Home এই অবেলায় এই অবেলায় পর্ব ৪৯

এই অবেলায় পর্ব ৪৯

এই অবেলায় পর্ব ৪৯
সুমনা সাথী

“এখানে কী ধরনের ফাজলামি হচ্ছে?”
নিযানার ঝাঁঝালো প্রশ্নের জবাবে কলরব কোনো কথা বলল না। শুধু ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসিটা ধরে রাখল। এরপর বেশ সময় নিয়ে, আপাদমস্তক নিযানাকে পরখ করে গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করল,
“তুমি কোন ইয়ার?”

নিযানা নিজের কুচকুচে কালো ভ্রু জোড়া কুঁচকে তীব্র বিরক্তিতে তাকাল ওর দিকে। ওপাশে দাঁড়িয়ে শান্ত আর অভিক মুখ টিপে হাসছে। কলরবের ভাবভঙ্গি এমন, যেন নিযানাকে সে আজ জীবনে প্রথম দেখল! নিযানা দাঁতে দাঁত চেপে, গলার স্বর নিচু করে বলল,
“এসব ফাজলামি বন্ধ করো আর এক্ষুনি এখান থেকে যাও। সবকিছুর একটা লিমিট থাকে।”
কলরব একটু ঝুঁকে এসে বলল, “এটা তোর নিজের বাড়ি না। যা খুশি বলবি। সিনিয়ররা যেটা জিজ্ঞেস করেছে, সেটার উত্তর দাও। কী রে তোরা, হাঁ করে দেখছিস কী? কিছু বল!”
শান্ত তৎক্ষণাৎ বলে উঠল, “হ্যাঁ, হ্যাঁ! বড় ভাইয়াদের একটা সালাম না দিয়ে গটগট করে কোথায় যাওয়া হচ্ছিল, শুনি?”

কথাটা শেষ হতেই শান্তর পায়ের ওপর সজোরে একটা লাথি বসিয়ে দিল কলরব। শান্ত ব্যথায় ককিয়ে উঠে হতভম্ব চোখে তাকাল কলরবের দিকে। বোঝার চেষ্টা করল হুট করে কী হলো। কলরব শান্তকে নিজের দিকে টেনে এনে, দাঁতে দাঁত পিষে ফিসফিসিয়ে বলল,
“কে ওর ভাই? তোর বোন হবে ও! আমার না। ছাগল।”
শান্ত ইশারায় ক্ষমা চেয়ে জিব কাটল। নিযানা কিছু বুঝে ওঠার আগেই, কলরব এক হাত বাড়িয়ে খপ করে নিযানার কাঁধ থেকে তার কলেজ ব্যাগটা কেড়ে নিল। ব্যাগটা হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখতে দেখতে বলল,
“বাপ রে বাপ! এত বড় ব্যাগে ঠিক কী নিয়ে কলেজে এসেছ তুমি? বাপের সব টাকা পয়সা?”
নিযানা ক্ষুব্ধ গলায় বলল, “দেখো কলরব, যা করছ তা কিন্তু মোটেও ভালো হচ্ছে না।”
“আরে! এই যে, ভেতরে তো ফোন নিয়ে এসেছ দেখছি! তুমি কি জানো না বেবি, কলেজে ফোন নিয়ে আসা সম্পূর্ণ নিষেধ? এত বড় স্পর্ধা হয় কীভাবে?”

শেষের কথাটা বলার সময় কলরব চোখে চোখ রেখে চাইল। নিযানা তখনো রাগী দৃষ্টিতে চেয়ে রইল ওর পানে। কলরব ব্যাগ থেকে নিযানার ফোনটা বের করে উল্টেপাল্টে দেখে বলল,
“বাহ! আইফোন! বড়লোকের মেয়ে, তাই বুঝি এত দেমাগ? কই, লকটা খোলো তো দেখি।”
নিযানাকে অবশ্য লক খোলার জন্য বিন্দুমাত্র কষ্ট করতে হলো না। কলরব নিজের হাতের ফোনটা নিযানার মুখের সামনে ধরতেই ফেস-আইডি ডিটেক্ট করে লকটা খুলে গেল। স্ক্রিনটা জ্বলে উঠতেই কলরব শান্তর দিকে তাকিয়ে বলল,
“ওয়াও শান্ত! এই ফেস-লকের প্রযুক্তিটা আসলে কে আবিষ্কার করেছিল রে ভাই? ওরে পাইলে আজ আমি দশটা চুমু দিতাম!”

