আমি শুধু চেয়েছি তোমায় পর্ব ৬৫
suraiya rafa
আজ একত্রিশে ডিসেম্বর, এ বছরের শেষ দিন। অবশ্য দিন বললে ভুল হবে, খানিক আগেই পুবাকাশে বুনো মহিষের মতো নেমে এসেছে ধূসর সন্ধ্যা। বাইরে অবিশ্রান্ত তুষারপাত, ঠান্ডায় জমে সমুদ্রের জল বরফ খণ্ডে পরিণত হয়েছে সব। ম্যানশনের সামনের রাস্তায় দু’টো হলদে রঙের ল্যামপোস্ট টিমটিমিয়ে আলো ছড়াচ্ছে , সেই নিয়ন আলোতে দু’জন বন্দুকধারী গার্ড স্পষ্ট দৃশ্যমান। হাড়-হিম তুষারের বৃষ্টিকে অদৃশ্যের মতো উপেক্ষা করে মোটা উলের ওভারকোট আর কালো গ্লাভস পড়ে সতর্ক পদক্ষেপে এদিক ওদিক পায়চারী করছে তারা। ঈগলের মতোই নিখাঁদ আর ধারালো তাদের নিশাচরী দৃষ্টি।
খোলা জানালায় মুখ বাড়িয়ে আঁধারঘেরা শ্বেত শুভ্র প্রকৃতিটাকে পর্যবেক্ষণ করতেই বাইরের হাড়-কাঁপানো হিমেল হাওয়ার দাপটে শরীর জমে গেলো ঈশানীর। চোখমুখ কুঁচকে তাড়াহুড়ো জানালার কপাট লাগিয়ে ঘুরে দাঁড়ালো ও। বসার ঘরটা সাজানো শেষ, এবারে জানালার কার্নিশে ফুল আর লতাপাতার সংমিশ্রণে তৈরি ফেয়ারী লাইটগুলো জ্বালিয়ে দিলেই হলো, তারপরই ফোন করা হবে এরীশকে। এর আগে কখনো কল করার অনুমতি না দিলেও এবার কেঁদেকুটে ছেলের দোহাই দিয়ে এই অভাবনীয় সুযোগটা লুফে নিয়েছে ঈশানী। শর্ত একটাই, এরীশের মতোই প্রাইভেট নাম্বার ব্যবহার করতে হবে তাকে। অবশ্য প্রাইভেট হোক কিংবা পাবলিক, এসবে কোনো যায় আসেনা ঈশানীর। সময় অসময় মানুষটাকে কল করতে পারলেই হলো।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
স্বামীকে ফোন করার কথা ভেবেই অকারণ একটা খুশির ঢেউ খেলে গেলো রমণীর অন্তর জুড়ে । পরপরই ভাবনা ভুলে ব্যস্ত হয়ে পড়লো রঙ বেরঙের লাইটগুলো নিয়ে।
ওদিকে সন্ধ্যা পেরোতেই ঘুমিয়ে পড়েছে ইয়াশ, তাই ন্যানী দু’টোও ঈশানীর সঙ্গে হাত লাগিয়েছে টুকটাক গোছানোর কাজে। যার দরুন সময়ের আগেই অনেকটা কাজ সম্পন্ন হয়েছে ওদের।চেয়ারের উপরে দাঁড়িয়ে লতানো লাইট গুলো নিয়ে হিমশিম খেতে খেতেই একবার গলা উঁচিয়ে ন্যানীদের ডেকে উঠলো ঈশানী,
—মাদাম! চেয়ার গুলো কি গোছানো হয়েছে?
পরপরই এক মধ্যবয়স্কা রমণীর প্রত্যুত্তর ভেসে এলো ওপাশ থেকে,
— হয়েছে গাসপজা ঈশানী (ঈশানী ম্যাম)।
— ঠিক আছে, এবার তাহলে এদিকে আসুন, আমাকে একটু সাহায্য করুন।
ঈশানী অনুরোধ করতেই ন্যানী দু’টো এগিয়ে এলো তড়িৎ পায়ে। ওর কাছ থেকে লাইট গুলো নিয়ে সুক্ষ্ম হাতে বিন্যস্ত করতে করতে খুব ইতস্থ গলায় জানতে চাইলো একজন,
— কিছু না মনে করলে, আমরা কি জানতে পারি আজকে কি আছে?
ঈশানী তড়াক করে চোখ তুললো। ওর সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে ভড়কে গিয়ে ভদ্রমহিলা জোরপূর্বক হেসে ফের বলে উঠলো,
—নিশ্চয়ই কোনো বিশেষ দিন?
নিঃশব্দে উপর-নিচ মাথা নাড়ালো ঈশানী,বিগলিত হেসে জবাব দিলো,
— আজ তার জন্মদিন!
ঈশানীর মুখ ফুঁড়ে কথাটা বের হতেই দক্ষিণের দমকা হওয়ার তোড়ে ঠাস করে খুলে গেলো জানালাটা, সেই সাথে একযোগে নিভে গেলো সব আলো। চোখের পলকে ঘুটঘুটে আঁধার নেমে এলো প্রাসাদের মতো গোটা ম্যানশন জুড়ে।লৌহ গাঁট গুলো চিঁড়েফেঁড়ে অশুভের ন্যায় গ্রহপ্রবেশ করা কনকনে হাওয়াটা এখনো অবাধ্যের মতো দোল খাচ্ছে জানালার সফেদ পর্দার গায়ে। ইতিপূর্বে কখনো বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটেনি এই ম্যানশনে আজকেই প্রথম। তারউপর দূর্গের মতো বাড়িটা সমুদ্রের অতি নিকটস্থ হওয়ায় আশপাশটা লোকালয়হীন। ফলস্বরূপ বাড়ির আলো নিভে যেতেই অদৃশ্য হয়ে গেলো সমগ্র বালুচর। ভাগ্যিস কাল জিনিসপত্র কেনার সময় সাথে করে কিছু মোমবাতি নিয়ে এসেছিল ঈশানী, আপাতত সেগুলো দিয়েই কাজ চালাতে হবে। কথাটা ভেবে আবারও দক্ষ হাতে জানালার কপাট লাগালো মেয়েটা। সঙ্গে সঙ্গে উপরের ঘর থেকে ভেসে এলো ইয়াশের অদম্য চিৎকার। ঠান্ডার তোড়ে ঘুম ভেঙে গেলো বোধ হয়। ছেলের কান্না শুনে সর্তক হয়ে উঠলো ঈশানী, তখনই অন্ধকারের মাঝে ন্যানীদের কানে ভেসে এলো তার রমণীয় কণ্ঠস্বর,
— মোমবাতি গুলো জ্বালিয়ে ক্যান্ডেল হোল্ডারে রাখুন, আমি ইয়াশকে ঘুম পাড়িয়ে আসছি এক্ষুনি।
মাদাম দু’টো ওর কথায় সম্মতি জানালে আঁধার হাতরে ধীর পায়ে উপরের ঘরের দিকে এগিয়ে যায় ঈশানী। মানুষ বলে বৃষ্টি আর তুষারের নিজস্ব একপ্রকার আলো থাকে, সেই আলোক শিখা হাতড়েই অবশেষে গুটি গুটি পদচ্ছাপে উপরের তলায় পৌঁছালো রমণী। ওদিকে মায়ের সান্নিধ্য পেতেই শিথিল হয়ে গেলো ইয়াশের ক্রন্দনের বহর। অনবরত হেঁচকি তুলে চুক চুক শব্দ করে দুধ পান করতে লাগলো সে । একপর্যায়ে কান্নাকাটি থেমে গেলে আধো আধো হাসির সঙ্গে ভেসে এলো তার পরিতৃপ্ত কণ্ঠস্বর।
ছেলেকে পুনরায় ঘুম পাড়িয়ে আবারও সিঁড়ি ভেঙে নিচে নেমে এলো ঈশানী। ও ভেবেছিল এতোক্ষণে হয়তো মোমবাতির নরম আলোয় আলোকিত সমগ্র ঘর, কিন্তু বসার ঘরে পা রাখতে না রাখতেই ভাবনা ভেঙে গেলো তার । তিমিরাচ্ছন্ন ঘরের মধ্যিখানে অপ্রত্যাশিত নীরবতায় হুট করেই জমে গেলো অন্তর। শঙ্কিত নয়নে এদিকওদিক দৃষ্টি বুলিয়ে ক্ষীণ আওয়াজে ডেকে উঠলো ন্যানীদের,
— মাদাম! মাদাম! কোথায় আপনারা?
