Home ইশকে দে ফানিয়ার ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ২৬

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ২৬

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ২৬
মেহজাবিন নাদিয়া

সারিম টালমাটাল পায়ে পুরো রুমটা অরিকে খুঁজতে লাগল। পর্দার আড়াল হতে-সব জায়গা অস্থির হয়ে দেখেও যখন বউটার ছায়াটুকু পেল না, তখন ওর শরীরের ভেতরের সেই অসহ্য গরমটা আর সহ্য হলো না।
মাথাটা ঝিম ধরে আসছে, নিঃশ্বাস ভারী। সারিম আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। দাঁতে দাঁত চেপে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গেল।
দরজাটা সশব্দে বন্ধ করে শাওয়ারটা ফুল স্পিডে ছেড়ে দিল। ঠান্ডা পানির ধারা মাথার ওপর আছড়ে পড়তেই সারিম দুই হাতে দেয়ালটা খামচে ধরল। চোখ বন্ধ করে লম্বা শ্বাস নিল। নিজের সাথে নিজেই যুদ্ধ করছে লোকটা—এই মুহূর্তে একটু স্থির হওয়া খুব দরকার।
ওদিকে কার্বাডের ওপর গুটিসুটি মেরে বসে থাকা অরি নিচে থেকে পানির শব্দ শুনেই বুঝল, সারিম ওয়াশরুমে গেছে। এই সুযোগটাই ওর জন্য জান বাঁচানো। এক সেকেন্ডও দেরি না করে অরি কার্বাড থেকে নামল। পা দুটো তখনো থরথর করে কাঁপছে, বুকের ভেতর ধুকপুক করছে হাজারটা ড্রাম। দরজার লকটা আলতো করে খুলে, একবার পেছন ফিরে তাকাল। ওয়াশরুমের ভেতর থেকে শুধু পানির শব্দ আসছে।
অরি নিঃশব্দে, বিড়ালের মতো পা টিপে টিপে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। করিডোর ফাঁকা। তিনতলার দিকে দৌড় দিল সে, যেন পেছনে কোনো দানব ধাওয়া করছে।নিজের রুমে ঢুকেই ধড়াম করে দরজাটা বন্ধ করে দিল অরি। সাথে লক। পিঠটা দরজার সাথে ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল। বুকের ভেতরটা এত জোরে ওঠানামা করছে যে মনে হচ্ছে এখুনি দম বন্ধ হয়ে যাবে।

_“আল্লাহ… বাঁচালা…”
অস্ফুটে বলেই ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ল অরি। দুই হাঁটুর মাঝে মুখ গুঁজে লম্বা করে শ্বাস নিল। আজকের মতো ওই লোকটার হাত থেকে বেঁচেছে-এইটাই অনেক।
ঘড়ির কাঁটা তখন রাত দুটো ছুঁইছুঁই। আকাশভাঙা বৃষ্টি নেমেছে, যা সেন্ট্রাল জেলের কংক্রিটের দেয়ালে আছড়ে পড়ছে অবিরত।চার নম্বর সেলটার ভেতরের পরিবেশ বাইরের বৃষ্টির চেয়েও হাজার গুণ বেশি স্যাঁতসেঁতে এবং থমথমে।
সেলে হাই-ভোল্টেজ হ্যালোজেন বাতি জ্বলছে। তীব্র আলোয় চারপাশের অন্ধকার কেটে গেলেও বাতাসে ভাসছে তীব্র পচা গন্ধ। ঘরের ঠিক মাঝখানে পড়ে আছে একটা চাদর জড়ানো লাশ। তবে তাকে লাশ বলাটা ভুল, ওটা এখন গলিত মাংসের একটা পিণ্ড মাত্র। শরীর থেকে মাংস পচে গলে চুয়ে চুয়ে মেঝেতে পড়ছে।
লাশটার চারপাশে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন পুলিশের চার-পাঁচজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, সিআইডির ফরেন্সিক টিম এবং লোকাল থানার ইনচার্জ। সবার মুখেই রুমাল গোঁজা, চোখ-মুখে তীব্র অস্বস্তি। কিন্তু একজনের চোখে কোনো অস্বস্তি নেই। তিনি এসিপি আয়ুশ কায়দার। সিআইডির স্পেশাল ক্রাইম ব্রাঞ্চের লিড অফিসার। ৩৪ বছর বয়স, কিন্তু টানটান মেদহীন শরীর, ধারালো চিবুক আর তীক্ষ্ণ চোখের চাউনি তাকে যেকোনো করপোরেট মডেলের চেয়েও বেশি আকর্ষণীয় করে তুলেছে। পরনে একটা কালো ওভারকোট, যা তাকে একদম ফিটফাট দেখাচ্ছে।

লোকাল থানার ওসি প্রদীপ রুমালটা নাক থেকে একটু সরিয়ে কাশতে কাশতে বললেন,
_”স্যার, আর থাকা যাচ্ছে না এখানে। গন্ধটা ফুসফুস অব্দি পৌঁছে যাচ্ছে। জেলের ভেতরে এতো নিরাপত্তা, সিসিটিভি ক্যামেরা, ২৪ ঘণ্টার পাহাড়া থাকা সত্ত্বেও এই লোকটাকে কে এভাবে মেরে রেখে গেল, আর লাশটার এই অবস্থাই বা কী করে হলো… কিছুই মাথায় ঢুকছে না।”
ফরেন্সিক টিমের প্রধান ডক্টর স্যানাল লাশের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে ম্যাগনিফাইং গ্লাসটা পকেটে পুরলেন। গ্লাভস পরা হাত দুটো তুলে তিনি আয়ুশের দিকে তাকিয়ে বললেন,
_”আয়ুশ, এখানে দাঁড়িয়ে আর নতুন কিছু বের করা সম্ভব নয়। মৃত্যুর ধরণটা অত্যন্ত অস্বাভাবিক। কোনো সাধারণ বিষ বা রাসায়নিক নয়, মনে হচ্ছে শরীরের ভেতরের কোষগুলো কোনো অজানা ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসের কারণে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এভাবে গলে গেছে। এটাকে এখনই আমাদের মেইন ফরেন্সিক ল্যাবে পাঠাতে হবে। বডি প্রিজার্ভ না করলে সকালে শুধু কঙ্কালটাই পড়ে থাকবে।”
আয়ুশ পকেটে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। সে একদৃষ্টে লাশটার দিকে তাকিয়ে ঠাণ্ডা গলায় বলল,

_”এটাকে এখনই ল্যাবে পাঠানোর ব্যবস্থা করুন। কোনো একটা ক্লু যেন মিস না হয়। আই ওয়ান্ট দ্য ফুল অটোপ্সি রিপোর্ট বাই টুমরো মর্নিং।”
_”ঠিক আছে, আমি ব্যবস্থা করছি,” বলে ডক্টর স্যানেল তার টিমকে লাশটি স্ট্রেচারে তোলার নির্দেশ দিলেন।
লাশটা ঘর থেকে বের করে নিয়ে যাওয়ার পর সেলের ভেতরের ভারী বাতাসটা কিছুটা হালকা হলো।ঠিক তখনই সেলের দরজায় এসে দাঁড়াল অবিরাম-আয়ুশের বিশ্বস্ত অ্যাসিস্ট্যান্ট এবং সিআইডির সাব-ইন্সপেক্টর। তার হাতে একটা পুরনো লাল রঙের ফাইল।
আয়ুশ না ফিরেই বলল, _”এনেছ অবিরাম?”
_”হ্যাঁ স্যার। আপনি বলার পরেই হেডকোয়ার্টারের ওল্ড আর্কাইভ থেকে বের করলাম। কিন্তু…” অবিরামের গলায় স্পষ্ট দ্বিধা।
আয়ুশ ঘুরল। _”কিন্তু কী? বলো।”
অবিরাম ফাইলটা আয়ুশের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

