এক দেখায় পর্ব ২৯
সুরভী আক্তার
বাড়িতে কিচ্ছু জানানো হয় নি । কাল রাত থেকে রাফি বাইরে । মিহির ফোন পেয়ে রাতেই কাউকে কিছু না জানিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসেছিল সে । এখন সকাল নয়টা পেরিয়েছে । রাফি ঘরে নেই এটা এতক্ষণে সবার জানা হয়ে গেছে নিশ্চয়ই । রাফি একটু আগে নিজে থেকেই ফোন করে একটা বাহানা দিয়ে ম্যানেজ করেছে সবটা । এই মুহূর্তে ফোনে সে কাউকে কিছু জানাতে চায় না ।
হসপিটালের ক্যান্টিনে বসে হালকা কিছু খেয়ে নিল মিহি । রাফি আর একটা কথাও বলে নি ওর সাথে । ওর চোখে মুখে স্পষ্ট গাম্ভীর্য ভাব প্রতীয়মান । বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে রেখেছে । মিহি খাওয়ার মাঝে কথা বলার চেষ্টা করেছে,,রাফি উত্তর করে নি । মিহির খাওয়া শেষ হতেই রাফি কোন কথা না বলে না তাকিয়ে মেডিসিন এগিয়ে রাখলো মিহির সামনে । মাথা যন্ত্রণা কমে নি এখনো মিহির । রাফি কিছু না বলে সামনে বসে ফোন ঘাটছে । মিহিও কিছু না বলে মেডিসিন খেয়ে নিল । কয়েক মুহূর্ত বসে তাকিয়ে থাকলো রাফির পানে । রাফি ফোন থেকে চোখ সরিয়ে বাঁকা চোখে পরখ করে নিলো মিহি কে । ওর তাকিয়ে থাকা দেখে পুর্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো । চোখ মুখ শক্ত রেখেই উঠে দাঁড়ালো । পা বাড়িয়ে গম্ভীর স্বরে বলল…
” আসুন…
ডানে সিঁড়ি বামে লিফট । মাঝখানে দাড়িয়ে আছে মিহি । ঠোঁট জোড়া উল্টে রেখেছে । রাফি লিফটের সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে । মিহি রাফির হাবভাব দেখে ফোঁস করে শ্বাস ফেললো । মুখ বাঁকিয়ে কি বিড়বিড় করতে করতে সিঁড়ির দিকে এগোলো । লিফটের দরজা খুলতেই রাফি পিছন ফিরলো । মিহি কে সিঁড়ির দিকে এগোতে দেখে কপাল কুঁচকালো । সহসা ডাকলো…
” ঐ … ওদিকে কোথায় যাচ্ছেন ?
মিহি ও ভেংচি কেটে ঝাঁজ দেখিয়ে উত্তর করলো…
” সিঁড়ি দিয়ে যাবো আমি । আপনি যান একা একা…
” এদিকে আসুন বলছি…
” যাবো না আমি…
” আমি আসতে বলেছি,, তাড়াতাড়ি আসুন ।
” বললাম তো যাবো না । আপনি যান.. আমি সিঁড়ি দিয়েই যেতে পারবো ।
রাফি দাঁত পিষলো । মিহি সবে কয়েক ধাপ সিঁড়ি উঠেছে । রাফি বড় বড় ধাপ ফেলে ওর সামনে গিয়ে পথ রোধ করে দাঁড়ালো । বাঁধা পেয়ে ভ্রু যুগল জড়ো করলো মিহি । ভ্রু উঁচিয়ে বলল…
” এতক্ষণ তো কথা বলছিলেন না । এখন কেনো এতো ভাবছেন আমায় নিয়ে ? আমি সিঁড়ি দিয়ে উঠতে পারবো , সরুন আপনি ।
রাফি কথা বললো না । খপ করে ধরলো মিহির হাত খানা । রাফির আকস্মিক স্পর্শে চোখ বড় বড় করে তাকালো মিহি । একবার হাতের দিকে তো আর একবার রাফির দিকে । শিরশির করলো পুরো শরীর । বক্ষ স্থল কম্পিত হলো । ঢোক গিললো মিহি । রাফি ঠোঁট বাঁকিয়ে ক্রুর হেসে একটু ঝুঁকে ফিসফিস করলো …
” আমাকে জেদ দেখাবেন না ম্যাডাম । ভালোয় ভালোয় চলুন, নয়তো আপনাকে নিয়ে যাওয়ার অন্য পথ জানা আছে আমার ।
” য…যদি না যাই , ক…কি করবেন আপনি ?
” না গিয়েই দেখুন কি করি ?