কোথাও কোনো আওয়াজ নেই। চারিপাশে শশ্মানের নীরবতা। গা ছমছমে অন্ধকারের মাঝে এহেন অসহনীয় নৈঃশব্দ্যে ভড়কে গেলো ঈশানী। ভেতরকার শঙ্কাটুকু দমিয়ে নিজেকে যথাসম্ভব স্থির রাখা সত্ত্বেও অশুভ সব চিন্তারা ঘুনোপোকার মতো ক্রমশ কুটকুট করতে লাগলো মস্তিষ্কে। লম্বা একটা শ্বাস ফেলে আবারও সামনে এগোলো মেয়েটা। এলোমেলো কদমে আরও খানিকটা এগিয়ে যেতেই মেঝেতে পরে থাকা শক্ত কোনো ধাতবের সঙ্গে পা লেগে থমকালো ফের। গতিজড়তায় ভারসাম্য হারিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়তে পড়তে নিজেকে সামলে নিলো কোনোমতে । অচিরেই বুক চিঁড়ে বেড়িয়ে এলো রুদ্ধশ্বাস, সামান্য ঝুঁকে কাঁপা হাতে জিনিসটাকে তুলে চোখের সামনে ধরে অনেকক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে বুঝলো এটা আসলো ক্যান্ডেল হোল্ডার। বস্তুটা হাতে নিতেই মস্তিষ্ক জুড়ে জেঁকে বসলো অজস্র প্রশ্নের সমাহার, যার একটারও উত্তর নেই ঈশানীর কাছে। সহসা আনমনেই বিড়বিড়িয়ে স্বগোতক্তি করলো মেয়েটা,
—লাইটার, মোমবাতি সবকিছু মেঝেতে পড়ে আছে, তাহলে ওনারা কোথায়?
বলতে বলতেই আবারও নমিত স্বরে ডেকে উঠলো রমণী,
— মাদাম! আপনারা কি কিচেনে?
এবারও নিস্তব্ধ চারিপাশ। আশেপাশে কোথাও কোনো টু শব্দ নেই। ফলস্বরূপ একটু আগের অপ্রতুলতা মূহুর্তেই আতঙ্ক হয়ে গ্রাস করে নিয়েছে অন্তর। শঙ্কায় ঢোক গিললো ঈশানী, বিমূঢ় আর্ত গলায় আওড়ালো,
—ক…কোথায় আপনারা!
দ্বিতীয়বারেও ঠিক একই ভাবে ঈশানী দিশাহীন প্রশ্নের জবাবে আঁধার ফুঁড়ে ভেসে এলো নীরবতা। যার দরুন মাত্রা ছাড়ালো আতঙ্ক । উপয়ান্তর না পেয়ে কাঁপা হাতে লাইটার দিয়ে মোমবাতি জ্বালালো ঈশানী, ক্ষীণ একটা হলু্দাভ আলো কক্ষের চারিপাশে ছড়িয়ে পড়তেই শঙ্কা ভুলে কিছুটা স্বস্তি মিললো রমণীর। এতোক্ষণে সন্ধ্যা উতরে গেছে, বাইরে প্রগাঢ় অমানিশা। শুনশান নীরবতার মাঝে নিজের শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দটাকেও যেন বিশ্বাসঘাতক মনে হয়। প্রতিটি মূহুর্তে অকারণ আতঙ্ক। অজানা আড়ষ্টতায় গা ছমছম করছে ঈশানীর। তারউপর দু দু’জন ন্যানী চোখের পলকে হাওয়া। এইতো এখানেই ছিলো ওরা, কত মন দিয়ে চেয়ার গুলো সাজাচ্ছিল, যত্ন করে গোছাচ্ছিল সবকিছু। তাহলে এসব এখানে ফেলে রেখে হঠাৎ গেলোটা কোথায়? তারা তো হেয়ালি করার মানুষ নন। তাহলে?
অপ্রাকৃত এই প্রশ্নটা পিংপং বলের মতোই ঢপ খেতে থাকলো ঈশানীর ব্যতিগ্রস্ত মস্তিষ্কে। সহসা লম্বা নিশ্বাস ফেলে মোমবাতি হাতে সামনে এগিয়ে গেলো মেয়েটা, সিঁড়ি পথ ডিঙিয়ে বসার ঘরে পা রাখতেই কারোর অস্পষ্ট গোঙানির আওয়াজে টনক নড়ে উঠলো ওর। ভেতরের অদৃশ্য কম্পনে তিরতিরিয়ে কেঁপে উঠলো সমস্ত শরীর। মোমবাতিটাকে শক্ত হাতে চেপে ধরে চোখ খিঁচে ঈশ্বরকে ডাকলো ও, অতঃপর সতর্ক চোখে পরখ করলো চারিপাশ। কিছুক্ষণের জন্য শিথিল হয়ে আসা গোঙানির আওয়াজটা আবারও ফিরে এলো নতুন উদ্যমে। অদ্ভুত গা শিউড়ানো শব্দটা শ্রবনেন্দ্রিয় ভেদ করতেই কাউচের দিকে স্থির হলো তার ভীতিগ্রস্ত দু’নয়ন। জড়তা ভুলে তক্ষুনি ডেকে উঠলো ঈশানী,
—কে ওখানে!
