আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ২৪
সাবিলা সাবি
দানিয়েল সাধারণত গম্ভীর স্বভাবের মানুষ। তার পড়ার টেবিলে সবসময়ই স্থান পায় মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার, অপরাধবিজ্ঞান কিংবা মানবমনের জটিলতা নিয়ে লেখা ভারী বই। সেসবের বাইরে অন্য কোনো জনরার প্রতি তার আগ্রহ ছিল না বললেই চলে।
লন্ডনে যাওয়ার আগে দুবাইয়ের এই সারপেন্ট পেন্টহাউসেই কেটেছে তাদের অসংখ্য বছর। সেই সময়ের স্মৃতিগুলো এখনও হাউসের প্রতিটি কোণে নিঃশব্দে ছড়িয়ে আছে। দেয়াল, করিডোর, সিঁড়ি সবকিছুর সঙ্গেই যেন জড়িয়ে আছে তাদের পুরোনো দিনের অসংখ্য মুহূর্ত।
সকালে একটা প্রয়োজনেই হঠাৎ হিয়ার রুমে ঢুকতে হলো তাকে। রুমে প্রবেশ করেই তার দৃষ্টি থেমে গেল চারপাশে।
বিছানা এলোমেলো। ড্রেসিং টেবিলের ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে বিভিন্ন জিনিস। কোথাও একটা হেয়ারব্রাশ, কোথাও পারফিউমের বোতল, আবার কোথাও কয়েকটা বই খোলা অবস্থায় পড়ে আছে। টেবিলের ওপর রাখা কাগজপত্রও যেন বহুদিন ধরে কেউ গুছিয়ে রাখেনি।
দৃশ্যটা দেখে দানিয়েলের ভ্রু কুঁচকে গেল। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সার্ভেন্টকে সংক্ষিপ্ত অথচ কঠোর কণ্ঠে বলল,
— “পুরো রুমটা ভালোভাবে গুছিয়ে রাখবে।”
— “জি, স্যার।”
সার্ভেন্ট তৎক্ষণাৎ কাজে লেগে পড়ল।
দানিয়েল বেরিয়ে যাওয়ার জন্য ঘুরতেই হঠাৎ তার চোখ পড়ল বুকশেলফের দিকে। একটি বই সামান্য বাইরে বেরিয়ে আছে। স্বভাবগত অভ্যাসে সে হাত বাড়িয়ে বইটি যথাস্থানে রাখতে গেল। কিন্তু বইটা হাতে নিতেই তার চোখ আটকে গেল পুরো বুকশেলফজুড়ে সাজানো বইগুলোর দিকে।
সে আগে কখনও হিয়ার ব্যক্তিগত বইয়ের সংগ্রহ দেখেনি। আজ প্রথমবার খেয়াল করল—শেলফজুড়ে একটিও মনস্তত্ত্ব, ক্রাইম কিংবা ক্লাসিক সাহিত্য নেই।
সারি সারি সাজানো প্রায় সব বইই ডার্ক রোমান্স জনরার। একটার পর একটা শিরোনামের দিকে তাকিয়ে দানিয়েলের কপালে সূক্ষ্ম ভাঁজ পড়ল।
এই জনরার কোনো বই সে জীবনে কখনও পড়েনি। এমনকি হাতে নিয়েও দেখেনি। কিন্তু মানুষের অজানা জিনিসের প্রতি স্বাভাবিক কৌতূহলটাই হয়তো তাকে থামিয়ে দিল। সে শেলফ থেকে সবচেয়ে মোটা, গাঢ় প্রচ্ছদের একটি বই বের করল।
কয়েক মুহূর্ত বইটির প্রচ্ছদের দিকে তাকিয়ে থেকে সেটি হাতে নিয়েই নিজের রুমে ফিরে এল। নিজের ইজি চেয়ারে বসে ধীরে ধীরে বইটির প্রথম পাতা খুলল।
বইটার নাম—“Untamed Sovereign: A Crown of BDSM & Brutal Desire.”
প্রথম কয়েকটা অধ্যায় পড়েই সে বুঝতে পারল, এটা তার পরিচিত কোনো জগত নয়। চরিত্রগুলোর তীব্র শারীরিক নিয়ন্ত্রণ, আধিপত্যের চরম রূপ আর নিষিদ্ধ কামনার রোমান্স সবকিছুই তার কাছে অচেনা।
বইটার একটা নির্দিষ্ট পাতার বর্ণনায় পড়া শুরু করতেই তার চোখ আটকে গেল—
> “তার হাতের ইস্পাতকঠিন মুঠো মেয়েটির নরম কোমরটাকে এমন নির্মম জোরে আটকে ধরেছিল, যেন তার অস্তিত্বের পুরো নিয়ন্ত্রণটুকু নিজের কুক্ষিগত করে নেওয়াটাই একমাত্র লক্ষ্য। চামড়ার চাবুকের মৃদু শাঁই শাই শব্দ আর নিঃশ্বাসের সাথে মিশে থাকা গলার কর্কট স্বরের আদেশ আর প্রতিটি ছোঁয়ায় লুকিয়ে থাকা আদিম অধিকারবোধ—সব মিলিয়ে মেয়েটির সমস্ত প্রতিরোধ মুহূর্তের মধ্যে ধূলিসাৎ হয়ে গেল। ঠোঁটের সেই হিংস্র ও ক্ষুধার্ত গ্রাসে তখন কেবলই এক তীব্র আত্মসমর্পণের আর্তনাদ!”>
বইয়ের এই কড়া আর বিবস্ত্র রোমান্স দৃশ্যগুলো পড়ার সাথে সাথেই দানিয়েলের রক্তস্রোত কোনো এক নেশায় গরম হয়ে উঠতে লাগল। তার ভেতরের পেশিগুলো টানটান হয়ে গেল এবং অবচেতনভাবেই একটা অবর্ণনীয় অস্থির শিহরণ তার পুরো শরীরকে গ্রাস করতে চাইল। একজন গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ হিসেবে সে কখনো এই ধরনের অনুভূতির মুখোমুখি হয়নি; হিয়ার কালেকশনের এই বইটা তাকে ভেতর থেকে একদম নাজেহাল করে তুলল।
পাতা উল্টাতে উল্টাতে কখন যে তার কপালে হালকা ঘাম জমেছে, সে খেয়ালই করেনি।
গলা শুকিয়ে এলে ধীরে একটা ভারী ঢোক গিলল।
বুকের ভেতরটা অস্বস্তিকর এক উত্তাপে তোলপাড় করতে লাগল। বইয়ের ভাষা, চরিত্রগুলোর তীব্র টানাপোড়েন এবং সম্পর্কের নিষিদ্ধ গভীরতা তার বহু বছরের স্থির মানসিকতায় ও পুরুষত্বে সূক্ষ্ম এক আলোড়ন তুলছিল।
কয়েক মুহূর্ত একই পাতার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সে। তারপর আর সামনে এগোতে পারল না।
ধীরে ধীরে বইটা বন্ধ করে টেবিলের ওপর রেখে দিল।
মাথাটা ইজি চেয়ারের পেছনে এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করল। বুকের ভেতর থেকে দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস বেরিয়ে এল। নিজেকেই নীরবে প্রশ্ন করল—
“হিয়া… এসব বই-ই পড়ে?”