_”এই লোকটার ফাইল ঘাঁটতে গিয়ে যা দেখলাম,এই মৃত কয়েদি আর কেউ নয়… সে ছিল চৌদ্দ বছর আগের কুখ্যাত ‘অর্গান ট্রাফিকিং কেসের অন্যতম প্রধান সন্দেহভাজন।”
‘অর্গান ট্রাফিকিং’ শব্দটা উচ্চারণ হতেই ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে থাকা অন্য police অফিসাররা চমকে উঠলেন। ওয়ান অফ দ্য মোস্ট ডার্ক অ্যান্ড মিস্টেরিয়াস কেসেস অফ দ্য স্টেট।
আয়ুশ ফাইলের পাতাগুলো উল্টাতে উল্টাতে বলল,
_”এই কেসের মূল মাথা কে ছিল? ফাইলের সারসংক্ষেপটা আমাকে মুখে বলো।”
অবিরাম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে শুরু করল,
_”চৌদ্দ বছর আগে শহরের বুকে একটা আন্ডারগ্রাউন্ড অবৈধ মানব অঙ্গ পাচারের চক্র গড়ে উঠেছিল, যার কোড নেম ছিল ‘অর্গান ট্রাফিকিং’। এই কেসের সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে ছিল দুজন মানুষের নাম। একজন হলেন মহিলা ডাক্তার যার সম্পর্কে এখনো অব্দি কিছু জানা যায়নি। আর এই যে গলিত লাশটা আজ আমরা জেলের ভেতর পেলাম, এই লাশটা দ্বিতীয়জনের কুখ্যাত সার্জন ডাক্তার জুইফানের!”
আয়ুশের চোখ দুটো সামান্য কুঁচকে গেল।

_”তার মানে এই মৃতদেহটা ডাক্তার জুইফানের?”
“হ্যাঁ স্যার!”
অবিরাম ফাইলের একটা পাতায় আঙুল রেখে বলল,
_”রেকর্ড অনুযায়ী, এই জুইফানই ছিল সেই চক্রের মেইন সার্জন যে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে অবৈধ উপায়ে অঙ্গ প্রতিস্থাপন করত। জুইফানের পেছনে আরেকজন আসল মাস্টারমাইন্ড ছিল, যাকে আজ পর্যন্ত কোনো পুলিশ বা সিআইডি খুঁজে পায়নি। সে পর্দার আড়ালেই থেকে গেছে। তবে একটা অদ্ভুত তথ্য আছে ফাইলে-শোনা গিয়েছিল, চৌদ্দ বছর আগে সেই মহিলা ডাক্তার যখন পুলিশের জালে ধরা পড়ার মুখে, তখন এক রহস্যময় অগ্নিকাণ্ডে সে তার নিজ ল্যাবরেটরিতেই পুড়ে মারা গেছে।”
_”এরপর?
অবিরাম এবার আয়ুশের আরও কাছে এগিয়ে এল। তার গলা চেপে এল ভয়ে।
“স্যার, আমি আপনাকে একটা অনুরোধ করতে চাই। এই কেসটা নিয়ে আপনি আর ঘাঁটাঘাঁটি করবেন না। প্লিজ স্যার।”
আয়ুশ ভুরু কুঁচকে তাকাল।

“কেন?আয়ুশ কায়দার কোনো কেস না সলভ করে পেছনে ফেরে না,এটা তুমি জানো।”
_”জানি স্যার। আপনি সিআইডির সেরা অফিসার। আপনি এমন সব আন্তর্জাতিক ক্রিমিনালদের খাঁচায় পুরেছেন, যা অন্য কেউ ভাবতেও পারে না। কিন্তু এই কেসটা আলাদা। এটা একটা অভিশপ্ত কেস,”
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা প্রদীপ বাবুও এবার মুখ খুললেন,
_”স্যার, অবিরাম ঠিকই বলছে। এই কেসটা যে-ই ছুঁয়েছে, সে-ই শেষ হয়ে গেছে।”
আয়ুশ ফাইলটা বন্ধ করে একটা টেবিলের ওপর রাখল।
_”ডিটেইলসে বলো। আমি অলৌকিকতায় বিশ্বাস করি না, অপরাধীর বুদ্ধিতে বিশ্বাস করি।”
অবিরাম বলল,

_”চৌদ্দ বছর আগে এই কেসটির প্রথম দায়িত্বে ছিলেন ইন্সপেক্টর দিলরাজ সাহা। অত্যন্ত সৎ এবং সাহসী অফিসার। তিনি যেই জুইফানের এই চক্রের খোঁজ পেলেন, তার ঠিক তিন দিনের মাথায় ওনার গাড়ির ভেতর ওনার লাশ পাওয়া যায়। ডাক্তাররা বলেছিলেন হার্ট অ্যাটাক, কিন্তু ওনার চোখ দুটো ভয়ের চোটে ঠিকরে বেরিয়ে আসছিল। দিলরাজ বাবুর মৃত্যুর পর আরও তিনজন অফিসার বিভিন্ন সময়ে এই ফাইলটা খুলেছিলেন। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো এই যে, যারাই এই কেসটির দায়িত্বে আসত, তারা ফাইল খোলার ঠিক তিন থেকে চার দিনের ভেতরে কোনো না কোনোভাবে মারা যেত! কেউ ছাদ থেকে পড়ে, কেউ সাইয়ানাইড খেয়ে, কেউ বা মাঝরাস্তায় গাড়ি দুর্ঘটনায়। ডিপার্টমেন্ট বাধ্য হয়ে কেসটা ক্লোজ করে রেড জোনে ফেলে রেখেছিল।”
সেলে হঠাৎ একটা নীরবতা নেমে এল। শুধু বাইরের বৃষ্টির শব্দ আর হ্যালোজেন লাইটের মৃদু গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল।আয়ুশ অবিরামের দিকে তাকাল। তার ঠোঁটের কোণে একটা মৃদু, আত্মবিশ্বাসী হাসি ফুটে উঠল। সে অবিরামের কাঁধে হাত রেখে বলল,
_”তিন থেকে চার দিন, তাই তো? তাহলে আমার হাতেও ঠিক তিন দিন সময় আছে। অবিরাম, যারা মারা গেছে, তারা অপরাধীর চালটা বুঝতে পারেনি।দাবার বোর্ডের উল্টোদিকে বসলে কিন্তু চালটা নিজেকেই দেয়। ভয় পেও না। কাল সকাল নয়টায় আমার কেবিনে এই কেসের প্রতিটা ভিকটিম আর সাসপেক্টের ডিটেইলস চাই।”

