Home উন্মাদনা উন্মাদনা পর্ব ১৯

উন্মাদনা পর্ব ১৯

উন্মাদনা পর্ব ১৯
কায়নাত খান কবিতা

___ধ’র্ষণ কী হয়েছিলো?”
ব্যাগের স্ট্রাপটি আরও শক্ত করে চেপে ধরে মাথা নাড়লো আনন্দী। আঙুলের গিঁটগুলো সাদা হয়ে উঠেছে। বুকের ভেতরটা কেমন ধুকপুক করছে অস্বাভাবিক দ্রুত। জীবনের দ্বিতীয়বার পুলিশের সামনে বসে আছে সে।প্রথমবারটা ছিলো ২০২২ সালে।
যেদিন ডা. অভী ফারসিকে পুলিশের গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো।সেই রাতটার কথা মনে পড়তেই বুকের ভেতর হালকা মোচড় দিয়ে উঠলো আনন্দীর। হাসপাতালের করিডোর, সাদা আলো, মানুষের ফিসফাস আর অভীর শেষবার পিছনে ফিরে তাকানো সবকিছু এখনো দুঃস্বপ্নের মতো তাড়া করে বেড়ায় তাকে।

তবে আজকের পরিস্থিতি আলাদা।আজ অভী নেই।আজ সে একাই।সাব-ইন্সপেক্টর আকবর আলী একবার ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকাচ্ছে, তো আরেকবার আনন্দীর দিকে। চোখদুটো কেমন অনুসন্ধানী। যেন আনন্দীর নীরব মুখের আড়াল থেকে সত্যিটা টেনে বের করে আনতে চাইছে।আর আনন্দী?সে প্রায় জড়বস্তুর মতো চুপসে বসে আছে। ঠোঁট শুকিয়ে গেছে। গলার কাছে কাঁটার মতো কিছু আটকে আছে। ভিতরে যে কী ভয়ংকর তোলপাড় চলছে, সেটা শুধু সেই জানে। বাইরে থেকে তাকে শান্ত দেখালেও ভেতরে ভেতরে সে ভেঙে পড়ছে প্রতি সেকেন্ডে।
থানার ছোট্ট রুমটায় অদ্ভুত এক গুমোট গন্ধ। পুরোনো ফাইল, সিগারেট আর ধুলোর মিশ্রিত গন্ধে দমবন্ধ লাগছে আনন্দীর। মাথার উপর ধীরে ঘুরতে থাকা ফ্যানটাও যেন পরিস্থিতির ভার কমাতে পারছে না।
হঠাৎ টেবিলের উপর রাখা ফোনটা সামনে এগিয়ে দিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে আকবর আলী বললো,
“ফোনে তেমন কোনো টেক্সট বা ভয়েস কিছুই তো নেই ম্যাডাম”
সাব-ইন্সপেক্টরের কথা শুনে আপনাআপনি চোখ বড়ো হয়ে যায় আনন্দীর। মুহূর্তেই মুখের রঙ ফ্যাকাশে হয়ে আসে তার। কপাল বেয়ে ছোট ছোট ঘামের বিন্দু গড়িয়ে পড়তে থাকে। বুকের ভেতরটা এমন জোরে কাঁপছে যেন পাশের মানুষটাও শব্দ শুনতে পাবে।
ঠিক তখনই সাব-ইন্সপেক্টর আকবর আলী ধীরে ফোনটা ঘুরিয়ে আনন্দীর দিকে এগিয়ে ধরলেন।

“দেখেন তো ভালো করে।”
কাঁপা হাতে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই
থমকে গেলো আনন্দী।কোনো টেক্সট নেই।
একটাও না।পুরো কনভারসেশন ফাঁকা। যেন কখনো কোনো চ্যাটই ছিলো না সেখানে।
আনন্দীর নিঃশ্বাস আটকে আসে। সে অবিশ্বাস্য চোখে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে কয়েক সেকেন্ড। তারপর ধীরে ধীরে মাথা তুলে তাকায় আকবর আলীর দিকে। চোখেমুখে স্পষ্ট আতঙ্ক।
কারণ সে নিশ্চিত,একদম নিশ্চিত,থানায় আসার সময় সব মেসেজ ছিলো। প্রতিটা টেক্সট, ভয়েস নোট, এমনকি শেষ হুমকিটাও।তাহলে হঠাৎ সব গেলো কোথায়?
গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায় আনন্দীর। ঠোঁট নড়লেও প্রথমে কোনো শব্দ বের হয় না। কয়েক সেকেন্ড পর সাব ইন্সপেক্টর বললো,