প্রশ্নটার উত্তর তার জানা নেই। কিন্তু নিজের অস্বস্তিটা সে স্পষ্ট বুঝতে পারছিল।
সারাদিনের ধকল আর মনের ভেতর বয়ে চলা অস্থিরতা নিয়ে একসময় ইজি চেয়ারে বসেই ঘুমিয়ে পড়েছিল দানিয়েল।
চোখ দুটো ধীরে ধীরে ভারী হয়ে আসার ঠিক সেই মুহূর্তে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল বেলি ফুলের একটা মিষ্টি সুবাস।
সুবাসটা তার কাছে অপরিচিত নয়। এক মুহূর্তেই সাত বছর আগের সেই সন্ধেটা ফিরে এল তার মস্তিষ্কে।
বাসের ভেতর গুরুতর আ*হত অবস্থায় সে যখন হিয়ার কাঁধে মাথা রেখে অচেতন হয়ে পড়েছিল, তখনও তার শরীর থেকে ঠিক এই বেলি ফুলের ঘ্রাণই ভেসে আসছিল।
সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলে গেছে। এখন হিয়া পৃথিবীর সবচেয়ে দামি পারফিউম ব্যবহার করে।
তবুও সেই প্রথম দিনের বেলি ফুলের গন্ধটা আজও দানিয়েলের স্মৃতিতে অমলিন। ঠিক তখনই ধীরে ধীরে চোখ খুলল সে। তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে হিয়া।
আজ তাকে অনেকটাই অন্যরকম লাগছে। চোখের গভীর চাহনি, আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গি আর নিঃশব্দ উপস্থিতি সব মিলিয়ে তার ভেতর থেকে চোখ সরিয়ে নেওয়া অসম্ভব হয়ে উঠল।
হিয়া কোনো কথা বলল না। নিঃশব্দে এগিয়ে এসে ইজি চেয়ারের দুই হাতলের ওপর দুই পা রেখে অনায়াসে দানিয়েলের কোলের ওপর বসে পড়ল।
হঠাৎ এতটা কাছে তাকে পেয়ে দানিয়েলের শরীরের প্রতিটি পেশি শক্ত হয়ে উঠল। হিয়া নির্বিকার ভঙ্গিতে পকেট থেকে একটি সিগারেটের প্যাকেট বের করল।
নিজের ঠোঁটে একটি সিগারেট চেপে ধরার পর আরেকটি বাড়িয়ে দিল দানিয়েলের ঠোঁটের দিকে।
এরপর লাইটার বের করে প্রথমে দানিয়েলের সিগারেটে আগুন ধরিয়ে দিল। তারপর সামান্য ঝুঁকে একই আগুনের শিখায় নিজের সিগারেটটিও জ্বালিয়ে নিল।
দানিয়েল ধোঁয়া ছেড়ে নির্বাক চোখে তাকিয়ে রইল হিয়ার দিকে। হিয়া ধীরে ধীরে দীর্ঘ একটা টান দিল।
ধোঁয়াটা কিছুক্ষণ নিজের মুখে আটকে রেখে আরও একটু ঝুঁকে এল।
দানিয়েলের দৃষ্টি তখনও স্থির। অজান্তেই তার ঠোঁট সামান্য ফাঁক হয়ে গেল। সেই সুযোগেই হিয়া নিজের মুখে আটকে রাখা ধোঁয়াটা ধীরে ধীরে দানিয়েলের মুখের ভেতরে ছেড়ে দিল। নিঃশ্বাসের সঙ্গে মিশিয়ে দিল ধোঁয়া।
তারপর আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা না করে সে নিজের অধরজোড়া শক্ত ও ক্ষুধার্ত গ্রাসে সজোরে বসিয়ে দিল দানিয়েলের অধরে। সেই চুম্বন ছিল উগ্র, বন্য এবং সমস্ত সীমানা ছাড়িয়ে যাওয়ার এক তীব্র ঘোষণার মতোই।
দানিয়েলের বহু বছরের যত্ন করে রাখা সংযম সেই গভীর আক্রমণাত্মক ছোঁয়ায় এক নিমিষেই ধূলিসাৎ হয়ে গেল। সে আর নিজেকে আটকে রাখতে না পেরে উন্মত্তের মতো সেই চুম্বনে সাড়া দিতে শুরু করল, মনে হলো অবরুদ্ধ এক ক্ষুধা এতদিন পর তার সর্বস্ব গ্রাস করতে চাইছে।
ঠিক তখনই হিয়া সেই গভীর চুম্বনের মাঝে হঠাৎ করে দানিয়েলের ঠোঁটে দন্ত বসিয়ে একটা হিং/স্র কামড় দিল। তীক্ষ্ণ সেই অনুভূতিতে দানিয়েলের চোখের পাতা হঠাৎ খুলে গেল। সে হাঁপাতে শুরু করল।
তার বুক দ্রুত ওঠানামা করছে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে চারপাশে তাকিয়ে রইল সে।
তারপর ধীরে ধীরে বুঝতে পারল এতক্ষণ যা কিছু অনুভব করেছে, সবটাই ছিল একটা স্বপ্ন।
গত সাত বছরে এই প্রথমবার হিয়াকে নিয়ে এমন একটি স্বপ্ন দেখল সে, যা তার বহু বছরের স্থিরতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ আর মানসিক ভারসাম্যকে এক মুহূর্তের জন্য হলেও গভীরভাবে নাড়া দিয়ে গেল।
দানিয়েল আর এক মুহূর্তও সেখানে বসে রইল না।
ঝটপট উঠে সোজা নিজের বাথরুমে ঢুকে গেল।
কল খুলে সে বরফ-ঠান্ডা পানির ধারার নিচে দাঁড়িয়ে পড়ল। হিমশীতল পানি মাথার ওপর দিয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল। তার ভেজা চুল কপালের ওপর লেপ্টে গেল। পানির তীব্র ঠান্ডা স্রোত তার মাথার ভেতরের সমস্ত উত্তাপ নিমেষেই ধুয়ে মুছে দিতে চাইল, কিন্তু বুকের ভেতর বয়ে চলা সেই অচেনা ঝড়তো কিছুতেই থামতে চাইছিল না।
সে দুই হাত বাথরুমের দেয়ালে চেপে ধরে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। পানির ফোঁটাগুলো তার পেন্সিলের মতো শার্প চোয়াল, ঘাড় আর শরীর বেয়ে নিচে নেমে যাচ্ছে। সে চোয়াল শক্ত করল।
“কী হচ্ছে এসব?” সেই স্বপ্নটার কথা মনে পড়তেই সে দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে মনে মনে ধিক্কার দিতে লাগল।
হিয়া সম্পর্কে তার ধারণার কোনো স্পষ্ট ভিত্তি নেই, অথচ সেই মেয়েটাকে নিয়ে এমন বন্য, অবচেতন এবং প্রলয়সৃষ্টিকারী একটা স্বপ্ন সে কীভাবে দেখল? তার মতো একজন ঠান্ডা মাথার, গম্ভীর মানুষ কোনো অন্ধ আবেগের বশে এমন একটা স্বপ্ন দেখবে এটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না সে। হিয়া আসলে কী ভাবে তাকে নিয়ে বা তার মনের গভীরে ঠিক কী চলে, তা পরিষ্কার না জেনে তাকে নিয়ে এ ধরনের অবচেতন উত্তেজনায় ভেসে যাওয়াটা ভীষণ অন্যায় হয়েছে। তাহলে এমন এক অনুভূতিতে ভেসে যাওয়ার অধিকারই বা সে কোথায় পেল?
ঠান্ডা পানির নিচে দাঁড়িয়ে চোয়াল শক্ত করে সে নিজেকে বারবার শাসাতে লাগল এই ভুল যেন জীবনে আর কখনো না হয়।
লন্ডন, যুক্তরাজ্য
রাত তখন প্রায় গভীর।
লন্ডনের ব্যস্ত শহর অনেক আগেই রাতের নিস্তব্ধতায় ডুবে গেছে। দূরের রাস্তার বাতিগুলো কুয়াশার আস্তরণ ভেদ করে ম্লান আলো ছড়াচ্ছে।
শহরের কোলাহল থেকে বহু দূরে, পরিত্যক্ত একটি পুরোনো গুদামঘর অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে।
চারপাশে নীরবতা। শুধু মাঝে মাঝে বাতাসে টিনের ছাদ কেঁপে উঠছে। গুদামঘরের ভেতরেও অস্বাভাবিক নীরবতা। সারি সারি মরচে ধরা কনটেইনারের মাঝখানে কয়েকজন সশস্ত্র লোক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
সবার চোখে সতর্কতা। হাতে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র।
একপাশে একটি লোহার চেয়ারে বসে আছে ইভানা।
তার দুই হাত পেছনে বাঁধা। মুখের একপাশে আঘাতের চিহ্ন। ঠোঁটের কোণে শুকিয়ে যাওয়া রক্ত। তবুও চোখে ভয়ের চেয়ে বেশি ছিল একরাশ জেদ। তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি সিগারেটের ছাই ঝেড়ে মাটিতে ফেলল।
— “তোর মিস্ট্রেস আসবে তো?”
ইভানা কোনো উত্তর দিল না। লোকটি আবার হাসল।
— “নাকি তোকে এখানেই ফেলে রেখে পালিয়ে গেছে?”
ইভানা ধীরে ধীরে মাথা তুলল। তারচোখে তীব্র অবজ্ঞা।
“তোরা ভাইপারকে চিনিসই না।”
লোকটি ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
“কী বললি?”
ইভানার ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি ফুটল।
“যাকে তোরা আসতে বাধ্য করছিস বলে ভাবছিস…”
সে ধীরে ধীরে বলল, “সে আসবে। তবে বাধ্য হয়ে নয়।”
তার চোখে এবার দৃঢ়তা আরও স্পষ্ট “সে আসছে কারণ তোদের শেষটা নিজের হাতে করবে বলে।”
লোকটি কিছু বলার আগেই দূরে কোথাও একটা ইঞ্জিনের শব্দ ভেসে এল। গুদামঘরের ভেতরের সবাই মুহূর্তেই সতর্ক হয়ে উঠল। ইঞ্জিনের শব্দ ধীরে ধীরে কাছে আসতে লাগল।
তারপর— এক ঝটকায় শব্দটা থেমে গেল। পুরো গুদামঘর আবার নীরব। কয়েক সেকেন্ড কেটে গেল।
একজন গার্ড ফিসফিস করে বলল,
— “বসকে খবর দিন।”
আরেকজন অস্ত্র শক্ত করে ধরল। ঠিক তখনই গুদামঘরের বিশাল লোহার দরজার বাইরে একটা ছায়া দেখা গেল। ধীরে ধীরে সেই ছায়া এগিয়ে এল।
কালো পোশাক। কালো বুট। কাঁধে ঝুলছে কালো জ্যাকেট। আর হাতে কোনো অস্ত্র নেই।
দরজার সামনে এসে হিয়া থেমে গেল। তার মুখ সম্পূর্ণ শান্ত। চোখ দুটো স্থির। যেন সামনে কয়েক ডজন সশস্ত্র মানুষ নয়, বরং কোনো সাধারণ সাক্ষাতের জন্য এসেছে সে।
একজন গার্ড এগিয়ে এসে চিৎকার করে উঠল,
— “হাত ওপরে তোল!”
হিয়া সামান্য থামল। পরক্ষণেই ধীরে ধীরে দুই হাত ওপরে তুলল। তার অধরের কোণে খুব ক্ষীণ একটা হাসি ফুটে উঠল।
“ইভানা কোথায়?”
