উন্মাদনা পর্ব ৭
কায়নাত খান কবিতা
__নারী কিসে আঁটকায়?’
ছলনায়!
নারী জাতি ভয়ংকরী। নারীর ফাঁদে পড়েছে যে জন,নিঃস্ব হয়ে মরেছে সে জন।’
সিগা’রের ধোঁয়া উড়াতে উড়াতে ফোনে থাকা আনন্দীর ছবি গুলো দেখে দেখে কথাগুলো বলতে থাকে অভী। তার চোখজোড়া অসম্ভব লাল। হয়তো আজ ও কো’কেন টেনেছে সে। এতিম ছেলেটি কো’কেন, ম’দ, বাবা সহ অনেক কিছুই সেবন করে থাকে। যার পরিবার নেই তাকে থামাবে কে? কার এতো দায় পড়েছে?
অভীর চার পাশে গোল হয়ে বসে থাকে তার সাঙ্গপাঙ্গরা। তারা ও দু-একটান কো”কেন টেনেছে বটে। তবে খুব বেশি নে’শা করেনি। কারণ বারণ রয়েছে যে। অভী প্রায় সময় অতিরিক্ত নে’শা করে ভুলভাল কাজ করে বসে। তারপর পুলিশে আটক ও হয়। কিন্তু কয়েক ঘন্টার মধ্যে ছাড়া ও পায়।এর প্রথম কারণ হলো দাদা সাহেব। আর দ্বিতীয় কারণ হলো এমপি নওয়াজ উদ্দিন। তাদের দু-জনের সমস্ত কালো অধ্যায় গুলো অভী হ্যান্ডেল করে। যার ফলে বেশি ক্ষণ তাকে থানায় আটকে থাকতে হয় না। সে নে’শা করলে ও বাকিরা করে না। এটাই এখানকার নিয়ম।
নেতাদের চোরাচালান থেকে ড্রা*গ পাচার সব কিছুই চলে অভীর কন্ট্রোলে। কিন্তু সে এখন ও মা’ফিয়া জগতে তেমন একটা নাম করে উঠতে পারেনি। এর প্রধান কারণ হচ্ছে নামের আগে খু’নির ট্যাগ না পাওয়া। আন্ডারওয়া’ল্ডে একটি রুলস রয়েছে। যার নামের আগে যত খু’নের সংখ্যা। তার দখলে তত বেশি ক্ষমতা। যার ফলে কালো দুনিয়ায় অভী নামটি তেমন জাগ্রত নয়।
তবে সে কালো দুনিয়া বর্তমানে চলে দাদা সাহেবের হুকুমে। এতে অনেক এমপি, মন্ত্রীরা ও জড়িত। কিন্তু তাদের নীতি বাক্যের ফলে ভিতরের কালো দুনিয়ার খবর চাপা পড়ে যায়। এতো এতো খু’ন, গুম হয় তো ঠিকই। কিন্তু বিচার হয় না। আর এসবেরর বিচার না হওয়ার এক মাত্র কারণ হচ্ছে উপর পদে থাকা এসব মন্ত্রী, মিনিস্টাররা। লোক দেখানোর গ্রেফতার হয় ঠিকই। কিন্তু বিচার হয় না। যার পুরোপুরি সুযোগ লুফে নেয় দাদা সাহেব।
পুরো বাংলাদেশের কালো দুনিয়া চলে দাদা সাহেবের হুকুমে। তবে তার নিচে অগণিত লোক রয়েছে। যারা পুরো দেশে নিজেরদের সিস্টেম বজায় রাখে। হয়তো তারা আম জনতার মতোই দেখতে। তাই আমরা বুঝতে পারি না কে কেমন।কার মনে কী চলে।
নে’শাগ্রস্ত অভী হুট করে উঠে বসে। আজ নে’শার মাত্রা তুলনা মূলক একটু বেশিই ছিলো বোধ হয়। পা দুটো তার টলমল করে এদিক ওদিক চলে যেতে থাকে। ঢলে পড়ার আগেই কেউ না কেউ তাকে ধরে ফেলে। না হলে মাটিতে পড়ে যাওয়ার সম্ভবনা রয়েছে যে। আর অভী চাঁদ মাটিতে পড়লে বাকিদের ড্রেনে ফেলবে।এটা তো সিউর।
