এক দেখায় পর্ব ২৭
সুরভী আক্তার
এদিকে হসপিটাল থেকে ফিরতেই রাফি কে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে সবাই । চৌধুরী বাড়ির একমাত্র ছেলে সবার নয়নের মণি অসুস্থ, ব্যস্ত হওয়ারই কথা ।
রাফি নিজের ঘরে খাটের ব্যাক বোর্ডে হেলান দিয়ে বসে আছে । ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়ে মাথা এলিয়ে কোমল নেত্রে দেখে যাচ্ছে হেনা বেগমের কান্ড । হেনা বেগম ট্রে ভর্তি ফলমূল কেটে সাজিয়ে এনেছেন ছেলের জন্য । হসপিটাল থেকে ফেরার পর পরই ভেজা কাপড়ে ছেলের গাঁ মুছিয়ে দিয়েছেন তিনি । রাফি একদম ফিট আছে । তবুও হেনা বেগম খাট থেকে নামতে দেন নি ছেলেকে । ডাক্তার আপাতত ঝাল খাবার খেতে বারন করেছে রাফি কে , এলার্জি তে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে এতেও । হেনা বেগম এটা শুনেই ঝাল বিহীন রান্না করেছেন আজকে । আজ সবার ঝাল খাওয়া বন্ধ । ছেলের জন্য কাঁদতে কাঁদতে চোখ মুখ ফুলিয়ে ফেলেছেন তিনি ।
অ্যানাফাইলাক্সিস অত্যন্ত মারাত্মক । রাফির প্রাণের ঝুঁকি থাকতে পারতো এতে । ছোট বেলা থেকে রাফি কে সবসময় এলার্জি জনিত খাবার থেকে বিরত রেখেছেন তিনি ।
এখন তো ছেলে বড় হয়েছে । আগের মতো তো আর সবসময় চোখে চোখে রাখা যায় না । নিজের একান্ত জীবন হয়েছে তার । তবুও ছেলে কে নিয়ে সবসময় চিন্তায় থাকেন তিনি ।
রাফির সামনে বসে রাফি কে নিজের হাতে ফল খাইয়ে দিচ্ছেন তিনি । রাফিও বাধ্য ছেলের মত নিঃশব্দে খেয়ে যাচ্ছে মায়ের হাতে । এতক্ষণ রাফির ঘরে সবাই ছিল । এখন ওকে একটু রেস্ট করার জন্য সময় দিয়ে বেরিয়ে গেছে সবাই । শান্ত ঘরে ঢুকতে গিয়ে থমকে দাঁড়ালো দরজায় । মা ছেলের সুন্দর একটা মুহূর্ত দেখে বুকে হাত গুটিয়ে দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়ালো ও । মুচকি হাসলো একটু । আফসানা বেগমও তো শান্ত কে কম ভালোবাসে না ! কিন্তু শান্ত ? সে তো সময়ই দিতে পারে না আম্মু কে ! এড়িয়ে চলে সবসময় । একমাত্র ছেলে হওয়ার দরুন শান্ত কে কখনো চোখের আড়াল করতে চান না আফসানা বেগম । কিন্তু শান্ত , অধিক সময় চোখের আড়াল থাকে মায়ের । অনেক দিন হলো সময় করে একটু জড়িয়ে ধরা হয় না আম্মু কে । ঠিক মতো কথাও বলা হয় না । শান্ত হাসলো কিছু একটা ভেবে । আফসানা বেগমও এসেছেন রাফির অসুস্থতার কথা শুনে । এখন নিজ ঘরে আরাম করছেন তিনি । শান্ত কিছু একটা ভেবে পিছন ফিরলো আম্মুর কাছে যাওয়ার জন্য । দরজার চৌকাঠ পেরোনোর আগেই হেনা বেগমের কান্না ভেজা কন্ঠ কানে আসলো…
” দেখ রাফি ,, বড় হয়েছিস তুই ! তোকে নিয়ে সবসময় এমন টেনশন করতে আর ভালো লাগে না আমার । তুই কি নিজের ঠিকমতো খেয়াল টুকুও রাখতে পারিস না ? তুই তো জানিস তোর এলার্জি আছে , তাহলে এসব এলার্জি জনিত খাবার খাস কেনো তুই ?
রুহি বলল.. ওদের সাথে নাকি ফুচকা খেয়েছিলি , কি ছিল ফুচকায়, হঠাৎ এমন কেনো হলো তোর ?
রাফি আম্মুর হাত ধরলো । মোলায়েম কন্ঠে বললো…
” আম্মু, এসব বাদ দাও তো । এখন তো আমি ঠিক আছি । আর কি চাই তোমার ?
” এখন ঠিক আছিস, কিন্তু কাল ? কাল ঠিক ছিলি তুই ? অক্সিজেন নির্ভর ছিলি সারা রাত । একদিনেই কেমন শুকিয়ে গেছিস ! শরীর টা কেমন ফ্যাকাশে হয়ে আছে ।
কথা দে আমায়, আর কখনো এসব হাবিজাবি খাবার খাবি না তুই !