‘’ দেখুন ম্যাডাম! এখন আধুনিক যুগ নারী অধিকার বেশি।তাই যে যখন পারছে মাম’লা দিয়ে দিচ্ছে।প্রেমিক চলে গেছে ধর্ষ’ণের মামলা। বিয়ে করছে ধ’র্ষণের মামলা। কেমন যেনো পানি ভাত হয়ে গেছে এই বিষয় গুলো।”
ইন্সপেক্টরের কথাগুলো শুনে আনন্দীর নিজের কাছেই নিজেকে কেমন নোংরা একটা মেয়েলোক মনে হতে লাগলো। বুকের ভেতর জমে থাকা অপমান ধীরে ধীরে বিষের মতো ছড়িয়ে পড়ছে পুরো শরীরে।
নিজের সম্মান নিয়ে কেউ মিথ্যা বলে?
কোন মেয়ে ইচ্ছে করে থানায় এসে নিজের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন উঠায়?তাহলে কেন তার কথা কেউ বিশ্বাস করছে না?নারী অধিকারের কথা চারদিকে এত বলা হয়,টিভিতে, সোশ্যাল মিডিয়ায়,
সভা-সেমিনারে। অথচ কিছুদিন পরপরই ভয়ংকর সব খবর আসে। কারও অভিযোগ চাপা পড়ে যায়, কেউ বিচার পায় না, কেউ আবার প্রমাণের অভাবে উল্টো দোষী হয়ে দাঁড়ায়।
আনন্দীর মনে হলো, এই রুমের ভেতরে বসে সে যেন ধীরে ধীরে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যাচ্ছে।
সে কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই পাশের চেয়ারটা টেনে কেউ বসে পড়ে।কর্কশ শব্দে চেয়ার ঘষা খেতেই পাশ ফিরে তাকায় আনন্দী।

আর তাকিয়েই পিলে চমকে ওঠে।অভী।মুহূর্তেই হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসে আনন্দীর। চোখ বড়ো বড়ো হয়ে যায়। সে এখানে কী করছে?
কিন্তু তার চেয়েও ভয়ংকর ছিলো পরের মুহূর্তটা।
কারণ কিছু সেকেন্ড পরই ইন্সপেক্টর আর অভীর কথোপকথন কানে আসতে শুরু করে।
আর প্রতিটা শব্দ যেন ধারালো ছুরির মতো এসে বিঁধতে থাকে আনন্দীর বুকে।ইন্সপেক্টর ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি টেনে বললো,
“চাঁদ ভাই, এসব প্রাইভেট ম্যাটার ঘরে সলভ করাই ভালো। হাজার হইলেও কৃষ্ণ দাসের মতো লোক আপনার পাতানো বাবা। একটা সম্মান তো আছে, না-কি?”
কথাটা শুনে আনন্দীর বুকের ভেতর ধপ করে ওঠে।চাঁদ ভাই?তাহলে, তারা আগে থেকেই পরিচিত?ইন্সপেক্টরের সাথে তাল মিলিয়ে শান্ত, নির্লিপ্ত কণ্ঠে অভী বললো,