পুনরায় ঢোক গিললো মিহি । রাফি অনেকটা কাছে আসায় ওর গরম নিঃশ্বাস অবধি অনুভব করতে পারছে সে । ওর শরীরের তীব্র ঝাজালো গন্ধ, স্পর্শ আর ধারালো দৃষ্টিতে নিজের দৃষ্টি সরিয়ে চোখ বন্ধ করলো মিহি । রাফি মুচকি হাসলো । আশেপাশে গুটি কয়েক মানুষের আনাগোনা আর পায়ের শব্দে দুরত্ব টানলো রাফি । মিহির হাত ধরেই টেনে আনলো লিফটের কাছে । মিহিও চোখ নামিয়ে গুটি গুটি পা ফেলে এগোলো কোন প্রকার বাঁধ না সেঁধে । রাফি ওর হাত ছেড়েছে লিফটের সামনে । ইচ্ছে করেই ছেড়েছে ।
লিফটে ঢুকতেই মিহি ঠোঁট উল্টে করুন চোখে তাকালো । রাফি হাত সোজা রেখেই খানিক বাঁকা করে মিহির দিকে এগিয়ে দিল হাত খানা । লিফট চলতেই মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠলো মিহির । তৎক্ষণাৎ রাফির বাহু চেপে ধরলো সে । ভীত হয়ে চোখ বন্ধ করে নিলো । রাফির বাহুর আঁকড়ে অনেকটা সংস্পর্শে এসে নিজেকে যেন লুকানোর চেষ্টা করছে অষ্টাদশী ।
রাফি আলতো হাসলো । নরম হলো চাহনি । মিহি সিঁড়ি বেয়ে উঠলে, এই সময়টা, প্রেয়সীর স্পর্শের অনুভূতিটুকু মিস করে ফেলতো সে । সেটা তো আর হতে দেওয়া যায় না । এখন তার স্নিগ্ধ পুষ্প আঁকড়ে রেখেছে তাকে । পুষ্পের স্পর্শে জোরালো হলো রাফির নিঃশ্বাস । বুক ভরে শ্বাস টানলো সে ।
আজমাল হোসেনের জ্ঞান ফিরেছে বারোটার দিকে । এরমধ্যে রাফি একবার বাড়িতে গিয়েছিল । সেখান থেকে অফিস । ফ্রেশ হয়ে পুনরায় সন্ধ্যার দিকে এসেছে । অফিস এটেন্ড করাও প্রয়োজন ছিল । প্রজেক্টের কাজ আছে হাতে ।
আজমাল হোসেন কে হসপিটাল থেকে ছাড়বে না আজ । কাল রিলিজ দেওয়া হতে পারে । সাফি ঢাকায় নেই । থাকলে এতক্ষণে হসপিটালে উপস্থিত হতো সে । মিহির সাথে কথা হয়েছে, তখন মিহি জানতে পারে সাফি ঢাকায় নেই । কোন একটা কাজে ঢাকার বাইরে যেতে হয়েছে তাকে ।
আজমাল হোসেনের অবস্থার কারণে আজ টিউশনেও যেতে পারে নি মিহি ।
মা মেয়ে বসে আছে তার পাশে । রাফি গলা খাঁকারি দিয়ে কেবিনে ঢোকে । শান্ত ও এসেছে ওর সাথে । মিহি অবস্থার পরিবর্তন না করে একই ভাবে বসে আছে । রাফি কে দেখে মুচকি হাসেন সাবিনা বেগম । কৃতজ্ঞতা জন্মেছে রাফির প্রতি । আজমাল হোসেন রাফি কে দেখে হাসার চেষ্টা করেন । মুখের আকৃতি বদলে যায় তার । তিনি মিহি কে বলেন…
” আম্মু,, তোমার আম্মু কে নিয়ে একটু বাইরে যাও তো । রাফির সাথে কথা আছে আমার ।
আঁতকে ওঠেন সাবিনা বেগম । তৎক্ষণাৎ দাঁড়িয়ে যান তিনি । স্পস্ট ভয় ফুটে ওঠে তার চেহারায় । গলা শুকিয়ে আসে , শুকনো ঢোক গিলে গলা ভেজানোর চেষ্টা চালান তিনি । রুদ্ধ স্বরে বলেন…
” ক..কি বলবেন আপনি ,, আমাদের সামনেই বলুন । বাইরে যাবো না আমরা । যা বলার ভেবে চিন্তে আমাদের সামনেই বলুন ।
আজমাল হোসেন পলক ফেলে কিছু বোঝান তাকে । ইশারা দেন বাইরে যাওয়ার জন্য । সাবিনা বেগম ছলছল করুন চোখে চেয়ে দুদিকে মাথা নাড়েন । অতঃপর বেরিয়ে আসেন বাইরে । তিনি বেরোতেই রাফি মুখোমুখি বসে আজমাল হোসেনের । আজমাল হোসেন ও চেয়ে আছেন রাফির নিজে থেকে কিছু বলার অপেক্ষায় । অবশেষে রাফি বলে উঠলো…
” আঙ্কেল,, আপনার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে এই নিয়ে চতুর্থ বার, ডাক্তার বলেছে আমায় । আপনি জানেন আপনার কি অবস্থা ?
” জানি বাবা ,, আর এতক্ষণে তুমিও নিশ্চয়ই জেনে গেছো আমার কি হয়েছে !
” আপনি সবটা জানেন ?
বলতে গিয়ে গলা জড়ালো রাফির । আজমাল হোসেন ভারী শ্বাস ফেললেন । মলিন হেসে হতাশা নিয়ে বললেন…
” আমার রোগ , আমি বয়ে বেড়াচ্ছি শরীরে , আর আমি জানবো না । ‘মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন’ ,, আবার হার্টে ফুটোও আছে আমার । এখন আর এর কোনো চিকিৎসা নেই, লাস্ট পর্যায়ে আছি আমি । বেশি আয়ু নেই আমার হাতে বাবা , যখন তখন যা খুশি হয়ে যেতে পারে । তুমি জেনেছো সবটা, এখন আমার একটা কথা রাখো বাবা… মিহি আর ওর আম্মু যেন এসব বিষয়ে কখনো জানতে না পারে । দয়া করে এসব বলো না ওদের । সহ্য করতে পারবে না ওরা । আমি যদি একেবারে ফাঁকি দিয়ে চলে যাই তাহলে আলাদা ব্যাপার , তখন ওরা ধীরে ধীরে হলেও সামলাতে পারবে নিজেদের । কিন্তু এখন এসব জানলে ওরা কখনো সামলাতে পারবে না নিজেদের । আমার থেকে বেশি ওরা ভেঙে পড়বে । প্লিজ ওদের কিছু বলো না…
