ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ২২
মেহজাবিন নাদিয়া
সুখ কুঞ্জের ডাইনিং রুমের বাতাসটা আজ বড্ড ভারী। সুফিয়ান মৃধার দাফন সম্পন্ন হয়েছে ঠিকই, কিন্তু শোকের ছায়া যেন বাড়ির প্রতিটি কোণায় পাথরের মতো চেপে বসে আছে। বড় টেবিলটার চারপাশ জুড়ে বসে আছেন মৃধা পরিবারের সদস্যরা। রুবাব মৃধা সবার সামনের আসনে বসে আছেন। তার দৃষ্টি টেবিলের দিকে কম,বরং সিঁড়ির দিকে বেশি।চোয়াল শক্ত, কপালে চিন্তার ভাঁজ।স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে দুই সন্তান সহ বাপের বাড়িতেই থাকেন রুবাব মৃধা। বড় ছেলে শান্ত এবার মাস্টার্স পড়ছে,ছোট হচ্ছে ফুল,সামনেই এইচএসসি দিবে।শান্ত গম্ভীর মুখে নিজের প্লেটে মনোযোগ দিয়ে খাবার খাচ্ছে। ফুলের মুখটাও অনেকটা ম্লান। সবাই একে অপরের সাথে সামান্য আলাপ করলেও,বাড়ির মূল পুরুষ আর নতুন দুই জোড়া সদস্যের অনুপস্থিতি যেন বাকিদের নীরবতাকে আরও প্রকট করে তুলেছে।
ঠিক তখনই সিঁড়ির দিক থেকে অরি আর সারিমকে ধীর পায়ে নেমে আসতে দেখা গেল। অরির চোখ-মুখ কিছুটা ফোলা, চুলে কিছুটা অগোছালো ভাব। সারিমের পরনে আগের সেই ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি।চোখে মুখে তার অদ্ভুত উদাসীন ভাব।দুজনে এসে টেবিলের এক কোণায় পাশাপাশি বসল।
রুবাব মৃধা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে অরির দিকে তাকালেন। অরিকে আজ স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বেশি আড়ষ্ট দেখাচ্ছে। রুবাব মৃধা ধীর গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
_“তোমার শশুড় আর তার বউ কোথায়? এত বেলা হলো, এখনো নিচে নামেনি কেন?”
অরি কিছু বলার আগেই পাশ থেকে ফুল শান্ত গলায় উত্তর দিল,
_“ বড় মামি অসুস্থ,মা। তাই হয়তো মামা নিচে আসছেন না।”
ফুলের এই কথাটুকু শোনা মাত্রই টেবিলের পরিবেশটা এক সেকেন্ডের জন্য স্থির হয়ে গেল। সারিম পানির গ্লাসে চুমুক দিতে গিয়ে থেমে গেল,ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা ক্রূর হাসির রেখা ফুটে উঠল। অরির অবস্থা সঙ্গিন; সে গ্লাসে পানি নিতে গিয়ে প্রায় বিষম খেলো।জেবার জন্য বেশ চিন্তা হতে লাগল তার।রুবাব মৃধা ভ্রু কুঁচকে ফুলের দিকে তাকালেন।
_“অসুস্থ? হঠাৎ কী হলো মেয়েটার?”
ফুল টেবিলের দিকে না তাকিয়ে,পুরোটা না বলে খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,
_“আমি জানি না ঠিক কী হয়েছে, তবে গতকাল রাতে মামা আমার কাছে থেকে মামির জন্য কাপড় চেয়ে নিয়েছিলেন। সম্ভবত রাতে তাকে ফ্রেশ করার প্রয়োজন হয়েছিল।”
ফুলের কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথে ডাইনিং টেবিলের বাকি সদস্যদের মধ্যে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। শান্তর হাতের চামচটা প্লেটে লেগে টুং করে শব্দ হলো। বাকি আত্মীয়রা একে অপরের দিকে চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল। সবার চোখেমুখে এক অদ্ভুত বিস্ময় আর কানাঘুষার গুঞ্জন।
সারিম বিরবির করে বলতে লাগল,
-“বাহ আরিশান মৃধা! এতো দেখছি আমার চেয়েও ফাস্ট! আমি সারারাত চেষ্টা করেও বউকে বশে আনতে হিমশিম খাচ্ছি, আর আমার বাপ দেখি এক রাতেই তার বউকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে যে কাপড় পর্যন্ত চেঞ্জ করতে হচ্ছে!’
সারিম নিজের অগোচরেই অরির দিকে এক নজর তাকাল, অরি তখন মাটির দিকে তাকিয়ে কোনোমতে খাবার গেলাতে ব্যস্ত।
রুবাব মৃধার চোখজোড়া জ্বলে উঠল। তার ভাই আরিশান মৃধা নিয়মানুবর্তিতার কথা সকলের কাছে প্রচলিত। তিনি কিনা এই বয়সে এসে এমন হঠকারিতা করছেন! রুবাব মৃধা নিজের ভেতরে বাড়তে থাকা তীব্র নিন্দা চেপে রাখলেন।দ্রুত হাতে একটা প্লেটে খাবার সাজিয়ে ফুলের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে শীতল কণ্ঠে বললেন,
_“ফুল, এগুলো নিয়ে যা। তোর মামা আর মামিকে বলবি যেন খেয়ে নেয়।”
ফুল প্লেট নিয়ে সিঁড়ির দিকে হাঁটা ধরল।রুবাব মৃধা এবার শান্তর দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞাসা করলেন,
_“এভাবে না খেয়ে চুপচাপ বসে আছিস কেন?কিছু লাগবে তোর?”
