আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ৩০
সাবিলা সাবি
টাওয়ার ব্রিজের আলো পেছনে ফেলে ধীরে ধীরে বাড়ির পথে এগিয়ে চলল গাড়িটা।
রাত তখন মাত্র ১টা বেজে ১০ মিনিট।
লন্ডনের রাস্তাগুলো পুরোপুরি নিস্তব্ধ হয়ে যায়নি। কোথাও কোথাও গাড়ির আলো ছুটে যাচ্ছে, রাস্তার ধারের বাতিগুলো একের পর এক পিছিয়ে পড়ছে। স্টিয়ারিংয়ে শক্ত হয়ে রাখা হাতদুটোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলেছে গাড়ির চাকা।
চালকের আসনে বসে থাকা সিআইডির সেই কঠোর অফিসারের মুখে ক্লান্তির ছাপ থাকলেও চোখে ছিল গভীর চিন্তার রেখা।
আজকের রাতটা একসঙ্গে অনেকগুলো অনুভূতি তার সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।
সিআইডি হেডকোয়ার্টারে রাখা বো/মা।
একজন অপরাধিনীর পাতা ফাঁ/দ। তারপর টাওয়ার ব্রিজে পৌঁছে দেখা সেই অভাবনীয় আয়োজন।
আর সবশেষে সেই নারীটির কাছ থেকে পাওয়া জন্মদিনের বিশেষ উপহার। পকেটের ভেতর রাখা ঘড়িটার অস্তিত্ব তখনও বারবার নিজের উপস্থিতি জানান দিচ্ছিল।
স্টিয়ারিংয়ে থাকা হাতটা এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। লাল সিগন্যালে গাড়ি থামতেই সে পকেটের ওপর হাত রাখল।
ঘড়িটা এখনও সেখানেই আছে। থেমস নদীর জলে ফেলে দিতে পারত। কিন্তু ফেলে দেয়নি।
কেন?
এই প্রশ্নটার কোনো উত্তর নিজের কাছেও খুঁজে পেল না কঠোর হৃদয়ের সেই পুরুষ। সিগন্যাল সবুজ হতেই আবার গাড়ি এগিয়ে চলল। কিছুক্ষণ পর দূর থেকে ভেসে উঠল হায়াস ম্যানশনের পরিচিত আলো।
বিশাল গেট খুলে গেল। গাড়িটা ভেতরে ঢুকে ধীরে ধীরে থামল। ইঞ্জিন বন্ধ করে কয়েক সেকেন্ড স্টিয়ারিংয়ের ওপর হাত রেখেই বসে রইল সে। তারপর গভীর শ্বাস নিয়ে গাড়ি থেকে নামল। বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই বুঝতে পারল, কেউ এখনও ঘুমাতে যায়নি।
ড্রয়িংরুমের আলো জ্বলছে। আর সেই আলোয় অপেক্ষা করছে তার আপন মানুষগুলো। দরজা খুলে ভেতরে পা রাখতেই সবার দৃষ্টি একসঙ্গে এসে থামল তার ওপর।
পরক্ষণেই অ্যামেলিয়ার মুখে ফুটে উঠল স্বস্তির হাসি।
“লিওন! তুই শেষ পর্যন্ত বাড়িতে এলি!”
মায়ার মুখেও সঙ্গে সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ল আনন্দ।
কিছুক্ষণ আগেও যে মেয়েটার মনে হয়েছিল, আজকের জন্মদিনটা হয়তো অসম্পূর্ণই থেকে যাবে, প্রিয় মানুষটির ফিরে আসায় সেই সমস্ত অভিমান যেন মুহূর্তেই গলে গেল।
আর বাবা-মায়ের চোখে ফুটে উঠল নিঃশব্দ স্বস্তি।
আজকের রাতটা যে কতটা উৎকণ্ঠায় কেটেছে, সেই চোখ দুটোই তার সাক্ষ্য দিচ্ছে। লিওন সবার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
“বলেছিলাম তো, ফিরে আসব।”
তার কণ্ঠের স্বাভাবিক দৃঢ়তা শুনেই কক্ষের বাতাসটা হালকা হয়ে গেল।
অ্যামেলিয়া সঙ্গে সঙ্গে কেকের দিকে এগিয়ে গেল।
“তাহলে আর দেরি কেন? তাড়াতাড়ি এসে কেকটা কাট।”
কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার জ্বলে উঠল কেকের মোমবাতি। মোমবাতির আলোয় সাজানো কেকটার সামনে এসে দাঁড়াল জন্মদিনের নায়ক। চারপাশে পরিবারের আপন মুখগুলো। আর বাবা-মায়ের স্নেহমাখা দৃষ্টি। বোনের উচ্ছ্বাস। রুদ্রনীলের পরিচিত হাসি। আর একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা মায়ার চোখে জমে থাকা নির্মল আনন্দ।
এই মানুষগুলোর মাঝখানে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণের জন্য তার মন থেকে টাওয়ার ব্রিজের সেই রাত, হু/মকি, বো/মা, অ/পরাধ আর অন্ধকার সবকিছুই দূরে সরে গেল।
একসঙ্গে সবাই বলে উঠল, “হ্যাপি বার্থডে!”
মোমবাতির আলোয় কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে রইল সেই কঠোর মুখটা। তারপর এক নিঃশ্বাসে নিভে গেল সবগুলো শিখা। হাততালিতে ভরে উঠল ড্রয়িংরুম। কেক কাটা হলো।
প্রথম টুকরো বাবা-মায়ের মুখে তুলে দিল সে। তারপর বোন আর রুদ্রনীলের মুখে আর সবশেষে মায়ার মুখে।
পরিবারের হাসিতে ধীরে ধীরে ভরে উঠল ঘরটা। আজকের রাতটা আবার নিজের জায়গায় ফিরে পেল। এরপর শুরু হলো উপহার দেওয়ার পালা। প্রথমে সামনে এগিয়ে এলেন তার বাবা। হাতে একটি গাড়ির চাবি। লিওন চাবিটা হাতে নিয়ে বিস্মিত চোখে তাকাল।
“এটা কী?”
বাবার ঠোঁটে গর্বমাখা হাসি ফুটল। “তোর জন্য।”
কয়েক মুহূর্ত চাবিটার দিকে তাকিয়ে থেকে আবার বাবার দিকে তাকাল সে। “নতুন গাড়ি?”
“হ্যাঁ। অনেকদিন ধরেই ভাবছিলাম তোর প্রিয় মডেলের একটা গাড়ি কিনে দেবো। ভাবলাম জন্মদিনে সেটাই দিই।”
কঠোর মুখটায় এবার শিশুসুলভ আনন্দের আভা ফুটে উঠল।
“থ্যাঙ্ক ইউ, ড্যাড।”
বাবা ছেলের কাঁধে হাত রাখলেন। সেই স্পর্শে ছিল এমন এক ভালোবাসা, যার কোনো বড় শব্দের প্রয়োজন হয় না। তারপর রুদ্রনীল এগিয়ে এল। হাতে সুন্দর করে মোড়ানো একটি উপহার।
“এবার আমারটা।”
লিওন হেসে বলল, “ব্রো আপনিও প্রস্তুত হয়ে বসে আছেন দেখছি।”
“জন্মদিনে প্রিয় শ্যালকের হাতে উপহার থাকবে না, সেটা হয় নাকি?”
হাসিতে আবার মুখর হয়ে উঠল পুরো ড্রয়িং রুম। এক এক করে উপহার খুলতে লাগল সে। প্রতিটি উপহারের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল আলাদা আলাদা মানুষের ভালোবাসা, স্মৃতি আর যত্ন।
সবশেষে ধীরে ধীরে হুইলচেয়ারের চাকা ঘুরিয়ে সামনে এগিয়ে এলো মায়া। তার হাতে ছোট্ট একটি বক্স। সারাদিন ধরে বুকের কাছে আগলে রাখা উপহার। লিওনের সামনে এসে কয়েক মুহূর্ত থমকে রইল সে। চোখেমুখে মিশে আছে লাজুক আনন্দ।
তারপর বক্সটা বাড়িয়ে দিল লিওনের দিকে।
“লিও ভাইয়া, এটা তোমার জন্য।”
উপহারটা হাতে নিয়ে সেই কঠোর চোখজোড়া এবার কোমল হয়ে এলো।
“আমার জন্য?”
মায়া মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ। অনেক ভেবেই কিনেছি জিনিসটা।”
বক্সের ঢাকনা খুলতেই ভেতরে থাকা জিনিসটার দিকে তাকিয়ে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল সে। একটি কাস্টমাইজড করা সুন্দর ওয়ালেট।
গাঢ় রঙের চামড়ার ওপর সূক্ষ্ম কারুকাজ। নিখুঁত নকশার মধ্যে ফুটে আছে ব্যক্তিগত ছোঁয়া। দেখতে মার্জিত, ব্যবহারিক, অথচ তার প্রতিটি রেখায় যত্নের পরিচয়।
লিওন ওয়ালেটটা হাতে তুলে নিল। আঙুলের ডগা দিয়ে একবার ছুঁয়ে দেখল। তার ঠোঁটে ফুটে উঠল প্রশান্ত হাসি।
“খুব সুন্দর হয়েছে মায়া।”
মায়ার চোখ মুহূর্তেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
“সত্যিই পছন্দ হয়েছে?”
