Home উপসংহারে তুমি সিজন ২ উপসংহারে তুমি সিজন ২ পর্ব ৭

উপসংহারে তুমি সিজন ২ পর্ব ৭

উপসংহারে তুমি সিজন ২ পর্ব ৭
রুহানিয়া ইমরোজ

ঘটনার আকস্মিকতায় চমকে গিয়েছিল সবাই। থম থমে দৃষ্টিতে দেখছিল নাওয়াফের শক্তপোক্ত বুকে পড়ে থাকা চিত্রাকে। কাব্য নিজেই বড়সড় হা করে গিলছিল দৃশ্যটা। বহিরাগত কোনো মেয়েকে নাওয়াফ ছুয়েছে ; একথা খানা হজমই হচ্ছিল না। চোখ ডলে পুনরায় একই দৃশ্য দেখে তার বুক চিনচিন করে ওঠে। মাথা ঝিমঝিম করতে থাকে। মনে হয় সেও ঢলে পড়বে সরজমিনে। তখনই শোনা যায় ভূমিকার ধমক,
-“ ওকে ধরে দাঁড়িয়ে আছিস কেনো? বেঞ্চে শুইয়ে দে। কেউ পানি নিয়ে আয় তো। দেখি..
বলে চিত্রাকে ছুঁতে গেলে নাওয়াফ ঘোরাচ্ছন্ন থমথমে গলায় বলে,

-“ সাংঘাতিক জ্বর এসেছে। হার্টবিট অনেক ফাস্ট, আই গেস হসপিটালে নেওয়াটা বেটার হবে।
ভূমিকার কপালে ভাঁজ পড়ে। ও চপল পায়ে এগিয়ে এসে চিত্রার হাত ছোঁয় কারণ মুখবিবর তো নাওয়াফের শক্ত পোক্ত বুকে লুকিয়ে আছে। শরীরের তাপমাত্রা দেখে সে নিজেও চমকে গিয়ে কাব্যকে বলে,
-“ গাড়ি বের কর , ওরে ইমিডিয়েট মেডিকেলে নিতে হবে। কি যে করে ইডিয়টটা..
রাগী স্বরে কথাগুলো বললেও তার চোখেমুখে চিন্তিত ভাবটা স্পষ্ট। অথচ চলতি পথে মৃত মানুষকে দেখেও নির্বিকার থাকে ভূমিকা। চিত্রার প্রতি তার সহমর্মিতা দেখে আরেকদফা চমকাল কাব্য। ও জোকার হলেও বোকা নয়। সাংঘাতিক চালাক বলেই নাওয়াফের মতো ধূর্ত লোকের সহচারী হতে পেরেছে। ক্ষুদে অস্বাভাবিক বিষয়গুলো তার নজর এড়িয়ে যায় না। এবারও তেমনটাই হলো। পরপর দু’টো ঝটকা খেয়ে কাব্য পুরো সিরিয়াস মুডে চলে গেল। ভূমিকার কথায় দৌড় দিলো পার্কিং লটের দিকে।

