আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ২৩
সাবিলা সাবি
দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভিআইপি রয়্যাল টার্মিনাল।
সূর্যের আলোয় ঝলমল করছে রানওয়ে। দূর থেকে ধীরে ধীরে নেমে এল কালো-রূপালি রঙের বিলাসবহুল একটা প্রাইভেট জেট।
বিমান থামতেই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে চারপাশে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়াল কালো স্যুট পরা রয়্যাল সিকিউরিটি, দুবাইয়ের প্রোটোকল অফিসার এবং রাজপরিবারের প্রতিনিধিরা।
মুহূর্তের মধ্যেই বিমানের দরজা খুলে গেল।
ধীরে ধীরে সিঁড়ি নামিয়ে দেওয়া হলো।
সবার দৃষ্টি তখন উপরের দিকেই।
অবশেষে দেখা দিল দানিয়েল।
আজ তাকে দেখে কোনো আন্ডারওয়ার্ল্ডের কিং নয়, বরং জন্মগত এক রাজপুত্র মনে হচ্ছে।
গাঢ় নেভি ব্লু রয়্যাল মিলিটারি-স্টাইল স্যুট পরিহিত সে। তার কাঁধে সোনালি এপোলেট, বুকে সূক্ষ্ম এমব্রয়ডারির নকশা। সাদা গ্লাভস পরা হাতে কালো ছড়ি নয়, বরং চামড়ার গ্লাভস। পায়ে চকচকে কালো ড্রেস বুট। কব্জিতে বিরল সংস্করণের প্লাটিনাম ঘড়ি।
তার চোখে সেই চিরচেনা বরফশীতল দৃষ্টি। মুখে কোনো হাসি নেই। ধীরে ধীরে সে বিমানের সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে লাগল।
নিচে ইতোমধ্যেই বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে লাল কার্পেট।
দানিয়েলের কালো বুট যখন প্রথমবার সেই কার্পেটের ওপর পড়ল, চারপাশে উপস্থিত সবাই সম্মান জানিয়ে মাথা নত করল। রয়্যাল ব্যান্ডে বেজে উঠল আনুষ্ঠানিক সুর। একজন উচ্চপদস্থ প্রোটোকল অফিসার এগিয়ে এসে মাথা নত করে বলল,
— “ওয়েলকাম টু দুবাই, ইয়োর হাইনেস।”
তার পাশে দাঁড়ানো এক তরুণী সোনালি ও সাদা অর্কিডের বিশাল ফুলের তোড়া এগিয়ে দিল।
আরেকজন সম্মানসূচক স্মারক তুলে ধরল।
চারদিক ক্যামেরার ফ্ল্যাশে আলোকিত হয়ে উঠল।
কিন্তু…
দানিয়েলের মুখের অভিব্যক্তিতে একটুও পরিবর্তন এল না। সে ফুলের তোড়াটার দিকে একবারও তাকাল না।
প্রোটোকল অফিসার বিব্রত মুখে দাঁড়িয়ে রইল।
লেডি ভিক্টোরিয়া মৃদু হেসে ফিসফিস করে বললেন,
— “দানি… অন্তত ফুলটা নাও। এটা ওদের প্রোটোকল।”
দানিয়েল ধীরে ধীরে চারপাশে তাকাল। তার চোখে রাজকীয় আয়োজনের প্রতি কোনো মুগ্ধতা নেই। শুধু গভীর বিরক্তি। সে নিচু, শীতল কণ্ঠে বলল,
— “এই আয়োজন… আমার জন্য নয়।”
সে এক মুহূর্ত থেমে আবার বলল,
— “এটা সেই রক্তের জন্য… যেটাকে আমি ঘৃণা করি।”
ভিক্টোরিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তিনি জানতেন, দানিয়েলের কাছে রয়্যাল ব্লাড কোনো গর্বের বিষয় নয়। বরং তার বাবার পরিচয়ই দানিয়েলের জীবনের সবচেয়ে অপছন্দের সত্য।
দানিয়েল ধীরে ধীরে ফুলের তোড়াটা হাতে নিলেও পরের মুহূর্তেই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক নিরাপত্তারক্ষীর হাতে দিয়ে দিল। তারপর একবারও পেছনে না তাকিয়ে লাল কার্পেট ধরে সামনে হাঁটতে শুরু করল।
সামনে অপেক্ষা করছে রাজকীয় কনভয়। আর দানিয়েলের মুখে তখনও একই নিরাবেগ অভিব্যক্তি—মনে হলো পৃথিবীর সবচেয়ে সম্মানজনক অভ্যর্থনাও তার কাছে সম্পূর্ণ অর্থহীন।
দুবাই। রয়্যাল প্যালেস।
কালো রঙের রাজকীয় কনভয় ধীরে ধীরে প্রাসাদের বিশাল লোহার গেট পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল। প্রাসাদের সামনে গাড়ি থামতেই দানিয়েল নেমে এল। চারদিকে সাদা মার্বেলের স্তম্ভ, সোনালি কারুকাজ, ঝলমলে ঝাড়বাতি আর রাজকীয় স্থাপত্য। যে দৃশ্য দেখে সাধারণ মানুষের চোখ বিস্ময়ে আটকে যায়…সেই দৃশ্যের দিকে দানিয়েল একবারও তাকাল না। সে ধীর পায়ে প্রাসাদের ভেতরে প্রবেশ করল। প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে তার বুকের ভেতরটা আরও ভারী হয়ে উঠতে লাগলো।
এই প্রাসাদ…
এই দেয়াল…
এই করিডোর…
সবকিছুই তার কাছে একটা দুঃস্বপ্নের স্মৃতি। কারণ এই প্রাসাদের প্রতিটি কোণ তাকে তার জন্মদাত্রী মায়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠল।
কয়েক সেকেন্ডের জন্য সে চোখ বন্ধ করল। তারপর আবার নিজেকে শক্ত করে নিল।
না…আজ আর তার কোনো আফসোস নেই। কারণ যার জন্য তার মা এত কষ্ট পেয়েছিলেন…যে মানুষটা তার মায়ের জীবনটা নরকে পরিণত করেছিল…সেই মানুষটার বিচার সে নিজের হাতেই করেছে। তার নিজের দুই হাতেই লেগে আছে—
নিজের বাবার খু/নের র/ক্ত। আর তারমধ্যে কোনো অনুশোচনা নেই। এক ফোঁটাও না।
বরং এটাই ছিল তার কাছে প্রকৃত বিচার। দানিয়েল ধীরে ধীরে নিজের হাতের তালুর দিকে তাকাল। মনে মনে ফিসফিস করে বলল,
— “তোমার মৃ*ত্যুই ছিল আমার মায়ের জন্য সবচেয়ে বড় ন্যায়বিচার।”
ঠিক তখনই ভিক্টোরিয়া পাশে এসে দাঁড়ালেন।
— “দানি… নিজের কক্ষে গিয়ে বিশ্রাম নাও। অনেকটা পথ এসেছ।”
দানিয়েল ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।তার কণ্ঠে কোনো আবেগ নেই।
— “আমি এখানে থাকব না পিপি।”
ভিক্টোরিয়া বিস্মিত হয়ে তাকালেন। — “মানে?”
