এই অবেলায় পর্ব ৪৭ (২)
সুমনা সাথী
নিযানার বুকের ভেতরটা আশঙ্কায় দুলতে শুরু করল।কপালে স্পষ্ট চিন্তার সূক্ষ্ম ভাঁজ। সে শঙ্কিত ত্রস্ত চোখে চাইল কলরবের পানে। কিন্তু তাকে কিছু ভাবার বা পালানোর বিন্দুমাত্র সুযোগ না দিয়ে চোখের পলকে এগিয়ে এলো কলরব। ঝুঁকে এলো নিযানার তপ্ত মুখের ওপর। নিজের শক্তপোক্ত একহাতের আঙুলগুলো দিয়ে সজোরে চেপে ধরল নিযানার নরম গাল। নাহ, সেই ছোঁয়ায় আজ কোনো সুপ্ত মমতা নেই। যা আছে তা কেবলই তীব্র হিংস্রতা। আকস্মিক সেই ব্যথায় নিযানার চোখ-মুখ কুঁচকে গেল। নিযানার মুখের ওপর আছড়ে পড়ল কলরবের তপ্ত নিঃশ্বাস আর ক্রুদ্ধ গলা,
“কতদিন হলো ছেড়েছি তোকে, হ্যাঁ? মোটে তিনদিন? পাঁচদিন? নাকি সাতদিন? এর মধ্যেই নিজের জন্য আরেকজন জুটিয়ে ফেলেছিস? এত বড় দুঃসাহস তুই কীভাবে করলি নিযানা? আমার বুকে দাঁড়িয়ে অন্য কারও হাত ধরার সাহস তোর হলো কী করে?”
নিযানা যন্ত্রণার মাঝেই নিজের সর্বশক্তি দিয়ে কলরবের শক্তপোক্ত বুকে ধাক্কা দিল তাকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু কলরবের ভারী শরীরটাকে সে এক চুলও নড়াতে পারল না। তবু সে দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। অপমানে আর অভিমানে নিজের কাজল-চোখ দুটো সটান তুলে রাখল কলরবের রক্তবর্ণ চোখের ওপর। জেদি গলায় প্রত্যুত্তর করল,
“বেশ করেছি! কেন করব না? আমি বেঁচে থাকি না মরে যাই, কিংবা সোজা জাহান্নামে যাই। তাতে তোমার কী এসে যায়? তোমার কী যায় আসে কলরব?”
কলরব নিথর হয়ে গেল কয়েক সেকেন্ডের জন্য। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। এরপরই তার চোয়াল ঘেঁষে তীক্ত একটা হাসি ফুটে উঠল। দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
“আমার কী যায় আসে? আমাদের কি ডিভোর্স হয়ে গেছে, নিযানা? বল না, হয়ে গেছে ডিভোর্স? এখনো কাগজগুলোয় আমার সই পড়েনি। আর আইনত তুই এখনো আমার স্ত্রী। তোর জন্য আমি ছাড়া এই পৃথিবীর প্রতিটা পুরুষ এখনো পরপুরুষ! নিজের স্বামী জীবিত থাকতে তুই অন্য কাউকে বিয়ে করার কথা ভাবছিস? আরে, স্বামী মরলেও তো একটা মেয়েকে কয়েকমাস অপেক্ষা করতে হয়। আর তুই? এটাকে কী বলে যায় তো?”
ইঙ্গিত বুঝতে সময় লাগলো না নিযানার। সইতে না পেরে চিৎকার করে উঠল,
“কলরব!”
“কী কলরব? ভুল কিছু বলেছি আমি?”
“ছাড়ো আমাকে! বলছি হাত সরাও নিজের!”
নিযানার ছটফটানি দেখে কলরব নিজের আঙুলগুলোর চাপ আরেকটু বাড়িয়ে দিয়ে তার মুখের আরও কাছে ঝুঁকে এলো। যেন তার ঠোঁট দুটো নিযানার কানের লতি স্পর্শ করবে। অত্যন্ত শান্ত গলায় বলল,
“কী বললি? জোরে বল, আমি ঠিক শুনতে পাচ্ছি না।”
নিয়ানার শরীরটা রাগে, ক্ষোভে আর অপমানে আরও একবার ছটফট করে ওঠে। সে নিজের সর্বশক্তি দিয়ে কলরবের বুকের ওপর ধাক্কা মারতে মারতে তীব্র গলায় চেঁচিয়ে ওঠে,
“কেন করছ এমন? তুমিই তো আমাকে ছেড়ে দিয়েছ, তাই না? তবে এখন আবার এই অধিকার দেখাতে আসছ কেন? আমি অন্য কাউকে বিয়ে করি, কিংবা যাকে খুশি তাকে নিজের জীবনে জড়িয়ে নিই। সেটা যদি অভি….!”