মাঠের চারপাশে ইতিমধ্যেই বেশ কিছু কৌতূহলী ছেলেমেয়ে জড়ো হতে শুরু করেছে। সবার উৎসুক ও সন্ধানী দৃষ্টি নিযানার অস্বস্তি আর বিব্রতবোধকে এক নিমেষে বহুগুণ বাড়িয়ে দিল। তার ইচ্ছে হলো, এখনই ঠাস ঠাস করে কয়েকটা চড় এই ধৃষ্ট ছেলেটার গালে বসিয়ে দিতে। প্রচণ্ড ক্ষোভ আর অপমানে ফর্সা মুখটা টকটকে লাল হয়ে উঠেছে। রাগে নাসিকাপল্লব কাঁপছে থরথর করে। সে একপ্রকার অগ্নিদৃষ্টি মেলে চেয়ে রইল কলরবের পানে। কলরব অবশ্য নিযানার সেই রূপকে বিন্দুমাত্র পাত্তা দিল না। সে নির্বিকার ভঙ্গিতে নিযানার ফোন ঘেঁটে নিজের নম্বরটা আনব্লক করতে করতে মুখ নিচু করেই বিড়বিড় করে বলতে লাগল,
“ব্লক করছে ব্লক! তোর ওই টাক বাপকে সারাজীবনের মতো ব্লক করে রেখে দেব। বেয়াদব কোথাকার!”
নিজের কাঙ্ক্ষিত কাজটুকু উদ্ধার হতেই কলরব ফোনটা নিযানার দিকে বাড়িয়ে দিল। মুখে একটা কৃত্রিম গাম্ভীর্য ফুটিয়ে বলল,

“নাও তোমার ফোন। ভেতরে একটা জুয়ার অ্যাপ ছিল দেখলাম। ওটা ডিলিট করে দিয়েছি। আজকালকার ছেলেমেয়েদের যে কী একটা অবস্থা হয়েছে রে ভাই। একেবারে উচ্ছন্মে গেছে সব! এতটুকু বাচ্চার হাতে দামি ফোন তুলে দিলে তো তারা এসব অপকর্মই করবে। দেখো, এসব মোটেও ভালো কাজ নয়…!”
উপদেশবাণী শেষ হওয়ার আগেই প্রচণ্ড একটা শব্দ প্রতিধ্বনিত হলো। কলরব চোখ তুলে দেখল, নিযানা তার বাড়ানো হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিয়ে সজোরে ছুঁড়ে মেরেছে পাশের বিল্ডিংয়ের কংক্রিটের দেয়ালে। মুহূর্তেই আছাড় খেয়ে ফোনটার স্ক্রিন চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল। উপস্থিত সবাই এই কাণ্ডে সম্পূর্ণ হতভম্ব হয়ে রইল। নিযানা তখন রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,
“আমি তোমাকে দেখে নেব, কলরব!”
কলরব অবশ্য এতে একটুও দমে না গিয়ে উল্টো মৃদু হাসল। সে নিযানার কানের কাছাকাছি একটু ঝুঁকে এসে ফিসফিসিয়ে বলল,

“অবশ্যই দেখবি। তোর তো পূর্ণ অধিকার আছে আমাকে দেখার। যখন ইচ্ছা তখন যা খুশি দেখতে পারবি। সময়মতো সব দেখাব। এখন তুই যা তো। নয়তো ক্লাস টেস্টের জন্য লেট হয়ে যাবে।”
নিযানা তপ্ত শ্বাস ফেলল। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অভিকের হাত থেকে নিজের ব্যাগটা কেড়ে নিয়ে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল। মাত্র দু-কদম এগিয়েছে, অমনি পেছন থেকে কলরব হাত টেনে ধরলো। কানের নিকট ঝুঁকে নিচু গলায় বলল,
“কিরে, চললি কোথায়? সালাম দিয়ে যাবিনা। শোন, কলেজ শেষ করে সোজা ক্লাবে একবার আসবি। তোর সাথে একটা চূড়ান্ত বোঝাপড়া বাকি আছে। বেশি কিছু না, মাত্র পাঁচটা চুমু খেয়ে তোকে ছেড়ে দেব!”
নিযানার তীব্র ইচ্ছে হলো পিছন ফিরে ওর গলাটা দুই হাতে টিপে ধরতে। নিজের ভেতরের ক্ষোভটুকু চেপে অবজ্ঞাসূচক গলায় বলল,
“ওসব তোমার স্বপ্নেই সম্ভব!”
কলরব শব্দ করে মৃদু হাসল। নিযানার এই প্রতিক্রিয়া সে আগেই জানত। বাঁকা চোখে চেয়ে রসিকতার সুরে বলল,