শান্ত মাথা নেড়ে ‘না’ জানাল। তারপর পাশের গ্লাস থেকে পানি নিয়ে প্লেটের উপর ঢেলে দিয়ে সশব্দে উঠে দাঁড়াল। রুবাব মৃধা অবাক হয়ে চাইলেন, ছেলের কী হলো তিনি বুঝতে পারলেন না। শান্ত আর কোনো কথা না বলে, চেয়ার ছেড়ে উল্টো পথে ঘুরে দাঁড়াল এবং প্রায় হনহন করে নিজের রুমের দিকে চলে গেল। ছেলের এই আকস্মিক খাওয়া ছেড়ে চলে যাওয়ার পথের দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন রুবাব মৃধা। মাথায় ঢুকল না, ছেলেটা এমন আচরণ কেন করল।
এদিকে টেবিলের অন্য সদস্যরাও আরিশান মৃধা আর জেবাকে নিয়ে অস্ফুট স্বরে ফিসফিসানি শুরু করে দিয়েছে। পুরো পরিবেশটাই যেন এক অস্বস্তিকর গুঞ্জনে ভারী হয়ে উঠল।
সকাল সকাল দরজার ওপার থেকে ভেসে আসা কাঠের কড়া নাড়ার শব্দে জেবার গভীর ঘুমটা এক ঝটকায় ভেঙে গেল। সে চোখ দুটো পিটপিট করে মেলল। ঘুমের ঘোরেই আড়মোড়া ভেঙে খাট থেকে উঠতে চাইল দরজাটা খোলার জন্য। কিন্তু বিছানা থেকে পা নামানোর আগেই বারান্দার দরজা খুলে ধীর পায়ে ঘরের ভেতর প্রবেশ করলেন আরিশান মৃধা।
ওনার পায়ের শব্দ পেয়ে জেবা ওখানেই থমকে বসল। সকালের নরম আলোয় আরিশান মৃধার চোখ দুটো আচমকা গিয়ে আটকে গেল জেবার সদ্য ঘুম ভাঙা মুখশ্রীর ওপর। এলোমেলো চুলগুলো মুখের দুপাশে ছড়িয়ে আছে, চোখ দুটো ঘুমে কিছুটা জড়সড়, আর ঠোঁট দুটো অবুজ বাচ্চার মতো সামান্য ফোলা। সকালের এই সিগ্ধ আলোয় মেয়েটাকে বড্ড মায়াবী আর নিষ্পাপ দেখাচ্ছিল। ওনাকে ওভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে জেবা নিজের ওড়নাটা টেনে একটু আড়ষ্ট হয়ে বসল। আরিশান মৃধার বুকের ভেতর আবার সেই অবাধ্য, অচেনা অনুভূতির ঢেউ আছড়ে পড়ল। ওনি এক সেকেন্ডের জন্য নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাতে বসলেন। তবে পরক্ষণেই নিজেকে শক্ত করে সামলে নিয়ে, এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে দরজাটা খুলে দিলেন।
দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল ফুল।হাতে খাবারের ট্রে। ফুল আরিশান মৃধাকে দেখে মাথা নিচু করে বলল,
_“মামা, মা আপনাদের দুজনের জন্য সকালের নাশতা পাঠিয়েছেন।”
আরিশান মৃধা ফুলের হাত থেকে খাবারের ট্রে-টা নিজের হাতে তুলে নিলেন। ওনার গম্ভীর মুখের দিকে তাকিয়ে ফুল আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না, ধীর পায়ে সেখান থেকে চলে গেল।
আরিশান মৃধা ঘরের দরজাটা আবার আটকে দিলেন। এরপর খাবারের ট্রে-টা এনে খাটের পাশের বেডসাইড টেবিলে রাখলেন। জেবা তখনো খাটের ওপর জড়সড় হয়ে বসে ওনার প্রতিটি নড়াচড়া লক্ষ্য করছিল।
আরিশান মৃধাকে এভাবে একদম সামনে দেখার পর জেবার মনের ভেতর হুট করেই গতকাল রাতের কথাগুলো হুড়মুড় করে ভেসে উঠল। কীভাবে তীব্র ব্যথায় সে মেঝের ওপর কাঁদছিল, আর এই গম্ভীর লৌহমানব লোকটা ওকে নিজের কোলে তুলে নিয়েছিলো! ওনার বুকের সেই তপ্ত ওম আর নিরাপদ আশ্রয়ের কথা মনে পড়তেই জেবার ফর্সা গাল দুটো মুহূর্তের মধ্যে লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। সে নিজের নখ দিয়ে চাদরের কোণটা খুঁটতে লাগল। তবে লজ্জার পাশাপাশি ওর মনের এক কোণে এক চিলতে খুশির রেখাও ফুটে উঠল। আরিশান মৃধার মতো একজন রাশভারী মানুষের কাছ থেকে এমন কেয়ার বা যত্ন পাওয়া তো চাট্টিখানি কথা নয়!
জেবার মনের ভেতর হুট করে একটা অদ্ভুত প্রশ্ন উঁকি দিল
—‘তাহলে কি এই খড়খড়ে বুড়ো মিনিস্টার ওকে মনে মনে পছন্দ করতে শুরু করেছেন?’
জেবা যখন নিজের মনেই সুখের সাগরে ডুব দিচ্ছিল, ঠিক তখনই আরিশান মৃধা ওর দিকে ঘুরে দাঁড়ালো। ওনার চশমার পেছনের চোখ দুটো তখনো গম্ভীর আর থমথমে। ওনি জেবাকে ওভাবে বসে থাকতে দেখে অত্যন্ত রুক্ষ আর শক্ত কণ্ঠে বলে উঠলেন,
_“কী হলো? এভাবে হাঁ করে তাকিয়ে আছ কেন? দ্রুত গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসো। নাশতা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।”
লোকটার মুখের এই আকস্মিক শক্ত গলা শুনে জেবার ভেতরের সমস্ত রঙিন বেলুন এক নিমেষে ‘ফুস’ করে ফেটে গেল।এতক্ষণের ভালো লাগাটা নিমেষেই ক্ষোভে রূপ নিল। জেবা আরিশান মৃধার অলক্ষ্যে নিজের মুখটা চরম বাঁকিয়ে মনে মনে শতখানেক গালি দিতে শুরু করল
_”সালা বুইড়া মিনিস্টার! একটু মিষ্টি করে নরম গলায় কথা বললে কি এমন হয় বুঝিনা?কাল রাতেতো ঠিকি কত কেয়ার দেখালি,আর এখন আবার জল্লাদের মতো হুকুম চালাচ্ছিস!বেটা খবিশ একটা!’
