকবে না। সেটা ও বেশ বুঝতে পেরেছে। সুযোগ পেলে আবারও ওর ওপর চড়াও হবে। কতবারই বা চুপচাপ সহ্য করতে পারবে তার আক্রমণকে?

‘আমাদের ডাকোনি কেন তোমরা?’ বলতে বলতেই টেরেসে এলো নাওফিল৷ সঙ্গে ইয়াসিফও। কিছু বলার আর সুযোগ পেলো না মারিহাম।
দীধিতির দু পাশের দুটো চেয়ার দখল করল দু ভাই। মেয়ে তিনজনের হাতে কফির মগ দেখে ইয়াসিফ জানতে চাইলো‚ ‘আমাদের কফি কই?’
সঙ্গে সঙ্গেই মাভিশা মুচকি হেসে টি টেবিলে রাখা মারিহামের কফির মগটা এগিয়ে দিলো ইয়াসিফকে। সৌজন্য হেসে মগটা নিলো সে৷ দীধিতি আর মাভিশা তখন ঠোঁট টিপে হেসে তাকাল একবার মারিহামের দিকে। মারিহাম এদিকে কপাল কুঁচকে‚ মুখ কঠিন করে চেয়ে আছে ওর এঁটো মগে ইয়াসিফের ঠোঁটে ছোঁয়াতে দেখে।
‘স্যরি‚ তোমাকে দিতে পারছি না।’ নাওফিলকে বলল দীধিতি।
‘সমস্যা নেই। তোমাদের আড্ডা শেষ?’
‘আড্ডা আর কোথায় দিতে পারলাম? মারিহাম কেমন থমথমে মুখে বসে আছে দেখছ না? কিছু হয়েছে তোমার বোনের।’
‘তুমি কি অখুশি‚ মারিহাম?’ ফেকাশে হেসে জিজ্ঞেস করল নাওফিল‚ ‘আমাদের উপস্থিতি ভালো লাগছে না বোধ হয়?’

‘ভাইয়া প্লিজ!’ আহত চোখে তাকাল মারিহাম।
হাতটা বাড়িয়ে দিলো নাওফিল‚ ‘দেখি এদিকে এসো। আমার কাছে এসে বসো তো।’
দীধিতি চেয়ারটা ছেড়ে উঠে পড়ল দ্রুত। মারিহাম হঠাৎ খুব আহ্লাদ অনুভব করল। ভাইয়ের ডাকার ভঙ্গি আর কথা বলার ভঙ্গি ওকে কল্পনা করাচ্ছে হয়ত বাবাও এভাবেই আহ্লাদ করে কথা বলত ওর সঙ্গে! ভাইয়ের মধ্যে বাবাকে অনুভব হচ্ছে বলেই ওর চোখদুটো বারবার অশ্রুনীরে ডুবছে। কান্না সামলে এসে বসল নাওফিল আর ইয়াসিফের মাঝের চেয়ারটাই। বোনের মাথায় আদরে হাত বুলাতে বুলাতে জিজ্ঞেস করল নাওফিল‚ ‘তাহলে খাওনি কেন আজ ঠিকঠাক? ব্রেকফাস্টে আর লাঞ্চেও খেয়াল করেছি। খুব ভারাক্রান্তও লাগছে তোমাকে।’
‘এটাই জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিলাম আমরাও।’ মারিহামের চেয়ারে বসতে বসতে বলল দীধিতি।
‘টেনশন করার মতো কিছু হয়নি।’ আশ্বস্ত করতে বলল মারিহাম‚ ‘হঠাৎ বেশ ঠান্ডা লেগে টনসিল ব্যথা হয়েছে। তাই কিছু খেতে পারছি না। কথা বলতেও একটু কষ্ট হচ্ছে।’
টেরেসের সামনে বেশ উঁচু করে থাই গ্লাসের রেলিং দেওয়া। গ্লাসের ওপাশ থেকে ব্যস্ত ইস্তাম্বুলের বহু অট্টালিকা আর মহাসড়কগুলোই এখন ইয়াসিফের দৃষ্টি সীমানায়। মারিহামের মুখের দিকে তাকালেই রক্ত গরম হয়ে উঠছে তার৷ এমনকি ওর এই কণ্ঠ শুনলেও মাথায় খুন চেপে যেতে চাইছে। কিন্তু টনসিল ব্যথার কথাটা কানে আসতেই কানটা খাঁড়া হয়ে উঠল৷

