আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ১৯
সাবিলা সাবি
রাত আরও গভীর হয়েছে।
লন্ডনের ব্যস্ত সড়ক পেরিয়ে কালো এসইউভিটা এসে থামল শহরের একটি অভিজাত পাঁচতারকা হোটেলের সার্ভিস এন্ট্রান্সে। চারপাশে কড়া নিরাপত্তা থাকলেও পুরো কাজটাই চলছিল নিঃশব্দে।
মার্ক গাড়ি থেকে নেমে চারপাশে একবার সতর্ক চোখ বুলিয়ে নিল। সবকিছু ঠিক আছে নিশ্চিত হয়ে দরজা খুলে অচেতন লিওনকে কাঁধে ভর দিয়ে ভেতরে নিয়ে গেল। আগেই ভুয়া পরিচয়ে একটি কক্ষ বুক করা ছিল।
রুমে ঢুকেই সে সাবধানে লিওনকে বিছানায় শুইয়ে দিল। নাড়ি পরীক্ষা করে নিশ্চিত হলো আঘাতের কারণে সে শুধু অচেতন, অন্য কোনো সমস্যা নেই। এরপর টেবিলের ওপর লিওনের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র গুছিয়ে রেখে শেষবারের মতো তার দিকে তাকাল।
মার্ক নিচু স্বরে বলল,
“মিস্ট্রেসের আদেশের একটুও এদিক-ওদিক হওয়া চলবে না।”
কথা শেষ করে সে নিঃশব্দে দরজা বন্ধ করে বেরিয়ে গেল। পুরো কক্ষ আবার নিস্তব্ধ হয়ে উঠল।
অচেতন লিওন জানতই না, কয়েক ঘণ্টা আগেও যে আন্ডারগ্রাউন্ড টানেলের বন্দিশালায় সে আটকে ছিল, এখন সে লন্ডনের একটি বিলাসবহুল হোটেলের কক্ষে শুয়ে আছে।
শহরের অন্য প্রান্তে ঠিক তখনই একটি কালো স্পোর্টস বাইক পরিত্যক্ত একটি গুদামঘরের সামনে এসে থামল।
বাইরে থেকে জায়গাটা ভাঙাচোরা আর নির্জন মনে হলেও সেটাই ছিল ছদ্মবেশ। গুদামঘরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা একটি গোপন লিফট সোজা অনেকটা নিচে নেমে গেছে।
লিফটের দরজা খুলতেই চোখের সামনে ভেসে উঠল এক বিশাল আন্ডারগ্রাউন্ড সিক্রেট ক্যাসিনো ক্লাব।
ঝলমলে আলো, পোকার টেবিল, রুলেট, দামি মদের সংগ্রহ, উচ্চস্বরে বাজতে থাকা সুর আর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অপরাধজগতের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আনাগোনায় পুরো জায়গাটা মুখর।
এখানে টাকার চেয়েও মূল্যবান ছিল ক্ষমতা আর গোপন চুক্তি। হিয়া ধীর পায়ে ভেতরে প্রবেশ করল। তার পাশে ইভানা।
হিয়াকে দেখেই নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা লোকগুলো সম্মানের সঙ্গে মাথা নত করল। কেউ সামনে এসে কিছু বলার সাহস পেল না।
ভাইপারের নাম শুনলেই মানুষ ভয় পায়। আর সামনে দাঁড়িয়ে থাকলে সেই ভয় কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
ইভানা নিচু স্বরে বলল,
“মিস্ট্রেস, আয়মান খান ভিআইপি লাউঞ্জে আপনার অপেক্ষায় আছেন।”
হিয়ার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে শীতল এক হাসি ফুটে উঠল। তার দৃষ্টি মুহূর্তেই কঠিন হয়ে গেল।
“চলো। অনেক দিনের বাকি হিসাব আজ শুরু হবে।”
ভিআইপি লাউঞ্জের দরজা খুলতেই নরম সোনালি আলোয় ভেসে উঠল অভিজাত এক পরিবেশ। চারদিকে দামি কাঠের আসবাব, ক্রিস্টালের ঝাড়বাতি আর নিভু নিভু আলোয় বসে আছে অপরাধজগতের পরিচিত কিছু মুখ। সেই ভিড়ের মাঝখানে সোফায় হেলান দিয়ে বসে ছিল আয়মান খান।
দরজার দিকে চোখ পড়তেই তার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল। আজ হিয়া কোনো ছদ্মবেশে আসেনি।
কালো ব্লেজার স্যুটে, আত্মবিশ্বাসী পদক্ষেপে, নিজের আসল পরিচয় ভাইপার হিসেবেই সে এই ক্লাবে প্রবেশ করেছে। এই আন্ডারগ্রাউন্ড ক্যাসিনোতে ভাইপারকে সবাই চেনে। এখানে নিজের পরিচয় লুকানোর কোনো প্রয়োজন নেই।
হিয়া ধীর পায়ে এগিয়ে এসে আয়মানের পাশের সোফায় বসল। একজন ওয়েটার এগিয়ে এলে সে হাতের ইশারায় তাকে সরে যেতে বলল।
আয়মান মৃদু হেসে বলল, “বাবা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। খুব শিগগিরই বাংলাদেশ ফিরে যাব।”
হিয়ার চোখে এক মুহূর্তের জন্যও বিস্ময় ফুটল না। শান্ত ভঙ্গিতেই সে আয়মানের গালে আলতো করে আঙুল ছুঁইয়ে দিল।
“এত তাড়াতাড়ি চলে যেতে চাও?”
আয়মান মাথা নাড়ল।
“আমি যেতে চাই না। কিন্তু বাবার এখানে কয়েকটা বড় ডিল ছিল। সবগুলো প্রায় শেষ। তাই উনি আর থাকতে চাইছেন না।”
হিয়া স্বাভাবিক কণ্ঠেই জিজ্ঞেস করল,
“কীসের ডিল?”
আয়মান চারপাশে একবার তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল,
“হিউম্যান ট্র্যাফিকিং… কয়েকজন মেয়েকে লন্ডন থেকে দুবাই পাঠানো হবে। সব ব্যবস্থা হয়ে গেছে।”
কথাটা শেষ হতেই হিয়ার বুকের ভেতর আগুন জ্বলে উঠল। তার মুখে কোনো পরিবর্তন এল না, কিন্তু টেবিলের নিচে মুঠো করে রাখা হাতের শিরাগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠল।
মেয়েদের পাচার…
এটা সে কোনো মূল্যেই হতে দেবে না।
তার জীবনে যত অপরাধই থাকুক, নিরীহ কোনো মেয়েকে নরকে ঠেলে দেওয়ার মতো অপরাধ সে কখনো সমর্থন করেনি।
নিজেকে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রেখে সে আবার প্রশ্ন করল,
“কবে? কোথা দিয়ে যাবে?”
আয়মান হালকা হেসে মাথা নাড়ল।
“এসব বলা যাবে না, ভাইপার। এগুলো খুব কনফিডেনশিয়াল।”
হিয়া ঠোঁট বাঁকিয়ে তাকাল।
“আমাকে এখনও ট্রাস্ট করতে পারলে না?”
আয়মান একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল।
হিয়া আরও কাছে ঝুঁকে এল। তার কণ্ঠে নেমে এল মাদকতা।
“ঠিক আছে… আজ রাতটা আমি তোমার সঙ্গেই থাকব। এবার বলো, আমার ওপর বিশ্বাস হবে?”
কথাটা শুনতেই আয়মানের চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
লোভ আর মোহে তার দৃষ্টি ঝলসে উঠল।
সে বুঝতেই পারল না, যার উপস্থিতিতে সে এতটা মুগ্ধ, সেই নারীই তার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর ফাঁদ হয়ে সামনে বসে আছে।
আয়মানের ঠোঁটে ধীরে ধীরে হাসি ফুটে উঠল। সে হেলান দিয়ে বসে বলল, “একটা গেইম হবে, ভাইপার?”
হিয়া ভ্রু তুলল। “কোন গেইম?”