বলেই আয়ুশ সেল থেকে বেরিয়ে দীর্ঘ করিডোর দিয়ে হাঁটতে লাগল। তার বুটের শব্দ ফাঁকা দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল।আকাশভাঙা বৃষ্টি তখনো কমেনি, বরং তার বেগ আরও বেড়েছে। উইন্ডস্ক্রিনের ওপর ওয়াইপার দুটো তীব্র গতিতে আছড়ে পড়ছে। স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে আয়ুশের চোখের সামনে কেবল ভাসছিল চার নম্বর সেলের সেই গলিত লাশের বীভৎসতা আর অবিরামের বলা চৌদ্দ বছর আগের সেই অভিশপ্ত ইতিহাসের কথা। কিন্তু আয়ুশের মস্তিষ্কে ভয়ের কোনো স্থান নেই; সেখানে কেবল ঘুরপাক খাচ্ছে দাবার বোর্ডে অপরাধীকে টেক্কা দেওয়ার নিখুঁত চাল।
ধানমন্ডির এক বহুতল অ্যাপার্টমেন্টের আন্ডারগ্রাউন্ড পার্কিংয়ে গাড়িটা পার্ক করে লিফট বেয়ে নিজের ফ্ল্যাটের সামনে এসে দাঁড়াল আয়ুশ। পকেট থেকে চাবি বের করে লকটা খুলতেই ভেতরের মৃদু, নীলচে আলোটা চোখে পড়ল। সারাদিনের ক্লান্তি শরীর থেকে ঝেড়ে ফেলার জন্য সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। দরজাটা বন্ধ করে লক করতেই পুরো ঘর জুড়ে এক অদ্ভুত নীরবতা আর সুগন্ধি চেনা সুবাস তাকে স্বাগত জানাল।
আয়ুশ সোফার দিকে এগিয়ে গিয়ে কেবল তার ওভারকোটটা খুলে রেখেছে, ঠিক তখনই পেছন থেকে এক জোড়া নরম, উষ্ণ হাত তার কোমর জড়িয়ে ধরল। পিঠে অনুভূত হলো এক নারীর সুডৌল শরীরের কোমল ছোঁয়া। নারীটি রিয়া।
রিয়ার পরনে তখন অত্যন্ত খোলামেলা একটা সিল্কের কালো নাইট গাউন, যার পাতলা কাপড়ের ওপর দিয়ে তার শরীরের প্রতিটি ভাঁজ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। স্লিভলেস গাউনের নুডুলস স্ট্র্যাপটা তার মসৃণ কাঁধ বেয়ে কিছুটা নিচে নেমে এসেছে। আয়ুশের চওড়া পিঠে নিজের মুখটা ঘষে রিয়া ফিসফিস করে বলল,

_”এত দেরি করলে কেন, আয়ুশ? আমি কতক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছি জানো?” কণ্ঠস্বরে তার তীব্র মাদকতা আর অভিমান মেশানো।
আয়ুশ একটু হাসল। সে ঘুরে দাঁড়িয়ে রিয়ার কোমরে হাত রাখল। রিয়ার উন্মুক্ত গলার নিচে চাদরের মতো ছড়িয়ে থাকা খোলা চুলগুলো থমথমে রাতের পরিবেশকে এক নিমেষে বদলে দিল। আয়ুশ নিজের গলার টাইটা এক হাত দিয়ে টেনে আলগা করতে করতে বলল,
_”একটা জটিল কেস চলে এল রিয়া।”
_”আজ রাতে আর কোনো কেসের কথা শুনতে চাই না,”
রিয়ার তপ্ত নিশ্বাস আয়ুশের গলায় আছড়ে পড়ল। সে আয়ুশের শার্টের বোতামগুলো একটা একটা করে খুলতে শুরু করল। তার আঙুলের ছোঁয়া আয়ুশের মেদহীন, টানটান বুকে এক অদ্ভুত শিহরণ জাগিয়ে তুলল। বাইরে বৃষ্টির গর্জন আর ঘরের ভেতরে দুই শরীরের তীব্র উষ্ণতা যেন একাকার হয়ে যাচ্ছিল।
আয়ুশ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না।রিয়াকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে নিজের দিকে টেনে নিল। রিয়ার খোলামেলা পোশাকের ভেতর দিয়ে তার উষ্ণ ত্বকের স্পর্শ আয়ুশের ভেতরের পুরুষালি চাহিদাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিল।আয়ুশ ঝুঁকে পড়ে রিয়ার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দিল। গভীর, তীব্র এক চুম্বনে রিয়া শিউরে উঠল, তার হাত দুটো আয়ুশের চুলে চুলে বিলি কাটতে লাগল। চুম্বনের আবেশে রিয়াকে কোলপাঁজা করে তুলে নিয়ে আয়ুশ পা বাড়াল বেডরুমের দিকে।
বিছানার নরম চাদরে রিয়াকে শুইয়ে দিতেই তার পোশাকের সামনের অংশটা আরও কিছুটা সরে গিয়ে তার বক্ষযুগলের উন্মুক্ত সৌন্দর্য প্রস্ফুটিত হয়ে উঠল। জানলা দিয়ে আসা বাইরের বিদ্যুতের আলোয় রিয়ার সেই মোহময়ী রূপ দেখে আয়ুশের চোখ দুটো আরও গাঢ় হলো। সে নিজের শার্টটা সম্পূর্ণ খুলে ছুঁড়ে ফেলে দিল মেঝেতে।

ধীরে ধীরে দুই শরীর এক অলিখিত তৃষ্ণায় মেতে উঠল। আয়ুশের ঠোঁট রিয়ার ঠোঁট ছেড়ে নেমে এল তার মসৃণ গলায়, তারপর আরও নিচে-যেখানে রিয়ার হৃদস্পন্দন দ্রুত থেকে দ্রুততর হচ্ছিল। রিয়ার মুখ থেকে এক মৃদু তৃপ্তির গোঙানি বেরিয়ে এল, সে আয়ুশকে আরও শক্ত করে নিজের শরীরের সাথে চেপে ধরল।
বাইরের ঝোড়ো হাওয়া আর বৃষ্টির শব্দের পটভূমিতে, সেই আধা-অন্ধকার ঘরে দুটি শরীর এক পরম শারীরিক মিলনে লিপ্ত হলো। সমস্ত মানসিক ক্লান্তি আর চারপাশের রহস্যের জাল থেকে দূরে, আয়ুশ নিজেকে সমর্পণ করল রিয়ার এই ভালোবাসার গভীর সমুদ্রে,
সকালে যখন জেবার ঘুম ভাঙল, ঘরের ভেতর তখন ভোরের আলো মৃদুভাবে উঁকি দিচ্ছে। চোখ মেলেই সে অনুভব করল, আরিশান মৃধা ওর শরীর থেকে কিছুটা দূরে সরে হাত-পা ছড়িয়ে গভীর ঘুমে মগ্ন। কাল রাতের সেই ভয়াবহ শারীরিক ও মানসিক ঝড়ের পর ওনার শান্ত, ক্লান্ত মুখশ্রী দেখে জেবার বুকটা এক অদ্ভুত মায়ায় ভরে উঠল। সে অত্যন্ত সন্তর্পণে, যাতে ওনার ঘুম না ভেঙে যায়, বিছানা থেকে নেমে ধীর পায়ে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গেল।ওয়াশরুমে গিয়ে শাওয়ারের নিচে দাঁড়াতেই কাল রাতের প্রতিটা স্পর্শ, আরিশান মৃধার সেই উম্মত্ততা আর শেষমেশ ওর বুকে মাথা রেখে শান্ত হয়ে যাওয়ার স্মৃতিগুলো জেবার মনে ভিড় করে এলো। শাওয়ার নিয়ে শরীর ও মন কিছুটা হালকা করে যখন সে জামা পড়ে বাইরে বেরিয়ে এলো, তখন আচমকা থমকে দাঁড়াল জেবা।দেখতে পেল, আরিশান মৃধা বিছানায় পিঠ ঠেকিয়ে জেগে বসে আছেন। ওনার তীক্ষ্ণ, গম্ভীর চোখ দুটো সরাসরি শাওয়ার থেকে সদ্য বের হওয়া জেবার ভেজা অবয়বের ওপর নিবদ্ধ। জেবাকে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি হাত বাড়িয়ে বিছানার পাশটা দেখিয়ে অত্যন্ত নিচু অথচ স্পষ্ট স্বরে বললেন,

