Home এক দেখায় এক দেখায় পর্ব ২৭ (২)

এক দেখায় পর্ব ২৭ (২)

এক দেখায় পর্ব ২৭ (২)
সুরভী আক্তার

সময় গড়াচ্ছে আপন গতিতে । কেটে গেছে আরো কয়েকটা দিন ।‌ রাফি বসে থাকে নি । পরদিন থেকেই অফিস শুরু করেছে আবার ।‌ রাশেদ রায়হান চৌধুরী ও বাঁধা দেন নি ছেলেকে । রাফি যে বসে থাকার মতো ছেলে নয় তিনি সেটা খুব ভালো করেই জানেন ।‌সংগীত ক্যারিয়ারে গুরুত্ব দেয় না রাফি , যদি গুরুত্ব দিতো তাহলে আজ হয়তো বাবার বিজনেসে আসা হতো না ওর । সংগীত জগতে অতো বেশি গুরুত্ব না দিলেও একেবারে সংগীত থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারে নি সে । ভক্তদের ডাকে সাড়া দিয়ে মাঝে মাঝে ফিরে আসে তার সেই চিরচেনা রুজান রাফি রুপে । তবুও এক প্রকার বাধ্য হয়ে । গানের জগৎ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হতে চেয়েছিল সে , কিন্তু পারে নি ।
অতীতের কোন ঘটনা জড়িয়ে আছে এর সাথে । যার জন্য রাফি নিজেকে দুরে সরিয়েছে গানের জগৎ থেকে ।
আজ সকাল থেকে আবহাওয়া টা বেশ স্নিগ্ধ । গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে সকাল থেকে । মেঘের কালো চাদরে ঢেকে আছে চারপাশ । দুপুরের দিকে একটু কমেছিল বৃষ্টি । বিকেল হতেই আবারো ভারী বর্ষণ শুরু হয়েছে ।

টিউশন শেষে ইমরান স্যার সহ মিহি-রুহি দু’জনেই আটকে পড়েছে । বাইরে ভারী বর্ষণে এক সেকেন্ডই গাঁ ভিজে যাবে । তাই আর ক্লাস থেকে বের হয় নি কেউ । সময় শেষ হওয়ার পরও অনেক টা সময় পড়াশোনা নিয়ে আলোচনা করছেন ইমরান । শেষমেষ বই খাতা প্যাক করে গালে হাত দিয়ে বসে আছে তিনজনে । বৃষ্টি থামার কোন লক্ষন নেই । তিনজনে গল্প করছে টুকটাক । এই কদিনে ইমরানের সাথে বেশ ভালোই মিশে গেছে মিহি, রুহি । ইমরান স্বভাবে বড্ড প্রাণচঞ্চল আর মিশুক । সবসময় হাসি লেগেই থাকে ওর মুখে । ও ওর ফ্যামিলি নিয়ে টুকটাক গল্প শোনাচ্ছে মিহি রুহি কে । মিহি আর রুহি মিটিমিটি হাসছে ওর কথায় । মাঝে মাঝে শব্দ করে হাসছে ।
এদিকে অফিসের ভিতর নিজের রুমে বসে ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে আছে রাফি । ঠোঁট কামড়ে দু’আঙুল দিয়ে কপাল চুলকাচ্ছে অনবরত । ল্যাপটপের স্ক্রিনে সিসি ক্যামেরায় বন্দী তার প্রেয়সীর হাস্যোজ্জ্বল লাইভ ফুটেজ দেখে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটলো আপনা আপনি ।