জেবা রাগ নিয়ে বিছানা থেকে নেমে গটগট পায়ে ওয়াশরুমে চলে গেল। কয়েক মিনিটের মধ্যে ফ্রেশ হয়ে রুমে ফিরে এলো,এসেই খাটের এক কোণায় ধপাস করে বসল। টেবিলে রাখা খাবারের দিকে তাকাতেই জেবার মুখটা আরও তিতা হয়ে গেল। কেমন যেন একটা বমি বমি ভাব আসছিল ওর এই শুকনো রুটি আর ভাজি দেখে,এখন বিন্দুমাত্র খাওয়ার রুচি নেই।
আরিশান মৃধা চেয়ারে বসে নিজের ফোন দেখছিলেন। জেবাকে ওভাবে খাবারের দিকে তাকিয়ে মুখ কুঁচকে বসে থাকতে দেখে ওনি ফোন থেকে চোখ তুলে বেশ ধমকের সুরে জিজ্ঞাসা করলেন,
_“কী সমস্যা তোমার? খাবার সামনে নিয়ে ওভাবে ভূত দেখার মতো বসে আছ কেন? খাচ্ছ না কেন?”
জেবা ওনার ধমক খেয়ে একটু কেঁপে উঠল, তবে সে দমবার পাত্র নয়। নিজের ঠোঁট উল্টে অত্যন্ত নাকোচ গলায় বলল,
_“আমার খেতে ইচ্ছে করছে না।”
আরিশান মৃধা নিজের চোখ দুটো ছোট করে বললেন,
_“ইচ্ছে করছে না মানে কী? গতকাল থেকে এখনো অব্দি কিছু খাওনি। এমনিতেই শরীর অসুস্থ তোমার,এখন যদি না খাও তবে সোজা হসপিটালে গিয়ে স্যালাইন দিতে হবে। চুপচাপ খাবার মুখে তোলো!”
জেবা এবার চারপাশের শান্ত ঘরটার দিকে তাকাল।এখানে কোনো বিনোদন নেই।সে বড্ড বোর ফিল করছিল।জেবা আরিশান মৃধার দিকে তাকিয়ে বাচ্চাদের মতো ঘ্যানঘ্যান করে বলল,
_“এভাবে চুপচাপ খেতে আমার বোরিং লাগে।একটা টিভি থাকলে ভালো হতো।”
আরিশান মৃধা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন,
_“টিভি দিয়ে কী করতে তুমি এই সকাল বেলা?”
_“কেন আবার? কার্টুন দেখতাম! আমি যখনই খাই, তখনই কার্টুন দেখতে দেখতে খাই। নয়তো আমার পেটে খাবার ঢুকতেই চায় না।কার্টুন না দেখে আমি খেতে পারি না!”
আরিশান মৃধা জেবার এই বাচ্চাদের মতো যুক্তি শুনে নিজের কপালে নিজেরি হাত চাপড়াতে মন চাচ্ছিলো।তীব্র ইচ্ছা করছিল মেয়েটাকে একটা কড়া ধমক দিতে, কিন্তু পরক্ষনেই তিনি ভাবলেন এই বাচ্চা মেয়ের সাথে তর্ক করে কোনো লাভ নেই।কিছুক্ষণ কী যেন ভাবলেন,এরপর পকেট থেকে নিজের ফোনটা বের করলেন।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, আরিশান মৃধা ওনার এই ফোন কাউকে কোনোদিন স্পর্শ পর্যন্ত করতে দেন না। দেশের কত বড় বড় রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য, নথিপত্র আর গুরুত্বপূর্ণ কল এই ফোনে আসে, ওনার অনুমতি ছাড়া কেউ এই ফোনে হাত দেওয়ার সাহস পায় না। অথচ আজ, এই বাচ্চা মেয়ের কার্টুন দেখার আবদার মেটাতে ওনি নিজের ফোনটা আনলক করে জেবার দিকে বাড়িয়ে দিলেন।ওনি অত্যন্ত গম্ভীর গলায় জিজ্ঞাসা করলেন,
_“কী কার্টুন দেখো তুমি?”
জেবা তো ওনার হাতে ফোন দেখে এক নিমেষে ওনার সমস্ত রুক্ষতা ভুলে খুশিতে আটখানা হয়ে গেল।জেবা আরিশান মৃধার হাত থেকে ফোনটা প্রায় ছিনিয়ে নেওয়ার মতো করে নিয়ে চোখের মণি চকচকিয়ে বলল,
_“আমি টম অ্যান্ড জেরি দেখি!”
আরিশান মৃধা নিজের ফোন থেকে ইউটিউব বের করে ‘টম অ্যান্ড জেরি’র একটা পর্ব চালু করে ফোনটা জেবার হাতে দিলেন। জেবা ফোনটা পাওয়া মাত্রই সমস্ত জগত সংসার ভুলে অত্যন্ত ইন্টারেস্ট নিয়ে খাটের ওপর উপুড় হয়ে বসে কার্টুন দেখতে মগ্ন হয়ে পড়ল। কার্টুনের টম যখন আছাড় খাচ্ছিল, জেবা তখন খিলখিল করে হেসে উঠছিল।সে কার্টুন দেখায় এতটাই বিভোর হয়ে গেছে যে সামনে পড়ে থাকা খাবারের প্লেটের দিকে ওর কোনো নজরই নেই। খাবার মুখে নেওয়া তো দূর, ও সেদিকে তাকাচ্ছেও না।
আরিশান মৃধা বেশ কিছুক্ষণ ধৈর্য ধরে দেখলেন। ওনার বিরক্তির পারদ এবার আকাশ ছুঁয়ে ফেলল। ওনি চেয়ার থেকে উঠে জেবার সামনে এসে দাঁড়ালেন এবং কড়া গলায় বললেন,
_“জেবা! কার্টুন দেখতে বলেছি তার মানে এই নয় যে তুমি খাওয়া ভুলে যাবে!”