_“এখানে এসে বসো।”
জেবা কিছুটা লজ্জিত ও আড়ষ্ট হয়ে ওনার নির্দেশমতো বিছানার একপাশে গিয়ে বসল। আরিশান মৃধা কোনো কথা না বলে পাশ থেকে একটা শুকনো তোয়ালে তুলে নিলেন এবং অত্যন্ত আলতো হাতে জেবার ভেজা মাথার চুলগুলো মুছতে লাগলেন। ওনার মতো একজন গম্ভীর ও শক্ত হৃদয়ের মানুষের হাত থেকে এমন কোমল ছোঁয়া পেয়ে জেবা ভেতরে ভেতরে শিউরে উঠল। তোয়ালে দিয়ে মোছা শেষে তিনি ড্রয়ার থেকে হেয়ার ড্রায়ারটা বের করলেন। মেশিনের মৃদু শব্দের সাথে সাথে ওনার আঙুলগুলো যখন জেবার চুলের ভাঁজে ভাঁজে বিলি কাটছিল, তখন জেবা এক অদ্ভুত ভালো লাগায় চোখ দুটো বুজে ফেলল। সে কখনো স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি যে আরিশান মৃধা তাকে এতটা যত্ন করবে, এতটা আগলে রাখবে। কাল রাতের করা আরিশান মৃধার আচরণের পর আজ জেবার মনে কোনো সংশয় রইল না-এই পুরুষটি তাকে মনে-প্রাণে নিজের স্ত্রী হিসেবে মেনে নিয়েছে।
চুল শুকানো শেষ হতেই আরিশান মৃধা হেয়ার ড্রায়ারটা পাশে রেখে জেবার খুব কাছাকাছি এগিয়ে এলেন। ওনার উষ্ণ নিঃশ্বাস জেবার গালে আছড়ে পড়তেই জেবার হৃদস্পন্দন আবার দ্রুত হতে শুরু করল। আরিশান মৃধা ধীর হাতে জেবার চিবুকটা স্পর্শ করে মুখটা সামান্য ওপরে তুললেন। ওনার নজর গেল জেবার ঠোঁটের কোণের দিকে, যেখানে কাল রাতের তীব্র কামড়ের দাগটা এখন কিছুটা কালচে হয়ে রক্ত জমে আছে।ওনার চোখের কঠোরতা মুহূর্তে গলে এক অপরাধবোধে রূপ নিল। অত্যন্ত আলতো করে, পরম যন্তে তিনি নিজের বুড়ো আঙুলটা জেবার ঠোঁটের সেই ক্ষতে ছোঁয়ালেন। ওনার আঙুলের স্পর্শে ক্ষতস্থানে জায়গাটাতে সামান্য জ্বলে উঠলো জেবার, মুখ দিয়ে মৃদু শব্দে ‘আহ’বেরিয়ে এলো। আরিশান মৃধা অপরাধী গলায় ফিসফিস করে বললেন,

_“বড্ড লেগেছে, তাই না? কাল রাতে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলাম। আই অ্যাম সরি।”জেবা আরিশান মৃধার চোখের সেই অনুশোচনা দেখে ওনার হাতটা নিজের ছোট হাতের মুঠোয় নিয়ে আলতো করে মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দিল-তার কোনো ক্ষোভ নেই।
এদিকে সকাল সকাল আনতারা মৃধা ড্রয়িং রুমের সোফায় অত্যন্ত গম্ভীর ও ক্রুদ্ধ মুখে বসে আছেন। কাল রাতের ওষুধের ঘোর কেটে যাওয়ার পর থেকেই ওনার মেজাজ তুঙ্গে।এমন সময় ওপর থেকে সবার আগে অরি নিচে নেমে এলো।ওর পরনে কালকের সাধারণ পোশাক, চোখে রিডিং গ্লাস,মুখটা ক্লান্তিতে মলিন দেখাচ্ছে।একি সময় সিঁড়ি ভেঙে নিচে নামতে দেখা গেল জেবাকে।আনতারা মৃধা সিঁড়ি দিয়ে কাউকে নামতে দেখে সেদিকে ফিরলেন। জেবাকে দেখামাত্রই ওনার চোখের সামনে কাল রাতের ঘটনাগুলো ভেসে উঠল-এই মেয়েটা ওনার এত প্ল্যান নষ্ট করে এখনো এই বাড়িতে রয়ে গেছে! ওর বাবা ওকে নিতে এসে একা ফিরে গেছে, অথচ সে যায়নি!
ক্রোধের এক তীব্র অগ্ন্যুৎপাত নিয়ে আনতারা মৃধা সোফা ছেড়ে প্রায় তেড়ে এলেন জেবার দিকে। জেবা কিছু বোঝার বা কথা বলার সুযোগ পাওয়ার আগেই আনতারা মৃধা প্রচণ্ড শক্তিতে ওর গালে পরপর দুটো থাপ্পড় বসিয়ে দিলেন!থাপ্পরের শব্দটা ড্রয়িং রুমের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হলো। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অরি হতবাক ও স্তব্ধ হয়ে গেল। জেবা নিজের ঠোঁটের কোণের ক্ষতে হাত চেপে মাথা ধরে নিচু করে ফেললো।আনতারা মৃধা জেবার দিকে তর্জনী উঁচিয়ে বিষাক্ত গলায় চিৎকার করে বলতে লাগলেন,

_“নির্লজ্জ, ক্যারেক্টারলেস মেয়ে একটা! তোর বাবা তোকে ত্যাজ্য করে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিতে বলে গেছে, তাও তোর লজ্জা হয় না এই বাড়িতে পড়ে থাকতে? বাবার বয়সী একটা মরদের বিছানায় রাতে ঘুমানোর জন্য এত লোভ তোর? লজ্জা-শরম বলতে কিচ্ছু নেই তোর ওই ছোট জাতের শরীরে? নতুন নাটক সাজিয়েছিস আমার স্বামীকে ভোলানোর জন্য? জঘন্য মেয়ে একটা!”
জেবার ওপর এমন নির্মম অপবাদ,অপমান সইতে না পেরে.পাশ থেকে অরি অত্যন্ত ভদ্রভাবে, নিচু স্বরে আনতারা মৃধাকে থামানোর চেষ্টা করল। সে এগিয়ে এসে বলল,
_“আন্টি, প্লিজ থামুন। এভাবে বলবেন না ওকে।”
কিন্তু অরিকে কথা শেষ করতে দিলেন না আনতারা মৃধা। তিনি অরির দিকে ঘুরে তীব্র ঘৃণায় মুখ বাঁকিয়ে বলে উঠেন,_“মুখ বন্ধ কর অনাথের বাচ্চা! তুই এসছিস এখানে দালালি করতে? তোর নিজের কোনো পরিচয় আছে? কোথা থেকে এক অনাথ, কুড়িয়ে আনা মেয়েকে আমার সারিমের সঙ্গে বিয়ে দিছে!এই মৃধা বাড়ির বউ হওয়ার যোগ্যতা তো দূরের কথা, তোকে তো এই বাড়ির কাজের লোক হওয়ার যোগ্যতা নেই! নিজের স্ট্যাটাস দেখে কথা বলবি!”

