Home ইন্তেজার এ ওয়াসিল ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ৩

ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ৩

ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ৩
নওরিন কবির তিশা

শহরের ব্যস্ত রাজপথের বুকে তপ্ত পিচ অগ্নি হল্কা ছড়াচ্ছে। স্কুটি নিয়ে বাতাসের গতিতে ছুটে চলছিল ‌তিয়াশা, হুট করেই ওর নজর কাড়ল মাঝরাস্তায় পড়ে থাকা এক অবোধ প্রাণ। সজোরে ব্রেক কোষে স্কুটির গতি রোধ করল ও।
​রাস্তার ঠিক মাঝখানে এক শ্বেতশুভ্র বিড়ালছানা যন্ত্র’ণায় কুণ্ডলী পাকিয়ে পড়ে আছে। ওর শরীর থেকে চুইয়ে পড়ছে তাজা র-ক্ত। চারপাশ দিয়ে দানবীয় সব যানবাহন পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে, যেন কারো এক মুহূর্ত থামার ফুরসত নেই। তিয়াশা সময়ক্ষেপণ না করে স্কুটি থেকে নেমে পড়ল।

ঝড়ের বেগে ছুটে গিয়ে বিড়ালছানাটাকে আলতো করে কোলের মধ্যে তুলে নিল ও। ওর হৃদপিণ্ড তখনো সজোরে ধুকপুক করছে। অবোধ প্রাণীটার কম্পমান শরীর আর অসহায় চোখদুটো যেন তিয়াশার কাছে জীবনের এক করুণ আর্তি প্রকাশ করছে। ব্যস্ত সড়কের যান্ত্রিকতাকে উপেক্ষা করে তিয়াশা তখন কেবল ওই প্রাণটুকুকে বাঁচানোর অদম্য মায়ায় বিভোর।
শহরের ব্যস্ত ট্রাফিক জ্যাম আর হর্নের বীভৎস শব্দের মাঝে তিয়াশা তখন যেন এক ভিন্ন জগতের বাসিন্দা। ওর পরনের ওড়নাটা অবাধ্য বাতাসের ঝাপটায় অবিন্যস্ত হয়ে উড়ছে। ঠিক সেই মুহূর্তে পিছন থেকে টায়ার ঘষটানোর কর্কশ শব্দ কানে এলো। সেই সাথে ভেসে এলো এক তাচ্ছিল্যভরা পুরুষালি কণ্ঠ,,
“আরে ম্যাডাম! মাথার স্ক্রু কি লুজ হয়ে গেছে? রাস্তার মাঝখানে জান দেওয়ার শখ হলে অন্য কোথাও যান, মাঝরাস্তায় এই সস্তা সেন্টিমেন্ট দেখানোর মানে কী?”

বিড়ালছানাটাকে বুকে আগলে রেখেই তিয়াশা অগ্নিদৃষ্টি নিয়ে পিছন ফিরে তাকালো। বাতাসের ঝাপটায় অবিন্যস্ত চুলগুলো সরাতেই ওর চোখ পড়ল গাড়ি থেকে নামা সেই সুঠাম দেহী অবয়বটির দিকে। চোখে দামী সানগ্লাস, ঠোঁটে সেই চিরচেনা বিদ্রূপের হাসি। আরাভ খান!তিয়াশার গলার স্বর হুট করেই সপ্তমে চড়ল,,
“ইউ্য!”
আরাভ সানগ্লাসটা কপাল অব্দি তুলে যেন আকাশ থেকে পড়ল,,
“ওহ মাই গড! দ্য ড্রামা কুইন! তুমি এখানে কী করছো? ওহ স্যরি, ইউ্য তো গ্রেট সোশিওলজিস্ট, মাঝরাস্তায় বিড়াল উদ্ধার করে কি নোবেল পাওয়ার ট্রাই করছো?”
তিয়াশা দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“ইউ্য রাস্কেল!”
আরাভ এক পা এগিয়ে এসে তাচ্ছিল্যভরে হাসল,,
“লুক তিয়াশা, ডোন্ট শো মি ইয়োর অ্যাটিটিউড। তোর তো আগে থেকেই স্ক্রু ঢিলা ছিল, এখন দেখছি পুরোপুরি পাগল হয়ে গেছিস। এই নোংরা বিড়ালের জন্য মাঝরাস্তায় জ্যাম লাগিয়ে বসে আছিস?”
তিয়াশা তেড়ে এল,,