” আচ্ছা আম্মু , ঠিক আছে আর কখনো ওসব খাবো না আমি । তুমি এখন আর অতো টেনশন করো না তো , কাল সারারাত ঘুমাও নি, এখন গিয়ে একটু রেস্ট করো ।
দুজনের কথার মাঝেই শান্ত বাইরে না বেরিয়ে ঘরে ঢুকলো । শান্ত কে দেখে হেনা বেগম উঠে দাঁড়ালেন । গাঁ ম্যাজ ম্যাজ করছে তার । নিজেরও বিশ্রামের প্রয়োজন । শান্ত এসে দাঁড়ালো খাটের পাশে । হেনা বেগম শান্ত কে উদ্দেশ্য করে বললেন…
” শান্ত, বাবা তুই ও তো কাল থেকে অনেক ধকল সামলেছিস । তোরও বিশ্রামের প্রয়োজন । রাফির সাথে তুইও রেস্ট কর একটু , আমি আসছি ।
বলেই ধীর পায়ে ঘর ত্যাগ করলেন হেনা বেগম । তিনি চলে যেতেই শান্ত ঠোঁট কামড়ে কপাল কুঁচকে তাকালো রাফির দিকে । রাফি আম্মুর যাওয়ার দিক থেকে চোখ সরিয়ে শান্তর পানে তাকালো । শান্তর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দেখে ভ্রু কুঁচকে আসলো রাফির । স্বাভাবিক কন্ঠে বলল….
” কি দেখছিস এভাবে ?
শান্ত সিরিয়াস ভঙ্গিতে দ্বিগুণ ভারী গলায় শুধালো…
” কাল হঠাৎ অ্যানাফাইলাক্সিস আক্রমণ করলো কিভাবে ? কি খেয়েছিলি ?
রাফি গাঁ ছাড়া ভাব নিয়ে জবাব দিলো…
” খেয়েছিলাম কিছু একটা !
” চকলেট খেয়েছিলি ? কোথায় পেলি চকলেট ?
” পেয়েছি কোথাও…
” মিহি খাইয়েছে তাই না ?
” জানিস যখন, তখন জিজ্ঞেস করছিস কেনো ?
শান্ত তপ্ত শ্বাস ফেললো । বসলো রাফির পাশে । নরম কন্ঠে গলা নামিয়ে বললো…
” পাগল হয়ে গেছিস তুই ? তোর প্রাণ সংশয়ে
ছিল । যদি কিছু হয়ে যেতো ? সবটা জেনেও কেনো এমনটা করলি তুই ? ওকে বলতে পারতি, ও তো জানতো না বল । বেচারি জানার পর কতটা কষ্ট পেয়েছে ভাবতো । রুহির সাথে কথা হওয়ার পনেরো মিনিটের মাথায় ছুটে এসেছে ও । তাহলে ভাব , ওর কি অবস্থা হয়েছিল ।
রাফি আলতো হাসলো । বুকের বাম পাশে হাত রেখে চোখ বন্ধ করে মাথা এলিয়ে দিলো ব্যাক বোর্ডে । লম্বা শ্বাস টেনে হাস্কি স্বরে বলল…
” সত্যি পাগল হয়ে গেছি রে আমি ! বিশ্বাস কর আর পারছি না আমি । ও পাগল করে দিচ্ছে আমায় । আমি তো এমনটা ছিলাম না , কবে এমন হলাম ?
ওর চোখের স্বাভাবিক চাহনিও পুড়িয়ে ফেলে আমাকে , ছিন্ন ভিন্ন করে দেয় আমার হৃৎপিণ্ড কে । ওর হাসি সবসময় ঝংকার তোলে আমার কানে । আমি হারিয়ে যাচ্ছি । দিক দিশা হারিয়ে যায় আমার ওর সামনে গেলে । কিচ্ছু ভাবতে পারি না আমি । নিজের কথা ভাববো কি করে ?
জানিস, আমি যেমন এক দেখায় ওর মায়ায় জড়িয়ে গেছি, ও নিজেও একটু একটু করে জড়িয়ে যাচ্ছে আমাতে । শত চেষ্টা করলেও আর নিজেকে ছাড়াতে পারবে না আমার কাছ থেকে ।
শান্ত ঠোঁট কামড়ে হাসলো রাফির কথায় । রাফির অনুভূতি গুলো বুঝতে পারছে ও । ও নিজেও তো একসময় এই পর্যায়ে ছিল । না বোঝার কথা নয় ।
শান্ত এবার ঠোঁট চেপে রসিকতার সুরে টিটকারী মেরে বললো…
” তোকে দেখে একটা গান মনে পড়ে গেলো । বলি তাহলে ? জানি তোর মতো গলায় সুর নেই আমার , গলাটা ফাটা বাঁশের মতো হতে পারে । কিন্তু তবুও তোর অবস্থা দেখে আটকাতে পারছি না নিজেকে , বলি শোন…
উহুম উহুম……
Oo darling tu pehle SE Kitna
badal geya..
Strang Liye Jadu tera
‘Mihi Pakhi’ pe chal geya….
শান্ত হাত নেড়ে নেড়ে গাইলো দুলাইন । শান্তর বেসুরো গান আর তার অর্থ বুঝে হেসে উঠলো রাফি । শান্ত নিজেও তাল মিলিয়ে হাসলো । রাফি কে হাসতে দেখতে ভীষণ ভালো লাগে ওর । রাফি হাসতে হাসতে থেমে জোরে শ্বাস টানলো । নিগুড় চোখে চাইলো সিলিংয়ের দিকে ।
শান্ত বললো…
” তাহলে , অপেক্ষার প্রহর কবে শেষ হচ্ছে ? মিহি পাখি অনুভূতি থেকে বেরিয়ে বাস্তবে ধরা দিচ্ছে কবে ?