লোকটি ঠান্ডা গলায় বলল,
“আগে অস্ত্রগুলো বের করে মাটিতে রাখ।”
হিয়া কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে কোমর থেকে পিস্তল বের করে মাটিতে ফেলে দিল। এরপর উরুর পাশ থেকে কমব্যাট নাইফটাও খুলে ছুড়ে দিল।
একজন গার্ড এগিয়ে এসে তার শরীর তল্লাশি করল।
কিছুই পেল না। সে ফিরে গিয়ে মাথা নাড়ল।
— “ক্লিয়ার।”
হিয়া ধীরে ধীরে ভেতরে প্রবেশ করল। প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল মেপে নেওয়া। তার চোখ একবারও চারপাশের অস্ত্রধারীদের ওপর স্থির হলো না। সে শুধু খুঁজছিল একজনকে। অবশেষে তার চোখ ইভানার ওপর গিয়ে থামল। ইভানাও হিয়াকে দেখতে পেল। তার চোখ মুহূর্তেই ভিজে উঠল।
— “মিস্ট্রেস…”
হিয়ার মুখের কঠোরতা এক মুহূর্তের জন্য নরম হয়ে গেল। সে খুব শান্ত স্বরে বলল,
“আমি এসেছি, ইভানা।”
ইভানা মাথা নাড়ল। “আপনার এখানে আসা উচিত ছিল না…”
হিয়া ধীরে ধীরে তার দিকে তাকিয়ে বলল, “তোকে রেখে চলে যাওয়া আমার অভিধানে নেই।”
ঠিক তখনই—
অন্ধকারের ভেতর থেকে ভেসে এল একটি পরিচিত হাসি।
“আমি জানতাম…”
একটু বিরতি নিয়ে বললো ।
“তুই আসবিই, ভাইপার।”
হিয়ার চোখ ধীরে ধীরে সেই শব্দের উৎসের দিকে উঠল। গুদামঘরের দ্বিতীয় তলার লোহার সিঁড়ির ওপর দাঁড়িয়ে আছে একজন মানুষ।
কালো কোট পরিহিত।হাতে সিগার ধরা। চোখে নির্মম আত্মবিশ্বাস।
আসাদ খান।
সে ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে শুরু করল।
প্রতিটি ধাপের সঙ্গে তার ঠোঁটের হাসি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। হিয়া একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
সাত বছর ধরে যে মানুষটার নাম তার বুকের ভেতর আগুনের মতো জ্বলছে আজ সে মানুষটা অবশেষে আবার তার সামনে। এত কাছে।
আসাদ খান শেষ ধাপটায় এসে থামল। সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে হেসে বলল,
— “স্বাগতম, ভাইপার।”
হিয়া কোনো উত্তর দিল না। শুধু তার চোখে ধীরে ধীরে এমন এক শীতলতা নেমে এল, যেটা দেখে মনে হলো—
আজকের রাতটা আসাদ খানের জন্য আর সাধারণ কোনো রাত নয়।
আসাদ ধীরে ধীরে হিয়ার সামনে এসে দাঁড়াল। কয়েক মুহূর্ত তার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে বলল,
“একটা বিষয় কিছুতেই বুঝতে পারছি না, ভাইপার।”
হিয়া নীরবে তাকিয়ে রইল।
আসাদ আবার বলল,
“আমার চালান একের পর এক আটকে দিচ্ছিস কেন?”
কণ্ঠে এবার বিরক্তি স্পষ্ট।
“আমার ব্যবসায় নাক গলাচ্ছিস, আমার লোকজনদের মেরে ফেলছিস। এমনকি আমার নারী পাচারের খবর পর্যন্ত নিউজে এক্সপোজ করে দিয়েছিস।”
সে আরও কাছে এগিয়ে এল।
“কিসের এত শত্রুতা আমার সঙ্গে তোর?”
হিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর শান্ত গলায় বলল,
— “শত্রুতা?”
আসাদ ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
হিয়া ধীরে ধীরে বলল, “না, আসাদ খান। এটাকে শত্রুতা বলো না।”
তার চোখের দৃষ্টি মুহূর্তেই কঠিন হয়ে উঠল।
“এটাকে কর্মফল বল।”
আসাদের মুখের হাসি কিছুটা ম্লান হলো।
“কর্মফল?”
“হ্যাঁ।” হিয়া এক পা এগিয়ে এল।
“মানুষ যা করে, তার হিসাব একদিন না একদিন তাকে দিতেই হয়।”
হিয়ার কণ্ঠে কোনো উত্তেজনা নেই। শুধু স্থিরতা।
“কেউ আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে দেয়। কেউ নিজের বিবেকের কাছে, আর কেউ কেউ… আমার মতো কারও হাতে সেই হিসাবটা ফিরে পায়।”
আসাদ খান ঠান্ডা গলায় হেসে উঠল “বেশ বড় বড় কথা বলছিস।”
“বড় কথা নয়।” হিয়ার চোখে আগুন জ্বলে উঠল।
“হিসাবের কথা বলছি।” সে একে একে বলতে লাগল—
“যে মানুষগুলোর জীবন তুই ধ্বংস করেছিস, তাদের হিসাব।”
“যেসব মেয়েকে মিথ্যা স্বপ্ন দেখিয়ে নিজের ব্যবসার অংশ বানিয়েছিস, তাদের হিসাব।”
“যেসব পরিবারকে নিঃস্ব করেছিস, তাদের হিসাব।”
“যাদের জীবন থেকে তাদের প্রিয় মানুষগুলোকে কেড়ে নিয়েছিস, তাদের হিসাব।”
আসাদের মুখের ভাব ধীরে ধীরে বদলে গেল।
হিয়া থামল না। তখনও
“তোর নারী পাচারের নেটওয়ার্কে কতজন মানুষ জড়িত, আমি জানি।”
“কোন পথে তোর চালান যায়, আমি জানি।”
“কোন লোক তোর হয়ে কাজ করে, আমি জানি।”
“কোন ব্যবসার আড়ালে তুই নিজের আসল কাজ চালাস, সেটাও জানি।”
আসাদ এবার স্থির হয়ে গেল।
হিয়া ধীরে ধীরে আরো বল চোখে তীব্র বিদ্রূপ নিয়ে।
— “তুই ভেবেছিলি টাকা আর ক্ষমতা দিয়ে সবকিছু চাপা দিয়ে রাখতে পারবি। কিন্তু একটা জিনিস ভুলে গিয়েছিলি।”
আসাদ তাকিয়ে রইল।
“কর্মফল কখনো ঘুষ নেয় না।”
কয়েক মুহূর্ত গুদামঘরে নিস্তব্ধতা নেমে এল। আসাদ এবার হিয়াকে নতুন করে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল।
তার চোখে আগের রাগের সঙ্গে এবার যোগ হলো সন্দেহ।
“তুই তো দেখছি আমার সব খবরই জানিস।”
হিয়া কোনো উত্তর দিল না।
আসাদ আরও এক পা এগিয়ে এল।
“আমার চালানের খবর, আমার লোকজনের খবর, আমার ব্যবসার খবর… এমনকি আমার গোপন কাজগুলোর খবরও।”
তার চোখ সরু হয়ে এল। “এত কিছু তুই জানিস কীভাবে?”
হিয়া নীরবে শধু তাকিয়ে রইল। আসাদের কণ্ঠ এবার আরও নিচু হলো। “কে তুই?”
হিয়া আসাদের চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল একটুখানি শীতল হাসি। “ধরে নে, তোর যম তোর জান কবজ করতে এসেছে।”
একটু থেমে বলল, “তোর মৃ/ত্যুর কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেছে।”
হিয়ার চোখের দৃষ্টি আরও কঠিন হলো। ঠোঁটে আবার অদ্ভুত হাসি ফুটল।
“আমি কে, সেটা তুই জানবি। তবে মরার কয়েক সেকেন্ড আগে।”
আসাদ কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর হঠাৎ হেসে উঠে বললো
“তুই কি রোবট নাকি?”
তার হাসির মধ্যে স্পষ্ট তাচ্ছিল্য।
“একা এসেছিস। নিজের সব অস্ত্র আমার লোকদের কাছে জমা দিয়েছিস। তোর চোখের সামনে আমার লোকজন দাঁড়িয়ে আছে। আর তোর মানুষ এখনো আমার হাতে বন্দি।”
আসাদ ধীরে ধীরে হিয়ার চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে আবার তার দিকে তাকাল।
“তারপরও তুই আমাকে মরার হুমকি দিচ্ছিস?”
হিয়া একটুও বিচলিত হলো না। “হুমকি দিচ্ছি?”
তার ঠোঁটে আবারও সেই স্থির হাসি ফুটে উঠল।
“তোর মৃত্যুতো আল্লাহ আমার হাতেই লিখে রেখেছেন।”
এক মুহূর্তের জন্য তার কণ্ঠ আরও দৃঢ় হয়ে উঠল।
“আর তুই মারা না যাওয়া পর্যন্ত আমি মরব না।”
আসাদের চোখে এবার কৌতুকের সঙ্গে নির্মমতা মিশে গেল। সে ধীরে ধীরে হিয়ার সামনে এসে দাঁড়াল।
“তোকে মারতে আমার এক সেকেন্ডও লাগবে না।”
তার কণ্ঠ নিচু, কিন্তু প্রতিটি শব্দে রয়েছে হুমকির ধার।
“কারণ আমি কত বড় শয়তান, সে সম্পর্কে তোর কোনো ধারণাই নেই।”
আসাদ সামান্য ঝুঁকে হিয়ার চোখের দিকে তাকাল।
তার ঠোঁটে নিষ্ঠুর হাসি ফুটল।
“তুই আমার এত হিসাব রেখেছিস, তাই না? তাহলে এটাও শুনে রাখ। আসাদ খানের স্বার্থে আঘাত লাগলে সে কাউকে ছাড়ে না।”
তার কণ্ঠ আরও কঠিন হয়ে উঠল “নিজের আপন ভাই, ভাতিজি, ভাতিজা—এমনকি তাদের পুরো পরিবারকেও শেষ করে দিতে পারে যে মানুষ…”
আসাদ কয়েক সেকেন্ড থামল। তারপর ঠান্ডা চোখে হিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, “তার কাছে তুই কে?”
