ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৩৭
মেহজাবিন নাদিয়া
সোলেমান শেখের কান দিয়ে যেন তখনো গরম সিসা গলিয়ে ঢোকাচ্ছিল আনতারা মৃধার প্রতিটি শব্দ। নিজের এত বছরের চেনা মানুষগুলোর ভেতরের এই বীভৎস, পৈশাচিক রূপ তিনি কোনোদিন কল্পনাও করতে পারেননি। যে স্ত্রীকে তিনি হৃদয়ের মণিকোঠায় আগলে রেখেছিলেন, সে-ই কিনা টাকার লোভে নিজের সদ্যজাত সন্তানের কিডনি বিক্রি করে দিয়েছিল! বুক চিড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস আর তীব্র হাহাকার বেরিয়ে এলো তাঁর। চোখ ফেটে জল নামলেও, তাঁর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।তিনি আনতারার দিকে তীব্র ঘৃণায় থুতু ছিটিয়ে দিয়ে গর্জে উঠলেন,
_”পিশাচনী! তোরা মানুষ নোস, জানোয়ারের চেয়েও অধম! সাতশত কোটি তো দূর, তোদের মতো খুনিদের হাতে আমি যদি মরেও যাই, তাও ওই লকেটের ঠিকানা কোনোদিন বলব না!”
সোলেমান শেখের মুখের থুতু ছিটকে এসে পড়ল আনতারা মৃধার গালে। রাগে আনতারার চোখ দুটো লাল হয়ে উঠল। একহাতের জামির হাতা দিয়ে গালের থুতুটা সজোরে মুছে নিয়ে তিনি দাঁতে দাঁত চেপে দাঁড়ালেন। সোলেমান শেখের দিকে এমন এক খুনে দৃষ্টিতে তাকালেন যেন এই চোখ দিয়ে ওনি এখনই তাকে শেষ করে দেবেন।সোলেমান শেখকে চরম কিছু একটা করতে যাওয়ার আগেই পাশ থেকে অনুপমা হাত বাড়িয়ে ওনাকে বাধা দিল।ঠান্ডা স্বরে বলল,
_”আন্টি, তুমি সরো তো। এই বুড়োর মুখ কীভাবে সহজে খোলাতে হয়, তা আমার খুব ভালো করেই জানা আছে।”
আনতারা মৃধা সরে দাড়ালেন।অনুপমা ধীর পায়ে সোলেমান শেখের দিকে এগিয়ে গেল।ওনার সামনে এসে দাঁড়াতেই সোলেমান শেখ নিজের ভেতরের সবটুকু ঘৃণা আর ক্ষোভ নিয়ে মেয়েটার দিকে অগ্নিচোখে তাকালেন।মনটা কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিল না যে এই মেয়েটা জাহরিমার নিজের পেটের সন্তান! সম্পর্কে ওনার সৎ মেয়ে। সোলেমান শেখের মনে এক অদ্ভুত আশঙ্কার ঝড় বয়ে গেল। ওনার জেবা যদি কখনো জানতে পারে যে তার মা কতটা নিকৃষ্ট ছিল, তখন মেয়েটা কীভাবে নিজেকে সামলাবে? সেই ভাবনায় ওনার বুকটা কেঁপে উঠল।
ঠিক তখনই মাথার তালুতে তীব্র এক টান অনুভব করলেন তিনি। ভাবনার সুতো ছিঁড়ে গেল। অনুপমা অত্যন্ত হিংস্রভাবে ওনার চুলের মুঠি শক্ত হাতে চেপে ধরে নিজের দিকে টেনে এনেছে। ব্যথায় সোলেমান শেখের মুখটা কুঁচকে গেল, কিন্তু হাত-পা শক্ত দড়িতে বাঁধা থাকায় তিনি সম্পূর্ণ অসহায়।
অনুপমা আরও দু-কদম এগিয়ে এসে মুখটা সোলেমান শেখের কানের কাছে নিয়ে গেল। ফিসফিস করে অথচ বিষাক্ত স্বরে বলল,
_”দেখ বুড়ো, এই বয়সে এসে একদম হিরো সাজার চেষ্টা করবি না। ওই লকেটটা কোথায় লুকিয়ে রেখেছিস, জলদি আমাদের বল। নয়তো…”
অনুপমা আচমকা এক পৈশাচিক হাসি হেসে উঠল। সেই হাসির কুৎসিত শব্দে অন্ধকার গুদামের দেয়ালগুলো যেন কেঁপে উঠল। সোলেমান শেখের আত্মাটা শুকিয়ে গেল। স্পষ্ট বুঝতে পারলেন, সামনে বড় কোনো বিপদ অপেক্ষা করছে।
_”নয়তো তোর আদরের মেয়ে জেবার ক্ষতি করতে আমার এক সেকেন্ডও সময় লাগবে না!” অনুপমার কণ্ঠে ঝরে পড়ল চরম নিষ্ঠুরতা।
_”নিজের আর নিজের মেয়ের ভালো যদি চাস, তবে লকেটটা কোথায় আছে সোজা বলে দে।”
জেবার নাম শুনতেই সোলেমান শেখের মনের সমস্ত জোর তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। বাবার মন তো! নিজের জীবনের চেয়েও জেবাকে তিনি বেশি ভালোবাসেন। মেয়ের কোনো ক্ষতি তিনি কিছুতেই সহ্য করতে পারবেন না। অত্যন্ত কাতর গলায় তিনি বললেন,
_”লকেটটা যদি আমি তোমাদের দিয়ে দিই, তাহলে কী গ্যারান্টি আছে যে তোমরা আমার আর আমার মেয়ের কোনো ক্ষতি করবে না?”