“বাহ! ফোনের ওয়ালপেপারে চব্বিশ ঘণ্টা আমার ছবি সাজিয়ে রাখতে পারো আর অনেকিন না খাওয়ার পর, সামনাসামনি আমি একটু চুমু খেতে চাইলেই তা মহা দোষের হয়ে গেল? এ তোমার কেমন বিচার, বেবি?”
কথাটা শোনামাত্রই নিযানার মনে হলো পায়ের তলার মাটি যদি ফাঁক হয়ে যেত, তবে সে সেখানেই ঢুকে পড়ত। ইশ! ফোনের হোম স্ক্রিনের ওয়ালপেপারে যে আজও এই বাঁদড়টার ছবি জ্বলজ্বল করছিল, সেই সত্যটা সে রাগের মাথায় একেবারে বেমালুম ভুলে বসেছিল! লজ্জায় আর অপমানে নিযানা সেখানে আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। গটগট পায়ে প্রায় দৌড়ে মাঠ পেরিয়ে চলে গেল। পেছন কলরবের উচ্চকিত, বিজয়ীর অট্টহাসি তখনো নিযানার কানে তপ্ত শেলের মতো বিঁধতে লাগল।

অবশেষে সমস্ত জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে বিকেল চারটার ট্রেনে করে সবাই ময়মনসিংহের উদ্দেশ্যে রওনা দেবে। দিব্য ঠিক কীভাবে আরশাদ তালুকদারকে রাজি করিয়েছে, তা একটা রহস্য। অবশ্য দিব্যর প্রতি আরশাদ তালুকদারের দুর্বলতা বরাবরই বেশি। তবে এই সিদ্ধান্তে কুহুর চেয়ে বেশি খুশি আর কেউ হয়নি। সে এখন ঘরের বড় আয়নাটার সামনে দাঁড়িয়ে মনের সুখে সাজগোজ করছে। তবে কুহুর এই আনন্দের মাঝে ব্যাঘাত ঘটিয়ে বেশ কিছুক্ষণ ধরে তার ঘরে এসে চুপচাপ বসে আছে কলরব। কোনো কথা নেই, বার্তা নেই, এক কোণে বসে আছে। কুহু ইতিমধ্যে বেশ কয়েকবার তাকে জিজ্ঞেস করলেও সে কোনো উত্তর দেয়নি। অবশেষে কোনো উপায় না পেয়ে কুহু আবারও চিরুনীটা হাতে নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ভাইয়া, তুমি কি বলবে যে তোমার আসলে কী চাই?”
কলরব কিছুটা আমতা আমতা করে বলল, “আচ্ছা, ফুপিরা কি আমাদের সাথে যাচ্ছে?”
“যাবে তো।”
কথাটা শোনামাত্রই কলরব সোফা থেকে এক প্রকার লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল,

“শিওর যাবে তো?”
“হ্যাঁ ভাইয়া, আব্বু তো একটু আগেই ফোন করে সবার যাওয়ার কথা কনফার্ম করল।”
কলরব কিছুক্ষণ গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে চুপ করে রইল। ঘরের মেঝেতে কয়েকবার পায়চারি করে অত্যন্ত নিস্পৃহ ভাব দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“আর নিযানা? ও-ও কি যাবে? আসলে, ও যদি এই যায়, তবে আমি কোনো অবস্থাতেই যাব না। তাই আগেভাগে একটু শিওর হয়ে নিচ্ছি আরকি।”
কুহু আয়না থেকে চোখ সরিয়ে বিরক্তিতে ভাইয়ের দিকে তাকাল। হাত নেড়ে বলল,
“তুমি আসলে নিজেকে ভাবোটা কী, শুনি? টাইটানিক মুভির জ্যাক নাকি? এত দেমাগ দেখানোর কিচ্ছু নেই। তুমি একদম নিশ্চিন্তে যেতে পারো। নিযানা আগেই সাফ জানিয়ে দিয়েছে। যেহেতু তুমি যাচ্ছ, তাই ও কোনোভাবেই যাবে না। এই তো, একটু আগেই ফুপির ফোন থেকে আমি নিজে ওর সাথে কথা বলেছি।”
কুহুর কথা শুনে কলরবের মুখটা পলকে চুপসে গেল। এতক্ষণ ধরে মনের ভেতর বুনে রাখা আশার গুড়ে যেন বালি পড়ে গেল। অত্যন্ত বিরস ও মলিন মুখে বিড়বিড় করে বলল,