‘ঠান্ডা লাগল কীভাবে?’ জিজ্ঞেস করল নাওফিল।
‘অনেক রাতে ঠান্ডা পানিতে শাওয়ার নিয়েছিলাম।’
হ্যাঁ‚ এ কথা মিথ্যা নয়৷ ইয়াসিফের ঘর থেকে ফিরেই মারিহাম গোসলে ঢুকেছিল। তাই দেখেই তো মাভিশা ভেবে নিয়েছিল নিশ্চয়ই বিশেষ কিছু ঘটেছে দুজনের মাঝে৷ কিন্তু তাই বলে মনমরা হয়ে ঘুরবে কেন মারিহাম? এ নিয়েই মুখ খুলতে যাচ্ছিল মাভিশা৷ তার আগেই মারিহাম বলে উঠল‚ ‘আমাকে নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। আমার থেকে ইম্পর্ট্যান্ট টপিক আছে৷ সে ব্যাপারেই কথা শুরু করতে চাচ্ছি।’ বলে নাওফিলের দিকে কোমল চাউনিতে তাকাল সে৷ ভাইয়ের হাতটা ধরে মৃদুস্বরে বলল‚ ‘তুমি স্টেবল থাকার চেষ্টা করবে প্লিজ।’
মুচকি হাসল নাওফিল‚ ‘তোমার ভাইয়াকে কমজোর ভাবছ?’
কোনো জবাব দিলো না মারিহাম। ভাইয়ের হাসিটা এত কাছ থেকে দেখে ওর মাঝে মুগ্ধতার সঙ্গে যন্ত্রণাও উপলব্ধি হলো। এই হাসিটা অবিকল বাবার মতো। চোখদুটোই আবার নোনাজল ভিড় করতেই উঠে পড়ল সে‚ ‘বসো‚ আমি ফিরছি এক্ষুনি।’

ওর যাওয়ার পথে চারটা মানুষই অনিমেষ চেয়ে রইল৷ অদ্ভুতভাবে নাওফিল‚ ইয়াসিফ‚ দীধিতি‚ তিনজনের মধ্যেই একই অনুভূতি হচ্ছে৷ বিষাদ! মারিহাম যা কিছুর মুখোমুখি করবে ওদের‚ তা নিশ্চয়ই বিষাদই বয়ে আনবে ওদের জন্য। এমনটাই ভাবছে ওরা। তাই বুকে কাঁপনও অনুভব করছে তিনজন একইভাবেই।
মাঝারি একটা ব্যাগ সমেত ফিরল মারিহাম। চেয়ারে বসতে বসতে দীধিতিকে ডাকল‚ ‘তুমি এগিয়ে এসে বসো‚ স্মরণ।’
ভ্রু‚ কপাল কুঁচকে ইয়াসিফ আচমকা কঠোর গলায় বলল মারিহামকে‚ ‘বড়ো ভাইয়ের বউকে ভাবী সম্বোধন করতে হয়।’
‘স্যরি।’ নিম্নস্বর মারিহামের।
‘ভাইয়া‚ এটা কোনো ব্যাপার না আমার কাছে।’ দীধিতি বলল।
‘আধুনিকায় গা ভাসানো অপছন্দ নয়। কিন্তু প্রকৃত কালচার থেকে বেরিয়ে আসাও পছন্দ নয়।’ ভারী কণ্ঠে জবাবটা দিলো ইয়াসিফ দৃষ্টি নুইয়ে রাখা মারিহামের দিকে চেয়েই।
‘আস্তে ধীরে অভ্যাস হবে‚ নিহাদ। তাই বলে এভাবে বকবি না।’ প্রশ্রয়ের সুরে বলে উঠল নাওফিল।
গাম্ভীর্যের সঙ্গেই তখন উত্তর দিলো ইয়াসিফ‚ ‘তোর বোনকে তুই আদরের সাগরে চুবা। আমার থেকে তা আশা করবি না। খবরদার!’