” আঙ্কেল,, এভাবে বলছেন কেনো ? আই আন্ডারস্ট্যান্ড । বুঝতে পারছি সবটা । কিন্তু আপনার শরীরের অবস্থা ভালো নয় আঙ্কেল । আপনি ধারণা করতে পারছেন, যখন তখন যা খুশি হয়ে যেতে পারে…
” আমি জানি, কিন্তু কিছু করার নেই আমার । সময় নেই আমার হাতে । আমাকে নিয়ে চিন্তা করো না । আমিও নিজেকে নিয়ে চিন্তায় নেই । আমি ভাবছি আমার স্ত্রী সন্তানের কথা । ওদের কেউ নেই বাবা । আমি ছাড়া ওদের আর কেউ নেই । আমাকে ক্ষমা করো, আমি তোমাকে অনেক কিছুই বলতে পারবো না । মিহির বিষয়ে অনেক কথা জমে আছে আমার মনে । কিন্তু আমি বলতে পারবো না তোমায় । হাত পা বাঁধা আমার । আমি ওদের ব্যবস্থা করে রেখেছি , আমার অবর্তমানে আমার অনুপস্থিতির বেদনা ছাড়া ওদের আর কোনো সমস্যা ছুঁতেও পারবে না । তবুও যদি কখনো কোনো সমস্যা হয় , তাহলে ওদের একটু দেখো বাবা । মিহির উপর অধিকার আছে তোমার…
আজমাল হোসেনের শেষ কথাটা শুনে খানিকটা ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলো রাফির শরীর । তৎক্ষণাৎ সে তাকালো শান্তর দিকে । যে আগে থেকেই হাঁ হয়ে তাকিয়ে ছিল চোখ গোল গোল করে । রাফি তাকানোতে ভ্রু উঁচু করলো শান্ত । রাফি চোখ ফিরিয়ে শুল্ক ঢোক গিললো । কথাটার মানে বোঝার চেষ্টা করলো । আজমাল হোসেন কি বোঝাতে চাইলেন এই কথাটা দ্বারা । হৃৎস্পন্দন বেড়ে গেছে রাফির । ঘন পলক পড়ছে চোখে । ভালো লাগার জাগরণ ঘটলো কিছু আন্দাজ করে । জিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজালো রাফি । আবারো শুল্ক ঢোক গিলে শান্ত কন্ঠে বললো…
” আপনার কিচ্ছু হবে না আঙ্কেল । দেখবেন, কিচ্ছু হবে না আপনার । সবকিছু আল্লাহর হাতে, উনি চাইলে সব সম্ভব । আপনি চিন্তা করবেন না, আন্টি বা মিহি ওরা কেউ জানবে না । আমি আছি আপনার সাথে, আর ওদের সাথেও ।
আজমাল হোসেন স্মিথ হাসলেন ।
আজকেও তাকে হসপিটালেই থাকতে হবে । দম বন্ধ লাগছে তার । বুকটা ফেটে যাচ্ছে ভবিষ্যত চিন্তা করে । চোখের পানি কোটর ফেটে বেরিয়ে আসতে চাইছে । বাঁধ মানছে না তারা । হাহাকার হয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে বাইরে । কিন্তু বাঁধ সাধছে তার পৌরুষত্ব । পুরুষ মানুষদের যে কাঁদতে নেই । চোখে পানি আসতে নেই । নিজের জন্যে তো একেবারেই না । তবে আজমাল হোসেনের নিজের চিন্তায় কাঁদতে চাইছেন না । তার কান্না আসছে, কষ্ট হচ্ছে তার স্ত্রী সন্তানের অজ্ঞাত ভবিষ্যত নিয়ে । কি হবে তাদের ? কি করে বাঁচবে তারা ওনাকে ছাড়া । উনি তো তাদের অভ্যাস । অভ্যাস বদলাতে কতদিন সময় লাগবে ? একটা নির্দিষ্ট দিন পর নিশ্চয়ই তারা তাদের অভ্যাস বদলাবে ! ভুলে যাবে তাকে । তাকে কি ভুলতে পারবে ? তিনি কি শুধুই তাদের অভ্যাস ? অবশেষে চিন্তার মাঝেই দুফোঁটা কষ্টের গরম পানি গড়ালো চোখের কর্নিশ বেয়ে । তৎক্ষণাৎ মুছে নিলেন তিনি সেটা । লম্বা লম্বা শ্বাস টানলেন বুক ভরে । বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসছে বারবার ।
রাত এগারোটা…
মিহি টিউশনে আসে নি আজ । যার ফলে রুহিও টিউশনে আসে নি । ইমরান কে বারন করে দেওয়া হয়েছিল আজকে । রুহি সারাদিন মনমরা হয়ে ঘরে বসে ছিল । ওর মন ভালো নেই একটুও । মিহির সাথে কথা বলে একটু আগেই ঘুমিয়েছে সে । ঘরে সবুজ রঙা ডিম লাইট জ্বলছে একটা । গলা অবধি কম্বল জড়িয়ে শুয়ে আছে সে । মাথার সিল্কি চুল গুলো এলোমেলো । ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছে মুখের উপর । ফ্যানের হাওয়ার তালে তালে মৃদু ঢেউ খেলে উড়ছে চুল গুলো । সবুজ রঙা আলতো আলোয় ফিকে হয়েও জ্বল জ্বল করছে স্নিগ্ধ মুখ খানা ।
শান্ত বেশ অনেকটা মুহূর্ত ধরে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছে তার প্রেয়সীকে । হাসছে মিটিমিটি । রুহির সম্মুখে হাঁটু মুড়ে মাটিতে বসে বিছানায় মাথা এলিয়ে এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে সে । তার চাহনি এলোমেলো তবুও স্থির । তার তাকিয়ে থাকার মাঝে ডিস্টার্ব করছে রুহির এলোমেলো চুল গুলো । রুহির মুখের উপর দুলে দুলে ছড়িয়ে পড়ছে সেগুলো । যা শান্তর ধ্যানে ভাঙ্গন ধরায় । বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে ফেলে শান্ত । বাম হাত এগিয়ে দু’আঙুলে আলতো স্পর্শে সরিয়ে দেয় চুল গুলো । শ্বাস টেনে মুচকি হাসে । ঘুমন্ত রুহির কপালে আর নাকে টোকা দেয় আলতো করে । চোখ মুখ কুঁচকায় রুহি । শান্ত দুষ্টু হেসে ঠান্ডা হাত ছুঁইয়ে দেয় ওর গালে । অকস্মাৎ ভিড়মি খেয়ে এক ঝটকায় চোখ খোলে রুহি । ঘুম জড়ানো ঝাঁপসা চোখে সামনে ছায়া মতো কিছু একটা দেখে চোখ ছানাবড়া হয়ে যায় তার । ভড়কে গিয়ে চোখ খিচে জোরে চিৎকারের জন্য মুখ খোলার আগেই শান্ত মুখ চেপে ধরে ওর । বিছানায় রুহির পাশে একটু ঝুঁকে ওর মুখ চেপে ধরে অত্যন্ত ক্ষীণ স্বরে বলে ওঠে……