ডাকতে গিয়ে টের পেলো ভয়ের তোড়ে কণ্ঠতালু শুকিয়ে এসেছে ওর। কনকনে ঠান্ডার মাঝেও শরীর ঘেমে একাকার। ওপাশ থেকে প্রত্যুত্তর এলোনা,ঈশানী যত কাছাকাছি যাচ্ছে ততই বেড়ে চলেছে অস্থির গোঙানির আওয়াজ। ঘড় ঘড় করে কাতরাচ্ছে কেউ, মৃ’ত্যু যন্ত্রণার শেষ নিঃশ্বাস টুকু যেন ধারালো শূলের মতোই আঁটকে আছে তার কণ্ঠায়।
অবশেষে কাউচের পাশ ঘেষে দাঁড়িয়ে মোমের আলোটা তুলে ধরতেই বজ্রাহাতের ন্যায় থমকে গেলো রমণী। চোখের দৃষ্টিতে ভেসে উঠলো অবিশ্বাসের ঢেউ। দপ দপ করে জ্বলতে থাকা অগ্নিশিখার সম্মুখে দৃশ্যমান ভয়াভয় এক বাস্তবতা, যা দেখা মাত্রই নিঃশ্বাস আঁটকে গেলো ঈশানীর। চোখের সামনে দুনিয়া দুলে উঠলো ওর, মূহুর্তেই নিস্তেজ হয়ে গেলো সমগ্র শরীর। মেয়েটা স্তম্ভিত নয়নে চেয়ে দেখলো শুধু, ওর থেকে কয়েক সেন্টিমিটার দূরে ন্যানীদের মস্তক বিহীন নিথর শরীর দু’টো ভেঙেচুরে পরে আছে মেঝেতে ।
ভীষণ যন্ত্রণায় ধড়ফড় করছে তারা , মৃ”ত্যুর বীভৎস লগ্নে কাতরাতে কাতরাতে ফুঁড়িয়ে যাচ্ছে আয়ুষ্কাল। এই প্রথম চোখের সামনে এতো বীভৎস মৃ”ত্যু দেখলো ঈশানী। দেখতে গিয়েই অনুভব করলো অযাচিত উষ্ণ তরলে ভিজে গেছে ওর দু’টো পা। কম্পমান হাতে মোমবাতিটা সামান্য নামিয়ে পায়ের দিকে লক্ষ্য করতেই আরেকদফা আতঙ্কে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে গেলো রমণীর । কর্তিত শরীর দু’টো থেকে টকটকে রঞ্জিত ধারা স্রোতের মতো বয়ে যাচ্ছে ওর পায়ের উপর দিয়ে। কি বীভৎস! কি নির্মম! সঙ্গে সঙ্গে মুখের উপর দু’হাত চেপে ধরে অস্বাভাবিক শ্বাস ফেলে আর্ত স্বরে আওড়ালো মেয়েটা,
— র…র”ক্ত!
— ভীষণ সুন্দর! ঠিক যেন আলতা রাঙা পা!
আচানক অপ্রত্যাশিত এক পুরুষালি ভরাট কণ্ঠে বিদ্যুৎস্পৃষ্ঠের ন্যায় ছলকে উঠলো ঈশানী। তৎক্ষনাৎ চোখ সরিয়ে ভয়ার্ত নেত্রে সম্মুখে দৃষ্টিপাত করতেই চোখের সামনে দুনিয়া দুলে উঠলো ওর। মাত্রাতিরিক্ত ভয়ে থরথর কেঁপে উঠলো সর্বাঙ্গ। মোমবাতিটা ফুরিয়ে গেছে, ধীরে ধীরে নিভে আসছে তার হলুদাভ আলো,সেই নিভন্ত আলোকে সাক্ষী রেখে চোখের সামনে স্বয়ং যমের মুখ দেখলো ঈশানী। কালো কঙ্কাল আকৃতির মুখোশ আর আলখাল্লার আবরণে ঢাকা প্রহেলিকার মতো অশুভ এক অবয়ব, ছিন্ন ম”স্ত”ক দু’টোকে দু’হাতে নিয়ে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে ওর সম্মুখে। কলুষে আবর্তিত চোখে তার অদ্ভুত ক্রূর হাসি। হয়তো মুখোশের আড়ালের নৈঃশব্দ্যিক হাসিটা এর চেয়েও নির্মম আর পৈশাচিক।
কে এই লোক? এরীশ কি তবে এই লোকটার কথাই এতোদিন বারবার সর্তক করেছিল? এটাই কি তবে সেই অজ্ঞাত সাইকোপ্যাথ?যে ঈশানীকে মা”রতে চায়? কিন্তু কেন?
মস্তিষ্ক জুড়ে অজস্র প্রশ্নের সমাহার, অথচ এই মূহুর্তে দাঁড়িয়ে কোনোকিছুই ভাবতে পারছে না ঈশানী, ব্রেইন কাজ করছে না। কানের কাছে শোঁ শোঁ শব্দ হচ্ছে অনবরত। দুনিয়াটা যেন থমকে গেছে।
ঈশানী বোধহয় চেতনা হারাবে, তেমন ভাবেই অসার হয়ে এসেছে দু’টো পা। বুকের উপর অদৃশ্য এক পাথর চাপা ব্যথা, শ্বাস টেনে তোলা দায় তবুও রুদ্ধশ্বাসে ধ্বনিত তার জড়ানো কণ্ঠস্বর,
— কেহহ!