‘তা নিয়ে পরে আলোচনা করা যাবে।’ মুহূর্তেই গম্ভীর হলো নাওফিলও। এই দুজনের মাঝে অতীতে যা হয়েছে তা মাথা থেকে সরায়নি সে৷ তাই অন্যায়ের সাজা সে দুজনের জন্যই বরাদ্দ রেখেছে।
প্রতিবাদের বদলে মারিহামকে ভুল মেনে নিতে দেখে এদিকে মাভিশা অবাক চোখে দেখছে ওকে৷ ভাবতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল সে আবার‚ গতরাতে কী এমন হলো ইয়াসিফের সঙ্গে মারিহামের? যার কারণে রাতারাতি বদল দেখতে পাচ্ছে মেয়েটার মাঝে? তাছাড়া বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি মারিহাম শ্রদ্ধাশীল না। বরঞ্চ বাঙালিদের সব কিছু ওর কাছে বাড়াবাড়ি আর ন্যাকামো লাগে৷ সে কারণেই দীধিতিকে ভাবী ডাকতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না। ভাবী না ডাকলে কি দীধিতির প্রতি শ্রদ্ধা‚ সম্মান বা ভালোবাসা কমে যাবে? এ কথায় তো প্রত্যাশা করেছিল মাভিশা। বদলে ইয়াসিফের ধমকে এক মুহূর্তেই ‘স্যরি’ বলে দিলো! ভারি আশ্চর্যের না সেটা?
চুপচাপ সবার কথা শুনতে শুনতে ব্যাগ থেকে একটা ধূসর কভারের ডায়ারি আর একটা ছোটো ফাইল বের করে আনল মারিহাম। ফাইলটা ছবির ফাইল৷ সেটা নাওফিলের হাতে তুলে দিয়ে বলল‚ ‘ভাবীকে নিয়ে দেখো।’ দীধিতিকে ইশারায় নিজের চেয়ারে ফিরে আসতে বললে দীধিতি উঠে এসে নাওফিলের চেয়ারের হাতলে বসল‚ ‘সমস্যা নেই‚ মারিহাম৷ তুমি ওখানেই বসো।’
মূলত ইয়াসিফের পাশে বসে থাকতে রাজি নয় মারিহাম। তা বুঝতে পারছে দীধিতি৷ কিন্তু এদের মাঝে খুব শীঘ্রই সব ঝামেলার অবসান ঘটাতে চায় সে আর নাওফিল৷