পাশ থেকে দেলোয়ার এতক্ষণ কুটিল হাসিমুখে সব দেখছিল। এবার সে উপহাসের সুরে বলে উঠল,
_”গ্যারান্টি!অবশ্যই আছে। লকেট পেলেও তোমাকে বাঁচিয়ে রাখার কোনো প্রশ্নই উঠবেনা। কারণ তুমি আমাদের ব্যাপারে সবকিছু জেনে গেছ। তুমি বাইরে গিয়ে এগুলো পুলিশকে বলবে না, তার কী গ্যারান্টি? তবে হ্যাঁ, তোমার মেয়ের কোনো ক্ষতি আমরা করব না-এইটুকু কথা দিতে পারি।”
দেলোয়ারের কথা শুনে সোলেমান শেখ চুপ হয়ে গেলেন। তিনি স্পষ্ট বুঝতে পারলেন, এদের লকেটের ঠিকানা বললেও তার মৃত্যু নিশ্চিত, আর না বললেও মৃত্যু নিশ্চিত। তাহলে কেন মরার আগে এমন এক পাপের রাজ্যকে আবার সচল করার চাবি এদের হাতে তুলে দেবেন? তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, প্রাণ গেলেও লকেটের কথা বলবেন না।কিন্তু পরক্ষনেই জেবার নিষ্পাপ মুখটা মনে পড়তেই ওনার চোখের কোণ বেয়ে দু-ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। তিনি শেষবারের মতো একটা চেষ্টা করার জন্য অত্যন্ত অসহায় ও করুণ চোখে অনুপমার দিকে তাকালেন। ভাঙা গলায় বললেন,
_”অনুপমা… তুমি নিজের বোনের সাথে এমনটা কী করে করতে পারো? জেবা তো তোমার নিজের মায়ের পেটের বোন! আমি নাহয় তোমার সৎ বাবা, তোমার কেউ নই। কিন্তু ও তো তোমার ছোট বোন! বড় বোনদের দায়িত্ব তো ছোট বোনদের আগলে রাখা, আর তুমি কিনা নিজের সেই ছোট বোনকেই শেষ করে দিতে চাইছ? এখনো সময় আছে অনুপমা, এই নোংরা পথ ছেড়ে ভালো পথে ফিরে আসো।”
সোলেমান শেখের এই আবেগভরা কথাগুলো অনুপমার কানে স্রেফ সস্তা মেলোড্রামা আর ফালতু ইমোশন ছাড়া আর কিছুই মনে হলো না। ওনার ওপর অনুপমার রাগ যেন আরও দ্বিগুণ হয়ে উঠল।অতীতে ওর সঙ্গে ঘটা সকল অবহেলাগুলো চোখের সামনে ভাসতে চাইলো।
_”ঐ মেয়েটা আমার বোন নয়! ও আমার শত্রু! ওর জন্যই আমি আমার মায়ের কাছ থেকে নিজের শৈশব হারিয়েছি। মা আমাকে কোনোদিন খোঁজার চেষ্টা পর্যন্ত করেনি শুধুমাত্র ওই মেয়েটার জন্য! নিজে ঠিকই সুখী সংসার গড়ে স্বামী নিয়ে দিন কাটিয়েছে,আর আমাকে আর বাবাকে নরকে ফেলে রেখে গেছে ওই মহিলা! ওই মহিলার ওপর আমার যে ক্ষোভ, তার শোধ আমি ওর মেয়ের ওপর নিয়ে মেটাব। আমি ওকে কোনোভাবেই ছাড়ব না!”