“ওহ! এই ব্যাপার! তাহলে তো ভালো সুযোগ। ইশ, আমি যদি এইবার যেতে পারতাম!”
কুহু ভ্রু কুঁচকে বলল, “কেন? এখনও যেতে পারবে না কেন?”
কলরব নিজের কপালটা এক হাত দিয়ে চেপে ধরে বেশ অসুস্থতার ভান করে বলল,
“আসলে ইদানীং কাজের চাপে শরীরটা ঠিক ভালো লাগছে না রে, কুহু। খুব দুর্বল লাগছে। তোরা সবাই যা। আমি না হয় ভালো হয়ে পরের বার কোনো এক সময়ে গ্রামে ঘুরে আসব।”
কুহু বলল, “ঠিক আছে, যা ভালো বোঝো করো। তবে যাওয়ার আগে একটা সত্যি কথা বলো তো ভাইয়া? আজ হুট করে তুমি আমার সাথে এত মিষ্টি করে, ভালো ব্যবহার কেন করছ, হ্যাঁ? ডাল মে কুছ কালা হ্যায়!”
কলরব জোরপূর্বক একটু হাসলো। কুহুর মাথায় আলতো করে একটা গাঁট্টা মেরে বলল,
“কী যে সব উল্টোপাল্টা বকিস না! তুই তো আমার এই দুনিয়ায় একমাত্র আদরের ছোট বোন। আমি তোকে খুব ভালোবাসি রে কাঠি! ব্যাস, তোর এই ভাইটা নিজের ভালোবাসা একটু কম প্রকাশ করে, এই যা। তুই তো অবুঝ। কিছু বুঝিস না!”
কুহু এমন আকস্মিক ও অভাবনীয় স্নেহ দেখে বোকার মতো দুপাশে মাথা নাড়ল। কলরব আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়াল না। ধীরপায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

“মায়াভরা এই ভুবনে চাইনি কিছুই আমি
শুধু তোকে চাই মন, কাছে পেতে চাই।
তুমি বিনা কেন কিছুই বুঝি না কেন আমি,
শুধু তোকে নিয়েই সব স্বপ্ন সাজাই!
তুম বিন মন মানে না, তুম বিন মন বোঝে না বারণ
তুমি ছাড়া মন কেমন কেমন লাগে
সহে না, সহে না মন………!”
মোবাইলের জ্বলজ্বলে স্ক্রিনে অনবরত বেজে চলেছে গানটা। চোখ ধাঁধানো রঙিন লাইটের নিচে, বিশাল স্টেজের ওপর দাঁড়িয়ে গলায় গিটার ঝুলিয়ে যেন গলার সমস্ত সুর আর ঢেলে দিয়ে গানটা গাইছে কলরব। কাল রাতে একটা কনসার্টে গিয়েছিল সে। ব্যান্ডের সেই অনবদ্য পারফর্ম্যান্সের ভিডিওটাই আজ সকালে তাদের অফিসিয়াল মিউজিক পেজে পোস্ট করা হয়েছে।

“নিযানা, তাড়াতাড়ি এসো বেবি! ট্রেন ছেড়ে দেবে তো। আমাদের এবার বগিতে উঠতে হবে।”
কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের হইচই আর হুইসেলের ভিড়ে হঠাৎ ভেসে এলো ডাকটা। নিযানা ঘোর কাটিয়ে চট করে চোখ তুলে তাকাল। ধীর পায়ে এগিয়ে আসতে আসতে সাড়া দিয়ে বলল,
“আসছি মাম্মা!”
ওদিকে ফোনের ওপাশে কয়েক সেকেন্ড ধরে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে মৌনিতা পুনরায় ডেকে উঠল,
“ভাইয়া? তুমি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছো?”
কলরব একদম স্তব্ধ হয়ে গেছে। যেন কিছুক্ষণের জন্য নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছে না সে! বুকের ভেতরের স্পন্দনটা আচমকা দ্বিগুণ গতিতে ছুটতে শুরু করেছে। তীব্র এক অস্থিরতা গ্রাস করল তাকে। ধরা গলায় শুধাল,