রাফি একই আবেশিত কন্ঠে উত্তর করলো…
” খুব তাড়াতাড়ি,, ইনশাআল্লাহ । আমার প্রতি ওর অনুভূতি গুলো আরো একটু গাঢ় হতে দে । ও চাওয়া অনুযায়ী আমিও চাই ও আমার চোখে ওর প্রতি আমার অনুভূতি, আকাঙ্ক্ষা ভালোবাসা সবটা বুঝুক । সবটা বোঝার পর ও যতদিন না আমার কাছে নিজে থেকেই ধরা দেবে ততদিন অপেক্ষায় থাকবো আমি ।
” উফফফ, যা করবি তাড়াতাড়ি কর ভাই । আমারো তো বিয়ে করতে ইচ্ছে করে নাকি ? তোর পর তোর বোন, আর তোর বোনের মানেই আমার বিয়ে ।
” আমার বোনের সাথে যদি কেউ তোর বিয়ে না দেয় তাহলে ?
” হুহহ..
কে দেবে না শুনি ? তোর বাপ ? শোন তোর বাপ যদি বেশি তেড়ামো করে না, তাহলে সাফ সাফ বলে দেবো.. ‘ শুনুন চৌধুরী সাহেব, হয় আপনার মেয়ে কে আমার হাতে তুলে দিন , আর নয়তো আমি নিজেই তুলে নিয়ে আসবো ওকে । কেউ আটকাতে পারবে না আমায় ।
রাফি আবারো হেসে ফেললো । শান্ত তপ্ত শ্বাস ফেলে শুয়ে পড়লো, একটু অসার কন্ঠে বলল..
” শোন ভাই তোর বোন শুধুই আমার । ও যতদিন এই বাড়িতে আছে, ততদিন ওকে শুধু আমার জন্য সেফ করে রাখিস প্লিজ । তার পর ওর দায়িত্ব আমার । ওকে নিয়ে তোদের আর কখনো, কোনো দিন ভাবতে হবে না । শুধু ওকে আমার জন্য লিখে দে একবার ।
ভেবে দেখ তুই এই একটা বছরেই মিহি পাখি কে ঠিক কতটা ভালোবেসেছিস , তাহলে আমি ? আমি গত আঠারো বছর ধরে তোর বোনকে চেয়ে এসেছি । রাগের মাথায় ওকে জেদ হিসেবে চেয়েছিলাম আমার জীবনে । কিন্তু এই জেদ যে কবে ভালোলাগা থেকে ভালোবাসায় পরিনত হয়েছে বুঝতেই পারিনি ।
তোর বোন রক্তের সাথে মিশে গেছে আমার ।
রাফি নরম দৃষ্টিতে চেয়ে মনযোগ সহকারে শান্তর কথা শুনলো । শান্তকে ও ভালো করেই চেনে । রুহি ওর জেদ , থেকে অবসেশন , ভালোবাসা সব পর্যায়ে ছিল সেই আঠারো বছর আগ থেকে ।
আজ থেকে আঠারো বছর আগে যখন রুহির জন্ম হয়েছিল তখন শান্ত আর রাফির বয়স ছিল হবে দশ বছর । নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমে হসপিটালেই জন্ম হয়েছিল রুহির । জন্মের পর সবসময় প্যাঁচ প্যাঁচ করে নাকে কান্না কাঁদতো রুহি । শান্ত আর রাফি কখনোই কাছে যেতো না ওর । দুর থেকে অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকতো ওর দিকে । কি সুন্দর মোমের পুতুলের মত একটা বাচ্চা ছিল রুহি । গায়ের রং টুকটুকে ছিলো, টোকা দিলেই যেন রক্ত গড়িয়ে পড়বে ।
হসপিটাল থেকে তিন দিন পর বাড়িতে নিয়ে আসা হয়েছিল ওদের । চৌধুরী বাড়িতে দ্বিতীয় কোনো কন্যা সন্তান হওয়ায় পুরো ধুম পড়ে গেছিলো বাড়িতে । রাবেয়া চৌধুরীর গর্ভে মিফতাহুল ছিল তখন । শারীরিক অসুস্থতায় তিনি অতটা ঘর থেকে বের হতে পারতেন না । কোলেও নিতে পারতেন না রুহি কে । জুবায়ের চৌধুরীর ও বিয়ে হয় নি তখন । রুহির দেখাশোনার জন্য অনেককেই রাখা হয়েছিল সেই সময় । কিন্তু রুহি কারোর কোলেই থাকতো না । সবসময় প্যাঁচ প্যাঁচ করে কাঁদতো । আফসানা বেগম আর হেনা বেগম ব্যতীত ওকে কেউ সামলাতে পারতো না । হেনা বেগমের থেকে আফসানা বেগমের কোলে অধিক সময় থাকতো রুহি । শান্তর এতে বেশ হিংসে হতো । ওর আম্মু কিনা ওকে ছেড়ে এই ছিঁচকাদুনে মেয়েটাকে কোলে নিয়ে থাকে সবসময় । আদরও করে অনেক । শান্ত কটমট করে জ্বলতো হিংসায় । রুহির কাছে আসতো না কখনো ।
রাফিও বোনকে দুর থেকে দেখতো সবসময় । কাছে আসলেও ভয়ে ছুঁয়ে দেখতো না । যদি ব্যাথা পায় বা কেঁদে দেয়, এই ভয়ে কাছেও আসতো না রাফি । রাফির সাথে সবসময় যুক্ত থাকতো শান্ত । চোখ পাকিয়ে কটমট করে তাকাতো রুহির দিকে । রুহির উপর খুব ভীষণ রাগ হতো ওর ।
