Home উন্মাদনা উন্মাদনা পর্ব ১৮

উন্মাদনা পর্ব ১৮

উন্মাদনা পর্ব ১৮
কায়নাত খান কবিতা

__সারা রাত কী আমার লগেই থাকার ইচ্ছা বান্দী? আমার কোনো সমস্যা নাই। তুই সহ্য করতে পারলেই হইলো।”
চোখ বন্ধ করে গভীরভাবে নিঃশ্বাস নিতে থাকে আনন্দী। বুকের ভেতরটা যেন অদ্ভুত ভারে চেপে আছে। কোনো শব্দই যেন তার কান অব্দি পৌঁছাচ্ছে না, শুধু নিজের দ্রুত ওঠানামা করা শ্বাসের আওয়াজটাই স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।
অজান্তেই চোখের কোণ ভিজে ওঠে। এক ফোঁটা, দুই ফোঁটা করে নীরব জল গড়িয়ে পড়ে তার গাল বেয়ে। সে ঠোঁট কামড়ে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে, কিন্তু ভেতরের জমে থাকা কষ্টগুলো যেন আজ আর মানতে চাইছে না।
কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে আনন্দী ধীরে ধীরে চোখ খুলে। লাল হয়ে থাকা চোখদুটোতে জমে থাকে হাজারটা না বলা কথা। কাঁপা কণ্ঠে সে বলে— আমি কখনো জানো’য়ার দেখিনি। আজকে আপনাকে দেখলাম।”
আনন্দীর তাচ্ছিল্য পূর্ন কথা শুনে হঠাৎই ফিক করে হেঁসে ওঠে অভী। এক হাত দিয়ে আনন্দীর ন:গ্ন শরীরটা নিজের উপরে এনে বলে,__আর একটু ভালো ভাবে দেখবে? কাপ’ড় খুলে দাঁড়ায়?”

__আমি বাড়ি যাবো।”
__তো যা। কে আটকাইছে?”
শরীরে শক্তি সঞ্চয় করে কোনো রকম অভীর উপর থেকে সরে বসে আনন্দী। এক চোখ বুলিয়ে ফ্লোরে পরে থাকা কাপড় চোপড় গুলোকে দেখে নেয় সে। কোনো রকম উঠে দাঁড়াতেই অভী আবার ও আনন্দীর হাত ধরে হেঁচকা টান দিয়ে তার উপরে ফেলে দেয় আনন্দীকে। কপাল কুঁচকে আনন্দী অভীর দিকে তাকিয়ে বলে,__মুক্তি চাই আমার।”
__এ জন্মে না।”
__আপনার মনের ইচ্ছে তো পূর্ণ হয়েছে। মন মতো ভোগ করেছেন আমাকে। তাহলে আর কেন?”
__একবারে খেয়ে পেট ভরানোর লোক কিং নয়। সারাজীবন রেখে আস্তে ধীরে খাওয়াতে মজা।”
__ছিঃ!”
__ হুয়াই ছি সোনা মনি? আমার পারফরম্যান্স পছন্দ হইতাছে না? মাত্র তো দুই দিন গেলো। বেডি মানুষের মন ভরে না।”
__সারাজীবন নিজের স্লা’ট হিসেবে রাখতে চান আমাকে?”

হুট করেই উঠে দাঁড়ায় অভী। মুহূর্তেই বদলে যায় তার চেহারার ভাব। চোয়াল শক্ত হয়ে আসে, চোখেমুখে স্পষ্ট হয়ে ওঠে চাপা রাগ। বুকের ভেতর যেন তীব্র কোনো ঝড় বয়ে যাচ্ছে তার।
একটাও কথা না বলে দ্রুত পায়ে এগিয়ে যায় সে। রুমের এদিক-ওদিক ছড়িয়ে থাকা আনন্দীর সমস্ত জামাকাপড় এক এক করে তুলে গুছিয়ে আনতে থাকে।
আনন্দী নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকে অভীর দিকে। অভীর এই হঠাৎ বদলে যাওয়া আচরণে তার বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে।
সব কাপড় গুছিয়ে এনে দ্রূত হাতে আনন্দীকে সব জামাকাপড় পড়াতে থাকে সে। এতে বেশ ব্যথা অনুভব হয় আনন্দীর। কেউ টেনে কাপড় পরাতে থাকলে ম্যাসালে মোটামুটি টান পাওয়ার সম্ভবনা থাকে। আনন্দীর বেলা ও ঠিক সেটাই হয়। সে পেশিতে ক-জায়গায় টান খায়। অভীর এমন আচরণ সইতে না পেরে আনন্দী বলে,__আহ! লাগছে আমার অভী।”
__লাগুক।”
আনন্দীকে সব জামাকাপড় পড়িয়ে, চুল ও টেনে টেনে বাঁধতে থাকে সে। যে তাদের মধ্যে একটু আগে কিছুই হয়নি।
সম্পূর্ণ রূপে আনন্দীকে রেডি করে অভী বলে,__যাহ বের হো আমার বাসা থেকে। “