কথাটা হিয়ার বুকের কোথাও গিয়ে যেন আঘাত করল।
আসাদ তখনও জানত না, সে নিজের মুখেই নিজের মৃত্যুর দরজা খুলে দিয়েছে। হিয়ার চোখের ভেতরের শান্তিটা ধীরে ধীরে বদলে যেতে লাগল।
আসাদ হঠাৎ বলল, “তোকে তো একটা কথা বলা হয়নি।”
হিয়া ভ্রু কুঁচকে তাকাল। আসাদ কয়েক মুহূর্ত তার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
“তুই দেখতে হুবহু আমার ভাতিজির মতো।”
কথাটা শুনেই হিয়ার চোখের দৃষ্টি মুহূর্তে বদলে গেল।
আসাদ ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,— “তবে স্বভাবে তোদের দুজনের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য।”
একটু থেমে সে নির্বিকার ভঙ্গিতে যোগ করল,ৎ“ও তো অনেক আগেই মরে গেছে। এখন কবরেই ঘুমাচ্ছে।”
হিয়ার ভেতরে এক মুহূর্তে আগুন জ্বলে উঠল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। হাতের মুঠো শক্ত হলো।চোখের ভেতর জমে থাকা আগুন আরও গভীর হয়ে উঠল। কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল।
তার চোখ ইভানার দিকে গেল তারপর খুব ধীরে বলল, “আমাকে আসতে বলেছিলি। আমি এসেছি।”
পুনরায় আসাদ খানের দিকে তাকালো। বরফের মতো ঠান্ডা কন্ঠে বললো
“তোর শত্রুতা আমার সঙ্গে। ইভানাকে যেতে দে।”
আসাদ সঙ্গে সঙ্গে হেসে উঠল। “নো ওয়ে।”
কথাটা বলেই ইভানার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমার চালানের ওপর হামলায় ওই তো তোর সঙ্গে ছিল, তাই না?”
সে আবার হিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, “তাহলে এই বান্দির বাচ্চাটাকে এত সহজে ছেড়ে দেব?”
হিয়ার চোখ এবার আরও কঠিন হয়ে উঠল।
“আমি শেষবারের মতো বলছি, আসাদ খান।”
একটু থেমে বলল “ইভানাকে যেতে দে।”
আসাদ খান কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে হেসে উঠল।
“ঠিক আছে।”
সে হাতের সিগারেটটা মাটিতে ফেলে জুতোর নিচে পিষে দিল। তারপর ঠান্ডা গলায় বলল,
“তাহলে আগে হাঁটু গেড়ে বস।”
হিয়া স্থির চোখে তাকিয়ে রইল।
আসাদ খান বলল, “আমার সামনে মাথা নিচু করে হাঁটু গেড়ে বসবি। তারপর ওকে ছেড়ে দেব।”
কয়েক সেকেন্ড সবকিছু থমকে রইল। হিয়া ধীরে ধীরে এক পা পিছিয়ে গেল। আসাদের চোখে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। সে ভাবল—অবশেষে ভাইপার তার সামনে মাথা নত করেছে।
কিন্তু সে জানত না, শিকার যখন নিজেই মাথা নিচু করে, তখন অনেক সময় সেটা আত্মসমর্পণের জন্য নয়—আঘাতের সঠিক মুহূর্তটা বেছে নেওয়ার জন্য।
হিয়া খুব ধীরে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। মাথাটাও সামান্য নিচু করল। আসাদের ঠোঁটে বিজয়ের হাসি ফুটে উঠল।
আর ঠিক পরের মুহূর্তেই—হিয়া বিদ্যুতের গতিতে সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ল। চারপাশের লোকজন কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে তাদের ওপর হামলে পড়ল।
মুহূর্তের মধ্যে গুদামঘরের নীরবতা ভেঙে গেল সংঘর্ষের শব্দে। হিয়া নিজের জুতোর ভেতর থেকে লুকিয়ে রাখা ছু/রিটা বের করে নিল। কাছের লোকটির দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে মাটিতে ফেলে দিল।
পরপর কয়েকজন তার দিকে এগিয়ে আসতেই হিয়া ঘুরে দাঁড়িয়ে একের পর এক আঘাত করতে লাগল।
এরপর জ্যাকেটের ভেতরের হিডেন পকেট থেকে পি*স্তল বের করে নিতেই পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠল। চারদিক থেকে লোকজন ছুটে এল।
গুদামঘরের ভেতর শুরু হলো তীব্র সংঘর্ষ। হিয়ার শ্বাস দ্রুত হয়ে আসছিল। তবুও তার চোখের দৃষ্টি একটুও টলছিল না। একজন সামনে থেকে এগিয়ে এলে সে পাশ কাটিয়ে গেল। আরেকজন পেছন থেকে আসতেই মুহূর্তের মধ্যে ঘুরে দাঁড়াল। প্রশিক্ষিত শরীর যেন প্রতিটি আ*ক্রমণের আগেই পরবর্তী চালটা বুঝে ফেলছিল।
একসময় তার সামনে এগারোজন লোক নিস্তেজ হয়ে মাটিতে পড়ে রইল। আসাদ কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে সেই দৃশ্য দেখল। তার চোখে বিস্ময় ফুটে উঠলেও পরক্ষণেই ঠোঁটে হাসি ফিরে এল।
কারণ সে জানত—এখনও তার আসল লোকজন আসেনি।
ঠিক তখনই গুদামঘরের অন্য প্রান্ত থেকে ভারী পায়ের শব্দ শোনা গেল। একসঙ্গে কয়েকজন বিশালদেহী লোক ভেতরে ঢুকে পড়ল। প্রত্যেকের শরীর যেন পাথর দিয়ে গড়া।
আসাদ তাদের দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল,
“ভাইপারকে মেরে ফেলো না।”
তার ঠোঁটে ধীরে ধীরে নিষ্ঠুর হাসি ফুটে উঠল।
“তিলে তিলে মারবে।”
পরের মুহূর্তেই লোকগুলো হিয়ার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
হিয়া প্রতিরোধ করার চেষ্টা করল। কিন্তু এবার প্রতিপক্ষের শক্তি অনেক বেশি। একজনের আঘাতে তার শরীর ছিটকে গিয়ে মেঝেতে পড়ল।
ঠোঁটের কোণে র/ক্ত জমল। সে হাতের তালু দিয়ে মেঝে ঠেলে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল।
আরেকটি আঘাত এসে লাগল তার শরীরে। হিয়া কয়েক পা পিছিয়ে গেল। নাক ও মুখ দিয়ে র/ক্ত গড়িয়ে পড়তে শুরু করল। এক পায়ে প্রচণ্ড আঘাত লেগেছে। পা পুরোপুরি ভর নিতে পারছে না।
তবুও সে দাঁড়িয়ে রইল। দূরে বাঁধা ইভানা সবকিছু দেখছিল। হিয়ার ওপর একের পর এক আঘাত পড়তে দেখে সে নিজের সর্বশক্তি দিয়ে হাতের বাঁধন খুলতে চেষ্টা করতে লাগল। দড়িটা প্রচণ্ড শক্ত। তার কবজিতে ঘষা লেগে চামড়া উঠে যাচ্ছে। তবুও ইভানা থামল না।
কারণ সে জানত হিয়াকে বাঁচাতে হলে তাকে নিজেকেই মুক্ত হতে হবে।
হিয়া খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রইল। শরীরের প্রতিটি অংশ ব্যথায় অবশ হয়ে গেলো। কিন্তু তার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে তিনটে মুখ।
তার বাবা। তার মা। তার ছোট ভাই।
হঠাৎ আসাদের কথাটা আবার কানে বাজল “নিজের আপন ভাই আর তার পরিবারকে যে মানুষ মেরে ফেলতে পারে, তার কাছে তুই কে?”