স্মার্ট নোবেল অভীকে ধরে বলে,
__চাঁদ ভাই আপনেরে রুমে দিয়া আহি?’
নিভু নিভু চোখে স্মার্ট নোবেলের দিকে তাকায় অভী। তারপর তার গালে আস্তে ধীরে থা’প্পড় মার’তে মার’তে বলে,
__গাড়ি বাইর কর বেটা!’
কপাল কুঁচকে নোবেল তাকায় অভীর পানে। এতো নে’শা গ্রস্ত অবস্থায় সে এখন যাবেটা কোথায়? কিন্তু ভয়ে প্রশ্ন করে উঠতে পারে না। তবু ও সাহস সঞ্চয় করে বলে,
___ভাই এতো রাইতে কই যাইবেন?’
নোবেলের পাল্টা প্রশ্ন শুনে মুখে কিঞ্চিৎ পরিমাণের হাসি টেনে এনে অভী উত্তর দেয়,
__এক বা:ন্দীর বাচ্চার বাসায়। ওরে না থা’পড়াইলে কলিজা শান্তি হইবো না। জলদি বাইর কর গাড়িহহহহ।’
অভীর নির্দেশ মতো নোবেল ইশারা করে কুদ্দুসকে গাড়ি বের করতে বলে, তারপর তার অভীকে ধরে গাড়িতে তুলে তারা। গাড়িতে ওঠার আগে মুখেচোখে পানির ঝাপটা দেয় অভী। থা:প্পড় মারা’র জন্য শক্তি তো দরকার না-কি?
গাড়িতে বসে সিটে পুরো শরীর এলিয়ে দেয় সে। যেতে যেতে এক চমক ঘুম হয়ে যাবে তার। তাই চোখ বন্ধ করে নিদ্রায় ঘলে পড়ে সে। বাকিরা চুপচাপ গাঠিতে উঠে বসে। সকলে নিজেদের মুখে কুলু পাতে। অভীর ঘুমে ডিস্টার্ব হলে তাদের সাড়ে বারোটা বাজাবে সে।
‘শেখ বাড়ি’
রাত তখন একটার ধার ধার, সবাই তখন গভীর ঘুমে।শুধু ঘুম নেই আনন্দীর চোখে।
টেবিলে ল্যাম্পের আলোয় বই খুলে বসে থাকে সে এইচএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য।
চোখ বইয়ের পাতায়, কিন্তু মন বারবার হারিয়ে যায় তার।
লাইন পড় চলেছে বার বার। কিন্তু পরক্ষণেই আবার ও ভুলে যায় সে।তবুও নিজেকে জোর করে পড়ায় মন বসাতে চায় আনন্দী।
মাঝে মাঝে বাবার ঋণের কথা মনে পড়ে বুকটা ভারী হয়ে উঠে তার।
তাদের ব্যবসা ছোট ছিল, কিন্তু সৎ ছিল।এতো ঋণ কখনোই ছিল না তার বাবার।
কাপড়ের ব্যবসা বাড়ানোর স্বপ্নে আজমল শেখ নতুন এক বড় ডিল নেন।যেখানে অভীর লোকেরা ক্রেতা সেজে আসে।
প্রথমে তারা অগ্রিম টাকা দিয়ে বিশ্বাস অর্জন করে, বড় অর্ডারের লোভ দেখায়।
তারপর ভুয়া কাগজে সই করিয়ে নেয়।যেখানে অংকটা আসল টাকার কয়েকগুণ বেশি দেখানো হয়।
ডেলিভারির দিন ইচ্ছে করে পণ্য রিজেক্ট করে দেয়, দোষ চাপায় শেখ সাহেবের উপর।
একই সাথে বাজারে তার নামে গুজব ছড়িয়ে দেয়।খারাপ মাল, প্রতারণা,।ব্যবসার সুনাম একদিনেই শেষ।
ব্যাংকের পুরনো লোনগুলোও হঠাৎ চাপ তৈরি করে, যেন সব একসাথে ভেঙে পড়ে তার উপর।
সবশেষে পাওনাদার সাজিয়ে লোক পাঠায় অভী।যারা টাকা চাইতে এসে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে তোলে।