মূহুর্তেই নিভে গেলো মোমবাতিটা। এবার যেন অকূল পাথারে পড়লো ঈশানী। কয়েক মূহুর্ত নীরব থাকার পরেও কোনোরূপ প্রত্যুত্তর ভেসে এলোনা ওপাশ থেকে,বিপরীতে ঈশানীর কর্ণকূহর ভেদ করলো অপ্রত্যাশিত বুটের আওয়াজ।
— ঠক্ ঠক্ ঠক্
ক্রীসের উপর ভর করে একজোড়া যান্ত্রিক পা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে সশব্দে এগিয়ে এলো সন্নিকটে। ভয়ে, আতঙ্কে জর্জরিত হয়ে তৎক্ষনাৎ পিছিয়ে গেলো ঈশানী, অন্ধকারের মাঝে কয়েক কদম পেছাতেই গতি জড়তায় তাল হারিয়ে পড়ে গেলো মেয়েটা। সঙ্গে সঙ্গে থমকে গেলো আগন্তুকের পদধ্বনি। ঈশানীর আতঙ্কিত চেহারা দেখে তার বোধ হয় আনন্দই হলো তেমন করেই বিপরীতপ্রান্ত থেকে ভেসে এলো বিদ্রুপ মেশানো বিশ্রী হাসির ঝংকার । যা শোনামাত্রই ঘৃণা,অপমান অস্বস্তিতে ভেতরটা রিঁ রিঁ করে উঠলো ঈশানীর।
কেন যেন আত্মবিশ্বাসী ভেতরটা হুট করেই বাঁধা দিলো পালাতে। ফলস্বরূপ হাতের কাছে কিছু একটা দিয়ে আত্মরক্ষা করতেই যাবে। ঠিক সেই মূহুর্তে উপর তলা থেকে ভেসে এলো ইয়াশের অস্থির ক্রন্দন। ছেলেটা আজ ঘুমাতে পারছেনা কিছুতেই, মায়ের বিপদে তারও বুঝি অস্থির প্রাণ। এমন একটা জীবন মরণ মূহুর্তে ছেলের কান্না শোনা মাত্রই ভূত দেখার মতো চমকে উঠলো ঈশানী। ভীতিগ্রস্ত নয়নে একবার দোতলার ঘরে তাকিয়ে, আবারও চোখ ঘুরিয়ে দৃষ্টিপাত করে নিগূঢ় অন্ধকারে।
নিজের কথা ভুলে গেলো ঈশানী, নিমেষেই ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হলো তার জমানো আত্নবিশ্বাস। ছেলের কান্নায় ব্যাকুল হয়ে উঠলো ভেতরের মাতৃসত্তা। সহসা জীবনের তোয়াক্কা না করে শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে সিঁড়ি ভেঙে ছুটলো সে ছেলের কাছে। দিগ্বিদিক হারিয়ে মেয়েটা যখন তরতরিয়ে উপরে উঠে গেলো,মিলিয়ে গেলো অন্ধকারে, তখনই সিঁড়ির সম্মুখে এসে স্থির হলো আগন্তুক। ঘোর তামশার মাঝেই ধীরে ধীরে মাথা তুলে চাইলে ওই ঘরটার দিকে, যেখান থেকে ক্রমাগত ভেসে আসছে বাচ্চা শিশুর অনিমেষ ক্রন্দন। যা দেখা মাত্রই অদৃশ্য এক নীরব উল্লাসে ফেটে পড়লো তার আগ্রাসী মস্তিষ্ক । র”ক্তিম নৃ”শংস চোখের তারায় ভেসে উঠলো অভূতপূর্ব পৈশাচিক তৃপ্তি। কান্নার রেশ যত বাড়ছিল ততই যেন চোখের রঙ পাল্টে যাচ্ছিল তার। দেখতে দেখতেই একপর্যায়ে শীতল আওয়াজে ফিসফিসিয়ে ওঠে লোকটা,
— ব্লাড ডায়মন্ড,বউ, বাচ্চা। আমার ফেবরেট সব “ব” গুলোকে একসঙ্গে গুছিয়ে রেখেছে মাফিয়া বস। দ্যাটস সো গ্রেট!
ঘরে এসে কোনো মতে ইয়াশের কান্না থামালো ঈশানী। এখনো অস্থির হয়ে ফুঁপিয়ে যাচ্ছে ছেলে তার। আজকাল খুব জেদি হয়েছে বাচ্চাটা, মতের হেরফের হলেই ঘন্টার পর ঘন্টা কেঁদে ভাসায়। রাতের শব্দ বহুদূর অবধি শোনা যায়, ঈশানী নিশ্চিত ওই ভয়ানক লোকটা আসে পাশেই আছে। হাতে খুব বেশি সময় নেই, যতদ্রুত সম্ভব এখান থেকে বেড়িয়ে বেজমেন্ট অবধি পৌঁছাতে হবে। সেই ভেবেই মুঠোফোনটা হাতে তুলে নিলো ঈশানী,অন্য হাতে ইয়াশকে নিয়ে ছুটে বেড়িয়ে গেলো রুম থেকে। সমগ্র করিডোর জুড়ে ঘুটঘুটে অন্ধকার, চারিদিকে গোলোক ধাঁধার মতোই নৃত্য করছে প্রহেলিকা।
নিজের হাতে গোছানো সংসার আজ চোখের পলকে অচেনা লাগছে ঈশানীর,অদমনীয় আতঙ্কে হ্যাং হয়ে আছে মস্তিষ্ক। সেই নিশ্ছিদ্র আঁধারের মাঝেই ছেলেকে বুকে আগলে একলা পথিকের মতো উদ্দেশ্যহীন ছুটে চলেছে ঈশানী। ঘর থেকে বেড়িয়ে করিডোর ধরে সোজা এগোলেই বেজমেন্টের গোপন সরু রাস্তা, আপাতত গন্তব্য সেদিকেই।
ঠিক সেই সময়ে ভয়ানক ঠক্ ঠক্ শব্দটার পুনরাবৃত্তি ঘটলো আবারও, এবার শুধু শব্দ নয় মৃ’তের মতো ঠান্ডা সুরে শীস বাজাচ্ছে লোকটা। যা শোনা মাত্রই পায়ের গতি থমকে গেলো ঈশানীর, এককোণে দাঁড়িয়ে নিশ্চুপে অনুকরণ করতে থাকলো সেই শব্দের গতি। ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে সুর, ধীরে ধীরে এদিকেই এগিয়ে আসছে লোকটা।ফলস্বরূপ হাত পা ঠান্ডা হয়ে এলো রমণীর। তখনই ভেসে এলো আরেকদফা বিকৃত কণ্ঠস্বর,
— মাফিয়া বস এখন আন্ডারওয়ার্ল্ড মিটিং এ বিজি। আর আমি বিজি তার প্রাণপাখিকে নিয়ে। কি সুন্দর কম্বিনেশন তাইনা!