নিযানা তার বাক্যটি আর শেষ করতে পারে না। তার আগেই অত্যন্ত আকস্মিক আর ক্ষিপ্র গতিতে তার অবাধ্য ঠোঁট জোড়া রুদ্ধ হয়ে যায় কলরবের পুরুষালি ঠোঁটের রুক্ষ স্পর্শে। এই স্পর্শে কোনো মার্জিত প্রেম নেই। আছে অবাধ্যতা। হিংস্রতায় মোড়ানো অধিকারবোধ। নিযানা কষ্টে, অপমানে ছটফট করে ওঠে। নিজের শেষ শক্তিটুকু দিয়ে নিজেকে ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে, কিন্তু কলরবকে একচুল ও সরাতে পারেনা। উল্টো, নিযানার অবাধ্য হাত দুটোকেও কলরব এক ঝটকায় নিজের শক্ত এক মুঠোয় বন্দী করে বিছানার ওপর চেপে ধরে। দম বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হয় নিযানার। বেশ কিছুটা সময় পর যখন কলরব নিযানার ঠোঁট ছেড়ে দেয়, ততক্ষণে নিযানা ক্লান্ত ও নিস্তেজ হয়ে শান্ত হয়ে এসেছে। কলরব নিজে বারকয়েক জোরে জোরে তপ্ত নিশ্বাস ফেলে তাকায় বিছানায় শুয়ে থাকা রমণীর পানে। নিযানার চোখ দুটো এখন শক্ত করে বোজা। বুকটা ঘন ঘন ওঠানামা করছে তীব্র শ্বাসের ওঠানামায়। চোখের নোনা জলে ভিজে একাকার হয়ে গেছে তার দুই গাল। ঠোঁটের ওপর নিখুঁত কারুকাজে মাখা লিপস্টিকটা লেপ্টে গেছে চারধারে। কিন্তু নিযানার এই জরাজীর্ণ, বিধ্বস্ত রূপ দেখেও কলরবের মনে বিন্দুমাত্র আফসোসের উদয় হয় না। বরং তার ভেতরের তীব্র ঈর্ষা আর আক্রোশ আরও দ্বিগুণ বেগে জ্বলে ওঠে। নিজের একটা হাত দিয়ে ঠোঁটের কোণটা মুছে নিয়ে, দাঁতে দাঁত পিষে ক্রুদ্ধ গলায় বলে,
“কী যেন বলেছিলি তুই? ওওও-ভি? আমি জানতাম, পড়াশোনাই নাকি তোর জীবন? তোর স্বপ্ন? তোর বেঁচে থাকার একমাত্র কারণ? ওটা কেড়ে নিলে নাকি তুই বেঁচে থেকেও মরে যাবি? আজ কোথায় গেল তোর সেই সব বড় বড় বাণী? তোর জীবনের লক্ষ্য তো কখনোই বিয়ে করা ছিল না! তুই না উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বাইরে যেতে চেয়েছিলি? সেখানকার কোনো এক নামকরা ইউনিভার্সিটিতে পড়তে চেয়েছিলি? কোথায় গেল আজ তোর সেই আকাশছোঁয়া স্বপ্ন? আর তার মাঝখানে হুট করে কোথা থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসল এই সংসার, বিয়ে… আর ওই অভি… অভিনব?”
অভিনবের নামটা উচ্চারণ করতে গিয়ে রাগে কণ্ঠ আটকে যায় কলরবের। নিযানা আলতো করে নিজের চোখের ভারী পাতা দুটো মেলে তাকায়। চার চোখের এক নিবিড়, জ্বলন্ত মিলন ঘটে। নিযানার শরীরটা তখনো প্রচণ্ড রাগ থরথর করে কাঁপছে। কলরবের মুখে এই নীতিবাক্য আর কর্তৃত্ববাদী কথাগুলো তার কাছে চরম বিরক্তিকর আর হাস্যকর ঠেকছে। নিজেকে এই ছেলেটা ভাবেটা কী আসলে? নিযানা কি ওর হাতের কোনো খেলনা বা পুতুল। যাকে ও নিজের খেয়ালখুশি মতো যখন ইচ্ছে ছুড়ে ফেলবে আর যখন ইচ্ছে আবার বুক পকেটে পুরে রাখবে? আচমকাই ঘরের নিস্তব্ধতা ভেঙে খিলখিল করে শব্দ করে হেসে ওঠে নিযানা। তার এই অদ্ভুত অসময়ের হাসিতে কলরব কিছুটা চমকে যায়। তার ভ্রু কুঁচকে ওঠে। নিযানা তার চোখ জোড়ায় একরাশ অবহেলা আর তাচ্ছিল্য ফুটিয়ে বলে,
“কেন বলো তো? তোমার কি খুব কষ্ট হচ্ছে, কলরব? নাকি তীব্র আফসোস হচ্ছে বুকের ভেতর? কিন্তু কেন? আমি অন্য কারও হয়ে গেলে, অন্য কাউকে নিজের স্বামী বলে মেনে নিলে তোমার কীসের এত রাগ? তুমি তো আমাকে কোনোদিন ভালোই বাসোনি। এখনো বাসোনা। কোনোদিন নিজের স্ত্রী বলে মনেপ্রাণে স্বীকারও করোনি। তাহলে আজ এই অধিকার দেখানো কেন?”
কলরব তেমন সময় নেয়না। নিযানার মুখাবয়বের একদম কাছাকাছি ঝুঁকে আসে। তপ্ত গলায় বলে,
“হ্যাঁ! স্বীকার করছি আমি তোকে ভালোবাসি না! কিন্তু! কিন্তু তুই আমার! তুই আমারই ছিলিস। আজকেও আমারই আছিস আর ভবিষ্যতেও শুধু আমার হয়েই থাকবি! ব্যাস। এর বাইরে আর কোনো কারন আমি জানিনা। জানার ইচ্ছা ও প্রকাশ করছিনা।”
নিযানা ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি, “আজ এতদিন ধরে অবহেলা করে এসেছ কারণ তুমি আমাকে নিজের একটা খেলনা ছাড়া আর কিছুই ভাবোনি। কিন্তু জেনে রেখো, খেলনারও ভাঙার পর তা দিয়ে আর খেলা যায়না। আমিও মানুষ, কলরব। অনেক সহ্য করেছি আমি, কিন্তু আর এক মুহূর্তও না। এমন একটা ভালোবাসাহীন, জঘন্য সম্পর্কের খাঁচায় আর সবচেয়ে বড় কথা, তোমার মতো একটা মানুষের সাথে আমি আর এক সেকেন্ডও থাকতে চাই না!”
“চলে গিয়ে দেখা!”
“তুমি এভাবে আমার ওপর জোর খাটাত পারো না!”