“পোকার। অনেক দিন টেবিলে বসা হয় না।”
হিয়া কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর শান্ত গলায় বলল,
“ওকে।”
ক্যাসিনোর মাঝখানে থাকা ভিআইপি পোকার টেবিলের দিকে দুজন এগিয়ে গেল। ভাইপারকে টেবিলে বসতে দেখেই আশপাশের কথাবার্তা ধীরে ধীরে থেমে গেল। কয়েকজন খেলোয়াড় একে অপরের মুখের দিকে তাকাল। তারপর একজন উঠে দাঁড়িয়ে মাথা নাড়ল।
“নো… আমি এই ম্যাচ খেলছি না।”
আরেকজন হালকা হেসে বলল,
“টাকা হারানোর ভয় নেই। কিন্তু ভাইপারের কাছে হারার ইচ্ছাও নেই।”
মুহূর্তের মধ্যে আরও দু-তিনজন সরে গেল।
এই আন্ডারগ্রাউন্ড ক্যাসিনোতে নিয়মিত যারা খেলত, তারা সবাই জানত—ভাইপার শুধু একজন কুখ্যাত অপরাধী নয়, পোকার টেবিলেও সে প্রায় অপ্রতিরোধ্য।
তার মুখভঙ্গি দেখে কার্ড পড়া যায় না।
ব্লাফ ধরাও প্রায় অসম্ভব।
সবচেয়ে বড় কথা, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কেউ বুঝতেই পারে না তার আসল চাল কোনটা।
আয়মান হেসে মাথা নাড়ল।
“বাহ, তোমাকে দেখে সবাই ভয়ে পালাচ্ছে।”
হিয়া নির্বিকার কণ্ঠে বলল,
“ভয়কে আমি কখনও জোর করে তৈরি করিনি। মানুষ নিজেরাই তৈরি করেছে।”
ঠিক তখনই ক্যাসিনোর প্রধান প্রবেশপথ দিয়ে একজন অচেনা ব্যক্তি ভেতরে ঢুকল। লম্বা দেহ, আত্মবিশ্বাসী হাঁটা, চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। সে একবার পোকার টেবিলের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে এগিয়ে এল।
চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকদের উদ্দেশে বলল,
“খেলোয়াড় না পেলে… আমি বসতে পারি।”
কথাটা শুনে আশপাশে চাপা গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল।
লোকটা ধীরে ধীরে চেয়ার টেনে বসে বলল,
“অনেক শুনেছি ভাইপারের নাম। আজ দেখি… কিংবদন্তিটা সত্যিই কত বড় মাপের খেলোয়াড়।”
ভিআইপি পোকার টেবিলের চারপাশে মুহূর্তেই ভিড় জমে গেল। সবাই জানত, ভাইপার টেবিলে বসলে সেটা আর সাধারণ খেলা থাকে না।
ডিলার নতুন তাসের ডেক খুলে সবার সামনে সিল ভাঙল। নিয়ম অনুযায়ী কার্ডগুলো ভালোভাবে শাফল করে খেলা শুরু হলো।
প্রথম রাউন্ডের বেট ধরা হলো ৫০ হাজার পাউন্ড।
আয়মান আর হিয়া একই টিমে। বিপরীতে বসা রহস্যময় খেলোয়াড় সার সাথে আরেকজন খেলছে।
প্রথম কয়েক রাউন্ডে হিয়া ইচ্ছে করেই খুব সাধারণ চাল দিল। তার মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই, হাতে শক্ত কার্ড নাকি একেবারেই ফাঁকা।
আয়মান মাঝেমধ্যে অবাক চোখে হিয়ার দিকে তাকাচ্ছিল। সে বুঝতেই পারছিল না, হিয়া আসলে কী পরিকল্পনা করছে।
অপরপক্ষ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে একের পর এক রেইজ করতে লাগল।
এক লাখ…
দুই লাখ…
পাঁচ লাখ পাউন্ড।
চারপাশে চাপা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল।
এত বড় অঙ্কের খেলায় সাধারণত কেউ এত দ্রুত অল-ইনের কাছাকাছি যায় না।
হিয়া নির্বিকার মুখে চিপস ঠেলে দিল।
“Call.”
ডিলার পরপর কমিউনিটি কার্ড খুলতে লাগল।
টেবিলের পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করল।
রহস্যময় লোকটার মুখে তখনও আত্মবিশ্বাসী হাসি।
সে ভেবেই নিয়েছে, এই হাত তার।
শেষ কার্ডটি টেবিলে পড়তেই হিয়া একবারও উত্তেজিত হলো না।
সে শুধু আঙুল দিয়ে টেবিলে হালকা টোকা দিল।
“Show.”
লোকটা বিজয়ীর ভঙ্গিতে নিজের কার্ড খুলে দিল।
চারপাশ থেকে কয়েকজন চাপা স্বরে বলল,
“দারুণ হাত!”
আয়মানের মুখও মুহূর্তের জন্য ম্লান হয়ে গেল।
কিন্তু হিয়া ধীরে ধীরে নিজের দুটি কার্ড টেবিলে রাখতেই পুরো ক্যাসিনো নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
ডিলার কার্ডগুলোর দিকে তাকিয়ে কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ রইল।
তারপর পরিষ্কার কণ্ঠে ঘোষণা করল,
“Winner… Team Viper.”
মুহূর্তেই চারদিকে বিস্ময়ের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল।
লোকটা হতভম্ব হয়ে কার্ডগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর অবিশ্বাসের সুরে বলল,
“অসম্ভব…”
হিয়া ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি টেনে উত্তর দিল,
“পোকারে ভাগ্য মানুষকে একবার জেতায়। কিন্তু হিসাব করে চাল দিতে না পারলে ভাগ্যও বেশিক্ষণ পাশে থাকে না।”
ডিলার সব চিপস তাদের দিকে ঠেলে দিল।
মোট পটের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ১.২ মিলিয়ন পাউন্ড।
আয়মান বিস্মিত চোখে হিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোমাকে যতবার খেলতে দেখি, ততবারই মনে হয় তোমার মাথার ভেতর আরেকটা দাবার বোর্ড চলছে।”
হিয়া শুধু হালকা হাসল। জয়টা তার কাছে টাকার জন্য ছিল না। সে জানত, মানুষের লোভ, আত্মবিশ্বাস আর ভুল সিদ্ধান্ত—এই তিনটাকেই হারাতে পারলে পোকার টেবিলে জয় প্রায় নিশ্চিত।
ভিআইপি টেবিল থেকে উঠে দাঁড়াল আয়মান আর ভাইপার।
জেতা অর্থের হিসাব তখনও শেষ হয়নি। চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন নিজেদের মধ্যে চাপা স্বরে আলোচনা করছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে ভাইপারের দৃষ্টি গিয়ে থামল আয়মানের সাদা ফ্রেমের চশমায়।
চশমার কাচে ক্ষীণ এক প্রতিফলন ভেসে উঠেছে।
পেছন দিক থেকে একজন অস্ত্র তাক করে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে।
এক সেকেন্ডও দেরি করল না ভাইপার।
সে বিদ্যুৎগতিতে ঘুরে কোমর থেকে পিস্তল বের করল।
একটি গু/লির শব্দে পুরো ক্যাসিনো কেঁপে উঠল।আ*ক্রমণ*কারী মাটিতে লুটিয়ে পড়তেই চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে গেল।
পরের মুহূর্তেই আরও কয়েকজন অস্ত্র হাতে চারদিক থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। গো*লাগু*লির শব্দে আন্ডারগ্রাউন্ড ক্যাসিনো রণক্ষেত্রে পরিণত হলো।
আয়মান দ্রুত একটি টেবিলের আড়ালে আশ্রয় নিল। সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই ভাইপার সামনের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়েছে।
তার পায়ের স্নিকারের ভেতরে লুকিয়ে রাখা ধারালো ব্লেড বের করে সে প্রথম হামলাকারীর কবজিতে আঘাত করল। অস্ত্র ছিটকে পড়তেই কনুইয়ের আঘাতে আরেকজনকে মেঝেতে ফেলে দিল।
তৃতীয় ব্যক্তি সামনে আসতেই ভাইপার মাথা ঝুঁকিয়ে তার আঘাত এড়িয়ে কপাল দিয়ে সজোরে ধাক্কা মারল।
লোকটা ভারসাম্য হারাতেই হাঁটুর আঘাতে তাকে মাটিতে ফেলে দিল। চারদিক তখন গু/লির শব্দে কাঁপছে। কেউ বুঝতেই পারছে না, এই সশস্ত্র দলটা আসলে ভাইপারের শত্রু, নাকি তার পাশের আয়মানের। একদল শু/ধু গুলি চালিয়েই যাচ্ছে।
ভাইপার লড়তে লড়তে আয়মানের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করল,
“স্ট্যান্ড আপ! এখান থেকে বের হতে হবে!”