‘’উত্তরা’’
অন্ধকারে ঢাকা পিছনের গেটটা পেরিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে থাকে আফরিন। ফোনের টর্চ লাইটের ক্ষীণ আলোটা কাঁপতে কাঁপতে সামনে পথ দেখাতে থাকে। চারপাশ এতটাই নিস্তব্ধ যে তার দ্রুত শ্বাসের শব্দও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। বের হওয়ার আগে সিসিটিভি ফুটেজ বন্ধ করে এসেছে সে।যেন আজকের এই রাতটার কোনো প্রমাণ না থাকে কোথাও।
দূর থেকে পরিচিত অবয়বটা চোখে পড়তেই থমকে যায় জুলফিকার। ঠোঁটের কোণে ধরা জ্বলন্ত সিগারেটটা মাটিতে ফেলে পায়ের নিচে পিষে দেয় সে। চোখেমুখে মুহূর্তেই নেমে আসে তীব্র অস্থিরতা।
এরপর আর এক সেকেন্ডও দাঁড়িয়ে থাকে না জুলফিকার। দ্রুত পায়ে এগিয়ে যায় আফরিনের দিকে। কাছে যেতেই কোনো কথা না বলে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তাকে।
আচমকা এমন টানে আফরিনের হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়ে যেতে নেয়। জুলফিকারের বুকের ভেতর দ্রুত ধুকপুক শব্দ হতে থাকে। যেন এতক্ষণ ধরে বুকের মধ্যে জমে থাকা ভয়, রাগ আর অস্থিরতা এক মুহূর্তে এসে আটকে গেছে এই আলিঙ্গনে।
চোয়াল শক্ত করে আফরিনের মাথার ওপর মুখ গুঁজে চোখ বন্ধ করে থাকে জুলফিকার। নিচু, ভারী গলায় ধীরে বলে—আর এক মিনিট দেরি করলে আমি নিজেই ভেতরে ঢুকে যেতাম, আফরিন…”

__প্রিন্স আমি মুক্তি চাই।”
আফরিনের মুখে হঠাৎ মুক্তি শব্দটা শুনতেই যেন মুহূর্তের মধ্যে বদলে যায় জুলফিকার। চোখের গভীরে জমে ওঠে তীব্র রাগ আর আহত এক উন্মাদনা। এক ঝটকায় আফরিনের চুলের মুঠি শক্ত করে ধরে তাকে নিজের মুখের একদম কাছে টেনে আনে সে।
আচমকা টানে আফরিন কেঁপে ওঠে। দু’জনের দ্রুত নিশ্বাস একে অপরের মুখে আছড়ে পড়ছে। জুলফিকারের চোয়াল শক্ত, চোখদুটো লাল হয়ে আছে দমিয়ে রাখা ক্রোধে।
নিচু কিন্তু কাঁপা কণ্ঠে সে ধীরে ধীরে বলে,__হয় আমি না-হয় তুমি। দু-জনের মধ্যে কেউ একজন মর:লেই মুক্তি পাবে।”

কথাটি শেষ করেই আফরিনের ঠোঁটে নিজের ঠোঁট বসিয়ে দেয় জুলফিকার। চোখ বন্ধ করে ফেলে আফরিন। ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার আগে ও আফরিন জানতো না তার জন্য কী অপেক্ষা করে রয়েছে। জীবনটা এভাবে ঘুরে যাবে, সেটা কল্পনা ও করতে পারেনি সে। জুলফিকারের জন্য যেটা ভালোবাসা । আফরিনের জন্য সেটা বন্দীত্ব। এমন ভালোবাসা কে কবে চেয়েছে? যেখানে শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে ও অন্য কারো অনুমতির প্রয়োজন।
” ২০২৫”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রথম দিন আজ আফরিনের।
সকালের নরম রোদ, ক্যাম্পাসজুড়ে কচি পাতার গন্ধ আর চারপাশে নতুন মুখের ভিড়—সব মিলিয়ে তার মনটা আজ অদ্ভুত ফুরফুরে।
হালকা নীল জিন্সের সাথে সাদা শর্ট কুর্তি পরেছে সে। কাঁধ পর্যন্ত নেমে আসা খোলা চুলগুলো বাতাসে বারবার উড়ে গিয়ে গাল ছুঁয়ে দিচ্ছে। চোখেমুখে স্পষ্ট নতুন শুরু করার উত্তেজনা। বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে রাখা ফাইলটা নিয়ে ধীর পায়ে মেইন গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢোকে আফরিন।
ক্যাম্পাসের কোলাহল, সিনিয়রদের আড্ডা, কোথাও গিটার বাজছে, কোথাও আবার চায়ের কাপ হাতে তর্ক সবকিছু তার কাছে নতুন অথচ সুন্দর লাগছিল।