আর দেরি করা ঠিক হবে না ভেবে ভূমিকা এগোতে নিল চিত্রাকে ধরার জন্য। ঠিক তখুনি তার পাখির পালকের ন্যায় হালকা শরীরটাকে কোলে তুলে ধপাধপ্ পা ফেলে বেরিয়ে গেল নাওয়াফ৷ ঠিক এ পর্যায়ে সকলে বিস্মিত চোখে চাইল কেননা চিত্রাকে কোলে নেওয়ার মাঝে মার্জিত ভাবের বদলে ফুটে উঠেছিল তীব্র অধিকারবোধের প্রতিচ্ছবি। অদ্ভুত কান্ড, কেউ বিশ্বাসই করতে পারছে না এখনো। ভূমিকাও দু মিনিট মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে ফ্লোরে পড়ে থাকা চিত্রার একটা স্লিপার হাতে তুলে নিহার দিকে তাকিয়ে বলে,
-“ ক্লাসে যাও। কাউকে কিছু বলবে না এই ব্যপারে৷ ও একটু সুস্থ হলে কলেজ আসবে৷
ভয়ের কারণে কথা বাড়ানোর সাহস পায় না নিহা কিন্তু ওর বুক পুড়তে থাকে চিত্রার জন্য। ভূমিকা একপ্রকার দৌড়ে যায় নিচের দিকে। ঘরটায় কেবল থাকে নুসাইবা এবং তার বন্ধুরা। মার খেয়ে তার অবস্থাও কাহিল৷ জ্বর ও নেহাত কম নয় কিন্তু পরপর ঘটে যাওয়া ঘটনাক্রমে হুঁশ হারিয়ে ফেলেছে ও। থরথরিয়ে কাঁপছে শরীর। বুক পুড়ছে বিরহে। নিজেকে সামলাতে না পেরে সেও ছুটে যায় মেডিকেলে। যে করেই হোক, নাওয়াফকে বোঝাতে হবে, ও দোষী নয়।

চিত্রাকে হসপিটালে আনার পর বাঁধল আরেক বিপত্তি। তার লম্বাটে চুলের বেশ কিছু অংশ কঠিন ভাবে পেঁচিয়ে গেল নাওয়াফের শার্টের বোতামের সাথে। কোনোভাবেই ছুটানো গেল না তৎক্ষনাৎ। অবশ্য নাওয়াফের মধ্যে কোনো সংকোচ দেখা গেল না। মনে হলো ভেতরে যেতে আপত্তি নেই তার। ফলস্বরূপ নাওয়াফ সমেতই কেবিনে নেওয়া হলো চিত্রাকে।
অদ্ভুত ভাবে খ্যাপাটে স্বভাবের নাওয়াফ আজ একটুও রাগ কিংবা বিরক্তি প্রকাশ করছে না। থম মেরে আছে কেবল। ভূমিকা চিন্তিত মুখে বসে আছে ওয়েটিং জোনে। আচমকা এই মেয়ের শরীর ঠান্ডা হয়ে যাওয়ার কারণ বুঝতে পারছে না। ক্ষণিকের মধ্যেই চিত্রার চেহারার রঙ কেমন ফ্যাকাসে বর্ণ ধারণ করেছিল। ব্যথার চোটে কাতরাচ্ছিল রীতিমতো। হসপিটালে নিতে দেরি হওয়ায় পথিমধ্যে পুরোপুরি সেন্স হারায় বেচারি।
সবাই চিত্রাকে নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও নুসাইবা এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে কেবিনের বদ্ধ দরজার দিকে। হিংসাত্মক দাবানলে জ্বলে পুড়ে আঙ্গার হয়ে যাচ্ছে তার বুকের ভেতরটা। চিত্রাকে কোলে তুলে হসপিটালে আনা এবং তার সাথে ভেতরে যাওয়ার দৃশ্যটা অসহ্য রকমের যন্ত্রণা দিচ্ছে নুসাইবাকে। সেটুকুই দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করলেও পরবর্তী দৃশ্যটা ভেতর থেকে তছনছ করে দিল মেয়েটাকে।