তবে ভ্রু কুঁচকে আসছে ইমরান কে দেখে । এই ছেলে টা কি এমন বলছে যে ওরা এভাবে হাসছে ? ইমরান বয়সে রাফির মতোই হবে , স্মার্ট সুদর্শন, বিয়ে হয়েছে, বাচ্চা আছে এটা আলাদা ব্যাপার । এতো দিন রাফির বিয়ে হলে তার ও তো দু-একটা বাচ্চা হতো । বয়স তো আর কম হলো না । এসব চিন্তা মাথায় আসতেই সহসা জিভে কামড় বসালো রাফি । কি সব চিন্তা করছে ও ? ঐ সঙ্গ দোষে লোহা ভাসে — শান্তর সাথে থাকতে থাকতে এসব চিন্তা ওর নিজের মাথাতেও আসছে ।
রাফি ল্যাপটপ সামনের ডেস্কে রেখে ফোন লাগায় ইমরানের নাম্বারে । সে ফোন রিসিভ করতেই রাফি স্ক্রিনের দিকে চেয়েই সালাম দিয়ে স্বাভাবিক কন্ঠে বলে…
” আপনার জন্য বাইরে গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে,, পৌঁছে দেবে আপনাকে । বৃষ্টি কমার কোন লক্ষন নেই , সন্ধ্যা হয়ে আসছে । আপনি গাড়িতে গিয়ে বসুন , ড্রাইভার আপনাকে পৌঁছে দেবে ।
ইমরান এক গাল হেসে রুহি আর মিহি কে একবার পরখ করে বলে…

” এটার কোন প্রয়োজন ছিল না । আমি যেতে পারতাম । কিন্তু আপনার বোন , ওরা কি করবে এখন ।
” ওদের নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না । আমার স্টাফ গেছে ওদের আনতে ।
বলেই ফোন কেটে দেয় রাফি । ইমরান খানিক ভ্রু কুঁচকায় । অতঃপর বেরিয়ে আসে ক্লাস থেকে । বাইরে ড্রাইভার সহ গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল । সেটাতে উঠে পড়ে সে । রাফির স্টাফরা মিহি আর রুহি কে নিয়ে আসে অফিসের নিচে । ভারী বর্ষণ কমছে না , চার দিকে কালো মেঘের অন্ধকার নেমেছে । রাফির কেবিন সাত তলায় । সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গেলে বেহাল দশা হয়ে যাবে । আর এদিকে মিহি কিছুতেই লিফটে উঠবে না । সে বুকে হাত গুটিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে সিঁড়ির পাশে । রুহি বোঝানোর স্বরে আহ্লাদ করে বললো…
” চল না পাখি, ভাইয়ার সাথে একবার দেখা করে আসি । তুই তো ভিতরে যাস নি কেনো দিন । আজ দেখে নিস নিজের জামাই জান কোন জায়গায়, কাদের সাথে কাজ করে ।
মিহি চোখ পাঁকালো । রুহি ফের দাঁত কেলিয়ে ঠোঁট চেপে বললো…

” ওওওও….আমার ভাবি জান তো আবার লিফটে উঠতে ভয় পায় । Soo.. ভয় পেয়ে খামচে ধরার জন্য হলেও একটা শক্ত পোক্ত হাতের প্রয়োজন । আমার এই নরম হাত পোষাবে না এতে । তা .. সেদিনের মতো লাভ বাইট দেওয়ার জন্য ভাইয়া কে ডাকবো নাকি, ভাবি জান ? ডাকি?
” রুহি, প্লিজ জ্বালাস না আমায় ! বাড়িতে ফিরতে হবে, সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে । আব্বু টেনশন করবে ।
খানিক অসার কন্ঠে কথাটা বললো মিহি । মুখে হালকা চিন্তার ছাপ ফুটে উঠেছে । মিহি কে নিয়ে আব্বু ইদানিং একটু বেশি টেনশন করে । মিহি আর বাড়াতে চায় না আব্বুর টেনশন । এমনিতেই তার শরীরের অবস্থা ভালো নয় ।
রুহি মিহি কে সরু চোখে পর্যবেক্ষণ করলো , ওর শুকনো চিন্তিত মুখপানে চেয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করে বলল….
” আচ্ছা, তাহলে তোর ফোনটা দে , আমি ভাইয়া কে ফোন করে নিচে আসতে বলছি, আমরা আর উপরে যাবো না ।
কপাল কুঁচকালো মিহি । নাকের পাটা ফুলিয়ে তপ্ত স্বরে বলল…