রুহির জন্মের এক সপ্তাহ পর ওকে ঘরে ঘুম পাড়িয়ে বাইরে এসেছিলেন হেনা বেগম । আফসানা বেগম বা অন্য কেউ ও আশেপাশে ছিল না । রাফি আর শান্ত খেলছিল ঘরের মেঝেতে । দোলনায় শোয়ানো ছিল রুহি । হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কেঁদে ওঠে ও । রাফি আর শান্ত একসাথে ভড়কে যায় । দু’জনে কোন কিছু না ভেবে প্রথম বারের মত ছুটে যায় ওর কাছে । হাত পা নাচিয়ে নাচিয়ে কাঁদছে রুহি । রাফি শান্ত কে ওর কাছে রেখে ছুটে যায় আম্মু কে ডাকতে । শান্ত সেই প্রথম বার ভালো করে দেখেছিল রুহিকে । বরাবরের মতো রুহির কান্না অসহ্য লাগে নি । বরং রুহির কান্না মাখা ছোট্ট পাখির ছানার মতো বাচ্চা মুখটা দেখে মায়া লেগেছিল ওর । শান্ত একটু ঝুঁকে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে কান্না থামানোর চেষ্টা করে । আচমকা ছোট্ট ছোট্ট নখের কবলে পড়ে শান্তর চুল । রুহি কাঁদতে কাঁদতে ঠিকড়ে উঠে খামচে ধরে শান্তর চুল । কোন রকমে চুল ছাড়ালেও আবার শান্তর ছোট হাতে আঁচড় পড়ে রুহির নখের ।
শান্তর নরম হাতে বেশ শক্ত করেই খামচে ধরেছিল রুহি ।
পরমুহূর্তে হেনা বেগম এসে সামলেছেন ওকে । হাতে খামচি দেওয়ায় শান্ত আরো বেশি রেগে যায় রুহির উপর । রাগে ফোঁস ফোঁস করতে করতে রাফির কাছে এসে নালিশ করে…
” দেখ, তোর ছিঁচকাদুনে বোন কি করেছে আমার হাতে । কত শক্তি দেখেছিস ওর । দাগ বসিয়ে ফেলেছে পুরো আমার হাতে । ব্যাবি বলে কিছু বললাম না, কিন্তু ও শুধু একবার বড় হোক আমি কিন্তু এর রিভেঞ্জ নিয়েই ছাড়বো বলে দিলাম ।
রাফি তখন তীক্ষ্ণ স্বরে জবাব দিয়েছিল…
” খবরদার আমার বোন কে কিচ্ছু করতে পারবি না । ও আমার বোন , ওকে কিছু করলে তোকে ছাড়বো না আমি ।
শান্ত বাচ্চা সুলভ হৃদয়ে একটু রেগে জেদ খাটিয়ে বলেছিল…
” ও তোর বোন , কিন্তু দেখিস ওকে আমি বড় হয়ে বিয়ে করবো । তখন আমি আমার এই প্রতিশোধ নিয়ে নেবো । তখন কিচ্ছু করতে পারবি না তুই । ওকে বিয়ের পর আমিও চিমটি কাটবো ।
পুরনো স্মৃতি চারণ করে রাফি আর শান্ত দু’জনেই মৃদু হেসে ওঠে । সেই একটা চিমটির প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য রুহির পিছনে পড়েছিল শান্ত । সবসময় খোঁচাতো রুহিকে । কিন্তু গায়ে হাত দিতো না কখনো । ধীরে ধীরে বড় হওয়ায় সাথে সাথে অনুভূতিরা পরিবর্তন হয় । একটা জেদ পরিনত হয় ভালো লাগায় । আর সেটা একসময় ভালোবাসায় ।
শান্ত জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে কোমল স্বরে বলে….
” তোর বোনের উপর সেই চিমটির প্রতিশোধ নেওয়া এখনো বাকি । আমি কিন্তু কিছু ভুলি নি । একবার খালি বিয়েটা হতে দে , সত্যি বলছি আমি কিন্তু প্রতিশোধ নিয়েই ছাড়বো । ছাড় পাবে না তোর বোন । হাজার গুণ বাড়িয়ে প্রতিশোধ নেবো আমি ।
রাফি এবার গলা খাঁকারি দিয়ে শুকনো কেশে ওঠে । গলা পরিষ্কার করে বলে…
” হয়েছে , আমার সামনে এসব বলতে হবে না । ভাইয়া হোই আমি ওর । আগেও ছিলাম, আর এখনো আছি ।
এখন যা দেখি, আমার টায়ার্ড লাগছে ভীষণ । তুইও রেস্ট নে একটু ।
শান্ত উঠতে উঠতে বলল…
” তুই রেস্ট কর । আমি একটু আম্মুর কাছ থেকে আসছি ।
বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে আসে শান্ত ।
আফসানা বেগম ঘরে আধশোয়া হয়ে শুয়ে আছেন । রুহিও আছে তার সাথে । জেনি ঘুমিয়েছে । তাই কারোর সঙ্গ না পেয়ে রুহি এখন এসেছে আফসানা বেগমের কাছে । টুকটাক গল্প হচ্ছে দুজনের মাঝে ।
শান্ত বাইরে থেকে কড়া নাড়ে দরজায় । আফসানা বেগম মাথা তুলে তাকান । শান্ত ঘরে ঢুকতেই রুহি জড়োসড়ো হয়ে বসে । মুচকি হাসে একটু । শান্ত রুহির চোখে চোখ রেখে রুহির হাসিতে নিজেও হেসে ওঠে নীরবে । অসময়ে ছেলে কে দেখে অবাক হন আফসানা বেগম । তিনি প্রশ্ন সূচক নয়নে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেন…
” কি হয়েছে বাবা ? রাফি ঠিক আছে ?