“হ্যাঁ।”
একটু থেমে আবার বলল, “এটা আমার খুব পছন্দ হয়েছে।”
এই সামান্য প্রশংসাটুকুই যেন মায়ার সমস্ত অপেক্ষার মূল্য ফিরিয়ে দিল। তার মুখে ফুটে উঠল প্রশান্তির হাসি।
আজকের রাতটা তার কাছে আরও বিশেষ হয়ে উঠল।
কারণ তার লিও ভাইয়া শেষ পর্যন্ত ফিরে এসেছে। তাদের সঙ্গে বসে কেক কেটেছে। তার দেওয়া উপহারটা নিজের হাতে নিয়েছে। আর পছন্দও করেছে।
ড্রয়িংরুমে তখন আবার হাসি-আনন্দের ঢেউ উঠেছে।
কেউ নতুন গাড়ির কথা বলছে। কেউ রুদ্রনীলের উপহার নিয়ে মজা করছে। অ্যামেলিয়া একের পর এক ছবি তুলছে।
মায়া দূর থেকে তাকিয়ে দেখছে তার প্রিয় মানুষটাকে।
আর সেই সবকিছুর মাঝখানে বসে থাকা সিআইডির দুর্ধর্ষ অফিসারটির মুখেও অনেকদিন পর পরিবারের সামনে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এক হাসি ফুটে উঠেছে। তবু তার পকেটের ভেতর নিঃশব্দে রয়ে গেছে আরেকটি উপহার।
একটা দামি বিরল ঘড়ি। যেটা এসেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পৃথিবী থেকে। একদিকে পরিবারের ভালোবাসায় পাওয়া উপহারগুলো সাজানো হয়ে আছে তার সামনে।
অন্যদিকে পকেটের অন্ধকারে লুকিয়ে আছে এমন এক নারীর দেওয়া উপহার, যার নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে র*ক্ত, অ/পরাধ, বিপদ আর এক সীমাহীন অধিকারবোধ।
দুটি উপহার।
দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পৃথিবী।
আর তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে একজন মানুষ, যে এখনও জানে না কোন উপহার তার জীবনে কতটা গভীর ছাপ রেখে যাবে।
সেদিনের জন্মদিনের রাতটা তাই শুধু কেক, উপহার আর পারিবারিক আনন্দের রাত হয়ে রইল না।
একই রাতের দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে গেল দুই নারী।
একজন তার জন্য বেছে নিয়েছে ভালোবাসার কোমল স্মারক। অন্যজন নিজের অন্ধকার সাম্রাজ্য থেকে তুলে এনেছে পৃথিবীর বিরলতম রত্ন দিয়ে তৈরি এক উপহার।
আর লিওন?
সে শুধু জানে, তার জীবনের সবচেয়ে অদ্ভুত জন্মদিনটাই ছিলো আজকের।
অন্যদিকে—
টাউন হাউসের বিশাল দরজাটা ধীরে ধীরে খুলে গেল।
রাতের নীরবতা ভেদ করে ভেতরে প্রবেশ করল আন্ডারওয়ার্ল্ডের সেই দুর্ধর্ষ নারী। কয়েক ঘণ্টা আগেও যে নারী টাওয়ার ব্রিজের ওপর নিজের সমস্ত আড়ম্বর উজাড় করে একজন মানুষের জন্মদিন উদযাপন করেছিল, ফিরে আসার সময় তার মুখে সেই উচ্ছ্বাসের সামান্য ছাপও নেই।
হিয়া ধীর পায়ে ভেতরে ঢুকল। পেছনে দরজা বন্ধ হয়ে গেল। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস করল না।
তার হাঁটার ভঙ্গিতে আগের সেই আত্মবিশ্বাস ছিল, মুখে ছিল স্বভাবজাত কঠোরতা, চোখে ছিল সেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। বাইরে থেকে দেখলে বোঝার কোনো উপায় নেই, কিছুক্ষণ আগেই একটি মাত্র বাক্য তার ভেতরটা কতটা নাড়িয়ে দিয়েছে।
“আই হেইট ইউ।”
লিওনের কণ্ঠটা এখনও কানে বাজছে। হিয়া সোজা নিজের কক্ষে চলে গেল। দরজা বন্ধ করে কয়েক মুহূর্ত সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল সে। তারপর ধীরে ধীরে আয়নার সামনে গিয়ে থামল।
আয়নায় দেখা যাচ্ছে সেই একই নারীকে। কালো লেদার প্যান্ট, সাদা শার্ট, গলার কাছে পেঁচানো নেক-ব্যান্ড। চোখে সেই তীক্ষ্ণতা। ঠোঁটে কোনো হাসি নেই। কিছুক্ষণ নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে রইল অন্ধকারের অধিপতিনী।
আজ সে লিওনের জন্মদিনকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য নিজের সাধ্যের কোনো সীমা রাখেনি।
পুরো টাওয়ার ব্রিজ খালি করেছে। শত শত ফুল দিয়ে সাজিয়েছে। আকাশে পাঁচশো ড্রোন দিয়ে তার নাম লিখিয়েছে। নয় ফুটের কেক বানিয়েছে। মানুষের উচ্চতাকেও ছাড়িয়ে যাওয়া সাদা গোলাপের তোড়া এনেছে। আর সবশেষে নিজের সবচেয়ে মূল্যবান উপহারটাও তার হাতে তুলে দিয়েছে।
তার বিনিময়ে কী পেয়েছে?
“আই হেইট ইউ।”
হিয়ার চোখের দৃষ্টি ধীরে ধীরে নিচে নেমে এলো।
বুকের ভেতর কোথাও একটা চাপা ব্যথা উঠল।
তবু চোখের কোণে জল এলো না। এই নারী কাঁদে না।
অন্তত কারও সামনে নয়। সে ধীরে ধীরে চেয়ারে গিয়ে বসল। কিছুক্ষণ নীরবে বসে থাকার পর তার ঠোঁটের কোণে খুব ক্ষীণ একটা হাসি ফুটে উঠল।
কারণ লিওন তাকে ভুল বুঝেছে, সেটা সে বুঝতে পেরেছে। লিওনের চোখে সে এখন সেই নারী, যে সিআইডি হেডকোয়ার্টারে রাখা বোমা*র কথা জানত।
কারণ দানিয়েল তার টিমের মানুষ। আর লিওনের হিসাবটা সেই জায়গাতেই থেমে গেছে।
কিন্তু হিয়া জানে সত্যিটা।
সে জানে, হেডকোয়ার্টারে কী রাখা হয়েছিল, কে সেটা রেখেছিল এবং কোন পরিকল্পনার কথা তার জানা ছিল না।
তবু সে লিওনকে কিছু বলবে না। একটা কথাও না।
কারণ নিজের সত্যি প্রমাণ করার জন্য কারও সামনে দাঁড়িয়ে ব্যাখ্যা দেওয়া তার স্বভাবে নেই। কেউ তাকে ভুল বুঝলে সে তাকে ধরে বসিয়ে নিজের নির্দোষিতা প্রমাণ করে না।
কেউ তার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুললে সে নিজের অতীতের পাতা খুলে বসে না। কেউ তার কাজের অর্থ জানতে চাইলে সে জবাবদিহি করে না।
মানুষ তাকে ভুল বুঝবে। তারপর সেই ভুলের ভেতর দিয়েই একদিন নিজে সত্যিটা খুঁজে নেবে। হিয়ার কাছে সেটাই যথেষ্ট। কারণ সে বিশ্বাস করে, নিজের মুখে বলা সত্যির চেয়ে নিজের চোখে খুঁজে পাওয়া সত্যির মূল্য অনেক বেশি।
লিওনও একদিন সত্যিটা নিজেই খুঁজে বের করবে।
হয়তো আজ নয়।
হয়তো কালও নয়।
কিন্তু যেদিন সে সত্যিটা জানবে, সেদিন হিয়াকে আর কোনো ব্যাখ্যা দিতে হবে না। আন্ডারওয়ার্ল্ডের এই সম্রাজ্ঞী কাউকে বোঝাতে ছুটবে না যে সে নির্দোষ।
সে শুধু অপেক্ষা করবে। কারণ তার নীরবতারও একটা ভাষা আছে। আর সেই ভাষা বুঝতে হলে তাকে বুঝতে হবে হিয়াকে।
চেয়ার থেকে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল সে। আয়নার সামনে এসে গলার কাছে থাকা বুলেটের লকেটটা আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দেখল। লিওনের ছোড়া সেই গুলি। আজও তার গলায় ঝুলছে। তারপর দৃষ্টি গিয়ে থামল সেই ট্যাটুর ওপর।
LEON.