এই বলেই অন্ধকারের মাঝে ঈশানীর মুখের সামনে মুখ বাড়িয়ে দিলো লোকটা। ততক্ষণে নিঃশ্বাস আঁটকে গেলো ঈশানীর, গলার কাছে চলে এসেছে রুহুটা। অন্ধকারের মাঝে দম বন্ধ করে জীবন্ত লাশের মতো নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলো ও। খুব বেশি সময় ক্ষেপণ না করে ছাঁয়ার মতোই ফের আঁধারে মিলিয়ে গেলো লোকটা। লোকটা সরে গেলে চারিদিকে সতর্ক দৃষ্টিপাত করে ধীরে ধীরে শ্বাস ফেললো ঈশানী। র’ক্তশূণ্য ফ্যাকাশে মুখশ্রী জুড়ে বিন্দু বিন্দু ঘামের আস্ফালন। উৎকণ্ঠায় শ্বাসপ্রশ্বাস ভারী হয়ে এসেছে মেয়েটার। মনে হচ্ছে দূর বহুদূর ছুটে এসে সবেই দাঁড়ালো এখানে।
লোকটার পদধ্বনি ক্ষীণ হয়ে এসেছে, এই মূহুর্তে করিডোর ধরে এগোনো অসম্ভব,আপাতত লুকিয়ে পড়তে হবে কোথাও, সেই ভেবে পেছনের ফাঁকা রুমটাতে চট করেই ঢুকে পড়লো ঈশানী । রুমটা ছিল স্টোররুম। অন্ধকারের মাঝে তাড়াহুড়ো এগুতে গিয়ে কাঠের খুঁটির সঙ্গে সজোরে ধাক্কা খেল আচানক, মুহূর্তের মধ্যে ধারালো এক ধাতবে লেগে আড়াআড়িভাবে কেটে গেলো পায়ের অগ্রভাগ। তীব্র যন্ত্রণায় শ্বাস আটকে এলো ওর,সঙ্গে সঙ্গে শরীরের সর্বশক্তিব্যয়ে দাঁত দিয়ে হাতের পৃষ্ঠ কামড়ে ধরে আর্তনাদ সংবরণ করলো মেয়েটা। দাঁতে দাঁত চেপে ফুঁপিয়ে উঠলো নিঃশব্দে, অসহনীয় ব্যথায় নীলবর্ণ ধারণ করলো তার তুলতুলে আদুরে মুখ, তবুও টু শব্দ করলো না রমণী। ছেলের সুরক্ষার তাগিদে চুপচাপ সহ্য করে নিলো সবটা। ওদিকে মায়ের সজলচক্ষু বেয়ে নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়া ঈষদুষ্ণ জলের ছোঁয়া পেতেই নড়েচড়ে উঠলো ছোট্ট প্রাণ।
যখম থেকে গড়িয়ে পড়া তাজা র”ক্তে ক্রমশ আঠালো হয়ে উঠেছে পায়ের তলা, মেয়েটা দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না আর, শরীর ভেঙে আসছে ক্লান্তিতে, সহসা দাঁতের ডগায় অধর কামড়ে রয়েসয়ে নাক টানলো একটু ,সঙ্গে সঙ্গে শরীর ঝাঁকিয়ে হাত-পা ছুঁড়ে কেঁদে উঠলো ছেলে তার। এবার যেন ম”রা”র উপর খারার ঘা পড়লো। ছেলের অদম্য চিৎকারে র”ক্তশূণ্য পাণ্ডুর হয়ে গেলো ঈশানীর ক্রন্দিত মুখ।চিৎকারের শব্দে নিচতলা থেকে ধাপ ধাপ করে ছুটে আসছে কেউ।
যা শোনা মাত্রই বিদ্যুৎস্পৃষ্ঠের ন্যায় ছলকে উঠলো হৃদযন্ত্র, ধড়ফড়িয়ে উঠে ছেলেকে বুকে চেপে ধরলো ঈশানী, কিছুতেই যেন কিছু হচ্ছে না এবার। মায়ের বুকের উষ্ণতা যেন সুরক্ষা দিতে অক্ষম, তেমন করেই হাত পা ছুড়ে গলা চিঁড়ে কাঁদছে ইয়াশ। ওদিকে পায়ের গতি আরও স্পর্ষ্ট আরও ভারী হয়ে উঠেছে এবার। লোকটা কাছাকাছি চলে এসেছে, তবুও কিছুতেই থামানো যাচ্ছেনা ছেলেকে। কেঁদেকেটে র”ক্তবর্ণ ধারণ করেছে তার কোমল চেহারা। চোখের আর নাকের পানিতে একাকার হয়ে দম আঁটকে যাওয়ার উপক্রম। ও বোধ হয় মায়ের কণ্ঠস্বর শোনার জন্যই এমন ব্যাকুল হয়ে কাঁদছে, কিন্তু এমন এক সংকটপূর্ণ মূহুর্ত, যেখানে নিঃশ্বাস নেওয়া দায় সেখানে কথা কি করে বলবে ঈশানী? ছেলের অসহায় মুখের দিকে চেয়ে কান্নায় বুক ভেঙে এলো তার। বাচ্চাকে বুকের মাঝে নিয়ে ফিসফিস করে বললো,
— আর কাঁদে না বাবা, আর কাঁদে না। মায়ের দোহাই লাগে কান্না থামাও। তুমি কাঁদলে ওরা এ ঘরে চলে আসবে, ওরা যে ভয়ংকর আর নির্মম, তোমাকে কষ্ট দিবে। তোমার কষ্ট কিভাবে সইবো আমি? পারবোনা তো। ইয়াশ যে মায়ের একটামাত্র আপনজন, মায়ের নাড়িছেঁড়া ধন। এই মূহুর্ত যতটা পীড়াদায়ক,তোমার কান্নার আওয়াজ তার চেয়েও বেশি যন্ত্রণার। তুমি কাঁদলে মায়ের বুক ভেঙে যায়, তুফান শুরু হয় অন্তরে, কেন বুঝতে চাওনা?
মায়ের হৃদয়ছেঁড়া কাকুতি যেন পৌঁছালো না ইয়াশের কান অবধি , তেমন করেই কান্না জুড়লো সবেগে, এক্ষুণি ছেলেকে না থামাতে পারলে হয়তো লোকটা দরজা ভেঙে চলে আসবে ভেতরে, আর তারপর অবধারিত মৃ”ত্যু! এমন একটা শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে দিশেহারা হয়ে পড়লো রমণী। কোথায় যাবে, কি করবে বুঝে না পেয়ে, খিঁচে বন্ধ করে ফেললো দু’চোখ । সবকিছুই যেন অবাস্তব, মিছে এক কল্পনা মাত্র সেই ভেবেই স্তম্ভিত হয়ে রইলো কিয়ৎক্ষণ। হৃদস্পন্দন মাত্রা ছাড়িয়েছে,অথচ বরফের মতোই জমে আছে কলজেটা। চোখের সামনে একটা মুখই বারবার ভেসে উঠছে কেবল। মন বলছে কোথায় সে? কোথায়! কোথায়! কোথায়! কেন এখনো প্রলয়ের মতো ছুটে আসছেনা, কেন সবসময়ের মতো ঝড়েরবেগে বদলে দিচ্ছে না আবহ?
সেই শুরু থেকে শেষ, কতবারই কত নিষ্ঠুর বাস্তবতা থেকে বাঁচিয়ে নিয়েছে মানুষটা ওকে, অস্তিত্ব ভুলে গিয়ে সবর্দা সুরক্ষা দিয়েছে নিজের শক্ত খোলসের আস্তরণে। তাহলে আজ এই আসন্ন বিপদে সে কোথায়? কোথায় তার এতোবড় সাম্রাজ্য? ঈশানীর স্পষ্ট মনে আছে ম্যানশনের সামনে দু’জন বন্দুকধারী গার্ড ছিল সর্বক্ষণ, তারাই বা গেলো কোথায়? এই লোকটা কি সবাইকে মে’রে ফেললো তবে? কিন্তু এমন একজন অক্ষম লোকের পক্ষে কি এতোজনকে মে’রে ফেলা আদৌও সম্ভব? নাকি আরও কেউ আছে তার সঙ্গে? মস্তিষ্ক জুড়ে অগণিত প্রশ্নের সমাহার, অথচ উত্তর দেওয়ার কেউ নেই। হয়তো কোনো না কোনো ভাবে শেষ মূহুর্ত অবধি অভূতপূর্ব এক মিরাকলের প্রত্যাশা করেছিল মেয়েটা। কিন্তু হায়, বাস্তবতা যে বড়ই নিষ্ঠুর। স্রোতের বিপরীতে চলা তার অভ্যেস, মানুষ যতভাবেই নিজেকে নিখাঁদ ত্রুটিহীন দাবি করুক না কেন, কোনো না কোনোভাবে এই নিষ্ঠুরতম বাস্তবতার কাছে ঠিকই ধরা দিয়ে দেয় নিজের দূর্বলতা, আর তারপর শুরু হয় শত্রুপক্ষের বিকৃত উল্লাস। লোকে বলে পাপ বাপকেও ছাড়েনা, এরীশের জীবনে পাপের পরিমাণ আকাশচুম্বী। আজ সেই আকাশচুম্বী পাপই যেন শ’ত্রু হয়ে কড়া নেড়েছে তার দুয়ারে।
ঠক্ ঠক্ ঠক্!