” আরে জান…
এটা আমি । ভালো করে দেখো জান । পটকা বাজির মুখটা দিয়ে আওয়াজ বের করো না প্লিজ ।
রুহি হৃৎপিণ্ড চলছে দ্রুত গতিতে । আশঙ্কা আর ভয়ে কপালে আর নাকের ডগায় বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে মুহূর্তেই । জোরে জোরে শ্বাস টানছে ও । শান্তর গলার স্বরে দ্রুত চোখ খোলে সে । সামনে অনেকটা কাছাকাছি শান্ত কে দেখে চোখ মুখ কুঁচকে এক ঝটকায় সরিয়ে দেয় শান্ত কে । শান্ত ও টাল সামলাতে না পেরে সরে আসে,, খাটের এক কোনায় থাকার ফলে আচমকা টাল হারিয়ে মেঝেতে গড়িয়ে পড়ে শান্ত । রুহি উঠে বসে বুকে হাত রেখে জোরে জোরে বুক ভরে শ্বাস টানে । পর মূহুর্তে শান্তর দিকে ক্ষিপ্ত দৃষ্টিপাত করে তেঁতে ওঠে…
” খবিশ লোক ,, আপনি আমার ঘরে কি করছেন ? আপনি জানেন কতটা ভয় পেয়ে গেছিলাম আমি ? এক্ষুনি আত্মারাম খাঁচাছাড়া হয়ে যেত আমার ।
শান্ত কোমরে হাত রেখে ঠোঁট উল্টে তাকিয়ে আছে । ব্যাথা পেয়েছে একটু । সে আহত স্বরে বলল…
” আমাকে এভাবে ধাক্কা দিতে পারলে জান ! আমার কোমরটা বোধহয় ভেঙেই গেলো । আহহ্…. কি ব্যাথা…
রুহি তৎক্ষণাৎ হুড়মুড়িয়ে নিচে নামলো । ব্যাস্ত হয়ে বললো…
” ব্যাথা পেয়েছেন ? সরি , আমি বুঝতে পারি নি এতো জোরে পড়ে যাবেন । দেখি… উঠুন দেখি…
শান্ত আরো বেশি ব্যাথা পাওয়ার ভান ধরলো । নাক টেনে টেনে বললো…
” ব্যাথা দিয়ে জিজ্ঞেস করছো ব্যাথা পেয়েছি কি না ?
” কোথায় ব্যাথা পেলেন ?
শান্ত শাহাদাৎ আঙুল দিয়ে বুকের বাম পাশে ঠেকিয়ে ইশারা করে বললো…
” এখানে ব্যাথা পেয়েছি জান । ভীষণ মারাত্মক ভাবে ব্যাথা পেয়েছি তোমার প্রেমের অনলে…
রুহি কটমট করে তাকিয়ে ফোঁস করে শ্বাস ফেললো । কন্ঠে রাগি ভাব টেনে বললো…
” নির্লজ্জ লোক…
লজ্জা সরম নেই ? এতো রাতে আমার ঘরে এসেছেন কেনো আপনি ?
” তোমায় দেখতে জান !
সোজা সুজি ভাবেলাশ হীন উত্তর করলো শান্ত । ঠোঁট কামড়ে হাসছে সে । হাসির মাঝেই রুহির দিকে তাকিয়ে চোখ মারলো । রুহি একবার দরজার দিকে তাকালো । দরজা লাগানো । তার মানে ইনি ব্যালকনি দিয়ে এসেছেন । বাড়ির চাবি এমনিতেও আছে শান্তর কাছে । শান্ত কখন এসেছে জানে না রুহি ।
রুহি চড়া কন্ঠে বলে উঠলো…
” ঢং করবেন না । জান আমার ঘর থেকে । ভাইয়া যদি জানতে পারে তাহলে কি ভাববে, ছিঃ……
” কি আবার ভাববে ? ও ঘুমিয়েছে । কিচ্ছু ভাববে না ও । তোমার থেকেও ও আমায় খুব ভালো করেই চেনে ।
রুহির মুখটা মলিন হলো । নিরস স্বরে বলল…
” আমি আপনাকে চিনি না ?
” চেনো বুঝি ? তাহলে এভাবে বললে কেনো ? আমার উপর বিশ্বাস নেই তোমার ?
ঠোঁট উল্টালো রুহি । শান্ত ওর হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বললো…
” আমি জানি তুমি আমায় সব থেকে বেশি ভালো চেনো । তুমি জানো, আমি তোমার জন্যই এসেছিলাম । আজ সারাদিন ঘরে ছিলে তুমি , বোর হয়েছো নিশ্চয়ই ? সারাদিন সময় দিতে পারি নি তোমায় , সরি জান ।
এখন বাইরে যাবে ? চলো, বাইক নিয়ে এসেছি , নিচেই আছে । এই রাতের বেলা লং ড্রাইভে যাবো দুজন ।
রুহি অবাক স্বরে বলল…
” এখন ?
” হুম !
” কেউ যদি জানতে পারে ?
” তো কি হয়েছে, আমি কি কাউকে ভয় পাই নাকি ?
রুহি লাজুক হাসলো । শান্ত ওর হাসির দিকে তাকিয়ে ঠোঁট প্রসারিত করলো । হালকা হলো হৃদয় ।
রাতের নির্জন রাস্তায় ছুটে চলেছে শান্তর বাইক । বাতাসের বেগে শা শা শব্দ হচ্ছে । রাস্তায় আশেপাশে কেউ নেই । ল্যাম্পপোস্টের আলোয় ছুটে চলেছে দুই নর-নারী । রুহি যে অবস্থায় ঘুমিয়েছিল সে অবস্থাতেই বেরিয়েছে । হাওয়ার তালে উড়ছে কোমর পর্যন্ত ছড়ানো চুল গুলো । সে এক হাতে জড়িয়ে আছে শান্তর কাঁধ । মুখে উৎফুল্ল হাসি । সারাদিন মনটা খারাপ থাকলেও এখন আর নেই । শান্ত মিররে রুহির হাস্যোজ্জ্বল মুখশ্রী দেখে মুচকি হাসলো । বাইকের গতি কমালো । কিছু দূর এগিয়ে রাস্তার পাশে ল্যাম্পপোস্টের নিচে বাইক থামালো । নামলো দু’জনে । রুহি ঠোঁটে হাসি রেখেই প্রশ্ন করলো…
” এখানে থামলাম কেনো ?