” আমার ফোন কেনো দিতে যাবো ? তোর নিজের ফোন নেই ? জানিস না তোর ভাইয়া অচেনা অজানা মেয়েদের সাথে কথা বলে না , আমার নাম্বার চেনেন না উনি , আমার ফোন থেকে কল করলে ডিস্টার্ব হবেন তোর সুপারস্টার ভাই ।
” উফফ… সেদিন থেকে কি এককথা বারবার বলিস বলতো ? আমি তো কিছুই বুঝি না ! ভাইয়া তোর নাম্বার চিনবে না কেন ?
আর এমনিতেও আমার ফোনে ব্যালেন্স নেই । তাই তোর ফোন চাইছি…
মিহি চোখ উল্টে ভেংচি কাটলো । মনে মনে আওড়ালো….
” উহহহ.. চিনবে ? তাহলে সেই দিন চিনলো না কেনো ? অযথা নাটক করলেন কেনো উনি ? গায়ক না হয়ে নায়ক হতে পারতো তাহলে ।
বলতে বলতে ব্যাগ থেকে ফোন টা বের করে ধরিয়ে দিলো রুহির হাতে । রুহি মুচকি হাসলো ।
কিপ্যাডে রাফির নাম্বার টাইপ করে দেখলো ওর নাম্বার সেইভ করা নেই মিহির ফোনে । অমনি কপাল কুঁচকে শক্ত চোখে মিহির দিকে চাইলো রুহি ।
কন্ঠে গাম্ভীর্য ভাব টানলো কিছু একটা বলার জন্য । পরমুহূর্তে আর বললো না । দুষ্টু হাসি ফুটলো ঠোঁটের কোণে । প্রথম বার কল রিসিভ না হওয়ায় দ্বিতীয় বার কল করলো রুহি । ফোন কানে তোলার আগে সামনে থেকে একটা মেয়েলি কন্ঠ ভেসে আসলো…

” হাই,,, তুমি রুহি , তাই না ?
অকস্মাৎ সামনে তাকালো রুহি । সাথে সাথে মিহিও । ভ্রু কুঁচকে আসলো দুজনেরই । সামনে একটা সুন্দর মতো মেয়ে দাড়িয়ে আছে । দেখতে ভারী কিউট । মুখে ঝলমলে উচ্ছাসিত হাসি ‌। পড়নে বেশ রুচিশীল দামী পোশাক । রুহি মিহি মেয়েটার দিকে কয়েক পলক চেয়ে থেকে একে অপরের দিকে তাকালো ‌ । মিহি ভ্রু নাচাতেই রুহি ঠোঁট উল্টালো । অর্থাৎ মেয়েটা কে সে চেনে না । আবারো দুজনে একই সাথে দৃষ্টি পাত করলো সামনের মেয়েটার দিকে । রুহির হাবভাব বুঝে মেয়েটা এক গাল হেসে নিজে থেকেই বললো….
” আমাকে চেনো নি, তাই না ? চেনার কথাও নয়‌ ! কিন্তু আমি তোমাকে চিনি । তুমি রাফির বোন । আর আমার ভবিষ্যৎ….
উহুম… এটা সিক্রেট থাক , পরে আপনা আপনি জেনে যাবে ।‌
আপাতত আমার নামটা শুনে রাখো – আমি ‘তিথি’ ।
বলতে বলতে রুহিকে অকস্মাৎ জড়িয়ে ধরল মেয়েটা । রুহি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে স্থির দাঁড়িয়ে রইল । তিথি ওকে ছেড়ে দিতেই রুহি স্বাভাবিক কন্ঠে প্রশ্ন করলো…

” আপনি ভাইয়া কে চেনেন ?
” হুম , খুব ভালো করেই চিনি । ওর সাথেই তো দেখা করতে এসেছিলাম । কিন্তু শুনলাম ওর নাকি একটা আর্জেন্ট মিটিং আছে , বিজি আছে অনেক । তাই আজ আর দেখা হলো না ।
তবে খুব তাড়াতাড়ি দেখা হবে , তোমার ভাইয়ার সাথেও আর তোমার সাথেও । আজ আসি, দেরি হয়ে যাচ্ছে আমার ।
কথাটা বলেই তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে আসলো মেয়ে টা । রুহি এখনো অবাক লোচনে চেয়ে আছে । রুহি আর মিহি মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থাকার মাঝেই রাফি আসলো সেখানে । রুহি ফোন করেছিল ধরে নি , ফোন কেটে সোজা নিচে এসেছে ।‌ রুহি মিহির দৃষ্টি লক্ষ্য করে ওদের মনযোগ আকর্ষনের জন্য রাফি খানিক রাগান্বিত গম্ভীর স্বরে বলে উঠলো….

” এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেনো তোরা ? তোদের বলেছি না উপরে আসতে ।
রাফির ঝাঁজালো কন্ঠে মিহি রুহি চমকে তাকায় ওর দিকে । রাফির চোখ মুখে বিরক্তি প্রকাশ পাচ্ছে । কপাল কুঁচকে আছে । ভাঁজ পড়েছে কয়েক স্তর । রুহি ঢোক গিলে মিনমিন করে বললো….
” না মানে ভাইয়া, আসলে, দেরি হয়ে যাচ্ছে তাই আর উপরে উঠে সময় নষ্ট করলাম না ।
কিন্তু ঐ মেয়েটা কে ভাইয়া, তোমার সাথে দেখা করতে এসেছিল কেনো ?
রাফি একপলক মিহি কে দেখে শক্ত কন্ঠে বলল…
” চিনি না আমি । চল…

বলেই গটগট পায়ে হাঁটা লাগালো সে । রুহি ও কিছু বলতে চেয়েও পারলো না । মিহির হাত ধরে পিছু পিছু পা মেলালো রাফির সাথে ।
পুরো রাস্তায় একটা কথাও বলে নি রাফি । চোখ মুখ শক্ত হয়ে আছে ওর । দেখে মনে হচ্ছে রেগে আছে কোনো কিছু নিয়ে । মিহি কে বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে , রুহিকে নিয়ে বাড়িতে ফিরেছে রাফি ।
আট’টার দিকে রাতের খাবার খেতে বসেছে সবাই । রাফি দেরিতে নিচে নেমেছে । মাথা নিচু করে খাবার খাচ্ছে । রুহি মাঝে মাঝে পিটপিট করে তাকাচ্ছে ভাইয়ার দিকে ।
রাশেদ রায়হান চৌধুরী আর জুবায়ের চৌধুরী খাওয়া শেষে সোফায় বসে আছেন । লো ভয়েসে টুকটাক গল্প করছেন নিজেদের মধ্যে । হেনা বেগম ছেলে কে খাবার বেড়ে দিয়ে তাদের সাথে যোগ দিয়েছেন । শান্ত এসেছিল সন্ধ্যায় । সেও বসে বসে খাচ্ছে রাফির পাশে । তবে আজ ও নিজেও চুপ । কথা বলছে না । রুহির অবাক লাগছে আজকে সবার হাবভাব দেখে ।
ও মনে মনে হিসেব কষার চেষ্টা করছে । ধীরে ধীরে আনমনে হাত চালাচ্ছে খাবারের প্লেটে । শান্ত বারবার আড়চোখে দেখছিলো ওকে । এবার মুখ খুললো সে । নিচু স্বরে বলে উঠলো….

” কি হলো জান ,, খেতে ইচ্ছে করছে না ? এভাবে খাবারের প্লেটে হাত নাড়ছো কেনো ?
রুহি রাফি কে একবার দেখে মাথা একটু এগিয়ে ফিসফিস করে বললো…..
” আজ সবার কি হয়েছে বলুন তো ? আর ভাইয়ারই বা কি হয়েছে ?
শান্ত ঠোঁট কামড়ে রুহির মতোই ফিসফিস করে বললো…
” একটু পর সবটা বুঝতে পারবে ।
ততক্ষণে রাফির কোন রকমে খেয়ে উঠে পড়েছে । ব্যাসিন থেকে হাত ধুয়ে কোন দিকে না‌ তাকিয়ে সোজা পা বাড়িয়েছে সিঁড়ির দিকে । অকস্মাৎ পিছন থেকে গলা খাঁকারি দিয়ে ডেকে উঠলেন রাশেদ রায়হান চৌধুরী….
” রাফি…
পা থমকে গেল রাফির । না চাইতেও নিজেকে সামলে নিয়ে পিছন ফিরলো । স্বাভাবিক কন্ঠে বলল…
” জ্বি আব্বু…
” এদিকে এসো , বসো , কথা আছে তোমার সাথে ।
রাফিও এগিয়ে গেল বাধ্য ছেলের মতো । রুহি আর শান্ত তড়িঘড়ি করে খাবার শেষ করে একপাশে এসে দাঁড়িয়েছে । জেনি ও আছে ওদের সাথে । রাশেদ রায়হান চৌধুরী রাফির দিকে তাকিয়ে রাশভারী কন্ঠে বলে উঠলেন….
” আজ ‘তিথি’ এসেছিল অফিসে । দেখা করোনি কেনো ?
তিথির নাম শুনে রুহি চকিতে তাকালো শান্তর দিকে । শান্ত মিটিমিটি হাসছে , সে চোখের ইশারায় কিছু একটা বোঝালো রুহিকে । রাফি কপালে ভাঁজ ফেলে গম্ভীর স্বরে উত্তর করলো….
” দেখা করার প্রয়োজন ছিল না , তাই দেখা করি নি !
দীর্ঘশ্বাস ফেললেন রাশেদ রায়হান চৌধুরী । কন্ঠ নরম করে বললেন..