দরজার উপর শক্ত করাঘাতের শব্দে চমকে উঠলো ঈশানী। বিভ্রম কেটে যেতেই নড়েচড়ে উঠলো মেয়েটা, পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই, লড়াই করার শক্তি নেই তাহলে শেষ পরিনতি কি হতে চলেছে? মৃ”ত্যু!
নিরুপায় হয়ে পড়লো ঈশানী, অসহায় চোখে দৃষ্টিপাত করলো সে ছেলের অস্পষ্ট মুখের দিকে। কাঁদতে কাঁদতে গলা ভেঙে এসেছে তার। মা হয়ে নিজের ছেলের সুরক্ষায় ব্যর্থ হওয়ার চেয়ে ম’রে যাওয়া অনেক ভালো। হ্যা, অনেক ভালো।
তখনই ফের আনমনা হয়ে গেলো মেয়েটা, কি যেন ভেবে হাত বাড়িয়ে আলতো স্পর্শে ছুঁয়ে দিলো নিজের ছোট্ট উদর। যেন কোনো অস্তিত্বের সন্ধানে বিপর্যস্ত রমণী, তেমন করেই নীরব ক্রন্দনে ঠোঁট ভেঙে গেলো তার, ফ্যাকাশে মুখজুড়ে খেলে গেলো অপ্রকাশ্য নির্মম বেদনা। ঠিক সেই সময়ে আরেকদফা ঠাস ঠাস করে করাঘাতের আওয়াজ শোনা গেলো বাইরে। লোকটা ধারালো কোনো বস্তু দিয়ে দরজাটাকে ভাঙার চেষ্টা করছে বারবার । দরজা ভাঙার হুড়মুড় শব্দে প্রকম্পিত হয়ে উঠলো রমণী, এক দণ্ড দেরী করার ফুরসত নেই, সহসা টুকরো টুকরো চুমুতে ভরিয়ে দিলো ক্রন্দিত ছেলের সমগ্র মুখ, কানের কাছে ওষ্ঠ ছুয়িয়ে ফিসফিস করে আওড়ালো,
— মা অনেক ভালোবাসে তোমাকে বাবা, অনেক বেশি, নিজের জীবনের চেয়েও বেশি।
অতঃপর নিজের অনামিকা আঙুল থেকে ব্লাড ডায়মন্ডের আংটিটা খুলে সেটা সমেত কক্ষের এককোণে শুয়িয়ে দিলো ছেলেকে। এদিকওদিক হাতড়ে শক্ত একটা ফুলদানি তুলে নিলো হাতের মুঠোয়। ততক্ষণে দরজা ভাঙা শেষ। ক্রীসে ভর করে যান্ত্রিক পদধ্বনিতে এদিকেই এগিয়ে আসছে লোকটা। দীর্ঘদেহী অথচ ছিপছিপে গড়ন, আলখাল্লার কারণে অন্ধকারের মাঝে বয়স অনুমান করা দায়,ঈশানী সময় নষ্ট করলো না, দৌড়ে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো লোকটার উপর, প্রগাঢ় অন্ধকারের মাঝেই ফুলদানি দিয়ে বসিয়ে দিলো কয়েক ঘাঁ। তবুও টললো সেই মানব,ঈশানীর তৎপরতা দেখে উল্টো হেসে উঠলো কদর্য গলায়।
ঠিকঠাক আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে কিনা অনুমান করা দায়, সেসবে মাথা খাটাতে গেলোনা রমণী, আগন্তুক লোকটার সবটুকু মনোযোগ কেড়ে নিয়ে ছুটলো যে দিগ্বিদিক। ও আসলে এটাই চেয়েছিল, ছেলের দিক থেকে সরে আসুক লোকটা, অবশেষে সেটাই হলো,হাতের ক্রীসটা ফেলে দিয়ে, নিজের যান্ত্রিক পায়ে স্পর্শ করতেই রোবটিক সিস্টেমে সোজা হয়ে গেলো পা টা।ঢেকে রাখা অংশ থেকে নীলাভ একটা আলো জ্বলে উঠতেই ঝড়ের গতিতে পিছু নিলো সে ঈশানীর। ছুটতে ছুটতেই পেছন থেকে ভেসে এলো বিকৃত হুংকার,
— দৌড়া! যত ইচ্ছে দৌড়া! তুই যতবেশি পালাবি, তোকে মা”রতে ততবেশি প্রশান্তি লাগবে আমার। তোকে কষ্ট দিয়ে না মা”রলে তোর মাফিয়া বসকে ভাঙবো কি করে? বুকের ভেতর বড্ড জ্বালা, এরীশ ইউভানের একমাত্র প্রাণভোমরাকে তিলে তিলে মে’রে তবেই না জ্বালা মিটবে এ বুকের!
অদ্ভুতভাবেই কণ্ঠস্বরটা ভীষণ পরিচিত ঠেকলো ঈশানীর, যেন খুব চেনা কেউ! চিরচেনা! তবেই এই মূহুর্তে ভাবনার সময় নেই, কোনোমতে ছুটতে ছুটতে কম্পমান হাতে ডায়াল করলো এরীশের নাম্বারে, মনেপ্রাণে শুধু একটাই আরাধনা করতে লাগলো,
— একটা কলই যাতে কাজে লেগে যায়, হায় ঈশ্বর! একটা কলই যাতে পৌঁছায়।
ঈশানীর আরাধনা বোধ হয় কবুল হলো, ওপাশ থেকে ভেসে এলো চিরচেনা মাদকীয় সেই কন্ঠস্বর,
— প্রেম আমার!