হিয়ার বুকের ভেতরটা আবার জ্বলে উঠল। সে ধীরে ধীরে মাথা তুলল। চোখের পানি আর র/ক্ত মিশে মুখ বেয়ে নামছে। কিন্তু তার চোখে এখন আর দুর্বলতা নেই।
আছে শুধু ক্রোধ। হিয়া গভীর একটা শ্বাস নিল।
তারপর আবার দাঁড়িয়ে গেল। সামনে থাকা লোকগুলো এবার তাকে ঘিরে ফেলেছে। হিয়া সরাসরি শক্তির সঙ্গে শক্তির লড়াইয়ে গেল না। দ্রুত পা সরিয়ে প্রতিপক্ষের আক্রমণ এড়িয়ে গেল। একজন পিছন থেকে ঝাঁপিয়ে পড়তেই হিয়া নিচু হয়ে তার আক্রমণ এড়িয়ে গেল।
তারপর পাশের ঝুলন্ত মোটা দড়িটা শক্ত করে ধরে ফেলল। এক ঝটকায় দড়ির সাহায্যে শরীরটা ওপরে তুলে নিল সে। দেয়ালের দিকে পা ঠেকিয়ে শরীর ঘুরিয়ে দিল। লোকগুলো কিছু বুঝে ওঠার আগেই হিয়া উল্টো ভঙ্গিতে দড়ি বেয়ে নেমে এসে একজনকে মাটিতে ফেলে দিল। আরেকজন এগিয়ে আসতেই দড়িটা ব্যবহার করে পাশ কাটিয়ে গেল।দেয়াল, দড়ি, মেঝে—গুদামঘরের প্রতিটি জিনিসকেই হিয়া নিজের কৌশলের অংশ বানিয়ে ফেলল।
একজনের পর একজন তার সামনে এসে পড়ছে।
আর হিয়া—আ*ঘাতপ্রাপ্ত, র*ক্তাক্ত, খুঁড়িয়ে চলা অবস্থাতেও একেকজনকে নিজের প্রশিক্ষিত কৌশলে কাবু করে যাচ্ছে।
দূর থেকে আসাদ খান নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইল। এই মেয়েটা এতক্ষণ পর্যন্ত তার চোখে শুধু একজন দুঃসাহসী শত্রু ছিল। কিন্তু এখন প্রথমবার তার মনে হলো ভাইপারকে সে যতটা সহজ ভেবেছিল, আসলে সে তার চেয়েও অনেক বেশি বিপজ্জনক।
সামনে থাকা বিশালদেহী লোকগুলো আবার একসঙ্গে তার দিকে এগিয়ে এল। হিয়া এবার আর পিছিয়ে গেল না। নিজের শরীরের শেষ শক্তিটুকু একত্র করে সে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। একজনের আঘাত এড়িয়ে তার ভারসাম্য নষ্ট করে দিল।
আরেকজনকে ঘুরে পাশ কাটিয়ে মাটিতে ফেলে দিল।
তৃতীয়জন এগিয়ে আসতেই তার আক্রমণ প্রতিহত করে তাকে কাবু করল। একজনের পর একজন। শেষ পর্যন্ত পাঁচজন বিশালদেহী মানুষও হিয়ার সামনে টিকতে পারল না। গুদামঘরের মেঝেতে একে একে তারা নিস্তেজ হয়ে পড়ে রইল।
আসাদ খান কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল।
তারপর দ্রুত পকেট থেকে ফোন বের করল।
সম্ভবত কাউকে নির্দেশ দেওয়ার জন্য।
কিন্তু সে কাউকে কোনো সংকেত দেওয়ার আগেই হিয়া ছুটে এসে তার সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ল এক মুহূর্তের মধ্যে তার পা উঠে গেল। সজোরে লাথি আসাদ খানের বুকে লাগতেই সে কয়েক পা পিছিয়ে গেল।
হিয়া সঙ্গে সঙ্গে তার হাত থেকে ফোনটা ছিনিয়ে নিল।
পরের মুহূর্তেই আসাদকে মাটিতে ফেলে তার বুকের ওপর পা রেখে দাঁড়াল। আসাদ কিছু বুঝে ওঠার আগেই হিয়া পাশ থেকে পড়ে থাকা ধারালো অস্ত্রটা তুলে নিল। তার চোখে তখন শুধু একটাই আগুন—
প্রতিশোধের আগুন।
আসাদ খানের মুখের আত্মবিশ্বাস প্রথমবারের মতো ভেঙে গেল। হিয়া অস্ত্রটা শক্ত করে ধরে তার ডান হাতটায় প্রথম একটা কোপ বসালো।
আসাদ যন্ত্রণায় চিৎকার করে কেঁপে উঠল। দরদর করে র/ক্ত বের হলো প্রায় হাত কেটে ঝুঁলে পড়েছে।
আর হিয়া দাঁড়িয়ে রইল তার বুকের ওপর পারা দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো। চোখে কোনো ভয় নেই। কোনো দ্বিধা নেই। শুধু জমে থাকা অগণিত বছরের ক্রোধ।
আসাদ তখন আর আগের সেই দম্ভ দেখাতে পারল না।
হিয়ার পায়ের নিচে পড়ে থাকা অবস্থায় কাঁপতে কাঁপতে বলল, “তুই কী চাস? বল আমাকে। আমি তোকে সব দেব। যা চাইবি, সব দেব। আমাকে ছেড়ে দে… প্লিজ, আমাকে মারিস না।”
হিয়ার চোখে কোনো মায়া দেখা গেল না। সে ধীরে ধীরে নিচু হয়ে আসাদের মুখের দিকে তাকাল।
“জীবন ভিক্ষা চাইছিস?”
তার কণ্ঠে তীব্র বিদ্রূপ ঝড়ে পড়লো। “জীবন?”
হিয়ার চোখের সামনে আবার ভেসে উঠল সেই পুরোনো দৃশ্য। তার বাবার মুখ। তার মায়ের মুখ। তার ছোট ভাইয়ের মুখ। তারপর সেই দিনটা।
হিয়া ধীরে ধীরে বলল,
“আমার আব্বুও তো তোর কাছে আমাদের জীবন ভিক্ষা চেয়েছিল।”
এক মুহূর্ত থেমে সে বলল, “দিয়েছিলি?”
আসাদ খান হঠাৎ থমকে গেল। তার চোখে স্পষ্ট বিস্ময়। সে অবাক হয়ে কাপা কাপা গলায় জিজ্ঞেস করলো “মানে…?”
হিয়া ধীরে ধীরে তার দিকে ঝুঁকে এল। ঠোঁটে ফুটে উঠল এক নির্মম হাসি।
“তোকে বলেছিলাম না?”
তার চোখের দৃষ্টি আরও কঠিন হয়ে উঠল। “আমি কে, সেটা তুই জানবি…”
একটু থেমে বলল, “মরার কয়েক সেকেন্ড আগে।”
কথাটা শেষ করেই হিয়া আসাদ খানের অন্য আরেকটা হাতেও কোপ মারলো। তারপর বুকের মধ্যে আর পায়ের মধ্যে ইচ্ছেমত কো*প মারলো।
আসাদ যন্ত্রণায় গগনবিদারী চিৎকার করে উঠল।
হিয়া থামল না। তার বহু বছরের জমে থাকা প্রতিশোধ আজ কোনো বাঁধ মানবে না।
আসাদের শরীর ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে আসছিল।
মেঝের চারপাশে র*ক্ত ছড়িয়ে পড়েছে। হিয়া শেষবারের মতো তার কলার চেপে ধরে তাকে নিজের দিকে টেনে আনল। তার মুখ আসাদের মুখের একেবারে কাছে। তারপর খুব ধীরে বলল,
“আমি নূজহাত খান হিয়া।”
একটু থেমে আবার বললো “সিআইডি অফিসার ইশতিয়াক খানের মেয়ে।”
হিয়ার চোখ সরাসরি আসাদের চোখে স্থির।
“শুনতে পাচ্ছিস?”
আসাদের ঠোঁট কাঁপল। গলা থেকে কষ্টসাধ্য একটা শব্দ বেরিয়ে এল, “হিয়া…?”
তার চোখে অবিশ্বাস “তুই… বেঁচে আছিস?”
হিয়া শান্ত গলায় বলল, “হ্যাঁ।”
তার চোখে জমে থাকা সমস্ত ঘৃণা একসঙ্গে প্রকাশ পেল। “বেঁচে আছি।”
এক মুহূর্ত থেমে বলল, “শুধু তোদের শেষ করার জন্য বেঁচে আছি।”
আসাদের চোখ ধীরে ধীরে ভারী হয়ে আসছিল।
মৃত্যুর কো/লে ঢলে পড়ার আগে তার চোখের সামনে হঠাৎ ভেসে উঠল সেই দিনটা।
সেই দিন…
যেদিন সবকিছুর শুরু হয়েছিল।
জানুয়ারি মাস
দীর্ঘ এক মাস পর ইশতিয়াক খান বাড়িতে ফিরেছিল।
এক মাস ধরে তার কোনো খোঁজ ছিল না।
হিয়া আর তার ছোট ভাই অয়ন প্রতিদিন অপেক্ষা করত তাদের আব্বুর জন্য।
তারা জানত, ইশতিয়াক খান আন্ডারওয়ার্ল্ডের একজন ডিটেকটিভ হিসেবে কাজ করতে গেছেন। কিন্তু কাজের কারণে এত দীর্ঘ সময় বাবার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ না থাকায় তাদের মনে প্রতিদিনই এক ধরনের অস্থিরতা জমে উঠেছিল।
তবু সেদিন যখন দরজার সামনে বাবাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিল তারা, সেই মুহূর্তে যেন এক মাসের সব অপেক্ষা, দুশ্চিন্তা আর অভিমান একসঙ্গে আনন্দে বদলে গিয়েছিল।
সেই রাতটা ছিল পরিবারের জন্য দীর্ঘদিন পর পাওয়া এক টুকরো শান্তি। সবাই একসঙ্গে খাবার টেবিলে বসেছিল। ইশতিয়াক খান ফিরে এসেছে—এই আনন্দে পুরো বাড়িটাই বদলে গিয়েছিল।
ফারহানা খান খেতে খেতেই জিজ্ঞেস করলেন,
“মিশন কেমন হলো? এতদিন কোথায় ছিলে? কিছু বললে তো না?”
প্রশ্নটা শুনতেই ইশতিয়াক খানের মুখের হাসি মুহূর্তের জন্য ম্লান হয়ে গেল। সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল, “সব বলব।”
কয়েক সেকেন্ড সবার দিকে তাকিয়ে ধীর কণ্ঠে যোগ করল, “তবে আজ না। কালকে তোমরা নিজের চোখেই সবটা দেখতে পারবে।”
কথাটার মধ্যে এমন কিছু ছিল, যা মুহূর্তের জন্য পরিবেশটাকে ভারী করে তুলেছিল। কিন্তু ইশতিয়াক খান আর কিছু বললেন না। তারপর আবার সবাই নিজেদের মধ্যে গল্পে মেতে উঠল।
আব্বু ফিরে এসেছে এই আনন্দে সেদিনের খাবারটাও অন্যরকম মনে হচ্ছিল। খাওয়া শেষে সবাই একসঙ্গে বসে অনেকক্ষণ গল্প করল। এক মাসে কে কী করেছে, কে কী মিস করেছে সবকিছুই একে একে ইশতিয়াক খানকে বলতে লাগল তারা।
হিয়া আর অয়নের তো কথার শেষই হচ্ছিল না।
এতদিন পর আব্বুকে কাছে পেয়ে জমে থাকা সমস্ত গল্প এক রাতেই বলে শেষ করতে চাইছিল তারা।
একপর্যায়ে ইশতিয়াক খান হাসতে হাসতে বললেন,
— “কয়েকদিনের মধ্যেই তোমাদের সবাইকে নিয়ে দূরে কোথাও ঘুরতে যাব।”
কথাটা শুনেই হিয়া আর অয়নের চোখ চকচক করে উঠল। “সত্যি আব্বু?”