শান্ত এগোতে এগোতে জবাব দেয় ..
” হুম আম্মু..!
” তাহলে তুই এখানে, ক্লান্ত দেখাচ্ছে তোকে ! খেয়েছিস কিছু ? একটু বিশ্রামের প্রয়োজন তোর ।
শান্ত কিছু না বলে খাটে শুয়ে আচমকা আম্মুর কোলে মাথা রাখে । চোখ বন্ধ করে শ্বাস টেনে আবদারের সুরে বলে…
” মাথা টা ভীষণ যন্ত্রণা করছে আম্মু । ভালো লাগছে না কিছু । মাথায় একটু আগের মতো হাত বুলিয়ে দেবে ? কতদিন এভাবে হাত বুলিয়ে দাও নি বলতো ?
আফসানা বেগম হাঁ বনে যান ছেলের কথায় । ঠিক কত দিন পর শান্ত এভাবে কোলে মাথা রাখলো তার । বাচ্চা সুলভ ঠিক আগের মতো আবদার করলো ! এখন তো বড় হয়েছে ছেলে । এসবের জন্য আলাদা করে সময় পায় না আর । ব্যস্ততায় থাকে সবসময় ।
ছেলের ক্লান্ত মুখ পানে তাকিয়ে চোখ ভরে ওঠে আফসানা বেগমের । তিনি তড়িতে স্নেহ মাখা হাত বুলিয়ে দিতে থাকেন ছেলের মাথায় । রুহিও অবাক হয় খানিক ।
মা ছেলেকে আলাদা সময় করে দিয়ে খাট থেকে নেমে আসতে চায় বেরিয়ে আসার জন্য । রুহি খাট থেকে নামার আগেই শান্ত মোলায়েম কন্ঠে ডাকে…
” রুহি..
তুমি কোথায় যাচ্ছ ? তুমিও এখানেই থাকো প্লিজ ! ভালো লাগছে !
রুহি ঘাঢ় বাঁকিয়ে তাকালো শান্তর দিকে । শান্ত আধো চোখ খুলে মুচকি হেসে চোখের ইশারায় থাকতে বললো ওকে ।
রাত ১০ টা পেরিয়েছে । রাতের ডিনার শেষে ঘরে এসেছে মিহি । মনটা কেমন ছটফট করছে । স্থির থাকতে পারছে না ও । একটু আগে রুহির সাথে কথা হলো । কাল টিউশন আসবে । অনেক সময় ঘোর প্যাঁচ কথা বলার পরেও রাফির বিষয়ে একটা কথাও বলে নি মিহি । গলায় এসে দ্বিধায় আটকে যাচ্ছিল কথা গুলো । অস্বস্তি হচ্ছিল ভীষণ । রুহিও আগ বাড়িয়ে কিছু বলে নি । ও চাইছিল মিহি আগে থেকেই জিজ্ঞেস করুক । কিন্তু না , মিহি তো তা করলো না । কথা শেষে ফোন কাটলো দু’জনে ।
মিহির খারাপ লাগছে ভীষণ । ওর জন্যেই তো হয়েছে সব কিছু । হসপিটাল থেকে এসেছে থেকে একটা বারও খোঁজ নিলো না রাফির । এটা বেমানান । খোঁজ নেওয়া টা দরকার ।
মিহি ঘরের মধ্যে অস্থির ভাবে পায়চারি করলো কিছুক্ষণ । রাফির নাম্বার আছে ওর কাছে । অনেক ভেবে শ্বাস টেনে সাহস জোগালো নিজেকে । কুন্ঠা ঠেলে প্রথম বারের মত ডিরেক্ট ফোন লাগালো রাফির নাম্বারে । কাঁপা হাতে ফোন তুললো কানে । গলা অবধি কাঁপছে ।
এদিকে রাফির ফোন শব্দ করে বেজে উঠতেই কপাল কুঁচকায় রাফি । অনেক দিন পর পরিবারের সাথে গল্প গুজবে বসেছে সে । ড্রইং রুমে উপস্থিত আছে সবাই । আফসানা বেগম আর শান্তও আছে এখানে । সন্ধ্যার দিকে জাকির হোসেন ও এসেছেন । পুরো পরিবার মিলে আড্ডা বসিয়েছে রাতের খাবার শেষে ।
রাফি শান্ত হয়ে বসে ছিল এতক্ষন । ফোনের শব্দে কপাল কুঁচকে পকেট থেকে ফোন বের করে । অমনি ফোনের ক্রিনে ভেসে ওঠা ‘Blossom’ নামে সেভ করা নাম্বার দেখে গোটানো কপাল শিথিল হয় আপনা আপনি । অবাকের সাথে সাথে ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে ওঠে । পাশ থেকে রাশেদ রায়হান চৌধুরী রাফি কে উদ্দেশ্য করে বলেন…
” কে ফোন করেছে বাবা ?