আয়মান আর দেরি করল না।
দুজন দ্রুত আন্ডারগ্রাউন্ড পার্কিং লটের দিকে ছুটে গেল।
সেখানেও তাদের পিছু নিল কয়েকজন হামলাকারী।
একটি কালো এসইউভির ছাদে লাফিয়ে উঠে ভাইপার সামনের লোকটাকে লাথি মেরে নিচে ফেলে দিল। পাশের গাড়ির দরজা খুলে সেটাকেই ঢাল হিসেবে ব্যবহার করল।
আয়মান বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল।
একজন নারী…
একা…আর তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা প্রশিক্ষিত সশস্ত্র লোকগুলোকে একের পর এক পরাস্ত করছে।
নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না সে।
দূর থেকে হঠাৎ পুলিশের সাইরেনের শব্দ ভেসে এল।
ভাইপার এক ঝলকে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করল।
ইভানা নিরাপদে বেরিয়ে যেতে পেরেছে—এটা নিশ্চিত হতেই সে আর এক মুহূর্তও দেরি করল না।
সে আয়মানের কবজি শক্ত করে ধরে বলল,
“চলো!”
দুজন দৌড়ে পার্কিংয়ের শেষ প্রান্তে রাখা কালো স্পোর্টস বাইকের কাছে পৌঁছে গেল। ভাইপার সামনে বসতেই আয়মান পেছনের সিটে উঠে বসল।
পরের মুহূর্তেই ইঞ্জিনের গর্জনে বাইকটা অন্ধকার টানেল ছেড়ে রাতের লন্ডনের রাস্তায় মিলিয়ে গেল।
বাইকটা শহরের ব্যস্ত রাস্তা পেরিয়ে অবশেষে একটি অভিজাত নাইট ক্লাবের সামনে এসে থামল।
ইঞ্জিন বন্ধ হতেই আয়মান কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ হিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।
আজকের ঘটনার পর তার ভেতরে কিছু একটা বদলে গেছে। ভাইপারকে সে আগেও রহস্যময় মনে করত, কিন্তু আজ নিজের চোখে দেখল—এই মেয়েটা শুধু বুদ্ধিমান নয়, প্রয়োজনে একাই একটি সশস্ত্র দলের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যেতে পারে।
তার অজান্তেই ভাইপারের প্রতি দুর্বলতা আরও গভীর হয়ে গেল।
হিয়া হেলমেট খুলে নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,
“চলো।”
দুজন ক্লাবের ভেতরে প্রবেশ করল।
ভেতরের পরিবেশ ক্যাসিনোর চেয়েও আলাদা। মৃদু আলো, ধীরগতির সুর আর অভিজাত অতিথিদের আনাগোনায় পুরো জায়গাটা মুখর।
হলরুমের এক কোণায়, জানালার পাশে রাখা একটি গোল টেবিলে বসে ছিল সেই রহস্যময় আগন্তুক—সেদিনের গেইস্ট।
তার কোলের ওপর আরাম করে বসেছিল এক তরুণী। দুজনের মাঝেই নিশ্চিন্ত আলাপ চলছিল।
আয়মান সোজা সেদিকেই হাঁটতে শুরু করল। কিন্তু কয়েক কদম এগোতেই হিয়ার পদক্ষেপ থেমে গেল।
তার চোখ স্থির হয়ে রইল গেইস্টের ওপর। অদ্ভুত এক চাপা ভয়ের অনুভূতি বুকের ভেতর ছড়িয়ে পড়ল।
সে অজান্তেই ধীরে একটি ঢোক গিলল। আয়মান বিষয়টা খেয়াল না করেই হিয়ার কবজি আলতো ধরে সামনে এগিয়ে নিল। ওদের উপস্থিতি টের পেয়ে গেইস্ট ধীরে মুখ তুলল। তার ঠান্ডা দৃষ্টি প্রথমে আয়মানের ওপর গিয়ে থামল, তারপর স্থির হলো ভাইপারের মুখে।
পরের মুহূর্তেই সে কোনো কথা না বলে নিজের কোল থেকে মেয়েটিকে নামিয়ে দিল। মেয়েটি বিস্মিত চোখে তার দিকে তাকাল, কিন্তু গেইস্ট আর একবারও তার দিকে ফিরেও তাকাল না।
কয়েক সেকেন্ড আগেও যে মেয়েটি তার সমস্ত মনোযোগের কেন্দ্র ছিল, এখন তাকে যেন সম্পূর্ণ অদৃশ্য মনে হচ্ছে। তার সমস্ত মনোযোগ নিবদ্ধ হয়ে আছে শুধু একজনের ওপর…
ভাইপার।
ক্লাবে ঢোকার পর হিয়া আয়মানের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“আমি একটু রেস্টরুম থেকে আসছি।”
আয়মান মাথা নাড়ে বললো “যাও আমি এখানেই আছি।”
হিয়া ধীর পায়ে করিডোর পেরিয়ে রেস্টরুমে ঢুকল।
মার্বেলের দেয়ালজুড়ে বিশাল আয়না। সে ওয়াশবেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে কল খুলতেই হঠাৎ অনুভব করল, তার ঠিক পেছনে আরেকটি উপস্থিতি।
আয়নায় চোখ তুলতেই বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
সেই গেইস্ট।
সে কখন এসে দাঁড়িয়েছে, হিয়া টেরই পায়নি।
লোকটা আয়নার দিকেই তাকিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল,
“অফিসার লিওনকে কি/ডন্যা/প করেছিলে কেন? তাও আবার তার বিয়ের দিন। উদ্দেশ্যটা কী ছিল?”
হিয়া কোনো উত্তর দিল না।
তার নীরবতা ভাঙতে গেইস্ট আরও কয়েক পা এগিয়ে এল। দুজনের মাঝের দূরত্ব মুহূর্তেই কমে গেল।
“যেহেতু কি/ডন্যা*প করেছ… বাঁচিয়ে রেখো না। শেষ করে দাও ওকে।”
তার কণ্ঠে কোনো রাগ ছিল না। বরং ভয়ঙ্কর শান্ত এক শীতলতা।
“ওই অফিসারটা বেঁচে থাকলে একদিন আমাদের মতো আন্ডারওয়ার্ল্ডের কিংদের জন্য বড় ক্ষতির কারণ হবে।”
হিয়া ধীরে মুখ তুলে তার দিকে তাকাল।
চোখদুটো কঠিন।
“আমি কী করব, কী করব না… সেটা কি আপনাকে জিজ্ঞেস করে করতে হবে?”
গেইস্টের ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটল।
পরের মুহূর্তেই সে হাত বাড়িয়ে হিয়ার থুতনি আলতো করে তুলে ধরল।
“তোমার এই আগুনে মেজাজ… এই অহংকার… এটাই আমাকে তোমার প্রতি আকৃষ্ট করেছে।”
সে কয়েক সেকেন্ড হিয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর নিচু স্বরে বলল,
“আর একটা কারণও আছে…”
“তোমাকে দেখতে আমার খুব কাছের একজন মানুষের মতো।”
কথাগুলো কানে যেতেই হিয়ার শরীর হঠাৎ শক্ত হয়ে গেল। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।
হাতের আঙুলগুলো কাঁপছে। বুকের ভেতর অস্বাভাবিক চাপ অনুভব করল সে। এই লোকটার উপস্থিতি… তার স্পর্শ… অকারণে আতঙ্ক তাকে গ্রাস করছে।
গেইস্ট ভ্রু তুলল। “এ কী…?”
সে হিয়ার চোখের দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে বলল,
“তোমার চোখে ভয় দেখছি। তুমি কি আমাকে ভয় পাচ্ছ, ভাইপার?”
হিয়া কোনো উত্তর দিতে পারল না।
গেইস্ট আবার প্রশ্ন করল,
“অফিসার লিওন এখন কোথায়? ওর সঙ্গে কী করেছ?”
ঠিক তখনই করিডোরে আয়মানের কণ্ঠ ভেসে এল।
“ভাইপার? তুমি কোথায়?”
কণ্ঠটা শুনেই গেইস্ট ধীরে ধীরে হাত সরিয়ে নিল।
একবার গভীর দৃষ্টিতে হিয়ার দিকে তাকিয়ে কোনো কথা না বলেই রেস্টরুম থেকে বেরিয়ে গেল।
লোকটা চলে যাওয়ার পরও হিয়া কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার শ্বাস তখনও ভারী। চোখের কোণে অজান্তেই জমে ওঠা একফোঁটা জল গাল বেয়ে ধীরে নিচে গড়িয়ে পড়ল।
হিয়া রেস্টরুম থেকে বেরিয়ে ধীর পায়ে চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিল।
গেইস্ট নেই। আয়মানও নেই।
সম্ভবত কোনো জরুরি কথায় গেইস্টের সঙ্গেই অন্য পাশে চলে গেছে। হিয়ার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।
“পারফেক্ট…” মনে মনে বলল সে।
তার দৃষ্টি গিয়ে থামল লাউঞ্জের এক কোণে।
সেখানে একা বসে আছে সেই তরুণী। কয়েক মিনিট আগেও গেইস্টের কোলে বসে ছিল, আর এখন নিঃশব্দে গ্লাসের বরফ নাড়ছে। মুখের অভিমানটা লুকানোর চেষ্টাও করছে না।
হিয়া আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে হেঁটে গিয়ে তার পাশে বসল।
মেয়েটি অবাক হয়ে তাকাল। কিছু বলার আগেই হিয়া আলতো করে তার হাতটা নিজের মুঠোয় নিল।
চোখে চোখ রেখে মৃদু স্বরে বলল, “তোমার জায়গায় আমি থাকলেও মন খারাপ করতাম, ডার্লিং।”
মেয়েটি কষ্টের হাসি হেসে বলল,
“ও আমাকে কোনোদিনই গুরুত্ব দেয় না। যখন ইচ্ছে কাছে ডাকে, আবার যখন ইচ্ছে দূরে সরিয়ে দেয়।”
হিয়া এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর ব্যাগ থেকে ফোন বের করে একটি ছবি খুলল। নীলাভ আলো ছড়ানো বিরল এক হীরা। সে ফোনটা মেয়েটির সামনে ধরে বলল,
“ব্লু স্টার ডায়মন্ড।”
মেয়েটির চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
“ওহ মাই গড… এটা তো পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্লভ ডায়মন্ডগুলোর একটা!”