হিয়ার প্রশ্নে ইশতিয়াক খান হেসে মাথা নাড়লেন।
— “হ্যাঁ, সত্যি।”
রাত আরও গভীর হলো। ঘুমানোর আগে হিয়া আর অয়ন পাশাপাশি বসে মোবাইল হাতে নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার জায়গা খুঁজতে শুরু করল। কোথায় যাওয়া যায়, কোন জায়গাটা সুন্দর, কোথায় কী খাবার পাওয়া যায় সবকিছুই তারা খুঁজে দেখতে লাগল।
একবার একটা লোকেশন পছন্দ হচ্ছে, আবার অন্য জায়গা দেখে সেটাও ভালো লাগছে।মাঝেমধ্যে দুজনের মধ্যে তর্কও শুরু হয়ে যাচ্ছে কোথায় গেলে বেশি মজা হবে, কোথায় গেলে ভালো খাবার পাওয়া যাবে।এক মাস পর পরিবারের সবাই একসঙ্গে। কতদিন পর এমন একটা স্বাভাবিক, আনন্দে ভরা রাত এসেছে।
কেউ তখনও জানত না এই রাতটাই হতে যাচ্ছে তাদের জীবনের শেষ শান্ত রাতগুলোর একটি।
পরদিন সকাল!
সকাল সকালই হিয়া অয়নকে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল। আব্বু এতদিন পর বাড়িতে ফিরেছে। তাই দুজনেরই ইচ্ছে ছিল আজ আর স্কুল-ভার্সিটিতে না যাওয়ার। পুরো দিনটা পরিবারের সঙ্গে কাটাবে এমনটাই ভেবেছিল তারা। কিন্তু উপায় ছিল না।
আজ অয়নের রেজাল্ট দেওয়ার দিন। আর হিয়ারও চলছে টেস্ট পরীক্ষা। তাই ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও দুজনকেই বের হতে হলো। হিয়া প্রথমে অয়নকে স্কুলে পৌঁছে দিল।
তারপর সেখান থেকে সোজা নিজের ভার্সিটির উদ্দেশ্যে রওনা হলো।
গাড়ি থেকে নামার আগে হিয়া একবার অয়নের দিকে তাকিয়ে বলল, “রেজাল্ট যেন ভালো হয়। আর স্কুল থেকে বাইরে কোথাও যাবি না। আমি নিতে না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করবি।”
অয়ন হাসতে হাসতে মাথা নাড়ল। “তুমিও পরীক্ষা ভালো করে দিও, আপু।”
হিয়া মৃদু হেসে বলল, “অবশ্যই।”
তারপর অয়ন স্কুলের ভেতরে চলে গেল। হিয়াও নিজের ভার্সিটির পথে পা বাড়াল।
দুই ঘণ্টার মধ্যেই হিয়ার পরীক্ষা শেষ হয়ে গেল।
পরীক্ষা শেষ করে আর দেরি না করে সে বেরিয়ে পড়ল।
সোজা অয়নের স্কুলের উদ্দেশ্যে রওনা হলো। স্কুলে পৌঁছে অয়নকে দেখেই হিয়ার মুখে হাসি ফুটে উঠল।
অয়ন এ-প্লাস পেয়েছে। খবরটা শুনে হিয়া আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল।
সে অয়নকে জড়িয়ে ধরে বলল, “আমি জানতাম তুই ভালো রেজাল্ট করবি। তবে এতোটা ভালো করবি, সেটা জানা ছিল না!”
খুশিতে অয়নের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
— “বল ভাই, কী চাই তোর?”
অয়ন কিছু বলার আগেই হিয়া নিজেই বলে উঠল,
“তোকে আমি একদম সুন্দর একটা ভিডিও গেম কিনে দেব। তোর যেটা পছন্দ, সেটাই। আর যা চাইবি, সেটাও দেখব।”
অয়নও খুশিতে হেসে উঠল। দুজন ভাই-বোন গল্প করতে করতে বাড়ির পথে রওনা হলো। সারাটা পথ তাদের গল্প আর হাসিতে কেটে গেল। কিছুক্ষণ পর তারা বাড়ির সামনে এসে পৌঁছাল। হিয়া দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কলিং বেল চাপল।
একবার।
দুবার।
তিনবার।
কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ এল না।
হিয়া ভ্রু কুঁচকে আবার বেল চাপল। “দরজা খুলছে না কেন আম্মু?”
অয়নও অবাক হয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।
কিছুক্ষণ পর অবশেষে দরজাটা খুলে গেল। হিয়া আর অয়ন ভেতরে পা রাখতেই দুজনেই থমকে গেল।
ড্রয়িংরুমে বসে আছে আসাদ খান। তার সঙ্গে আরও কয়েকজন অপরিচিত লোক। লোকগুলোর চেহারা আর উপস্থিতি দুটোতেই কেমন যেন অস্বাভাবিক একটা কঠোরতা।
হিয়ার চোখ সঙ্গে সঙ্গে তার বাবার দিকে গেল।
ইশতিয়াক খান তাদের সাথেই সেখানে বসে আছেন।
আর তার মা রান্নাঘরে। হিয়া কিছুটা অবাক হয়ে আসাদের দিকে তাকাল। সে জানে, আসাদ খান তাদের ছোট চাচা। ছোটবেলায় তাকে দূর থেকে দেখেছে কয়েকবার। কিন্তু এভাবে সামনাসামনি তাদের বাড়িতে তাকে কখনো আসতে দেখেনি।
হঠাৎ সামনে দেখে তাই স্বাভাবিকভাবেই একটু চমকে গেল। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে সালাম দিল,
— “আসসালামু আলাইকুম, চাচ্চু।”
আসাদও হিয়ার দিকে তাকাল। কয়েক সেকেন্ড তার দৃষ্টি হিয়ার মুখের ওপর স্থির রইল। তারপর ইশতিয়াক খান দ্রুত বলে উঠলেন,
— “হিয়া, মামনি, অয়নকে নিয়ে তোমরা ঘরে যাও। আমরা বড়রা একটু কথা বলছি।”
হিয়া বাবার মুখের দিকে তাকাল। তার কণ্ঠে এমন এক ধরনের গাম্ভীর্য ছিল, যা হিয়ার মনে অজান্তেই একটা অস্বস্তি তৈরি করল। তবু সে আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। অয়নের দিকে তাকিয়ে বলল,
— “চল অন্তর।”
দুজনেই ধীরে ধীরে নিজেদের ঘরের দিকে চলে গেল।
পেছনে ড্রয়িংরুমে রয়ে গেলেন ইশতিয়াক খান, আসাদ খান এবং তার সঙ্গে আসা লোকগুলো।
হিয়া নিজের ড্রেস পাল্টে নিল। অয়নও ফ্রেশ হয়ে নিল।
এরপর ফারহানা খান মেহমানদের জন্য একে একে বিভিন্ন খাবার এনে টেবিলে সাজিয়ে দিলেন।
বাড়ির পরিবেশটা বাইরে থেকে স্বাভাবিকই মনে হচ্ছিল। কিন্তু অদৃশ্য কোনো অশুভ ছায়া ধীরে ধীরে পুরো বাড়িটাকে ঘিরে ফেলছিল।
এভাবেই প্রায় এক ঘণ্টা কেটে গেল।
হঠাৎ—
বাড়ির নীরবতা কাঁপিয়ে দিয়ে বিকট একটা গু*লির শব্দ হলো। হিয়া আর অয়ন দুজনেই চমকে উঠল।
— “আব্বু!”
হিয়া ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। অয়নও তার পেছন পেছন ছুটে এল। ড্রয়িংরুমে পৌঁছেই দুজনের চোখের সামনে ভেসে উঠল ভয়ংকর দৃশ্যটা।
ইশতিয়াখ খানের হাতে গু/লি করা হয়েছে।
র/ক্ত ঝরছে তার হাত বেয়ে। হিয়া আতঙ্কে চিৎকার করে উঠতে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই ইশতিয়াক খানের কণ্ঠ ভেসে এল। সে আসাদের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
— “তুই আমার সঙ্গে বেইমানি করলি! তুই বলেছিলি, তুই আইনের কাছে সারেন্ডার করবি!”
আসাদ খান এক ঝটকায় ইশতিয়াক খানের কলার চেপে ধরল। “চুপ কর, হারামজাদা!”
তার চোখে তখন কোনো আত্মীয়তার চিহ্ন নেই।
“দুই টাকার সিআইডি! তুই কী ভেবেছিলি? এতদিন ধরে যে সাম্রাজ্য গড়েছি, সেটা সব ধুলায় মিশিয়ে দেব তোর কথায়?”