শান্ত মাথার হেলমেট খুলে বাইকের উপর রাখলো । হেলমেট খোলার ফলে এলোমেলো হয়ে গেছে চুল গুলো । শান্ত দুহাতের আঙ্গুলের সাহায্যে চুল গুলো সেট করে মৃদু হেসে বলল…
” দুজনে একটু পাশাপাশি হাঁটবো রাস্তায় ।
রুহি ভ্রু যুগল আড়াআড়ি ভাবে কুঁচকালো । পর মূহুর্তে একটু এগিয়ে পায়ের বৃদ্ধা আঙ্গুলে ভর করে একটু উঁচু হলো । হাত বাড়িয়ে শান্তর গোছানো চুল গুলো এলোমেলো করে দিলো । ফিক করে হেসে মাথা ঝাঁকিয়ে করে বললো…
” এবার ঠিক আছে । একদম সুপারহিট … চলুন…
মুচকি হাসলো শান্ত ।
রুহি আর শান্ত একে অপরের সাথে পা মিলিয়ে পাশাপাশি হাঁটলো অনেকটা সময় । একে অপরের হাতে হাত ধরে চলল দুই নর-নরী । শান্তর দুই হাত ধরে নির্জন রাস্তায় দাঁড়িয়ে কয়েকটা ছবিও তুলে নিলো রুহি । হাত ধরে ঘুরলো রাস্তার মাঝে । মিহি বাতাস একে অপরের স্নিগ্ধ হৃদয়কে স্পর্শ করে যাচ্ছে । শান্ত হা হয়ে তাকিয়ে দেখছে রুহিকে । চোখের তৃপ্তি মিটছে না তার । রাস্তার ধারে বসে অনেক গল্প করলো দু’জনে । রুহি সবসময় বকবক করে না , তবে একবার শান্তর সামনে বকবক শুরু করলে আর থামে না । হাত নেড়ে নেড়ে অনেকক্ষণ পটর পটর করলো সে । শান্ত নিঃশব্দে স্থির এক দৃষ্টিতে চেয়ে শুনলো ওর সমস্ত বকবক ।
হাসছে সে প্রতিটা ক্ষণ । আবারো হাঁটা শুরু করলো দু’জনে । হাঁটার গতি কমে গেছে শান্তর । একসময় দাঁড়িয়ে পড়েছে সে । তবুও দৃষ্টি সরছে না রুহির থেকে । ঘোর লাগা দৃষ্টিতে চেয়ে আছে ও । পলক ও পড়ছে না যেন । রুহি ছোট ছোট পা ফেলে কয়েক পা এগিয়েছে । ওরনাটা এক তরল হয়ে ঝুলছে গলায় । একপাশের কোণা মাটি ছুঁই ছুঁই করছে । শান্ত আবারো পা চালালো । মাটি ছুঁই ছুঁই ওরনার কোণা দুআঙুলে টেনে ধরলো । পেঁচালো আঙ্গুলে । রুহির পিছনে দাঁড়িয়ে হাস্কি স্বরে ডাকলো…
” জান……
অকস্মাৎ পিছন ফিরলো রুহি । ওরনায় টান পড়ায় আর শান্ত একদম কাছ ঘেঁষে পিছনে থাকায় কপাল ঠেকলো শান্ত বুকে । চোখ তুললো রুহি । শান্তর দৃষ্টির মানে বুঝলো না । শান্ত চেয়ে আছে অদ্ভুত দৃষ্টিতে । রুহি পিছিয়ে এসে শুধালো…
” কি হলো দাঁড়িয়ে গেলেন যে ?
শান্ত ওর ওরনার কোণা ধরে টানতেই আবারো ওর কাছাকাছি ঠিক সামনে এসে দাঁড়ালো রুহি । প্রশ্ন সূচক নয়নে বোকার মতো তাকিয়ে আছে ও । শান্ত ফুঁ দিয়ে ওর মুখের উপর ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট চুল গুলো সরিয়ে দিলো । ফের হাস্কি স্বরে বলল…
” চলো না জান বিয়ে করে ফেলি ।
রুহি কপাল কুঁচকালো । কোমরে এক হাত রেখে ভ্রু নাচিয়ে প্রশ্ন করলো…
” বিয়ে কেনো করবো ?
” বিয়ে কেনো করে ?