‘দেখি ওঠো।’ হঠাৎ হুকুম গলায় মারিহামকে বলল ইয়াসিফ‚ ‘আমাকে বসতে দাও। আমি দেখব।’
এই আদেশ কণ্ঠ শুনতেই মারিহাম চোখ বন্ধ করে মেজাজটা নিয়ন্ত্রণ করল। নেহায়েত গুরুতর পরিস্থিতি। ঝগড়াবিবাদের সময় নেই এখন৷ তাই অনায়াসেই চেয়ার অদল বদল করে নিলো সে৷
প্রথম ছবি‚ হাসপাতালের কেবিনে বসে আছে আয়মান হাসপাতালের পোশাকে। থমথমে চেহারায় তার আঁধারঘেরা। আর তার পাশেই সদ্য জন্ম নেওয়া এক শিশুকে কোলে করে দাঁড়িয়ে জায়িন উজ্জ্বল চেহারায় হাসছে। আনন্দ ঠিকরে পড়ছে তার চোখ থেকে। সেদিকেই ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে আয়মান। বাবা-মার অসংখ্য ছবি দেখেছে নাওফিল৷ কিন্তু সেই ছবিগুলোতে কোনো গল্প ছিল না‚ কোনো আবেগ ছিল না৷ অপলক ছবিটা দেখতে থাকলে দীধিতি জিজ্ঞেস করে উঠল‚ ‘এই বেবিটা কি তুমি‚ মারিহাম?’
‘হুঁ।’ দূর আকাশে উদাসীন দৃষ্টিজোড়া নিবদ্ধ রেখেছে মারিহাম।
ছবিটার পেছনে সাল‚ তারিখ উল্লেখ আছে৷ নাওফিল হিসাব করে দেখল সেই তারিখটা ওর বয়স যখন পাঁচ‚ তার পরের তারিখ। আর এই তারিখের কয়েক মাস আগেই জায়িন বাংলাদেশ ঢুকেছিল তাকে নিয়ে পালানোর জন্য।

দ্বিতীয় ছবি‚ হাস্যোজ্জ্বল জায়িনের কোলে মারিহাম ফোকলা হাসছে মুখের মধ্যে দু আঙুল পুরে। জায়িন দাঁড়িয়ে আছে শিপের ডেকে। সমুদ্রের মাঝে ওরা। বয়স তখন মারিহামের এক বছরের কাছাকাছি হবে হয়ত। তৃতীয় ছবিটাতে আয়মানের কোলে ঘুমাচ্ছে মারিহাম। মেয়ের মুখের দিকে বিরস মুখে চেয়ে আছে সে। আর জায়িন কী যেন বলছিল তখন আয়মানকে। ছবিটা ওদের অপ্রস্তুত মুহূর্তের বোঝা যাচ্ছে। পরবর্তী ছবিটা ওদের কাছে ধাঁধার মতো৷ আলিয়া আর আয়মান একই পোশাকে বসে আছে বিছানায়৷ আর নাদুসনুদুস মারিহাম কেবল ডায়পার পরে তাদের মাঝে বসে আছে বিভ্রান্ত চেহারায়। কে মা আর কে খালা তা নিয়ে সে সন্দিগ্ধ আরকী। এ সময়ে মারিহামকে একটু বড়ো লাগছে। হয়ত দেড় কি দুই বছরের। নাওফিল এবার সবগুলো ছবি দ্রুত দেখতে শুরু করল৷ তা দেখে দীধিতি অদ্ভুত কিছু দেখার ভঙ্গিমায় তাকাল তার দিকে৷ তারপর বুঝল নাওফিল কিছু খুঁজছে। কিন্তু কী খুঁজছে?
যা প্রত্যাশায় ছিল নাওফিলের তা অবশেষে পেয়ে গেল সে৷ এতগুলো ছবির মাঝে মাত্র একটা ছবিতে জায়িন আর আয়মানকে একসঙ্গে পেলো। খুঁজে চলল এই ছবিতে বাবা-মায়ের ভালোবাসাটা। সবাই বলে এই দুটো মানুষ কোনোদিনও একে অপরকে নাকি ভালোবাসেনি। শুধুই ব্যবহার করে গেছে দুজন দুজনকে স্বার্থের কারণে।