দানিয়েল চারদিকে একবার তাকিয়ে শীতল স্বরে বলল,
— “এই প্রাসাদে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে।”
— “এখানে প্রতিটি দেয়াল আমাকে এমন একজন মানুষের কথা মনে করিয়ে দেয়, যাকে আমি পৃথিবীর যেকোনো কিছুর চেয়ে বেশি ঘৃণা করি।”
সে আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। পকেট থেকে গাড়ির চাবি বের করে হাঁটতে হাঁটতে বলল,
— “আমি সারপেন্ট পেন্টহাউসে যাচ্ছি। সেখানেই আমার জায়গা।”
তার ঠোঁটে ক্ষীণ, তিক্ত হাসি ফুটে উঠল।
— “এই রাজপ্রাসাদ আমাকে শুধু একটা পরিচয় দিয়েছে…”
এক মুহূর্ত থেমে দানিয়েল আবার বলল,
— “কিন্তু সারপেন্ট পেন্টহাউস আমাকে একটা সাম্রাজ্য দিয়েছে।”
কথা শেষ করেই দানিয়েল প্রাসাদ ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
পেছনে রয়ে গেল রাজকীয় ঐশ্বর্য। আর সামনে অপেক্ষা করছে সেই সারপেন্ট পেন্টহাউস—যেখান থেকে একসময় শুরু হয়েছিল দানিয়েলের অন্ধকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের সাম্রাজ্যের উত্থান।
দুবাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত।
তখন প্রায় সন্ধ্যা। সূর্য তখন ধীরে ধীরে দিগন্তের নিচে হারিয়ে যাচ্ছে। দুবাই শহরের কাঁচে মোড়ানো অট্টালিকাগুলো সোনালি আলোয় ঝলমল করছে। প্রশস্ত সড়কজুড়ে একের পর এক বিলাসবহুল গাড়ি ছুটে চলেছে। দূরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে রাজপরিবারের বিশাল প্রাসাদ।
কিছুক্ষণ আগেই সেই প্রাসাদ ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে। কালো রঙের বুলেটপ্রুফ রোলস-রয়েসের ড্রাইভার নীরবে দরজা খুলে ধরতেই দানিয়েল গাড়িতে উঠে বসল।
দরজাটা বন্ধ হতেই বাইরের সমস্ত কোলাহল মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। গাড়িটি ধীরে ধীরে প্রাসাদের বিশাল লোহার গেট পেরিয়ে শহরের ব্যস্ত সড়কের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল।
দানিয়েল জানালার বাইরে স্থির চোখে তাকিয়ে রইল।
তার দৃষ্টি শহরের দিকে নয়…
বরং বহু বছর আগের স্মৃতির দিকে।
একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস বেরিয়ে এল তার বুক থেকে।
এই শহরে…এই রাজপরিবারে…তার জন্ম কোনো সাধারণ পরিবারের সন্তান হিসেবে নয়। সে জন্মেছিল বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী এক খ্রিস্টান রাজবংশ—অ্যাশফোর্ড রয়্যাল ফ্যামিলির উত্তরাধিকারী হিসেবে।
তার পূর্ণ পরিচয়—
হিজ রয়্যাল হাইনেস প্রিন্স ‘অ্যাড্রিয়ান অ্যাশফোর্ড’।
আর তার বাবা…
হিজ ম্যাজেস্টি কিং ‘এডওয়ার্ড অ্যাশফোর্ড’।
একজন রয়্যাল কিং…যার এক নির্দেশে মন্ত্রীরা সিদ্ধান্ত বদলাত, প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা মাথা নত করত, আর বিশ্বের বহু ক্ষমতাধর মানুষও যার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে চাইত।
কিন্তু…দানিয়েলের কাছে সেই মানুষটার পরিচয় ছিল একটাই—তার মায়ের জীবন ধ্বংস করে দেওয়া একজন নিষ্ঠুর চরিত্রহীন মানুষ।
সে নিজের চোখে দেখেছে, কীভাবে ক্ষমতা, রাজনীতি আর রাজকীয় অহংকার আর নারী দেহের প্রতি লোভ, তার মায়ের হাসি কেড়ে নিয়েছিল।
সেই দিনই তার মনে জন্ম নিয়েছিল একটাই ঘৃণা অ্যাশফোর্ড বংশের প্রতি ঘৃণা।
তাই একসময় সে নিজের শরীরের রক্ত পর্যন্ত পরিবর্তন করার চেষ্টা করেছিলো। যাতে করে তার শিরায় আর কখনো এডওয়ার্ড অ্যাশফোর্ডের রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে—এই অনুভূতিটুকুও না থাকে।
কিন্তু…
রক্ত বদলানো গেলেও ডিএনএ বদলানো যায় না।
এই একটাই সত্য তাকে আজও ভেতর থেকে পোড়ায়।
যদি পৃথিবীতে এমন কোনো উপায় থাকত…তাহলে সে নিজের অস্তিত্ব থেকেই অ্যাশফোর্ড নামটা মুছে ফেলত।
দানিয়েল ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল। তার ঠোঁটে ফুটে উঠল তিক্ত এক হাসি। নিচু স্বরে নিজেকেই বলল,
— “প্রিন্স অ্যাড্রিয়ান অ্যাশফোর্ড… সেই মানুষটা অনেক আগেই মারা গেছে।”
কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে আবার বলল,
— “এখন শুধু দানিয়েল বেঁচে আছে।”
একটা নাম…যেটার সামনে রাজকীয় উপাধির কোনো মূল্য নেই। একটা নাম…যেটা শুনে রাজারা সম্মান দেখায় না—বরং আন্ডারওয়ার্ল্ড কেঁপে ওঠে।
এমন সময় গাড়ির গতি কিছুটা কমে এল। দূরে কালো কাঁচে মোড়ানো আকাশছোঁয়া ভবনটা চোখে পড়তেই দানিয়েলের দৃষ্টি বদলে গেল।
সারপেন্ট পেন্টহাউস।
এই জায়গায় তার কোনো রাজকীয় পরিচয় নেই।
এখানে কেউ তাকে প্রিন্স অ্যাড্রিয়ান অ্যাশফোর্ড বলে না। এখানে সবাই চেনে শুধু এক নামেই—ফ্যান্টম কিং দানিয়েল।
যে নিজের সাম্রাজ্য নিজের হাতে গড়েছে।যে রাজমুকুট নয়…ভয়কে নিজের পরিচয় বানিয়েছে।
ব্যস্ত সড়ক পেরিয়ে কালো রঙের বুলেটপ্রুফ রোলস-রয়েসটি এসে থামল একটি আকাশছোঁয়া ভবনের সামনে।
“সারপেন্ট পেন্টহাউস।”
পঞ্চাশ তলা জুড়ে বিস্তৃত কালো কাঁচে মোড়ানো ভবনটি বাইরে থেকে একটি বিলাসবহুল কর্পোরেট টাওয়ারের মতো দেখালেও, পৃথিবীর খুব কম মানুষই জানে—এটাই বিশ্বের অন্যতম ভয়ংকর আন্ডারওয়ার্ল্ড সাম্রাজ্যের মূল সদর দপ্তর।
গাড়ি থেকে নামতেই সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা শতাধিক সশস্ত্র গার্ড একসঙ্গে মাথা নত করল।
— “ওয়েলকাম ব্যাক, ফ্যান্টম কিং!”