জেবা ওনার দিকে এক পলক তাকিয়ে, বিরক্ত না করার ভঙ্গিতে একটা রুটির টুকরো ছিঁড়ে মুখে পুরল। কিন্তু ওটা চিবানোর কোনো নামগন্ধ নেই!খাবারের লোকমাটা মুখের ভেতর এক পাশে জমিয়ে রেখে চোখ দুটো ফোনের স্ক্রিনে আটকে রেখে হা করে কার্টুন দেখতে লাগল।
আরিশান মৃধা এবার পুরোপুরি হাল ছেড়ে দিলেন। এই মেয়ের ওপর রাগ করাও বৃথা।শেষে ওনি বাধ্য হয়ে নিজেই খাটের কিনারায় বসলেন।জেবার হাত থেকে প্লেটটা নিজের বাঁ হাতে নিলেন এবং ডান হাত দিয়ে একটা রুটির টুকরো ছিঁড়ে তাতে ভাজি মাখিয়ে সরাসরি জেবার ঠোঁটের কাছে ধরলেন।
ওনি অত্যন্ত বিরক্ত গলায় বললেন,
_“মুখ খোলো! চিবিয়ে গিলে ফেলো এটা!”
জেবা কার্টুন দেখতে দেখতেই বাধ্য মেয়ের মতো ওনার হাতের লোকমাটা মুখে নিল এবং চিবিয়ে গিলে ফেলল। আরিশান মৃধা একটার পর একটা লোকমা নিজের হাতে জেবাকে খাওয়াতে লাগলেন।
ওনার কাছে এখন মনে হচ্ছে—ওনি কোনো বিয়ে করেননি, বরং সমাজসেবামূলক কোনো একটা অবুঝ বাচ্চাকে তুলে এনে তাকে বড় করার মিশনে নেমেছেন!গভীর হতাশায় নিমজ্জিত হলেন আরিশান মৃধা ওনার কুলাঙ্গার ছেলের উপর।শেষ বয়সে ওনাকে একটু শান্তিতে থাকতে দেবে না বলেই এই ছেলে এইরকম একটা মস্ত বড় বিপদকে ওনার ঘাড়ে জোর করে চাপিয়ে দিয়েছে। যে মেয়ে অলটাইম একটা চার-পাঁচ বছরের বাচ্চার মতো আচরণ করে, তার সাথে ওনি কীভাবে নিজের বাকি জীবন কাটাবেন?
আরিশান মৃধা নিজের ওপর নিজেই চরম হতাশ হলেন।
নিচে সকালের নাশতা পর্বটা কোনোমতে শেষ করেই সারিম অরির হাত ধরে টানতে টানতে ওপরে নিজেদের ঘরের দিকে নিয়ে এলো। বাড়ির গুরুগম্ভীর পরিবেশ আর বড়দের সামনে সারিমের এমন প্রকাশ্য টানাহেঁচড়ায় অরি মনে মনে চরম বিরক্ত ও লজ্জিত। রুমে পা রাখতেই অরি নিজের হাতটা ঝটকা মেরে সারিমের মুঠো থেকে ছাড়িয়ে নিল।সারিমের দিকে তাকিয়ে বেশ তাড়া মেশানো গলায় বলল,
_“আমি একটু জেবার রুমে যাচ্ছি। ও কেমন আছে, শরীরটা এখন ঠিক আছে কি না-একবার দেখা করে আসি।”
সারিম নিজের পাঞ্জাবির হাতাটা কনুই পর্যন্ত গোটাতে গোটাতে খাটের ওপর আয়েশ করে বসল। ঠোঁটের কোণে সেই চেনা, বাঁকা কুটিল হাসিটা ফুটিয়ে বলল,
_“গিয়ে কী দেখবে বউ? তোমার বান্ধবী তার জামাইর সাথে দুনিয়া স্বাধীন করে বসে আছে!অথচ ভাবো, আমাদের হিসেবটা-তাদের কতো আগে আমাদের বিয়ে হয়েছে, তাদের আগে আমরা একে অপরের প্রেমে পড়ে পড়েছি, অথচ আমরা এখনো কিছুই করতে পারলাম না! জাস্ট অপদার্থের মতো দিন পার করছি। তুমি একটু সহযোগিতা করলেই কিন্তু আজ রাতের মধ্যেই সব সম্ভব, চন্দ্রিমা!”
সারিমের মুখে এই ‘প্রেমে পড়া’র কথা শুনে অরি চোখ দুটো গোল গোল করে ওর দিকে তাকাল।সারিমের দিকে দুই পা এগিয়ে এসে বেশ চড়া গলায় বলল,
_“এক মিনিট! এই আমি কবে আপনার প্রেমে পড়লাম, হ্যাঁ? নিজের মনগড়া বানিয়ে বানিয়ে কথা বলা বন্ধ করুন!”
সারিম ভ্রু জোড়া সামান্য উঁচিয়ে একটা গভীর শ্বাস নিয়ে বলল,
_“পড়োনি বুঝি? মনে মনে তো ঠিকই সারাদিন আমার কথাই ভাবো। আচ্ছা ঠিক আছে, মানলাম এখনো প্রকাশ করোনি। চলো, আজ রাতেই আমাদের বাসরটা সেরে ফেলি, দেখবে মন অটোমেটিকভাবে একদম রকেটের গতিতে আমার প্রেমে পড়ে যাবে।”
সারিমের মুখ থেকে এমন নির্লজ্জমার্কা কথা শুনে অরি লজ্জায় আর রাগে এক্কেবারে লাল হয়ে উঠল।সে নিজের দুই হাত কোমরে রেখে দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
_“অসভ্য লোক একটা! ছিঃ! আপনার মতো আপনার ভাবনা-চিন্তাগুলোও বড্ড নোংরা আর জঘন্য!”
