উন্মাদনা পর্ব ১৫
কায়নাত খান কবিতা
__মেয়েরা বড়ো হলে, সবার আগে পর হয় বাবা।’
এক বুক ভরা আফসোস নিয়ে আকরাম শেখ কথাটি বললেন। তার কথার ভার যে কতটা ভারি, সেটা ওজন করার মতো সাধারণ মানুষের সাধ্যি নেই।পাশ থেকে তার স্ত্রী কাঁধে হাত রাখে, একটা ভরসার হাত। ছেলে মেয়ে বড়ো হলে তাদের নিজস্ব জীবন শুরু হয়। তাদের আলাদা একটা পরিবেশ গঠিত হয়। কিন্তু সেই পরিবেশের ত্রী_সীমানায় সবার আগে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয় বাবা মায়ের। একটা অচেনা বেষ্টনী তৈরি হয় সন্তান এবং মা-বাবার মাঝে।এটা না চাইতে ও মানতে হয়।
আকরাম শেখ উনার স্ত্রীর হাত শক্ত করে ধরে বলে,__গিন্নি! তোমরা মায়েরা অনেক ভাগ্যবান জানো। আমি বাবা চাইলে ও সন্তানের সাথে দু-দন্ড কথা বলতে পারি না।পরিবারের চাপ বাবাদের কখন সন্তান থেকে দূরে সরিয়ে ফেলে সেটা বাবা হিসেবে আমরা বুঝি না। কিন্তু জানো তো, মাথায় ২৪ ঘন্টা একটা জিনিসই ঘুরপাক খায়। ছেলে মেয়ে পেট ভরে খেলো তো? তাদের চাহিদা মিটাতে পারছি তো।” আকরাম শেখের চোখ আপনাআপনি লাল হয়ে ওঠে ।কিন্তু তিনি কাঁদেন না। কাঁদবেন কী করে? তিনি তো বাবা। বাবাদের কখনো কাঁদতে হয় না। তারা পাথর মূর্তি হয়ে থাকে। সারাদিনের হাড় ভাঙা পরিশ্রমের পর যখন সন্তান বলে, বাবা তুমি তো সময়ই দাও না।’ ঠিক তখনই বাবা নামক সেই মানব যন্ত্রটির বুকে হাহাকার শুরু হয়। পরিবারের দ্বায়িত্ব নিতে গিয়ে তারা সবার আগে পরিবার থেকেই দূরে সরে যায়। এটাই হলো বাবাদের জীবনচক্র।
__আনন্দী এখনো সব জায়গায় তোমাকে খোঁজে জানো তো! তাহলে কী করে বুঝলে মেয়ে বড় হলে তোমাকে দূর করে দেবে?’ স্ত্রীর শান্তনা মূলক কথা গুলো শুনে বুকে কিছুটা শান্তি অনুভব হয় আকরাম শেখের। কিন্তু বাস্তবতা তো অন্য কিছু বলে।ছেলে মেয়েরা মায়ের সাথে যতটা মিশুক বাবার সাথে ততটা মিশুক নয়। এটাই বাস্তব।
__আজ যদি আনন্দ!”
__আমার কোনো ছেলে নেই।”
স্ত্রীকে পাশ কাটিয়ে গটগট করে শয়ন কক্ষে চলে যায় আকরাম শেখ। স্বামীর এমন রাগ আজ ১৬ বছর ধরে দেখে আসছেন আনন্দীর মা। মা হওয়ার প্রথম অনুভূতি যেই ছেলের মাধ্যমে অনুভূব করেছিলেন তিনি। সেই ছেলে আজ ১৬ টি বছর ধরে নিরুদ্দেশ। আনন্দ ছোটোবেলা থেকেই বেশ রগচটা স্বভাবের ছিলো। বাবার অতিরিক্ত শাসন সে কিছুতেই নিতে পারতো না। যার ফলে ১২ বছর বয়সে বাবার উপরে জীদ করে বাসা ছাড়ে আনন্দ। সেদিন থেকে আকরাম শেখ হয়ে যায় আরো কঠিন। সবাইকে বলেন,তার শুধু একটি মেয়ে রয়েছে। ছেলের পরিচয় ও তিনি দিতে চাননা। কিন্তু দিনশেষে! আকরাম শেখ এক ব্যার্থ বাবা।
আনন্দ ছিলো আকরাম শেখের সব থেকে শখের সন্তান। প্রথম বাবা ডাক তিনি শুনেছিলেন আনন্দের মুখ থেকে। হসপিটালের করিডরে প্রায় সারারাত দাড়িয়ে দাড়িয়ে আনন্দকে নিয়ে দাড়িয়ে থাকতেন আকরাম শেখ। প্রেমের বিয়ের ফলে পরিবার, পরিজন বহুবছর আগেই তাদের ত্যাগ করেছিলেন। যার ফলে স্ত্রীকে নিয়ে একাই দিন পার করতেন তিনি। আকরাম শেখের সব থেকে সুখের দিন ছিলো যখন তিনি জানতে পারেন, কেউ একজন তাকে বাবা ডাকটি ডাকার জন্য আসছে।