চিত্রার হার্ট স্বাভাবিকের তুলনায় দ্রুত বিট করছে৷ সেই সাথে কমছে শরীরের তাপমাত্রা। মেয়েটা অস্থির চিত্তে গোঙাচ্ছে। ডক্টরেরা নানা ভাবে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করছে কিন্তু কিছু হলে তো! সবাইকে ব্যর্থ হতে দেখে নাওয়াফ কি মনে করে চিত্রার মাথাটা সামান্য উঠিয়ে নিজের বুকে চেপে ধরে। এক হাত তার গালের উপর রেখে কানের কাছে মুখ নিয়ে কিছু একটা বলতে থাকে৷ আর নাওয়াফের এহনও কাজে চিত্রাও আস্তে ধীরে শান্ত হয়ে আসে চিত্রা। নাওয়াফ বুকের মধ্যে চিত্রাকে আগলে নিয়ে আলতো করে তার পিঠে চাপড় দিতে থাকে। ওর উষ্ণতায় আরাম পেয়ে গভীর ঘুমে তলিয়ে যায় চিত্রা।
পঁয়ত্রিশ মিনিট ধরে চলমাম দৃশ্যখানা দেখে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না নুসাইবা। শক্তি ফুরিয়ে আসে তার শরীরের। কোনোমতে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রাখিকে বলে,
-“ আমাকে বাড়ি নিয়ে চল..।
রাখিও কোনোকিছু না বলে তার আদেশ পালন করে। ওদের দু’জনকে বেরিয়ে যেতে দেখেও কিছু বলে না ভূমিকা। এদের বিচার তো পরে করবে। রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে জ্বালানোর উপযুক্ত শাস্তি দিয়ে তবেই ছাড়বে। খুব বাড় বেড়েছে। এবার পাখনা ছাটাই করতে হবে।ভার্সিটি কারও বাপের জায়গা নয়। আর না তো কেউ কারো পয়সায় চলে। অন্যায়ভাবে গায়ে হাত দিলে সেটার জবাব অবশ্যই পেতে হবে। এসব ভেবে রাগে ফুঁসতে থাকে ভূমিকা৷
এরমধ্যে কাব্য হাজির হয় মেডিসিন নিয়ে। নার্সের হাতে প্যাকেটগুলো বুঝিয়ে দিয়ে ধপ করে ভূমিকার পাশে গিয়ে বসে এরপর আফসোস মাখা গলায় বলে,

-“ বেডি মানুষ মানেই ভেজাল।
ভূমিকা চেতে যায় তার কথায়। দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
-“ তাহলে কলা গাছের সাথেই বিয়ে বসিস।
কাব্য বিরক্তিতে চ সূচক শব্দ করে বলে,
-“ পারলে তো হতোই রে। কলা গাছ অন্তত টাকার ভুক্ষা হতো না। মেয়ের বাবাদের মতো ব্যাংক ব্যালেন্স দেখতে চাইতো না।
কাব্যর অতীত জানে ভূমিকা। তার এমন কথা বলা একদিক দিয়ে যৌক্তিক তবুও উচিত কথা বলা থেকে নিজেকে আর আটকাতে পারল না। কন্ঠে তাচ্ছিল্য মিশিয়ে বলল,
-“ বিয়ের সময় তোরা মেয়েদের মাথা থেকে পা পর্যন্ত পরীক্ষা করবি, অথচ তারা ছেলের ব্যাংক ব্যালেন্স দেখলেই পাপী ? আলটিমেটলি ওটাই তো আমাদের মেইন সিকিউরিটি কারণ তোদের তো এক মানুষ বেশিদিন ভাল্লাগে না, মত পরিবর্তন হয়, চাহিদা পাল্টায়..
কাব্য বিপরীতে বলার মতো কিছু খুঁজে পেল না। ভূমিকার সাথে তর্কে যাওয়া মানে হেরে লাট্টু হওয়া। এসময়ে মোটেও এমনকিছু চাইছে না তাই লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কথা ঘোরাতে বলল,