” দেখো রাফি, বড় হয়েছো তুমি । তোমার উপর আমাদের একটা দায়িত্ব আছে ।‌ বাবা মা হিসেবে এটা অনেক বড় দায়িত্ব আমাদের । তিথি আমাদের বিজনেস পার্টনার শাহিন সওদাগরের একমাত্র মেয়ে । মেয়েটা বেশ ভালো । তোমার আম্মুর ও অনেক পছন্দ হয়েছে ওকে । আমরা একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি , যদি তোমার কোন আপত্তি না থাকে তাহলে আমরা তিথি কে এই বাড়ির….
” আমার আপত্তি আছে আব্বু । আমি জানি তুমি কি বলবে । আর যা বলবে সেটাতে আমি রাজি নোই ।
” কেনো রাজি নোস তুই ? মেয়েটা কে দেখেছিস তুই ? কত সুন্দর একটা মেয়ে ! আমার তো ওকে অনেক পছন্দ হয়েছে ।
হেনা বেগমের কথায় রাফি তাকায় তার দিকে । নিজেকে স্বাভাবিক করে বলে…
” আমার পছন্দ নয় আম্মু । আর আমি এখন এসব নিয়ে ভাবতেও চাই না ।
রাশেদ রায়হান চৌধুরী তপ্ত শ্বাস ফেলে ছোট বাচ্চা বোঝানোর মতো করে বললেন..

” দেখো বাবা, বয়স হয়েছে তোমার । আর যদি আত্মীয়তার মধ্যেই সম্পর্ক গড়ে ওঠে তাহলে তো আরো ভালো । সম্পর্ক আরো জোরদার হবে এতে ।
এদিকে রাশেদ রায়হান চৌধুরীর কথা শেষ হতেই শান্ত ফোঁস করে ওঠে । একটু হেলে রুহির কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলে…
” জান.. তোমার বাপ দেখি ভালোই বোঝে । কিন্তু উল্টো বোঝে । এটা বোঝে না কোন আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক গড়তে হবে । আরে শশুর মশাই আমারে কি চোখে পড়ে না আপনার – বয়স তো আমারো কম হলো না আ । নাতি নাতনির মুখ দেখার ইচ্ছে নেই আপনার ? নিজের মেয়েকে তুলে দিন না আমার হাতে । এতে আপনার নিজের বোনের সাথে সম্পর্ক আরো বেশি জোরদার হবে ।
যে বিয়ে করতে চায় না তারেই সবাই তেল দেয় । আর আমারে তো কেউ পানিও দেয় না । উফফফ… ভালো লাগে না আর ।
রুহি ফিক করে হাসে । হাসি লুকিয়ে পরমুহূর্তে নিচু স্বরে বলে…