নয়টি মাস স্ত্রীর সেবা-যত্ন করতে থাকেন আকরাম শেখ। ডেলিভারির সময় একদম মহিলা মানুষের মতো সব কিছু করেন তিনি। আর্থিক অবস্থা ততোটা ভালো না থাকায়, সরকারি হসপিটালে হয় আনন্দ। স্ত্রীকে রাতে ঘুমাতে দিয়ে, তিনি সারারাত আনন্দকে নিয়ে হাটাহাটি করতেন। ছোটো মানুষ একটু থামলেই কেঁদে উঠতো। সচারাচর বাচ্চারা না-কি হওয়ার পর ঘুমায় বেশি। কিন্তু আকরাম শেখের এই ধারণা পুরোপুরি ভুল প্রমাণিত করে আনন্দ। সে একদম কাঁদুনি বুড়ো ছিলো। আকরাম শেখ তার জীবনের অনেক কিছু আনন্দর সাথে শেয়ার করতেন। ছোটো আনন্দ বাবার কথার অর্থ না বুঝতে পারলে ও মাঝে মাঝে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকতো। যেটা ছিলো আকরাম শেখের জন্য রত্ন খুঁজে পাওয়ার মতো।
ধীরে ধীরে আনন্দ বড়ো হতে থাকে এবং তার রাগ ও বাড়তে থাকে। তারপর আনন্দী হয়।আকরাম শেখের সুখের কোনো সীমানা থাকে না। কিন্তু ছেলের রাগ তিনি কিছুতেই কন্ট্রোল করতে পারতেন না। যার ফলে বকাঝকা করতেই থাকতেন। আস্তেধীরে তাদের কাপড়ের ব্যবহা ও ভালো হতে থাকে। আয় উন্নতি ও বাড়তে থাকে। যার ফলে সন্তানদের প্রতি তেমন একটা ধ্যান দিতে পারেননি তিনি।
যত দিন যায়, আনন্দ হয়ে ওঠে বেপরোয়া। এরপর একদিন একজনের মাথা ফাটিয়ে বাড়ি চলে আসে আনন্দ। আকরাম শেখ খুব জোড়ে চ’ড় বসিয়ে দেয় ছেলের গালে। যার ফল স্বরূপ সে রাতেই আনন্দ কোথাও চলে যায়। থানা, পুলিশ, এতো খোজাখুজি করে ও কোনো লাভ হয়নি। পাওয়া যায়নি আনন্দকে।
পুলিশ যতবার অজ্ঞাত নামার কোনো লা’শ পেতো, আকরাম শেখ সেখানে চলে যেতো। যদি ছেলের লা’শ হলে ও পাওয়া যায়। এভাবে দিনের পর দিন আকরাম শেখ এখানে ওখানে বেড়িয়েছেন। কোনো হারিয়ে যাওয়া শিশু পাওয়া গেছে। খবরটি আকরাম শেখের কান অব্দি গেলেই তিনি চলে যেতেন। কিন্তু আফসোস। ছেলেকে তিনি খুঁজে পাননি। বুকে এক চাপা কষ্ট নিয়ে ঘুরে বেড়ান তিনি। ছেলের সমস্ত জামা কাপড় খুব যত্নে রেখে দেন আকরাম শেখ। যদি ছেলে বাড়ি ফিরে সেই আশায়।
এরপর? এরপর আর কী! প্রতি মাসে একবার হলে ও ছেলের ঘর পরিষ্কার করেন, কাপড় গুলো ধুয়ে যত্নে রাখেন। কিন্তু ছেলেটি আর এলো না। আকরাম শেখ মাঝে মাঝে ভাবে সে যদি সেদিন না মারতো ছেলেকে। ভালো মতো বোঝাতো। আজ ছেলেটার ২৬ বছর হতো। বিয়ের কথা চিন্তা করতো। কিন্তু নেই! ছেলে নেই। হাহাকার! বাবাদের কষ্ট দেখানো যায় না। তাই আমরা দেখি ও না।
রুমে এসে ঘরের লাইটটি বন্ধ করে বিছানায় চুপচাপ শুয়ে পরে আনন্দী। শরীরটা অসহ্য ব্যাথায় জর্জরিত তার। ছোট্ট শরীরটা অভী খামচে খামচে খেয়ে’ছে। চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করে আনন্দী। কিন্তু চোখ বন্ধ করতেই অভীর সেই রূপটি তার চোখের সামনে ভেসে বেড়ায়। অভীর ছোয়া, অভীর নিঃশ্বাস, প্রতিটা জিনিস আনন্দী সুক্ষ ভাবে অনুভব করতে থাকে। আবার ও চোখ ভিজে ওঠে আনন্দীর। এ কেমন যন্ত্রণা পাচ্ছে সে?