এখানে কেউ তাকে প্রিন্স অ্যাড্রিয়ান অ্যাশফোর্ড নামে চেনে না।এখানে তার একটাই পরিচয়—ফ্যান্টম কিং দানিয়েল।
আন্ডারওয়ার্ল্ডের এমন এক সম্রাট, যার আসল পরিচয় আজও বিশ্বের অধিকাংশ গোয়েন্দা সংস্থার কাছে রহস্য।
দানিয়েল কোনো উত্তর দিল না। সে সোজা ব্যক্তিগত লিফটে উঠে নিচের দিকে নামতে লাগল।
–১… –৩… –৬… –৯… –১২…
অবশেষে লিফট থামল। দরজা খুলতেই সামনে ভেসে উঠল বিশাল এক আন্ডারগ্রাউন্ড কমান্ড সেন্টার।
চারদিকে শত শত এলইডি স্ক্রিন। কোথাও বিশ্বের লাইভ স্যাটেলাইট ম্যাপ। কোথাও অস্ত্র চালানের অবস্থান। কোথাও সমুদ্রপথের রুট। কোথাও ব্যাংকিং নেটওয়ার্কের এনক্রিপ্টেড তথ্য। আবার কোথাও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা তার সিন্ডিকেটের লাইভ রিপোর্ট।
শত শত অপারেটর একসঙ্গে কাজ করছে। কেউ সাইবার নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করছে। কেউ অস্ত্রের চালান পর্যবেক্ষণ করছে। কেউ বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা সংস্থার গতিবিধি বিশ্লেষণ করছে। এখানে এক সেকেন্ডের জন্যও কাজ থামে না। দানিয়েলকে দেখেই সবাই উঠে দাঁড়াল।
— “ফ্যান্টম কিং!”
সে শুধু মাথা নাড়ল। ঠিক তখনই বিশাল স্টিলের দরজা ধীরে ধীরে খুলে গেল। ভেতরে ছিল তার ব্যক্তিগত আন্ডারগ্রাউন্ড এরিনা।
প্রথমেই অন্ধকারের ভেতর থেকে নিঃশব্দে বেরিয়ে এল বিশাল ব্ল্যাক প্যান্থার—নক্স।
সবুজাভ জ্বলজ্বলে চোখ, নিঃশব্দ পদচারণা আর শিকার ধরার অসাধারণ দক্ষতার জন্য পুরো আন্ডারওয়ার্ল্ডে নক্স কিংবদন্তি।
কেউ বলে—”যেদিন নক্সকে দেখা যায়, সেদিন মৃ/ত্যু খুব কাছেই থাকে।”
দানিয়েলের সামনে এসে বিশাল প্যান্থারটি মাথা নিচু করল।
এরপর ধীরে ধীরে এগিয়ে এল বিশাল ব্ল্যাক উলফ—ফ্যাং।
দানিয়েলের এক ইশারাতেই সে শান্ত হয়ে তার পাশে দাঁড়িয়ে রইল। একপাশের কাচঘেরা বিশেষ এনক্লোজারের ভেতর ফণা তুলে দাঁড়িয়ে ছিল দৈত্যাকার কিং কোবরা—ভেনম।
দানিয়েল কাছে যেতেই হিসহিস শব্দ থেমে গেল।
ফণাও ধীরে ধীরে নিচে নেমে এল। সবশেষে আন্ডারগ্রাউন্ডের নিরাপত্তা খালের কালো পানি কাঁপিয়ে ভেসে উঠল বিশাল সাল্টওয়াটার কুমির—রেক্স।
তার বিশাল চোয়াল একবার খুলতেই নতুন কয়েকজন গার্ড অজান্তেই এক পা পিছিয়ে গেল। এই চারটি প্রাণী কোনো সাধারণ পোষা প্রাণী নয়। এরা প্রত্যেকেই ফ্যান্টম কিংয়ের জীবন্ত অস্ত্র।
দানিয়েল ধীরে ধীরে কমান্ড ডেস্কের সামনে এসে দাঁড়াল।
তার সামনে থাকা বিশাল হোলোগ্রাফিক স্ক্রিনে মুহূর্তের মধ্যেই জ্বলে উঠল পৃথিবীর মানচিত্র। একটির পর একটি লাল বিন্দু জ্বলতে শুরু করল। প্রতিটি বিন্দুই তার একটি করে অপারেশন সেল। প্রতিটি দেশে তার নিজস্ব কমান্ডার।
নিজস্ব অস্ত্রাগার। নিজস্ব অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক।
নিজস্ব সেফ হাউস। নিজস্ব পালানোর রুট। তার প্রতিটি অপারেশনের জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত থাকে—
প্ল্যান–এ।
প্ল্যান–বি।
প্ল্যান–সি।
এমনকি প্রয়োজনে আরও বিকল্প পরিকল্পনাও।
কোনো অপারেশন ব্যর্থ হলেও তার সাম্রাজ্য কখনো থেমে যায় না। কারণ ফ্যান্টম কিং কখনো একটিমাত্র পথের ওপর নির্ভর করে না। তাই বছরের পর বছর ধরে বিশ্বের বহু গোয়েন্দা সংস্থা, আন্তর্জাতিক অপরাধ দমন ইউনিট এবং শক্তিশালী সিন্ডিকেট তাকে খুঁজেছে।
কিন্তু…কেউ তার পুরো নেটওয়ার্ক ভাঙতে পারেনি।
কেউ তার আসল পরিচয় জানতে পারেনি। আর কেউই বুঝতে পারেনি—ফ্যান্টম কিংয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি তার অস্ত্র বা অর্থ নয়…তার মস্তিষ্ক।
সে সবসময় শত্রুর পরবর্তী চালের আগেই নিজের পরবর্তী দশটি চাল সাজিয়ে রাখে। তাই আন্ডারওয়ার্ল্ডে একটি কথাই প্রচলিত—”ফ্যান্টম কিংকে হারাতে চাইলে, আগে তার চিন্তার থেকেও দ্রুত ভাবতে শিখতে হবে।”
লন্ডন, যুক্তরাজ্য।
পরদিন বিকেল। সারাদিনের হালকা রোদের পর বিকেলের আলো ধীরে ধীরে নরম হয়ে এসেছে। লন্ডনের আকাশে ধূসর মেঘের ভেলা ভাসছে। মাঝে মাঝে শীতল বাতাস বইছে, রাস্তার দু’পাশের ম্যাপল গাছের পাতাগুলো মৃদু দুলে উঠছে।
শহরের কোলাহল থেকে কিছুটা দূরে, টেমস নদীর পাশের একটি নিরিবিলি পার্ক।
চারদিকে খুব বেশি মানুষ নেই। দূরে কয়েকজন জগিং করছে, কেউবা বেঞ্চে বসে বই পড়ছে। নদীর ওপরে সাদা সিগাল পাখি উড়ে বেড়াচ্ছে। একটি বেঞ্চে পা তুলে নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে বসে আছে হিয়া। তার পরনে কালো ওভারসাইজ হুডি, কালো কার্গো প্যান্ট আর স্নিকার্স। মাথার হুডটা অর্ধেক টানা। এক হাতে কফির কাপ, অন্য হাতে ছোট্ট একটি পাথর নিয়ে খেলছে সে। যাকেৎদেখলে মনে পৃথিবীর কোনো ঝড়ই তাকে স্পর্শ করতে পারে না।
ঠিক তখনই ধীরে ধীরে এগিয়ে এল আয়মান। আজ তার চেহারায় আগের সেই আত্মবিশ্বাস নেই। কয়েক রাতের নির্ঘুম ক্লান্তি স্পষ্ট চোখেমুখে। বাবার সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ার পর থেকে তার মাথায় একটাই প্রশ্ন ঘুরছে।
সে হিয়ার সামনে এসে থেমে গেল। হিয়া মাথা না তুলেই কফিতে এক চুমুক দিল।
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর আয়মান ধীরে ধীরে বলল,
— “ভাইপার…”
হিয়া এবার মাথা তুলল। তার ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটে উঠল।
— “বলো আয়মান।”
আয়মান গভীর দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— “আমি একটা উত্তর চাই।”
— “কিসের?” শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল হিয়া।
আয়মান এক পা সামনে এগিয়ে এল। তার গলায় চাপা রাগ আর কষ্ট স্পষ্ট।
— “তুমি এটা কেন করলে?”