ঠিক সেই মুহূর্তে সিঁড়ি দিয়ে ধীর পায়ে নিচে নামছিল সারিম। আনতারা মৃধার শেষ কথাগুলো ওর কান অব্দি পৌঁছানো মাত্রই। সারিমের পুরো শরীর রাগে রি রি করে উঠল।অপরদিকে আনতারা মৃধার মুখে ‘অনাথের বাচ্চা’ শব্দটা শোনা মাত্রই অরি ভেতর থেকে একদম চুপ হয়ে গেল।চোখে রিডিং গ্লাসের ওপর দিয়ে কয়েক ফোঁটা তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে নিচে পড়ে গেল। সে একদম পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
সারিম এক মুহূর্তও নষ্ট না করে দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো এবং সটান অরিকে নিজের চওড়া বুকের মাঝে টেনে নিল।এক হাত দিয়ে অরিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আনতারা মৃধার দিকে চরম ক্ষুব্ধ, হিংস্র খুনে দৃষ্টিতে তাকাল সারিম। নিজের জন্মদাত্রী মায়ের দিকে ছেলের এমন ভয়ংকর চাহনি দেখে আনতারা মৃধা ভেতরে ভেতরে কেঁপে উঠলেন, ওনার গলার স্বর মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেল।
ঠিক তখনই করিডোর কাঁপিয়ে ভারী পায়ের শব্দে নিচে নেমে এলেন আরিশান মৃধা। ড্রয়িং রুমের থমথমে পরিবেশ দেখে ওনার ভ্রু কুচকে এলো।প্রথমেই চোখ গেল জেবার দিকে।জেবা তখনো ঠোঁটের কোণে হাত দিয়ে,গালে থাপ্পড়ের লাল দাগ নিয়ে মাথা নিচু করে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। ওনার দেওয়া কাল রাতের কামড়ের দাগটা থেকে আবার সামান্য রক্ত গড়িয়ে পড়ছে।আরিশান মৃধার ভেতরের পুরুষটা যেন মুহূর্তে এক হিংস্র দানবে রূপ নিল। তিনি দ্রুত পায়ে জেবার দিকে এগিয়ে গেলেন এবং ওর মুখটা উঁচিয়ে ধরে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও গম্ভীর গলায় জিজ্ঞাসা করলেন,

_“কী হয়েছে জেবা? কে করেছে এটা?”
জেবা চোখ বন্ধ করে শুধু মাথা নাড়ল, ভয়ে কোনো কথা বলল না। কিন্তু আরিশান মৃধার বুঝতে বাকি রইল না,কাজটা কার। তিনি এক ঝটকায় ঘুরে দাঁড়ালেন এবং আনতারা মৃধার সামনে এসে দাঁড়ালেন।আনতারা মৃধা কিছু বলার জন্য মুখ খোলার আগেই আরিশান মৃধা ওনার ডান হাতটা বাতাসে তুলে এক কষে থাপ্পড় লাগালেন আনতারা মৃধার গালে!
থাপ্পড়ের তীব্র শব্দে ড্রয়িং রুমের উপস্থিত অরি, জেবা-দুজনেই তীব্রভাবে কেঁপে উঠল।তবে সারিমের এসবে তেমন কোনো হেলদোল দেখা গেল না। আনতারা মৃধা ছিটকে সোফার ওপর গিয়ে পড়লেন, ওনার ঠোঁটের কোণ ফেটে রক্ত বেরিয়ে এলো। তিনি গালে হাত দিয়ে চরম বিস্ময় আর অপমানে আরিশান মৃধার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠলেন,_“আরিশান! তুমি নিজের স্ত্রীকে,একটা বাচ্চা মেয়ের জন্য গায়ে হাত তুললে? তোমার এত বড় সাহস কীভাবে হয়!”

আরিশান মৃধার চোখ দুটো রাগে লাল হয়ে আছে। তিনি ওনার গম্ভীর, বজ্রকণ্ঠে গর্জে উঠে বললেন,
_“মুখ সামলে কথা বলো আনতারা! একদম মুখ সামলে! তুমি কার গায়ে হাত তুলেছ জানো? জেবা এই বাড়ির,কোনো বাইরের মেয়ে নয়, ও আমার বিবাহিত স্ত্রী! এই আরিশান মৃধার অর্ধাঙ্গিনী ও। আর তুমি? তুমি তো কেবল আমার অতীতের একটা ভুল, যাকে আমি বর্তমানে দয়া করে এই বাড়িতে থাকতে দিয়েছি,শুধুমাত্র আমার ছেলের মা হিসেবে।আমি যেন আর একবার না দেখি তুমি নিজের লিমিট ক্রস করেছে। আমার স্ত্রীর গায়ে হাত তোলার দুঃসাহস আর কখনো যেন না হয়?”
আনতারা মৃধা রাগে ও অপমানে সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,
_“স্ত্রী? ও তোমার স্ত্রী? একটা বাচ্চার বয়সী মেয়েকে বিয়ে করে তুমি নিজেকে সমাজপতি ভাবছ আরিশান? আমি তোমার প্রথম স্ত্রী, সারিমের মা! এই সংসারে আমার রাজত্ব, আমার অধিকার সবার আগে!”
আরিশান মৃধা এক চিলতে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে অত্যন্ত শীতল গলায় বললেন,
_“অধিকার? যে নারী নিজের সংসার ফেলে বছরের পর বছর পরপুরুষের খোঁজে বাইরে ঘুরে বেড়ায়, তার মুখে অধিকারের কথা মানায় না আনতারা। আজ থেকে এই মৃধা বাড়িতে তোমার কোনো স্থান নেই। যদি সম্মান বাঁচাতে চাও, তবে চুপচাপ পড়ে থাকো। আর যদি দ্বিতীয়বার জেবার দিকে চোখ তুলে তাকিয়েছ, তবে এই বাড়ি থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে তোমাকে বের করে দিতে আমি এক সেকেন্ডও ভাবব না। ইট’স মাই লাস্ট ওয়ার্নিং!”

সারিম এতক্ষন যাবত বাবা আর মায়ের এই কদর্য,ঝগড়া আর চেঁচামেচি দেখে মনে মনে চরম বিরক্তি জন্ম নিল। অরি ওর বুকে মাথা রেখে তখনো নিঃশব্দে কাঁদছে। সারিম আর এক মুহূর্তও এই বিষাক্ত পরিবেশে থাকা প্রয়োজন মনে করল না।
কাউকে কিছু না বলে, ওনাদের ঝগড়ার মাঝেই সারিম এক ঝটকায় অরিকে নিজের পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিল। অরি চমকে উঠে সারিমের গলা জড়িয়ে ধরল। সারিম অত্যন্ত শক্ত ও দ্রুত পায়ে ড্রয়িং রুম পেরিয়ে সদর দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো।
বাইরে পার্ক করে রাখা নিজের গাড়ির সামনে এসে সারিম এক হাত দিয়ে লক খুলে অরিকে অত্যন্ত সাবধানে ফ্রন্ট প্যাসেঞ্জার সিটে বসিয়ে দিল। তারপর নিজে দ্রুত ঘুরে এসে ড্রাইভিং সিটে বসল। গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার পর সারিম অরির দিকে তাকাল। অরি তখনো মাথা নিচু করে, চশমাটা হাতে নিয়ে চোখ মুছছে। ওর সেই মলিন মুখটা দেখে সারিমের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।
সে গাড়িটা মেইন রোডে তুলে এক হাত দিয়ে স্টিয়ারিং ধরে অন্য হাত বাড়িয়ে অরিকে টেনে ডাইরেক্ট ড্রাইভিং সিটে নিজের কোলের ওপর বসিয়ে নিল!অরি আচমকা সারিমের কোলের ওপর এসে পড়ে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে মৃদু স্বরে বলল,