“পারি! পারি! আমি সব পারি! তোর ওপর জোর খাটানোর অধিকার আমার জন্মগত!”
“কেন? কীসের জোরে তুমি আমার ওপর এই অন্যায় জোর খাটানোর স্পর্ধা পাও, কলরব? কোন অধিকারে?”
নিযানা পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইল। তার সেই চশমাছাড়া কাজল-চোখের অবাধ্য ও ভেজা চাউনির নিচে কলরব মুহূর্তের জন্য তীব্র এক অস্বস্তি ও বিব্রতবোধ অনুভব করল। নিজের ভেতরের এই অপ্রস্তুত ভাবটা চাপা দিতে সে পরক্ষণেই অবলীলায় তার কণ্ঠস্বরকে স্বাভাবিক ও কঠিন করে বলল,
“তোর যখন পড়াশোনার শখ এত তাড়াতাড়ি মিটেই গেছে, তবে তো ভালোই। যদি জীবনের শেষমেশ সংসার করার শখ জেগে থাকে মনে, তাহলে সেই সংসারটা আমার সাথেই হবে।একমাত্র আমার সাথে। ঢুকেছে মাথায়? মাঝখানে কোনো অভিনব, ববিনব বা অন্য কোনো বালছাল আসবে না। এক মিনিট…!”
কথাটা বলতে বলতেই কলরবের নজর গেল নিযানার হাতের দিকে। সে ঝটকা দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। নিযানার একটা হাত নিজের শক্ত মুঠোয় পুরে নিয়ে গভীর মনোযোগে ভ্রু কুঁচকে চেয়ে রইল ওটার দিকে। মিনিটখানেক পর তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। চোখ দিয়ে যেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ছিটকে বের হতে চাইল। তীব্র গলায় বলল,
“ছুঁয়েছিলিস ওকে? আমার চোখের সামনেই তুই অন্য একটা পুরুষের বাহু জড়িয়ে ধরেছিলিস? ইচ্ছা তো করছে তোকে এখনই…! চল আমার সাথে।”
নিযানাকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে, একপ্রকার জোর করে বিছানা থেকে টেনে নামাল কলরব। তার কোনো আপত্তি, কোনো বাধা ধোপে টিকল না। কলরব তাকে টেনে নিয়ে গিয়ে থামল ওয়াশরুমের বেসিনের সামনে। পানির কলটা ছেড়ে দিয়ে তার নিচে জোর করে চেপে ধরল নিযানার সেই হাতটা। যে হাত দিয়ে সে একটু আগে অভিনবকে স্পর্শ করেছিল। রাগে নিযানা চিৎকার করে উঠল,
“হাত ছাড়ো কলরব! আমি বলছি আমার হাত ছাড়ো!”
কলরব পানির দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে মুখ তুলে তাকাতেই, নিযানা নিজের সর্বশক্তি দিয়ে হাতটা তার থেকে কেড়ে নিল। সজোরে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল কলরবের ভারী শরীরটাকে। তীব্র অভিমানে ফুঁপিয়ে উঠে বলল,
“খবরদার! আজকের পর আর কোনোদিন যদি কথায় কথায় আমাকে স্পর্শ করেছ! ন্যূনতম কোনো লজ্জাবোধ নেই তোমার, তাই না? তোমার কী মনে হয় নিজেকে? আমি কোনো মাটির পুতুল? তোমার যখন ইচ্ছে হবে আমাকে নিয়ে খেলবে, আর যখন ইচ্ছে হবে ছুড়ে ফেলে দেবে? আগের বার তুমি ক্ষমা চেয়েছিলে, স্যরি বলেছিলে। কিন্তু এবার? এত বড় একটা কাণ্ড করার পরেও তোমার মধ্যে ন্যূনতম অনুশোচনাবোধটুকু পর্যন্ত নেই! আমার সত্যিই ভুল হয়েছে। তোমার কাছে ফেরাটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল। আফসোস করছি আমি৷”
“দেখ নিযানা….!”
“কী নিযানা? কেন থাকব আমি তোমার সাথে, বলতে পারো? বারবার তোমার কাছে এভাবে অপমানিত, লাঞ্ছিত আর অবহেলিত হওয়ার পরেও আমি কেন পড়ে থাকব তোমার জীবনে? কী যোগ্যতা আছে তোমার, কলরব? একটা মেয়ে সবসময় মনেপ্রাণে চায় তার জীবনসঙ্গী এমন একজন হোক, যাকে সে গোটা পৃথিবীর সামনে মাথা উঁচু করে নিজের স্বামী বলে পরিচয় করিয়ে দিতে পারবে। যাকে নিয়ে সে মনে মনে গর্ব করতে পারবে। যার কাছে তার নিজের ভালো লাগা, খারাপ লাগা আর অনুভূতির একটা ন্যূনতম মূল্য থাকবে। যে তাকে যত্ন করবে। ভালোবাসবে। কিন্তু না! আমি তো কোনোদিন তোমার থেকে এসবের কিছুই চাইনি। আমি তো শুধু তোমার সাথে থেকে যেতে চেয়েছিলাম। বিনিময়ে তুমি আমাকে কী দিলে?”