— “আমার বাবার পুরো চালান দখল করে নিলে… তার লোকদের মে/রে ফেললে… তার ব্যবসা ধ্বংস করে দিলে… তাকে পৃথিবীর সামনে এক্সপোজ করলে”
সে দাঁত চেপে বলল,— “কেন, ভাইপার?”
হিয়া ধীরে ধীরে কফির কাপটা বেঞ্চের পাশে রেখে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে কোনো রাগ নেই। শুধু রয়ছে সেখানে স্থিরতা। সে আয়মানের একেবারে সামনে এসে দাঁড়িয়ে শান্ত গলায় বলল,
— “কারণ তোমার বাবা আসাদ খান একটা সীমা অতিক্রম করেছে।”
আয়মান ভ্রু কুঁচকে তাকাল। — “মানে?”
হিয়ার চোখ মুহূর্তেই ঠান্ডা হয়ে গেল।
— “অস্ত্রের ব্যবসা..ড্রাগ…স্মাগলিং…এসব আমি সমর্থন করি, আন্ডারওয়ার্ল্ডে এগুলোর সাথে আমার পরিচয় নতুনও নয়।”
সে এক সেকেন্ড থেমে আয়মানের চোখে চোখ রেখে বলল,— “কিন্তু নারী পাচার?”
তার কণ্ঠ এবার বরফের মতো শীতল।
— “না। এটা আমি কখনো মেনে নেব না। তোমার বাবা নিরীহ মেয়েদের জীবন বিক্রি করছিল। তাদের ইজ্জতের ওপর নিজের সাম্রাজ্য দাঁড় করাচ্ছিল।
তাই আমি তার সাম্রাজ্যে আঘাত করেছি।”
কথাগুলো শুনে আয়মান স্তব্ধ হয়ে গেল। তার চোখে অবিশ্বাসের একটা ভান ফুটে উঠলো।
— “তুমি… সত্যি বলছ সে নারী পাচারের সাথে যুক্ত ছিলেন ?”
হিয়া কোনো উত্তর দিল না।বরং ধীরে ধীরে আরও এক পা এগিয়ে এল। তার ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। সে নিচু স্বরে বলল, — “এবার আমি তোমাকে একটা প্রশ্ন করি, আয়মান।”
আয়মান স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
হিয়া বলল,— “তুমি কার পাশে দাঁড়াবে?”
— “তোমার বাবার…”
এক মুহূর্ত থেমে সে নিজের আঙুল দিয়ে আয়মানের বুকে আলতো টোকা দিল।
— “নাকি আমার?”
আয়মান চুপ। হিয়া আবার বলল,
— “ভাবো ভালো করে।”
— “তুমি কি এমন একজন মানুষের পাশে থাকবে, যে মেয়েদের জীবন বিক্রি করে আর অর্থ সম্পদ একাই ভোগ করে তোমাকে শুধু তার দাস বানিয়ে রেখেছে। ছেলে হিসেবে কোনো ক্ষমতা আছে তোমার?”
তারপর খুব শান্ত গলায়, কিন্তু কথার ভেতরে সূক্ষ্ম চাপ তৈরি করে বলল, — “নাকি আমার পাশে দাঁড়াবে… যে তোমাকে ক্ষমতা আর পৃথিবীর সবকিছু দিতে পারবে?”
প্রশ্নটা ছুড়ে দিয়েই হিয়া চুপ হয়ে গেল।
আয়মানের মুখে কোনো উত্তর নেই। সে শুধু নির্বাক হয়ে হিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।
আর হিয়া বুঝতে পারল— তার কথাগুলো ইতোমধ্যেই আয়মানের মনে লোভের বীজ বপন করে দিয়েছে।
আয়মান দীর্ঘক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে একটা তিক্ত হাসি দিল।
— “আমি ভেবেছিলাম তুমি শুধু আমার বাবার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছো।”
সে মাথা নাড়ল।— “কিন্তু এখন বুঝতে পারছি… তুমি যা করেছো, ভালোই করেছো।”
হিয়া ভ্রু তুলল।
আয়মান আবার বলল,
— “আমি তোমাকে সাপোর্ট করি, ভাইপার। বাবা ভুল করলেও… আমি চাই না তোমাকে হারাতে। তুমি আমার পাশে থাকো। আমি তোমার পাশে থাকব।”
কথাগুলো শুনে হিয়ার মুখে কোনো পরিবর্তন এল না।
বরং তার ঠোঁটের কোণে হালকা এক রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। সে ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।
— “গুড ডিসিশন।”
আয়মান স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। সে বুঝতেই পারল না…হিয়ার মাথায় এই মুহূর্তে সম্পূর্ণ ভিন্ন খেলা চলছে।
হিয়া শান্ত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকলেও মনে মনে ঠান্ডা স্বরে বলল,
“মাদারচো/দ… তুই যে কত বড় হারামি, সেটা আমি অনেক আগেই জানি তুই নিজেও তো জানিস তোর বাপ যে মেয়েদের পাচার করে আর আমার সামনে নাটক করছিস জা/নো/য়ার।এখন শুধু অভিনয় কর।আগে তোর বাবাকে শেষ করি..তারপর তোর পালা।”
হিয়ার চোখের গভীরে এক মুহূর্তের জন্য তীক্ষ্ণ শীতলতা ঝলকে উঠল। কিন্তু পরের মুহূর্তেই সে আবার আগের মতোই নির্লিপ্ত। যেন কিছুই হয়নি। আর আয়মান…সে এখনও বিশ্বাস করে বসে আছে—ভাইপার সত্যি তাকে সবটা দেবে ক্ষমতা আর নিজেকেও ওর কাছে সঁপে দিবে।
লন্ডন, যুক্তরাজ্য।
ঠিক সন্ধ্যাবেলা। লন্ডন সিআইডি সদর দপ্তরের তদন্ত বিভাগে তখনও ব্যস্ততা চলছে। দিনের শিফট শেষ হলেও একটি কেবিনে এখনও আলো জ্বলছে।
সেই কেবিনে বসে আছে চিফ ইনভেস্টিগেটিং অফিসার লিওনার্দো হায়াস।
তার ডেস্কজুড়ে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য ফাইল, ফরেনসিক রিপোর্ট, ব্যাংক ট্রানজেকশনের কপি, ইমপোর্ট-এক্সপোর্টের নথি, শিপিং ম্যানিফেস্ট এবং আসাদ খানের সাম্রাজ্য থেকে উদ্ধার হওয়া বিভিন্ন ডকুমেন্ট।
লিওন কখনোই কোনো কেসকে শুধু চোখে দেখে বিচার করে না। সে কাগজের লেখার চেয়ে লেখার ফাঁকে লুকিয়ে থাকা সত্য পড়তে বেশি অভ্যস্ত তাই সে সবার থেকে আলাদা। এক হাতে কফির কাপ, তার অন্য হাতে কলম।সে প্রতিটি নথির গুরুত্বপূর্ণ অংশে ছোট ছোট চিহ্ন দিচ্ছিল।