ঠোঁটের কোণে আবারও খুব ক্ষীণ একটা হাসি ফুটল।
কণ্ঠে কোনো অভিযোগ নেই। কোনো অভিমানও নেই।
শুধু নিচু স্বরে নিজেকেই বলল, “তুমি আমাকে ভুল বুঝেছ, দিলবার।”
কয়েক সেকেন্ড নীরব থাকার পর চোখ দুটো আবার কঠিন হয়ে উঠল।
“কিন্তু আমি তোমাকে বুঝিয়ে বলব না।”
সে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল।
“তুমি নিজেই সত্যিটা খুঁজে নেবে।”
এইটুকু বলেই হিয়া জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
দূরে শহরের আলো জ্বলছে। অসংখ্য মানুষের ভিড়ে প্রত্যেকেই নিজের মতো করে সত্যি খুঁজে বেড়ায়।
আর অন্ধকারের এই নারীও জানে, একদিন লিওন তার সত্যিটা খুঁজে নেবে। সেদিন তাকে কিছু বলতে হবে না।
শুধু দাঁড়িয়ে থেকে দেখতে হবে, যে মানুষটা আজ তাকে ঘৃণা করে চলে গেছে, সেই মানুষটার চোখে সত্যিটা আবিষ্কারের মুহূর্তে কী বদল আসে।
পরের দিন।
দুবাইয়ের আকাশে তখনও সকালের রোদের তীব্রতা পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। অথচ শহরের নির্জন আকাশপথ চিরে এগিয়ে চলেছে একটি কালো চপার। কাচঘেরা কেবিনের ভেতরে নিঃশব্দে বসে আছে অন্ধকার সাম্রাজ্যের গডফাদার।
গত রাতের ঘটনাটা এখনও তার মস্তিষ্কের প্রতিটি কোণে জীবন্ত। চোখ বন্ধ করলেই ফিরে আসছে সেই মুহূর্ত। গলায় ঠেকানো ছুরি, তারপর নিজের বুকের ডানপাশে নিজ হাতেই বসিয়ে দেওয়া আঘাত।
আর তারপর সেই চোখ।
সেই তীক্ষ্ণ চোখের সামনে দাঁড়ানোর মতো মানসিক শক্তিটুকুও কোথায় হারিয়ে ফেলেছে রাজরক্তের সেই উত্তরাধিকারী।
তাই কোনো বিলম্ব না করেই নিজের চপারে করে দুবাই চলে এসেছে অন্ধকার জগতের অধিপতি।
ব্যবসার অজস্র হিসাব আছে। নিজস্ব সাম্রাজ্যের অসংখ্য সিদ্ধান্ত অপেক্ষা করছে। ক্ষমতার জগতে তার অনুপস্থিতি মানেই বহু মানুষের অস্থিরতা।
তবু নিজের কাছ থেকে সত্যিটা লুকাতে পারছে না সে।
এই যাত্রার পেছনে কোনো ব্যবসায়িক কারণ নেই।
আছে শুধু একজন নারী।
হিয়ার সামনে দাঁড়াতে পারছে না সে।
কিছুটা দূরত্ব হয়তো তার ভেতরের অস্থিরতাকে শান্ত করবে।
কিছুক্ষণ পর কালো চপারটি সারপেন্ট পেন্টহাউসের ব্যক্তিগত ল্যান্ডিং প্যাডে এসে অবতরণ করল।
দরজা খুলতেই ধীর পায়ে নিচে নেমে এলো সেই অন্ধকার সাম্রাজ্যের গডফাদার।
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল পেন্টহাউসটি দূর থেকেই তার ক্ষমতার নীরব ঘোষণা দিচ্ছে।
সারপেন্ট পেন্টহাউস।
দুবাইয়ের আকাশছোঁয়া ভবনগুলোর ভিড়ে নিজের জন্য তৈরি করা এই বিলাসবহুল সাম্রাজ্যটিতে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার নেই। প্রতিটি দরজা, প্রতিটি করিডোর, প্রতিটি নিরাপত্তাব্যবস্থা তার নিয়ন্ত্রণে। এখানে তার অনুমতি ছাড়া কিছুই নড়ে না।
ভেতরে ঢুকেই কারও সঙ্গে কথা বলল না সে।
কোট খুলে একপাশে ছুড়ে দিল। তারপর সোজা চলে গেল নিজের ব্যক্তিগত ট্রেনিং রুমে।
ভারী দরজাটা পেছনে বন্ধ হয়ে গেল।
বিশাল ঘরটির একপাশে সারি সারি অস্ত্র। অন্য পাশে প্রশিক্ষণের জন্য স্থাপন করা একাধিক টার্গেট বোর্ড। আর ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা রাজপুত্রের মতো সুদর্শন পুরুষটির মুখে তখন রাজকীয়তার কোনো কোমল ছাপ নেই।
মুখাবয়বে জন্মগত রাজরক্তের নিখুঁত ছাপ থাকলেও সময় সেই সৌন্দর্যের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে কঠোরতার এক অদৃশ্য আবরণ। তার চেহারার প্রতিটি রেখা বুলেটের চেয়েও তীক্ষ্ণ, তীরের চেয়েও ধারালো।
লেভেন্ডার রঙের চোখজোড়াই তার সবচেয়ে ভয়ংকর বৈশিষ্ট্য। রাজপরিবারের উত্তরাধিকারীর চোখে যে স্বাভাবিক ঔজ্জ্বল্য ও কোমলতা থাকার কথা, অন্ধকার সাম্রাজ্যের নির্মমতা তা বহু আগেই মুছে দিয়েছে।
সেখানে এখন বাস করে শীতল কর্তৃত্ব, বিপজ্জনক স্থিরতা আর এমন এক দৃষ্টি যার সামনে দাঁড়ালে নিজের অজান্তেই সতর্ক হয়ে যেতে হয়।
কালচে বাদামী ঠোঁটজোড়া শক্ত হয়ে আছে। স্বাভাবিকভাবেই বাদামী সেই ঠোঁট সিগারের ধোঁয়ার তাপে পুড়ে পুড়ে গাঢ়, কালচে বাদামী হয়ে উঠেছে। তার টানটান চোয়ালের রেখা আর কঠিন মুখাবয়ব স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে এই পুরুষের সৌন্দর্যের আড়ালে কোমলতার কোনো অস্তিত্ব নেই।
মুখের প্রতিটি অবয়বই তার পরিচয় বহন করছে।
জন্ম যার রাজপ্রাসাদে। কিন্তু জীবন অন্ধকার সাম্রাজ্যে। সে রাজপুত্র হয়েও এখন আর রাজকীয় নয়।
সে অন্ধকারের সম্রাট।
সামনের টেবিলের ওপর পাশাপাশি রাখা কয়েকটি পিস্তলের দিকে এগিয়ে গেল সেই অস্ত্রবিশারদ গডফাদার। সেগুলো কোনো সাধারণ অস্ত্র নয়।
প্রতিটি তার নিজের জন্য বিশেষভাবে কাস্টমাইজ করা। অস্ত্রের নকশা থেকে শুরু করে গ্রিপ, ব্যালান্স, ট্রিগারের সংবেদনশীলতা, প্রতিটি ক্ষুদ্র অংশ তৈরি করা হয়েছে তার ব্যবহারের কথা মাথায় রেখে। পৃথিবীর বহু ক্ষমতাধর মাফিয়ার কাছে এমন অস্ত্র কেবল স্বপ্ন হতে পারে, অথচ তার সামনে সেগুলো সাজানো রয়েছে প্রতিদিনের ব্যবহারের অস্ত্র হিসেবে।
লম্বা আঙুলগুলো ধীরে ধীরে একটি পিস্তলের ওপর গিয়ে থামল। অস্ত্রটা হাতে তুলে নিতেই ল্যাভেন্ডার চোখজোড়ার দৃষ্টি সামনে স্থির হলো।
টার্গেট বোর্ড। কোনো কথা নেই। কোনো দ্বিধা নেই। শুধু এক মুহূর্তের নীরবতা।
তারপর গুলির শব্দে কেঁপে উঠল বিশাল ট্রেনিং রুম।
টার্গেটের ঠিক কেন্দ্রবিন্দুতে গিয়ে বিদ্ধ হলো গুলি।
কিন্তু সেই ধারালো চোখে কোনো তৃপ্তি ফুটল না।
বরং চোখের গভীরে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল অস্থিরতা।
প্রথম অস্ত্রটা নামিয়ে দ্বিতীয় একটি পিস্তল তুলে নিল অন্ধকারের সম্রাট। আবারও লক্ষ্য স্থির হলো।
আবারও গু/লি ছুটল। টার্গেটের কেন্দ্র বিদীর্ণ হলো।
তারপর তৃতীয় অস্ত্র।
চতুর্থ।
একটার পর একটা গু*লি ছুটতে লাগল।
প্রতিটি গু/লি লক্ষ্যভেদ করছে নিখুঁতভাবে। অথচ যতবার ট্রিগারে চাপ পড়ছে, ততবারই মনে হচ্ছে সে কোনো টার্গেটকে নয়, নিজের ভেতরের অস্থিরতাকেই বিদ্ধ করতে চাইছে।
কিন্তু কিছুতেই পারছে না। কারণ প্রতিটি গুলি/র শব্দের পরেই তার মনে ফিরে আসছে একই দৃশ্য।
হিয়ার চোখজোড়া।
সেই চোখে থাকা রাগ।
অভিমান।
আর তার থেকেও ভয়ংকর কিছু।
বিশ্বাস।
অন্ধকারের সম্রাটের আঙুল আবারও ট্রিগারের ওপর শক্ত হয়ে উঠল। চোখের সামনে টার্গেট বোর্ড থাকলেও মনের পর্দায় ভেসে উঠল র/ক্তাক্ত সেই মুখ।
নিজের বুকের ডানপাশে নিজ হাতে আঘাত করা সেই নারী। যে নারী তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে।
যে নারী মৃ/ত্যুকেও ভয় পায় না। অথচ আজ তার সামনে দাঁড়িয়ে সেই চোখের দিকে তাকানোর সাহসটুকু এই মানুষটির নিজেরই হচ্ছে না।
হঠাৎ গু/লির শব্দ আবারও পুরো ঘর কাঁপিয়ে দিল।
টার্গেট বোর্ডের মাঝখানে আরও একটি গর্ত তৈরি হলো। কয়েক মুহূর্ত অস্ত্রটা হাতে রেখেই স্থির দাঁড়িয়ে রইল রাজরক্তের সেই উত্তরাধিকারী।
তারপর ধীরে ধীরে পিস্তলটা নামিয়ে রাখল। বুক থেকে বেরিয়ে এলো দীর্ঘ একটি নিঃশ্বাস।
ল্যাভেন্ডার চোখজোড়া ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল।
কিন্তু চোখ বন্ধ করেও মুক্তি মিলল না।বরং অন্ধকারের ভেতর আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল সেই মুখ।
সেই তীক্ষ্ণ চোখ।
সেই রক্তাক্ত বুক।
আর নিজের করা কাজের ভার।
দুবাই তাকে হিয়া থেকে দূরে নিয়ে এসেছে ঠিকই।
কিন্তু অন্ধকারের গডফাদার বুঝতে পারল, পৃথিবীর কোনো শহরই তাকে সেই চোখ দুটির কাছ থেকে সত্যিকার অর্থে দূরে রাখতে পারবে না।
অন্ধকার সাম্রাজ্যের গডফাদার কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল।
ল্যাভেন্ডার চোখজোড়ায় তখনও জমে আছে গভীর অস্থিরতা। হিয়ার মুখটা মন থেকে সরানোর জন্য এতক্ষণ যে গু/লিগুলো ছুড়েছে, সেগুলো টার্গেট বোর্ড বিদ্ধ করতে পেরেছে ঠিকই, কিন্তু বুকের ভেতর জমে থাকা অস্বস্তিটুকু একটুও কমাতে পারেনি।
ঠিক তখনই ভারী দরজায় মৃদু শব্দ হলো।
ঠক। ঠক।
রাজরক্তের উত্তরাধিকারী ধীরে ধীরে মুখ তুলল।
“Come in.”