হিয়া মৃদু হেসে বলল, “পছন্দ হয়েছে?”
“এটা… এটা কি সত্যিই আমার হতে পারে?”
“হতে পারে।”
হিয়া এবার ব্যাগ থেকে একটি দামী ফাউন্টেন পেন বের করল। দেখতে সাধারণ কলম। কিন্তু সেটার ভেতরে ছিল ক্ষুদ্র একটি হিডেন ক্যামেরা। সঙ্গে আরেকটি ছোট্ট জিপিএস ট্র্যাকার।
দুটো জিনিস মেয়েটির হাতে দিয়ে শান্ত স্বরে বলল,
“ওর গাড়িতে এগুলো রেখে দেবে সুযোগ বুঝে। এমনভাবে, যাতে ও জীবনে কোনোদিনও বুঝতে না পারে।”
মেয়েটি কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ থেকে জিজ্ঞেস করলো “তারপর?”
“তারপর ব্লু স্টার ডায়মন্ড তোমার।”
মেয়েটির চোখে একসঙ্গে লোভ আর প্রতিশোধের আভা দেখা দিল।
আজকের অপমানটা সে এখনও ভুলতে পারেনি।
যে মানুষটার জন্য এতক্ষণ অপেক্ষা করছিল, সেই মানুষটাই মুহূর্তের মধ্যে তাকে নিজের কোল থেকে সরিয়ে দিয়েছে।
হিয়া তার সেই দুর্বল জায়গাতেই আঘাত করল।
মেয়েটি হঠাৎ হেসে বলল, “তুমি যদি মেয়ে না হতে… বিশ্বাস করো, আমি এখনই তোমাকে প্রপোজ করতাম।”
হিয়া হালকা হেসে মেয়েটার চুলগুলো কানের পেছনে সরিয়ে দিল। তারপর খুব কাছে ঝুঁকে কানের পাশে ফিসফিস করে বলল,
“ভুলের কোনো সুযোগ নেই, ডার্লিং। কাজটা নিখুঁতভাবে করবে।”
সে নিজের ব্যক্তিগত নম্বর লেখা একটি ছোট কার্ড মেয়েটির হাতে গুঁজে দিল।
“কাজ শেষ হলেই আমাকে ফোন করবে।”
“ডিল।” বলেই মেয়েটি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মাথা নাড়ল।
হিয়া ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
দুই কদম এগিয়ে আবার একবার ফিরে তাকাল।
ঠোঁটের কোণে পরিচিত দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে আঙুলের ডগা থেকে একটি ফ্লাইং কিস ছুড়ে দিল।
মেয়েটিও হেসে সেটার জবাব দিল।হিয়া আর একবারও পেছনে তাকাল না। তার পরিকল্পনার আরেকটি চাল নিঃশব্দে বোর্ডে বসে গেছে।
হিয়া দৃষ্টির আড়ালে মিলিয়ে যেতেই মেয়েটা কিছুক্ষণ তার চলে যাওয়ার পথের দিকেই তাকিয়ে রইল।
তারপর নিজের অজান্তেই ঠোঁটের কোণে একটুখানি হাসি ফুটে উঠল। হাতের মুঠোয় ধরা কার্ডটার দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে করে বিড়বিড় করে বলল,
“আই উইশ… ওই মেয়েটা যদি ছেলে হতো…”
কথাটা বলেই সে নিজেই মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
“হয়তো সত্যিই প্রেমে পড়ে যেতাম।”
আয়মান ফিরে এসে চারপাশে তাকিয়েই ভ্রু কুঁচকে ফেলল। “ভাইপার?”
কোথাও তার দেখা নেই।ঠিক তখনই ফোনে একটি মেসেজ ভেসে উঠল।
«Emergency work. বের হতে হয়েছে। কাল দেখা হবে.»
আয়মান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে জানত, ভাইপার যখন বলে জরুরি কাজ, তখন প্রশ্ন করে কোনো লাভ নেই।
এদিকে গেইস্ট ধীর পায়ে লাউঞ্জে ফিরে এল।
তাকে দেখেই তরুণীটি উঠে দাঁড়াল। যেন কিছুই ঘটেনি, এমন স্বাভাবিক ভঙ্গিতে এগিয়ে গিয়ে তার হাত জড়িয়ে ধরল। গেইস্টের মেজাজ তখনও খারাপ।
কিছুক্ষণ আগেই ভাইপারকে সামনে পেয়েও নিজের উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারেনি। সেই অপূর্ণ বিরক্তি তার চোখেমুখে স্পষ্ট। কোনো কথা না বলে সে তরুণীটিকে নিয়ে পার্কিংয়ের দিকে হাঁটতে লাগল। গাড়ির দরজা খুলতেই তরুণীটি সুযোগটা কাজে লাগাল।
গেইস্ট সামনের সিটে বসে ফোনে ব্যস্ত হয়ে পড়তেই সে নিঃশব্দে হিয়ার দেওয়া ক্ষুদ্র ট্র্যাকারটি সিটের নিচে আটকে দিল। তারপর কলমের ছদ্মবেশে থাকা হিডেন ক্যামেরাটিও এমন জায়গায় রেখে দিল, যেখানে সহজে কারও চোখে পড়বে না।
সবকিছু এত দ্রুত আর স্বাভাবিকভাবে করল যে গেইস্ট কিছুই টের পেল না।
গাড়ি ধীরে ধীরে ক্লাব ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
কয়েক মিনিট পর গেইস্ট রাস্তার এক নির্জন পাশে গাড়ি থামাল।তার মুখের কঠোর ভাব দেখে তরুণীর বুক ধক করে উঠল।সে বুঝতে পারল, লোকটার মেজাজ এখনও স্বাভাবিক হয়নি।
তরুণীটি নিঃশব্দে বসে রইল। কিন্তু তার মনে তখন একটাই চিন্তা—কাজটা সফল হয়েছে। সুযোগ পেলেই ভাইপারকে খবর দিতে হবে।
গাড়িটি অন্ধকার রাস্তায় থামতেই গেইস্টের ভেতরের জমে থাকা ক্ষোভ বিস্ফোরণের রূপ নিল। কোনো পূর্বাবাস না দিয়ে সে হঠাৎ ওই তরুণীর ওপর হিংস্র পশুর মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল। মনে হলো কোনো লোভী শিকারি অনেক দিন পর তার ভাগের রক্তমাংস সামনে পেয়েছে। মেয়েটির আতঙ্কের আর্তনাদকে পাত্তাই না দিয়ে সে তার সারা শরীরে চরম আক্রোশে কামড় বসাতে লাগল—খুবলে খুবলে তার চামড়া ছিঁড়ে নিতে চাইলো। বিকৃ/ত হিং*স্রতার সেই ভ*য়ঙ্কর খেলায় রাতের নিস্তব্ধতা কেঁপে উঠল, আর অসহায় তরুণীটি তখন তার নিষ্ঠুর কব্জায় কেবলই এক টুকরো কাঁচা মাং/স।
গভীর রাত।
লন্ডনের রাস্তা তখন প্রায় ফাঁকা। দূরের ল্যাম্পপোস্টের আলো ভেজা অ্যাসফল্টে লম্বা ছায়া ফেলেছে।
হিয়া একা হাঁটছে। হাত দুটো জ্যাকেটের পকেটে গুঁজে রাখা, মাথা সামান্য নিচু। তার পদক্ষেপ ধীর, কিন্তু মাথার ভেতর চিন্তাগুলো থামার নাম নেই।
আয়মান…আর তার বাবা…
ওদের বিরুদ্ধে যে প্রতিশোধের আগুন সে এত বছর ধরে বুকে পুষে রেখেছে, সেটা একদিন না একদিন সে নেবেই।সেটা নিয়ে তার কোনো সন্দেহ নেই।
কিন্তু…আজকের সেই মানুষটা?