একসময় একাধিক ফাইল পাশাপাশি রেখে টাইমলাইন মিলিয়ে দেখা শুরু করল। কোন জাহাজ কবে ছেড়েছে…কোন বন্দরে থেমেছে…কোন কোম্পানির নামে কার্গো গেছে…সবকিছু সে নিজের মতো করে সাজিয়ে নিচ্ছিল। হঠাৎই তার চোখ থেমে গেল একটি পরিচিত নামের ওপর।
“ভুঁইয়া গ্লোবাল এক্সপোর্ট অ্যান্ড ইমপোর্ট লিমিটেড।”
লিওনের চোখ সরু হয়ে এল। এই কোম্পানির নাম তার অচেনা নয়। বাংলাদেশের প্রভাবশালী ভুঁইয়া বংশের পারিবারিক প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে যার দায়িত্বে রয়েছে তার বোন জামাই রুদ্রনীল ভুঁইয়া।
যদিও রুদ্রনীল শুরু থেকেই ব্যবসায়ী ছিল না। একসময় সে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সম্মানিত প্রফেসর ছিল।
বাবার অসুস্থতার পর অধ্যাপনার চাকরি ছেড়ে পারিবারিক এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যবসার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেয় রুদ্রনীল। এই তথ্য লিওনের বহু আগেই জানা।
কারণ নিজের বোনের বিয়ের আগে একজন সিআইডি অফিসার হিসেবে নয়, একজন ভাই হিসেবেও সে রুদ্রনীলের অতীত, পরিবার, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং ব্যবসা সম্পর্কে বিস্তারিত যাচাই করেছিল।
সেই তদন্তে কোনো অসঙ্গতি পাওয়া যায়নি। তাই এই নামটা আজ আসাদ খানের গোপন নথিতে দেখে তার কপালে ভাঁজ পড়ল। লিওন সঙ্গে সঙ্গে মনিটরে থাকা ফাইলগুলো বড় করে খুলল।
একটি নয়…দুটি নয়…একের পর এক চালানের তথ্য মিলিয়ে দেখতে লাগল। তারপর ডেস্ক থেকে একটি সাদা কাগজ টেনে নিয়ে নিজেই হিসাব লেখা শুরু করল।
কনটেইনার নম্বর…জাহাজের নাম…তারিখ…লোডিং পোর্ট…আনলোডিং পোর্ট…প্রতিটি তথ্য সে আলাদা করে মিলিয়ে দেখছিল।
হঠাৎ তার কলম থেমে গেল। একই কনটেইনার নম্বর। একই জাহাজ। একই তারিখ। কিন্তু দুই জায়গায় দুই ধরনের তথ্য।
সরকারি কাস্টমস ডকুমেন্টে লেখা—”মেডিকেল ইকুইপমেন্ট।”
অথচ আসাদ খানের এনক্রিপ্টেড হিসাবের খাতায় একই কনটেইনারের পাশে লেখা—”স্পেশাল কার্গো।”
লিওন আরেকটি চালান বের করল। আবারও একই অসঙ্গতি।
তৃতীয়টি…সেখানেও একই প্যাটার্ন।
এবার সে চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করল।
মাত্র কয়েক সেকেন্ড। তারপর আবার চোখ খুলে মনিটরের দিকে তাকাল।তার ঠোঁটে হালকা, প্রায় মৃদু একটি হাসি ফুটে উঠল। এটা সেই হাসি…যেটা তার সহকর্মীরা খুব ভালো করেই চেনে। কারণ এই হাসির মানে একটাই—লিওন কোনো বড় সূত্র খুঁজে পেয়েছে।
সে নিচু স্বরে নিজেকেই বলল,
— “ভুল একবার হতে পারে…”
— “দুইবারও হতে পারে…”
— “কিন্তু একই ধরনের ভুল বারবার হয় না।”
— “কেউ খুব নিখুঁতভাবে সত্যটা লুকানোর চেষ্টা করেছে।”
সে আবার রুদ্রনীলের কোম্পানির নামের দিকে তাকাল। তার চোখে তখন আর বিস্ময় নেই। বরং একজন অভিজ্ঞ তদন্তকারীর শীতল সতর্কতা।
— “রুদ্রনীল ভুঁইয়া… আমি বিশ্বাস করি না তুমি এতটা বোকা যে নিজের কোম্পানির নামে সরাসরি অবৈধ চালান পাঠাবে।”
— “কিন্তু এটাও বিশ্বাস করি না, তোমার কোম্পানির নাম বারবার এখানে কাকতালীয়ভাবে এসেছে।”
লিওন ধীরে ধীরে সব ফাইল নিজের ব্যক্তিগত এনক্রিপ্টেড ড্রাইভে সংরক্ষণ করল।
কারণ সে জানে—সন্দেহ মানেই অপরাধ নয়।
কিন্তু…প্রতিটি বড় অপরাধের শুরু হয় একটি ছোট সন্দেহ থেকেই। সে কোটটা গায়ে চাপিয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল।
আজ রাতে…
রুদ্রনীলকে সে অভিযুক্ত করবে না।কিন্তু এমন কিছু প্রশ্ন করবে… যার উত্তরে সত্য লুকানো কঠিন হয়ে যাবে।
পরদিন দুপুরবেলায়।
লন্ডন শহরের একেবারে প্রান্তে অবস্থিত একটি ব্যক্তিগত কার্গো টার্মিনাল।
চারদিকে সারি সারি কনটেইনার। বিশাল কার্গো ট্রাক একের পর এক ঢুকছে আবার বেরিয়ে যাচ্ছে। দূরে নোঙর করে আছে একটি মালবাহী জাহাজ, যার গন্তব্য—দুবাই।
দানিয়েলের নির্দেশ অনুযায়ী আজকের পুরো অপারেশনের দায়িত্বে ছিল মার্কার ইভানা।
দুবাইয়ে পাঠানো হবে দখল করা অস্ত্র, অর্থ এবং গুরুত্বপূর্ণ চালান। অপারেশনটি ছিল অত্যন্ত গোপন। দানিয়েলের টিম ছাড়া এর খবর আর কারও জানার কথা নয়।
অন্যদিকে হিয়া আজ টাউন হাউসেই ছিল। শরীর এখনও পুরোপুরি সুস্থ হয়নি। জ্যাকের নির্দেশে সে বিশ্রামে রয়েছে।
এমনিতেও এ ধরনের ছোটখাটো কার্গো অপারেশনে হিয়া নিজে খুব কমই যায়। তার উপস্থিতি প্রয়োজন হয় শুধু বড় মিশনে। এদিকে বন্দরে দাঁড়িয়ে মার্ক শেষবারের মতো পুরো চালান পরীক্ষা করছিল।
ইভানা ওয়্যারলেসে একের পর এক নির্দেশ দিচ্ছিল।
সবকিছু পরিকল্পনামাফিকই এগোচ্ছিল।ঠিক তখনই…
দূর থেকে ভেসে এল একটি গু/লির শব্দ।
মার্ক মুহূর্তেই ঘুরে দাঁড়াল।
— “কভার!”
কিন্তু তার সতর্কবাণী শেষ হওয়ার আগেই চারদিক থেকে স্বয়ংক্রিয় রাইফেলের গু/লি বৃষ্টির মতো ঝরে পড়তে শুরু করল।
ট্র্র্র্র্র্র…!!