“ কাল জেল থেকে ছাড়া পেয়েই খুব পাখা গজিয়েছে, না?”
আরাভ হুট করেই তিয়াশার এক হাত সজোরে চেপে ধরল। র’ক্ত লাল দৃষ্টি হেনে ধমকের সুরে বলল,,
“শাট আপ ইডিয়ট! তুই কার সাথে কথা বলছিস জানিস? আরাভ খানের সাথে কথা বলার যোগ্যতাও তোর নেই। ইউ্য আর জাস্ট আ লাকি গার্ল যে আমার বাবার দয়ায় এখনো শান্তিতে ঘুরছিস।”
তিয়াশা এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নিয়ে পাল্টা গর্জে উঠল,,
“আমি জানি তুই কে! একটা ড্রা”গি:স্ট, একটা ই:ভটি:জার আর একটা স্টুপিড লুজার। তোর মতো থার্ড ক্লাস ছেলের সাথে কথা বলাই রুচির ব্যাপার। তুই জানিস আমি কে? আমি ডিআইজি তাহের চৌধুরীর মেয়ে। তোর মতো গুন্ডাদের শায়েস্তা করা আমাদের ফ্যামিলি ট্র্যাডিশন!”
আরাভ এবার তিয়াশার খুব কাছে মুখ এসে বিদ্রূপের হাসি দিয়ে বলল,
“বড় বড় ডায়ালগ দিস না। তোর তো দেখছি কু’ত্তার মতো নাছোড়বান্দা স্বভাব। একবার ঝাড়ি খেয়েও শিক্ষা হয়নি? ওই যে বলে না, কু’ত্তার লেজ কখনো সোজা হয় না, তোর অবস্থাও তাই।”
তিয়াশা এবার ফেটে পড়ল,

“ কুকুর আমি না তুই? শোন আরাভ, তোর মতো জানোয়ারদের কোনো জাতই নেই। তাই তোর সাথে কথা বলার কোনো কারনও নেই;গেট আউট অফ মাই সাইট বিফোর আই কল মাই ফাদার!”
আরাভ এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে তিয়াশার রাগী মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর পকেটে হাত ঢুকিয়ে বাঁকা হেসে বলল,
“কল ইয়োর ফাদার? সিওর! উনাকে বলিস ওনার মেয়ে মাঝরাস্তায় বিড়াল নিয়ে রোমান্টিক সিন ক্রিয়েট করছে। বাই দ্য ওয়ে, এই জেদটা ধরে রাখিস তিয়াশা, কারণ খেলাটা তো জাস্ট শুরু হলো। সি ইউ ইন কলেজ, বেবি!”
আরাভ গটগট করে গাড়িতে উঠে বসল। তিয়াশা রাগে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে বিড়ালছানাটাকে নিয়ে স্কুটির দিকে এগোল।

ক্যাম্পাসের কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচের বাঁধানো বেঞ্চিতে বসে তিয়াশা অস্থিরভাবে পা নাচাচ্ছে। ওর কোলের ওপর রাখা ব্যান্ডেজ করা বিড়ালছানাটা এখন ঘুমে বিভোর। পাশে বসে ওর সবচেয়ে কাছের বন্ধু, আদ্রিতা। আদ্রিতা তিয়াশার ছোটবেলার সাথী, তাই ওর মনের খবরের হদিস আদ্রিতার চেয়ে ভালো কেউ জানে না।
​তিয়াশা পুরো ঘটনাটা এক নিঃশ্বাসে আদ্রিতাকে বলে থামল। আদ্রিতা কপালে ভাঁজ ফেলে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
​ “তিয়ু আই থিঙ্ক ইউ্য শ্যুড টক টু আঙ্কেল সিরিয়াসলি। সামথিং ইজ ডেফিনেটলি ফিশি। নাইলে যে ডিআইজি তাহের চৌধুরীকে অপরাধীরা যমের মতো ভয় দেখান, তিনি কেন হুট করে কোনো চার্জ ছাড়াই আরাভকে রিলিজ দেবেন? ইট জাস্ট ডাজ নট মেক সেন্স!”
​তিয়াশা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“আই নো আদ্রু! আব্বু বলছিলেন যে উনি নাকি পরিস্থিতির চাপে পড়েছেন। বাট হোয়্যাট কাইন্ড অফ প্রেসার?”
​আদ্রিতা তিয়াশার কাঁধে হাত রেখে একটু নিচু স্বরে বলল,