গেইস্ট।
হিয়ার হাঁটা ধীরে ধীরে থেমে গেল।তার বুকের ভেতর আবারও অস্বস্তি শুরু হলো। লোকটার মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠতেই শ্বাস ভারী হয়ে এল।
আজ রেস্টরুমে যখন সে তার থুতনি ছুঁয়েছিল…
ঠিক তখনই কেন শরীর কেঁপে উঠেছিল?
কেন মনে হচ্ছিল, সে আবার ফিরে গেছে জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর সেই মুহূর্তে…যে স্মৃতি থেকে পালাতে চাইলেও কোনোদিন পালাতে পারেনি।
হিয়া চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করল।
কিন্তু লাভ হলো না।বুকের ধুকপুকানি আরও বেড়ে গেল।আঙুলগুলো কাঁপছে। সে নিজের দুই হাত শক্ত করে মুঠো বানিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
“না… দুর্বল হলে চলবে না।”
“আয়মানকে হারাতে পারব… তার বাবাকেও শেষ করতে পারব…”
কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে খুব আস্তে বলল,
“কিন্তু… গেইস্ট?”
তার চোখে প্রথমবারের মতো একফোঁটা অনিশ্চয়তা ফুটে উঠল। “ওকে আমি হারাব কীভাবে?”
লোকটার সামনে দাঁড়ালেই তার ভেতরের সব সাহস যেন কোথায় মিলিয়ে যায়। মাথার ভেতর সেই পুরোনো দুঃস্বপ্ন ফিরে আসে। শরীর অবশ হয়ে যায়।
এভাবে চলতে থাকলে একদিন গেইস্টই তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হয়ে দাঁড়াবে।হিয়া ধীরে ধীরে আকাশের দিকে তাকাল। চোখে আবার সেই চেনা কঠোরতা ফিরে এল।
“না…”
“যে ভয় আমাকে এত বছর ধরে তাড়া করে বেড়াচ্ছে…”
“সেই ভয়কেই এবার শেষ করতে হবে।”
কারণ সে জানে—নিজের সবচেয়ে বড় ভয়কে হারাতে না পারলে, সবচেয়ে বড় শত্রুকেও কোনোদিন হারানো যায় না।
পরদিন সকাল।
সূর্যের আলো জানালার ফাঁক গলে মুখে পড়তেই লিওনের ধীরে ধীরে জ্ঞান ফিরল। সে চোখ মেলে চারপাশে তাকাল। একটি হোটেল রুম।
কয়েক সেকেন্ড কিছুই বুঝতে পারল না। তারপর আগের দিনের ঘটনাগুলো একে একে মনে পড়তেই কপালে হাত বুলিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“ওই পাগল মেয়েটা…”
বিছানা থেকে নেমে চারপাশে আরেকবার দেখে নিল।
হিয়া তাকে সত্যিই ছেড়ে দিয়েছে। আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করল না লিওন। দ্রুত হোটেল ছেড়ে সোজা বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিল। বাড়ির দরজায় কলিংবেল বাজতেই ভেতর থেকে ছুটে এল সবাই।
দরজা খুলেই লিওনকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার মা হতভম্ব।পরের মুহূর্তেই ছেলেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন।
“আলহামদুলিল্লাহ… বাবা তুই ফিরে এসেছিস!” চোখ ভিজে উঠল তার।
লিওনের বাবা এগিয়ে এসে ছেলের কাঁধে হাত রাখলেন। মুখে কোনো কথা নেই, কিন্তু চোখের স্বস্তিটুকুই সব বলে দিচ্ছে।
তার বড় বোন অ্যামেলিয়াও ছুটে এসে ভাইকে জড়িয়ে ধরল।
কয়েক মুহূর্তের জন্য পুরো বাড়িটা আবার প্রাণ ফিরে পেল। সবার খোঁজখবরের মাঝেই লিওনের মা হঠাৎ বললেন,
“মায়ার কাছে একবার যা, বাবা।”
“তুই চলে যাওয়ার পর থেকে মেয়েটা ঠিকমতো কিছুই খায়নি। ওষুধ পর্যন্ত খেতে চাইছে না। সারারাত শুধু কেঁদেছে।”
কথাগুলো শুনে লিওনের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।
সে আর দেরি না করে সোজা মায়ার ঘরের দিকে হাঁটল। দরজা আলতো করে খুলতেই দেখল, জানালার পাশে বিছানায় চুপচাপ বসে আছে মায়া।
এলোমেলো চুল, ফ্যাকাশে মুখ, চোখ দুটো কান্নায় ফুলে আছে। দেখেই বোঝা যায়, অনেকক্ষণ ধরে কিছু খায়নি।
দরজা খোলার শব্দে মায়া মুখ তুলল।
লিওনকে দেখামাত্রই তার চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়ল।
“লিও ভাইয়া…”
পরের মুহূর্তেই লিওন পাশে বসতেই মায়া তাকে জড়িয়ে ধরল। লিওন আলতো করে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
নরম গলায় বলল, “মায়া… তুই নাকি ওষুধও খাসনি?”
“এভাবে চললে সুস্থ হবি কী করে?”
মায়া কোনো উত্তর দিল না। শুধু আরও শক্ত করে লিওনকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল।
লিওন মৃদু হেসে বলল,
“It’s okay…”
“আমি তো ফিরে এসেছি, তাই না?”
মায়া ধীরে ধীরে মুখ তুলে তার দিকে তাকাল।
চোখভরা উদ্বেগ নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ওই ভাইপার… তোমার কোনো ক্ষতি করেনি তো?”
লিওন কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল কাঁচের বক্স, সাদা গোলাপ, দাবার বোর্ড আর সেই অদ্ভুত চব্বিশ ঘণ্টা।
মুহূর্তের মধ্যেই সব স্মৃতি সরিয়ে রেখে সে শান্ত গলায় বলল, “না… আমার কোনো ক্ষতি করেনি।”
লিওনের ফিরে আসার খবর প্রকাশ হতেই পুরো এলাকা সরগরম হয়ে উঠল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই বাড়ির সামনে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের গাড়ি, ক্যামেরা আর সাংবাদিকদের ভিড় জমে গেল।
লিওন বাইরে বের হতেই একের পর এক মাইক্রোফোন তার সামনে এগিয়ে এল।
“অফিসার লিওন! ভাইপার আপনাকে কেন অপহরণ করেছিল?”
“সে আপনার সঙ্গে কী করেছে?”
“আপনি কি তার আস্তানা দেখেছেন?”
“ভাইপার সম্পর্কে নতুন কোনো তথ্য পেয়েছেন?”
চারদিক থেকে প্রশ্ন ছুটে আসছে।
লিওন শান্তভাবেই সবার দিকে তাকিয়ে বলল,
“তদন্তের স্বার্থে এই মুহূর্তে বিস্তারিত কিছু বলা সম্ভব নয়।”
সে সংক্ষেপে যোগ করল,
“ভাইপারের কিছু তথ্য আমার কাছে ছিল। সেই কারণেই সে আমাকে নিয়ে গিয়েছিল। এর বেশি এখন কিছু বলতে চাই না।”
একজন সাংবাদিক আবার জিজ্ঞেস করল,
“তাহলে সে আপনার কোনো ক্ষতি করেনি?”
লিওন ছোট করে উত্তর দিল,
“না।”
এরপর আর কোনো প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে সে বাড়ির ভেতরে ফিরে যেতে উদ্যত হলো। ঠিক তখনই বাইরে কয়েকটি কালো সিআইডি গাড়ি এসে থামল।
গাড়ি থেকে এসিপি এবং বাকি সিআইডি অফিসার দ্রুত নেমে এলেন।
এসিপি এগিয়ে এসে বললেন,
“অফিসার লিওন, তোমাকে এখনই আমাদের সঙ্গে সদর দপ্তরে যেতে হবে।”
লিওন অবাক হয়ে বলল, “এখনই?”