-“ বাদ দে সেসব। ভাইয়ের ব্যপারটা খেয়াল করেছিস?
ভূমিকার মুখটা থমথমে হয়ে গেল। খানিকক্ষণ নিরব থেকে অতঃপর বলল,
-“ হুঁ! খুব সম্ভবত..
কাব্য ভ্রু উঁচিয়ে শুধাল,
-“ কী?
ভূমিকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে খুব ধীর স্বরে বলল,
-“ প্রিয়াঙ্কার সাথে অনেক মিল আছে চিত্রার। তাই হয়তো ঘোরের বশে নাওয়াফ এতটা বিচলিত হয়েছে। হুঁশ ফিরলেই আগের মতো হয়ে যাবে..
প্রিয়াঙ্কা নামটা শুনতেই তব্দা খেয়ে গেল কাব্য। শরীর ঝাঁকি দিয়ে উঠল তার। শক্ত হয়ে এল চোয়ালের পেশি৷ নোনাজল উঁকি দিল অক্ষিকোটরে। বোধ হল কেউ তার কলিজা খাবলে ধরেছে। ভূমিকা নিজেও চুপ হয়ে গেল। এই একটা মানুষের প্রসঙ্গ উঠলে কেউই নিজের মধ্যে থাকে না অথচ সবকিছু এখন কেবলই অতীত। মানুষটার অস্তিত্ব নেই কিন্তু স্মৃতির পাতায় সে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।
বহুকষ্টে নিজেকে সামলায় কাব্য। কারও সামনে নিজের দুর্বল সাইডটা প্রকাশ করতে পছন্দ করে না ও। অতীত নিয়ে গবেষণা করা বোকামি বৈ কিছু না। পরপর দু’টো ঢোক গিলে নিজেকে স্বাভাবিক করে মজার সুরে ভূমিকাকে বলে,

-“ ভাই, জেরক্স কপি পেয়ে আবার পাগল না হয়ে যায়।
ভূমিকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জবাব দেয়,
-“ নাওয়াফ শিকদারের নজরে পড়েছে। এত সহজে নিস্তার পাবে বলে মনে হয় তোর?
কাব্য রিয়েলিস্টিক মানুষ। ফিল্মি চিন্তাধারা তার আসে না। তাই অযথা নাটকীয় প্রেডিকশন করতে গেল না।সোজাসাপ্টা বলল,
-“ মিল থাকতেই পারে কিন্তু মানুষটা তো ভিন্ন। দুধের স্বাদ কি আর ঘোলে মিটে? ভাই এতটা অবুঝ না। তুই চিন্তা করিস না।
কিছুটা শান্তি পেল ভূমিক কিন্তু খচখচানিটা রয়ে গেল। তার সিক্সথ সেন্স বলছে, ব্যপারটা এত সহজে সমাধান হবার নয়। তবুও প্রার্থনা করছে, যেন আর কোনো ঝামেলায় না জড়াতে হয় মেয়েটাকে। বলা বাহুল্য, প্রিয়াঙ্কার সাথে মিল থাকায় সে ও কিঞ্চিৎ দুর্বলতা অনুভব করে চিত্রার প্রতি। এমনকি এখন অব্দি তার সমস্ত কথা বিনাবাক্যে মেনে নেওয়ার কারণও এটাই। তবে, মেয়েটার সরলতা ভূমিকার মন ছুঁয়ে গেছে।

উপসংহারে তুমি সিজন ২ পর্ব ৬

চিত্রাকে আগলে রাখতে চায় সে। কারণ দুজনেরই কেউ নেই। আর এই পৃথিবীটা এতিমের জন্য নির্মম। ভূমিকা যেসব দেখে শুনে বড় হয়েছে সেসব কিছুর আঁচ পেতে দিতে চায় না চিত্রা কে। দুদিনেই কেমন মায়া বসিয়ে ফেলেছে মেয়েটা। ভূমিকা না চাইতেও তার চিন্তা করতে বাধ্য হচ্ছে। আপনমনে ভাবনায় ব্যস্ত ভূমিকার ধ্যান ভাঙে রক্তমাখা শার্ট পরে চিত্রার বেরিয়ে আসা নাওয়াফের দিকে চেয়ে৷
ওর বিবর্ণ মুখবিবর দেখে কলিজা কেঁপে উঠে তার। হুট করে চোখের পাতায় ভেসে উঠে সাদা কাফনে মোড়ানো প্রিয়াঙ্কার লাশের চিত্র। তাহলে কি চিত্রাও..?

উপসংহারে তুমি সিজন ২ পর্ব ৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here