সারিম এবার বিছানা থেকে চট করে উঠে দাঁড়াল।তার লম্বা, চওড়া অবয়ব নিয়ে অরির একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়ে ডান হাতের তর্জনী উঁচিয়ে বলল,
_“এই… এই চন্দ্রিমা! মুখ সামলে কথা বলো বলে দিচ্ছি। একদম লিমিট ক্রস করবে না! এখনো পর্যন্ত তোমার সঙ্গে আমি এমন কী অসভ্যের মতো আচরণ করলাম যে তুমি আমাকে অসভ্য বলছ, হ্যাঁ?”
অরি এক কদমও পেছাল না। উল্টো সারিমের চোখের দিকে তাকিয়ে বুক ফুলিয়ে বলল,
_“কেন? আপনি কিছু করা বাকি রেখেছেন নাকি গত রাতে? ওইসব কাণ্ডকারখানা কি কোনো সভ্য মানুষের কাজ?”
সারিম নিজের দুই কানে হাত দিয়ে চোখ দুটো বন্ধ করে এক্কেবারে আকাশ থেকে পড়ার ভান করল। অত্যন্ত নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে উঠল,
_“নাউযুবিল্লাহ! আস্তাগফিরুল্লাহ! তোর ওপর আল্লাহ গজব পড়বে বউ, তোর ওপর ঠাডা পড়বে! আমার মতো এমন একজন নিষ্পাপ, শুদ্ধ পুরুষকে তুই এক নিমেষে একদম বিশুদ্ধ বানিয়ে দিলি? তার ওপর এই সাতসকালে এত বড় একটা মিথ্যা অপবাদ চাপিয়ে দিলি আমার ওপর? তুই মরবি না একদিন? আল্লাহর কাছে কি জবাব দিবি?”
অরি সারিমের এই ঢং দেখে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,
_“আমি না, আপনি মরবেন! আস্ত এক নাম্বারের মিথ্যাবাদী, বাটপার আপনি!”
সারিম নিজের বুক চাপড়ে বলল,
_“তুই মিথ্যাবাদী! আমি কাল রাতে জাস্ট একটুখানি আদর করছি,কিচ্ছু না করা সত্ত্বেও আমার নামে এত বড় এলিগেশন লাগিয়েছিস? দাঁড়া তোর নামে আমি কোর্টে গিয়ে মানহানির মামলা ঠুকে দেব!”
অরি মুখটা বাঁকিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,
_“দেন! যা ইচ্ছে করুন আপনার। আপনার ওই মিথ্যা মামলা খেয়ে জেলের ওই অন্ধকার কুঠুরিতে একা বসে থাকা ঢের ভালো, তবুও আপনার মতো একজন অসভ্য পুরুষ থেকে অন্তত বেঁচে যাব!”
সারিম এবার অরির একদম কানের কাছে নিজের মুখটা নিয়ে এলো। ওর তপ্ত নিঃশ্বাস অরির গালে লেপ্টে গেল।সারিম ফিসফিসিয়ে বলল,
_“কে বলল আমি তোমাকে জেলে একা একা থাকতে দিবো? আমি প্রতিদিন মাঝরাতে জেলের তালা চাবি চুরি করে তোমার সেলে ঢুকব, সারা রাত দুজন মিলে রোমান্স করব, আর সকাল হওয়ার আগে আবার চুপচাপ বেরিয়ে আসব। এইভাবে কিছুদিন যাওয়ার পর দেখবে এক অদ্ভুত ম্যাজিক হয়ে গেছে! ঢুকেছিলে একজন, আর জেল থেকে যখন জামিন পেয়ে বের হবে, তখন কোলে আরেকজনকে নিয়ে দুজন হয়ে বের হবে, বউ! আইডিয়াটা একদম জোস না বলো?”
সারিমের মুখের চরম বেহায়াপনা আর সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার কথা শুনে অরির ইচ্ছে করছিল দেওয়ালে মাথা কুঁড়তে।
_“ফালতু! জঘন্য, থার্ড ক্লাস আইডিয়া! এমন কুৎসিত আইডিয়ার ওপর আমি হাজারবার লানত মারি!সাবধান করে দিচ্ছি আপনাকে, এরপর যদি কখনো আমাকে ছুঁতে এসেছেন, আমি আপনার হাত-পা ভেঙে এক্কেবারে গুঁড়ো করে দেব!”
সারিম এবার অরির থেকে এক কদম পিছিয়ে গেল। তার মুখের সেই হাসিখুশি ভাবটা নিমেষেই উধাও হয়ে সেখানে এক গম্ভীর,রূপ ধারণ করল।সে অরির দিকে তাকিয়ে সগর্বে বলল,
_“তুমি আমাকে এত বড় কথা বলতে পারলে চন্দ্রিমা? মানলাম আমি একটুখানি নির্লজ্জ, তোমার জন্য না হয় একটু বেশিই বেহায়াপনা করি। তাই বলে আমি এতটা সস্তা নই যে তোমার অনিচ্ছায় তোমাকে জোর করে স্পর্শ করব। যাও, আজ থেকে প্রতিজ্ঞা করলাম, আমি তোমাকে আর নিজ থেকে ছুঁয়েও দেখব না। তবে একটা কথা কান খুলে শুনে রাখো বউ—তুমি যদি কোনোদিন নিজ থেকে গিয়ে আমাকে ছুঁতে আসো, সেদিন কিন্তু আমি আর কোনো বাহানা মানব না, ডাইরেক্ট একদম ফরজ কাজটা সেরে ফেলব! এই আমি বলে রাখলাম।”
অরি সারিমের দিকে এক রাশ অবজ্ঞা নিয়ে তাকিয়ে বলল,
_“আমার বয়েই গেছে আপনার মতো একটা বেয়াদব লোকের কাছে যেতে! স্বপ্ন দেখতে থাকুন আপনি।”
কথাটা বলেই অরি নিজের মুখটা চরম বিরতিতে অন্য দিকে বাঁকিয়ে নিল। সারিম ওর এই রূপ দেখে মনে মনে হাসল।পকেট থেকে ফোনটা বের করে সময় দেখে নিল। এরপর বেশ গম্ভীর গলায় বলল,
_“দেখা যাবে কে কার কাছে আগে ছুটে আসে,। সময় সব কথা বলে দেবে। এখন ওসব তর্ক বন্ধ করো আর দ্রুত রেডি হয়ে নাও।”
অরি একটু অবাক হয়ে ওনার দিকে ঘুরে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
_“রেডি হব কেন? কোথায় যাব?”