“লিসেন তিয়ু, আরাভ খান জাস্ট একজন মন্ত্রীর ছেলে না, ও একটা সাইকো। ওর রিভেঞ্জ নেওয়ার স্টাইল একদম আলাদা। গতকাল ক্লাবে ও নাকি তোর নামে যা তা বলছিল। আর তুই যে বললি ও তোকে মাঝরাস্তায় আবার হ্যারাস করল—দিস ইজ নট আ গুড সাইন। আই এম সিরিয়াসলি ওরিড অ্যাবাউট ইউ্য।”
​তিয়াশা জেদি গলায় বলল,
“ওকে আমি ডরাই না আদ্রু। ও একটা ড্রাগিস্ট লুজার ছাড়া আর কিচ্ছু না।”
​আদ্রিতা তিয়াশার দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে বলল,,
“শোন, সাহসের সাথে বোকামির একটা সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। আঙ্কেলের সাথে খোলাখুলি কথা বল। আস্ক হিম ডিরেক্টলি যে আরাভ খানের কাছে কোনো ব্ল্যাকমেইল করার মতো পয়েন্ট পেয়েছে কি না। বিকজ, ইন দিস টেকনো-ওয়ার্ল্ড, কারেক্টার এসাসিনেশন করা খুব ইজি। তুই জানিস না ওই আরাভ কতটা নিচে নামতে পারে। সো বি কেয়ারফুল, ওকে?”
​তিয়াশা আদ্রিতার কথার গভীরত্ব উপলব্ধি করে আনমনে বলল,,

“হু!”
আদ্রিতা আবারো কিছু বলতে উদ্যত হতেই তিয়াশাশা বলল,,
”ভাই কয়টা বাজে রে?”
আদ্রিতা এক ঝলক হাত ঘড়িটার পানে চেয়ে বলল,,
“২ টায় পাঁচ!”
“কি বলিস!”——জলদি পদক্ষেপে দাঁড়িয়ে পড়ল তিয়াশা।ওর এমন ব্যাতিব্যাস্ততায় আদ্রিতা ভ্রু কুঁচকে শুধালো,,
“কি হইছে?”
“আমাকে জয়নব ম্যামের বাসায় যেতে হবে,এক্ষুনি!”
”কেনো?”
”ভুলে গেলি?”
আদ্রিতা চোখ পিটপিট করতেই তিয়াশা বলল,,”আজকে ১০ ই মার্চ।”
আদ্রিতা মুহূর্তেই খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু মনে করার ভঙ্গিমায় বলল,, ”মানে তো….”
”হ্যাঁ,ম্যামের বার্থডে আজকে।”
”হায় আল্লাহ একদম ভুলে গেছিলাম রে!”
”তাহলে উঠিস না কেনো?চল আমি কেক অর্ডার করছিলাম অনিমা আপুর কাছে। হোম মেড কেক ছাড়া তো ম্যাম খান না।”
”হ্যাঁ, হ্যাঁ।চল চল। আর আমি কি নিব রে!”
”নিস কিছু এখন চল।”
চলতি পথে হুট করে থামলো আদ্রিতা, ”এই যা!”
তিয়াশা ভ্রু কুঁচকে বলল,, ”আবার কি?”
”দোস্ত আপুর আসবে আজকে।আম্মু বলছিলো বুলবুল কে নিজে জলদি ফিরতে।আমি যেতে পারব না রে।”
তিয়াশা মুখ গোটায়; অগত্যা মৃদু হেসে বলল,, ”আচ্ছা যা।”