” আমি তো বিয়ে করবো বউ সাজার জন্য । বউ সাজার অনেক শখ আমার ।
শান্ত আরো বেশি দুরত্ব ঘুচলো । রুহির ওরনার এক অংশ ওর মাথায় ঘোমটার মতো করে জড়িয়ে দিলো । এক হাতে ওর চিবুক ধরে মুখখানি উঁচু করলো , অন্য হাতে রুহির কোমর জড়িয়ে কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বললো…
” আর আমি বিয়ে করবো তোমাকে বউ রুপে দেখার জন্য । কবে দেখবো তোমায় বউ রুপে ? আর যে সহ্য হচ্ছে না আমার । আমার জান কে বউ রুপে কেমন লাগে, সেটা দেখার ইচ্ছে জাগছে মনে । চলো বিয়ে করে ফেলি…
” ধ্যাত, সরুন তো আপনি ? সব সময় শুধু বিয়ে বিয়ে… এতো তাড়াতাড়ি বিয়ে করবো না আমি ।
শান্তর বুকে আলতো ধাক্কা দিয়ে দূরত্ব বাড়িয়ে লাজুক স্বরে কথাটা বললো রুহি । শান্ত ওকে ছেড়ে বুকে হাত রাখলো । রুহি পা বাড়িয়েছে আবারো । মিটিমিটি হাসছে সে । শান্ত মাথা চুলকে ওর পিছু পিছু যেতে যেতে গলা ছাড়লো…
” যদি , বাসো , ভালো আমাকে…
তবে, কেনো , থাকো দূরে দূরে…
সহেনা যাতনা কি করি বলনা …
যতনে রেখেছি তোমাকে কতনা…(২)
কেটে গেছে আরো তিন তিনটে দিন । আজমাল হোসেন কে হসপিটাল থেকে রিলিজ দেওয়া হয়েছে পরদিনই । ব্যাংক থেকে পুরোপুরি রিটায়ার করেছেন তিনি । তার শারীরিক অবস্থার কথা কম বেশি সবাই জানে । এই অবস্থায় তাকে চাকরি করতে দেওয়া টা বিরুদ্ধ । অবশ্য তিনি নিজে থেকেই চাকরি ছেড়েছেন । অব্যাহতি নিয়ে এখন পুরোপুরি বেড রেস্টে আছেন তিনি । এর মধ্যে প্রায়ই রুহি সহ রাফি এসেছিল তাকে দেখতে ।
আজ বুধবার । উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের দিন । সকাল থেকে চিন্তা টেনশনে পেট চেপে এদিক ওদিক ছোটাছুটি করেছে মিহি । বুক ধড়ফড় করছে । পেটের ভেতর যেন সকল কিছু দলা পাকিয়ে গুড়গুড় করছে । পুরো বাড়িতে পায়চারি করেছে সকাল থেকে । পরীক্ষা ভালো হয়েছে ঠিক আছে, তবে টেনশন টা ফ্রি । এটা এমনিতেই হানা দিচ্ছে মাথায় । সকাল থেকে হাজার বার কথা হয়েছে রুহির সাথে । তার ও একই অবস্থা । স্থির থাকতে পারছে না দুজনের কেউই । আব্বুর ঘরে সারাদিন চক্কর কেটেছে মিহি । আজমাল হোসেন বারান্দায় হেলান চেয়ারে বসে দেখে গেছেন মেয়ের কান্ড । তিনি বিশ্বাস রাখেন তার মেয়ের উপর । মিহি যে খারাপ কিছু করবে না তা তিনি জানেন । আগের দিন মিষ্টি এনে ফ্রিজ ভর্তি করে রেখেছেন তিনি । আপন কেউ নেই তো কি হয়েছে, মেয়ের সফলতায় পুরো এলাকায় মিষ্টি বিলিয়ে দেবেন তিনি ।
নেটওয়ার্ক জ্যাম থাকায় দুপুরের দিক রেজাল্ট চোখের সামনে পেয়েছে মিহি । রেসাল্ট দেখে চোখ বেয়ে পানি গড়িয়েছে আপনা আপনি । খুশির চোটে হাসতে হাসতে কেঁদেছে সে । আব্বু আম্মু কে জড়িয়ে চিৎকার করে উঠেছে জিপিএ ফাইভ পাওয়ার খুশিতে । সাথে সাথে ফ্রিজ থেকে মিষ্টি বের করে খাইয়েছে আব্বু আম্মু কে । আনন্দ উল্লাসে ছুটে ছুটে দুহাত মেলে পাখির মতো উড়ে বেরিয়েছে পুরো বাড়ি । আজ তার ভীষণ খুশির দিন । সাবিনা বেগম আর আজমাল হোসেন চোখ ভরে দেখেছেন মেয়ের কান্ড । এদিকে রেসাল্ট পাওয়ার সাথে সাথে রুহি সবার প্রথমে ফোন করেছে মিহি কে ! সেও জিপিএ ফাইভ পেয়েছে । দুজনে কথা বলেছে অনেকটা সময় । খুশির ঢেউ বইছে উভয়ের মনে ।
বিকেলের আগে আগেই পুরো এলাকায় মিষ্টি বিলিয়ে দেওয়া শেষ হয়েছে । পথ শিশুদের কেও খাইয়েছেন আজমাল হোসেন । মিহি বিকেলের দিকে তৈরি হয়েছে বাইরে যাওয়ার জন্য । রুহি দের বাড়িতে যাবে আজ । আগে থেকেই বলে রেখেছিলো আব্বু আম্মুকে । আজ ওকে বাঁধা দেয় নি কেউ । সাবিনা বেগম নিজে থেকে এক প্যাকেট মিষ্টি সরিয়ে রেখেছিলেন তাদের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য । মিহি তৈরি হয়ে নিচে নামে । সাবিনা বেগম মুচকি হেসে এগিয়ে যায় সদর দরজা পর্যন্ত । দরজা খুলতেই মুখোমুখি হয় সাফির সাথে । সে সবে কড়া নাড়তে যাচ্ছিলো । সামনে মিহি কে দেখে প্রফুল্ল হাসে সে । হাতে থাকা ফুলের বুকে এগিয়ে দিয়ে উচ্ছাসিত কন্ঠে বলে……
” Congratulations মিহি…
মিহি খানিক অপ্রস্তুত হলেও পরমুহূর্তে নিজেকে স্বাভাবিক করে মিষ্টি হেসে ধন্যবাদ জানায় । মিহি কে আগা গোড়া পরখ করে সাফি শুধায়…
” কোথাও যাচ্ছো ?
” হুম , রুহি দের বাড়িতে যাবো ।
সাফির মুখের হাসি টুকু গায়েব হয় অমনি । পৈশাচিক হাসি ফোটে ঠোঁটের কোণে ।
মিহির সাথে কথা বাড়ায় না আর । মিহিও আম্মুর থেকে বিদায় নিয়ে বের হয় বাড়ি থেকে । রুহি কে না জানিয়ে সে যাচ্ছে চৌধুরী বাড়িতে । বাইরে রিকশা দাঁড়িয়ে ছিল, আজমাল হোসেন ভাঁড়া করে দিয়েছেন মেয়েকে ।
কলিং বেল বাজতেই দরজা খুলে দিল কেউ । মিহি দরজার ওপাশে কে আছে তা না দেখেই হুড়মুড়িয়ে ভেতরে ঢুকলো । জড়িয়ে ধরার জন্য উদ্যত হতেই থেমে গেল সহসা । সামনে রাফি কে দেখে ছিটকে দূরে সরে আসলো । সে ভেবেছিল হয়তো রুহি, নয়তো হেনা বেগম বা হালিমা বেগম কেউ হয়তো দরজা খুলে দেবেন বরাবরের মতো । কিন্তু রাফি কে দেখবে এটা কল্পনাতেও ছিল না ।
অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো মিহি । জোর পূর্বক হাসার চেষ্টা করলো রাফির কপাল কুঁচকানো তীক্ষ্ণ চাহনি দেখে । বসার ঘরে কেউ ছিল না, বোনের রেসাল্টের জন্য বিকেলের দিকে ফিরেছে রাফি । এখন সোফায় বসে কফি খাচ্ছিলো সে । হাতে ফোন । টানা বিরতি হীন কলিং বেল বাজায় বিরক্তিতে আশে পাশে না তাকিয়ে নিজেই দরজা খুলতে গেছে সে ।
মিহি অধর ভিজিয়ে ছোট করে বললো…
” সরি ,, ভেবেছিলাম রুহি বা আন্টি হবে হয়তো ।
রাফি কপাল কুঁচকেই বিড়বিড়ালো.…..