_“আমরা এক্ষুনি ঢাকা ব্যাক করব।অনেক কাজ বাকি পড়ে আছে আমার।”
অরি ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
_“বাবা আর জেবাও কি আমাদের সাথে যাবে?”
_“জানি না ওরা যাবে কি যাবে না।বাবাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করতে হবে। তবে তারা যাক বা না যাক, তুমি আজই আমার সাথে বাড়ি ফিরছো এটা কনফার্ম।”
আরিশান মৃধার ফোনে একটা অত্যন্ত জরুরি দাপ্তরিক কল এলো। ফোনের ওপার থেকে আসা খবরটার গুরুত্ব অনুধাবন করে ওনি ঘরের বদ্ধ পরিবেশে কথা বলা সমীচীন মনে করলেন না। গম্ভীর মুখে ফোনটা কানে চেপে ধীর পায়ে রুমের বাইরে বেরিয়ে নিচে নেমে এলেন এবং বাড়ির পেছনের নির্জন গার্ডেনের দিকে চলে গেলেন।
এদিকে সারিম আর অরি ওপর থেকে নিচে নামছিল। নিচে নামার আগে সারিম অরিকে নিয়ে আরিশান মৃধার ঘরে গিয়েছিল। কিন্তু সেখানে গিয়ে তারা কেবল বিছানায় শুয়ে থাকা জেবাকেই পেল, আরিশান মৃধা সেখানে ছিলেন না। জেবা তখনো পিরিয়ডের ক্লান্তিতে আধো-বোজা চোখে শুয়ে ছিল। অরি ওর মাথায় হাত দিয়ে সান্ত্বনা দিল এবং খুব দ্রুত ঢাকায় দেখা হবে বলে বিদায় নিল। এরপর নিচে নেমে রুবাব মৃধা, আনজুমান বেগম, শান্ত সহ বাড়ির বাকি সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে অরি আর সারিম চলে আসছিল।
কিন্তু এই সবকিছুর মাঝে ফুলকে কোথাও দেখা গেল না। সারিম ঢাকা ফিরে যাচ্ছে-এই খবরটা শোনা মাত্রই ফুল নিজেকে নিজের ঘরের ভেতর বন্দি করে ফেলেছে। সে আর রুম থেকে বের হয়নি। ও খুব ভালো করেই জানত, এই মুহূর্তে ও যদি সারিমের সামনে যায়, তবে নিজের ভেতরের অবদমিত কষ্ট কোনো ভাবেই ধরে রাখতে পারবে না। সারিমের প্রতি ওর এই একতরফা ভালোবাসা সবার সামনে প্রকাশ হয়ে পড়ার ভয়ে সে নিজেকে আড়াল করে রাখাই শ্রেয় মনে করল।
বাড়ির সদর দরজা পার হয়ে সারিম বাইরে এসে অরিকে উদ্দেশ্য করে বলল,
_“চন্দ্রিমা, তুমি গিয়ে গাড়িতে বসো। আমি বাবাকে একবার খুঁজে আসি, ওনাকে না বলে যাওয়াটা ঠিক হবে না।”
অরি বাধ্য মেয়ের মতো গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। সারিম চারপাশটা একবার চোখ বুলিয়ে আরিশান মৃধাকে খুঁজতে লাগলো। এবং ওর চতুর চোখের আন্দাজ একদম ঠিক প্রমাণিত হলো; আরিশান মৃধাকে বাগানের এক কোণায় বড় মেহগনি গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে গম্ভীর মুখে কথা বলতে দেখা গেলো।
কলটা শেষ করে আরিশান মৃধা ফোনটা পকেটে রাখতেই সামনে সারিমকে এসে দাঁড়াতে দেখে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন,
_“কিছু বলবে?”
সারিম পাঞ্জাবির দুই পকেটে হাত গুঁজে অত্যন্ত নির্বিকার গলায় বলল,
_“আমি আর অরি ঢাকা ফিরছি।”
আরিশান মৃধা অরি যাচ্ছে শুনে কিছুটা চিন্তিত হলেন। ওনি জেবার শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে সারিমকে বললেন,
_“অদ্রিজা যেহেতু যাচ্ছে, জেবাকে ও সাথে নিয়ে যেতে যাও। আমার এখানে কিছু কাজ বাকি আছে, আমি আগামীকাল ফিরব।”
সারিম এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে ঠোঁট বাঁকিয়ে সরাসরি উত্তর দিল,
_“পারব না! তোমার বউ তুমি নিয়ে এসো গিয়ে। আমি অন্যের বউয়ের দায়িত্ব ঘাড়ে নিতে যাব কেন?”
আরিশান মৃধা ছেলের এই ত্যাঁদড়ামো দেখে নিজের চোয়াল শক্ত করে বললেন,
_“ওর পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে, সামনে পরীক্ষা। তাই ওকে আজই নিয়ে যেতে বলছি। আমার কাল ঢাকা ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যেতে পারে।”
সারিম বাঁকা হেসে বলল,
_“তাহলে রাতেই বউ নিয়ে এসো। তাছাড়াও পড়াশোনার কথা এখন তোমার মুখে বড্ড বেমানান লাগছে ড্যাডি! পড়াশোনার এতই যদি চিন্তা থাকত তোমার মনে, তবে ওই বাচ্চা মেয়েটাকে সারা রাত এভাবে না ঘুমিয়ে, জাগিয়ে রেখে ওসব করতে পারতে না!”
_“সারিম! মুখ সামলে কথা বলো! কীসব যাতা বলছ তুমি আমার সামনে দাঁড়িয়ে?”
সারিম একটুও দমে না গিয়ে এক কদম এগিয়ে এসে বলল,
_“ভালোবাসাবাসি করেছো ভালো কথা, তাই বলে এভাবে রাতে অন্যকে ডেকে বলে বেড়ানোর মানে কী?”