“ভাবি, তোমার পাশে!তোমার পাশে কি নিযানা আছে?”
মৌনিতা কিছুটা অবাক হলো এমন আকস্মিক প্রশ্নে। তবে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
“হ্যাঁ, নিযানা তো আমাদের সাথেই আছে। আসলে আঙ্কেল শেষ মুহূর্তে আসতে পারলেন না। ওনার নাকি অফিসে ভীষণ জরুরি একটা মিটিং পড়ে গেছে। তাই ফুপি আর নিযানা এখন আমাদের সাথে একই ট্রেনে যাচ্ছে।”
উত্তরটা শোনামাত্রই কলরব একটা তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ভেতরটা কেমন যেন তোলপাড় করে উঠছে তার। নিজেকে আর কিছুতেই ধরে রাখতে পারছে না সে। ব্যাকুল গলায় জিজ্ঞেস করল,
“ভাবি, ট্রেন ছাড়তে আর ঠিক কতক্ষণ বাকি?”
“প্রায় বিশ মিনিটের মতো।”
“আমি আসছি, ভাবি!”
মৌনিতা বিস্মিত হয়ে বলল, “কোথায় আসছো তুমি?”
“আমিও তোমাদের সাথে ময়মনসিংহে যাব! প্লিজ, তুমি আব্বুকে একটু বলে ম্যানেজ করো!”
“এসব কী বলছো ভাইয়া? এতক্ষণ ধরে না করলে, এখন শেষ মুহূর্তে হুট করে কীভাবে সম্ভব? আগে কেন এলে না?”

মৌনিতা আসলে অন্য একটা দরকারি কথা বলতে ফোন করেছিল কিন্তু কলরবের এই আকস্মিক কাণ্ডে সে বাকরুদ্ধ। কলরব অবশ্য কোনো যুক্তিসঙ্গত উত্তর খুঁজে পাওয়ার মতো মানসিক অবস্থায় ছিল না। অস্থির হয়ে বলল,
“আসলে… আসলে আমি তোমাদের সবাইকে খুব মিস করছি! তোমরা কিন্তু আমাকে ফেলে যাবেনা! তোমরা যদি আমাকে রেখে যাও, তবে আমি নিশ্চিত ফিরে এসে আমাকে আর আস্ত বা জ্যান্ত খুঁজে পাবেনা! আমি আসছি। মাত্র পনেরো মিনিট। রাখছি ফোন!”
কথাটা এক নিঃশ্বাসে বলেই কলটা কেটে দিল কলরব। মৌনিতাকে আর পাল্টা কোনো প্রশ্ন করার ন্যূনতম সুযোগটুকুও দিল না। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কাব্য মৌনিতার ওমন হাঁ হয়ে থাকা মুখের দিকে তাকিয়ে কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কী হয়েছে মৌনিতা? কলরব হুট করে কী বলল?”
মৌনিতা তখনও ফোনের স্ক্রিনের দিকে বোকার মতো তাকিয়ে থেকে, অবাক গলায় বলল,
“ভাইয়া আসছে, কাব্য! ও নাকি আমাদের সাথেই ট্রেনে ময়মনসিংহে যাবে!”