” ভেবেছিলেন যখন, তখন ভেবেই জড়িয়ে ধরতে পারতেন । আমি কি না করেছি নাকি ?
ওর বিড়বিড়ানোর মাঝেই রুহির চিৎকার ভেসে আসলো……
” মেরি ভাবি জান…’
ওর চিৎকারে রাফি পিছন ফিরলো । মিহি ও দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরলো রুহি কে । রুহির ডাকটা খেয়াল করে নি ও । তবে রাফি করেছি,, অমনি খুকখুক করে শুকনো কাশি দিয়ে উঠলো সে । এদিকে দুই বান্ধবী একে অপরের সাথে তাল মিলিয়ে খুশিতে গদগদ হয়ে লাফাচ্ছে । ঘুরছে একে অপরের হাত ধরে । ওদের খুশির শেষ নেই আজ । রাফি মুচকি হাসলো দু’জনকে দেখে । আবারো সে এসে বসলো আগের জায়গায় । পুনরায় কফির মগ হাতে নিয়ে মনযোগ দেওয়ার চেষ্টা করলো ফোনে ।
রুহি মিহির চিৎকারে মুহুর্তেই ড্রইং রুমে জড়ো হয়েছে সবাই । জেনি এক ছুটে নিচে নেমেছে । ও নিজেও তাল মিলিয়ে লাফাচ্ছে রুহি মিহির সাথে । হেনা বেগম, হালিমা বেগম নিজেদের ঘরেই ছিলেন । একটু আগে রুহির রেসাল্ট নিয়ে মাতামাতি শেষ করে নিজেদের ঘরে গেছিলেন তারা । এখন আবারো বেরিয়ে আসলেন ঘর থেকে । দুই বান্ধবী কে একে অপরের সাথে এমন উৎফুল্ল অবস্থায় দেখে হেসে ফেললেন তারা । মিহি তাদের দেখে রুহিকে ছেড়ে দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরল হেনা বেগম কে । পর মূহুর্তে হালিমা বেগম কে । মিষ্টির প্যাকেট থেকে মিষ্টি বের করে একটা করে পুরে দিলো তাদের মুখে । জেনি কেও দিলো একটা । আবারো রুহি কে জড়িয়ে ধরে মিষ্টি স্বরে বলল…..
” আজ আমরা অনেক খুশি আন্টি । অনেক অনেক অনেক খুশি….তাই না জান ?
হেনা বেগম আর হালিমা বেগম খাওয়ার তালে কথা বলতে পারছেন না । হেনা বেগম খাওয়া শেষ করে মিহির দিকে এগিয়ে আসলেন । মুখে স্নেহের হাত বুলিয়ে কপালে চুমু খেলেন । শান্ত স্বরে বললেন….
” অনেক অনেক শুভেচ্ছা মা । তোরা সবসময় এভাবেই হাসি খুশি থাকিস ।
মিহি মিষ্টি হাসলো । এতক্ষণে পুনরায় নজর ফেরালো রাফির দিকে । সে এদিকে চেয়েও দেখছে না । মিহি একটু এগিয়ে মিষ্টি বাড়িয়ে দিয়ে বললো….
” আপনি ও একটা মিষ্টি খান ।
হেনা বেগম পিছন থেকে কিচেনের দিকে এগোতে এগোতে বললেন…
” রাফি মিষ্টি পছন্দ করে না মিহি ।
মিহি ‘ওওওওও’ বলে সরিয়ে নিলো মিষ্টি টা । রাফি চোখ তুলে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল…
” একটু ভেঙে দিন, আপনার সফলতার মিষ্টি তো , খাওয়াই যায় ।
মিহি মুচকি হাসলো । এক টুকরো ভেঙ্গে আবারো বাড়িয়ে দিলো । রাফি এক পলক বাড়ানো হাতের দিকে তাকিয়ে বললো…
” এই টুকু মিষ্টি খাওয়ায় জন্য হাত নষ্ট করতে পারবো না । পারলে আপনি খাইয়ে দিন ।
মিহি অস্বস্তিতে পড়ে গেল বোধহয় । পিছন থেকে গলা শব্দ করে খাঁকারি দিয়ে উঠলো রুহি । রাফি ভাবাবেগ প্রকাশ করলো না । সে এক ধ্যানে ফোনে মগ্ন । মিহি ইতস্তত হয়ে রাফির মুখ সম্মুখে ধরলো টুকরো টুকু । সহসা মুখ এগিয়ে সেটুকু মুখে তুলে নিলো রাফি । ওর ঠোঁটের স্পর্শে পুনরায় কম্পিত হলো অষ্টাদশীর হৃদয় । বক্ষ স্থল সীমান্ত ছাড়িয়ে বেরিয়ে আসার উপক্রম । মিহি এক মুহুর্ত অপেক্ষা না করে স্থান ত্যাগ করলো । ওর যাওয়ার পানে বাঁকা চোখে তাকিয়ে ফিচেল হাসলো রাফি ।
উপরে উঠে রুহির ঘরে যাওয়ার আগে রুহিকে নিয়ে রাবেয়া চৌধুরীর ঘরে পা বাড়িয়েছে মিহি । দরজা বাইরে থেকে লাগানো ছিল । মিহি রুহি দরজা খুলে প্রবেশ করে ভেতরে । ঘরে আশে পাশে চোখ ঘুরিয়ে দেখে কোথাও নেই রাবেয়া চৌধুরী । বারান্দায় উঁকি দিতেই সেখানে পাওয়া যায় তাকে । তার ঘরের বারান্দাটা খোলা নয় । গ্রিলে আবদ্ধ করা । তিনি বারান্দার গ্রিলে কপাল ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন । পিছন থেকে ডাকলো মিহি……
” আন্টি……
সাথে সাথে হকচকিয়ে পিছন ফিরলেন তিনি । মিহি কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এক প্রকার ছুটে আসলেন । জড়িয়ে ধরলেন মিহি কে । মুহুর্তেই পুরো মুখে কপালে চুমুতে ভরিয়ে দিলেন । আপনা আপনি চোখ দুটো ভিজে এসেছে তার । মিহি অবাক নেত্রে চেয়ে আছে । দেখছে তার কান্ড । রাবেয়া চৌধুরী অভিমানী স্বরে বলে উঠলেন……
” তোর সাথে কথা বলবো না আমি । তুই সবসময় আসিস না আমার কাছে । কেনো আসিস না ? তুই জানিস, তোকে খুব মনে পড়ে আমার । খুব দেখতে ইচ্ছে করে তোকে । কিন্তু দেখতে পাই না । কেনো তোকে সবসময় দেখতে পাই না আমি ? কেনো তুই থাকিস না আমার কাছে ?