নিযানা থামল। বুকের ভেতর থেকে উপচে আসা কান্নার তোড়ে তার কণ্ঠ বুজে এলো। দম আটকে যাওয়ার উপক্রম হলো। চোখ মুছে নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে সে পুনরায় ধরা গলায় বলে উঠল,
“কিন্তু আমি এতদিনে বুঝতে পেরেছি, তুমি আমাকে ডিজার্ভ করো না। তুমি আসলে এই পৃথিবীর কাউকেই পরোয়া করো না। তুমি একমাত্র নিজেকে ভালোবাসো। নিজের খুশির কথা ভাবো। তুমি কোনোদিন নিজের জন্মদাতা বাবার কথা ভাবোনি। তোমার এই দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের জন্য মামা আর মামির মধ্যে প্রতিনিয়ত কত অশান্তি হয়। কত ঝামেলা হয়! কিন্তু তুমি কোনোদিন মায়ের চোখের জলের মূল্য দাওনি। যে ছেলে নিজের মা-বাবার কথা এক মুহূর্তের জন্য ভাবতে পারে না। তাদের সম্মান-অসম্মানের তোয়াক্কা করে না। তার থেকে আমি বা কী আশা করতে পারি? আমি ভেবেছিলাম আমি তোমাকে একটু হলেও বদলাতে পারব। কিন্তু আজ বুঝলাম, আমি চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ। তুমি অতীতে যেমন ছিলে, আজও ঠিক তেমনই আছ। আর ভবিষ্যতেও তেমনই থাকবে। আমি চাই না তোমাকে। তোমার মতো একজন মানুষের সাথে এমন এক অনিশ্চিত ও অন্ধকার ভবিষ্যৎ আমি কল্পনাও করতে পারি না। তাই খবরদার! আমাকে আর আটকানোর বিন্দুমাত্র চেষ্টা করবে না। আমি তোমার সাথে এক ছাদের নিচে আর থাকব না। এটাই আমার শেষ সিদ্ধান্ত।”
নিযানার প্রতিটি কথা যেন তপ্ত তীরের মতো এসে বিঁধল কলরবের কানে। সে এক নিমেষে জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ল। পায়ের নিচের মাটি যেন সরে গেল তার। পুরো পৃথিবীটা তার চোখের সামনে ওলটপালট হতে লাগল। নিযানা তখনো ডুকরে কাঁদছে। বারবার নাক টেনে সে নিজের কান্নার বেগ সামলানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। কলরবের আর এই দৃশ্য সহ্য হলো না। নিযানার কান্নার শব্দটা তার বুকের ভেতর একটা তীব্র, অসহ্য যন্ত্রণার সৃষ্টি করছে। সে নিজের ভারী পা দুটো টেনে টেনে ধীর কদমে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
নিযানা অশ্রুসজল চোখে সেদিকে তাকাল। কিন্তু ততক্ষণে কলরবের ছায়া মিলিয়ে গেছে। সে তার চোখের আড়ালে চলে গেছে। শুধু দূর থেকে ভেসে এলো তার জেদি কণ্ঠস্বর,
“কোনো ডিভোর্স হচ্ছে না। আমি দেব না। আর যতদিন তুই আমার, ততদিন ভুলেও যেন অন্য কোনো ছেলের সাথে তোকে না দেখি। নয়তো আমি সত্যিই খুব খারাপ কিছু একটা করে ফেলব। এখন বাড়ি গিয়ে যত খুশি কাঁদ।”
ভোর গড়িয়ে এখন সকাল। চারিপাশ মুখরিত হয়ে উঠেছে পাখিদের মিষ্টি কলকাকলিতে। পূর্ব আকাশে হেলে থাকা সূর্যটা যেন আড়মোড়া ভেঙে উঁকি দিচ্ছে। তার তীক্ষ্ণ সোনালি রশ্মি চারপাশের সবকিছুকে এক মায়াবী আলোয় ঝলসে দিচ্ছে। নবনী উঠেছে ভোরের আলো ফোটারও বেশ খানিকটা আগে। সকালের নাস্তা তৈরিতে ব্যস্ত রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে সুবাস। আজ রান্নাঘরে উপস্থিত মাজহা। কোনো এক অজানা কারণে আজ সে ভীষণ খুশি। চোখে-মুখে এক অদ্ভুত চঞ্চলতা আর উৎসাহের ছাপ। তিনি বেশ শখ করে আজ সবার জন্য গরম গরম ধোঁয়া ওঠা খিচুড়ি আর গরুর মাংস রান্না করেছেন। রান্নার মাঝেই নবনীকে ডেকে ইতোমধ্যে কয়েকবার চামচ উঁচিয়ে টেস্টও করিয়েছেন। খেতেও হয়েছে ভারী চমৎকার। আজ নবনীর ভার্সিটি যাওয়ার দিন। পরীক্ষা আছে। তবে অলেখার বিষয়টির কথা মনে পড়তেই তার মনটা কেমন যেন ভারী হয়ে আসছে। একরাশ বিব্রতবোধ আর অস্বস্তি তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরছে। এসব ভাবতে ভাবতেই সালাদের শসা কাটছিলো।
“নবনী?”
হুট করে এক পরিচিত গম্ভীর কণ্ঠস্বর কানে আসতেই নবনী চমকে উঠল। ধড়ফড় করে পেছনের দিকে তাকাতেই সে দেখল রান্নাঘরের দরজার চৌকাঠ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে দিব্য। নবনী চট করে কোনো উত্তর দিতে পারল না। তার কণ্ঠনালী যেন এক নিমেষে শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। মুখ দিয়ে কোনো শব্দই সরল না। মাজহা সে দিকে তাকিয়ে স্নেহমাখা গলায় বললেন,
“দিব্য, কিছু লাগবে আব্বু?”
দিব্য আলতো করে মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বলল, “হ্যাঁ। নাস্তা হয়ে গেলে টেবিল দিয়ে দাও। আমাদের একটু জলদি বের হতে হবে। নবনীকে ওর ভার্সিটিতে ড্রপ করে দিয়ে আমি সোজা অফিসের দিকে রওনা হব।”
অতঃপর নবনীর দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল,
“কিন্তু আশ্চর্য নবনী! তুমি এখনো এখানে এভাবেই দাঁড়িয়ে আছো কেন?”