আসাদ ইশতিয়াক খানের কলার আরও শক্ত করে চেপে ধরল “তোকে তখনই মেরে ফেলতে পারতাম, যখন তুই ডিটেকটিভ সেজে আমার ডেরায় ঢুকেছিলি।”
তারপর টেবিলের ওপর রাখা কাগজগুলোর দিকে ইঙ্গিত করল “ভালোভাবে পেপারটায় সাইন কর। নাহলে আমি কী করতে পারি, সেটা তো জানিস।”
ইশতিয়াক খান যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গেলেও তার কণ্ঠে দৃঢ়তা ছিল “আমি মরে গেলেও সাইন করব না।”
আসাদ খান কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ঠান্ডা গলায় বলল, “তোকে মারলে সাইন করবি না?”
তার ঠোঁটে ধীরে ধীরে একটা নিষ্ঠুর হাসি ফুটে উঠল।
“কিন্তু তোর ওয়াইফ, মেয়ে আর ছেলেকে যদি কিছু করি, তখন?”
ইশতিয়াক খানের মুখ মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
“আসাদ!”
তার কণ্ঠে এবার আতঙ্ক স্পষ্ট “ওরা তোর আপন রক্ত। তোর ভাতিজা, ভাতিজি। ওদের কোনো ক্ষতি করিস না।”
হিয়া আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে ছুটে বাবার দিকে এগিয়ে যেতে চাইল।
— “আব্বু!”
কিন্তু ফারহানা খান দ্রুত তাকে ধরে ফেললেন।
— “হিয়া, মা!”
তিনি হিয়াকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ফিসফিস করে বললেন, “অয়নকে নিয়ে লুকিয়ে পড়। তাড়াতাড়ি এখান থেকে চলে যা!”
হিয়া মায়ের হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করল।
“না, আম্মু! আব্বুকে রেখে আমি কোথাও যাব না!”
ফারহানা খান এবার কোনো কথা না বলে দুজনকেই জোর করে টেনে নিয়ে যেতে লাগলেন। হিয়া বারবার পেছনে তাকাচ্ছিল। তার চোখের সামনে তখনও তার আহত বাবা। কিন্তু ফারহানা খান তাকে থামার কোনো সুযোগ দিলেন না। তিনি হিয়া আর অয়নকে নিয়ে দ্রুত সিঁড়ির পাশে একটা স্টোররুমের সামনে নিয়ে গেলেন।
দুজনকে ভেতরে ঢুকিয়ে দিলেন। হিয়া কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাইরে থেকে দরজাটা তালা বন্ধ করে দিলেন।
“আম্মু!” হিয়া দরজায় হাত রেখে চিৎকার করে উঠল।
— “আম্মু, দরজা খোলো!”
বাইরে দাঁড়িয়ে ফারহানা খান চোখের পানি মুছে একবার দরজার দিকে তাকালেন। দরজার ওপাশে তার মেয়ের কণ্ঠ। তার ছোট ছেলে। তার স্বামী।
সবকিছু একসঙ্গে বুকের ভেতর ছুরি হয়ে বিঁধছিল।
তবুও তিনি জানতেন—এই মুহূর্তে সন্তানদের বাঁচানোর জন্য তাকে কঠিন হতে হবে। তিনি ধীরে ধীরে সরে গেলেন। ফারহানা খান স্বামীকে বাঁচানোর জন্য আর এক মুহূর্তও দেরি না করে ড্রয়িংরুমের দিকে ছুটে গেলেন।
হিয়া শুধু দরজার ওপাশ থেকে মায়ের দ্রুত পায়ের শব্দ শুনতে পেল। তারপর ধীরে ধীরে সেই শব্দ মিলিয়ে গেল। এরপর কী হলো, কীভাবে হলো হিয়া কিছুই জানত না।
হঠাৎ সে শুধু শুনতে পেল পরপর কয়েকটা গু/লির শব্দ। বিকট শব্দে পুরো বাড়িটা কেঁপে উঠল।
হিয়া আতঙ্কে অয়নকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
“অন্তর…”
৮ বছরের অয়ন তখন ভয়ে কাঁপছিল। তার শরীরটা কাঁপুনিতে থরথর করছিল, আর হিয়ার নিজের বুকের ভেতরেও হৃদপিণ্ডটা পাঁজর ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাইছিল। তবুও সে নিজেকে সামলে নিল।
এই মুহূর্তে সে ভয় পেলে চলবে না। কারণ সে শুধু একজন মেয়ে নয় সে এখন তার ছোট ভাইয়ের একমাত্র আশ্রয়।
হিয়া ধীরে ধীরে দরজার কাছে গিয়ে কান পেতে দাঁড়াল। বাইরে কোনো শব্দ নেই। একদম নিস্তব্ধ।
কিন্তু সেই নিস্তব্ধতাটাই যেন আরও ভয়ংকর। কারণ সকালের আগেও এই বাড়িটা ছিল তাদের হাসি আনন্দে ভরা। আর এখন সেই বাড়ির প্রতিটি দেয়ালের ওপাশে কী ঘটছে, তার কিছুই জানে না হিয়া।
ঠিক তখনই—
সিঁড়ির দিক থেকে ভেসে এলো কারও পায়ের শব্দ।
ধীর… ভারী… একটার পর একটা পায়ের শব্দ। হিয়ার বুক কেঁপে উঠল। এক মুহূর্তের জন্য তার ইচ্ছে হলো চিৎকার করে উঠতে।
“কেউ আছেন? আমাকে বের করুন!”
হয়তো কেউ শুনবে। হয়তো তাকে এখান থেকে বের করে নিয়ে যাবে। তাহলে সে তার আম্মু আব্বুর কাছে যেতে পারবে। কিন্তু পরক্ষণেই সে থেমে গেল। তার চোখ চলে গেল অয়নের দিকে।
ছোট্ট ছেলেটা ভয়ে কুঁকড়ে বসে আছে। চোখ দুটো পানিতে ভরা। তার পৃথিবীটা এখন শুধু এই ছোট্ট স্টোররুম আর তার আপুকে ঘিরে।
হিয়ার মাথায় তখন একটাই কথা এলো—সে এখন আর একা নয়। তার সঙ্গে অয়ন আছে।
নিজের কথা ভাবলে চলবে না। যেভাবেই হোক, অয়নকে বাঁচাতে হবে।
হিয়া দ্রুত দরজাটা ভেতর থেকে শক্ত করে বন্ধ করে ছিটকিনি লাগিয়ে দিল। তারপর ছুটে এসে অয়নের সামনে বসে পড়ল। অয়ন ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে আপুর দিকে তাকাল। হিয়া আর কিছু না বলে তাকে নিজের বুকের সঙ্গে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
তার নিজের চোখেও তখন পানি জমে উঠেছে। গলা ভারী হয়ে এসেছে। কিন্তু সে কাঁদল না। অয়নের সামনে সে কাঁদতে পারবে না। শুধু খুব আস্তে করে তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
— “ভয় পাস না, অন্তর।”
কথাটা বলার সময় হিয়ার নিজের কণ্ঠই কেঁপে উঠেছিল।
বাইরে আবার পায়ের শব্দ শোনা গেল। হিয়া সঙ্গে সঙ্গে অয়নকে আরও শক্ত করে নিজের বুকের সঙ্গে চেপে ধরল।মুহূর্তটার ভয়াবহতার মধ্যেও তার মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরছিল “আমার কিছু হলে হোক… কিন্তু অয়নের কিছু হতে দেব না।”
এই মুহূর্তে তার কাছে নিজের জীবন নয়, অয়নের জীবনটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কিছুক্ষণ পর বাইরে আবার সব নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কিন্তু হিয়া জানত, এভাবে আর বেশিক্ষণ লুকিয়ে থাকা যাবে না। তাকে বের হতেই হবে। কিন্তু একা বের হলে হবে না। অয়নকে আগে নিরাপদে বের করতে হবে।
হিয়া দ্রুত স্টোররুমের চারপাশে চোখ বুলাতে লাগল।
হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল ঘরের একেবারে ওপরের দিকে থাকা একটি ভেন্টিলেটরের দিকে। ভেন্টিলেটরটা বাড়ির পেছনের বাগানের দিকে বের হয়েছে।
সেখান দিয়ে কোনোভাবে বের হতে পারলে সরাসরি রাস্তায় যাওয়া সম্ভব। হিয়ার মাথায় সঙ্গে সঙ্গে একটা বুদ্ধি এলো। সে দ্রুত কয়েকটা বস্তার ওপর উঠে ভেন্টিলেটরের কাছে পৌঁছাল। হাত বাড়িয়ে সেটার দরজা খুলে দিল।
ভেন্টিলেটরের ওপাশে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল সে।তারপর নিচে তাকিয়ে অয়নের দিকে বলল,
— “অন্তর… তুই এখান দিয়ে বের হয়ে যা।”
অয়ন সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল। “না আপু।”
হিয়া নিচে নেমে এসে অবাক হয়ে তাকাল।
“কেন?”