এসিপি মাথা নাড়লেন।
তুমি নিরাপদে ফিরে এসেছে, এটা আমাদের জন্য স্বস্তির খবর। কিন্তু তুমি ক্রিমিনাল ভাইপারের কাছ থেকে ফিরেছো। তোমার কাছ থেকে প্রতিটি তথ্য আমাদের জানতে হবে।”
তিনি সাংবাদিকদের ভিড়ের দিকে একবার তাকিয়ে আবার বললেন, “আর তুমি এখন এখানে থাকলে মিডিয়া তোমাকে কাজ করতে দেবে না।”
লিওন বিষয়টা বুঝতে পারল। একজন অফিসার সামনে এগিয়ে এসে সাংবাদিকদের উদ্দেশে বললেন,
“দুঃখিত, তদন্তের স্বার্থে অফিসার লিওনকে এখনই নিয়ে যেতে হবে। পরে আনুষ্ঠানিক ব্রিফিং দেওয়া হবে।”
এরপর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে লিওনকে গাড়িতে উঠিয়ে নেওয়া হলো। সাংবাদিকদের অসংখ্য প্রশ্ন আর ক্যামেরার ফ্ল্যাশ পেছনে ফেলেই সিআইডির গাড়িগুলো সদর দপ্তরের উদ্দেশে রওনা দিল।
সিআইডি সদর দপ্তরে পৌঁছেই লিওন এক মুহূর্তও নষ্ট করল না। গাড়ি থেকে নেমেই সে সরাসরি ইনভেস্টিগেশন ফ্লোরে চলে গেল।
এসিপি আগে থেকেই নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলেন। তাই ফরেনসিক আর্ট ইউনিটের একজন দক্ষ স্কেচ আর্টিস্ট সেখানে প্রস্তুত ছিল।
আর্টিস্ট ট্যাবলেট আর স্কেচপ্যাড সামনে রেখে বললেন,
“অফিসার, আপনি যতটুকু মনে করতে পারেন, ধীরে ধীরে বলুন।”
লিওন কয়েক সেকেন্ড চোখ বন্ধ করে হিয়ার মুখটা মনে করার চেষ্টা করল।
তারপর বলতে শুরু করল—”চোখ… একেবারে কালো নয় অনেকটা হালকা বাদামী রঙের। দৃষ্টি খুব তীক্ষ্ণ।”
আর্টিস্ট দ্রুত আঁকতে লাগলেন।
“মুখের গঠন একটু শার্প… নাক সোজা… ঠোঁট পাতলা নয়, আবার খুব ভারীও নয়…”
প্রতিটি নির্দেশনার সঙ্গে সঙ্গে স্কেচে পরিবর্তন আসতে লাগল। মাঝে মাঝে লিওন থামিয়ে বলছিল,
“না… চোখটা আরও ধারালো হবে।”
“চোয়ালটা একটু সরু করুন।”
“হ্যাঁ… এবার অনেকটা মিলছে।”
প্রায় এক ঘণ্টা পর স্কেচটা সম্পূর্ণ হলো।
ছবিটা দেখে লিওন ধীরে মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ..এবার হুবহু হয়েছে।”
এসিপি সঙ্গে সঙ্গে নির্দেশ দিলেন,
“এই স্কেচটা সব ইউনিটে পাঠিয়ে দিন। ইন্টারপোল ডাটাবেসেও পাঠানো হবে।”
কিন্তু কাজ তখনও শেষ হয়নি।
আর্টিস্ট আরেকটি খাতা সামনে টেনে নিয়ে বললেন,
“এবার লোকেশনটা বলুন।”
লিওন চোখ বন্ধ করে সেই রাতটার প্রতিটি মুহূর্ত মনে করার চেষ্টা করল। যখন সে পালিয়ে টানেল থেকে বের হয়েছিলো, তখন অল্প সময়ের জন্য বাইরের পরিবেশ দেখার সুযোগ হয়েছিল।
সে ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল—
“মাটির নিচে বড় একটা টানেল… প্রবেশপথটা বাইরে থেকে বোঝা যায় না।”
“ভেতরে নামার সিঁড়ি ছিল…”
“একটা বিশাল হলরুম…”
আর্টিস্ট প্রতিটি তথ্য নিখুঁতভাবে স্কেচে ফুটিয়ে তুলতে লাগলেন। যেখানে যতটুকু মনে আছে, লিওন সবকিছুই জানাল।
স্কেচ শেষ হলে পুরো টিম ছবিটার দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল। এখন তাদের হাতে প্রথমবারের মতো ভাইপারের মুখের একটি সম্ভাব্য প্রতিকৃতি এবং তার গোপন আস্তানার একটি প্রাথমিক নকশা এসেছে।
তদন্তের জন্য—এটাই ছিল সবচেয়ে মূল্যবান সূত্র।
হিয়ার স্কেচ আর টানেলের সম্ভাব্য নকশা তৈরি শেষ হতেই কনফারেন্স রুমে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা নেমে এল। লিওন হঠাৎ মাথা তুলে এসিপির দিকে তাকাল।
গম্ভীর গলায় বলল, “স্যার… আমি ভাইপারের আসল পরিচয়টাও জানি।”
রুমে উপস্থিত সবাই একসঙ্গে তার দিকে তাকাল।
এসিপি ধীরে বললেন, “কে সে?”
লিওন এক নিঃশ্বাসে উত্তর দিল,
“ভাইপারের আসল নাম… নূজহাত হিয়া।”
সে একটু থেমে আবার বলল, “বাংলাদেশে আমরা একই ভার্সিটি পড়তাম। সে আমার জুনিয়র ছিল।”
কথাটা শেষ হতেই এসিপির মুখের রং বদলে গেল।
তিনি কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে লিওনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর অবিশ্বাসে বললেন,
“তুমি… কী বলছ, লিওন?”
লিওন ভ্রু কুঁচকে বলল, “কেন, স্যার?”
এসিপি ধীরে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন।
“তুমি যে বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বললে… আর যে মেয়েটার নাম বললে…”
তিনি থেমে গভীর শ্বাস নিলেন। “…সাত বছর আগে সেই মেয়ে এবং তার পুরো পরিবার মারা গেছে।”
“What?” লিওনের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
“অসম্ভব…”
এসিপি কোনো উত্তর না দিয়ে কম্পিউটারের সামনে গিয়ে পুরোনো ডিজিটাল আর্কাইভ খুললেন।
কয়েক মুহূর্ত পর সাত বছর আগের একটি সংবাদপত্রের প্রতিবেদন স্ক্রিনে ভেসে উঠল।
তিনি সেটি লিওনের সামনে এগিয়ে দিলেন।
কাঁপা হাতে লিওন খবরটা পড়তে শুরু করল।
শিরোনামটা পড়েই তার বুক ধক করে উঠল।
“সিআইডি অফিসার ইশতিয়াক খানের পরিবারের একসাথে সকলের মৃ/ত্যু।”
নিচে একে একে পরিবারের সদস্যদের ছবি।
সেখানে স্পষ্ট লেখা সবার নাম। ইশতিয়াক খান এবং তার স্ত্রী ফারহানা খান এবং বড় মেয়ে —নূজহাত হিয়া আর ছোট ছেলে অয়ন।
লিওন দ্রুত আরও কয়েকটি প্রতিবেদন খুলে দেখল।
সব জায়গায় একই তথ্য।
একই নাম।
একই ঘটনা।
সে ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।
“না… এটা হতে পারে না…”
এসিপি নিচু স্বরে বললেন,
“শুধু সংবাদ নয়… সরকারি রেকর্ডেও তাদের সবাইকে মৃ/ত ঘোষণা করা হয়েছে।”
“তাদের দাফনও সম্পন্ন হয়েছিল।”
লিওনের কণ্ঠ কেঁপে উঠল। “তাহলে… আমি কাকে দেখলাম?”
রুমে আবার নীরবতা নেমে এল। কিছুক্ষণ পর এসিপি বললেন,
“হিয়ার বাবা ছিলেন একজন বাংলাদেশের সিআইডি অফিসার।”
“তদন্তে অভিযোগ উঠেছিল, তিনি আন্ডারওয়ার্ল্ডের একটি চক্রের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন।”
“এর কিছুদিন পরই পুরো পরিবারের মৃ/ত্যুর খবর আসে।”
লিওন কিছুক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে মাথা তুলে এসিপির দিকে তাকাল।
দৃঢ় কণ্ঠে বলল, “স্যার… আমি সাত বছর আগের কেসটা আবার তদন্ত করতে চাই।”
রুমে উপস্থিত অফিসাররা একে অপরের মুখের দিকে তাকাল। এসিপি ভ্রু কুঁচকে বললেন,
“লিওন, ওই কেস অনেক আগেই ক্লোজ হয়েছে। আর একটা বিষয় ভুলে যেও না—ওটা ছিল বাংলাদেশের একটি ডমেস্টিক কেস। আমাদের আন্তর্জাতিক টাস্ক ফোর্সের এখতিয়ারের বাইরে।”
তিনি টেবিলের ওপর রাখা হিয়ার স্কেচটার দিকে তাকালেন।
“আমাদের বর্তমান মিশন একটাই—ইউরোপ ও এশিয়া জুড়ে সক্রিয় গ্লোবাল সিন্ডিকেটটাকে ভেঙে ফেলা এবং ভাইপারকে গ্রেপ্তার করা। এখন সাত বছর আগের একটা বন্ধ ফাইল নিয়ে পড়ে থাকলে হবে?”