কিন্তু নাওফিল তা বিশ্বাস করত না‚ মানত না৷ সেই বিশ্বাস যাতে ভুল প্রমাণিত না হয় তার জন্য ছবিটাকে জহুরির মতো পরখ করতে থাকল৷ কোনো এক পার্কে দুজন পিকনিক করতে গিয়েছিল বোধ হয়। চাদর বিছিয়ে ঘাসের ওপর বসে আছে দুজন। আয়মানের কাঁধ জড়িয়ে ধরে জায়িন হাসতে হাসতে মারিহামকে দেখছে আর আপেলে কামড় বসাচ্ছে। খাবারে মাখামাখি অবস্থা মারিহামের। সারা মুখে কেচাপ মাখানো। কিন্তু বরাবরের মতো এখানেও আয়মান নির্জীব। তবে গভীর চাহনি আটকে আছে তার জায়িনের মুখে। বিস্মিত‚ বিমুগ্ধ দীধিতি স্বগতোক্তির মতো বলে উঠল‚ ‘এত সুন্দর দুটো মানুষ আমি আমার জীবনে এর আগে কখনো দেখিনি।’
‘আমিও।’ সায় জানিয়ে মাভিশা বলল‚ ‘আমার দেখা সব থেকে সুন্দর পুরুষ আঙ্কল জায়িন। আর অদ্ভুত সুন্দর নারী আন্টি আয়মান। প্রিন্সেস ডায়নার প্রতি যে অবসেশন ছিল আমার। সেটা থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য করেছে আমাকে আন্টি আয়মান। এই ছবিগুলোতে এত সুন্দর তিনি! শুনতে বাজে লাগলেও আমি না বলে পারছি না‚ আঙ্কল জায়িন যদি এ সময়ের পুরুষ হতেন। আমি কোনোভাবেই পারতাম না তার জন্য নিজেকে সামলাতে।’
ইয়াসিফ কথায় বলতে পারল না। চাচাকে সে যতই দেখে ততই মুগ্ধতায় মূক হয়ে যায়৷ দাদীর মতো মাঝেমধ্যে ওরও গর্ব করতে মন চায় এমন আকর্ষণীয় সুন্দর পু্রুষ ওরই আপনজন বলে। আর উপলব্ধি হয়‚ কেন নারীরা তার বহুপ্রেমী বৈশিষ্ট্য জেনেও তার সঙ্গ কামনা করত!

‘এই ডায়ারিটা কার‚ মারিহাম?’
ভাইয়ের ভার গলা শুনতে পেয়ে তাকাল মারিহাম৷ আবিষ্কার করল‚ ভাইয়ের চোখদুটো ভেজা। তা দেখে ওরও কান্না পেয়ে গেল। বলল‚ ‘খুলে দেখো। ওটা পড়তে চাইলে নিরিবিলিতে গিয়ে বসতে পারো।’
পৃষ্ঠা উলটে তৃতীয় পাতায় লেখা পেলো নাওফিল। গোটা গোটা অক্ষরের হাতের লেখাটা পরিচয় দিচ্ছে ডায়ারিটা একজন মেয়ের। পৃষ্ঠার মাঝ বরাবর একটা লাইন লেখা–
‘মান তবে ভালোবেসে ফেলেছে ওকে।’
লাইনটা পড়ল দীধিতি আর ইয়াসিফও। নাওফিলকে তখন বলল দীধিতি‚ ‘তুমি আগে একা পড়ো।’
‘ঘরে যা।’ বলল ইয়াসিফও।
বিনা বাক্যেই উঠে পড়ল নাওফিল। ছবিগুলো গুছিয়ে নিয়ে চলে গেল ঘরে।
‘তুমিও যেতে পারতে।’ দীধিতিকে বলল মারিহাম।
মাথা নাড়াল দীধিতি‚ ‘মন সায় দিচ্ছে না। ওর একাই পড়া উচিত মনে হচ্ছে।’
‘ওটা কার ডায়ারি?’ জিজ্ঞেস করল ইয়াসিফ।