নবনী অপ্রস্তুত হয়ে একবার মাজহার মুখের দিকে তাকাল। মাজহা যে মনে মনে ভীষণ অবাক হয়েছেন, তা তাঁর চোখের চাউনিতেই স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। ওদিকে দিব্যর কড়া ও গম্ভীর চোখ জোড়া তখনো নবনীর ওপরই স্থির। আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়িয়ে থাকাটা সমীচীন মনে হলো না নবনীর। সে ধীর পায়ে রান্নাঘর থেকে বের হয়ে দিব্যকে পাশ কাটিয়ে দ্রুত নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। ঘরে ঢুকতে না ঢুকতেই ঠিক পেছন পেছন দিব্যর গম্ভীর গলা ভেসে এলো,
“তোমাকে আমি আগেই বলেছিলাম না একটু তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিতে? আজ অফিসে আমার অত্যন্ত জরুরি একটা মিটিং আছে। সকালের নাস্তা করেছ তুমি?”
নবনী নিজের ঘাড় ঘুরে দাঁড়িয়ে অবাক চোখে তাকাল দিব্যর দিকে। সে কখন খাবে? সকাল থেকে এই অস্থিরতার মাঝে সবার আগে কি আর নাস্তা মুখে তোলা যায়? দিব্যকে দেখে আজ বেশি সিরিয়াস মনে হচ্ছে। নবনী মুখে কোনো কথা না বলে শুধু আলতো করে মাথা নেড়ে বোঝাল যে সে এখনো কিছুই খায়নি। উত্তরটা শুনে দিব্যর কপালে বিরক্তির সূক্ষ্ম ভাঁজ পড়ল। সে কিছুটা বিরক্ত কণ্ঠে বলল,
“তোমার কমনসেন্সটুকু আসলে কোথায় থাকে নবনী?পরীক্ষার দিনে কেউ এভাবে খালি পেটে থাকে? এভাবে চলে যেতে তুমি?”
সত্যি বলতে নবনীর একটু খেতে ইচ্ছা করছে না। কিন্তু সেটা বলার সাহস হলো না। কথা ঘুরিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
“দিয়া কোথায়? ও আজ স্কুলে যাবে না?”
“নাহ।”
আলমারি থেকে নিজের পোশাক বের করতে করতে সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল দিব্য। নবনী অবাক হয়ে বলল,
“কেন?”
দিব্য পেছনের দিকে তাকাল। দিয়াকে স্কুলে পৌঁছে দিতে গেলে তার সমস্যা হয়ে যাবে। এতটুকু সে গোপন করলো। নবনীকে তখনো দরজার কাছে স্থবির দেখে সামান্য ধমকের সুরে বলে উঠল,
“কী হলো? কাঠের পুতুলের মতো এখনো দাঁড়িয়ে আছ কেন? রেডি হবে না নাকি?”
নবনী চটজলদি মাথা নেড়ে আলমারি থেকে নিজের কাপড়গুলো হাতে তুলে নিয়ে প্রায় দৌড়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। ঠিক তখনই একটা প্রজাপতির মতো ঘরে এসে ঢুকল দিয়া। আধো আধো গলায় ডেকে উঠল,
“পাপ্পা?”
“আস্তে সোনা, এভাবে কেউ ছুটে আসে? পড়ে যাবে তো!”
দিব্য মেয়েকে কোলে টেনে নিলো। দিয়া তার পুতুল পা ফেলে দিব্যর শরীরের সাথে লেপ্টে গেল। গোল গোল চোখ দুটো এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে ঘরের চারপাশটা দেখে নিয়ে ছোট্ট মুখটা মেঘের মতো ভার করে জিজ্ঞেস করল,
“মাম্মা কোথায়, পাপ্পা?”
“তোমার মাম্মা ভেতরে তৈরি হচ্ছে।”
“তোমরা আজ কোথায় যাচ্ছ?”
“মাম্মার আজ ভার্সিটিতে পরীক্ষা আছে, সোনা। কাল রাতে তোমাকে বুঝিয়ে বললাম না?”
দিয়া কিছুক্ষণ বেশ ভাবুক ভঙ্গিতে মাথা দোলাল। তারপর মিষ্টি গলায় বলল,
“ইয়া!”
দিব্যর ঠোঁটে এক চিলতে হাসির রেখা ফুটে উঠল। ঠিক তখনই ওয়াশরুমের দরজা খুলে বাইরে পা রাখল নবনী। আজ তার পরনে সাধারণ একটি কুর্তি আর কাঁধে জড়ানো ম্যাচিং ওড়না। বিয়ের পর থেকে দিব্য তাকে সবসময় কেবল শাড়িতে দেখে এসেছে। আজ এই পোশাকে নবনীকে দেখে সে যেন এক মুহূর্তের জন্য নিজের অজান্তেই স্তব্ধ হয়ে গেল। এই কুর্তিগুলো দিব্য নিজেই পছন্দ করে কিনে এনেছিল। কিন্তু আজ এই পোশাকে নবনীকে দেখে মনে হচ্ছে, তার বয়স যেন এক ধাক্কায় অনেকখানি কমে গেছে। ঠিক যেন কোনো এক চঞ্চলা কলেজপড়ুয়া তরুণী। দিব্যর বুকের গহীনে কোথায় যেন একটা সূক্ষ্ম দোলা লাগল। মনে মনে সে নিজেকেই অপরাধী সাব্যস্ত করল। নাহ, পোশাকগুলো কিনে সে হয়তো ভুলই করেছে। এগুলো নবনীকে বেশি মানিয়ে গেছে। বেশি মায়াবী দেখাচ্ছে তাকে আজ! নবনীকে দেখতে পেয়েই দিয়া এক ছুটে গিয়ে তার পা জড়িয়ে ধরল। নবনীও ঝুঁকে ওকে কোলে তুলে নিয়ে গালে আলতো করে চুমু খেল। দিয়া নবনীর গলা জড়িয়ে ধরে বলল,
“বেস্ট অব লাক মাম্মা! পরীক্ষায় একদম ফাস্ট হতে হবে কিন্তু, কেমন? আর ফাস্ট না হলেও কোনো সমস্যা নেই। পাপ্পা বলেছে ফাস্ট হওয়া না হওয়া ‘নো ফ্যাক্ট’। বাট মাম্মা, ইউ লুকিং সো বিউটিফুল!”