_“কী করছেন সারিম? গাড়ি চালাচ্ছেন তো, এক্সিডেন্ট হবে। আমাকে ওপাশে বসতে দিন।”
সারিম এক হাত দিয়ে অরির কোমরটা শক্ত করে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে ধরে গম্ভীর অথচ অত্যন্ত আদরমাখা স্বরে বলল,
_“চুপচাপ একদম সোজা হয়ে বসে থাক চন্দ্রিমা। কোনো এক্সিডেন্ট হবে না, তোর স্বামী বড্ড ভালো ড্রাইভার। আর ওই কুৎসিৎ কথাগুলো মাথা থেকে একদম বের করে দে।”
অরি সারিমের বুকে মাথা ঠেকিয়ে অস্ফুটে বলল,
_“আপনার মা তো ভুল কিছু বলেনি সারিম। আমার তো সত্যিই কোনো পরিচয় নেই। আমি তো এক অনাথ…”
সারিম গাড়িটা রাস্তার একপাশে ব্রেক চেপে থামিয়ে দিল। সে অরির মুখটা নিজের দুই হাতের মুঠোয় নিয়ে সরাসরি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে তীব্র গলায় বলল,
_“আর একটাও এমন ফালতু কথা বললে তোর ঠোঁট কামড়ে ছিঁড়ে দেব চন্দ্রিমা! কে বলছে তোর পরিচয় নেই? তোর সবচেয়ে বড় পরিচয় তুই মৃধা আবরার সারিম স্ত্রী।ওই মহিলা কী বলল না বলল, তাতে আমার বাল ছেঁড়া যায় না! তুই শুধু আমার, বুঝছিস?”
অরি সারিমের চোখের দিকে তাকিয়ে সব কষ্ট ভুলে গেল। ওর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ম্লান হাসির রেখা ফুটে উঠল। সে সারিমের চওড়া বুকে নিজের মুখটা লুকিয়ে শক্ত করে ওকে জড়িয়ে ধরল। সারিমও অরির মাথায় নিজের থুতনি ঠেকিয়ে অত্যন্ত মমতায় ওর পিঠে হাত বুলাতে লাগল, যেন বাইরের সমস্ত বিষাক্ত ঝড় থেকে সে তার চন্দ্রিমাকে আজীবন এভাবেই আগলে রাখবে।

গাড়ির পেছনের সিটে পাশাপাশি বসে আছে আরিশান মৃধা আর জেবা। এসি সচল থাকায় ভেতরের পরিবেশটা বেশ ঠান্ডা, কিন্তু জেবার মনের ভেতরের অস্থিরতা যেন কিছুতেই কমছে না। ড্রাইভার অত্যন্ত সাবধানে মেইন রোড দিয়ে গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। জেবা আলতো করে আড়চোখে পাশে বসা পুরুষটার দিকে তাকাল। আরিশান মৃধা অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে নিজের আইপ্যাডে কোনো একটা অফিশিয়াল ফাইল দেখছেন, মাঝেমধ্যে ওনার আঙুলগুলো স্ক্রিনে দ্রুত নড়াচড়া করছে। মুখাবয়ব একদম শান্ত, গম্ভীর এবং ভাবলেশহীন। ওনার এই পাথরের মতো শান্ত চেহারা দেখে কার বাপের সাধ্য আছে যে বলবে, মাত্র কিছুক্ষণ আগে এই লোকটা নিজের প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে ড্রয়িং রুমে অমন একটা ভয়ংকর ঝড় তুলে এসেছে, এমনকি নিজের হাতে চড় পর্যন্ত মেরেছে!
আরিশান মৃধার ব্যক্তিত্বটা জেবার কাছে সবসময়ই একটা বড় রহস্যের মতো মনে হয়।ওনার এই পেশাদার ও গম্ভীর রূপটা জেবাকে পুরোপুরি বিভ্রান্ত করে দিচ্ছে। জেবা নিজের ওড়নার খুঁত আঙুলে জড়াতে জড়াতে জানালার বাইরে তাকাল।
বেশ কিছুক্ষণ ওভাবেই নীরবতায় কেটে যাওয়ার পর গাড়িটা প্রধান সড়ক ছেড়ে একটা সুপরিচিত এবং নামী বেসরকারি হাসপাতালের সামনে এসে থামল। ড্রাইভার দ্রুত নেমে এসে পেছনের সিটের দরজা খুলে দাঁড়াল। আরিশান মৃধা নিজের আইপ্যাডটা পাশে রেখে জেবার দিকে চাইলেন। ওনার সেই ঠান্ডা, আদেশসূচক কণ্ঠস্বরে বললেন,

_“নামো।”
জেবা হাসপাতালের বিশাল কাঁচের ভবনের দিকে তাকিয়ে চরম অবাক হয়ে গেল। ওনার দিকে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল,
_“এখানে কেন এসেছি আমরা? কার শরীর খারাপ? আপনার কি কিছু হয়েছে?”
আরিশান মৃধা ওর কোনো প্রশ্নের উত্তর দিলেন না। তিনি গাড়ি থেকে নেমে জেবার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে পুরে নিলেন। ওনার হাতের সেই চিরচেনা দৃঢ় বাঁধন অনুভব করতেই জেবা আর কথা বাড়ানোর সাহস পেল না। চুপচাপ ওনার পাশাপাশি হাঁটতে লাগল।
সয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরিশান মৃধাকে এভাবে হঠাৎ কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়া হাসপাতালে ঢুকতে দেখে চারপাশের পরিবেশ মুহূর্তে বদলে গেল। হাসপাতালের সিকিউরিটি গার্ড থেকে শুরু করে রিসেপশনের স্টাফ, ডাক্তার এবং সাধারণ রোগী-সবাই হন্তদন্ত হয়ে ওনার দিকে হা করে তাকিয়ে রইল। দেশের একজন ক্ষমতাধর মন্ত্রী নিজের চেয়ে অর্ধেক বয়সী একটা সাধারণ মেয়েকে ওভাবে শক্ত করে হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছেন, এই দৃশ্য দেখে ফিসফিসানি শুরু হতে বেশি সময় লাগল না। কিন্তু আরিশান মৃধার সেদিকে কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। ওনার গম্ভীর পদচারণা এবং চারপাশের মানুষকে অবজ্ঞা করার ভঙ্গিটা জেবাকে আরও বেশি গুটিয়ে দিল।আরিশান মৃধার বডিগার্ডরা ততক্ষণে হাসপাতালের ডিরেক্টরকে খবর দিয়ে দিয়েছে।
আরিশান মৃধা কাউকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে জেবাকে নিয়ে সরাসরি লিফটে চড়ে চারতলার একটা বিশেষ ভিআইপি কেবিনের দিকে এগিয়ে গেলেন। কেবিনের দরজায় ওনার নামফলক ও বিশেষ অ্যাপয়েন্টমেন্টের কাগজ আগেই রেডি ছিল। দরজায় নক করতেই ভেতর থেকে একজন মাঝবয়সী নারী গাইনোকোলজিস্ট অত্যন্ত বিনয়ের সাথে দরজা খুলে দিলেন। ওনার নেমপ্লেটে লেখা—ডাক্তার সায়েরা বানু।
ডাক্তার আরিশান মৃধাকে দেখামাত্রই বললেন,

_“আসুন, আসুন স্যার। আপনার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। প্লিজ, বসুন।”
আরিশান মৃধা জেবাকে নিয়ে ভেতরে ঢুকলেন এবং ওকে একটা আরামদায়ক চেয়ারে বসিয়ে নিজে ওর পাশের চেয়ারটায় বসলেন। বসার ভঙ্গিতে এক চিলতে শিথিলতা থাকলেও মুখের গাম্ভীর্য বিন্দুমাত্র কমেনি।
ডাক্তার সায়েরা জেবার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন, তারপর আরিশান মৃধার দিকে ঘুরে বললেন,
_“স্যার, আপনি ফোনে যা বলেছিলেন, আমি সেই অনুযায়ী সব প্রিপারেশন নিয়ে রেখেছি। ম্যাডামের আগের কোনো মেডিকেল হিস্ট্রি বা মেজর কোনো ইলনেস আছে কি?”
আরিশান মৃধা অত্যন্ত সংক্ষেপে ভারী গলায় বললেন,
_“না, ও শারীরিকভাবে সুস্থ। কোনো মেজর কমপ্লিকেশন নেই। তবে আমি চাই আজ পুরো বডি প্রোফাইল আর রিপ্রোডাক্টিভ হেলথটা আপনি নিজে ভালোভাবে চেকআপ করুন। কোনো ধরনের ঘাটতি বা সমস্যা আছে কিনা, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জানা দরকার।”