সবকিছুর আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিল অভী।নীরবে, হিসাব করে, পুরো পরিবারটাকে নিজের ফাঁদে ফেলতে।
খুব বড় একটা নিঃশ্বাস ফেলে নিঃশব্দে বসে থাকে আনন্দী।আফসোসে বুকটা ভারী হয়ে ওঠে।
একটা ভুল! যেটা আসলে তার ছিলো না!তবুও তার জীবনটাই যেন তার জন্য বদলে গেছে।
আজ শুধু সে না, তার পুরো পরিবার সেই ভুলের শাস্তি পাচ্ছে ।
বাবার অসহায় মুখ, মায়ের ভাঙা চোখ।সবকিছু তাকে ভিতর থেকে ভেঙে দিচ্ছে।
নিজেকে বারবার প্রশ্ন করে।কেন তার সাথেই এমন হলো?
তবুও উত্তর পায় না।শুধু নিঃশব্দে কষ্টটা বয়ে বেড়ায়।
নিজের অতীত নিয়ে ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ ফোনটা বেজে ওঠে আনন্দীর।
স্ক্রিনে অভীর নাম দেখতেই তার বুক কেঁপে ওঠে, হাত ঠান্ডা হয়ে যায়।
এক মুহূর্ত দ্বিধায় থাকে সে রিসিভ করবে কি না।
তবুও সাহস করে কলটা রিসিভ করে। না করলে আবার ও বাওয়াল করবে অভী।
ফোন রিসিভ হতেই ওপাশ থেকে ভেসে আসে অভীর কর্কশ কন্ঠস্বর __বা’ন্দীর বাচ্চা নিচে আয়। তোরে চ’ড়াইতে আইছি।”
ফোন কানে নিয়েই আনন্দী তাড়াহুড়ো করে বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়ায়।নিচে তাকাতেই তার বুক ধক করে ওঠে।অভী ঠিক তার বেলকনির নিচেই দাঁড়িয়ে।
অন্ধকার রাতেও তার উপস্থিতি স্পষ্ট, অস্বস্তিকর আর ভয়ংকর।অভী ধীরে হাত তোলে, আঙুল নেড়ে ইশারা করে তাকে নিচে নামতে বলে।
আনন্দী দ্রুত এদিক ওদিক তাকায়।চারপাশে নিস্তব্ধতা।
করিডোর ফাঁকা, কারও পায়ের শব্দ টুকু ওনেই।
ঘরের ভেতরও সবাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
নিশ্চিন্ত হতে চাইলেও তার বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে কেঁপে ওঠে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই দরজাটা আস্তে খুলে বাইরে বের হয় আনন্দী।রাতের ঠান্ডা হাওয়া গায়ে লাগতেই কেঁপে ওঠে সে।
উন্মাদনা পর্ব ৬
আনন্দী সামনে আসতেই অভীর দৃষ্টি নিচে নেমে যায়।পায়ের পাতা থেকে ধীরে ধীরে চুল অব্দি পর্যন্ত চোখ বুলিয়ে নেয় সে।পরখ করে, মেপে দেখে।
আনন্দীকে গেঞ্জি আর প্লাজু পরা অবস্থায় দেখে
অভীর ভ্রু কুঁচকে ওঠে, চোখে স্পষ্ট বিরক্তি ফুটে উঠে।
মাথা একটু কাত করে তাকায় সে।যেন এই উপস্থিতিটা তার পছন্দ হয়নি একদমই।
__কীরে বা’ন্দী শরীরে চর্বি বেশি না-কি? ওড়না কই তোর? আমারে বডি দেখাস? কিছু আছে তোর মাঝে? পিচ্চি বোকা চন্দ্র।’