এই একটা শব্দে ঈশানীর যেন দুনিয়া থমকে গেলো। চোখ ছাপিয়ে উগড়ে এলো কান্নার ঢেউ। হাঁপড়ের মতো ওঠানামা করছে নিঃশ্বাস। হাঁপাতে হাঁপাতে কিছু বলতে যাবে তখনই পেছন থেকে ওর দিকে ক্রীস ছুড়ে মা’রলো লোকটা। ধাতব বস্তুটার সঙ্গে নিমেষেই পা লেগে হুমড়ি খেয়ে মুখ থুবড়ে পরে গেলো রমণী, অসাবধনতায় হাত ফস্কে ছিটকে গেলো তার মুঠোফোন। শারীরিক যন্ত্রনার তোয়াক্কা করলো না ঈশানী, অসহায়ের মতো হামাগুড়ি দিয়ে ছুটতে লাগলো ফোনের দিকে। অপরপ্রান্ত যেন উন্মাদ হয়ে উঠেছে এতোক্ষণে। ক্রমাগত ভেসে আসছে উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বর। বহুল প্রচেষ্টায় কোনোমতে ফোনটা তুলেই ফেলেছিল হাতের মুঠোয়, তন্মধ্যেই অতর্কিত পদাঘাতে ওর কব্জি চেপে ধরলো আগন্তুক। শক্ত বুটের পেষনে থেতলে দিলো মোমরাঙা তুলতুলে নরম ত্বক। সঙ্গে সঙ্গে ঘর কাঁপিয়ে চিৎ”কার দিয়ে উঠলো ঈশানী, সেই সাথে চিৎকার দিয়ে উঠলো মুঠোফোনের বিপরীতপ্রান্তে থাকা আরও এক হিং”স্র সত্তা।
এরীশ ইউভানের অতর্কিত দানবীয় গর্জনে থরথর করে কেঁপে উঠলো সামনে বসে থাকা মাফিয়া সংঘের প্রত্যেকটি মানুষ। আজ আন্ডারগ্রাউন্ডে গোপনীয় এক বৈঠক বসেছে, পৃথিবীর ছোট বড় অনেক মাফিয়া সদস্যরাই সেখানে উপস্থিত। এরীশ সাধারণত উপস্থিত থাকেনা এসবে, আজ তুষার নেই বলেই বাধ্য হয়ে আসতে হলো। কতক্ষণই বা হবে, সবে আধঘণ্টার মতো। এর মাঝেই ওর দূর্বলতায় থাবা দিয়ে ফেলেছে শত্রুপক্ষ।কিন্তু ওই ম্যানশনের হদিস পেলো কোথায়? তারমানে কি কাল ঈশানীকে স্টক করেছে কেউ?
কোনোকিছুই ভাবতে পারলো না এরীশ, ওর কর্ণকূহরে তরঙ্গোচ্ছ্বাসের মতো প্রতিধ্বনিত হচ্ছে ঈশানীর হৃদয়ছেঁড়া আর্তনাদ! ওরা কতটা ব্যথা দিয়েছে সাকুরাকে! ঠিক কতটা!
— আই ডিড ওয়ার্ন ইউ্য, বলেছিলাম তোকে,একটা মাত্র ভুল পদক্ষেপ এ্যান্ড ইউ্য উইল বি কম্পিলিটলি ডেস্ট্রয়েড!
ফোনের ওপাশ থেকে হঠাৎ কর্কশ পুরুষালি কণ্ঠ ভেসে আসতেই সৎবিৎ ফিরলো এরীশের। যা শোনা মাত্রই হিং”স্রের মতো গর্জে উঠলো মাফিয়া বস,
—এইইই! লে আ ফাকিং হ্যান্ড অন হার,এ্যান্ড ইউ্য আর ফিনিশড!
মাফিয়া বস এরীশ ইউভানের এহেন হু”মকিতে বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা করলো না ওপাশের ব্যক্তি,উল্টো নিস্পৃহ ভঙ্গিতে হেসে উঠে ব্যঙ্গাত্তক স্বরে জবাব দিলো,
— হ্যান্ড? আমি তোর জানের গায়ে পা দিয়ে রেখেছি,আই লিটরেলি কিপ্ট হার আন্ডার মাই সুজ!
রাগের তোড়ে থরথর করে কেঁপে উঠল এরীশ। টগবগ করে ফুটতে লাগলো তার শরীরের প্রতিটি রক্তকনিকা, শক্ত হয়ে আসা চোয়ালের পেশি থেকে বেড়িয়ে এলো ভয়াল অশনি হুংকার,
— তুই আমাকে চিনিস না বাস্টার্ড, রীশষ্কাকে অনুমান করলেও, ব্লাডি মনস্টার তোর ধারণার বাইরে। আই উইল রিপ ইউওর লেগস অফ ইউওর বডি!
মাফিয়া বসের মুখ থেকে ভয়ানক হুমকি নিঃসৃত হওয়া মাত্রই ফোনের অপরপ্রান্ত থেকে আবারও ভেসে এলো ঈশানীর আর্ত চিৎকার। যা শুনে হৃদস্পন্দন থমকে গেলো এরীশের।
— চিৎকার শুনতে পাচ্ছিস নিশ্চয়ই? ওর আরেকটা হাতও পা দিয়ে পিষে দিয়েছি এবার। নাও ইট’স টাইম টু টেইক হার লাভলী সোল। মাফিয়া বসের জান প্রাণ সব তো ওটার মধ্যেই আছে, এ্যাম আই রাইট?
ভেতরটা দাবানলের মতো দাউদাউ করে জ্বলছে। মস্তিষ্কটা খেই হারিয়েছে আচানক। এমন এক সন্ধ্যিক্ষণে এরীশ এক জীবন্ত পুত্তলিকার ন্যায় নিস্তেজ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ। দূর্বলতা যে মানুষকে এতো করুন ভাবে ভাঙতে পারে তা এর আগে জানা ছিলনা কখনোই । আজ এই মূহুর্তে দাঁড়িয়ে নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় অপদার্থ বলে মনে হলো এরীশের। এতো বড় সাম্রাজ্য, এতো প্রতিপত্তি, এতো পাওয়ার সব সবকিছু একটা মেয়ের জীবনের কাছে পর্যদস্তু হয়ে পড়লো এক নিমেষে ।
— এবার বল,কেমন লাগছে নিজের দূর্বলতা উপলব্ধি করে ? এভাবে, ঠিক এভাবেই তো কত মানুষের দূর্বলতার সুযোগ নিয়ে আত্মাটাকে মে’রে ফেলেছিস।ভেঙে দিয়েছিস তাদের একজীবনের আশা, আকাঙ্খা, স্বপ্ন সবকিছু।
শুকিয়ে আসা ঠোঁট দু’টো জিভ দিয়ে ভিজিয়ে জীবনে প্রথমবার নিজেকে সংবরণ করলো মাফিয়া বস। জোরে জোরে শ্বাস ফেলে নিয়ন্ত্রণ করলো ভেতরের আগ্রাসী ক্রুদ্ধতা। চোখমুখ খিঁচে যথাসম্ভব ধীর গলায় বলে উঠলো,
— জাস্ট লিসেন টু মি। ডোন্ট টাচ্ হার!ডোওওন্ট! তোর আমার সঙ্গে শ”ত্রুতা তাইতো? আমি আসছি, যা প্রতিশোধ নেওয়ার আমার থেকে নিস! যা ইচ্ছে হয় করিস, আই উইল সারেন্ডার্ড, আমি মাথা পেতে নিবো সবকিছু। কিন্তু ওকে টাচ করিস না, শী ইজ মাই ফাকিং এন্টায়ার ওয়ার্ল্ড! মাই এভরিথিং!