সোলেমান শেখ হাল ছাড়লেন না। তিনি অনুনয় করে বললেন,
_”অনুপমা, তুমি এই পিশাচদের কথা শুনে ভুল পথে যাচ্ছ। আমি মানছি তোমার সাথে ছোটবেলা থেকে অনেক অন্যায় হয়েছে, কিন্তু তার জন্য তো ওই নিষ্পাপ মেয়েটা দায়ী নয়। ও তো নিজেই জানে না যে ওর মায়ের কর্মকাণ্ডের কারণে জন্ম থেকেই একটা কিডনি হারিয়ে বসে আছে। তুমি এসব হিংসা ছেড়ে ভালো পথে আসো মা… আমি কথা দিচ্ছি, আমি তোমাকে কখনো আমার জেবার চেয়ে কম ভালোবাসব না।”
সোলেমান শেখের মুখে নরম কথাগুলো শুনে অনুপমার চোখের চাউনি এক মুহূর্তের জন্য যেন একটু থমকে গেল। তার ভেতরের একাকী ও আদরবঞ্চিত মেয়েটা যেন কোথাও একটা মৃদু ধাক্কা খেল।অনুপমার এই ক্ষণিকের দ্বিধা পাশ থেকে তীক্ষ্ণ চোখে লক্ষ্য করলেন আনতারা মৃধা। তিনি কিছুটা বিচলিত হয়ে পড়লেন। সোলেমান শেখ যেভাবে আবেগ দিয়ে মেয়েটাকে নিজের দিকে টানার চেষ্টা করছেন, তাতে অনুপমা যদি সত্যি সত্যি গলে যায়? অনুপমা তো আদতে ভালোবাসার কাঙাল, যদি ও মত বদলে ফেলে তবে সব পরিকল্পনা ভেস্তে যাবে!
আনতারা মৃধা আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে দ্রুত দেলোয়ারের দিকে তাকালেন এবং চোখের ইশারায় তাকে কিছু একটা করার তাগিদ দিলেন।
দেলোয়ারও পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তড়িঘড়ি করে মেয়ের কাছে এগিয়ে এল। অত্যন্ত নাটকীয় ভাবে দরদি সুরে অনুপমার কাঁধে হাত রেখে বলল,
_”মা অনুপমা! এই শয়তান লোকটার ফালতু কথা শুনে একদম নিজের সময় নষ্ট করিস না। এ নিজেকে বাঁচানোর জন্য আর তোকে দুর্বল করার জন্য এখন সাধু সাজার ভান করছে! দেখছিস না, নিজের আসল রূপ লুকিয়ে ও কীভাবে তোর নিজের বাবার বিরুদ্ধেই তোকে উসকে দিচ্ছে?”
বাবার উসকানিমূলক কথাগুলো তীরের মতো গিয়ে বিঁধল অনুপমার কানে। মুহূর্তের মধ্যে তার চোখের সেই নরম ভাবটা কর্পূরের মতো উড়ে গেল। বুকের ভেতরের পুরোনো রাগ ও জেদ আবার ফুঁসে উঠল। সে আবার তার সেই আগের হিংস্র ও পাথুরে চেহারায় ফিরে এল।অনুপমার চোখের পলকে বদলে যাওয়া রূপ দেখে দেলোয়ার ও আনতারা মৃধা মনে মনে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। সোলেমান শেখের আবেগি কথার জাল মুহূর্তেই ছিঁড়ে গেল। অনুপমা ওনার চুলে আরও শক্ত একটা টান দিয়ে মাথাটা ঝাঁকিয়ে বলল,
_”আমার বাবার বিরুদ্ধে আমাকে কথা শোনাস বুড়ো? আমার বাবা ভালো হোক কিংবা মন্দ, সে-ই একমাত্র ব্যক্তি যে এই বিশাল পৃথিবীতে আমাকে নিজের আগলে রেখেছে! আর তুই আমায় ভালোবাসার লোভ দেখাচ্ছিস? যে মায়ের রক্তের কণিকা আমার শরীরে বইছে, সেই জন্মদাত্রী যখন আমায় ফেলে দিতে পেরেছে, তখন তোর মতো পরপুরুষের ভালোবাসার ওপর আমার কুত্তা দিয়ে প্রস্রাব করানোরও ইচ্ছে নেই!”