” উফফফ ,, আপনি না বড্ড অধৈর্য । চুপ চাপ থাকুন তো ।
রাফি ফের দ্বিগুণ ভারী গলায় জবাব দিলো…
” বললাম তো আব্বু, এসব নিয়ে এখন ভাবতে চাই না আমি । সময় আসুক সব হবে ।
বলেই পিছু ফিরে হাঁটা লাগায় । দু’পা এগিয়ে আবারো থেমে যায় । ঘাড় ঘুরিয়ে তিক্ত স্বরে বলে…
” আর হ্যাঁ… আর কোনো দিন যেন কোন মেয়ে আমার অফিসে না আসে ।
বলেই এক সেকেন্ড অপেক্ষা না করে নিজের ঘরে চলে গেল সে । হেনা বেগম কপালে ভাঁজ ফেলে সোফায় বসলেন । রাফির অসুস্থতার পর থেকে তিনি আরো বেশি চিন্তিত ছিলেন রাফি কে নিয়ে ‌। এদিকে ছেলের বয়স ও বাড়ছে, ভেবেছিলেন বিয়ে দিয়ে চিন্তা থেকে খানিক অব্যাহতি পাবেন তিনি ।
তার এই ভাবনার কথা রাশেদ রায়হান চৌধুরী কে জানানোর পর তিনি তিথি’র কথা বলেছিলেন । তিথি কে আগে থেকেই চিনতেন তিনি । হেনা বেগম ও বেশ পছন্দ করেছিলেন ওকে । উচ্চ বিত্ত বৈভব পূর্ণ পরিবারের মেয়ে তিথি ‌ । তার সাথে তিথির বাবা চৌধুরীদের বিজনেস পার্টনার । তাই এই সম্পর্কে আরো বেশি মতামত ছিল রাশেদ রায়হান চৌধুরীর ।

এর মধ্যেই ছেলের বউ কে নিয়ে অনেক পরিকল্পনা করে ফেলেছেন তিনি ।
কিন্তু রাফি, সব পরিকল্পনায় জল ঢেলে দিল ।
রাতের খাবার শেষে পড়তে বসেছে মিহি । দুই কানে হাত দিয়ে এক ধ্যানে জোরে জোরে পড়ছে ।‌ পড়া ব্যতীত অন্য কোন কিছু তে মনযোগ নেই ওর । ইদানিং পড়াশোনায় আরো বেশি সিরিয়াস হয়েছে সে । ক’দিন পর রেসাল্ট । কি হবে কে জানে । কিন্তু ভর্তি পরীক্ষায় যে করেই হোক ভালো কিছু করতে হবে ।
সব চিন্তা বাদ দিয়ে পড়তে বসেছে মিহি । এদিকে ফোনটা বেজে যাচ্ছে কখন থেকে । ফোনের শব্দ কানে পৌঁছাচ্ছে না মিহির । কান চেপে পড়ায় মগ্ন সে । আজমাল হোসেন বাইরে থেকে শব্দ পেয়ে মেয়ের ঘরে ঢুকে দুদিকে মাথা নাড়েন । নিঃশব্দে খাটের উপর থেকে ফোনটা হাতে তুলে নেন । রুহি ফোন করছে । তিনি এগিয়ে এসে মেয়েকে ডাকেন….

” আম্মু…
মিহি চকিতে তাকালো আব্বুর ডাকে । আজমাল হোসেন ফোন এগিয়ে দিয়ে বললেন….
” রুহি সেই কখন থেকে ফোন করছে , শুনতে পাও নি ?
মিহি চটপট করে ফোন হাতে নিলো । ততক্ষণে কেটে গেছে । মিহি আব্বুর দিকে তাকিয়ে আলতো হাসলো । আজমাল হোসেন মেয়ের মাথায় হাত রেখে মোলায়েম কন্ঠে বললেন…
” তুমি পড়ো আম্মু,, আমি আসছি ।
” ঔষধ খেয়েছো আব্বু..?
আজমাল হোসেন পা বাড়িয়ে থেমে গেলেন । আজকাল শুকনো কাশি বেড়েছে তার । শ্বাস কষ্ট ও আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে । তবুও নিজেকে ধাতস্থ করেন তিনি, বাইরে প্রকাশ করেন না কিছু । যতটা সম্ভব লুকানোর চেষ্টা করেন সবটা । তিনি মুচকি হেসে ছোট করে বললেন…
” হুম, খেয়েছি ।
বলেই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসলেন তিনি । মিহি আব্বুর যাওয়ার দিক থেকে চোখ সরিয়ে রুহির ফোনে কল লাগালো ।
ফোন রিসিভ করেই রুহি গদগদ হয়ে বলল….