“এসব বাইরের আবর্জনা বিছানা অব্দিই সীমাবদ্ধ থাকে। ঘরে কাম নাই।”
শব্দগুলো শুনে মনে হলো কেউ যেন আনন্দীর আত্মসম্মান মাটিতে ফেলে পিষে দিচ্ছে।
বাইরের আবর্জনা।এই একটা শব্দই যথেষ্ট ছিলো তাকে ভেতর থেকে শেষ করে দেওয়ার জন্য।
ফুপিয়ে কেঁদে ওঠে আনন্দী। চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে পৃথিবীর সব দরজা তার জন্য বন্ধ হয়ে গেছে।
টাকার কাছে আইন বিক্রি হয়ে গেলে সেখানে আর কী বলার থাকে?কাঁপা হাতে ব্যাগটা কাঁধে তুলে নেয় সে। একবারও অভীর দিকে তাকায় না। তাকানোর সাহসও হয় না।
পরের মুহূর্তেই প্রায় দৌড়ে থানা থেকে বেরিয়ে পড়ে আনন্দী।পেছন থেকে কেউ ডাকছে কি না, সেটা শোনার মতো অবস্থাতেও নেই সে। বাইরে বের হতেই রাতের ঠান্ডা বাতাস মুখে লাগে। কিন্তু তাতেও বুকের আগুন কমে না।
শুধু একটা কথাই বারবার কানে বাজতে থাকে
“বাইরের আবর্জনা…”

কিছু দূরে দ্রুতগতিতে একটা গাড়ি আসতে দেখে থমকে দাঁড়ায় আনন্দী। চোখ দুটো কান্নায় ঝাপসা। বুকের ভেতর জমে থাকা ব্যথাগুলো যেন আর সহ্য হচ্ছে না তার।এভাবে আর কত?আর কত অপমান, ভয়, বিশ্বাসঘাতকতা?মনের ভেতর হঠাৎই এক অদ্ভুত শূন্যতা নেমে আসে। যেন সব অনুভূতি নিঃশেষ হয়ে গেছে।
দূর থেকে আসা গাড়িটার হেডলাইট চোখে পড়তেই ধীরে ধীরে রাস্তার মাঝখানে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে আনন্দী।তারপর?তীব্র ব্রেকের শব্দ।
মানুষের চিৎকার।আর সবকিছু অন্ধকার।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল প্রায়। হাসপাতালের কেবিনে হালকা স্যালাইনের গন্ধ ছড়িয়ে আছে। জানালার ফাঁক দিয়ে আসা কমলা আলো বিছানার সাদা চাদরে পড়ে এক ধরনের নিস্তব্ধতা তৈরি করেছে।
হাতে স্যালাইন চলছে আনন্দীর। কপালের একপাশে ছোট ব্যান্ডেজ। বেশ কিছুটা রক্ত গিয়েছিলো, তবে ভাগ্য ভালো।বড় কোনো ক্ষতি হয়নি।
বেডের পাশে বসে ঘড়ির দিকে তাকায় ইন্সপেক্টর রেহমান। কয়েক মিনিট পরপর ফোন স্ক্রল করছে সে। কিন্তু একই জায়গায় এতক্ষণ বসে থাকা তার স্বভাবে নেই। ধৈর্য জিনিসটার সাথে তার সম্পর্ক বরাবরই খারাপ।

ইন্সপেক্টর রেহমান। বয়স ছাব্বিশ।সৎ, বদরাগী এবং ভয়ংকর জেদি একজন অফিসার।মোটামুটি ভালো পজিশনে আছে সে। তবে চাকরির এই অল্প সময়েই চৌদ্দটা জেলার বদলি খেয়ে ফেলেছে। কারণ একটাই।যেখানেই যায়, সেখানকার পচে যাওয়া সিস্টেমে আগুন লাগিয়ে আসে।
কয়েক মাস আগেই রাজশাহীর বড় একটা নারী পাচারকারী চক্র ধরার জন্য পুরস্কার পেয়েছে সে। অপরাধীদের প্রতি তার কোনো সহানুভূতি নেই। তার মাথায় সবসময় একটাই কথা ঘোরে।অপরাধীকে ধরো, থানায় ভরো।
তার রাগটাই যেন তার সবচেয়ে ভয়ংকর অস্ত্র। উচ্চতায় পাঁচ ফুট নয় ইঞ্চি হলেও মেজাজের উচ্চতা যেন লাখ ফুট।তবে ইদানীং তার মাথা সবচেয়ে বেশি গরম করে রেখেছে পুরান ঢাকার একটা অদৃশ্য সিন্ডিকেট। যতবারই রেইড দিয়েছে, ততবারই খালি হাতে ফিরতে হয়েছে। যেন কেউ আগেভাগেই খবর পেয়ে যায়।
আর তার টার্গেট লিস্টের এক নম্বরে আছে দুটো নাম।অভী চাঁদ,আর আফলা ব্রো ওরফে জুলফিকার।দুজনই ভয়ংকর ধূর্ত।উপর মহলের হাত আছে তাদের মাথার উপর। প্রমাণ ছাড়া তাদের ছোঁয়াও যায় না।এই একটা ব্যর্থতাই রেহমানের মাথা ঠান্ডা হতে দেয় না।
ধৈর্যের যখন প্রায় শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে সে, ঠিক তখনই বেডে শুয়ে থাকা আনন্দী ধীরে ধীরে চোখ খুলে।কিছু সেকেন্ড ঝাপসা দৃষ্টিতে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে সে। তারপর কষ্ট করে মাথা ঘুরাতেই চোখ পড়ে রেহমানের উপর।
দুজনের চোখাচোখি হতেই রেহমান চেয়ার থেকে সোজা হয়ে বসে।তারপর ঠান্ডা গলায় বলে উঠলো,