নিযানা খুব ভালো করেই জানত কলরব যাচ্ছে না। কুহুই তো তাকে সুসংবাদটা দিয়েছিল। সে ভেবেছিল, কলরব যখন যাচ্ছেই না, তখন তার যেতে আর কোনো বাঁধা নেই। কিন্তু এখন সে যে কী চূড়ান্ত বিপাকে পড়েছে তা কেবল সেই জানে! নিযানার অগ্নিদৃষ্টি তখন কুহুর ওপর নিবদ্ধ। কুহু অবশ্য অপরাধীর মতো মুখ নিচু করে বসে আছে। ট্রেনের একই বগিতে আলাদা আলাদা কেবিন ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। কায়েফ, কুহু, নিযানা আর অভিনব একই কেবিনে বসেছে সাথে রয়েছে আনায়াও। ট্রেন গন্তব্যে পৌঁছাতে পৌঁছাতে বেশ রাত হয়ে যাবে। দেখতে দেখতে ট্রেন ছাড়ার সময় ঘনিয়ে এলো। কোনো একটা কারনে ট্রেন ছাড়তে কয়েক মিনিট বিলম্ব হয়েছে। আর মাত্র মিনিট সাতেক বাকি। কিন্তু স্টেশনে কলরবের দূর-দূরান্তেও কোনো দেখা নেই! এত কম সময়ের মধ্যে ঢাকার এই জ্যাম ঠেলে সে কীভাবে স্টেশনে এসে পৌঁছাবে, সেটাই মাথায় ঢুকছে না কায়েফের। সে বারবার কেবিনের জানালা দিয়ে বাইরে ব্যাকুল হয়ে তাকাচ্ছিল। ঠিক তখনই প্ল্যাটফর্মে দেখা গেল তাকে। কলরব এলোমেলো চুলে হাপাতে হাপাতে দৌড়ে আসছে! কায়েফ নেমে গিয়ে ওকে নিয়ে এলো। ট্রেনে উঠে স্বস্তির শ্বাস ফেলল কলরব৷ তবে সেটা বেশিক্ষণ টিকলো না৷ কেবিনে ঢুকে নিযানার ঠিক পাশে অভিনবকে বসে থাকতে দেখেই কলরবের ভেতরের রক্তে যেন মুহূর্তেই আগুন ধরে গেল। মেজাজটা তার চড়ে গেল একেবারে সপ্তমে। কুহু মুখ বেঁকিয়ে বলল,

“সেই তো শেষমেষ আসবাই, তাহলে অতক্ষণ ধরে অত শতেক নাটক মারার কী দরকার ছিল? এসো বসো।”
কলরব কুহুর কথার কোনো জবাব দিল না। সে কোনোক্রমে নিজেকে সামলে কায়েফের পাশে গিয়ে বসল। নিযানা অপর পাশে জানালার কোল ঘেঁষে কুহুর সাথে বসা, আর ওর পাশেই অনায়াসে বসে আছে অভিনব! কলরবের বুকের ভেতরের জ্বলুনি আর অস্বস্তি ক্রমশো দ্বিগুন হচ্ছে। এপাশে জানালার পাশে বসা আনায়া। তার পাশে কায়েফ। ঝিকঝিক শব্দ করে ট্রেন ছেড়ে দিল। কিন্তু নিযানার পাশে এভাবে অভিনবকে বসে থাকতে দেখে কলরবের অস্থিরতা বাড়তে লাগলো। সে উশখুশ করতে করতে আচমকা চেঁচিয়ে উঠে বলল,
“আমার মারাত্মক বমি পাচ্ছে। আমি জানালার পাশে বসব। এই কুহু, উঠ তো এখান থেকে!”
কুহু চোখ-মুখ কুঁচকে বিরক্তির সুরে বলল, “একদম না! আমি জানালার পাশ ছাড়ব না। অন্য কোথাও গিয়ে দেখো।”

কলরব বেশ কড়া সুরে ধমকে উঠল, “বড় ভাইয়ের মুখের ওপর কথা বলছিস কুহু? চুপচাপ ওঠ তো! দেখছিস আনায়া ওপাশে বসে আছেন। আমি কি উনাকে উঠতে বলব? আর এখন যদি আমি সোজাসুজি তোদের সবার গায়ের ওপর বমি করে দিই, তখন খুব ভালো লাগবে, তাই না?”
কুহু আর কোনো তর্ক করার সাহস পেল না। বাধ্য হয়ে উঠে দাঁড়াল। কুহু ওঠার সাথে সাথেই কলরব এক লাফে গিয়ে ধপ করে কুহুর সেই ফাঁকা জায়গায়, অর্থাৎ নিযানার গা-ঘেঁষে বসে পড়ল। নিযানা তা বুঝতে পেরে তৎক্ষণাৎ বসা থেকে উঠে যেতে চাইল, কিন্তু ওঠার আগেই সে অনুভব করল কলরব নিজের একটা হাত দিয়ে নিমিষে ওর কোমরটা আড়ালে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছে। নিযানা ক্ষুব্ধ চোখে কলরবের পানে তাকাতেই, কলরব ওর একদম কাছাকাছি মুখ এনে দাঁতে দাঁত পিষে বিড়বিড় করে বলল,
“একদম চুপচাপ বসে থাক! নয়তো এই চলন্ত ট্রেনে সবার সামনে আমি কী করে বসব, তা আমি নিজেও জানি না! আমার মেজাজ কিন্তু প্রচুর খারাপ হয়ে আছে।”