দরজা খুলে গেল। ভেতরে প্রবেশ করলেন এক রাজকীয় নারী।
লেডি ভিক্টোরিয়া।
তার চলনে ছিল অভিজাত সৌন্দর্য, পোশাকে ছিল রাজপরিবারের স্বাভাবিক আভিজাত্য। চোখে সেই তীক্ষ্ণতা, যা দীর্ঘদিন রাজপরিবারের ভেতরের ক্ষমতার সমীকরণ দেখেছে।
সে কয়েক পা এগিয়ে এসে থামলো।
“এখানে এসে তোমাকে পাওয়া যাবে, সেটা ভাবিনি।”
অন্ধকারের সম্রাটের ঠোঁটে কোনো উত্তর এল না।
ভিক্টোরিয়ার দৃষ্টি একবার টার্গেট বোর্ডের দিকে গেল। তারপর টেবিলের ওপর পড়ে থাকা অস্ত্রগুলোর দিকে।
“এখানেও নিজের মাথার সঙ্গে যুদ্ধ করছ?”
কালচে বাদামী ঠোঁটজোড়া সামান্য শক্ত হলো।
“আমি কারও সঙ্গে যুদ্ধ করছি না।”
“সেটা তোমার মুখ বলছে না।”
দানিয়েল এবার ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল।
লেডি ভিক্টোরিয়া কিছুক্ষণ নীরবে তাকে দেখলেন। তারপর বললেন,
“চলো। তোমাকে প্রাসাদে যেতে হবে।”
ভ্রু সামান্য কুঁচকে গেল অন্ধকারের সম্রাটের।
“কেন?”
“কারণ আজ রাজপ্রাসাদে একজন অতিথি এসেছে।”
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
“কে?”
“একজন রয়্যাল কিং।”
কণ্ঠে এবার বিরক্তির স্পষ্ট ছাপ ফুটে উঠল তার।
“তাহলে?”
ভিক্টোরিয়া ধীরে ধীরে বললেন,
“তিনি একা আসেননি।”
ল্যাভেন্ডার চোখজোড়ার দৃষ্টি এবার সম্পূর্ণ স্থির হয়ে গেল।
“তার মেয়েকেও সঙ্গে এনেছেন।”
কয়েক মুহূর্ত নীরব রইল ঘরটা।
তারপর ভিক্টোরিয়া এমন একটি কথা বললেন, যেটা শুনেই অন্ধকারের সম্রাটের মুখের কঠোরতা আরও গভীর হয়ে উঠল।
“তোমার সঙ্গে তার মেয়ের সম্পর্ক স্থাপনের প্রস্তাব নিয়ে এসেছেন।”
দানিয়েলের চোখে বিরক্তি স্পষ্ট হয়ে উঠল।
“আমি আগ্রহী নই।”
“আমি জানি।”
“তাহলে আমাকে সেখানে যেতে বলছো কেন পিপি?”
ভিক্টোরিয়া এবার একটু কাছে এসে দাঁড়ালেন।
“কারণ তিনি বিষয়টাকে প্রস্তাব হিসেবে দেখছেন না।”
দানিয়েলের দৃষ্টি ঠান্ডা হয়ে গেল।
“তাহলে?”
“তিনি ধরে নিয়েছেন, রাজপরিবারের দুই উত্তরাধিকারীর এই সম্পর্ক একদিন না একদিন হবেই।”
কথাগুলো শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘরের বাতাসটাও যেন ভারী হয়ে উঠল।
রাজরক্তের উত্তরাধিকারী ধীরে ধীরে টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। একটি পিস্তল তুলে নিয়ে সেটার ম্যাগাজিন পরীক্ষা করল। তারপর নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে আবার টেবিলের ওপর রেখে দিল।
“তাহলে আজই বিষয়টা শেষ করে দেব।”
ভিক্টোরিয়া তার দিকে তাকিয়ে রইলো।
“সেই জন্যই তোমাকে নিয়ে যেতে এসেছি দানি।”
“আমি কাউকে বিয়ে করতে চাই না।”
“কেউ তোমাকে এখনই বিয়ে করতে বলছে না।”
দানিয়েলের ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের ক্ষীণ রেখা ফুটে উঠল।
“কিন্তু সবাই এমনভাবে এগোচ্ছে, যেন সিদ্ধান্তটা অনেক আগেই হয়ে গেছে।”
লেডি ভিক্টোরিয়া কোনো উত্তর দিলো না।
কারণ তিনি জানেন, এই মানুষটির কাছে রাজপরিবারের উত্তরাধিকার, ঐতিহ্য কিংবা রাজনৈতিক সম্পর্কের মূল্য খুব সীমিত। তার জীবনের আসল সিংহাসন বহু আগেই বদলে গেছে।
রাজপ্রাসাদের সোনালি দেয়ালের পরিবর্তে তার পৃথিবী এখন অন্ধকারে ঘেরা। ক্ষমতা তার কাছে রক্তের উত্তরাধিকার নয়। ক্ষমতা তার নিজের হাতে তৈরি।
ভিক্টোরিয়া ধীরে বললো,
“তুমি প্রাসাদে যাবে। তার সঙ্গে দেখা করবে। তারপর নিজের মুখে জানিয়ে দেবে তুমি এই সম্পর্কের জন্য রাজি নও।”
দানিয়েল কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। শেষ পর্যন্ত কোটটা তুলে নিল সে।
“ঠিক আছে।”
ভিক্টোরিয়ার চোখে সামান্য স্বস্তি ফুটে উঠল।কিন্তু দরজার দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় দানিয়েল থেমে গেল। ল্যাভেন্ডার চোখজোড়ায় আবারও এক মুহূর্তের জন্য ভেসে উঠল অন্য একটি মুখ।
এক জোড়া তীক্ষ্ণ চোখ।
রক্তাক্ত বুক। আর সেই চোখের সামনে নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়ার অসহায়তা।
তারপরই মুখের অভিব্যক্তি কঠিন হয়ে গেল।আজ রাজপ্রাসাদে যাওয়ার আরেকটা কারণও আছে।
এই সম্পর্কের প্রস্তাবটা যত দ্রুত সম্ভব শেষ করতে হবে।অন্ধকার সাম্রাজ্যের গডফাদার আর রাজপরিবারের এই পুরোনো জটিলতার মধ্যে নিজেকে আটকে রাখতে চায় না।
ভিক্টোরিয়ার সঙ্গে বেরিয়ে গেল সে। কিছুক্ষণ পর সারপেন্ট পেন্টহাউসের ব্যক্তিগত ল্যান্ডিং প্যাডে আবারও প্রস্তুত হলো কালো চপার।
দুবাইয়ের আকাশে উড়ে চলল সেটি। গন্তব্য রাজপ্রাসাদ।
সামনে অপেক্ষা করছে রাজপরিবারের আরেকটি অধ্যায়। আর সেই অধ্যায়ের প্রথম বাক্যটাই আজ নিজের হাতে শেষ করতে চায় অন্ধকারের সম্রাট।
রাজপ্রাসাদের বিশাল হলরুমে তখনও আলোচনা চলছিল। সোনালি ঝাড়বাতির আলোয় রাজকীয় পরিবেশ আরও গম্ভীর হয়ে উঠেছে। এক পাশে বসে রয়েছেন রয়্যাল কিং, অন্য পাশে রাজপরিবারের সদস্যরা। আর তাদের মাঝখানে বসে আছে রাজরক্তের সেই উত্তরাধিকারী, যার চোখে রাজপ্রাসাদের আভিজাত্যের চেয়ে অন্ধকার সাম্রাজ্যের কঠোরতাই বেশি স্পষ্ট।
রাজপ্রাসাদের বিশাল হলরুমের দরজা পেরিয়ে ভিক্টোরিয়ার সঙ্গে অন্ধকার সাম্রাজ্যের অধিপতি যখন ভেতরে প্রবেশ করল, তখন তার সামনে অপেক্ষা করছিলেন এক রাজ্যের রাজা। বহু দূরের সেই রাজ্য থেকে নিজের রাজকীয় মর্যাদা নিয়ে তিনি এসেছেন একমাত্র উদ্দেশ্যে—দুই রাজপরিবারের সম্পর্ককে বিবাহের বন্ধনে আবদ্ধ করা।
রয়্যাল কিং-এর সঙ্গে কিছুক্ষণ আনুষ্ঠানিক কথাবার্তা চলল। রাজনীতি, রাজপরিবারের সম্পর্ক, দুই সাম্রাজ্যের ভবিষ্যৎ—আলোচনার বিষয় কম ছিল না। কিন্তু যার জীবন নিয়ে এত পরিকল্পনা, সেই রাজরক্তের উত্তরাধিকারীর চোখে পুরো বিষয়টির প্রতি কোনো আগ্রহই দেখা গেল না।
অবশেষে সে শান্ত গলায় বলল, “আমি রাজকন্যার সঙ্গে একান্তে কিছু কথা বলতে চাই।”
রয়্যাল কিং সম্মতি জানাতেই রাজকন্যা উঠে দাঁড়ালেন।
দুজন প্রাসাদের বিশাল হলরুম ছেড়ে পাশের নির্জন রাজকীয় বারান্দায় এসে দাঁড়াল।
চারপাশে রাজকীয় নীরবতা। দূরে বিস্তৃত প্রাসাদের বাগান, ঝরে পড়া ফোয়ারার জল আর বিকেলের ম্লান আলোয় দাঁড়িয়ে থাকা সেই রাজকন্যা—যার জীবনের সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার স্বপ্ন দীর্ঘদিন ধরে দেখছে দুই রাজপরিবার।
কিছুক্ষণ তার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল রাজরক্তের সেই উত্তরাধিকারী।
তারপর কোনো ভূমিকা না করেই বলল,
“আমি সরাসরি কিছু কথা বলব।”
রাজকন্যা শান্ত চোখে তাকালেন।
“বলুন।”
“আমি শুনেছি, তুমি আমাকে পছন্দ করো।”
রাজকন্যার ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
“হ্যাঁ।”
“আর তুমি একজন রয়্যাল প্রিন্সকে বিয়ে করতে চাও?”