এক সেকেন্ডের মধ্যেই পুরো কার্গো ইয়ার্ড রণক্ষেত্রে পরিণত হলো। মার্কদের লোকজনও পাল্টা গু/লি চালাতে শুরু করল।
চারদিকে শুধু গলির শব্দ, বিস্ফোরণ আর মানুষের চিৎকার। মার্ক একের পর এক শত্রুকে নামিয়ে ফেলছিল। হঠাৎ…একটি গু/লি এসে তার কাঁধ ভেদ করে বেরিয়ে গেল।
প্রচণ্ড আঘাতে সে মাটিতে পড়ে গেলেও দাঁত চেপে আবার অস্ত্র তুলে নিল। অন্যদিকে ইভানা কয়েকজনকে গু/লি করে ফেললেও বুঝতে পারল— এটা সাধারণ হামলা নয়।
শত্রুপক্ষ সংখ্যায় অনেক বেশি। এবং…তারা যেন আগে থেকেই জানত আজ এই চালান এখান দিয়ে যাবে।
মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই দানিয়েলের প্রায় পুরো টিম মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। জীবিত যারা ছিল, তারাও মারাত্মক আ/হত। ইভানা শেষ গুলি/টা ছুড়ে ম্যাগাজিন বদলাতে যাবে…ঠিক তখনই পিছন থেকে কেউ তার মাথায় শক্ত আঘাত করল।
তার চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে গেল। সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। অচেতন হওয়ার আগে শুধু এক ঝলক দেখতে পেল…কালো পোশাক পরা কয়েকজন লোক তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
দূরে দাঁড়িয়ে থাকা একজন ধীরে ধীরে সিগার ধরাল।
তার ঠোঁটে ভয়ংকর হাসি।
— “বেঁচে থাকলে বল তোদের ভাইপারকে…”
— “আসাদ খান এখনও শেষ হয়ে যায়নি।”
কিছুক্ষণ পর…কার্গো ইয়ার্ডে শুধু ধোঁয়া, র/ক্ত আর নি/থর দেহ পড়ে রইল।
আহত অবস্থায় মার্ক কাঁপতে কাঁপতে নিজের ওয়্যারলেস হাতে তুলে নিল। রক্তে ভিজে যাওয়া কণ্ঠে সে শুধু একটি কথাই বলতে পারল—
— “মি…স্ট্রেস…”
— “অ্যামবুশ…”
— “ই… ইভানাকে… নিয়ে গেছে…”
ওয়্যারলেসের অপর প্রান্তে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর…শুধু একটি ঠান্ডা কণ্ঠ শোনা গেল—
— “কোথায়?”
মার্ক উত্তর দেওয়ার আগেই তার হাত থেকে ওয়্যারলেসটি মাটিতে পড়ে গেল। সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।
আর সেই মুহূর্তেই…
টাউন হাউসের ভেতরের পরিবেশ সম্পূর্ণ বদলে গেল। কারণ ভাইপার বুঝে গেল—আসাদ খান পালিয়ে বেড়াচ্ছে না, সে পাল্টা আঘাত করা শুরু করেছে।
ড্রয়িংরুমে পুরো টিমের সবাই মার্কের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছে। কিন্তু কোনো সাড়া নেই।
ঠিক তখনই…হিয়ার ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল—Ivana Calling…
হিয়া সঙ্গে সঙ্গে রিসিভ করল।— “ইভানা?”
ওপাশে কোনো উত্তর নেই।শুধু ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ।
তারপর…মনে হলো কেউ প্রচণ্ড জোরে কাউকে আঘাত করল। সঙ্গে সঙ্গে ইভানার ব্যথায় চিৎকার শোনা গেলো।
— “আআআহ…!”
হিয়ার চোখ মুহূর্তেই ঠান্ডা হয়ে গেল। তারপর ভেসে এল পরিচিত কণ্ঠ।
— “শুনতে পাচ্ছিস, ভাইপার?”
— “তোর লোক এখনো বেঁচে আছে।”
আসাদ খান মুচকি হেসে বলল।
— “কিন্তু কতক্ষণ বাঁচবে… সেটা তুই ঠিক করবি।”
হিয়া ঠান্ডা গলায় বলল,— “সোজা কথায় আসো।”
আসাদ হাসল।— “তুই কি এমনই।”
— “লোক মরছে… তবুও গলায় কোনো আবেগ নেই।”
একটু থেমে সে আবার বললো—
— “তাহলে একটা খেলা খেলি?”
হিয়া নিশ্চুপ রইলো।
— “এক ঘণ্টা। ঠিক এক ঘণ্টার মধ্যে এই লোকেশনে একা আসবি।”
হিয়ার ফোনে একটি লোকেশন চলে এল।
আসাদ আবার বলল,
— “একা মানে একাই। তোর টিম, পুলিশ..সিআইডি ,ইন্টারপোল…কাউকে দেখলেই প্রথম গু/লিটা ইভানার মাথায় যাবে।”
তারপর নিচু স্বরে যোগ করল,
— “আর দ্বিতীয় কাজটা হবে আরও মজার।”
হিয়া কিছু বলল না।
— “লন্ডনের সবচেয়ে বড় আন্ডারগ্রাউন্ড অকশনে ওকে বিক্রি করে দেব।”
— “পারলে তখন খুঁজে নিস।”
হঠাৎ ফোনের ওপাশে ইভানার দুর্বল কণ্ঠ শোনা গেল—
— “মিস্ট্রেস.. আপনি আসবেন… না.. ওরা….”
কথা শেষ হওয়ার আগেই—আরেকটা আঘাত পড়লো ইভানার ওপর। ইভানার চিৎকার পুনরায় শোনা গেলো
আসাদ বিরক্ত গলায় বলল,— “চুপ! হারামজাদি।”
তারপর আবার হিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলল,
— “আর একটা কথা…”
— “আজকের রাতটাই আমার লন্ডনে শেষ রাত।”
— “কাল আমি বাংলাদেশে থাকব।”
— “তুই যদি ওই মেয়েটাকে বাঁচাতে চাস…”
— “এটাই শেষ সুযোগ।”
তারপর হুট করেই কল কেটে গেল। পুরো রুম তখন নিস্তব্ধ। গার্ডরা সবাই হিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে।
হিয়া কয়েক সেকেন্ড ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব ধীরে বলল,
— “আসাদ খান…”
— “তুই ভুল করেছিস।”
— “আমার লোককে ছুঁয়ে তুই নিজের মৃ/ত্যুর সময়টা শুধু শুধু এগিয়ে আনলি।”
—
দুবাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত।
সারপেন্ট হাউস।
বিশাল আন্ডারগ্রাউন্ড কমান্ড সেন্টারের প্রতিটি স্ক্রিনে তখন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের লাইভ অপারেশন ভেসে উঠছে।
দানিয়েল নিজের ব্যক্তিগত কমান্ড ডেস্কে বসে একের পর এক রিপোর্ট দেখছিল।
হঠাৎ পুরো কন্ট্রোল রুমে লাল সতর্কবার্তা জ্বলে উঠল।
— EMERGENCY PRIORITY SIGNAL.
একজন অপারেটর তড়িঘড়ি উঠে দাঁড়াল।
— “বস! লন্ডন ইউনিট থেকে ইমার্জেন্সি সিগন্যাল!”
দানিয়েল মাথা তুলল। বড় স্ক্রিনে মুহূর্তের মধ্যেই ভেসে উঠল আহত মার্কের লাইভ ভিডিও।
তার পুরো শরীর র/ক্তে ভিজে গেছে। শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে।
মার্ক কষ্ট করে বলল,
— “ব… বস…”
— “আমাদের ওপর অ্যামবুশ হয়েছে…”
— “লোকজন… সবাই…”
সে কাশতে কাশতে রক্ত ফেলল। — “ইভানাকে… নিয়ে গেছে…”
ভিডিও হঠাৎ কেঁপে উঠে বন্ধ হয়ে গেল। পুরো কন্ট্রোল রুম নিস্তব্ধ। কেউ একটি শব্দও বলার সাহস পেল না।
ঠিক তখনই ভিক্টোরিয়া ধীরে ধীরে দানিয়েলের পাশে এসে দাঁড়াল। সে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
— “আমি জানি তুমি এখনই লন্ডনে ফিরতে চাইছ।”
— “কিন্তু যাবে না।”
দানিয়েল কোনো উত্তর দিল না।
ভিক্টোরিয়া আবার বলল,
— “তোমার ভাইপারকে সবাই কিংবদন্তি বলে।”
— “আজ আমি দেখতে চাই, তোমাকে ছাড়া সে কতদূর যেতে পারে।”
— “যদি সত্যিই সে তোমার সবচেয়ে যোগ্য মানুষ হয়… তাহলে এই পরিস্থিতি সে একাই সামলাক।”
রুমের সবাই দানিয়েলের দিকে তাকিয়ে আছে।
কয়েক সেকেন্ড নীরব থাকার পর দানিয়েল ধীরে ধীরে চেয়ারের পিঠে হেলান দিল। তার চোখে উদ্বেগের লেশমাত্র নেই। সে শুধু শান্ত গলায় বলল,— “ভাইপার পারবে।”
ভিক্টোরিয়া ঠান্ডা হেসে বললো
— “এতটাই বিশ্বাস?”