সোলেমান শেখ যন্ত্রণায় ও অপমানে চোখ বন্ধ করে ফেললেন।কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে ওনার। অনুপমা ওনার মুখটা সজোরে একপাশে ঝটকা মেরে ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়াল।হাতে একটা ধারালো নাইফ নিল।সেটার ধারালো ফলাটা সোলেমান শেখের চোখের খুব কাছে এনে নাচাতে নাচাতে বলল,
_”সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে আঙুল বাঁকা করতে হয়, তা তো জানিসই। লকেটের ঠিকানা তুই দিবি কি দিবি না,
সোলেমান শেখ দাঁতে দাঁত চেপে নিজের সবটুকু শক্তি সঞ্চয় করে বললেন,
_”বলব না! আমি বেঁচে থাকতে ওই লকেট কোথায় আছে, তা তোদের মতো জানোয়ারেরা কোনোদিন জানতে পারবে না।”
অনুপমার ভেতরের রাগটা এবার সীমা ছাড়িয়ে গেল। ওনার এই অবাধ্যতা সে আর সহ্য করতে পারল না। হাতের নাইফটা উঁচিয়ে সে কোনো কিছু না ভেবেই সোলেমান শেখের ডান হাতের কবজির ভেতর সজোরে ঢুকিয়ে দিল!
তীব্র যন্ত্রণায় সোলেমান শেখের বুক চিরে একটা আর্তনাদ বেরিয়ে এল। তিনি চোখ-মুখ খিঁচিয়ে গোঙাতে লাগলেন। ক্ষতস্থান থেকে গলগল করে তাজা রক্ত বেরিয়ে ওনার হাত বেয়ে মেঝেতে পড়তে লাগল।সারা শরীর কাঁপছে, কিন্তু অনুপমার মায়াহীন চোখে তখনো কোনো অনুশোচনা নেই। সে নাইফটা টেনে বের করে আবার ওনার চোখের সামনে ধরল। অত্যন্ত নিষ্ঠুর গলায় জিজ্ঞাসা করল,
_”এখনো সময় আছে বল, ওই লকেট কোথায়? নয়তো তোর আগে তোর আদরের মেয়ে জেবার লাশ দেখবি তুই!”
সোলেমান শেখ যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতেই মাথা নাড়লেন। ওনার চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছিল, তবুও চোয়াল শক্ত করে বললেন,
_”বলব না… কিছুতেই আমি সেই লকেটের ব্যাপারে তোদের কিচ্ছু বলব না! পারলে আমায় মেরেই ফেল তোরা। তবুও তোদের মতো পিশাচ, মুখোশধারী বহুরূপীদের আমি কিচ্ছু বলব না। আমার জেবাকে আরিশান থাকতে তোরা ছুঁতেও পারবি না! আরিশান ওর কোনো ক্ষতি হতে দেবে না।”
সোলেমান শেখের মুখে এই অনড় ভাব দেখে অনুপমা রাগে ফেটে গেল।এভাবে বলার পরেও লোকটা লকেটের ব্যাপারে বলতেছেনা।দ্বিতীয়বার না ভেবে অনুপমা আবার সোলেমান শেখের বাম হাতের কবজিতে নাইফটা সজোরে পুনরায় গেঁথে দিল। ওনার যন্ত্রণাকাতর গোঙানি গুদামের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।পাশ থেকে আনতারা মৃধা এতক্ষণ চুপ করে ছিলেন, কিন্তু আরিশান মৃধার নাম শুনতেই ওনার ভেতরের পুরনো জ্বালা আর হিংসা চাড়া দিয়ে উঠল। তিনি এগিয়ে এসে অত্যন্ত তুচ্ছতাচ্ছিল্যের সুরে বললেন,
_”আরিশান বাঁচাবে তোর মেয়েকে? হাহ্! আমার স্বামী তোর মেয়েকে পারলে এখনই ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। খালি তোর ওই নির্লজ্জ মেয়েটা পড়ে আছে ওখানে, তাই ভদ্রতার খাতিরে কিছু বলতে পারছে না। যতই হোক, ছোটলোকদের আশ্রয় দিতে আরিশান খুব ভালোবাসে।”
এত বড় শারীরিক যন্ত্রণা আর রক্তপাতের মধ্যেও আনতারা মৃধার কথাটা যেন সোলেমান শেখের ওপর প্রভাব ফেলতে পারল না। বরং তিনি ব্যথাতুর চোখে আনতারার দিকে তাকিয়ে এক টুকরো তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেন। টেনে টেনে বললেন,
_”আরিশান আমার মেয়েকে ভালোবাসে বলেই আগলে রাখে। আর ছোটলোক তো তুই! যে কিনা স্বামী থাকতে অন্য পুরুষের সঙ্গে ভেগে যাস। টাকার জন্য নিজের মানুষের অঙ্গ বিক্রি করিস! তোদের মতো নিচ আর নোংরা মহিলাদের জায়গা তো পতিতালয়ে হওয়া উচিত ছিল! আরিশান শুধু ওর বাচ্চার মা বলেই তোকে ওই বাড়িতে দয়া করে আশ্রয় দিয়েছে। নয়তো তোর মতো পিশাচনীকে আমার বন্ধু আরিশান তো দূর, কোনো ভদ্র মানুষ ফিরেও তাকাতো না!”