লিওন এক পা সামনে এগিয়ে এল। তার চোখে তখন অটল দৃঢ়তা।
“স্যার… আমার বিশ্বাস, এই দুইটা কেস আলাদা নয়।”
রুমে নীরবতা নেমে এল। লিওন ধীরে ধীরে বলল,
“সাত বছর আগে বাংলাদেশের যে কেসটা চাপা পড়ে গিয়েছিল, সেটা হয়তো তখন একটি দেশের ভেতরের তদন্ত ছিল। কিন্তু আজ পরিস্থিতি বদলে গেছে।”
সে হিয়ার স্কেচটা হাতে তুলে নিল।
“আজ যে মেয়েটাকে আমরা ‘ভাইপার’ নামে খুঁজছি, সে ইউরোপের আন্ডারওয়ার্ল্ডের অন্যতম প্রভাবশালী নাম।”
“আর যদি ভাইপার সত্যিই নূজহাত হিয়া হয়… তাহলে সাত বছর আগের সেই কেস আর শুধু বাংলাদেশের কেস নয়।”
লিওন এবার এসিপির চোখে চোখ রেখে বলল,
“একটা বন্ধ ফাইলের শেষ অধ্যায় আজ আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রের কেন্দ্রে এসে দাঁড়িয়েছে, স্যার।”
“আমার বিশ্বাস, ওই পুরোনো কেসের ভেতরেই এমন কিছু আছে, যেটা এই পুরো গ্লোবাল সিন্ডিকেটের জন্মের কারণ ব্যাখ্যা করবে।”
সে কয়েক সেকেন্ড থেমে আবার বলল,
“আমরা আজ ভাইপারকে খুঁজছি ইউরোপে। কিন্তু হয়তো তার গল্পের শুরুটা হয়েছিল বাংলাদেশে।”
“যদি শুরুটা না জানি, তাহলে শেষটাও কোনোদিন জানতে পারব না।”
পুরো রুম নিস্তব্ধ। এসিপি দীর্ঘক্ষণ লিওনের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর ধীরে ধীরে বললেন,
“…তুমি বলতে চাইছ, সাত বছর আগে যে ফাইলটা ঢাকায় বন্ধ হয়েছিল, আজ সেই ফাইলই আমাদের আন্তর্জাতিক অপারেশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হতে পারে?”
লিওন দৃঢ় গলায় উত্তর দিল,
“জি, স্যার।”
“ভাইপারকে ধরতে হলে, আমাকে আগে নূজহাত হিয়াকে বুঝতে হবে। আর নূজহাত হিয়াকে বুঝতে হলে, সাত বছর আগের সেই কেসটা আবার খুলতেই হবে।”
এসিপি চুপ করে শুনতে লাগলেন।
লিওন বলল, “আমি নিজের চোখে দেখেছি। ভাইপারই নূজহাত হিয়া।”
“আর যদি সরকারি রেকর্ড অনুযায়ী নূজহাত হিয়া সাত বছর আগেই মারা যায়…”
সে কয়েক সেকেন্ড থামল। “…তাহলে সত্যিটা লুকিয়ে আছে ওই পুরোনো কেসের ভেতরেই।”
সে টেবিলের ওপর রাখা পুরোনো ফাইলটার দিকে তাকিয়ে আবার বলল,
“ভাইপারকে ধরতে হলে আমাকে জানতে হবে—সাত বছর আগে আসলে কী ঘটেছিল।”
“কীভাবে একটা মৃ/ত মেয়ে আজ বিশ্বের সবচেয়ে ওয়ান্টেড ক্রিমিনাল হয়ে ফিরে এল।”
“এই প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত আমরা ভাইপারকে বুঝতেই পারব না, স্যার।”
পুরো রুম নিস্তব্ধ। এসিপি কিছুক্ষণ লিওনের চোখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে চেয়ারে হেলান দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
লিওন একটুও দ্বিধা না করে পুনরায় বললো ,
“আর সেই কারণেই আমি ওই কেসটা আবার ওপেন করতে চাই।”
এসিপি কিছুক্ষণ চিন্তা করলেন।
তারপর টেবিলে আঙুল ঠুকে ধীরে বললেন,
“ঠিক আছে… আমি তোমাকে অনুমতি দেওয়ার চেষ্টা করব।”
“কিন্তু মনে রেখো, যদি এই কেস আবার খুলি, তাহলে সাত বছর আগের অনেক গোপন সত্য বেরিয়ে আসতে পারে… যেগুলো অনেকেই আজও চাপা পড়ে থাকুক চায়।”
লিওন শান্ত গলায় বলল, “সত্য যত পুরোনোই হোক, একদিন না একদিন তার সামনে আসা উচিত, স্যার।”
লিওন পুরোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের রেকর্ডগুলো একের পর এক উল্টে দেখছিল। তার দরকার সেই সময়ের কয়েকজন অধ্যাপকের বর্তমান ঠিকানা। সাত বছর আগের ঘটনাগুলো জানতে হলে তাদের সঙ্গে কথা বলতেই হবে।
ঠিক তখনই পাশ থেকে অফিসার রওশন ফাইলের ওপর চোখ বুলিয়ে হালকা অবাক হয়ে বলল,
“স্যার… আপনার পুরো নাম লিওনার্দো জায়েদ হায়াস?”
লিওন চোখ না তুলেই বলল,
“হ্যাঁ।”
রওশন একটু ইতস্তত করে আবার বলল,
“তাহলে… আপনি মুসলিম?”
এবার লিওন মুখ তুলে তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
“কেন? তুমি কী ভেবেছিলে?”
রওশন অপ্রস্তুত হয়ে মাথা চুলকালো।
“সত্যি বলতে… নাম শুনে আমি ভেবেছিলাম আপনি হয়তো খ্রিস্টান।”
লিওন চেয়ারে হেলান দিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“ভাবাটাই স্বাভাবিক।”
“আমার বাবা, আর্থার হায়াস, জন্মসূত্রে ব্রিটিশ এবং খ্রিস্টান ছিলেন।”
সে কিছুক্ষণ থেমে আবার বলল,
“বাংলাদেশে গিয়ে আমার মায়ের সঙ্গে পরিচয় হয়। তারপর ইসলাম সম্পর্কে জানতে শুরু করেন।”
“অনেক ভেবেচিন্তে তিনি নিজের ইচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেন। এরপরই আমার মাকে বিয়ে করেন।”
রওশন মনোযোগ দিয়ে শুনছিল।
লিওন আরো বলল,
“কিন্তু বিষয়টা আমার দাদার পরিবার মেনে নেয়নি।”
“ধর্ম পরিবর্তন আর এই বিয়ের কারণে বাবা পরিবার থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যান।”
“তাই বাবা-মা বাংলাদেশেই নতুন জীবন শুরু করেন।”
তার ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটল।
“আমি আর আমার বোনের জন্মও সেখানেই।”
“পরে কাজের সূত্রে আমরা আবার লন্ডনে চলে আসি।”
রওশন মাথা নেড়ে বলল, “এখন বুঝলাম, স্যার।”
“তাহলে নামগুলো ব্রিটিশ ধাঁচের রাখার কারণও সেটাই?”