দানিয়েল এবার তার দিকে তাকাল। তার কণ্ঠে দৃঢ়তা ফুটে উঠলো।
— “বিশ্বাস না…”
একটু থেমে বললো —— “এটা কনফিডেন্স।”
— “ভাইপারকে আমি কখনো আমার ওপর নির্ভর করতে শেখাইনি।”
— “আমি ওকে এমনভাবে তৈরি করেছি, যাতে আমি না থাকলেও পুরো লড়াইটা শেষ করে ফিরতে পারে।”
ভিক্টোরিয়া ভ্রু কুঁচকে বলল,
— “যদি না পারে?”
দানিয়েলের ঠোঁটে হালকা তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল।
— “তাহলে আমি ভুল মানুষকে সাত বছর ধরে নিজের পাশে রেখেছি।”
সে আবার স্ক্রিনের দিকে তাকাল।
— “কিন্তু…”
— “আমি মানুষ চিনতে ভুল করি না।”
তারপর খুব শান্ত স্বরে শেষ কথাটা সে বলল—
— “আসাদ খান আজ ভাইপারকে ফাঁদে ডাকেনি…”
— “নিজের জন্যে কবর খুঁড়েছে।”
ভিক্টোরিয়া তখন ঠান্ডা স্বরে বলল,— “যদি ভাইপার এবার ব্যর্থ হয়?”
দানিয়েল এক সেকেন্ডও দেরি করল না বলতে।
— “হবে না।”
— “ও ফিরে আসবে।”
— “এবং ইভানাকেও ফিরিয়ে আনবে।”
কমান্ড সেন্টারে উপস্থিত সবাই নিঃশব্দ। দানিয়েল ধীরে ধীরে চেয়ার থেকে উঠে বিশাল কাচের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দূরে দুবাই শহরের আলো ঝলমল করছে। দুই হাত পকেটে রেখে সে নিচু স্বরে বলল,
— “আসাদ খান ভাবছে, সে আমার একজন মানুষকে অপহরণ করেছে।”
একটু থেমে তার কণ্ঠ আরও ঠান্ডা হয়ে উঠল।
— “আসলে সে নিজের মৃ/ত্যুদণ্ডে নিজেই স্বাক্ষর করেছে।”
ভিক্টোরিয়া তার দিকে তাকিয়ে রইল। দানিয়েল ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল। তার চোখে কোনো রাগ নেই। শুধু এমন এক নিশ্চয়তা প্রকাশ পেলো যেটা দেখেই বোঝা গেলো দানিয়েল ফলাফল আগেই দেখে ফেলেছে।
— “আসাদ খানের জীবনের শেষ অধ্যায় শুরু হয়ে গেছে।”
একজন অপারেটর সাহস করে জিজ্ঞেস করল, — “বস… যদি আসাদ খান পালিয়ে যায়?”
দানিয়েলের ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটে উঠল।
— “পালানোর সুযোগ তখনই থাকে…”
— “যখন শিকারিকে শিকার মনে করা হয়।”
— “কিন্তু আসাদ বুঝতেই পারেনি…”
সে ধীরে ধীরে কথাটা শেষ করল,
— “সে যাকে ফাঁদে ডাকছে, সেই-ই তার আজরাইল।”
কথা শেষ করেই দানিয়েল আবার নিজের কাজে মন দিল। তার মুখে বিন্দুমাত্র উৎকণ্ঠা নেই।কারণ সে জানে হিয়া যদি কোনো মিশনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে হয় মিশন শেষ হবে… নতুবা পৃথিবীতে আর হিয়া থাকবে না। মাঝামাঝি কোনো ফলাফল তার অভিধানে নেই।
লন্ডন, যুক্তরাজ্য।
রাত তখন গভীর প্রায়। টাউন হাউসের পুরো পরিবেশ থমথমে। হিয়া ইতোমধ্যেই কালো কমব্যাট পোশাক পরে প্রস্তুত হয়ে গেছে। কোমরে পিস্তল, উরুর পাশে কমব্যাট নাইফ, কাঁধে কালো জ্যাকেট।
দরজার দিকে কয়েক পা এগিয়েই সে হঠাৎ থেমে গেল।
কয়েক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে থাকার পর ধীরে ধীরে নিজের রুমের এক কোণে থাকা বুকশেলফের সামনে গেল। শেলফের একটি নির্দিষ্ট বই টেনে বের করতেই ভেতরের গোপন লকারটি খুলে গেল। লকারের ভেতরে খুব বেশি কিছু নেই।
একটি পুরোনো রক্তমাখা কাপড়ের টুকরো…একটি আইডি কার্ড…আর একটি পুরোনো ছবি।
এই একটিমাত্র ছবিই…তার পুরো পরিবারের শেষ স্মৃতি।
হিয়া দুই হাতে ছবিটা তুলে নিল। ছবিতে চারজন মানুষ।
তার বাবা…
তার মা…
তার ছোট ভাই অয়ন…
যাকে হিয়া ছোটবেলা থেকে অন্তর বলেই ডাকত। হিয়া নিজের নামের সাথে মিলিয়ে তার ছোট ভাইয়ের নাম রেখেছিলো অন্তর।
আর সবার মাঝে কলেজ পড়ুয়া এক মেয়ে…
যেটা হিয়া নিজেই।
ছবিটার ওপর ধীরে ধীরে হাত বুলিয়ে দিল সে। তার ঠোঁট কাঁপলেও চোখ থেকে একফোঁটা জলও পড়ল না। অনেক আগেই সে কাঁদতে ভুলে গেছে।
নিচু স্বরে বলল,
— “আব্বু…”
— “আম্মু…”
— “অন্তর…”
— “আজ… অনেক বছরের অপেক্ষার শুরুটা শেষ হতে চলেছে।”
সে কিছুক্ষণ ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে বলল,
— “আব্বু… তোমার আপন বড় ভাই …”
— “যাকে তুমি নিজের অভিভাবকের মতো বিশ্বাস করতে, সেই আসাদ খানই তোমার রক্তের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল।”
হিয়ার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
— “আমি আজও ভুলিনি, আমার চোখের সামনে তোমাকে যেভাবে হ/ত্যা করা হয়েছিল..আম্মুর শেষ চিৎকার..অন্তরের নিথর শরীর…”
তার কণ্ঠ কেঁপে উঠল।
— “আমি সেদিন কিছুই করতে পারিনি আমি অক্ষম ছিলাম, খুব অসহায় ছিলাম…”
হিয়া চোখজোড়া বন্ধ করল।
— “সেই অক্ষমতা আমাকে আজও প্রতিদিন পুড়িয়ে মারে।”
কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে আবার ছবিটার দিকে তাকাল। এবার তার কণ্ঠে আর কষ্ট নয়। শুধু কঠিন প্রতিজ্ঞা।
— “আজ প্রথম বিচার হবে, আব্বু। রক্তের সঙ্গে যে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে..নিজের ভাই আর তার পরিবারকে যে নি/র্ম/মভাবে হ/ত্যা করেছে…”
— “তার জন্য পৃথিবীর কোনো ক্ষমা নেই।”