জেবা ওনাদের এই কথোপকথনের আগামাথা কিছুই বুঝতে পারল না।শুধু হা করে ওনাদের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। ওনারা কী নিয়ে কথা বলছেন, কেন ওকে এখানে আনা হয়েছে—সবকিছুই ওর মাথার ওপর দিয়ে চলে যাচ্ছে।কিছুক্ষণ ওভাবে চুপচাপ বসে থাকতে থাকতে জেবা বড্ড বোর ফিল করতে লাগল। ওনারা তখনো জটিল সব ডাক্তারি টার্ম নিয়ে আলোচনা করছেন। জেবা অলস ভঙ্গিতে আশেপাশে তাকাতে তাকাতে ডাক্তারের টেবিলের ওপর নজর আটকালো। সেখানে একটা সুন্দর সাদা নোটপ্যাড আর একটা দামি কলম রাখা ছিল। আরিশান মৃধা যখন ডাক্তারের সাথে গভীর আলোচনায় মত্ত, জেবা তখন চোরের মতো হাত বাড়িয়ে অত্যন্ত সাবধানে সেই নোটপ্যাড আর কলমটা নিজের দিকে টেনে নিল।
জেবা নোটপ্যাডের পাতায় পরম মনোযোগ দিয়ে কলমের সাহায্যে একটা গোলগাল দেখতে ঘোড়া আঁকতে শুরু করল। ঘোড়াটার পাগুলো একটু বেশি লম্বা আর কান দুটো খরগোশের মতো হয়ে গেল। জেবা নিজের এই অদ্ভুত শিল্পকর্ম দেখে নিজেই মনে মনে হেসে উঠল এবং ওটার লেজটা সুন্দর করার জন্য আরও একটু ঝুঁকে গেল।
ঠিক তখনই একটা শক্ত, উষ্ণ হাত এসে জেবার হাতের কলম আর নোটপ্যাডটা আলতো করে চেপে ধরল। জেবা চমকে উঠে ওপরের দিকে তাকাতেই আরিশান মৃধার সেই তীক্ষ্ণ, শান্ত চোখের মুখোমুখি হলো। আরিশান মৃধা ওর হাত থেকে নোটপ্যাড আর কলমটা সরিয়ে টেবিলের ওপর রেখে দিলেন। ওনার গলায় কোনো রাগ ছিল না, কিন্তু এক অনড় শাসন স্পষ্ট ছিল। তিনি নিচু স্বরে বললেন,

_“ছোট বাচ্চাদের মতো আচরণ বন্ধ করো, জেবা। এখানে কোনো ড্রয়িং কম্পিটিশন চলছে না।”
জেবা লজ্জায় লাল হয়ে মুখটা নামিয়ে নিল।লোকটার এই ধমকটা মোটেও মোটেও পছন্দ হলো না জেবার, ডাক্তারের সামনে এভাবে ধরা পড়ে যাওয়ায় ওর ভীষণ অস্বস্তি লাগছে।ডাক্তার সায়েরা বানু জেবার এই কাণ্ড দেখে হেসে ফেললেন। তিনি আরিশান মৃধার দিকে তাকিয়ে বললেন,
_“স্যার, ম্যাডাম তো এখনো বেশ তরুণী। চাইল্ডিশ নেচার থাকাটাই স্বাভাবিক। যাই হোক, আমি ওনাকে টেস্টগুলোর জন্য ল্যাবে পাঠিয়ে দিচ্ছি। নার্স এসে ওনাকে নিয়ে যাবে।”
কিছুক্ষণের মধ্যেই একজন সিনিয়র নার্স কেবিনে ঢুকলেন। ডাক্তার জেবাকে ওনার সাথে যেতে বললেন। জেবা আরিশান মৃধার দিকে তাকাল, যেন ওনার কাছ থেকে অভয় চাইছে। আরিশান মৃধা কেবল আলতো করে মাথা নাড়িয়ে ওকে যাওয়ার অনুমতি দিলেন।জেবা নার্সের পেছন পেছন ল্যাবরেটরির দিকে চলে গেল। সেখানে ওর রক্ত নেওয়া হলো, আল্ট্রাসনোগ্রাফি করা হলো এবং আরও কিছু জটিল পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হলো। জেবা পুরোটা সময় একটা রোবটের মতো নার্সের কথামতো এদিক-ওদিক গেল, কিন্তু ওর মনে মনে এক বিশাল কৌতুহল দানা বাঁধতে লাগল—ওনারা কি ওর কোনো বড় অসুখ আবিষ্কার করেছেন? জেবার মাথায় নানারকম বৈজ্ঞানিক থিওরি ঘুরপাক খেতে লাগল।

সবগুলো টেস্ট শেষ হতে প্রায় দেড় ঘণ্টার মতো সময় লেগে গেল। পরীক্ষা শেষে নার্স জেবাকে আবার ডক্টর সায়েরার কেবিনে নিয়ে এলেন। জেবা ভেতরে ঢুকে দেখল, আরিশান মৃধা ঠিক আগের মতোই একই ভঙ্গিতে বসে আছেন, যেন তিনি এই দেড় ঘণ্টা ধরে এক চুলও নড়েননি। ওনার ধৈর্য দেখে জেবা মনে মনে আবার অবাক হলো।জেবা ওনার পাশের চেয়ারটায় গিয়ে বসতেই আরিশান মৃধা ওর দিকে একবার চাইলেন, কিন্তু কোনো কথা বললেন না। এর ঠিক পাঁচ মিনিটের মাথায় ল্যাবের একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট এক তোরা রিপোর্ট নিয়ে কেবিনে ঢুকলেন এবং ডাক্তারের হাতে দিলেন।
ডাক্তার সায়েরা চশমাটা নাকের ওপর ঠিকঠাক করে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে প্রতিটা রিপোর্টের পাতা উল্টে দেখতে লাগলেন। কেবিনের ভেতর তখন এক পিনপতন নীরবতা। জেবার হার্টবিট যেন ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছে। সে নিজের ওড়নাটা শক্ত করে মুঠো করে ধরে আল্লাহর নাম জপতে লাগল।

সবগুলো রিপোর্ট দেখা শেষ করে ডক্টর সায়েরা ওনার মুখ থেকে চশমাটা নামালেন। ওনার মুখে এক চিলতে স্বস্তির হাসি ফুটে উঠল। তিনি আরিশান মৃধার দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত ইতিবাচক গলায় বললেন,
_“কঙ্গ্রাচুলেশনস স্যার! রিপোর্টের সব প্যারামিটার একদম পারফেক্ট আছে। ম্যাডামের ইন্টারনাল কোনো কমপ্লিকেশন নেই, ওনার জরায়ু এবং ডিম্বাশয় পুরোপুরি সুস্থ। বেবি কনসিভ করার ক্ষেত্রে ওনার কোনো ধরনের সমস্যা হবে না। ওনার শরীর এখন একটা সুস্থ বাচ্চার জন্ম দেওয়ার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত।”
ডাক্তার ওনার কথা শেষ করে প্রেসক্রিপশন প্যাডটা টেনে নিয়ে কিছু ভিটামিন ও ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্ট লিখতে লাগলেন, যাতে কনসিভের প্রসেসটা আরও স্মুথ হয়।এদিকে ডক্টরের এই কথাগুলো শোনা মাত্রই জেবার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল! ওর কানে ‘বেবি কনসিভ’ শব্দটা বাজ পড়ার মতো শোনাল।চোখ দুটো চড়কগাছ হয়ে গেল, মুখের চোয়াল প্রায় ঝুলে পড়ার উপক্রম। সে নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। আরিশান মৃধা ওকে এখানে কোনো অসুখের চিকিৎসার জন্য আনেননি, ওকে এনেছেন বাচ্চার জন্ম দেওয়ার পরীক্ষা করাতে!
জেবা নিজের সমস্ত লজ্জা আর জড়তা ভুলে গিয়ে কেবিনের থমথমে নীরবতা চূর্ণ করে আরিশান মৃধার দিকে সরাসরি ঘুরে চিৎকার করার মতো গলায় বলে উঠল,