কথাগুলো তপ্ত শলাকার মতো গিয়ে বিধল আনতারা মৃধার ভিতরে।রাগে তার মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিল। চোখের মণি দুটো হিংস্র পশুর মতো বড় বড় হয়ে গেল।
আচমকা কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই আনতারা মৃধা সোলেমান শেখের দিকে তেড়ে গেলেন। অনুপমা ও দেলোয়ার কিছু বলার সুযোগ পাওয়ার আগেই তিনি সোলেমান শেখের বাম হাতের গেঁথে থাকা কবজি থেকে নাইফটা এক ঝটকায় টেনে তুললেন। তারপর কোনো হিতাহিত জ্ঞান না রেখে সরাসরি সেটা সোলেমান শেখের গলার কণ্ঠনালিতে গেঁথে দিলেন!
ওনার এই আকস্মিক কাণ্ডে দেলোয়ার আর অনুপমা দুজনেই চরম স্তব্ধ ও বিষ্মিত হয়ে গেল! তারা বড় বড় চোখ করে আনতারার দিকে তাকিয়ে রইল।এত সহজে সোলেমান শেখকে মারতে চায়নি তারা! ওনাকে বাঁচিয়ে রেখে লকেটের ঠিকানা বের করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য।কিন্তু আনতারা মৃধা সেসবের উল্টোটা করে বসে আছে।
সোলেমান শেখ গলার তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করতে লাগলেন।মুখ দিয়ে রক্তের ফেনা বের হতে লাগল, চোখ দুটো প্রায় উল্টে বুজে আসার জোগাড় হলো। কিন্তু এতেও যেন শান্তি হলো না আনতারা মৃধা। তিনি হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ওনার পেটে আর বুকে ইচ্ছেমতো ছুরির আঘাত করতে থাকলেন। যেন ভেতরের সবটুকু জমে থাকা আক্রোশ ওনার শরীরের ওপর ঝাড়ছেন।অবস্থা বেগতিক দেখে দেলোয়ার দ্রুত ছুটে এল। সে আনতারা মৃধাকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল এবং ওনার হাত থেকে রক্তমাখা ছোট নাইফটা কেড়ে নিল। অত্যন্ত রাগী গলায় কম্পিত স্বরে দেলোয়ার বলল,
_”পাগল হয়ে গেছ তুমি আনতারা?ওর মাধ্যমে আমরা সেই লকেটের কাছে পৌঁছাতে পারতাম, আর তুমি রাগের মাথায় একেই শেষ করে দিচ্ছো? নিজের বুদ্ধিটা কি একদম লোপ পেয়েছে তোমার?”
দেলোয়ারের তীব্র চিৎকারে এতক্ষণে যেন আনতারা মৃধার হুঁশ ফিরে এল। তিনি নিজের রক্তাক্ত হাত দুটোর দিকে তাকালেন, তারপর সোলেমান শেখের নিথর হয়ে আসা শরীরের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলেন যে রাগের বশবর্তী হয়ে তিনি কত বড় ভুল করে বসেছেন। ওনার শরীর ভয়ে কাঁপতে লাগল।
দেলোয়ার আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট না করে দ্রুত অনুপমার দিকে তাকিয়ে বলল,
_”অনুপমা, দাঁড়িয়ে আছিস কেন? তাড়াতাড়ি গিয়ে গাড়ি বের কর! একে আমাদের ল্যাবে নিয়ে যেতে হবে। এ যদি পুরোপুরি মারা যায়, তবে লকেট পর্যন্ত পৌঁছানো আমাদের জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। জলদি কর!”