অতঃপর নিজের গলার স্বর কিছুটা স্বাভাবিক করে অভিনবের দিকে তাকিয়ে বলল,
“অভিনব, তুমি বরং কায়েফের পাশে গিয়ে বসো। কুহুকে ওখানে বসতে দাও।”
অভিনব আর কথা বাড়াল না। সে উঠে গিয়ে কায়েফের পাশে বসল। কুহু এসে অভিনবের জায়গায় বসল। নিযানার অস্বস্তি হতে লাগল। সে আড়ালে বারকয়েক চেষ্টা করল নিজের কোমর থেকে কলরবের শক্ত হাতটা সরানোর। কিন্তু কলরবের বাঁধন আলগা হওয়া দূরের কথা, বিন্দু পরিমাণ সরলো না। নিযানা আর কোনো উপায় না পেয়ে বিরক্ত চোখে চেয়ে নিচু ও তপ্ত গলায় বলল,
“হাতটা সরাও কলরব! আমি যাচ্ছিনা কোথাও।”

কলরব ধীরে ধীরে ওর কোমর থেকে নিজের হাতটা আলগা করে ছেড়ে দিল। ট্রেন আপন গতিতে ছুটে চলল। মাঝখানে সবার সাথে টুকটাক কথাবার্তা হলেও ধীরে ধীরে তা ঝিমিয়ে এলো। জানালার ওপাশে তখন গভীর অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে। ধাতব শব্দ তুলে ট্রেন ছুটে চলেছে তার নিজস্ব ছন্দে। সারাদিনের ক্লান্তি আর চলন্ত ট্রেনের দোলনিতে একসময় কেবিনের সবাই প্রায় ঘুমে ঢুলতে শুরু করল।নিযানা ক্লান্তিতে চোখ বুজে নিজের মাথাটা পাশের কুহুর কাঁধে আলতো করে এলিয়ে দিল। কলরব পুরোটা সময় পলকহীন চোখে ওর দিকেই তাকিয়ে ছিল। সে আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। সতর্কতায় নিযানার মাথাটা কুহুর কাঁধ থেকে সরিয়ে এনে নিজের কাঁধের ওপর রাখল। তারপর আলতো করে নিজের একটা বাহুতে জড়িয়ে নিলো ওকে। যাতে ট্রেনের কোনো ঝাঁকুনিতে ওর ঘুমে ব্যাঘাত না ঘটে। অপর পাশে বসা অভিনব তখনও সজাগ ছিল। সে স্পষ্ট দেখতে পেল সবটা। কলরবও টের পেল অভিনব জেগে আছে, কিন্তু সে স্রেফ তাকে দেখেও না দেখার ভান করে চোখ সরিয়ে নিল। অভিনব অবশ্য কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। কেবল মনে মনে এক চিলতে হাসল। কলরবের এখন আর কোনো তিক্ত অতীত কিংবা অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুই ভাবতে ইচ্ছে করছে না। সমস্ত অভিযোগ আর দূরত্বের পর নিযানার এই উপস্থিতিতে তার বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘদিনের যন্ত্রণা যেন নিমেষে জুড়িয়ে গেল। এক অনির্বচনীয় সুখানুভূতি আর অদ্ভুত ভালোলাগায় আচ্ছন্ন হয়ে উঠল তার চারপাশের পৃথিবীটা।

“পাপ্পা, আমাদের যেতে আর কতক্ষণ লাগবে?”
দিব্যর প্রশস্ত বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিল দিয়া। একটু ঘুমঘুম চোখ বুজে মাথা তুলে আধো-আধো কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল সে। দিব্য মেয়ের মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
“এই তো সোনা, আমরা প্রায় চলে এসেছি।”
জানালার দিকে তাকিয়ে থাকা ইভান হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে চেঁচিয়ে উঠল,
“দিয়া, দিয়া দেখ! ওই দেখ আগুনের ফুলকি! বোধহয় বাইরে কেউ বাজি ফাটাচ্ছে!”
দিয়া ভীষণ বিস্ময় নিয়ে চোখের পাতা টিপে ট্রেনের জানালার বাইরে অন্ধকারের দিকে তাকাল। সেখানে ঝোপঝাড়ের ওপর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সোনালী-হলুদ আলো জ্বেলে দল বেঁধে উড়ে বেড়াচ্ছে অজস্র জোনাকি। তবে ইহানের ভুল ধরে দিয়ে ইভান বেশ অসন্তোষ প্রকাশ করল। নিজের ছোট গাল দুটি গম্ভীর করে বলল,
“এগুলো মোটেও আগুনের ফুলকি বা বাজি নয়, বুদ্ধু! এগুলো হলো জোনাকি। আমাকে দাদি বলেছিল।”
দিয়া হাত দিয়ে আলোগুলো দেখিয়ে আবার বলে উঠল,