বেলা গড়িয়ে এখন ঠিক তিনটা। চৈত্রের প্রখর রোদ কিছুটা ম্লান হয়ে এলেও ভ্যাপসা গরমের উপস্থিতি বড্ড প্রকট। শহরের এই প্রান্তে পিচঢালা পথগুলো এখন জনশূন্যপ্রায়, কেবল দু-একটা রিকশা টুংটাং শব্দে নিস্তব্ধতা ভাঙছে। তিয়াশা স্কুটি নিয়ে শহরতলীর এক কোণে এসে থামল।
​স্কুটির সামনে ঝুড়িতে পরম নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে সেই বিড়ালছানাটা, আর পেছনে সযত্নে রাখা অনিমা আপুর তৈরি ভ্যানিলা স্পঞ্জ কেক। তিয়াশা এক নজরে তাকাল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বাড়িটির দিকে। পুরোনো ধাঁচের দোতলা এক দালান; দেয়ালে শ্যাওলার আস্তরণ পড়ে কালচে রঙ ধারণ করেছে। কার্নিশ বেয়ে নেমে আসা লতানো গাছগুলো তীব্র গরমের মাঝেও শীতল ছায়ায় আচ্ছন্ন করছে চারপাশ।
​স্কুটি লক করে তিয়াশা সতর্ক পায়ে এগিয়ে গেল। জয়নব ম্যাম তার শৈশবের বর্ণমালা থেকে শুরু করে জীবনের অনেক কঠিন পাঠ শিখিয়েছেন। নিঃসঙ্গ এই মধ্যবয়সী মহিলাটি তিয়াশাকে নিজের গর্ভজাত সন্তানের চেয়ে কোনো অংশে কম ভাবেন না। তাই তিয়াশারও এনার প্রতি টানটা খুব বেশি। কলিংবেলে হাত রাখতেই ভেতরের নিস্তব্ধতা চিরে একটা সুমধুর ধ্বনি বেজে উঠল।
​কয়েক মুহূর্ত পর দরজা খোলার শব্দ হলো। ভারী কাঠের দরজাটা সামান্য ফাঁক হতেই দেখা গেল এক উজ্জ্বল প্রতিভাদীপ্ত মুখ। তার সৌন্দর্যের ভারিক্কিতে বয়সের কোটা বোঝা দায়। ছিমছাম গড়ন,সাদামাটা শাড়ি আর চোখের সেই মোটা ফ্রেমের চশমাটাও সংজ্ঞাহীন সৌন্দর্যের অবতারণা করে। তিয়াশাকে দেখামাত্র তার ঠোঁটের কোণে উপচে পড়ল অপার এক বাৎসল্য।

“ম্যাম, হ্যাপি বার্থডে!”
তিয়াশা এক গাল হেসে গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকল। ​জয়নব ম্যাম অবাক হলেন, পরক্ষণেই নিজের গম্ভীর সত্তাটা টেনে বললেন,
“তুই আবার এসেছিস এই রোদে পুড়ে?”
​ জয়নব ম্যামের গাম্ভীর্য অনেকটা ডাব বা নারিকেলের মতো—বাইরেটা শক্ত খোলসে আবৃত হলেও ভেতরটা স্নিগ্ধ রসে টইটম্বুর। ​তিয়াশা ম্যামের শাসনের ধরণটা খুব ভালো করেই জানে। ও খিলখিল করে হেসে ম্যামের ড্রয়িংরুমের ভেতর ঢুকে পড়ল। সোফায় কেকের বাক্সটা রেখে আদুরে গলায় বলল,
“ম্যাম, আপনি সব সময় এমন করেন কেন বলুন তো? যেন আমি আসাতে আপনি একদমই খুশি হননি! আর শুনুন, শুধু আমি আসিনি, আপনার জন্য একজন স্পেশাল গেস্টও নিয়ে এসেছি। আপনি তো সারাজীবন আমাদের শিখিয়েছেন মেহমানের সাথে ভালো ব্যবহার করতে, এবার নিজের শিক্ষাটা নিজে পরীক্ষা করে দেখুন তো!”
​জয়নব ম্যাম ভ্রু কুঁচকে তিয়াশার পেছনে তাকালেন। তিয়াশা আলতো করে স্কুটির ঝুড়ি থেকে সেই ব্যান্ডেজ করা শ্বেতশুভ্র বিড়ালছানাটাকে তুলে এনে ম্যামের সামনে ধরল। ম্যামের চোখের দৃষ্টি মুহূর্তেই নরম হয়ে এল। বিড়ালছানাটার অসহায় মুখ আর ওর শরীরের ব্যান্ডেজ দেখে ম্যামের মাতৃত্ব জেগে উঠল। তিনি অবচেতনভাবেই হাত বাড়িয়ে ছানাটাকে নিজের কোলের কাছে নিয়ে নিলেন।