” মাই ডিয়ার ভাবি জান…
ইউ আর সো লাকি…!
মিহি কপাল কুঁচকে মিহি স্বরে জিজ্ঞেস করল….
” কি জন্য আমি লাকি..?
” সেটা তো এখন বলা যাবে না ।
কাল টিউশনে আয় তারপর সামনা সামনি বলবো ।‌
” তাহলে এখন ফোন করলি কেনো ‌? এখন আমার শুনতে ইচ্ছে করছে , তুই এক্ষুনি বলবি ।
” উফফফ.. বেইবি…
এটা তোমার জন্য বিশেষ একটা কথা ‌ । এতো অধৈর্য হতে নেই । ইউ নো.. ধৈর্যের ফল মিষ্টি হয় ।

” ধুর..
দিলি তো মাথায় টেনশন চাপিয়ে । এখন যতক্ষণ না শুনছি ততক্ষণ শান্তি পাব না আমি, ঘুম হবে না আমার ।
” ঘুমোতে হবে না , তুমি সারারাত আমার ভাইয়ার কথা ভেবো তাতেই হবে । মনে মনে নিজের সংসার সাজাতে থাকো । আমি রাখছি…
আপনা আপনি ঠোঁট প্রসারিত হলো মিহির । লাজুক আভা ফুটলো মুখে । এই নিয়ে আর কথা বাড়ালো না । ফোন রেখে চেয়ারে হেলান দিয়ে দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেললো । আনমনে ভাবতে লাগলো কিছু একটা । ভাবতে ভাবতে নিজে নিজেই মুচকি হাসছে সে ।
রুহি ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে কথা শেষ করে আকাশের দিকে তাকালো । বৃষ্টি নেই এখন । শীতল ঠান্ডা হাওয়া বইছে । চাঁদ উঠেছে, চাঁদের জোছনা ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে । দুরে কোথাও ল্যাম্পপোস্টের আলোও দেখা যাচ্ছে । ব্যালকনির রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে এক দৃষ্টিতে গোল থালার মতো চাঁদের দিকে চেয়ে আছে রুহি । চুলগুলো খোলা এখনো , মৃদু হাওয়ায় ঢেউ খেয়ে উড়ছে ।
শান্ত রাফির ঘরের ব্যালকনির দরজায় হেলান দিয়ে বুকে হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে পলক হীন চেয়ে ছিল ওর দিকে ‌। চাঁদের ঝলমলে আলোয় চিকচিক করছে রুহির মুখশ্রী ‌ ‌। বেশ অনেকটা মূহূর্ত পর সে চোখ সরিয়ে এগিয়ে গেল রুহির কাছে ‌। আভাস পেতেই ঘাড় ঘোরালো রুহি । শান্ত কে দেখে মুচকি হাসলো , পরমুহূর্তেই চোখ ফেরালো আকাশের পানে । শান্ত ওর পাশাপাশি দাঁড়ালো । রুহির দৃষ্টি বরাবর চাঁদের দিকে একপলক চেয়ে আবারো রুহির দিকে তাকালো । ঘোর লাগা তীক্ষ্ণ ধারালো দৃষ্টিতে চেয়ে থাকলো আরো কয়েক মুহূর্ত । সময় যেন থমকে গেছে ওর কাছে । ওর দৃষ্টিতে রুহির অস্বস্তি হচ্ছে এবার । রুহি চোখ নামিয়ে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল…

” কি দেখছেন এভাবে ?
” চাঁদকে !
আবেশিত কন্ঠে ছোট্ট উত্তর শান্তর । রুহি কপাল কুঁচকে নিজেকে একপলক দেখে বললো…
” চাঁদ তো আকাশে । আপনি আমার দিকে চেয়ে আছেন কেনো ?
” উঁহুম.. আমার চাঁদ আমার সামনে !
একই স্বরে উত্তর করলো শান্ত । রুহি লাজুক হেসে জিজ্ঞেস করল…

এক দেখায় পর্ব ২৭

” তাই ?
” হুম !
” তা আকাশে যেটা আছে ওটা কি ?
শান্ত এবার তাকালো আকাশের দিকে । অতঃপর রুহির দিকে । কপাল কুঁচকে বললো…
” আমার চাঁদ আমার সামনে , আর আকাশে যেটা আছে ওটা কুমড়ো !

এক দেখায় পর্ব ২৮