কোনো জবাব দিলো না মারিহাম। দ্বিতীয়বার তাই প্রশ্নও করল না ইয়াসিফ৷ সে লক্ষ করল শুধু মারিহামের অভিব্যক্তি। প্রশ্নটা শুনতেই চোয়ালদুটো কঠিন করে ফেলেছে মেয়েটা। চোখের তারাতেও কেমন ক্রোধ প্রকাশ পাচ্ছে ওর। কী কারণে? প্রশ্নটা সে জিজ্ঞেস করেছে তাই? কিন্তু তার সঙ্গে তো কিছুক্ষণ একাকী কথা বলার সুযোগ চেয়েছে মারিহাম গতরাতের ঘটনার পরও। তার ওপর রেগে আছে বলে তো মনে হয়নি সারাদিনেও৷ বরং সে সামনে এলেই ওর চেহারা অপরাধীদের মতো হয়ে যেতে দেখেছে। তবে কি যার ডায়ারি তার কথা মনে হতেই রেগে উঠল? মান বলে তো আলিয়াই ডাকত মনে হয় আয়মানকে৷ কিন্তু আলিয়া হলে এমন ক্রুদ্ধ দেখাবে কেন মারিহামকে? কৌতূহলটা এবার বেশিই হলো ইয়াসিফের ডায়ারিটা নিয়ে।
‘আমার না স্পাইসি কিছু খেতে ইচ্ছে করছে’‚ দীধিতি হঠাৎ বলে উঠল৷ ‘কিছু করতে চাচ্ছি। তোমরা কিছু খেতে চাইলেও বলতে পারো।’

ইয়াসিফ ঠোঁট উলটাল। অর্থাৎ কিছু একটা হলেই হলো তার জন্য৷ মারিহাম কোনো উত্তর দিলো না। মাভিশা চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল‚ ‘চলো‚ তাহলে আমরা দুজনে মিলে কিছু কুক করি।’
হাসল দীধিতি মাভিশার চোখের ভাষা বুঝতে পেরে। মারিহাম আর ইয়াসিফকে একা করে ওরা চলে গেল টেরেস থেকে। সুযোগটা কাজে লাগাল ইয়াসিফ। কোনো কথাবার্তা ছাড়াই আচমকা টেনে ধরল মারিহামের স্কার্ফের কোনা। উদ্দেশ্য ছিল সেটা খুলে নেওয়ার। কিন্তু গতরাতের পর তো আর মারিহাম অসতর্ক থাকবে না৷ তাই দ্রুতই সেটা চেপে ধরল সে। ‘লিভ মাই স্কার্ফ’‚ হুমকি গলায় বলে উঠল।
ঠান্ডা চোখে কতক্ষণ ওর দিকে চেয়ে থেকে ইয়াসিফ ছেড়ে দিলো স্কার্ফটা। কিন্তু তারপরই করে বসল আরেক কাণ্ড। চেয়ারসমেত মারিহামকে টেনে আনল নিজের কাছে। উঠে চেয়ারের দু পাশের হাতলে ভর দিয়ে ঝুঁকল ওর দিকে। শীতল গলাতেই বলল‚ ‘ভাবছ তোমার ভাই তোমার আমার বেডরুমের কিচ্ছা জানে না? তাই এমন সতীসাবিত্রী হয়ে দেখাচ্ছ ওকে? আর শাওয়ার কেন নিয়েছ রাতে? কী প্রমাণ করতে চাচ্ছ সবার সামনে? ক্লিয়ার জেনে রাখো‚ আমি ইয়াসিফ তোমাকে এখন টাচ করতে পারি কেবল খুন করার জন্য৷ তোমাকে হর্নি করার জন্য না।’

শেষ কথাটা শেষ হতে না হতেই তলপেটে দারুণ এক গুঁতো খেলো সে৷ ব্যথায় চোখ বুজে ফেলল। চেয়ারের হাতলদুটো শক্ত করে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে হজম করতে চেষ্টা করল আঘাতটা। হাঁটু দিয়ে গুঁতোটা কষেছে মারিহাম। দ্বিতীয়বার আঘাত করারও সুযোগ ছিল ওর৷ কিন্তু করল না। ইয়াসিফও জানে করবে না। তাই সরে পড়ারও চেষ্টা করল না সে।
‘তোমার মনে হয় এই চার বছর আমি বসে আছি তোমার ছোঁয়ায় উত্তেজিত হওয়ার জন্য?’ শান্ত সুরে প্রশ্নটা ছুঁড়েই মারিহাম ইয়াসিফের গাল চেপে ধরে কটমটিয়ে বলল‚ ‘না-কি তুমি এটা ভাবো আমাকে তুমি ছাড়া স্যাটিসফাই করার অ্যাবিলিটি আর কারও নেই? তবে আমাকে খুন করার সাহস বা ক্ষমতা কোনোটাই তোমার নেই। থাকলে গতরাতেই পারতে।’