“ এতো কম বয়সে কেউ মরতে যায় স্টুপিড? বয়স কত তোমার?”
অপরিচিত লোকের থেকে এমন কর্কশ গলা শুনে চোখে পানি চলে আসে আনন্দীর। এভাবে কেউ বকে? আনন্দীকে ভয় পেতে দেখে নিজের রাগ কন্ট্রোল করে রেহমান বললো,
“ ওকে, কুল ডাউন! বাড়ি কোথায়?”
জনপূর্ণ রাস্তায় পুলিশের গাড়িতে বসে বাড়ি ফিরছিল আনন্দী। শহরের ব্যস্ততা তখনো থামেনি হর্নের শব্দ, মানুষের কোলাহল, ফুটপাতে ছুটে চলা অচেনা মুখগুলো সব যেন ঝাপসা লাগছিল তার কাছে। গাড়ির জানালার পাশে মাথা ঠেকিয়ে নিশ্চুপ হয়ে বসেছিল সে। চোখদুটো লালচে, ক্লান্ত। মনে হচ্ছিল আজকের দিনটা তাকে কয়েক বছর বুড়িয়ে দিয়েছে।
বাড়ি থেকে একটু দূরে আসতেই হঠাৎ নিচু স্বরে বলে ওঠে আনন্দী,

“গাড়িটা এখানে থামান। আমি চলে যেতে পারবো।”
স্টিয়ারিংয়ে থাকা ইন্সপেক্টর রেহমান একবার তার দিকে তাকায়। চোখে বিরক্তি থাকলেও কোথাও যেন অদ্ভুত এক চিন্তা লুকিয়ে ছিল। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে শুধু ছোট্ট করে বলে,“হুঁ।”
গাড়ি থামতেই দরজা খুলে ধীরে ধীরে নেমে আসে আনন্দী। শরীরটা এখনো দুর্বল। হাতে ব্যান্ডেজ, হাঁটার ভঙ্গিতেও ক্লান্তি স্পষ্ট। তবু নিজেকে শক্ত রাখার বৃথা চেষ্টা করছে সে।

উন্মাদনা পর্ব ১৮

দরজা বন্ধ করে একবার পিছনে তাকায় আনন্দী। রেহমান তখনো গাড়ির ভেতর বসে তার দিকেই তাকিয়ে। সেই দৃষ্টিতে রাগ আছে, বিরক্তি আছে।আবার অদ্ভুত এক স্বস্তিও আছে মেয়েটা অন্তত বেঁচে আছে।
আনন্দী আর কিছু না বলে হাঁটা শুরু করে। রাস্তার বাতির হলুদ আলো তার ছায়াটাকে লম্বা করে ফেলেছে।কিছুক্ষণ তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে রেহমান। তারপর সিটে হেলান দিয়ে নিচু গলায় বিরক্ত স্বরে বলে ওঠে,_“স্টুপিড!”

উন্মাদনা পর্ব ২০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here