উঠে বসে খুব জোড়ে জোড়ে নিঃশ্বাস নিতে থাকে সে। হঠাৎ করেই তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে ২০২২ সালের সেই ঘটনার কথাটি।
‘অতীত’
সময় বড়ই অদ্ভুত জিনিস। কখনো কারো পক্ষে, আবার কখনো কারো বিপক্ষে। আজকের সময়টা যেন হবু ডা. অভী ফারসির বিপক্ষে।
প্র্যাকটিস চলাকালীন সময় সবাই বলতো অভী একদিন দেশের নাম উজ্জল করবে। একটি এতিম ছেলে। যার না ছিলো বাবা-মা আর না ছিলো কোনো পরিচয়। এতিমখানাতে থেকে বড় হয় অভী। সেখান থেকে সরকারি সুযোগ সুবিধাতে পড়াশোনা করে বেশ ভালোই গতিতে এগোতে থাকে। পড়াশোনায় খুব বেশি ভালো হওয়ায় এতিমখানার বড় স্যার অভীকে এইচএসসি অব্দি নিজের বাড়িতেই রেখেছিলেন, এবং নামের পরে নিজের পদবি যোগ করেন। এরপর অভী পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি ও শুরু করেছিলো। ভালো ভার্সিটির স্টুডেন্ট হওয়ায় তার চাহিদা ও ছিলো ব্যাপক। পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করে যা পেতো তাতে অভীর বেশ ভালো চলে যেতো। আস্তে আস্তে সে একটি সিঙ্গেল বেডের এপার্টমেন্ট নিয়ে থাকতে শুরু করে। ভদ্রতা, এবং বড়দের প্রতি সম্মান, অভীকে খুব তাড়াতাড়ি সকলের নজরে আনে।
কিন্তু অভীর জীবনের সব থেকে বড় কষ্ট ছিলো, সে কখনো কাউকে মা ডাকতে পারেনি। ঈদে যেখানে মানুষ জন পরিবার পরিজন নিয়ে কত আনন্দ ফূর্তি করতো।সেখানে অভী নিজের সেমাই নিজেই রান্না করে খেয়ে চুপচাপ শূন্য ঘরটিতে শুয়ে থাকতো। এতিমদের তো ঈদ উৎসব বলতে কিছু হয় না। তাই অভীর ও ছিলো না। এভাবেই কেটে যাচ্ছিল অভীর জীবন।
কিন্তু নিয়তির পরিহাসে সেই ডা. অভী ফারসি আজ কেবলমাত্র একজন চরিত্রহীন, বহুরূপী ডাক্তারের উপাধি পেয়ে বসে আছেন। বোর্ড ডেকে তার ডাক্তারি লাইসেন্স কেড়ে নেওয়া হয়। তার গলায় জুতোর মালা পরিয়ে, চোখে-মুখে কালি মেখে, প্রেস-মিডিয়ার সামনে তাকে অপমান করা হয়।
যখন তাকে পুলিশ ভ্যানে তোলা হচ্ছিল, চারপাশে মানুষ, প্রেস, মিডিয়ার ভিড়—সবকিছুর ঊর্ধ্বে তার চোখ গিয়ে থামে ক্লাস টেনে পড়ুয়া আনন্দীর ওপর।
অভী একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। এত অপমান, এত লাঞ্ছনা—কিছুই যেন স্পর্শ করছে না তাকে।
অভীর দৃষ্টি নিজের দিকে দেখে ভয়ে মায়ের আঁচলে লুকিয়ে পড়ে আনন্দী।
অভীর ঠোঁটের কোণের হাসি বলে দিচ্ছিল—এসব তুচ্ছ ব্যাপারে তার কিছুই যায় আসে না। বরং সে যেন অন্য কিছু নিয়েই ভীষণ খুশি।
এটা দেখে আনন্দী আতঙ্কে ঘুরে দাঁড়ায়। গলা শুকিয়ে আসে তার। এতকিছুর পরও সে এসব করছে!