“আহারে! এটার এই অবস্থা কে করল? তুই কি আবার রাস্তা থেকে কুড়িয়ে আনলি নাকি?”
​তিয়াশা হেসে বলল,
“রাস্তা থেকেই তো! এখন আপনার এই নতুন গেস্টকে কি খেতে দেবেন নাকি ওই গম্ভীর মুখ করেই দাঁড়িয়ে থাকবেন?”
​জয়নব ম্যাম এবার আর গম্ভীর রইলেন না বিড়ালছানাটার মাথায় বিলি কাটতে কাটতে তিনি মৃদু হেহে তিয়াশার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললেন,
​ “তোর এই পাগলপনা কোনোদিন যাবে না রে তিয়া। যা, আগে মুখ-হাত ধুয়ে আয়। ফ্রেজ থেকে শরবত বের করে খা। আর মেহমানের খাবারের ব্যবস্থা আমিই করছি।”
​তিয়াশা আড়চোখে ম্যামকে দেখল। মানুষটা মুখে যত যাই বলুক, মনের গহীনে এক সমুদ্র মমতা নিয়ে বসে আছেন। এই নিঃসঙ্গ বাড়িটায় আজ অন্তত এক টুকরো আনন্দ নিয়ে আসতে পেরে তিয়াশার মনটাও বিড়ালছানাটার মতোই শান্ত হয়ে গেল।

“বাবা আই ওয়ান্ট টু টক উইথ ইউ্য অ্যান্ড ইটস আর্জেন্ট!”
রাতের নিস্তব্ধতা তখন ড্রয়িংরুমে জেঁকে বসেছে। তাহের চৌধুরী ডাইনিং টেবিলে বসে একমনে রাতের খাবার শেষ করছিলেন, আকস্মিক তিয়াশার কন্ঠে তিনি হাতে থাকা রুটির টুকরোটা প্লেটে রেখে মেয়ের দিকে তাকালেন। শান্ত স্বরে বললেন,,
“বলো।”
তিয়াশা সরাসরি বাবার উল্টো পাশের চেয়ারটা টেনে বসল,,
“বাবা, আই নো ইউ্য আর হাইডিং সামথিং। যে আরাভ খানকে তুমি ক্রিমিনাল অ্যাসল্টের চার্জে ভেতরে ঢুকালে, তাকে কোন ম্যাজিকাল পাওয়ারে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে উইদাউট এনি ট্রায়াল রিলিজ করে দিলে? ডু ইউ রিয়েলি থিঙ্ক আই অ্যাম দ্যাট নাঈভ?”
তাহের চৌধুরী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

“টিয়া, ইটস কমপ্লিকেটেড। পলিটিক্যাল প্রেসার আর ডিপার্টমেন্টাল প্রটোকল সব সময় একভাবে কাজ করে না। সিচুয়েশন এমন ছিল যে আমাকে পিছু হটতে হয়েছে।”
“ড্যাম ইট বাবা! ডোন্ট গিভ মি দ্যাট পলিটিক্যাল ক্র্যাপ! আমি আজ ক্যাম্পাসে যাওয়ার পথে আবার ওর ফেস করেছি। ও আমাকে ওপেনলি হ্যারাস করার ট্রাই করেছে। ও এখন অনেক বেশি ডেসপারেট। বাবা,ও কি তোমাকে কোনো কিছু দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করছে? ইজ্য ইট অ্যাবাউট মি?”
তাহের চৌধুরীর হাতের আঙুলগুলো কিঞ্চিৎ কেঁপে উঠল বোধ হয়, তিনি তিয়াশার চোখের দিকে তাকাতে পারছেন না। মেয়ের সম্মান আর নিজের সততা—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হওয়া একজন অসহায় পিতার প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠল তার চোখে। তিনি ধীর স্বরে বললেন,
“টিয়া, কখনো কখনো বৃহত্তর স্বার্থে ছোট ছোট হার মেনে নিতে হয়। আরাভ যা করেছে তার চেয়ে বড় বিপদ ধেয়ে আসছিল। আনোয়ার খান খুব নিচু স্তরের মানুষ, সে আমার ক্যারিয়ার নয়, আমার অহংকার অর্থাৎ তোমার গায়ে কলঙ্ক লেপন করতে চেয়েছিল। আই জাস্ট কুডন্ট লেট দ্যাট হ্যাপেন।”
তিয়াশা মুহূর্তেই থমকে গেল। বাবার গলার স্বর আর চোখের কোণে জমে থাকা জলটুকু ওর মস্তিষ্কের সব যুক্তি উল্টেপাল্টে দিচ্ছে্। ও উদ্বিগ্ন স্বরে শুধাল,,,