অনুপমাও পরিস্থিতি বুঝতে পেরে আর কোনো কথা না বাড়িয়ে দ্রুত গুদামের বাইরে ছুটে গেল গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার জন্য।আনতারা মৃধা অত্যন্ত অপরাধী ভাবে ভীত গলায় দেলোয়ারের দিকে তাকিয়ে বললো,
_”আই অ্যাম সরি দেলোয়ার… আমি আসলে রাগের মাথায়…”
দেলোয়ার এখন ওনার কোনো ‘সরি’ বা অজুহাত শোনার মুডে নেই। সোলেমান শেখের শরীর থেকে যেভাবে রক্ত ঝরছে, তাতে ওনাকে বাঁচানো অলৌকিক কিছু ছাড়া সম্ভব নয়। দেলোয়ার অস্থির হয়ে সোলেমান শেখের বাঁধনগুলো কাটতে লাগল। আনতারা মৃধাও নিজের ভুল বুঝতে পেরে চুপচাপ দেলোয়ারকে সাহায্য করতে লাগলেন। দুজনে মিলে কোনোমতে সোলেমান শেখের রক্তাক্ত ও ভারী শরীরটাকে চ্যাংদোলা করে গুদামের বাইরে নিয়ে এলেন।
ততক্ষণে অনুপমা গাড়ি ব্যাক করিয়ে গুদামের দরজার সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। দেলোয়ার যখন সোলেমান শেখকে গাড়ির পেছনের সিটে বসাতে যাচ্ছিল, তখনই অনুপমা গাড়ি থেকে নেমে এসে বাধা দিল। সে বেশ চিন্তিত ও সতর্ক গলায় বলল,
_”বাবা, থামো! একে পেছনের সিটে বসিও না। সামনেই বড় মোড়, ওখানে সবসময় ট্রাফিক পুলিশ থাকে। এই রক্তাক্ত অবস্থায় ওনাকে সিটে বসিয়ে নিয়ে গেলে যে কেউ দেখে ফেলবে, আর পুলিশ আমাদের ওখানেই আটকে দেবে।”
দেলোয়ার কপালে হাত দিয়ে চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞাসা করল,
_”তাহলে উপায় কী? একে তো এভাবে ফেলে রাখা যাবে না!”
পাশ থেকে আনতারা মৃধা চট করে বুদ্ধি দিয়ে বললেন,
_”একে গাড়ির ডিকিতে শুইয়ে দাও। বাইরে থেকে কিচ্ছু বোঝা যাবে না।”
দেলোয়ার আর এক মিনিটও সময় নষ্ট করার ঝুঁকি নিল না। সে সোলেমান শেখের নিস্তেজ শরীরটাকে টেনে গাড়ির ডিকির ভেতর তুলে দিল। সোলেমান শেখ তখন অত্যন্ত ক্ষীন ও ধীরভাবে শ্বাস নিচ্ছেন। ওনার চোখ দুটো প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে এসেছে, ঠোঁট দুটো কাঁপছে। ওনাকে ডিকিতে তোলার পর দেলোয়ার ধড়াস করে ডিকির ভারী দরজাটা লক করে দিল। অনুপমা ও আনতারা মৃধা দ্রুত গাড়িতে উঠে বসল। দেলোয়ার ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসল এবং ক্ষিপ্র হাতে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে ল্যাবের উদ্দেশ্যে রওনা হলো। গুদামের স্যাঁতসেঁতে মেঝেতে পড়ে রইল শুধু সোলেমান শেখের ঝরে পড়া তাজা রক্তের দাগ।
নদীর পাড়ে অনেক্ষন সময় থাকার পর আরিশান মৃধা জেবাকে ইশারা করে গাড়িতে এসে বসতে বললেন। জেবা মুখটা বাংলা পাঁচের মতো করে এসে ধপ করে গাড়ির সিটে বসল। আরিশান মৃধাও ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি স্টার্ট দিলেন। গাড়ি রাস্তা ধরে ওনাদের বাড়ির উদ্দেশ্যে ছুটে চলেছে।