সেই রাতেই আনন্দীর ভয় আরও বেড়ে যায়, যখন সে শুনতে পায়— জুনিয়র ডা. অভী ফারসি থানা থেকে বেরিয়ে গেছে।সেদিন রাত থেকেই শুরু হয় আনন্দীর জীবনের উল্টো গুনতি শুরু।
পূরনো স্মৃতি চারণ করতে করতে গভীর ঘুমে তলিয়ে যায় আনন্দী। এক ঘুমে পুরো রাত শেষ হয়ে যায়।
ডে-সিফটে ক্লাস থাকায় সারা সকাল বেশ অনেক ক্ষণই ঘুমিয়ে পার করে আনন্দী। মা ও তাকে ডাকেন না। মেয়েটার এমনিতেই শরীর খারাপ ভেবে ঘুমে ডিস্টার্ব করেন নি উনি। পরিপূর্ণ ঘুম কমপ্লিট করে বেশ ভালোই বেলা গড়িয়ে ঘুম থেকে ওঠে আনন্দী।
উঠে বসার পর থেকে শরীরে অসহ্য ব্যাথা অনুভব হয় তার। কোনো রকম উঠে, ফ্রেশ হয়ে কলেজ ড্রেস পরে নিচে নামতে থাকে সে। সামনে বোর্ড পরীক্ষা না থাকলে এই অবস্থায় আনন্দী কখনোই কলেজে যেতো না। তবে বাবার স্বপ্ন তো পূরন করতে হবেই। তাই ব্যাথা জর্জরিত শরীরটাকে ঠেলেই কলেজের উদ্দেশ্যে রওনা দেয় আনন্দী। মা শুরুতে অনেক বাঁধা দেয়।এক দিন না গেলে তেমন কিছুই হবে না, এসব যুক্তি ও পেশ করেন।তবে আনন্দীকে মাকে বুঝিয়ে বেরিয়ে পরে। বাসা থেকে একটু দূরেই মেইন রোড। মা সাথে এসে তাকে রিক্সায় তুলে দিয়ে নিজের খেয়াল রাখতে বলে। আনন্দী এক গাল হাসি দিয়ে মায়ের থেকে বিদায় নেয়। আঁকাবাকা রাস্তায় রিক্সার ঝাঁকুনি ও আনন্দীর ব্যাথা যেন কয়েক গুন বাড়িয়ে দিচ্ছিল। তবু ও দাঁতে দাঁত চেপে চুপচাপ বসে থাকে সে।
মনের সাথে হিসাব কষাকষিতে ব্যস্ত আনন্দীর ধ্যান ভাঙ্গে হঠাৎ রিক্সাটি থেমে যাওয়ার ফলে। বাইক নিয়ে নোবেল এবং কয়েক জন তার রিক্সা ঘেরাও করে দাঁড়ায়। কিন্তু অভী ছিলো না সে। আনন্দী কিছু বলতে যাবে তার আগেই নোবেল বলে,__আপামনি! ভাই বলছে এক্ষুনি যাইতে। আসেন জলদি।”
নোবেলের এমন কথা শুনে কপাল কুঁচকে আনন্দী বলে,__আমার কলেজ রয়েছে। আমি পারবো না যেতে।”
উন্মাদনা পর্ব ১৪
নোবেল কিছু না শুধু চুপ থাকে। তারপর অভীর ফোনে টেক্সট পাঠায়। টেক্সট যাওয়ার কিছু ক্ষণের মধ্যে আনন্দীর ফোনে কল আসে। অভীর নাম্বার দেখে প্রথমে ফোন রিসিভই করতে চাইনি আনন্দী।তবে না করলে কী হবে এটা তার ভালো মতোই জানা রয়েছে। যার ফলে আনন্দী খুব বেশি সময় নেয় না।
কল রিসিভ করে কানে ভেসে আসে অভীর কর্কশ গলার তিক্ত কথা,___বা’ন্দীর বাচ্চা, জলদি আয়! তোরে এক্ষুনি লাগবো আমার। দশ মিনিটের মধ্যে তোরে চাই আমার।”