লিওন মৃদু হেসে উত্তর দিল,
“হ্যাঁ। বাবা নিজের শিকড় কখনো অস্বীকার করেননি, আবার নিজের নতুন বিশ্বাস থেকেও সরে যাননি।”
“তাই আমাদের নামে দুই পরিচয়ই রেখেছেন।”
রওশন সম্মানের দৃষ্টিতে লিওনের দিকে তাকাল।
“দারুণ একটা গল্প, স্যার।”
লিওন আবার ফাইলের দিকে চোখ নামিয়ে শান্ত স্বরে বলল, “এখন গল্প নয়, রওশন… সাত বছর আগের সত্যিটা খুঁজে বের করাই আমাদের কাজ।”
সারাদিনের টানা কাজ শেষে রাতের দিকে লিওন বাড়ি ফিরল। ঘরে ঢুকেই ক্লান্ত শরীরটা সোফায় ছুড়ে দিল। কয়েক মিনিট চোখ বন্ধ করে বসে থেকে ধীরে ধীরে উঠে আলমারির সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
আলমারি খুলতেই চোখে পড়ল আগের সব অ্যাসাইনমেন্টের ফাইল, পুরস্কারের মেডেল আর সফল অভিযানের স্মারকগুলো।
একটার পর একটা ফাইল হাতে নিতে নিতে হঠাৎই তার চোখের সামনে ভেসে উঠল গত চব্বিশ ঘণ্টার প্রতিটি মুহূর্ত। কাঁচের বক্সে আটকে রেখে প্রোপজ তারপর সেই সাদা গোলাপ…একসাথে খাবার খাওয়া, দাবার বোর্ড…
আর সেই নির্লজ্জ মেয়েটা।
লিওন বিরক্ত হয়ে ফাইলটা আবার জায়গামতো রেখে দিল। নিজের চুলে হাত চালিয়ে নিচু স্বরে বিড়বিড় করল,
“কী আজব একটা মেয়ে…”
তার কাজ একটাই।
ভাইপারকে আইনের হাতে তুলে দেওয়া।
দানিয়েলকেও তার মাধ্যমেই ধরতে হবে।
এটাই একজন সিআইডি অফিসার হিসেবে তার দায়িত্ব। কিন্তু…
দায়িত্বের বাইরে বুকের ভেতর অদ্ভুত আরেকটা যুদ্ধ শুরু হয়েছে। যতবারই সে মন থেকে হিয়াকে সরিয়ে দিতে চায়, ততবারই মেয়েটার তীক্ষ্ণ চাহনি, বেপরোয়া কথাবার্তা আর আত্মবিশ্বাসী হাসিটা অবচেতন মনে ফিরে আসে।লিওন বিরক্তিতে কপাল চেপে ধরল।
“অসম্ভব…”
“একটা ক্রিমিনাল আমার মাথার ভেতর এত জায়গা নিয়ে বসে থাকবে কেন?”
সে গভীর শ্বাস ফেলল। তারপর নিজের মনকেই ধমক দিয়ে বলল,
“ও এসব ইচ্ছে করেই করেছে।”
“আমার মনোযোগ নষ্ট করার জন্য… আমাকে মানসিকভাবে দুর্বল করার জন্য।”
“ও একজন ভয়ংকর ম্যানিপুলেটর।”
কথাটা বললেও বুকের ভেতরের অস্থিরতা একটুও কমল না। বরং মনে হচ্ছিল, যত দ্রুত সে ভাইপারকে গ্রেপ্তার করবে… তত দ্রুত এই অদ্ভুত অস্থিরতারও শেষ হবে।
আলমারির পাশে রাখা টেবিলের ওপর স্কেচটা পড়ে ছিল। সিআইডির ফরেনসিক আর্টিস্টের আঁকা—হিয়ার মুখ।লিওন ধীরে ধীরে স্কেচটা হাতে তুলে নিল।
তার দৃষ্টি গিয়ে থামল ছবিটার চোখে। হালকা বাদামী সেই চোখ…
তীক্ষ্ণ, স্থির, অথচ অদ্ভুতভাবে জীবন্ত।
আজ সিআইডি অফিসেও সবাই অবাক হয়ে গিয়েছিল। একজন আর্টিস্টকে এত নিখুঁতভাবে কারও মুখের প্রতিটি খুঁটিনাটি বোঝানো সহজ নয়।
কিন্তু লিওন একবারও দ্বিধা করেনি।
চোখের রঙ…
ভ্রুর বাঁক…
ঠোঁটের রেখা…
চোয়ালের গঠন…
এমনকি চোখের দৃষ্টিটা পর্যন্ত সে এত স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছিল যে, রুমে উপস্থিত কয়েকজন অফিসার বিস্ময়ে একে অপরের দিকে তাকিয়েছিল।
লিওন এখনও সেই স্কেচটার দিকেই তাকিয়ে আছে।
তার আঙুল অজান্তেই ছবিটার কিনারা স্পর্শ করল।
কয়েক সেকেন্ড পর নিজেরই আচরণে সে বিরক্ত হয়ে গেল স্কেচটা টেবিলের ওপর রেখে ধীরে ধীরে বলল,
“তুমি আসলে কে…?”
“নূজহাত হিয়া?”
“…নাকি ভাইপার?”
প্রশ্নটা যেন ছবির উদ্দেশে নয়, নিজের মনকেই করা।
কারণ যতই সে হিয়াকে একজন অপরাধী হিসেবে ভাবতে চায়, ততই মেয়েটাকে ঘিরে রহস্যগুলো আরও জটিল হয়ে উঠছে।
স্কেচটার দিকে শেষবারের মতো তাকিয়ে লিওন দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আজ প্রথমবার তার মনে হলো—
সে শুধু একজন ক্রিমিনালকে নয়, এমন একজন মানুষকে খুঁজছে, যার অতীতের প্রতিটি পাতাই অন্ধকারে ঢাকা।
রাত অনেক হয়ে গেছে।
সারাদিনের ধকল ও ক্লান্তি শেষে অবশেষে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হলো লিওন।
কিন্তু সে ঘুম কোনো স্বস্তির ছিল না। অবচেতন মন তাকে টেনে নিয়ে গেল অতীতে সেই কাঁচের বক্সের নিস্তব্ধ সময়টাতে। চারপাশের গাঢ় নীরবতা ভেদ করে নাকে এসে লাগল চেনা সেই সাদা গোলাপের সুবাস। আধোঘুম আর আধোজাগরণের অদ্ভুত আচ্ছন্নতায় শরীর পক্ষাঘাতগ্রস্তের মতো অবশ, কেবল অনুভূতিগুলো জীবন্ত। সে বুঝতে পারল, কেউ একজন নিঃশব্দ পায়ে তার শিয়রে এসে দাঁড়িয়েছে।
চেনা সেই সুবাস। চেনা সেই উপস্থিতি।
হিয়া।
স্বপ্নের ভেতর হিয়া ধীরে ঝুঁকে এল। তার সেই স্থির দৃষ্টি, ঠোঁটের কোণে লেপ্টে থাকা সেই বিপজ্জনক দুষ্টু হাসি। লিওনের মুখের ঠিক ওপরে ঝুঁকে সে অত্যন্ত নিচু, উষ্ণ স্বরে ফিসফিস করে উঠল,
“দিলবার… এবার তো পালাতে পারবে না।”
পরের মুহূর্তেই হিয়া তার সমস্ত দূরত্ব মুছে দিয়ে নিজের ঠোঁট রাখল লিওনের ঠোঁটে। সেই স্পর্শ সাধারণ কোনো ছোঁয়া ছিল না; তা ছিল ক্ষুধার্ত, তীব্র আর ঘোরলাগা অধিকারবোধ। ঠোঁটের সাথে ঠোঁট মিলিয়ে হিয়া লিওনের ভেতরের সমস্ত প্রতিরোধ চূর্ণ করে দিল। দীর্ঘ ও গভীর সেই চুম্বনের উত্তাপে অবচেতন লিওনের শরীর কেঁপে উঠল। সেই নিবিড় আবেশে কোনো প্রতিবাদ তো দূর, উল্টো আচ্ছন্নতা আর তীব্র ভালোলাগা তার সমস্ত স্নায়ু অবশ করে দিল। মনে হচ্ছিল, এই ঘোরলাগা নিমজ্জনেই সে হারিয়ে যেতে চায়।
হঠাৎ—
বুকের ভেতর প্রচণ্ড এক তোলপাড় তুলে লিওন ধড়ফড় করে ঘুম ভেঙে উঠে বসল। কপালে, গলায় তখন শীতল ঘামের নদী। সে দ্রুত হাঁপাতে হাঁপাতে চারপাশে তাকাল। নিজের পরিচিত রুম। চারপাশের নিস্তব্ধতায় কোনো অমিল নেই।
কয়েক সেকেন্ড পাথর হয়ে বসে থেকে সে দুই হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে ফেলল।
“ইয়া আল্লাহ…”
নিজের ওপরেই ঘৃণা আর বিতৃষ্ণা নিয়ে সে ফিসফিস করে উঠল,
“আমি একটা ক্রিমিনালকে নিয়ে… এই ধরনের স্বপ্ন আবার দেখলাম?”
মাথা ঝাঁকিয়ে সে দ্রুত বিছানা ছেড়ে নামল এবং ভারাক্রান্ত পায়ে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে রাতের ঠান্ডা বাতাস মুখে লাগতেই ফুসফুস ভরে একটা গভীর শ্বাস টানল সে। তারপর নিজের বিদ্রোহী মনকে কঠোর গলায় প্রবোধ দিল,
আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ১৮
“এটা শুধু একটা স্বপ্ন…”
“আর কিছু না।”
কিন্তু রাতের শীতল হাওয়া যতই তার শরীর জুড়াতে চাইল না কেন, হিয়ার সেই মোহময় স্পর্শ আর চাউনিটা তার অন্তরের গভীরে ততটাই স্পষ্টভাবে জীবন্ত হয়ে রইল।