রাফি ফোনটা হাতের মুঠোয় নিয়ে ঘন পলক ফেলে উঠে দাঁড়ায় সোফা ছেড়ে । শান্ত ঠোঁট কামড়ে উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করে । রাফি স্বাভাবিক কন্ঠে বলে…
” তেমন কেউ না আব্বু , আমি একটু কথা বলে আসছি !
বলেই বড় বড় পা ফেলে উঠতে থাকে সিঁড়ি বেয়ে । উঠতে উঠতেই ফোন কেটে গেছে । রাফি প্রথম বার ফোন রিসিভ না করায় মিহি আবারো ডায়াল করে । এবার ঘরে গিয়ে সোফায় গাঁ এলিয়ে দিয়ে ফোনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে ফোন রিসিভ করে রাফি । ফোন রিসিভ করে কেউ কোন কথা বলে না । দু’জনেই একে অপরের কথা বলার অপেক্ষায় আছে । কয়েক সেকেন্ড পর মিহি নরম কন্ঠে সালাম দেয়…
” আ..আসসালামুয়ালাইকুম..!
রাফি মুচকি হাসে । গলা ভারী করে উত্তর দেয়…
” ওয়ালাইকুমুস সালাম..!
” কেমন আছেন এখন ?
রাফি আবারো ভারী গলায় উত্তর করলো..
” জ্বি আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি ! কিন্তু আপনি কে ? আপনাকে তো চিনলাম না ?
থতমত খেলো মিহি । অপ্রত্যাশিত প্রশ্নে কিঞ্চিত অবাক হলো । ভ্রু যুগল কুঁচকে এলো আপনা আপনি । রাফি ওকে চিনতে পারলো না ? নাম্বার না চিনুক ওর গলার স্বর ও চিনলো না ? কিন্তু নাম্বার তো চেনার কথা ! রুহি তো অনেক সময় রাফির ফোন থেকে কল করে মিহিকে । তবুও রাফি চিনলো না ।
মিহি গলার স্বর অবধি ও চিনলো না । এতে খারাপ লাগার সৃষ্টি হলো মিহির মনে ।
চোখ মুখে ভাঁজ পড়লো ।
মিহি সময় নিয়ে গলা স্বাভাবিক করে বলল…
” আমি,, চিনতে পারেন নি ?
রাফি আবারো অচেনার ভান করে ঠোঁট চেপে বললো…
” না তো ! কে আপনি ? আপনি আমায় চেনেন ? আর আমার নাম্বার কোথায় পেলেন ?
দেখুন আমি কিন্তু অচেনা, অজানা মেয়েদের সাথে কথা বলি না ।
মিহির খারাপ লাগা বারলো । বুকের ভেতর অদ্ভুত চিনচিনে ব্যাথা অনুভব হলো । গলা জড়িয়ে আসলো আপনা আপনি ।
ঠোঁট উল্টে ধৃষ্ট স্বরে বলল…
” ঠিক আছে , কথা বলতে হবে না । রাখি..!
বলেই কান থেকে ফোন নামালো মিহি । চোখের কোনে পানি জমেছে অজান্তেই । ফোন কাঁটার আগে রাফি ডাকলো…
” শুনুন…
মিহি থমকালো । বারবার এই স্বর থমকে দেয় মিহি কে । তবে এবার নিজেকে সামলে নিলো মিহি । কথা বললো না । ফোন টাও কানে তুললো না । মুখের সম্মুখে ধরে রইলো । মিহির সাঁড়া না পেয়ে রাফি বললো…
” ঐ যে আপনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন না যে আমি কেমন আছি , এর পরিবর্তে আমার ও জিজ্ঞেস করা উচিত আপনাকে । তা আপনি কেমন আছেন ?
মিহি দাঁত পিষে কাঠখোট্টা স্বরে জবাব দিলো ..
” একটা অচেনা অজানা মেয়ে কেমন আছে সেটা আপনার না জানলেও চলবে !
বলেই ক্ষিপ্ত হয়ে টুং টুং করে ফোনটা কেটে দিলো মিহি । সেটা ছুড়ে মারলো খাটের এক পাশে । গোমড়া মুখে উবু হয়ে বালিশ জড়িয়ে শুয়ে পড়ল ।
এদিকে ফোন কাটতেই রাফি ভড়কালো । বেশি বেশি হয়ে গেলো বোধ হয় । এমনটা করা উচিত হয় নি হয়তো । মেয়েটা প্রথম বার ফোন করলো, আর এভাবে ওর সাথে কথা বলাটা কি ঠিক হলো ? এবার রাফির নিজের ও খারাপ লাগলো ।
পরদিন ঠিক দুপুর দুটোর দিকে টিউশন ছিলো । বাড়ির গাড়িতেই মিহি সহ রুহি একই সাথে টিউশনে এসেছে । মিহি আজ বড্ড চুপচাপ । হিসেব করে কথা বলছে । হিসেবের বাইরে একটা কথাও বলছে না । কেমন গম্ভীর হয়ে আছে । রুহি লক্ষ্য করেছে সেটা । তবে এই বিষয়ে কিছু জিজ্ঞেস করে নি । ভেবে রেখেছে একেবারে টিউশনের পর জিজ্ঞেস করবে ।
রাফি আজ অফিসে আসে নি । ওকে আসতে দেওয়া হয় নি । ক’দিন রেস্ট করার জন্য অফিস থেকে এক প্রকার ছুটি দেওয়া হয়েছে ওকে ।
টিউশন শেষ পাঁচটার দিকে । তিন ঘণ্টা ক্লাস করতে করতে বিরক্তি লাগছে মিহি আর রুহি কে । এতক্ষণ বসে থাকতে থাকতে খিল ধরে গেছে কোমরে । বাড়ির গাড়ি অপেক্ষা করছে অফিসের সামনে । সেটাই এখন পৌঁছে দেবে ওদের । বাইরে বেরিয়েই রুহি মিহি কে জিজ্ঞেস করে…
” আজ বেশি কথা বলছিস না কেনো বলতো ?