খুনে চোখে ইয়াসিফ স্থির তাকিয়ে রইল। মারিহামের বলা একটা কথায় তার মস্তিষ্কে বিচরণ করতে থাকল শুধু। এই চার বছরে তবে মারিহামের জীবনে আরও কেউ এসেছে? তার সঙ্গে মিশেছে মারিহাম? কিন্তু সে কেন তবে পারেনি? চেষ্টা তো করেছিল। কিন্তু পারেনি আর কাউকে কাছে টানতে। যে ধোঁকা আর যে অন্যায় মারিহাম করেছে ওর সঙ্গে—আফসোস‚ তা একটা দিনের জন্যও ভুলতে পারেনি বলেই এক ফোঁটা শান্তিও মেলেনি তার এতদিনে৷ অথচ এই ধোঁকাবাজ‚ ক্রিমিনাল মেয়েটা ঠিকই সুখে থেকেছে। ভাবতেই আগুন জ্বলে উঠল যেন মাথার মধ্যে। খপ করে মারিহামের হাতটা ধরল শক্ত মুঠোতে‚ যে হাতে মারিহাম তার গাল চেপে ধরেছিল৷ টেনে ওঠাল ওকে আর মুহূর্তেই হাতটা এমনভাবে মুচড়ে ওরই পিঠের সঙ্গে লাগিয়ে ধরল যে‚ অসহনীয় ব্যথায় মারিহাম চেঁচিয়ে উঠতে গেল৷ শেষে কোনোভাবে কণ্ঠটা নিচু রেখে বলল চিবিয়ে চিবিয়ে‚ ‘আমাকে অ্যাকশন নিতে বাধ্য কোরো না‚ ইয়াসিফ। সবটা খারাপ হবে তাহলে।’
সে কথাকে পাত্তা দিলো না ইয়াসিফ৷ হাতটাও শিথিল করে ধরল না৷ ‘যতটা খারাপ করব ভেবেছিলাম। তুমি তার চেয়েও খারাপ কিছু ভোগ করবে‚ বিট্রেয়ার। গতরাতে রিগ্রেটফুল মনে হয়েছিল তোমাকে। তাই ছেড়ে দিয়েছিলাম। ভুল যেহেতু ভাঙালে তার জন্য পুরষ্কারটাও পাওনা থাকল। কতক্ষণ ভাইয়ের ছায়াতলে থাকবে? দূরে দূরে থেকেই বা কতক্ষণ বাঁচাতে পারো নিজেকে সেটাও দেখব। তোমাকে খুন করার স্পর্ধা আমার নেই বললে না? কথাটা স্পর্ধা না৷ ওটা হবে ইচ্ছে। আমার ইচ্ছে নেই৷ আর যদি ভাবো জাদের কারণে আমি তোমাকে কিচ্ছু করব না সেই ভাবনা ভুলে যাও। সব থেকে খারাপটা আমি করব তোমার সঙ্গে। তার জন্য জাদ আমার মাথায় গুলি চালালেও আপত্তি নেই।’