“জোনাকি? ওয়াও! সো বিউটিফুল!”
ইভান মাথা নাড়ল। পাশে বসা ইহান মুগ্ধ চোখে ইভানের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ইউ আর দ্য গ্রেট ব্রো! তুমি কতকিছু জানো। মাম্মা, জানো? আমাদের স্কুলের সবাই না ইভানকে খুব পছন্দ করে!”
মৌনিতা ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে বলল, “তাই নাকি? কিন্তু আমি তো জানতাম সবাই আমার ইহান সোনাকেও খুব ভালোবাসে।”
ইহান সাথে সাথে মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ, বাসে তো! তবে ইভানের কাছে সবাই পড়া না বুঝলে হেল্প নিতে আসে। ওর কত প্রশংসা করে সবাই! ও তো পড়াশোনায় খুব ভালো, এইজন্য।”
দিব্য ইহানের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কেন, আমাদের ইহান বাবুর বুঝি পড়াশোনা করতে একদম ভালো লাগে না?”

“আমি আসলে অত পড়তে চাই না চাচ্চু। আমি বড় হয়ে নায়ক হব। একবারে সুপারস্টার! তারপর চাচির মতো সুন্দর আর একটা মেয়েকে বিয়ে করব।”
সবাই একযোগে হেসে উঠল। নবনী আদর করে ইহানের গালটা টেনে দিয়ে বলল,
“তাই নাকি? ঠিক আছে। ইহান যখন অনেক বড় হয়ে যাবে, তখন আমরা সবাই মিলে ওর জন্য খুব সুন্দর একটা বউ নিয়ে আসব।”
কাব্য অবশ্য ছেলের কথা শুনে বিরক্ত গলায় বলে উঠল,
“আশ্চর্য! এখনই বিয়ের কথা? এ ছাওয়াল আমার ছেলে কীভাবে হলো ভাই! নিশ্চিত বলছি, এসব ওই কলরবের কারসাজি। কলরবই ওকে এসব ভুলভাল কথা শিখিয়েছে। ওর সাথে মিশে মিশে দিন দিন বেয়াদব হচ্ছে! বলে কিনা, এতকিছু ছেড়ে নায়ক হবে।”

দিব্য ভাইকে থামিয়ে দিয়ে শান্ত গলায় বলল, “হুট করে বাচ্চাটাকে এভাবে ধমকাচ্ছিস কেন কাব্য? ও তো মনের কথাটা সহজ ভাবে বলেছে। তবে ইহান বাবু, নায়ক বা সুপারস্টার হতে হলেও পড়াশোনা করতে হয়। ততদিন তো মন দিয়ে পড়তে হবে। তাই না বলো?”
ইহান বাধ্য ছেলের মতো মাথা নেড়ে জিজ্ঞেস করল,
“চাচ্চু, আপনি আমাকে লাইক করেন?”
দিব্য কিছুটা অবাক হলেও ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে বলল,
“অবশ্যই করি! ইহান তো আমাদের সোনা একটা বাচ্চা!”

এই অবেলায় পর্ব ৪৮

কথাটা শুনে ইহান কিছুক্ষণ নিঝুম হয়ে চুপ করে রইলো। তার ছোট্ট কপালে ভাবনার ভাঁজ। যেন কোনো গভীর আর জটিল অংক মেলাচ্ছে মনের ভেতর। দিব্যসহ বাকি সবাই অত্যন্ত কৌতূহলী চোখে ওর দিকে তাকিয়ে রইল। সবাইকে হতভম্ব করে দিয়ে, পূর্ণ গাম্ভীর্য নিয়ে ইহান বলল,
“তাহলে আমি চাচ্চুর মতো বড় হয়ে গেলে, আমাকে দিয়ার সাথে বিয়ে দিবেন?”

এই অবেলায় পর্ব ৫০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here