কিন্তু হঠাৎই জ্বালানো সিগারেটের তীব্র ধোঁয়া এসে লাগে তার মুখে।
আফরিন কাশতে কাশতে বিরক্ত মুখে পাশে তাকায়। আর তাকিয়েই কয়েক সেকেন্ড থেমে যায় সে।
কালো শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গুটানো। এক হাতে সিগারেট, অন্য হাতটা পকেটে। এলোমেলো চুলের নিচে ধারালো চোখদুটো অস্বাভাবিক শান্ত। ঠোঁটের কোণে অবহেলার হাসি ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ছেলেটা। তার আশেপাশে আরও কয়েকজন ছেলে থাকলেও পুরো জায়গাটার দখল যেন একাই নিয়ে রেখেছে সে।
আফরিন বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে ফেলে। তারপর ঠান্ডা অথচ তীক্ষ্ণ গলায় বলে ওঠে,
__বখাটে।”
কপাল কুঁচকে, চোখে স্পষ্ট বিরক্তি নিয়ে
জুলফিকারকে বখাটের উপাধি দেয় আফরিন।
তার তীক্ষ্ণ চাহুনি যেন সরাসরি আঘাত করলো জুলফিকারের অহংকারে। চোখদুটোতে ভয় ছিলো না একটুও, বরং ছিলো তীব্র অসন্তোষ। যেন সে এই ধরনের ছেলেদের বহুবার দেখেছে, আর প্রতিবারই ঘৃণা করেছে সমানভাবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসব দৃশ্য খুব একটা নতুন না।
রাজনীতি, ক্ষমতা, বড় ভাইদের দাপট। সব মিলিয়ে অনেক কিছুই এখানে স্বাভাবিক হয়ে গেছে।
কিন্তু কিছু কিছু বিষয় কখনো স্বাভাবিক হওয়ার কথা না।
কারণ কারো বিনোদন, কারো স্টাইল কিংবা দাদাগির, অন্য একজন মানুষের অস্বস্তি কিংবা ক্ষতির কারণ হতে পারে।
আফরিন সম্ভবত সেই ব্যাপারটাই সহ্য করতে পারে না।
বিরক্তিতে ঠোঁট চেপে ব্যাগের স্ট্র্যাপটা ঠিক করলো সে। তারপর গটগটিয়ে সামনে হাঁটতে শুরু করলো।
তার হাঁটার ভঙ্গিতেও রাগ স্পষ্ট।

ওড়নার একপাশ বাতাসে উড়ছে, আর দ্রুত পায়ে হাঁটার কারণে কাঁধে ঝোলানো ব্যাগটা বারবার দুলে উঠছে।
পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেগুলোর মুখ হাঁ হয়ে যায়। অস্ত্র মামুন জুলফিকারের সামনে পাশে দাড়িয়ে বলে,__ব্রো! হেতি কিন্তু আপনারে বখাটক কইলো।”
জুলফিকার কিছু ক্ষণ চুপ করে থেকে আরেকটা নতুন সিগারেট ধরিয়ে বললো,__খোঁজ লাগা তো এই ফাজিল মেয়ের ডিপার্টমেন্ট কোনটা।”
__ওক্কে ভাই!”

উন্মাদনা পর্ব ১৭

” বর্তমান”
তীব্র চুম্বনের পর জুলফিকার আলগা করে ধরে আফরিনের ঠোঁট জোড়া। তারপর নাক ঘষতে ঘষতে বলে,__আই জাস্ট লাভ ইউ্য কাপকেক। হয় মর না হয় আমার হয়ে থাকো। চয়েস ইজ্য ইউ্যরস।”

উন্মাদনা পর্ব ১৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here