নবনী মৃদু হেঁসে আদুরে গলায় বলল, “থ্যাঙ্ক ইউ, আমার সোনা মাম্মা!”
“মাম্মা, আমার জন্য আইসক্রিম নিয়ে আসবে?”
“আচ্ছা আনব। পুরো দুটো আইসক্রিম। হবে?”
দিয়া আনন্দে হাততালি দিয়ে লাফিয়ে উঠল, “অবশ্যই। ইয়ে! কী মজা। একটা কোন আর একটা চকবার।”
দিব্য ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ববল, “ঠিক আছে। অনেক আদর হয়েছে। এবার নামো তো মাম্মা। আমাদের জলদি বের হতে হবে। নয়তো মাম্মা লেট হয়ে যাবে।”
নবনী দিয়াকে আলতো করে কোল থেকে নামিয়ে দিল। ওর চিবুক ছুঁয়ে আদর করে বলল,
“মাম্মা পরীক্ষা দিয়েই খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসবে, কেমন? তুমি বাড়িতে একদম দুষ্টুমি করবে না। সাবধানে থাকবে। আমার দিয়া তো এমনিতে খুব গুড গার্ল!”
দিয়া লক্ষ্মী মেয়ের মতো মাথা দোলাল। নবনী দিয়াকে নিয়ে গিয়ে ইহান আর ইভানের ঘরে রেখে এলো। তবে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় অলেখার দিকে চোখ পড়তেই নবনীর বুকটা সামান্য কেঁপে উঠল। যাওয়ার আগে সে মোটামুটি সবাইকে বলেছে। অলেখা মুখ থমথমে করে সোফায় বসে ছিলেন। তাঁর এই তীব্র অসন্তুষ্টি আর চাপা ক্রোধ নবনীর চোখ এড়ায়নি। এই নীরব বিরোধিতা সে স্পষ্ট অনুভব করতে পারল। তবে সবকিছুর মাঝে দিব্যর মনের মেঘলা ভাবটা সে কিছুতেই মেলাতে পারল না। আজ সকাল থেকেই দিব্য কেন এত গম্ভীর আর খিটখিটে মেজাজে আছে, তার পেছনের রহস্যটা নবনীর কাছে একেবারেই ধোঁয়াশাময় রয়ে গেল।
রেস্টুরেন্টের কোণটায় রাখা একটি কাঠের চেয়ারে বসে ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিল আনায়া। বেশ অনেকক্ষণ ধরেই সে একা বসে আছে। আজ কায়েফের এখানে আসার কথা। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও তার দেখা নেই।অপেক্ষার প্রহর যখন ক্রমশ দীর্ঘ হচ্ছে ঠিক তখনই রেস্টুরেন্টের প্রবেশদ্বারে কাঙ্ক্ষিত মুখটি নজরে পড়ল ওর। নিজেকে কিছুটা তাড়াহুড়ো করে গুছিয়ে নিয়ে ঠোঁটে এক চিলতে সৌজন্যমূলক হাসি ফুটিয়ে তুলল সে। কিন্তু কায়েফের ঠিক পেছনেই কলরবকে হেঁটে আসতে দেখে আনায়ার ভেতরের সমস্ত স্বস্তি এক লহমায় উবে গেল। এই দৃশ্যটার জন্য সে মোটেও প্রস্তুত ছিল না। আজ তারা প্রথমবার দুজন আলাদাভাবে দেখা করতে এসেছে আর এমন একটা দিনে কেউ সাথে করে নিজের ভাইকে নিয়ে আসে? কায়েফ টেবিলের সামনে এসে দাঁড়িয়ে কিছুটা লজ্জিত ভঙ্গিতে বলল,
“আই অ্যাম সো স্যরি, আসতে একটু দেরিই হয়ে গেল।”
আনায়া নিজের ভেতরের বিরক্তিটুকু আড়াল করে মৃদু হেসে বলল,
“না না, সমস্যা নেই। বসুন।”
“ধন্যবাদ।”
কায়েফ নিজের বসার চেয়ারটা টেনে নেওয়ার আগেই দেখল, কলরব অলরেডি তার পাশের চেয়ারটা টেনে আয়েশ করে বসে পড়েছে। ওর এমন বেহায়াপনায় কায়েফ মনে মনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আজ সকাল থেকে হুট করে কলরব কেন যে তার পিছু নিয়েছে, কেন তার সাথে ছায়ার মতো ঘুরছে, তা কায়েফের সরল মাথায় কিছুতেই ঢুকছে না। নিজেকে স্বাভাবিক করে কায়েফ জিজ্ঞেস করল,
“কিছু কি অর্ডার দিয়েছেন ইতিমধ্যে?”
আনায়া আলতো করে মাথা নেড়ে বোঝাল, না, সে এখনো কিছুই অর্ডার করেনি। কায়েফ হাতের ইশারায় ওয়েটারকে ডেকে মেন্যু কার্ডটা নিল। এরপর আনায়ার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“আপনি কী নিতে পছন্দ করবেন বলুন?”
আনায়া ম্লান হেসে বলল, “আসলে এখন তেমন ভারী কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না। আমার জন্য এক কাপ কফি হলেই চলবে।”
আনায়ার আসলেই ভেতর থেকে অস্বস্তি লাগছিল। তার ওপর কলরবের উপস্থিতি বিরক্তিটাকে দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। কলরব বাঁকা চোখে আনায়ার দিকে তাকিয়ে হুট করে প্রশ্ন ছুড়ে দিল,
“তা, আপনি কি আজ একাই এসেছেন এখানে?”