জেবা জানালার বাইরে মুখ ঘুরিয়ে বসে রইল।ভেতরে ভেতরে ভীষণ বিরক্ত! ওকে যেভাবে মাঝপথ থেকে টেনেহিঁচড়ে কোচিং থেকে নিয়ে আসা হলো, সেটা কোনো সুস্থ মানুষের কাজ হতে পারে না। এই লোকটার ব্যবহার দিন দিন কেমন যেন অদ্ভুত আর খামখেয়ালি ঠেকছে জেবার কাছে। নিজেই সেদিন ক্যারিয়ার নিয়ে এত বড় বড় লেকচার শোনাল, অথচ আজ কোচিং করতে দেবে না! আবার বলছে সংসার করতে! মুখে বলবে ‘ভালোবাসি না’, কিন্তু কাজে এমন সব কাণ্ড করবে যেন ও ছাড়া দুনিয়ায় আর কেউ নেই ওনার। পুরো সাইকো হয়ে গেছে লোকটা! তার ওপর আজ জোর করে ওকে ওই এক বস্তা বোরকা আর নিকাব পরিয়ে দিল।
লোকটার পেশার মতো ওনার মাথার মগজের মধ্যেও যে প্রচুর প্যাঁচ আছে, তা ও এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে জেবা। প্রতিনিয়ত জেবার এখন নিজেকেই নিজে চড় মারতে মন চায়-কোন ভূতের পাল্লায় পড়ে যে সে এইরকম এক বেয়াদপ, গম্ভীর বেডার প্রেমে পড়ল, তা সে নিজেই জানে না! কথা বললেই মুখটা এমন থমথমে আর শক্ত করে রাখবে যেন জীবনেও কোনোদিন মুখে একটু মধু লাগায়নি। একে দেখে যে কোন দিক থেকে জেবা ছোটবেলা থেকে ‘হানি’ বলে ডাকত, তা এখন ও নিজেই ভেবে পায় না। এইরকম এক রসকষহীন, খটখটে বেডার সাথে বেচারির সারাজীবন সংসার করতে হবে ভেবেই নিজের জন্য মনে মনে চরম দুঃখ পেতে লাগল জেবা।
জেবাকে এভাবে ভাবনায় পুরো বিভোর হয়ে মুখ কালো করে বসে থাকতে দেখে আরিশান মৃধা আয়না দিয়ে আড়চোখে তাকালেন। ওনার ঠোঁটের কোণে একটা মুচকি হাসি ফুটে উঠলেও তা জেবার আড়ালেই রইল। গাড়ি চালাতে চালাতেই আরিশান মৃধা হঠাৎ খুব স্বাভাবিক গলায় বলে উঠলেন,
_”ফুচকা খাবে?”
জেবা জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। ওনার কথা শুনে বেচারির মনে হলো ও বোধহয় কানে ভুল শুনেছে। আরিশান মৃধা ওকে ফুচকা খাওয়ার অফার করছেন-এটা নির্ঘাত তার হ্যালুসিনেশন কিংবা দিবাস্বপ্ন! তাই ও কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে ওভাবেই চুপচাপ বসে রইল।
আরিশান মৃধা জেবার কোনো সাড়া না পেয়ে বাম হাত বাড়িয়ে এক হেঁচকা টান দিয়ে জেবাকে ওনার নিজের খুব কাছে নিয়ে আসলেন। আচমকা এই টানে জেবা ওনার গায়ের ওপর এসে পড়ার মতো হলো। ও পুরোপুরি বাকরুদ্ধ হয়ে বড় বড় চোখে ওনার দিকে তাকাল। নিজের কান আর চোখকে বিশ্বাস করতে না পেরে জেবা নিজের হাতটার ওপর সজোরে একটা চিমটি কেটে বসল-উদ্দেশ্য ছিল নিজে স্বপ্নে আছে নাকি বাস্তবে তা পরীক্ষা করা, কিন্তু ভুলবশত চিমটিটা নিজের হাতে না কেটে ও আরিশান মৃধার হাতেই কেটে ফেলেছে!
আরিশান মৃধা চিমটি খেয়ে ভ্রু কুঁচকে বলে উঠলেন,
_”এটা আমার হাত জেবা!”
জেবা বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো চট করে ওনার হাত থেকে নিজের হাত সরিয়ে নিল। জিভ কেটে অপ্রস্তুত গলায় বলল,
_”সরি, সরি! আসলে…”
তারপর নিজেকে একটু সামলে নিয়ে ওনার মুখের দিকে তাকিয়ে সন্দেহী গলায় জিজ্ঞেস করল,
_”আপনি কি আসলেই আমাকে ফুচকা খাওয়ার অফার করলেন?”