কি হয়েছে ?
” কোই, কিছু না তো !
” ভাইয়ার শরীর কেমন আছে কাল থেকে একবারও জানতে চাইলি না যে ? জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হয় নি ? টেনশন হয় নি ভাইয়া কে নিয়ে ?
মিহি স্বাভাবিক ভাবেই বললো…
” তোর ভাইয়া ভালোই আছে নিশ্চয়ই ! আর তোর ভাইয়ার খবর নেওয়ার আমি কে ? অচেনা অজানা একটা মেয়ে আমি , আমাকে কেউ মনে রাখে যে আমি কাউকে মনে রাখবো ?
রুহি ভ্রু কুঁচকায় মিহির কথা শুনে । মিহির কন্ঠে স্পষ্ট রোষাবেশ প্রকাশ পাচ্ছে । রুহি ভারী গলায় প্রশ্ন করে…
” তুই আবার অচেনা অজানা হলি কবে থেকে , আর তোকে আবার কে মনে রাখলো না শুনি ?
” অচেনা অজানা আমি শুরু থেকেই । কে হোই আমি তোদের । তোরা চিনিস আমায় যে মনে রাখবি ।
মিহির ঘোর প্যাঁচ কথায় রুহি ভ্রু যুগল কুঁচকালো নাকের ডগা বরাবর । পর মুহুর্তে শান্ত স্বরে বলল..
” কি হয়েছে ভাবি জান ? ভাইয়া কিছু বলেছে তোকে ?
মিহি বিরক্তি প্রকাশ করলো । খিটখিটে তপ্ত স্বরে বলল…
” খবরদার ভাবি জান বলবি না আমায় । কে হোই আমি তোর ভাইয়ের ? একটা অচেনা অজানা মেয়েকে কেনো তোর ভাইয়া কিছু বলতে যাবে ?
” উফফফ.. তখন থেকে কি বারবার এক কথা বলে যাচ্ছিস বল তো ? তুই অচেনা অজানা হতে যাবি কেনো ? তুই তো আমার ভাবি জান, আর আমার ভাইয়ার জান !
” কে কার জান শুনি ?
পুরুষালি পরিচিত ভরাট কন্ঠে মিহি রুহি সহসা সামনে তাকায় । রাফি এসে দাঁড়িয়েছে ওদের সামনে । মুখে হালকা হাসি । মিহি চোখ সরিয়ে নেয় মুহূর্তের মধ্যেই । চোখ মুখ আরো বেশি শক্ত করে ফেলে । মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে,আজ ও কিছুতেই তাকাবে না এই লোকটার দিকে, কথা বলা তো দুরের কথা ।
ভাইয়া কে দেখে রুহি আপ্লুত হয়ে বলে…
” ভাইয়া, তুমি এসেছো ? কিন্তু তুমি আসতে গেলে কেনো ? তোমার রেস্টের প্রয়োজন এখন ? আম্মু আসতে দিলো তোমায় ?
রাফি মুচকি হেসে বললো…
” এমনি আসলাম । অফিসে একটা কাজ ছিল । আর তোদেরকেও দেখতে আসলাম !
” ওও…
তা আমা..দের দেখতে আসলে ?
খানিক মেকি স্বরে দুষ্টু হেসে কথাটা বলে রুহি । রাফি চোখ সরু করে তাকায় ওর দিকে । রুহি তৎক্ষণাৎ নিজের দু’ঠোটের মাঝখানে আঙুল চেপে মুখ বন্ধ করে নেয় । রাফি এবার গভীর দৃষ্টিতে তাকায় মিহির দিকে । মিহি দুহাত বুকে গুটিয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে । অভিমান হয়েছে মেয়ের । কপাল ও থুতনিতে ভাঁজ পড়ে আছে । মিহির অভিমানী আদল রাফির মনে স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে দিচ্ছে । নিঃশব্দে হাসে রাফি ।
আচমকা ফোন টা বেজে ওঠে ওর । ফোনের শব্দে মিহি বাঁকা চোখে তাকায় রাফির দিকে । চোখ মুখে কোন পরিবর্তন আনলো না তবুও ।
রাফি ফোন রিসিভ করে । ওপাশ থেকে কিছু একটা বলতেই রাফি গম্ভীর স্বরে বলে…
” সরি, রং নাম্বার । আমি চিনি না আপনাকে ! আর বারবার এভাবে ফোন করে ডিস্টার্ব করবেন না আমায় । আমি অচেনা অজানা কোন মেয়ে বা কারোর সাথেই কথা বলি না ।
বলেই ফোন কেটে আবারো ফোন পকেটে রাখে রাফি । রাফির কথা গুলো কানে পৌঁছাতেই মিহি ঠোঁটের এক কোণা কামড়ে সোজাসুজি তাকায় ওর দিকে । রাফিও মিহির দিকে চোখ ফিরায় একই সময় । চোখাচোখি হয় দুজনের । রুহি ঠোঁট থেকে হাত সরিয়ে লম্বা শ্বাস ছেড়ে বলল…
” বাবা…
কি হয়েছে আজ তোমাদের বলতো ? একজন নাকি অচেনা অজানা মেয়ে, আর একজন কে নাকি অচেনা অজানা মেয়ে ডিস্টার্ব করছে ?