— উহু! এই মেয়েটার সঙ্গেও যে আমার শত্রুতা। ঘোর শত্রুতা। শী ইজ আ বিচ!
— এইই! ডোন্ট কল হার বিচ! জিহ্বা টেনে ছিঁড়ে ফেলবো আমি তোর!
এরীশের হুংকারের পরোয়া করলো না বিপরীত পক্ষ, উল্টো শীতল আওয়াজে গর্জে উঠলো অপরাপর,
— চেকমেট মাফিয়া বস!জাস্ট গেট অন ইউওর নিইইচ !
— ইউ্য মাদার ফাকিং বা”স্টার্ড!
মাথায় খু”ন চেপে বসলো এরীশের। ক্রোধান্বিত হয়ে আরও কিছু বলবে তার আগেই ধীর কণ্ঠে অনুরূপ কথার পুনরাবৃত্তি করলো লোকটা,
— গেন অন ইউওর নিইইচ!
চোখমুখ শক্ত করে ফেললো মাফিয়া বস। তার এহেন অভিব্যক্তি দেখা মাত্রই দফায় দফায় তৈরি হয়ে নিলো সশস্ত্র গার্ড। বড়সড় বিপদ আসন্ন তাদের আর বুঝতে বাকি নেই।
দু’প্রান্তে শশ্মানের নীরবতা বিরাজমান। মাফিয়া বসকে এক দণ্ড সময় দিলো না সাইকোপ্যাথ,কথার এফোঁড়ওফোঁড় হওয়া মাত্রই শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে ঈশানীকে ছু”ড়িকাঘাত করতে উদ্যত হলো সে।ধা'”রালো মা”রণা’স্ত্রখানি তেড়েফুঁড়ে পেটের দিকে ছুটে আসতেই, রুগ্ন হাতে সেটাকে প্রতিহত করলো রমণী। খুব কষ্ট করে কান্না বিজড়িত কণ্ঠে মিনতি করে বললো,
— এ.. এখানে না।
ভ্রু বাঁকিয়ে ফেললো আগন্তুক। এরীশের তোয়াক্কা না করেই জানতে চাইলো,
—কি আছে এখানে?
— বাচ্চা! আমার বাচ্চা!
ঈশানীর এই ছোট্ট কথাটা তীরের ফলার মতো গিয়ে বিদ্ধ হলো এরীশে মস্তিষ্কে। ভূকম্পনের মতোই সমগ্র অস্তিত্ব নড়ে উঠলো তার। বিস্ফারিত নয়নে তাকিয়ে কলের পুতুলের মতো আওড়ালো,
— ব..বাচ্চা!
প্রতিশোধের নেশায় মত্ত হয়ে ওঠা সাইকোপ্যাথের নিকট ঈশানীর এই বাক্যটা যেন মেঘ না চাইতে বৃষ্টির মতো ঠেকলো। সে তো এটাই চেয়েছিল, ব্লাডিবিস্ট মাফিয়া বসটাকে মা’নসি’ক য’ন্ত্রণায় ভেঙে গুড়িয়ে দিতে। যেই ভাবা সেই কাজ, ঈশানীর রুগ্ন হাতদুটোকে এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে ধারালো ছু”ড়িটাকে সোজা গেঁথে ফেললো পেটের ভেতর। এদিকওদিক ঘুরিয়ে কে””টেছিঁ”ড়ে বের করে আনলো অনর্গল র”ক্তস্রোত। মূহুর্তেই তীব্র আ”ঘা”তে ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলো রমণীর সর্বাঙ্গ। যার ব্যথাতুর আওয়াজ পৌঁছে গেলো ফোনের অপরপ্রান্ত অবধি।
— নো!নো! নোওওও!
চিৎকার দিয়ে উঠে তৎক্ষনাৎ হাঁটু মুড়ে ধপ করে মেঝেতে বসে পড়লো বিপরীত পক্ষ। একের পর এক জোড়ালো মু”ষ্টাঘা”তে র”ক্তা”ক্ত করে ফেললো শ্বেত পাথরের তকতকে মেঝে, হাতের চামড়া থেত”লে গিয়ে বেড়িয়ে এলো তার ক্ষ”তবি”ক্ষত শিঁড়া , তবুও উন্মাদের মতো চিৎকার করে যাচ্ছে মানুষটা। পুরো ঘটনাটা ঘটে গেলো কয়েক ন্যানো সেকেন্ডের মাঝে। এরীশের সামনে বসে থাকা দেশ-বিদেশের মাফিয়ারা সব কিংকর্তব্যবিমূঢ়! মাফিয়া বসটাকে এভাবে হঠাৎ বসে পড়তে দেখে তারা একযোগে দাঁড়িয়ে পড়লো সব। demon Knight রা কমান্ডের অপেক্ষায় বসে রইলো না আর এক মূহুর্ত। কোনোরূপ ভাবান্তর না করেই, শয়ে শয়ে গাড়ি নিয়ে বেড়িয়ে পড়লো মাফিয়া ম্যানসনের উদ্দেশ্যে।
আমি শুধু চেয়েছি তোমায় পর্ব ৬৪
ওদিকে ধস্তাধস্তি আর টানাহেঁচড়ার মধ্যেই দ্বিতীয়বারের মতো ঈশানীর পেটের মাঝে ছু”ড়ি চালালো লোকটা, অতর্কিত ছু”রিকা”ঘাতে ব্য”থায় নীলবর্ণ ধারণ করলো তার মোমরাঙা ফর্সা কোমল মুখ। নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠেছে, শরীর জুড়ে র””ক্তের প্লাবন, সেই র”ক্তমাখা হাত দিয়েই টেনে সরালো আগন্তুকের কালো বিদঘুটে মুখোশ, সঙ্গে সঙ্গে লোকটা পিছিয়ে গেলো কয়েক পা। তবুও ঈশানী নিজের আঙুল তাক করলো সেদিকে, কম্পমান তর্জণীখানি মুখের উপর ইশারা করে থেমে থেমে আওড়ালো ,
— স… সুইট ডেমোন!

Porer part plz……
“lekhika apu plz taratari porer part deo……..
Ar ai uponnash ta ki sad ending hobe… Plz reply dio..!”
Next part please
Next part taratari dan🥺
eta ki apu sad ending diben apu? plz reply….eta happy ending diyen plz apu
Next parttttt
Sad ending diyen na apu plz…r next part ta joldi den…..
Plz Apu sad ending diyen na 🥺🥺🥺🥺🥺🥺🥺🥺
Next part please 🥺