আরিশান মৃধা সামনের দিকে তাকিয়েই আলতো করে মাথা নাড়লেন, যার অর্থ ‘হ্যাঁ’।
জেবা এবার আর এক সেকেন্ডও দেরি না করে সিটের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে এক হাত বাড়িয়ে ওনার কপালে আর অন্য হাত ওনার গলায় ঠেকাল। বউয়ের এই আকস্মিক নরম হাতের স্পর্শে হুট করে আরিশান মৃধার মনোযোগ নড়ে গেল, তিনি টাল সামলাতে না পেরে চলন্ত গাড়িতেই সজোরে একটা ব্রেক কষলেন! পিচ রাস্তায় চাকার ঘর্ষণে তীব্র শব্দ হলো। আরিশান মৃধা গাড়ি থামিয়ে জেবার হাত দুটো খপ করে ধরে ফেললেন। বেশ বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
_”কী করছ কী এসব?”
জেবা ওনার হাতের বাঁধন থেকে নিজের হাত না ছাড়িয়েই খুব গুরুত্বের সাথে বলল,
_”দেখছিলাম আপনার গায়ে জ্বর উঠেছে কিনা।”
আরিশান মৃধা পুরোপুরি তাজ্জব বনে গেলেন। ওনার ভ্রু কুঁচকে গেল।
_”আমার জ্বর উঠতে যাবে কেন? কী হয়েছে তোমার?”
জেবা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সিটে সোজা হয়ে বসে বলল,
_”ওহ, ওঠেনি? না মানে, আপনি আমাকে ফুচকা খাওয়াবেন বলছেন, তাই ভাবলাম আপনি বোধহয় সজ্ঞানে নেই। হয়তো জ্বরের ঘোরে আবোলতাবোল বকছেন। তাই একটু চেক করে নিলাম।”
বউয়ের মুখে এমন অদ্ভুত লজিক শুনে আরিশান মৃধা ভীষণ বিরক্ত হলেন। তিনি আবার গাড়ি স্টার্ট দিয়ে সামনের দিকে তাকাতেই জেবা ওনার দিকে একটু বাঁকা আর দুষ্টু হেসে তাকিয়ে রইল।নিকাবের ভেতর থেকে ওর চোখ দুটো চকচক করছে। জেবা হঠাৎ জিজ্ঞেস করল।
_”আচ্ছা আঙ্কেল, আপনি এত রোমান্টিক কেন বলুন তো?”
আরিশান মৃধার চোখ দুটো জেবার কথা শুনে মূহর্তেই বেশ বড় বড় হয়ে গেল। তিনি অবাক হয়ে ওনার চঞ্চল বউয়ের দিকে এক পলক তাকিয়ে আবার রাস্তায় চোখ ফেরালেন। গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
_”এখানে রোমান্টিকতার কী দেখলে তুমি?”
জেবা দুই হাতে নিজের মুখটা ঢেকে লজ্জার ভান করে মাথা দুলিয়ে বলল,
_”কেন? এই যে আপনি আমার পছন্দগুলোর এত গুরুত্ব দেন! আমি ফুচকা ভালোবাসি তাই আপনিও আমাকে ফুচকা খাওয়াতে চান। এটাই তো রোমান্টিকতা!”
আরিশান মৃধা জেবার এই ঢং আর বসার ভঙ্গি দেখে মনে মনে চোখ উল্টালেন। ভেতরের সেই গম্ভীর ভাবটা বজায় রেখেই বাঁকা চোখে তাকিয়ে বলে উঠলেন,
_”ভালোই পেকে গেছ দেখছি!”
জেবা এক মুহূর্তও দেরি না করে ঝটপট উত্তর দিল,
_”আপনার প্রেমে পড়ে!”
আরিশান মৃধা এবার একটু কৌতুক বোধ করলেন। ওনার গম্ভীর ঠোঁটের কোণে হালকা হাসির রেখা ফুটে উঠল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন,
ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ৩৬
_”তা আমার প্রেমে কীভাবে পড়লে শুনি?”
জেবা ওনার দিকে তাকিয়ে একটা বড়সড় দীর্ঘশ্বাস ফেলে খুব আফসোসের সুরে বলল,
_”উষ্টা খেয়ে!”
উষ্টা খেয়ে কেউ আবার প্রেমে পড়ে তা আগে কোনোদিন শুনেনি আরিশান মৃধা। ওনি তাজ্জব বনে গেলেন। পরক্ষনেই নিজেকে বুঝালেন এটা অন্যকেউ নয়,ওনার হাফ মেন্টাল আধ পাগল বউ। এরে দ্ধারা সব সম্ভব।