“হ্যাঁ।”
উত্তরটা শুনে কয়েক মুহূর্ত নীরব রইল সে। তারপর ধীর, অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল, “তাহলে তোমার একটা বিষয় জানা উচিত। তুমি যে রয়্যাল প্রিন্সকে কল্পনা করে আমাকে পছন্দ করেছ, আমি এখন আর সেই মানুষটি নই।”
রাজকন্যার চোখে সামান্য প্রশ্ন ফুটে উঠল। “আমি আপনার সম্পর্কে অনেক কিছুই জানি।”
“না। তুমি আমার পরিচয় জানো, আমার জীবন জানো না।”
কণ্ঠে এবার রাজকীয় কোমলতার কোনো ছাপ রইল না।
“আমি এখন আন্ডারওয়ার্ল্ডের সম্রাট। আমার পৃথিবী রাজপ্রাসাদের মতো নয়। সেখানে আইন মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করে না, ক্ষমতা করে। আমার চারপাশে র/ক্ত আছে, খু/ন আছে, অপরাধ আছে। প্রতিদিন এমন সিদ্ধান্ত নিতে হয়, যেগুলোর ভার একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে বহন করা কঠিন।”
রাজকন্যা বিন্দুমাত্র বিচলিত হলেন না।
“আমি সব জানি।”
ল্যাভেন্ডার চোখজোড়া এবার তার মুখে স্থির হলো।
“সব?”
“লেডি ভিক্টোরিয়া আমাকে আপনার সম্পর্কে সব বলেছেন।”
কয়েক মুহূর্ত রাজকন্যার দিকে তাকিয়ে রইল অন্ধকারের সম্রাট। তারপর ধীরে ধীরে বলল,
“তবুও তুমি এই বিয়েতে রাজি?”
“হ্যাঁ আমার কোনো সমস্যা নেই বিয়েতে।”
উত্তরটা শুনে তার চোয়াল সামান্য শক্ত হয়ে উঠল।
“কিন্তু আমার সমস্যা আছে।”
রাজকন্যা নীরবে তাকিয়ে রইলেন।
সে কয়েক মুহূর্ত কোনো কথা বলল না। তারপর বারান্দার রেলিংয়ের দিকে এগিয়ে গিয়ে নিচে তাকাল। দূরে রাজপ্রাসাদের বাগান, অথচ তার চোখে সেই সৌন্দর্যের কোনো প্রতিফলন নেই।
অবশেষে ফিরে দাঁড়াল।
“I’m not into women.”
রাজকন্যার চোখে বিস্ময়ের ছায়া নেমে এলো।
সে নির্বিকার স্বরে বলল, “I’m gay.”
কথাটা বলার সময় তার মুখাবয়বে এতটুকু দ্বিধা দেখা গেল না।
রাজকন্যা কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ হয়ে রইলেন। অন্ধকারের সেই সম্রাট এবার আরও স্পষ্ট করে বলল,
“আমার একজন বয়ফ্রেন্ডও আছে।”
রাজকন্যার চোখে এবার বিস্ময় আরও গভীর হলো।
“তাই তুমি যদি আমাকে বিয়েও করো, এই সম্পর্ক থেকে স্বামী-স্ত্রীর স্বাভাবিক কোনো সম্পর্ক পাবে না। তোমাকে আমি সেই অধিকার দিতে পারব না কারন আমিতো তোমার প্রতি স্যাক্সুয়াল অ্যাট্রাক্টই ফিল করবো না।”
কণ্ঠে কোনো অপরাধবোধ নেই, কোনো সংকোচ নেই। কথাগুলো এমন নিখুঁত স্বাভাবিকতায় উচ্চারিত হলো, যেন তার জীবনের সবচেয়ে স্বাভাবিক সত্যটিই সে জানিয়ে দিচ্ছে।
রাজকন্যা ধীরে ধীরে বললেন, “আপনি এতদিন কাউকে বলেননি?”
ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ এক বাঁকা হাসি ফুটল।
“কারণ কাউকে বলার প্রয়োজন পড়েনি।”
কয়েক মুহূর্ত নীরবতা নেমে রইল। তারপর সে শান্ত গলায় বলল,
“তাই তোমার সামনে এখনো সুযোগ আছে। তুমি চাইলে এই সম্পর্ক থেকে সরে যেতে পারো। আমি তোমাকে কোনোভাবেই বাধ্য করব না।”
রাজকন্যা তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। চোখে দ্বিধা, বিস্ময় আর একসঙ্গে ভেঙে পড়া কিছু প্রত্যাশার ছায়া।
অন্ধকারের সম্রাট আবারও বলল,
“তোমার পিতাকে যা বলার বলো। এই বিয়ে হওয়ার কোনো কারণ নেই।”
কথাগুলো শেষ করে সে আর দাঁড়াল না।ধীর পায়ে বারান্দা পেরিয়ে রাজপ্রাসাদের ভেতরের দিকে এগিয়ে গেল। তার পেছনে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন রাজকন্যা।
যে সম্পর্ককে ঘিরে দুই রাজপরিবার এতদিন ধরে ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনছিল, কয়েকটি বাক্যের মধ্যেই সেই স্বপ্নের দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল।
আর রাজরক্তের উত্তরাধিকারী? তার মুখে তখনও সেই একই কঠোরতা। কারণ নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে কোনো সম্পর্ককে জীবনের সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার চেয়ে, একটি মিথ্যাকে সত্যের মতো নিখুঁত করে তোলাই তার কাছে অনেক সহজ।
দানিয়েল আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না।
রাজকীয় বারান্দা পেরিয়ে ধীর পায়ে হলরুমের দিকে এগিয়ে গেল অন্ধকারের সম্রাট। মুখে তখনও সেই কঠিন, নির্লিপ্ত অভিব্যক্তি। কয়েক মুহূর্ত আগের কথোপকথনের কোনো ছাপ তার চোখেমুখে নেই।
হলরুমে ঢুকতেই ভিক্টোরিয়ার দৃষ্টি সঙ্গে সঙ্গে তার ওপর গিয়ে থামল। দানিয়েলের মুখের দিকে তাকিয়েই তিনি বুঝতে পারলেন, কথোপকথনটা প্রত্যাশামতো হয়নি।
ভিক্টোরিয়া কয়েক পা এগিয়ে এসে প্রশ্ন করলেন,
“কী হলো, দানি?”
ফ্যান্টম কিং থামল।
ল্যাভেন্ডার চোখজোড়া ধীরে ধীরে ভিক্টোরিয়ার দিকে উঠল। মুখে কোনো বিরক্তি নেই, কণ্ঠেও নেই কোনো ব্যাখ্যা দেওয়ার ইচ্ছা। শুধু শান্ত, ঠান্ডা স্বরে বলল,
“যা বলার, প্রিন্সেস বলবে।”
এইটুকু বলেই আর দাঁড়াল না সে। ভিক্টোরিয়া কয়েক মুহূর্ত তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল। হলরুমে আবার নেমে এলো নীরবতা। রয়্যাল কিং এতক্ষণ চুপচাপ বসে ছিলেন। এবার তিনি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন।
ভিক্টোরিয়ার দৃষ্টি তার দিকে ফিরতেই তিনি শান্ত কণ্ঠে বললেন, “এই সম্পর্ক নিয়ে আর কোনো আলোচনা করার প্রয়োজন নেই।”
ভিক্টোরিয়ার ভ্রু সামান্য কুঁচকে গেল।
“কী বলতে চাইছেন?”
রয়্যাল কিং কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে বললেন,
“আমার রাজকন্যা এই বিয়েতে রাজি নয়।”
কথাটা শুনে ভিক্টোরিয়া কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রইলেন।
“সে নিজেই সিদ্ধান্তটা নিয়েছে?”