”তার মানে ও কি কোনো ফেক ভিডিও বা কিছু…”
তাহের চৌধুরী মাঝপথেই ওকে থামিয়ে দিলেন, পরম মমতায় মেয়ের হাতটা চেপে ধরে বললেন,
“ডোন্ট ওরি মা। আমি যতদিন আছি, কোনো ফেক ভিডিও বা ব্ল্যাকমেইল তোমার সম্মান ছুঁতে পারবে না। আমি ওকে ছেড়ে দিয়েছি ঠিকই, কিন্তু ওর ওপর নজর রাখা আমি বন্ধ করিনি। দিস ইজ নট দ্য এন্ড টিয়া, দিস ইজ জাস্ট আ স্ট্র্যাটেজিক রিট্রিট। ট্রাস্ট ইয়োর ফাদার।”
বাবার উষ্ণ স্পর্শের নিরাপত্তা বোধকে ছাপিয়ে তৃষার মনের এক কোণে জেদটা আরও দৃঢ় হলো। আরাভ খান শুধু একজন অপরাধী নয়, ও এখন রীতিমতো তিয়াশার ব্যক্তিগত শত্রুতে পরিণত হয়েছে। তিয়াশা দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো বাবার এই অসহায়ত্বের প্রতিটি মুহূর্তের হিসাব ও আরাভের কাছ থেকে কড়ায়-গণ্ডায় বুঝে নেবে।

” গিভ মি ফিফটি থাউজেন্ড ইন ক্যাশ ইমিডিয়েটলি বাবা।”
রাতের নিস্তব্ধতাকে ছাপিয়ে রাজধানীর গুলশানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আনোয়ার খানের বাসভবনে তখনো ব্যস্ততার ছাপ। ড্রয়িংরুমের কোণে বসে তিনি আসন্ন নির্বাচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কনফারেন্স কলের ফাইল চেক করছিলেন। চারপাশ থমথমে। হঠাৎ ফোন করেই ছেলেরা মন ভূমিকাহীন কথায়​ তিনি মুহূর্তেই ভ্রু কুঁচকালেন। ঘড়ির কাঁটা তখন বারোটা ছুঁই ছুঁই। তিনি দাঁতে দাঁত চেপে গম্ভীর গলায় শুধালেন,,
​ “হোয়্যাট? ফিফটি থাউজেন্ড ক্যাশ? পাগল হয়েছ আরাভ? এই মাঝরাতে তোমার এত টাকা দিয়ে কী কাজ? কোনো নতুন ঝামেলা পাকিয়েছ নাকি?”
​আরাভ ওপাশ থেকে তাচ্ছিল্যের স্বরে উত্তর দিল,,
”ঝামেলা না বাবা, জাস্ট আ লিটল সেলিব্রেশন উইথ ফ্রেন্ডস। আর শোনো, ওই যে আগে যা ছিল—ছবি-টবি বা ওসব আজেবাজে জিনিস, ওগুলো সব শেষ হয়ে গেছে। আই নিড ফ্রেশ মানি ফর দ্য নাইট।”
​আনোয়ার খান সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। গলার স্বরে বিরক্তি আর দুশ্চিন্তার মিশ্রণ। তিনি বুঝতে পারলেন আরাভ এখন কোথায়? তিনি চাপা গর্জে বললেন,
“আরাভ, তুমি কি বুঝতে পারছ না পরিস্থিতি কতটা সেনসিটিভ? সামনে ইলেকশন। অপজিশন পার্টি সুযোগ খুঁজছে আমাদের ছোট কোনো ভুলকে বড় ইস্যু বানাতে। অন্তত এই কটা দিন নিজের ওপর কন্ট্রোল রাখো। দিস ইজ নট ডুইং এনি গুড টু মাই ক্যারিয়ার!”