আরিশান মৃধা ছেলের কথার আগামাথা কিছুই বুঝতে পারলেন না।
_“সারিম, সহ্যের একটা লিমিট আছে! তোমার এই অসভ্যতা আর সহ্য করা যাচ্ছে না বলে দিচ্ছি।”
সারিম এক রাশ তাচ্ছিল্য উগরে দিয়ে বলল,
_“উচিত কথা বলি তো, তাই এখন তোমার সহ্য হচ্ছে না ড্যাডি!”
সারিম এবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের কপালে হাত দিয়ে বলল,
_“ছিঃ! তুমি আমার বাবা—তা ভাবতেই আমার গায়ে কেমন যেন একটা চুলকানি উঠছে।”
আরিশান মৃধা রাগে কড়া গলায় জবাব দিলেন,
_“এত চুলকানি উঠলে গিয়ে চুলকাওগে! আমার সামনে দাঁড়িয়ে ফালতু বোকো না।”
সারিম নিজের বুক টান টান করে অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে বলল,
_“তোমার আগে বিয়ে করেও আমি এখনো বউয়ের সাথে বাসর করতে পারলাম না। আর তুমি কিনা এই বুড়ো বয়সে এসে… ছেহ! বেচারি জেবা মেয়েটা বড্ড সহজ-সরল, অবুঝ দেখে ওরে ভুলিয়ে-ভালিয়ে এসব করতে তোমার একটুও লজ্জা করল না পিতা?”
আরিশান মৃধা রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললেন,
_“তোমার মুখে লাগাম টানো, সারিম! যা আমি করিনি, তার দোষ আমার ওপর চাপানো বন্ধ করো।”
সারিম আবার সেই বাঁকা উপহাসের হাসি হেসে বলল,
_“হ্যাঁ হ্যাঁ, এখন তো মুখ বন্ধ রাখতেই বলবে। তবে ভাবতেও পারিনি তুমি এত ফাস্ট! আমি তো আরো ভাবছিলাম অনলাইন থেকে খোঁজখবর নিয়ে তোমার জন্য উন্নত মানের, কোয়ালিটি সম্পন্ন খাঁটি হারবাল এনে দেব, যাতে এই বয়সে তোমার কোনো উইকনেস না থাকে!”
আরিশান মৃধা আর একসেকেন্ডও এসব শোনার ধৈর্য রাখলেন না। ওনি সারিমকে পাশ কাটিয়ে যেতে চেয়ে বললেন,
_“তোমার এইসব ফালতু কথা শোনার সময় আমার নেই। সরো রাস্তা থেকে!”
সারিম ওনার যাওয়ার পথে এসে পথ আটকে দাঁড়িয়ে বলল,
_“এখন তো সরতে বলবেই, আমি যে এখন পুরোনো হয়ে গেছি তোমার কাছে! তুমি তো এখন নতুন জনকে সংসারে আনার জোর তাগিদে আছো। তবে একটা কথা খুব ভালো করে মনে রেখো পিতা—তুমি যদি এবার আমার সম্পত্তির ভাগে নতুন কোনো অংশীদার আনার মিশনে নেমে থাকো, তবে এর ফল কিন্তু মোটেও ভালো হবে না বলে দিচ্ছি। আমি না চাওয়া পর্যন্ত কোনো নতুন ভাইবোনের দরকার আমার এই জীবনে নেই!”
আরিশান মৃধা ছেলের এই উদ্ভট কথা শুনে তার দিকে এক রাশ তাচ্ছিল্য নিয়ে তাকালেন। ওনি অত্যন্ত ঠান্ডা ও অনমনীয় গলায় জবাব দিলেন,
_“তোমার চাওয়া বা না চাওয়াতে আমার কিচ্ছু আসে যায় না!”
আরিশান মৃধা এবার আর এক মূহর্ত এই ছেলের সামনে থাকা নিরাপদ মনে করলেন না। তিনি অত্যান্ত দ্রুততার সঙ্গে পা চালিয়ে ঐ স্থান ত্যাগ খরেন। বাবাকে চলে যেতে দেখে সারিম এক বিজয়ী পুরুষের মতো শিষ দিতে দিতে ধীর পায়ে হেঁটে গাড়ির দিকে এগিয়ে এলো।গাড়ির দরজা খুলে সে ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসল, পাশে বসা অরি তার দিকে একবার চাইল আবার সাথে সাথে সে চোখ নামিয়ে আনলো। সারিম কোনো কথা না বাড়িয়ে গাড়ি স্টার্ট দিল
ভেন্টিলেটর আর হার্ট মনিটরের চেনা যান্ত্রিক শব্দ ছাড়া চারপাশটা যেন কোনো এক আসন্ন ঝড়ের অপেক্ষায় থমথম করছিল।ঠিক তখনই, একটা অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটল।
হসপিটালের কেবিনের বেডে শুয়ে থাকা মহিলাটির চোখের পাতা দুটো তীব্র এক যন্ত্রণায় কুঁচকে গেল। চৌদ্দটা বছর ধরে যে মস্তিষ্ক গভীর সুপ্তির অন্ধকারে ডুবে ছিল, সেখানে হঠাৎ যেন হাজার ওয়াটের বিদ্যুৎ চমকে উঠল।স্মৃতির দেয়ালে হাতুড়ির মতো আঘাত করতে লাগল।বুকের ভেতরটা আচমকা এক বিশাল নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্য হাহাকার করে উঠল। ফুসফুস দুটো যেন বাতাস পানের জন্য ছটফট করে উঠল। অবশ হয়ে থাকা গলার ভেতর থেকে একটা অস্পষ্ট, কর্কশ ঘড়ঘড়ে আওয়াজ বেরিয়ে এল।পুরো শরীরটা এক ঝটকায় ধনুকের মতো বেঁকে গেল।
ধীরে ধীরে, অত্যন্ত কষ্ট করে সে তার চোখের ভারী পাতা দুটো মেলল। চৌদ্দ বছর পর পৃথিবীর আলো প্রথমবার তার চোখে এসে পড়তেই এক তীব্র জ্বালা অনুভূত হলো। ঝাপসা দৃষ্টিটা আস্তে আস্তে পরিষ্কার হতে লাগল। চোখের সামনে হসপিটালের সাদা ছাদ, ঝুলন্ত স্যালাইনের বোতল আর চারপাশের যান্ত্রিক সেটআপ দেখে তার বুঝতে বাকি রইল না সে কোথায় আছে। কিন্তু তার অবচেতন মন বলছিল—এখানে থাকা আর নিরাপদ নয়। তাকে ছলে-বলে-কৌশলে এখান থেকে বের হতেই হবে।