তোমাদের ব্যপার-স্যাপার কিন্তু ডাউট লাগছে আমার কাছে !
রাফি খানিক বিরক্তি সূচক কন্ঠে বলল…
” এই অচেনা অজানা মেয়েটা আবার কে ?
” কে আবার ? আমার এই ভা.. না মানে পাখি..! সে বলছে তাকে নাকি কেউ চেনেই না, মনেই রাখে না ওকে কেউ ।
মিহি শক্ত কন্ঠে বলল…
” চুপ করবি ? ভালো লাগছে না আমার ! আমি গেলাম !
” কোথায় যাবি ?
” বাড়িতে !
” একা ?
” নাহ, তোর দুলাভাই প্রাইভেট প্লেন বুক করেছে আমার জন্য ! সেটা আসছে ব্যান্ড পার্টি নিয়ে , সেটাতেই যাবো !
একটু মেকি রাগান্বিত স্বরে কথাটা বললো মিহি । রুহি অবাক হওয়ার ভান করে রাফির দিকে তাকিয়ে কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করল..
” ভাইয়া, প্লেন বুক করেছো তুমি ? কোই আমায় বললে না তো ?
মিহি এবার দাঁত চেপে চিমটি কাটল রুহি কে । সহসা ‘আউচচ’ বলে মৃদু চেঁচিয়ে উঠলো রুহি । মিহি রাগান্বিত দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো রুহির দিকে । তা দেখে ফ্যাল ফ্যাল করে বোকার মত হাসলো রুহি ।
রাফি দুজনের কান্ড দেখে হাসি আটকে বললো…
” প্রাইভেট প্লেন না , তবে প্রাইভেট কার আছে । চলুন, পৌঁছে দেই আপনাদের !
মিহি মুখ ফিরিয়ে শান্ত স্বরে বলল…
” কোন প্রয়োজন নেই , একটা রিকশা ডেকে দিন । আমি যেতে পারবো !
” তা কি করে হয় ? আপনাকে একা ছাড়তে পারি কি করে ? আফটার অল আপনি আমার বোনের বেস্ট ফ্রেন্ড বলে কথা , অচেনা অজানা কোন মেয়ে হলে সেটা আলাদা ব্যাপার হতো ।
মিহি এবার রাফির দিকে তাকিয়ে দ্বিধা হীন ভাবে আঙুল তুলে বললো…
” বার বার এক কথা বলবেন না বলে দিলাম ! কাল থেকে আমার মাথায় চড়ে আছে এই কথাটা ।
রুহি সুযোগ বুঝে ওদের পাশ কাটিয়ে পা টিপে টিপে গাড়িতে এসে বসে । রাফি শান্ত নরম চোখে চেয়ে মৃদু হাসে । একই দৃষ্টিতে চেয়ে মোলায়েম স্বরে বলে…
” সরি , আর বলবো না । চলুন…
মিহিও কথা বাড়ালো না আর । বড় বড় পা ফেলে উঠে পড়লো গাড়িতে ।
মিহি দের বাড়ির সামনে এসে ওকে নামিয়ে দেওয়া হয় । এতক্ষণে একটু হাসি ফুটলো মিহির ঠোঁটে । গাড়ি থেকে নেমে এক চিলতে হেসে রুহির উদ্দেশ্য বললো…
” আসি পাখি..!
সাবধানে যাস ! আর বাড়িতে পৌঁছে আমাকে ফোন করবি কিন্তু !
রুহি নাক সিটকে মুখ বাঁকিয়ে বললো…
” আমাকে বলছিস কেনো ? ভাইয়ার মাথা থেকে বের হয়ে ভাইয়া কে বল, ভাইয়া যদি সাবধানে চালায় তবেই সাবধানে যেতে পারবো আমি ।
মিহি এক পলক তাকালো রাফির দিকে । চোখ ফিরিয়ে বিদ্রুপ করে বললো…
” তোর ভাইয়া অচেনা অজানা মেয়েদের সাথে কথা বলে না ।
এক দেখায় পর্ব ২৬
বলেই এক সেকেন্ড অপেক্ষা না করে দ্রুত ঢুকে পড়লো বাড়ির ভিতর । রুহি লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলল । কিছু তো একটা হয়েছে এদের মাঝে । এদিকে রাফির হাসি পাচ্ছে ভীষণ । হাসতেও পারছে না । ঠোঁট চেপে আটকে রেখেছে হাসি । এদিকে মনের মাঝে ডানা ঝাপটে পাখি উড়ছে ওর । মিহি অভিমান করেছে, আর মানুষ তার উপরই অভিমান করে যাকে সে ভালোবাসে । ভালোবাসার মানুষ ব্যতীত অন্য কারোর উপর অভিমান ব্যাপার টা আসে না । আসলেও সেটাকে ঠিক অভিমান বলে না । অভিমানের তকমা টা আলাদা । যেটা সবার উপর আসে না ।