​আরাভ ফোনের ওপাশে কর্কশ স্বরে হেসে উঠল। বাবার উপদেশকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে ও বলল,,
​ “স্টপ ইট বাবা! ইউ্য নো ভেরি ওয়েল, আমার লিমিট কতটুকু। আমাকে নীতি কথা শুনিয়ে ইমপ্রেস করার চেষ্টা করো না। তোমার পাওয়ার আর পজিশন কেন? আমার এই লাইফস্টাইল মেনটেইন করার জন্যই তো, তাই না? সো ডোন্ট লেকচার মি। জাস্ট সেন্ড দ্য মানি। ড্রাইভারকে দিয়ে ক্যাশটা পাঠিয়ে দাও এখনই।”
​আনোয়ার খান কিছু একটা বলতে উদ্যত হতেই আরাভ খসখসে গলায় শেষ কথাটুকু যোগ করল,,
“ডোন্ট মেক ইট ডিফিকাল্ট বাবা। টাকাটা পাঠিয়ে দাও। আই এম ওয়েটিং।”
​বলেই আরাভ খট করে ফোনটা কেটে দিল। আনোয়ার খান স্মার্টফোনটা হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে রইলেন। আদর দিয়ে মানুষ করতে গিয়ে কখন যে বেয়ারা করে ফেলেছেন ছেলেকে বুঝতেই পারেননি তিনি অথচ আজ তার ফল কি নিদারুন রূপে ভোগ করতে হচ্ছে তাকে।

আরাভ ফোনটা টেবিলের ওপর আছড়ে ফেলে সোফায় হেলান দিল। চারিদিকের নীল আলো আর উগ্র মিউজিকের তালে ওর বন্ধুরা তখন নেশায় বুঁদ। গুলশানের প্রাইভেট পেন্টহাউসটা এখন আরাভের ব্যক্তিগত আস্তানা।​ওর বন্ধু আরিয়ান এক গ্লাস শ্যা:ম্পে:ন নিয়ে এগিয়ে এল। কুৎসিত এক হাসি দিয়ে বলল,
“কিরে মামু? মিনিস্টার সাহেব কি মাঝরাতে ইকোনমিক ক্রাইসিস শুরু করলেন নাকি? টাকা পাঠাচ্ছে তো?”
​আরাভ তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে আরিয়ানের হাত থেকে গ্লাসটা কেড়ে নিল। এক চুমুকে অর্ধেকটা শেষ করে কর্কশ গলায় বলল,
“বাবার পকেট থেকে টাকা বের করাটা এখন জাস্ট একটা ফর্মালিটি, আরিয়ান। পলিটিক্স আর পাওয়ারের নেশা যার রক্তে, সে নিজের ক্যারিয়ার বাঁচাতে ছেলেকে ঠিকই ফিড করবে। ওল্ড ম্যান নোস হাউ টু প্লে হিজ কার্ডস।”
​সাইদ পাশ থেকে বলে উঠল,,
“বাবার কার্ড তো বুঝলাম, কিন্তু তুই তিয়াশার সাথে যে গেম শুরু করলি, ওটার লেটেস্ট আপডেট কী?”
​আরাভ পকেট থেকে একটা লাইটার বের করে ওটা নিয়ে খেলতে শুরু করল। নৃত্যরত অগ্নিশিখায় হিংস্র দৃষ্টিতে চেয়ে ও দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

“তিয়াশা চৌধুরী! মেয়েটার তেজ দিন দিন বাড়ছে। আজকে রাস্তায় ও আমাকে যে ভাষায় ইনসাল্ট করল, কসম… আমার রক্ত টগবগ করে ফুটছে। ও ভাবছে বাবার উর্দির জোরে ও সেফ। কিন্তু ও জানে না, ওই উর্দিতে আমি অলরেডি একটা পার্মানেন্ট দাগ বসিয়ে দিয়েছি।”
​আরিয়ান ভ্রু কুঁচকে শুধাল,
“মানে? ওই ব্ল্যাকমেইল ভিডিওটা দিয়ে কাজ হবে তো? ডিআইজি সাহেব তো অলরেডি সারেন্ডার করেছে।”

ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ২

​“সারেন্ডার তো জাস্ট শুরু, মামু!”
আরাভ বসা থেকে উঠে জানালার কাঁচের কাছে গিয়ে দাঁড়াল,
“ভিডিওটা তো জাস্ট ওর বাপের মুখ বন্ধ রাখার চাবিকাঠি। কিন্তু তিয়াশাকে শায়েস্তা করার প্ল্যানটা আরও বেশি ইন্টারেস্টিং। ওকে আমি এমন এক চোরাবালিতে ফেলব, যেখান থেকে ওর সুপারহিরো বাবাও ওকে টেনে তুলতে পারবে না। শি কলড মি আ ড্রা-গিস্ট লুজার, রাইট? এবার আমি দেখাব এই লুজারের হার্ট কত বড়।”

ইন্তেজার এ ওয়াসিল পর্ব ৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here