“হ্যাঁ।”
রয়্যাল কিং-এর কণ্ঠে এবার পিতৃসুলভ কোমলতা ফুটে উঠল।
“আমি তাকে কোনো সিদ্ধান্তে বাধ্য করব না। দানিয়েলের সঙ্গে কথা বলার পর সে নিজের সিদ্ধান্ত আমাকে জানিয়েছে। সে এই সম্পর্ক থেকে সরে দাঁড়াতে চায়।”
ভিক্টোরিয়া ধীরে মাথা নাড়লেন। “আমি বুঝতে পারছি।”
রয়্যাল কিং দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “রাজপরিবারের সম্পর্ক সবসময় রাজনীতি কিংবা ক্ষমতার হিসাব মেনে হয় না, ভিক্টোরিয়া। কখনো কখনো একজন মানুষের নিজের ইচ্ছেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।”
ভিক্টোরিয়া আর কিছু বললেন না।
কিন্তু আজকের সিদ্ধান্তের পেছনে ঠিক কতটা সত্যি আর কতটা গোপনীয়তা রয়েছে, সেটা এখনও ভিক্টোরিয়ার অজানা।
রাজকন্যার সঙ্গে কথোপকথন শেষ করার পর দানিয়েলের দীর্ঘদেহী অবয়বটা ধীর পদক্ষেপে হলরুম পেরিয়ে অ্যাশফোর্ড প্রাসাদের সেই পুরোনো অংশের দিকে এগিয়ে চলল, যে অংশটায় বহু বছর ধরে তার পা পড়েনি।
এই পথটা সে যত বছরই ভুলে থাকার চেষ্টা করুক, ভুলতে পারেনি।
দীর্ঘ রাজকীয় করিডোরের দেয়ালে ঝোলানো পুরোনো প্রতিকৃতিগুলো একে একে পেছনে পড়ে যেতে লাগল। দেয়ালের সোনালি কারুকাজের ওপর সময়ের ছাপ স্পষ্ট, জানালার কাঁচে জমে থাকা রাতের অন্ধকার আর মৃদু হলুদ আলোয় পুরো করিডোরটাকে অতীতের কোনো পরিত্যক্ত স্মৃতির মতো মনে হচ্ছিল। অবশেষে করিডোরের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে থামল রুঢ় মানবটি।
সামনে সেই পরিচিত দরজা। যে দরজার ওপাশে একসময় তার পৃথিবীটা ছিল অনেক ছোট, অনেক সহজ, আর অনেক বেশি কোমল।
কয়েক সেকেন্ড নিঃশব্দে দরজাটার দিকে তাকিয়ে রইল দানিয়েল। তারপর ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে ছিটকিনিটা সরিয়ে দিল।
দরজা খুলতেই বহু বছরের পুরোনো একটা গন্ধ তার নাকে এসে লাগল।
এক মুহূর্তেই যেন সময় পিছিয়ে গেল।
ঘরটা প্রায় আগের মতোই আছে।
এক পাশে ছোটবেলার কাঠের খেলনাগুলো এখনও যত্নহীনভাবে পড়ে আছে—পুরোনো খেলনা ঘোড়া, কয়েকটা ছোট্ট খেলনা গাড়ি, কাঠের তৈরি সৈনিকের দল। সময়ের ধুলো তাদের গায়ে জমে রং অনেকটাই ফিকে করে দিয়েছে, কোথাও কোথাও কাঠে বয়সের দাগ পড়েছে, তবুও দানিয়েলের চোখে সেগুলো এখনও ঠিক আগের মতোই জীবন্ত; যেন একটু পরেই সেই ছোট্ট ছেলেটা ছুটে এসে খেলনাগুলো হাতে তুলে নেবে।
ঘরের অন্য পাশে রয়েছে তার পুরোনো বইয়ের তাক। মনোবিজ্ঞান, সাইকিয়াট্রি, মানবমস্তিষ্ক, আচরণ, স্মৃতি আর ট্রমা নিয়ে লেখা অসংখ্য বই আর তার হাতে লেখা নোট এখনও সেখানে সাজানো। একসময় এই বইগুলোর মাঝেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা ডুবে থাকত দানিয়েল। মানুষের মন তাকে ছোটবেলা থেকেই অদ্ভুতভাবে আকর্ষণ করত—একজন মানুষ কেন হাসে, কেন কাঁদে, কেন একই আঘাত একজনকে ভেঙে দেয় অথচ অন্যজনকে আরও শক্ত করে তোলে, মানুষের মনের ভেতরে জমে থাকা অদৃশ্য ক্ষতগুলো কীভাবে তার পুরো জীবনকে বদলে দিতে পারে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই ধীরে ধীরে তার জীবনের পথ তৈরি হয়েছিল।
আর ঠিক সেই বইয়ের তাকের পাশের দেয়ালেই ঝুলছে একটি ছবি।
তার মায়ের ছবি।
ছবিটা দানিয়েল নিজেই এঁকেছিল।
কারণ এই বিশাল অ্যাশফোর্ড প্রাসাদে তার মায়ের কোনো ছবি ছিল না; রাজপরিবারের ইতিহাসে যেখানে একের পর এক রাজপুরুষ, রানি এবং বংশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের প্রতিকৃতি সযত্নে সংরক্ষিত ছিল, সেখানে তার মায়ের জন্য একটি ছোট্ট ছবির জায়গাটুকুও কেউ রাখতে চায়নি। তাই ছোট্ট দানিয়েল নিজের রং-তুলিতে মায়ের মুখটা এঁকে এই ঘরের দেয়ালে ঝুলিয়ে দিয়েছিল।
ছবিটার সামনে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল দানিয়েল।
তার ল্যাভেন্ডার রঙা চোখজোড়া স্থির হয়ে রইল মায়ের মুখের ওপর।মুহূর্তের মধ্যেই তার কঠিন মুখাবয়বের কোথাও যেন অদৃশ্য একটা রেখা নরম হয়ে এলো।
আর ঠিক তখনই—অতীতের একটা দরজা নিঃশব্দে খুলে গেল।
বহু বছর আগে
তখন দানিয়েল অনেক ছোট।
রাজপরিবারের সন্তান হওয়ার কারণে তার শৈশব কখনোই সাধারণ কোনো শিশুর মতো ছিল না। তার চারপাশে ছিল বিশাল প্রাসাদ, অগণিত দাস-দাসী, কঠোর রাজকীয় নিয়ম, নিরাপত্তারক্ষী, ক্ষমতাবান মানুষ আর এমন এক পরিবেশ, যেখানে প্রতিটি হাসির আড়ালেও কোনো না কোনো স্বার্থ লুকিয়ে থাকত।
তবুও সেই ছোট্ট দানিয়েল ছিল অদ্ভুত রকমের কোমল।
কারও কষ্ট দেখলে থেমে যেত, আহত কোনো পাখি দেখলে সেটাকে হাতে তুলে নিয়ে পরিচর্যা করত, প্রাসাদের কোনো কর্মচারী অসুস্থ হয়ে পড়লে লুকিয়ে তার খোঁজ নিত। রাজপরিবারের র/ক্ত তার শরীরে থাকলেও অহংকার তার স্বভাবে জায়গাই করে নিতে পারেনি।
আর দেখতে?
সেই বয়সেই ছেলেটা ছিল অস্বাভাবিক রকমের সুন্দর।
রাজপরিবারের র/ক্ত যেন তার চেহারায় নিজের সমস্ত সৌন্দর্য ঢেলে দিয়েছিল—স্বচ্ছ ত্বক, গভীর ল্যাভেন্ডার চোখ, কোমল অথচ আকর্ষণীয় মুখাবয়ব আর এমন এক নিষ্পাপ সৌন্দর্য, যার দিকে তাকালে মানুষ অজান্তেই দ্বিতীয়বার তাকাতে বাধ্য হতো।
কিন্তু সেই সৌন্দর্য ধীরে ধীরে তার জন্য আশীর্বাদ না হয়ে অভিশাপ হয়ে উঠেছিল।
রাজপরিবারের সঙ্গে ওঠাবসা করা অনেক বয়স্ক রয়্যাল নারী তার সৌন্দর্যের প্রতি অস্বাভাবিক আগ্রহ দেখাতে শুরু করেছিলেন। কেউ তাকে দামি উপহার পাঠাতেন, কেউ অকারণে তার কাছে আসার চেষ্টা করতেন, আবার কেউ কেউ রয়্যাল কিং-এর কাছে এমন ইঙ্গিতও দিতেন যে এই সুন্দর রাজপুত্রকে কেন্দ্র করে তারা কতটা আগ্রহী এবং বিনিময়ে কত কিছু দিতে প্রস্তুত।
ছোট্ট দানিয়েল তখন এসবের গভীর অর্থ বুঝত না।
সে শুধু বুঝত, কিছু মানুষের চোখে সে একজন মানুষ নয়। একটা মূল্যবান জিনিস।
একদিন নিজের বাবার কাছ থেকেই সে এমন কিছু শব্দ শুনে ফেলেছিল, যেগুলোর অর্থ পুরোপুরি বোঝার মতো বয়স তখনও তার হয়নি, কিন্তু শব্দগুলো তার কোমল মনে একটা আতঙ্ক তৈরি করেছিল—মূল্য, চুক্তি, নিলাম।
সেদিন রাতে মায়ের কাছে গিয়ে সে অনেকক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে হঠাৎ জিজ্ঞেস করেছিল, “মা, মানুষকে কি সত্যিই বিক্রি করা যায়?”
ছেলের প্রশ্ন শুনে তার মা কয়েক মুহূর্ত একদৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তারপর কোনো উত্তর দেওয়ার আগে তাকে শক্ত করে নিজের বুকের মধ্যে টেনে নিয়েছিলেন।
“না, বাবা।”
তার কণ্ঠটা কেঁপে উঠেছিল। “কোনো মানুষ বিক্রি হওয়ার জিনিস নয়।”
ছোট্ট দানিয়েল মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে ফেলেছিল।
সে জানত না, তার মা তখন নিজের ভেতরে কতটা ভয় লুকিয়ে রেখেছেন। কারণ রয়্যাল কিং ইতিমধ্যেই নিজের ছেলের সৌন্দর্য, রাজরক্ত এবং ভবিষ্যৎকে ক্ষমতার আরেকটি হাতিয়ার হিসেবে দেখার মতো মানসিকতায় পৌঁছে গিয়েছিলেন।
একদিন সেই সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যেই সামনে এলো।
দানিয়েল তখনও খুব অল্পবয়সী। রাজকীয় সভাকক্ষে কয়েকজন প্রভাবশালী রয়্যাল পরিবার থেকে মানুষ এসেছিল। সেখানে দানিয়েলের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল এমনভাবে, যেন সে কোনো মানুষ নয় বরং সম্পদ।
রয়্যাল কিং-এর মুখে ছিল নির্লজ্জ শীতলতা।
“আমার পুত্ররের সৌন্দর্যের মূল্য অনেক।”
কথাটা শুনে দানিয়েলের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠেছিল।সে তখনও বুঝতে পারছিল না, কেন তার নিজের বাবা তার কথা এমনভাবে বলছেন।
কিন্তু তার মা বুঝেছিলেন। তিনি হঠাৎ ছেলের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। এক মুহূর্তে তিনি দানিয়েলকে নিজের পেছনে লুকিয়ে ফেলেছিলেন। নিজের শরীর দিয়েই পৃথিবীর সামনে একটা দেয়াল তুলে দিয়েছেন।
“আমার ছেলেকে কেউ ছুঁবে না।” তার কণ্ঠ কাঁপছিল।
রয়্যাল কিং ঠান্ডা চোখে স্ত্রীর দিকে তাকিয়েছিলেন।
“তুমি আমার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যাচ্ছ?”