আনায়া সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল, “নাহ, সাথে ড্রাইভার আছে।”
“কোনো ফ্রেন্ড আসেনি সাথে?”
“নাহ!”
“একা একা একটা মেয়ে, এভাবে চলে এলেন?”
“কলরব!”
কায়েফ বেশ কড়া গলায় ওকে থামিয়ে দিল। কলরব আর কথা না বাড়িয়ে বিরক্তির ভঙ্গিতে মুখ বাঁকাল। কায়েফের মনে হলো, আনায়ার বোধহয় এখানে খুব সমস্যা হচ্ছে। সে মনে মনে ভাবল, আসার সময় যদি সে একটু শক্ত হয়ে কলরবকে বাড়িতে রেখে আসত। সেটাই বোধহয় সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হতো। পরিস্থিতি হালকা করতে কায়েফ জিজ্ঞেস করল,
“বাসার সবাই কেমন আছেন? আঙ্কেল, আন্টি, নোমান?”
আনায়া কফির কাপে চুমুক দিয়ে বলল, “হ্যাঁ, সবাই ভালো আছেন।”
এরপরের সময়টুকু কাটল অস্বস্তিকর নীরবতার মধ্য দিয়ে। বেশ কিছুক্ষণ আর কোনো কথাই হলো না তাদের মাঝে। ইতিমধ্যে ওয়েটার এসে খাবার টেবিলে সাজিয়ে দিয়ে গেছে। কায়েফ মাথা নিচু করে খাচ্ছে। তার সাথে সমান তালে খেয়ে চলেছে কলরবও। আনায়া লক্ষ্য করল, কায়েফ পুরোটা সময় একবারের জন্যও তার দিকে চোখ তুলে তাকাচ্ছে না। কেমন এক অদ্ভুত, লাজুক আর আজব ছেলে! আর তার পাশের জন তো আরও এক ডিগ্রি ওপরে। মস্ত বড় আজব এক চিজ। সেদিন তালুকদার বাড়িতে দাঁড়িয়ে কলরবের বলা সেই তপ্ত ও অপমানজনক কথাগুলো এখনো আনায়ার কানে অনবরত বাজছে। এই দুই ভাইয়ের মেলবন্ধন আজ তার মাথা ধরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। বিরক্তির শেষ সীমায় পৌঁছে আনায়া নিজের ফোনটা বের করে একবার সময়টা চেক করল। এরপর ব্যাগটা হাতে তুলে নিয়ে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল,
“আই অ্যাম সো স্যরি কায়েফ। তবে একটা জরুরি কাজের কথা মনে পড়ল। আমাকে এখনই উঠতে হচ্ছে।”
কায়েফ খাবারের প্লেট থেকে মুখ তুলে কিছুটা উদ্বেগের সাথে জিজ্ঞেস করল,
“এনি প্রবলেম?”
আনায়া নিজের হ্যান্ডব্যাগটা কাঁধে তুলে নিয়ে অত্যন্ত স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করে বলল,
“নাহ! তেমন কিছু না।”
কায়েফ আর বসে রইল না। সৌজন্যবশত সে-ও উঠে দাঁড়াল। বেশ মার্জিত গলায় বলল,
“চলুন, আমি আপনাকে গাড়ি অব্দি ছেড়ে আসছি।”
আনায়া মৃদু মাথা নেড়ে সায় দিল। কায়েফের এই যত্নটুকু তার বেশ পছন্দ হলো। রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে কায়েফ একদম পার্কিং লটে ওর গাড়ি পর্যন্ত সাথে গেল। গাড়ির দরজা খোলার আগে আনায়া একটু থমকে দাঁড়িয়ে কায়েফের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনি এবার আসতে পারেন। ধন্যবাদ।”
কায়েফ কেবল শান্তভাবে মাথা নাড়ল। আনায়া গাড়ির ভেতরে আয়েশ করে বসে, দরজাটা লাগানোর আগে হুট করেই মৃদু হেঁসে বলল,
“আমার মনটাকে খুঁজে পেলে, আমাকে ততক্ষনাত খবর দিয়েন, অসি সাহেব!”
কায়েফ চট করে আনায়ার দিকে তাকাতেই দেখল, ততক্ষণে গাড়ির কালো গ্লাসটা হুড়মুড় করে ওপরে উঠে গেছে। আর তার পরমুহূর্তেই স্টার্ট নিয়ে তীব্র গতিতে ছুটতে শুরু করেছে গাড়িটা। কায়েফ সেই চলে যাওয়া গাড়ির ধুলোবালির দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। মেয়েটার শেষ কথাটা তার বুকের কোথাও যেন একটা সূক্ষ্ম টোকা দিয়ে গেল। তবে পরমুহূর্তেই নিজের এই আড়ষ্টতা কাটিয়ে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ম্লান হাসি ফুটিয়ে তুলল সে। পুনরায় রেস্টুরেন্টের ভেতরে ফিরে আসতেই কায়েফের চোখ গেল টেবিলের দিকে। সে দেখল, কলরব চরম বিরক্তি মাখা মুখে প্রায় যুদ্ধ করার ভঙ্গিতে পিৎজা চিবোচ্ছে। কায়েফ নিজের চেয়ারটা টেনে ধপ করে বসে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ওর বসার শব্দ পেয়ে কলরব মুখ তুলে তাকাল। চোখ দুটো সরু করে অত্যন্ত বিরক্তিকর গলায় বলল,
“কী? মেয়েটা চলে গেল বলে খুব কষ্ট হচ্ছে নাকি?”