হিয়া ছবিটা আলতো করে নিজের কপালে ছুঁইয়ে দিল।
— “আমি ওকে গু/লি করে মেরে ফেলব না। আমি ওকে ঠিক সেভাবেই শাস্তি দেব..যেভাবে ও তোমার, আম্মুর, আর অন্তরের জীবন কেড়ে নিয়েছিল।”
তারপর খুব নিচু স্বরে পুনরায় বলল,
— “হে আল্লাহ..আমার প্রতিশোধ নেওয়ার আগ পর্যন্ত আমাকে শুধু এতটুকু হায়াত দিন আপনি, যেহেতু সেদিন আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন তাহলে আমাকে আরো কিছুদিন বাঁচিয়ে রাখুন আপনার দয়ায়। যাতে আমার আব্বু, আম্মু আর অন্তরের মৃ/ত্যুর বিচার আমি নিজের হাতে করতে পারি।”
কথাগুলো শেষ করে হিয়া ছবিটা আবার লকারে রেখে দিল। লকার বন্ধ করল। তার চোখের শেষ কোমলতাটুকুও মিলিয়ে গেল। এখন সে শুধু— ভাইপার।
যে আজ প্রতিশোধ নিতে যাচ্ছে। তার চোখে আর কোনো দ্বিধা নেই। শুধু বরফের মতো জমাট বাঁধা ক্রোধ। ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে এক চিলতে শীতল হাসি ফুটে উঠল। সে কোমর থেকে নিজের পিস্তলটা বের করে ম্যাগাজিন খুলে আবার লাগাল।
অস্ত্রটা হাতে নিয়েই নিচু স্বরে বলল,
— “আসাদ খান..একটা ভুল তুই বহু বছর আগে করেছিলি..আজ আরেকটা করলি।”
পিস্তলের ট্রিগারের ওপর আলতো করে আঙুল বুলিয়ে নিল সে।
— “আমার আব্বু-আম্মু আর ছোট ভাইয়ের রক্ত ঝরিয়েছিস….সেই হিসাবের বিচার আজও বাকি ছিল।”
একটু থামল হিয়া। তার চোখে তখন মৃ/ত্যুর মতোই নিস্তব্ধতা।
— “কিন্তু আজ…”
— “তুই আবার আমার মানুষকে ছুঁয়েছিস।”
তার কণ্ঠ আরও নিচু হয়ে এল।
— “ইভানার গায়ে হাত তোলার সাহস হলো তোর? ওকে নিলামে তোলার কথা মুখে আনলি?”
হিয়া মাথা নিচু করে খুব আস্তে হেসে উঠল। সেই হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না। ছিল কেবল মৃত্যুর পূর্বাভাস।
— “তুই জানিস না, আসাদ খান..আমি একবার আমার পুরো পরিবারকে হারিয়েছি। তারপর থেকে নিজের মানুষ বলতে যাদের মেনেছি..তাদের দিকে কেউ চোখ তুলে তাকালেও আমি ছেড়ে দিই না।”
সে ধীরে ধীরে মাথা তুলল। চোখ দুটো লাল নয়…ভয়ঙ্করভাবে শান্ত।
— “ইভানা শুধু আমার টিমের একজন না। ও আমার কাছের মানুষ। আমার মানুষকে নিলামে তোলার সাহস দেখিয়েছিস? আজ তোকে মৃ/ত্যুর জন্যও ভিক্ষা চাইতে হবে।”
ঠিক তখনই দূর আকাশ থেকে ডানার শব্দ ভেসে এল।
ফড়ফড়…করে, সোনালি ঈগল শ্যাডো ঝাঁপিয়ে এসে নিঃশব্দে হিয়ার কাঁধে বসল। হিয়া একবার শ্যাডোর মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। তারপর দরজার বাইরে পা বাড়িয়ে ঠান্ডা কণ্ঠে বলল,
— “চল, শ্যাডো।”
— “আজ আর কাউকে হারাতে দেবো না জীবন থেকে।”
— “ইভানাকে নিয়েই ফিরব।”
এক মুহূর্ত থেমে তার ঠোঁটের কোণে আবার সেই শীতল হাসি ফুটে উঠল।
— “আর যদি সেটা না পারি..তাহলে পৃথিবী আজ দুটো লা/শ দেখবে। একটা আমার..আর আরেকটা আসাদ খানের।”
কথাটা বলেই রাতের অন্ধকারে পা বাড়াল ভাইপার।
আজ সে কোনো অপারেশনে যাচ্ছে না। আজ সে যাচ্ছে নিজের মানুষকে ফিরিয়ে আনতে এবং বহু বছরের র/ক্তঋণের শেষ বিচার করতে।
হিয়া কালো স্পোর্টস বাইকটায় উঠে বসল।
ইঞ্জিন স্টার্ট হতেই রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে গর্জে উঠল বাইকটি। এক ঝটকায় টাউন হাউস ছেড়ে লন্ডনের ফাঁকা রাস্তা ধরে ছুটে চলল হিয়া। ঠান্ডা বাতাস মুখে এসে আছড়ে পড়ছে। কিন্তু তার দৃষ্টি স্থির। মনের ভেতর কোনো দ্বিধা নেই।
কারণ এই মুহূর্তটার জন্যই সে গত সাত বছর ধরে নিজেকে তৈরি করেছে। এই সাত বছরে সে শুধু অস্ত্র চালানো, মার্শাল আর্ট কিংবা শারীরিক শক্তির প্রশিক্ষণ নেয়নি।
সে শিখেছে আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রতিটি নিয়ম। কীভাবে একটি সিন্ডিকেট কাজ করে…কীভাবে একজন ডন চিন্তা করে..কীভাবে তারা ফাঁদ পাতে…কীভাবে শত্রুকে ভাঙে…
কীভাবে শেষ মুহূর্তে চাল বদলায়…প্রতিটি বিষয় সে নিজের মস্তিষ্কে গেঁথে নিয়েছে। শুধু একজন মানুষকে বুঝতেই সে বছরের পর বছর ব্যয় করেছে।
আসাদ খান।
তার অভ্যাস…তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ধরন…রাগের সময় কী করে…কোণঠাসা হলে কোন পথ বেছে নেয়…সবকিছুই হিয়া বহু আগেই বিশ্লেষণ করে রেখেছে।
তাই আজ আসাদ কোন চাল চালতে পারে, পরের পদক্ষেপ কী হতে পারে—এসব হিয়ার কাছে নতুন নয়।
বরং…
সে অপেক্ষা করছিল ঠিক এই দিনের।
অন্যদিকে আসাদ খান এখনও একটা সত্য জানে না।
তার কাছে ভাইপার শুধু এক ভয়ংকর শত্রু। একজন রহস্যময় প্রতিদ্বন্দ্বী।
কিন্তু সে জানেই না…যে মানুষটাকে সে ডেকে আনছে।
আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ২২
যাকে হ/ত্যা করার জন্য ফাঁদ পেতেছে…সে-ই তার নিজের র*ক্ত। তার ছোট ভাইয়ের মেয়ে।
‘নূজহাত খান হিয়া’।
আর হয়তো…আজই…জীবনের শেষ মুহূর্তে দাঁড়িয়ে সে সেই সত্যটা জানতে পারবে। কিন্তু তখন…সত্য জানার জন্য অনেক দেরি হয়ে যাবে।