‘লাস্টটাইম ওয়ার্ন করছি‚ ইয়াসিফ।’ একটু চেঁচিয়েই উঠল মারিহাম‚ ‘লিভ মাই হ্যান্ড।’ ওর চোখদুটো থেকে পানি উপচে পড়ল দুবার। হাতের ব্যথায় নাকি মনের ব্যথায় তা বোঝা গেল না।
কিন্তু পাষাণ ইয়াসিফ ‘ওয়ার্ন’ কথাটা শুনে আরও ক্ষিপ্ত হলো। যার ফলস্বরূপ মারিহামের লং স্লিভ টপসটা কাঁধ থেকে টেনে নামিয়ে ওর খোলা কাঁধে দাঁত বসাল জোরালোভাবে। রক্ত বের না হলেও চামড়া কেটে গেল। ছটফটিয়ে উঠল মারিহাম। তবু চেঁচাল না৷ ব্যথা সহ্যক্ষমতা ওর প্রশংসনীয়৷ বুঝতে পারল ইয়াসিফ৷ দিনের বেলা বলে এটুকুতেই ছাড় দিলো সে।
হাতটা ছাড়া পেয়ে টপসটা কাঁধে ওঠাতে ওঠাতে মারিহাম ভেজা চোখে আর কাঠিন্য মুখে দেখতে থাকল তাকে৷ ইয়াসিফও ওর ভেজা চোখে চোখ রেখে দৃঢ় সুরে জানাল‚ ‘আই প্রমিজ। এই শরীরে পচন ধরিয়ে দেবো‚ মারিহাম।’
মারিহামের কী হয়ে গেল যেন মুহূর্তেই৷ আহত বাঘিনী রূপে ঝাঁপিয়ে পড়ল ইয়াসিফের ওপর৷ তার মাথার পেছনের চুল দু হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরল আর সাংঘাতিকভাবে তার ঠোঁটদুটোই আক্রমণ করল৷ উদ্দেশ্য‚ দাঁতের নিচে ফেলে ইয়াসিফের সিগারেট পোড়া পুরু ঠোঁটদুটোকে কামড়ে ছিন্নভিন্ন‚ রক্তাক্ত করবে।

ওর মারমুখী অভিব্যক্তি দেখে মনে মনেই ভাবছিল ইয়াসিফ‚ কোনোভাবে আবার কিল‚ ঘুষি বা লাথি মারার চেষ্টা করবে তাকে। তাই বলে তার ঠোঁটের ওপর হামলা করা হবে কে জানত? পরিণতি খারাপ হতে চলেছে তা বুঝতে আর বাকি নেই৷ ঠোঁটে কামড় বসার সঙ্গে সঙ্গেই সে মারিহামের নাজুক‚ স্পর্শকাতর বিশেষ অঙ্গে অশ্লীল স্পর্শ করে বসল একটু শক্তভাবেই৷ এছাড়া উপায় কী ঠোঁটদুটোকে রক্ষা করার? তার অভাবনীয় এই কাণ্ডে মারিহাম আসলেই পারল না শোধটুকু তুলতে৷ উপরন্তু শিরশিরানি এক অনুভূতি অনুভব করল বুকের ভেতর। আর ওকে কেঁপে উঠতে দেখেই বোধ হয় ইয়াসিফের সেই স্পর্শও কামুক স্পর্শে পরিণত হলো৷ প্রবল ধাক্কায় তখন সরাতে চাইলো মারিহাম তাকে৷ কিন্তু পারল না।

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৮৯

সাপের মতো শক্ত করে ওর চিকন কোমরটা এক হাতে জড়িয়ে ধরে রাখল ইয়াসিফ। অদ্ভুত কিছু একটা পরিবর্তন ঘটে গেল তার ভেতর। মারিহামের ঠোঁটের স্পর্শেই নাকি ওকে করা এলোমেলো স্পর্শেই কে জানে! নারীসঙ্গ ব্যতিত দীর্ঘ চার বছরের অভুক্ত এই শরীরটা জেগে উঠল তার নিমেষেই৷ মুহূর্তের জন্য সকল রাগ‚ ক্ষোভ ভুলে গেল তাই মনের অজান্তেই। অধিকন্তু মারিহামের মতোই আগ্রাসী হয়ে উঠল ওর অধরকে নিজের ওষ্ঠদ্বয়ের ফাঁকে টেনে নিয়ে।

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৯১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here