কায়েফ ওর কথায় কান না দিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল, “কী যে সব বাজে বকিস না! আচ্ছা কলরব, তুই সত্যি করে বল তো, কতদিন ধরে তুই কিছু খাস না?”
কলরব পিৎজার স্লাইসে কামড় বসাতে বসাতে উল্টো প্রশ্ন করল,
“হুট করে এমন মনে হওয়ার কারণ?”
“যেভাবে তুই খাবারের ওপর হামলে পড়েছিস, তা দেখে তো এমনটাই মনে হওয়া স্বাভাবিক।”
“কাল দুপুর থেকে পেটে এক দানা দানাপানিও পড়েনি।”
অত্যন্ত নিস্পৃহ গলায় তথ্যটা দিল কলরব। কায়েফ টেবিলের ওপর দুই হাত রেখে বলল,
“আচ্ছা, আসার সময় তুই যেন কী একটা জরুরি কথা বলবি বলছিলিস?”
কলরব খাওয়া থামিয়ে সোজা কায়েফের চোখের দিকে তাকাল। সরাসরি বলল,
“এই মেয়েটাকে তুই বিয়ে করিস না।”
কায়েফ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কেন?”
“কারণ এই বিয়েতে আমার বিন্দুমাত্র মত নেই। তুই চিন্তা করিস না, আমি নিজে তোর জন্য এর চেয়ে ঢের ভালো মেয়ে খুঁজে দেব। এই আনায়ার থেকে দ্বিগুণ, তিনগুণ সুন্দরী মেয়ে এনে দেব তোকে।”
কায়েফ শব্দ করে হেসে উঠল। কৌতুক মেশানো গলায় বলল,
“তা, আনায়ার মধ্যে এমন কী প্রবলেম দেখলি তুই?”
“জানি না।”
কলরব মুখ ঘুরিয়ে ছোট করে উত্তর দিল। কায়েফ আর কিছু বলল না। এই ছেলের মাথার ভেতর কখন যে কী কুটিল চক্র চলে, তা একমাত্র ওপরওয়ালাই ভালো জানেন। কলরব কিছুক্ষণ চুপচাপ নিজের প্লেটের দিকে তাকিয়ে রইল। এরপর আবার বলল,
“দেখ ভাই, এই মেয়েটা কোনো দিক দিয়েই একদম তোর টাইপের না। ওই যে বলে না, একটা ভাইব ম্যাচ করার ব্যাপার থাকে? তোদের দুজনের মধ্যে সেই জিনিসটাই উধাও।”
কায়েফ এবার কিছুটা ক্লান্ত গলায় বলল, “যা বলার সরাসরি বল না, কলরব। শুধু এই ভাঙা রেকর্ড বাজানোর জন্যই তুই আমার পিছু পিছু এতদূর চলে এসেছিস?”
কলরব মাথা নিচু করে বলল, “আসলে, সেদিনের সেই ঘটনার জন্য আমি তোর কাছে সত্যিই খুব স্যরি, ভাই। তোর সাথে বেশি রুড বিহেভ করে ফেলেছিলাম। আসলে হ্যাঁ, এটা সত্য যে আমি আগে থেকেই জানতে পেরেছিলাম নিযানার সাথে আমার বিয়ে হতে পারে। কিন্তু আমি তোকে সেই কথাটা জানানোর আগেই তুই নিজে এসে আমাকে বললি যে তুই নিযানাকে কতটা ভালোবাসিস।”
কায়েফ কিছুটা অস্বস্তি বোধ করে হাত তুলে তাকে থামানোর চেষ্টা করল,
“কলরব, প্লিজ! ছাড় ওসব পুরনো কথা।”
“বিষয়টা হলো, আমি তখন চেয়েও তোকে সত্যিটা বলতে পারিনি। আর আমি পুরো ব্যাপারটাকে তখন অতটা সিরিয়াসলি নেইওনি। আমার তো মনে হয়েছিল নিযানার মতো অমন শান্ত, ভদ্র মেয়ে আমার মতো এক উশৃঙ্খল ছেলেকে কোনোদিন বিয়েই করবে না। আর তাছাড়া, তোর আগে আমি বিয়ে করে ফেললে ফ্যামিলিতে কোনো বড় সমস্যাও হতো না। এটা তো এমন কোনো মহাভারত অশুদ্ধ হওয়ার মতো ব্যাপার ছিল না! তুই এটা নিয়ে শুধু শুধু আমার ওপর এতদিন ধরে রাগ করে আছিস।”
কায়েফ অত্যন্ত শান্ত গলায় জবাব দিল, “তেমন কোনো কিছু না, কলরব।”
“তবুও, আই অ্যাম রিয়েলি স্যরি।”
“ইট’স ওকে।”
কলরব বেশ প্রফুল্ল গলায় বলল, “তবে এই স্যরিটা কিন্তু তোর আজকের সুন্দর ডেটটা নষ্ট করার জন্য। কারণ আমি সম্পূর্ণ জেনেবুঝেই তোকে ডিস্টার্ব করতে এসেছি। আমার শেষ কথা একটাই। এই মেয়েটাকে তুই বিয়ে করিস না, ব্যস!”
এই অবেলায় পর্ব ৪৭
কায়েফ আর কোনো মন্তব্য করল না। কলরব তাড়াহুড়ো করে খাওয়া শেষ করলো। অতঃপর উঠে পড়ল। চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতে গিয়েও সে মাঝপথে হুট করে থমকে দাঁড়াল। কায়েফের দিকে পেছন ফিরে দাঁড়িয়েই অত্যন্ত গম্ভীর গলায় বলল,
“আজকের বিলটা দিয়ে দিস। আমি কাল সকাল থেকেই আমাদের কোম্পানিতে জয়েন করছি। কোটিপতি হয়ে গেলে ফেরত দিয়ে দেব। নয়তো মাপ করে দিস৷ আপাতত আমার কাছে নেই৷”