“সে আপনার সম্পত্তি নয়।”
প্রাসাদে নেমে এসেছিল ভয়ংকর নীরবতা।দানিয়েল মায়ের পোশাক আঁকড়ে ধরে দাঁড়িয়েছিল। তার কিশোর বুক তখন ভয়ে কাঁপছে। সে বুঝতে পারছিল না কী হচ্ছে।শুধু বুঝতে পারছিল—তার মা তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করছেন।
আর তার বাবা সেই মানুষটাকেই শাস্তি দিতে প্রস্তুত, যে তার সামনে দাঁড়িয়েছে। সেদিন দানিয়েলের মা-ই তার ঢাল হয়েছিলেন।আর সেই ঢাল হওয়ার মূল্যও তাকেই দিতে হয়েছিল।তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল প্রাসাদের সেই অন্ধকার কক্ষে, যার নাম শুনলেই কিশোর দানিয়েলের বুক কেঁপে উঠত।
দানিয়েল ছুটে যেতে চেয়েছিল। কাঁদতে কাঁদতে দরজায় আঘাত করেছিল। “আমার মাকে ছেড়ে দিন!”
কিন্তু কেউ শোনেনি।সেদিন প্রথমবার কোমল কিশোরটি বুঝেছিল—রাজপরিবারের এই বিশাল প্রাসাদে তার মায়ের জন্য কোনো নিরাপদ জায়গা নেই।
এমনকি তার নিজের বাবার কাছেও নয়।
সেই রাতের পর দানিয়েল আর আগের মতো থাকেনি।
তার শৈশবের কোমলতা ধীরে ধীরে ভাঙতে শুরু করেছিল। তবু সে সম্পূর্ণ কঠিন হয়ে যায়নি।
বরং মানুষের কষ্ট বোঝার ক্ষমতাটা আরও তীব্র হয়ে উঠেছিল।সে মানুষের চোখ পড়তে শিখেছিল।
নীরবতার অর্থ বুঝতে শিখেছিল। কেউ হাসলেও তার ভেতরের কান্না চিনতে শিখেছিল।
আর সময় যত এগোচ্ছিল, দানিয়েল ততই বুঝতে শিখছিল তার বাবা কেমন মানুষ।
রয়্যাল কিং প্রায়ই নিজের কক্ষে বিভিন্ন নারীকে নিয়ে আসতেন। কখনও তারা প্রাসাদের অতিথি হিসেবে আসতেন, কখনও রাজপরিবারের পরিচিত কেউ, আবার কখনও এমন নারীও আসতেন, যাদের সম্পর্কে দানিয়েল কিছুই জানত না। ছোটবেলায় সে দূর থেকে এসব দৃশ্য দেখত, সবকিছু বোঝার মতো বয়স না থাকলেও একটা বিষয় তার চোখ এড়াত না—তার মা এসব কখনোই পছন্দ করতেন না।
যখনই সেই নারীদের কাউকে রয়্যাল কিং-এর কক্ষের দিকে যেতে দেখতেন, তার মায়ের মুখের হাসিটা মিলিয়ে যেত, চোখ দুটো নিঃশব্দ হয়ে উঠত, আর তিনি যেন নিজের ভেতরেই কোথাও হারিয়ে যেতেন।
একদিন করিডোরে দাঁড়িয়ে দানিয়েল দেখেছিল, তার বাবা নিজের কক্ষে ঢুকছেন। কিছুক্ষণ পর একজন নারী একই দরজা দিয়ে বেরিয়ে এলেন। ছোট্ট দানিয়েল তখন মায়ের হাত ধরে দাঁড়িয়ে ছিল।
মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে সে সরল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেছিল, “মা, বাবা সবসময় অন্য নারীদের আমাদের রাজ প্রাসাদে নিয়ে আসে কেন?”
তার মা কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলেন। তারপর ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে খুব আস্তে বলেছিলেন,
“সব প্রশ্নের উত্তর এখন জানতে হয় না, আড্রি।”
দানিয়েল উত্তরটা বুঝতে পারেনি। কিন্তু মায়ের চোখের কষ্টটা বুঝেছিল।
সেদিনের পর থেকে বাবার কক্ষের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় তার ছোট্ট পা দুটো অজান্তেই ধীর হয়ে যেত। কারণ সে জানত, ওই দরজার ওপাশে এমন কিছু আছে, যা তার মা দেখতে চান না।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই দৃশ্যগুলো আর অচেনা থাকল না। দানিয়েল বড় হতে লাগল। প্রাসাদের রাজনীতি বুঝতে শিখল, মানুষের মুখের হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা উদ্দেশ্য বুঝতে শিখল, আর সবচেয়ে বেশি বুঝতে শুরু করল নিজের মাকে।
তার মা কখনো প্রকাশ্যে বড় কোনো প্রতিবাদ করতেন না, কিন্তু তার সেই নীরবতাই ছিল সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ। রয়্যাল কিং-এর জীবনযাপন যতই বেপরোয়া হয়ে উঠতে লাগল, তাদের সম্পর্ক ততই বিষাক্ত হয়ে উঠল, আর সেই বিষাক্ততার ছায়া ধীরে ধীরে দানিয়েলের জীবনেও এসে পড়ল।
কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, বাবার জীবনযাপন দেখে দানিয়েল বাবার মতো হতে চায়নি। বরং তার মনে আরও বেশি করে প্রশ্ন জন্ম নিতে লাগল মানুষের মন নিয়ে।
একজন মানুষ কেন ভেঙে যায়?কেন কেউ নিজের কষ্ট কাউকে বলতে পারে না? কেন কিছু মানুষ নিজের কষ্ট অন্যের ওপর চাপিয়ে দেয়?
এই প্রশ্নগুলোই ধীরে ধীরে তাকে মনোবিজ্ঞানের দিকে টেনে নিয়ে গেল।
সময় গড়িয়ে গেল।
কোমল কিশোর দানিয়েল একদিন যুবক হলো।
আর সেই যুবকই একসময় পরিচিতি পেল বিখ্যাত সাইকিয়াট্রিস্ট অ্যাড্রিয়ান অ্যাশফোর্ড নামে।
মানুষের মনের চিকিৎসা করত সে। ট্রমার ভেতর আটকে থাকা মানুষকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনত, মানুষের আচরণের গভীরে লুকিয়ে থাকা কারণ খুঁজে বের করত এবং এমন মানুষদের পাশে দাঁড়াত, যাদের ভেতরের যুদ্ধটা বাইরের পৃথিবী কখনো দেখতে পায় না।
অন্যের মনের অন্ধকারে প্রবেশ করতে সে কখনো ভয় পেত না। কিন্তু নিজের জীবনের অন্ধকার?
সেটা তখনও তার কাছে অমীমাংসিত।
আর রয়্যাল কিং তার ছেলের এই পেশাটাকে কখনোই সম্মান করেননি। তার কাছে মানুষের মন বোঝা ছিল দুর্বলতার পরিচয়। তিনি চেয়েছিলেন তার ছেলে শুধু একজন সাইকিয়াট্রিস্ট হয়ে থাকবে না; তিনি চেয়েছিলেন দানিয়েল হবে ক্ষমতার এমন এক প্রতীক, যার নাম শুনলেই মানুষ ভয়ে নতজানু হবে, যার একটি নির্দেশে শাস্তি নেমে আসবে, যার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলার সাহস করার আগেই মানুষ নিজের পরিণতি নিয়ে ভাববে।
শুধু রয়্যাল প্রিন্স নয়—তিনি চেয়েছিলেন তার ছেলে একদিন অন্ধকার জগতের সম্রাট হোক।
কিন্তু দানিয়েল মানুষের ওপর ক্ষমতা দেখানোর চেয়ে মানুষের ভাঙা মন বুঝতে বেশি আগ্রহী ছিল।
আর এই আদর্শের পার্থক্যই ধীরে ধীরে বাবা-ছেলের সম্পর্ককে আরও দূরে ঠেলে দিয়েছিল।
একদিন সেই সংঘাত সরাসরি এসে পড়ল দানিয়েলের ব্যক্তিগত জীবনে। তখন সে প্রতিষ্ঠিত সাইকিয়াট্রিস্ট। নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত, নিজের পরিচয় নিয়ে সন্তুষ্ট। কিন্তু এক রাতে নিজের কক্ষে ফিরে এসে দরজা খুলতেই থমকে দাঁড়িয়ে গেল সে।
ঘরের ভেতরে একজন নারী অপেক্ষা করছিল তার বিছানায় বসে। নারীর পোশাক ছিলো রাজকীয় কিন্তু অর্ধনগ্ন অবস্থায় বসে ছিলো সেই রমণী।
প্রথমে কিছুই বুঝতে পারেনি দানিয়েল। কিন্তু কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সবটা পরিষ্কার হয়ে গেল—তাকে সেখানে পাঠানো হয়েছে রয়্যাল কিং-এর নির্দেশে।
সেদিন দানিয়েল আর নিজের রাগ চেপে রাখতে পারেনি। সোজা বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে কঠিন গলায় বলেছিল,
“আমার কক্ষে ওই নোংরা নারীকে কেন পাঠিয়েছেন?”
রয়্যাল কিং নির্বিকারভাবে ছেলের দিকে তাকিয়েছিলেন।
“কেন? ভালো লাগেনি? পছন্দ হয়নি?”
“এসব বন্ধ করুন।”
রয়্যাল কিং হাসলো। তারপর বললো “তুই এখন বড় হয়েছিস, অ্যাড্রিয়ান। এসব থেকে পালিয়ে থাকলে চলবে?”
দানিয়েলের চোখ ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে উঠেছিল।
“আমি এসব চাই না।”
রয়্যাল কিং-এর হাসি মিলিয়ে গিয়েছিল। সে কঠোরভাবে বললো “তুই কি পুরুষ না? তুই কি দুর্বল? তোর মধ্য যৌন আকাঙ্ক্ষা নেই?”
দানিয়েল কিছুক্ষণ বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিল, “আপনার কাছে যেটা স্বাভাবিক, আমার কাছে সেটা নয়।”
রয়্যাল কিং বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন,
“এখন থেকেই এই জীবনটা উপভোগ করতে শিখ। ক্ষমতা, অর্থ, নারী এসবই রাজপরিবারের মানুষের জীবন। কতটা সুন্দর এই জীবন, সেটা উপভোগ না করলে বুঝবি কী করে?”