মহিলাটি অত্যন্ত সতর্কতায় নিজের হাত থেকে স্যালাইনের নিডল আর শরীরের সাথে যুক্ত মনিটরের তারগুলো এক এক করে খুলে ফেলল। মনিটরটি যাতে কোনো বিপ শব্দ না করে, সে জন্য অত্যন্ত চতুরতার সাথে সেটার মেইন সুইচটা বন্ধ করে দিল। দীর্ঘ চৌদ্দ বছর অব্যবহৃত থাকার কারণে পা দুটো প্রথমবার মাটিতে ফেলতেই অবশ হয়ে আসছিল, পুরো পৃথিবীটা যেন দুলছিল। কিন্তু সে দমল না। দেয়াল ধরে ধরে, নিজের সমস্ত শক্তি এক সুতোয় বেঁধে সে কেবিনের দরজার দিকে এগোল।
বাইরে তখন সকালের ডিউটি বদলের সময়। করিডোরে নার্স আর সিকিউরিটি গার্ডদের ব্যস্ততা একটু কম। মহিলাটি কেবিনের ভেতরে থাকা একটা অ্যাপ্রন নিজের গায়ে জড়িয়ে নিল এবং ওড়না দিয়ে মুখটা কিছুটা আড়াল করে নিল। হসপিটালের কড়া সিকিউরিটির চোখ ফাঁকি দেওয়া সহজ ছিল না, কিন্তু সকালের শিফট পরিবর্তনের সেই সুবর্ণ সুযোগটাকে সে কাজে লাগাল। করিডোরের সিসিটিভি ক্যামেরাগুলোর দিক থেকে মুখ লুকিয়ে, অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হাঁটার অভিনয় করে সে পিছনের ইমার্জেন্সি এক্সিট দিয়ে হসপিটালের বাইরে বেরিয়ে এল।
হসপিটালের সীমানা ছাড়িয়ে মূল রাস্তায় আসতেই সকালের তীব্র রোদ আর কোলাহল তাকে গ্রাস করল। মহিলাটির শরীর তখনো কাঁপছিল, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। সে আর এক মুহূর্তও নষ্ট করতে চাইল না।
রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটা খালি ট্যাক্সি দেখে সে মরিয়া হয়ে সেটার দিকে এগিয়ে গেল। ট্যাক্সিচালকের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই চালক কিছুটা অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল। মহিলাটি কোনো ভূমিকা না করে, অত্যন্ত দুর্বল গলায় একটি সুনির্দিষ্ট ঠিকানার নাম বললো।
ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দিতেই মহিলাটি পেছনের সিটে হেলান দিয়ে বসল। তার বুকটা তখনো দুরুদুরু কাঁপছিল। সে জানে, গন্তব্যে পৌঁছানোর আগে তাকে একটা অত্যন্ত জরুরি কাজ সারতে হবে। সে কিছুটা ঝুঁকে ড্রাইভারের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল।
“ভাই, আপনার ফোনটা কি একটু দেওয়া যাবে? একটা ভীষণ জরুরি কল করতে হবে। প্লিজ।”
মহিলাটির গলার স্বরে এমন এক আকুতি ছিল যে ড্রাইভার না বলতে পারল না। সে নিজের মোবাইল ফোনটা আনলক করে পেছনের সিটে বাড়িয়ে দিল।
মহিলাটি ফোনটা হাতে নিল। চৌদ্দ বছর ধরে কোনো নম্বর ডায়াল না করলেও, একটা বিশেষ নম্বর তার মস্তিষ্কের কোষে কোষে খোদাই করা ছিল। কাঁপতে থাকা আঙুলে সে নম্বরটি টিপল এবং কল বাটনে চাপ দিয়ে ফোনটা কানে ধরল।
রিং হতে লাগল… এক বার, দুই বার, তিন বার…। অপর প্রান্তের প্রতিটি রিং যেন মহিলাটির হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন বাড়িয়ে দিচ্ছিল।
অবশেষে ওপাশ থেকে কলটা রিসিভ হলো। এক গম্ভীর পুরুষের কণ্ঠস্বর ভেসে এল,
_”হ্যালো, কে বলছেন?”
মহিলাটি প্রথম দফায় কোনো কথা বলতে পারল না। তার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।
ওপাশ থেকে আবারও বিরক্তিকর গলায় প্রশ্ন এল,
_”হ্যালো? কে আপনি? কথা বলছেন না কেন? কাকে চান?”
এবার মহিলাটি নিজের ভেতরের সমস্ত জড়তা আর ভয় ঝেড়ে ফেলে সোজা হয়ে বসল। জানালার বাইরে ছুটে চলা শহরের দিকে তাকিয়ে সে অত্যন্ত শান্ত, গম্ভীর অথচ চেনা এক শীতল কণ্ঠে বলে উঠল-
ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ২১
_”সময়টা খুব দীর্ঘ হলেও… আশা করি আমাকে এত সহজে ভুলে যাওনি।”
কথাটা শোনামাত্রই ওপাশের ব্যক্তিটির দীর্ঘশ্বাসের শব্দও যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। ওপ্রান্তে এক মহাজাগতিক নীরবতা নেমে এল। কয়েক সেকেন্ডের সেই স্তব্ধতা ভেঙে অপর প্রান্তের পুরুষটি অত্যন্ত অস্ফুট, অবিশ্বাস্য এবং কাঁপতি স্বরে ফিসফিস করে বলে উঠল
_”…আনতারা? তুমি! তুমি বেঁচে আছো?”