_“বেবি? কার বেবি? এখানে বাচ্চার কথা কোথা থেকে আসছে? আপনি কি পাগল হয়েছেন?সারিম ভাইয়া আছে তো,আর বেবি লাগবে না।”
জেবার এমন আকস্মিক প্রশ্নে ডক্টর সায়েরা কিছুটা থমকে গেলেন, ওনার হাতের কলমটা এক সেকেন্ডের জন্য থেমে গেল। কিন্তু আরিশান মৃধা বিন্দুমাত্র বিচলিত হলেন না। ওনার মুখের অবয়ব আগের মতোই পাথরের মতো শক্ত রইল। তিনি জেবার এই পাগলামিকে পুরোপুরি ইগনোর করে ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত শান্ত গলায় বললেন,
_“ওকে ডক্টর, ওষুধগুলো কীভাবে খেতে হবে তা আপনি প্রেসক্রিপশনে ডিটেইলস লিখে দিন। আর ওকে কি বিশেষ কোনো ডায়েট মেইনটেইন করতে হবে?”
ডাক্তার সায়েরা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য বললেন,
_“হ্যাঁ স্যার, আমি ডায়েট চার্টটা এর সাথে দিয়ে দিচ্ছি। গ্রিন ভেজিটেবলস আর প্রোটিনটা একটু বেশি রাখতে হবে।”

জেবা ওখানেই রাগে আর ক্ষোভে ফুঁসতে লাগল। লোকটা ওকে পাত্তাই দিচ্ছে না! সে ওনার দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল, কিন্তু আরিশান মৃধার সেই গম্ভীর ও হিমশীতল ব্যক্তিত্বের সামনে আর দ্বিতীয়বার মুখ খোলার সাহস পেল না। ওনার চারপাশের সেই অদৃশ্য দেয়ালটা জেবাকে চুপ করিয়ে দিল।
আরিশান মৃধা আরও কিছুক্ষণ ডাক্তারের সঙ্গে কিছু গোপনীয় মেডিকেল টার্ম নিয়ে কথা বললেন, তারপর প্রেসক্রিপশনটা নিজের নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। জেবার দিকে তাকিয়ে ওনার সেই চেনা গম্ভীর স্বরে বললেন,
_“চলো।”
জেবা কোনো কথা না বলে ধুপধাপ পা ফেলে ওনার পেছন পেছন কেবিন থেকে বেরিয়ে এলো।তার মনের ভেতর তখন রাগের এক বিশাল লাভা অগ্ন্যুৎপাতের জন্য তৈরি হচ্ছে। হসপিটালের করিডোর দিয়ে যাওয়ার সময়ও দুজনে ওভাবেই চললো—আরিশান মৃধা একদম শান্ত ও সোজা হয়ে হাঁটছেন, আর জেবা মুখ ফুলিয়ে ওনার পাশে পাশে প্রায় দৌড়াচ্ছে।
গাড়িতে এসে বসার পরও জেবার ভেতরের সেই লাভা শান্ত হলো না। ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দিয়ে মেইন রোডে নামতেই জেবা আর নিজের ভেতরের ক্ষোভ চেপে রাখতে পারল না। সে আরিশান মৃধার দিকে পুরোপুরি ঘুরে বসে অত্যন্ত চড়া ও জিদ্দি গলায় জিজ্ঞাসা করল,

_“হানি, আপনি কি আমার কথার উত্তর দেবেন? ডাক্তার আন্টি যে বলল বেবি কনসিভ করার কথা, কার বাচ্চার কথা হচ্ছিল ওখানে? আপনি আমাকে না জানিয়ে হসপিটালে নিয়ে এই সব পরীক্ষা কেন করালেন?”
আরিশান মৃধা নিজের ফোন থেকে চোখ না তুলেই অত্যন্ত ধীর ও ভারী গলায় উত্তর দিলেন,
_“আমাদের বাচ্চার কথা হচ্ছিল।”
ওনার এই অতি সাধারণ এবং সোজাসাপ্টা উত্তর শুনে জেবার মেজাজ আরও এক ডিগ্রি চড়ে গেল। সে প্রায় খেঁকে উঠে বলল,
_“আমাদের বাচ্চা? মানে আপনি আর আমি? অসম্ভব! আমাদের কোনো বাচ্চার দরকার নেই। অলরেডি সারিম ভাইয়া আছে তো! সারিম ভাইয়া থাকতে আর নতুন করে বেবি দিয়ে কী কাজ আমাদের? আমার জীবনের কোনো প্ল্যানেই কোনো বাচ্চার জায়গা নেই, আমি কোনো বাচ্চার মা হতে পারব না!”
জেবার মুখে সারিমের নাম এবং বাচ্চা না নেওয়ার অনড় জেদ শুনে আরিশান মৃধা এবার ওনার ফোনটা লক করে পাশে রাখলেন। তিনি ধীর হয়ে জেবার দিকে একটু ঝুঁকে এলেন। ওনার সেই গভীর, কুচকুচে কালো চোখ দুটোর মাঝে এক তীব্র একগুঁয়েমি স্পষ্ট হয়ে উঠল। মুখাবয়ব আগের চেয়েও দ্বিগুণ গম্ভীর হয়ে গেল। তিনি জেবার চোখের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে অত্যন্ত নিচু হুশিয়ারি মেশানো কণ্ঠে বললেন,

_”সারিম আমার সন্তান, জেবা। ও আমার অতীত এবং বর্তমান। কিন্তু তোমার সাথে তার কোনো রক্তের সম্পর্ক নেই। আর এখন এই সংসারে, আমার জীবনে যে আসবে—সে হবে আমাদের দুজনের অস্তিত্বের অংশ। তোমার আর আমার সন্তান। সো, সারিম থাকা না থাকায় আমাদের বাচ্চার কোনো রিলেশন নেই।”
জেবা ওনার এই গভীর তত্ত্ব বুঝতে চাইল না। সে নিজের হাত দুটো বুকের ওপর আড়াআড়িভাবে বেঁধে, মুখটা চরম অবাধ্যের মতো ফুলিয়ে বলল,
_“আমি ওসব কিছু জানি না! আমি কোনো বেবি-টেবি নিতে পারব না। আমি নিব না মানে নিব না, এটা ফাইনাল!”

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ২৫

আরিশান মৃধা নিজের চোখ দুটো সামান্য সরু করে নিলেন। ওনার ঠোঁটের কোণে এক ভয়ংকর অথচ অদ্ভুত সুন্দর বাঁকা হাসির রেখা ফুটে উঠল। ওনি জেবার মুখের খুব কাছাকাছি নিজের মুখটা এনে অত্যন্ত ধীর,গম্ভীর ও চড়া স্বরে ওনার সেই চেনা হুমকিটা দিয়ে বললেন,
_“আমি বলছি তুমি নিবে! আর যদি বেশি অবাধ্যতা করো, তবে চাপার দাঁত একটাও আস্ত রাখব না বলে দিলাম। মুখ ভেঙে হাত দিয়ে দেব, যদি আমার কথার ওপর আর একটাও কথা বলো!”

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ২৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here