দানিয়েলের চোখে তখন শুধু ঘৃণা।
“আপনার কাছে সুন্দর হতে পারে। আমার কাছে এটা অন্তত নোংরা।”
কথাটা শুনে রয়্যাল কিং-এর মুখ শক্ত হয়ে গিয়েছিল।
“তুই আমার ছেলে হয়ে আমার জীবনকে বিচার করছিস?”
“আমি আপনার জীবনকে বিচার করছি না,” দানিয়েল শান্ত গলায় বলেছিল, “আমি শুধু আমার জীবনটা নিজের মতো বেছে নিতে চাই।”
“নিজের মতো?”
রয়্যাল কিং-এর ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠেছিল।
“তুই অ্যাশফোর্ড বংশের ছেলে। তোর জীবন তুই ঠিক করবি না। তোর জীবন ঠিক করবে তোর রক্ত আর তোর সিংহাসন।”
দানিয়েলের উত্তর ছিল অস্বাভাবিক শান্ত।
“আমি সিংহাসন চাই না।”
সেই একটি বাক্যই তাদের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় সংঘাতের শুরু হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
কারণ রয়্যাল কিং চেয়েছিলেন তার ছেলে শুধু রাজপরিবারের উত্তরাধিকারী হয়ে না থাকুক; সে হবে এমন এক ক্ষমতার অধিপতি, যার নাম অন্ধকার জগতের মানুষও ভয়ে উচ্চারণ করবে।
কিন্তু দানিয়েল তখনও বিশ্বাস করত, মানুষের ওপর ক্ষমতা দেখানোর চেয়ে মানুষের ভাঙা মনটা বুঝতে পারা অনেক বড় শক্তি।
সে জানত না, তার বাবার নিষ্ঠুরতা একদিন তাকে এমন এক পথে নিয়ে যাবে, যেখানে নিজের সেই আদর্শকেই তাকে পেছনে ফেলে আসতে হবে।
আর তার মায়ের গল্প?
সেটা তখনও শেষ হয়নি।
রয়্যাল কিং-এর জীবনযাপনের বিরুদ্ধে তার মা যতবারই প্রতিবাদ করেছেন, ততবারই তাকে শাস্তি পেতে হয়েছে। কখনও অপমান, কখনও বন্দিত্ব, কখনও প্রাসাদের সেই গোপন নির্যাতনকক্ষ—যে জায়গাটার নাম শুনলেই ছোটবেলার দানিয়েলের বুক কেঁপে উঠত।
একসময় সেই দৃশ্যও তাকে নিজের চোখে দেখতে হয়েছিল। তার মাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে সেই অন্ধকার কক্ষের দিকে।
দানিয়েল ছুটে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু রাজপরিবারের প্রহরীরা তাকে আটকে দিয়েছিল।
সে ছটফট করেছিল, মাকে ডাকতে চেয়েছিল, কিন্তু সেই বিশাল প্রাসাদে তার কণ্ঠ যেন নিজের বাবার ক্ষমতার কাছেই পরাজিত হয়ে গিয়েছিল।
সেদিন প্রথমবার সেই রুঢ় মানবের ভেতরে জন্ম নিয়েছিল এক ভয়ংকর উপলব্ধি—সে রাজপরিবারের সন্তান হয়েও নিজের মাকে রক্ষা করার মতো ক্ষমতা রাখে না।
তারপর এসেছিল সেই রাত। যে রাতের পর তার মায়ের কণ্ঠ আর আগের মতো ছিল না।
রয়্যাল কিং-এর নিষ্ঠুর নির্যাতনের একপর্যায়ে তার মায়ের কণ্ঠনালিতে জ্বলন্ত কয়লা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেই নি/র্মম নি/র্যাতনের পর তিনি চিরতরে হারিয়ে ফেলেছিলেন নিজের কণ্ঠস্বর। আর মায়ের সেই অসহায়, যন্ত্রণাকাতর দৃশ্য নিজের চোখে দেখা দানিয়েলের কোমল হৃদয়ে বেঁচে থাকা শেষটুকু কোমলতাকেও ভেতর থেকে চূর্ণ করে দিয়েছিল। সেই রাতের পর তার ভেতরে কিছু একটা চিরতরে মরে গিয়েছিল।
রয়্যাল কিং-এর নৈতিক অধঃপতন এতটাই জঘন্য ছিল যে, নিজের স্ত্রীকেও তিনি নিজের আপন ভাইয়ের ভোগের জন্য ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। নিজের ভাইয়ের লালসা সম্পর্কে তিনি ভালোভাবেই জানতেন; তবুও ইচ্ছা করেই স্ত্রীকে তার কক্ষে পাঠিয়ে দিতেন জোর করে। স্ত্রীর সম্মতি, অপমান কিংবা যন্ত্রণার প্রতি তার বিন্দুমাত্র পরোয়া ছিল না বরং অন্যের হাতে নিজের স্ত্রীকে তুলে দেওয়াটাকেই তিনি নিজের ক্ষমতার আরেকটি বি/কৃত প্রদর্শন হিসেবে দেখতেন।
সেদিন দানিয়েল বুঝেছিল, মানুষের শরীরের ক্ষত একদিন শুকিয়ে যেতে পারে, কিন্তু মনের ক্ষত কখনো কখনো মানুষকে সারাজীবন তাড়া করে বেড়ায়।
সম্ভবত সেই কারণেই সে মানুষের মন নিয়ে আরও গভীরে যেতে চেয়েছিল। অন্যের ট্রমা সারাতে চেয়েছিল। অন্যের ভেঙে যাওয়া মানুষটাকে আবার দাঁড় করাতে চেয়েছিল।
কিন্তু জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা ছিল— যে মানুষটাকে সে পৃথিবীর যেকোনো মানুষের চেয়ে বেশি ভালোবাসত, সেই নিজের মায়ের ভাঙা মনটাকে সে কখনো জোড়া লাগাতে পারেনি।
আর নিজেরটাকেও নয়।
বর্তমানে ফিরে এলো দানিয়েল।
অ্যাশফোর্ড প্রাসাদের সেই পুরোনো ঘরটা এখনও নিস্তব্ধ। তার সামনে মায়ের ছবি।
একসময়ের বিখ্যাত সাইকিয়াট্রিস্ট অ্যাড্রিয়ান অ্যাশফোর্ড ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে ছবিটার ফ্রেম ছুঁয়ে দিল। আঙুলের ডগায় জমে থাকা ধুলো মুছে গেলেও স্মৃতির ধুলো যেন কিছুতেই মুছে গেল না।
তার চোখের সামনে একসঙ্গে ভেসে উঠল সেই পুরোনো করিডোর, বাবার বন্ধ দরজা, মায়ের নীরব মুখ, নিজের শৈশব, মানুষের মন নিয়ে পড়ে থাকা রাতগুলো, প্রথম রোগী, প্রথম থেরাপি, আর সেই অসহায় রাত—যেদিন সে নিজের মাকে রক্ষা করতে পারেনি।
একসময়ের কোমল কিশোরটি ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল। অ্যাড্রিয়ান অ্যাশফোর্ড কোথায় যেন বহু বছর আগেই হারিয়ে গেছে।
তার জায়গায় জন্ম নিয়েছে এমন এক মানুষ, যে মানুষের মন পড়তে পারে, মানুষের দুর্বলতা বুঝতে পারে, মানুষের ট্রমার গভীরে পৌঁছাতে পারে—কিন্তু প্রয়োজনে সেই মনকেই ভেঙে দেওয়ার ক্ষমতাও রাখে।
যে একসময় মানুষের ক্ষত সারাত, একদিন সেই মানুষটাই নিজের সমস্ত অন্ধকারকে অস্ত্র বানিয়ে নিয়েছিল।রাজপরিবারের সেই কোমল কিশোর আজ আর কেবল রাজপুত্র নয়।
সে এখন—ফ্যান্টম কিং।
অন্ধকার সাম্রাজ্যের সেই সম্রাট, যার নাম শুনলে ক্ষমতাবান মানুষও নিজের কণ্ঠ নিচু করে কথা বলে।
দানিয়েল আরও একবার মায়ের ছবিটার দিকে তাকাল। তার কঠিন মুখে তখনও স্থিরতা, অথচ চোখের গভীরে বহু বছরের পুরোনো একটা ব্যথা এখনও নিঃশব্দে বেঁচে আছে।
খুব নিচু স্বরে সে বলল, “আমি তোমাকে সেদিন বাঁচাতে পারিনি, মা।”
কণ্ঠটা থেমে গেল তার। কয়েক মুহূর্ত পর আবার বলল,
“কিন্তু তোমার কষ্ট আমাকে যে মানুষটা বানিয়েছে…”
তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল এক নিঃশব্দ, বিষণ্ণ হাসি।
“সেই মানুষটাকে পৃথিবী এখন ফ্যান্টম কিং নামে চেনে।”
ঘরের নীরবতার ভেতর কথাগুলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। আর দেয়ালে ঝুলে থাকা মায়ের ছবিটা নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল তার দিকে—ছবির ভেতরের সেই নারী বোধহয় এখনও তার ছোট্ট ছেলেটাকেই দেখছেন, অন্ধকার সাম্রাজ্যের সম্রাটকে নয়।
আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ২৯
কিন্তু দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি আর সেই কোমল কিশোর নেই।
সে এখন রুঢ় মানব। সে এখন আন্ডারওয়ার্ল্ডের ফ্যান্টম কিং। আর তার হৃদয়ের গভীরে আজও বেঁচে আছে সেই একমাত্র মানুষটির স্মৃতি—যে তাকে কখনো রাজপুত্র, উত্তরাধিকারী কিংবা কোনো মূল্যবান সম্পদ হিসেবে দেখেনি। শুধু নিজের সন্তান হিসেবে ভালোবেসেছিল।