অয়নের চোখ বেয়ে তখন টুপটুপ করে পানি পড়ছে।
সে কাঁপা কণ্ঠে বলল, “আমি তোমাকে ফেলে যাব না।”
হিয়ার বুকটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠল। সে অয়নের সামনে হাঁটু গেড়ে বসল।
অয়ন এবার কান্নায় ভেঙে পড়ে বলল,
“আমি তোমাকে আর আব্বু-আম্মুকে ছেড়ে কোথাও যাব না।”
কথাগুলো শুনে হিয়ার চোখও ভিজে উঠল। অয়ন আবার বলল, “আপু… মনে হয় ওরা আব্বু-আম্মুকে মেরে ফেলছে।”
শেষ কথাটা বলতে গিয়েই তার কণ্ঠ ভেঙে গেল।
“তুমি গেলে ওরা তোমাকেও মেরে ফেলবে।”
ছোট্ট ছেলেটা আপুর হাত দুটো শক্ত করে ধরে ফেলল।
“আমি এই দুনিয়ায় একা হয়ে যাব, আপু… তুমি যেও না বাইরে।”
হিয়ার বুকের ভেতরটা তখন কেউ মুঠো করে চেপে ধরল। এই কয়েক ঘন্টা আগেও যে ছেলেটা তার সঙ্গে বসে হাসছিল, রেজাল্ট দেখিয়ে আনন্দ করছিল, ভিডিও গেম চেয়ে বায়না করছিল—সেই ছেলেটাই এখন মৃ*ত্যুর ভয়ে কাঁপছে।
হিয়া জানে না তার আব্বু বেঁচে আছেন কি না। জানে না আম্মুর কী হয়েছে। জানে না দরজার ওপাশে কতজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। এমনকি সে এটাও জানে না—আর কয়েক মিনিট পর সে নিজে বেঁচে থাকবে কি না।
তবুও তাকে শক্ত থাকতে হবে। কারণ অয়নের সামনে ভেঙে পড়ার কোনো সুযোগ তার নেই।
হিয়া দ্রুত চোখের পানি মুছে ফেলল। তারপর অয়নের দুই কাঁধ শক্ত করে ধরে বলল,
“অন্তর, ভাই… তুই যা।”
অয়ন মাথা নাড়তে নাড়তে কাঁদল। “না…”
হিয়ার গলা এবার কঠিন হয়ে গেল।
“তুই না গেলে আমরা কেউ বাঁচব না।”
অয়ন চুপ করে আপুর দিকে তাকিয়ে রইল।
হিয়া ভেন্টিলেটরের দিকে ইশারা করে বলল,
“তুই সোজা এখান থেকে বের হয়ে যাবি। আমাদের বাড়ির সামনে যে থানাটা আছে, সেখানে যাবি।”
অয়নের চোখে তখনও ভয়।
হিয়া তার মুখটা দুহাতের মধ্যে নিয়ে বলল,
“সেখানে গিয়ে পুলিশ আঙ্কেলদের সব বলবি। বলবি, আমাদের বাড়িতে খারাপ লোক এসেছে। আব্বু-আম্মু বিপদে আছে।”
একটু থেমে সে বলল, “তারপর পুলিশ নিয়ে এখানে ফিরে আসবি।”
অয়ন নীরবে তাকিয়ে রইল। হিয়া তার মাথায় হাত বুলিয়ে মৃদু স্বরে বলল, “তুই তো আমার ব্রেভ ভাই, তাই না?”
অয়নের ঠোঁট কেঁপে উঠল। সে খুব আস্তে মাথা নাড়ল।
কিন্তু হিয়া জানত, সে যতটা অয়নকে সাহস দিচ্ছে, তার নিজের ভেতরে ততটাই ভয় জমে আছে।
সে জানে না বাইরে কী ঘটেছে। জানে না তার বাবা-মায়ের কী হয়েছে। তবুও একটা বিষয় সে নিশ্চিতভাবে জানে অয়নকে এখান থেকে বের করতেই হবে। যদি আজ তাকে নিজের জীবন দিয়ে হলেও ভাইটাকে বাঁচাতে হয়, তবুও সে পিছিয়ে যাবে না।
ঠিক তখনই আবার পায়ের শব্দ শোনা গেল। হিয়া মুহূর্তের মধ্যে চুপ হয়ে গেল। এবার শব্দটা আগের চেয়ে অনেক কাছে।
তারপর—কেউ একজন দরজার বাইরে থেকে ডাকল,
— “হিয়া…”
হিয়ার শরীরের ভেতর দিয়ে ঠান্ডা একটা স্রোত বয়ে গেল।
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর আবার সেই পুরুষ কণ্ঠ— “অয়ন…”
হিয়ার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। কণ্ঠটা তার পরিচিত নয়। কিন্তু মানুষটা তাদের নাম এমনভাবে ডাকছে, যেন সে তাদের খুব ভালোভাবেই চেনে।
হিয়া সঙ্গে সঙ্গে অয়নকে নিজের কাছে টেনে নিল।
তার চোখ স্থির হয়ে গেল দরজার দিকে। বাইরে আবার সেই কণ্ঠ ভেসে এলো, “হিয়া… অয়ন…”
এবার আর কোনো সন্দেহ রইল না। কেউ তাদের খুঁজছে। হিয়ার শরীরের প্রতিটি স্নায়ু সতর্ক হয়ে উঠল।
আর এক মুহূর্তও দেরি করলে চলবে না। সে দ্রুত ভেন্টিলেটরের সামনের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসে পড়ল।তারপর অয়নের দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে বলল,
— “উঠ। তাড়াতাড়ি।”
অয়ন কাঁদতে কাঁদতে মাথা নাড়ল— “আপু…”
হিয়া তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসার চেষ্টা করল। কিন্তু সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে ছিল নিজের ভাইকে হয়তো শেষবারের মতো দেখার আশঙ্কা।
“যা, অন্তর।”
অয়ন অনিচ্ছা সত্ত্বেও হিয়ার কাঁধে পা রাখল। হিয়া নিজের সর্বশক্তি দিয়ে তাকে ওপরে তুলে দিল। অয়ন কোনোভাবে ভেন্টিলেটরের ভেতরে উঠে গেল। ওপরে উঠে সে আবার নিচের দিকে তাকাল। হিয়ার চোখের সঙ্গে তার চোখ মিলল। কয়েক সেকেন্ড দুজনেই চুপ করে রইল।
হিয়া খুব আস্তে বলল, “দৌড়াবি। পেছনে তাকাবি না।”
অয়নের চোখ আবার ভিজে উঠল। “আপু… তুমি আমার জন্য অপেক্ষা করো।”
হিয়ার বুকটা কেঁপে উঠল।সে জোর করে হাসল।
— “আমি অপেক্ষা করব।”
কিন্তু কথাটা বলার সময় হিয়া নিজেই জানত না, সে সত্যিই অপেক্ষা করতে পারবে কি না।
অয়ন ভেন্টিলেটর দিয়ে বেরিয়ে গেল।
তারপর নিচে লাফ দিতেই বাড়ির পেছনের বাগানের মাটিতে পড়ল সে।হাঁটু ছড়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে। র/ক্ত বেরিয়ে এলো। তীব্র ব্যথায় অয়নের মুখ কুঁচকে গেল।
এক মুহূর্তের জন্য সে মাটিতে বসে পড়তে চাইল।কিন্তু পরক্ষণেই তার আপুর কথা মনে পড়ল—“দৌড়াবি। পেছনে তাকাবি না।”
অয়ন দাঁত চেপে উঠে দাঁড়াল। হাঁটুতে ব্যথা করছে।
র/ক্ত ঝরছে। চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। তবুও সে থামল না। একবারও পেছনে ফিরে তাকাল না।
কারণ সে জানে, এখন থামলে তার আপু তাকে বাঁচানোর জন্য যে সাহস দেখিয়েছে, সেই সাহসের কোনো মূল্য থাকবে না।
ছোট্ট অয়ন প্রাণপণে দৌড়াতে লাগল।
তার একটাই লক্ষ্য—সামনের থানায় পৌঁছানো।
পুলিশ নিয়ে ফিরে আসা। তার আপুকে বাঁচানো।
তার আব্বু-আম্মুকে বাঁচানো। আর হয়তো… তাদের সেই আগের সুন্দর পরিবারটাকেও আবার ফিরিয়ে আনা।
কিন্তু সে জানত না কিছু কিছু পরিবারকে আর কখনো আগের মতো ফিরিয়ে আনা যায় না।
আর স্টোররুমের ভেতর দাঁড়িয়ে হিয়া তখনও ভেন্টিলেটরের দিকে তাকিয়ে রইল।
অয়নের পায়ের শব্দ ধীরে ধীরে দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে।
আর হিয়ার চোখে তখন অশ্রু জমে উঠেছে। সে হাত বাড়িয়ে ভেন্টিলেটরের ধাতব অংশটা স্পর্শ করল।
মনে হলো, এইমাত্র তার ছোট ভাইটাকে নিজের জীবন থেকে ছিঁড়ে দূরে পাঠিয়ে দিল সে। হিয়ার ঠোঁট কেঁপে উঠল।খুব আস্তে করে সে ফিসফিস করে বলল,
“ভালো থাকিস, অন্তর…”
এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল তার গাল বেয়ে।
“তুই শুধু বেঁচে থাকিস।”
তারপর চোখ বন্ধ করে গভীর একটা নিঃশ্বাস নিল সে।
বাইরে আবার পায়ের শব্দ। এবার একেবারে দরজার সামনে। হিয়ার চোখ খুলে গেল। সে ধীরে ধীরে ঘুরে দরজার দিকে তাকাল।অয়নকে সে বের করে দিয়েছে।
এখন আর তার পালানোর কোনো পথ নেই।এখন নিজের ভাগ্যের মুখোমুখি হওয়ার পালা।দরজার ওপাশে কে দাঁড়িয়ে আছে, সে জানে না।
কী অপেক্ষা করছে, সেটাও জানে না।শুধু জানে—
তার ছোট ভাইটা এখন নিরাপদে থাকার জন্য ছুটছে।
আর তাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যই হিয়া এখন নিজের ভয়কে গিলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
দরজার ওপাশ থেকে আবার সেই পুরুষ কণ্ঠ ভেসে এলো—
আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ২৩
— “হিয়া…”
হিয়া ধীরে ধীরে চোখ তুলে দরজার দিকে তাকাল। তার চোখে তখন আর ভয় নেই। আছে শুধু দৃঢ়তা।
কারণ সে জানে অয়নকে সে বাঁচানোর চেষ্টা করেছে।
এবার যা হওয়ার, তার সঙ্গে একাই লড়তে হবে তাকে।