মিহি মৃদু হেসে উত্তর করলো…
” আমি যে আমার বাড়িতে থাকি আন্টি । এখানে তো থাকি না । সবসময় দেখবেন কি করে ?
” আজ থেকে আমার কাছে থাকবি তুই ,, আমার খুব একা একা লাগে । দম বন্ধ হয়ে আসে । রাফিও থাকে না আমার কাছে । তুই থাকবি বল ?
” একা একা লাগে আপনার ? কেনো ? এই বাড়িতে তো অনেকে আছে ।রুহি আছে, জেনি আছে । অনেক বড় পরিবার আছে আপনার । আপনি সবার সাথে কথা বলেন না কেনো ? আমি তো আপনার কেউ হোই না, কিন্তু এই বাড়ির মানুষ গুলো তো আপনার আপন । ওদের সাথে থাকবেন, তাহলে আপনার আর একা একা লাগবে না ।
রাবেয়া চৌধুরী উত্তর করলো না । মিহি জিজ্ঞেস করলো…
” নিচে যাবেন ? চলুন ! সবাই আছে নিচে । দেখবেন আপনার খুব ভালো লাগবে । সবাই অনেক খুশি হবে আপনাকে দেখলে ।
রাবেয়া চৌধুরী চুপ করে আছেন । ভাবলেন বোধহয় । আলতো ঘাড় করলেন তিনি । মিহি রুহির দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল…
” ওনাকে নিচে নিয়ে যাই ?
রুহি উপর নিচ মাথা নাড়ালো । রাবেয়া চৌধুরী তার ঘর থেকে বের হন না । অনেক চেষ্টার পরও তাকে সবার সাথে কখনো মেশানো যায় নি । রাফি ব্যতীত অন্য কারোর সাথেই সেভাবে কথা বলেন না তিনি, একমাত্র মিহি ছাড়া । আজ মিহির কথায় নিচে যেতে রাজি হয়েছেন তিনি । এই সুযোগটা হাতছাড়া করা যায় না । রুহি খুশি হলো মনে মনে ।
রাফি এখনো সেভাবেই ড্রইং রুমের সোফায় বসে আছে । হাতে ফোন, ফোনে দৃষ্টি তার । সিঁড়িতে কারোর পায়ের শব্দ পেয়ে চোখ তুললো সে । বড় বড় হলো চোখ দুটো । সহসা দাঁড়িয়ে গেলো । মিহি আর রুহির সাথে রাবেয়া চৌধুরী নিচে নেমে আসছেন । এদিক ওদিক চোরা চোখে নজর ঘোরাচ্ছেন তিনি । রাফি ক্ষীয় কাল থমকে দাঁড়িয়ে রইল । নিজের চোখ কে অবিশ্বাস্য হচ্ছে তার ।
কিচেন থেকে হেনা বেগম বেরিয়ে আসার সময় তিনিও থমকে দাঁড়ালেন সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে ।
রাবেয়া চৌধুরী নিচে এসে এক পলক করে দেখে নিলেন সবাই কে । রাফি কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে স্মিথ হাসলেন তিনি । রাফি এখনো অবিশ্বাস্য নয়নে চেয়ে আছে । রাবেয়া চৌধুরী রাফির কাছে এসে দাঁড়ালেন । ক্ষীণ চাপা স্বরে বললেন……
” আমি আজ ঘর ছেড়ে বেরিয়েছি দেখেছিস । ও আমাকে নিয়ে এসেছে । ও খুব ভালো জানিস । আমার ওকে খুব ভালো লেগেছে । তুই আমাকে একটা জিনিস দিবি ?
রাফি নিঃশব্দে হাসলো । মুখে বললো…
” মামনি…তুমি,, তুমি বসো । বলো…আর কোথাও যাবে তুমি ? বলো ,, কিছু খাবে ? আমি সব এনে দেবো তোমায় ? বলো কি চাই তোমার ?
” ওকে আমার কাছে সবসময় রেখে দিবি ? ওকে দেখতে খুব ভালো লাগে আমার । ওর সাথে কথা বলতেও ভালো লাগে । ওকে রেখে দে না আমার কাছে !
রাফি তাকালো মিহির পানে । বলতে পারলো না কিছু । হেনা বেগম এগিয়ে গিয়ে কথা বলার চেষ্টা করলেন রাবেয়া চৌধুরীর সাথে ।
তিনি ও আজ কথা বললেন । অনেক দিন পর আজ আবারো চৌধুরী বাড়ির তিন কর্তী একসাথে হলো । পুনর্মিলন হলো তাদের । মিহিও তাদের সাথে সময় কাটালো অনেকটা সময় ।
সন্ধ্যা গড়াচ্ছে । এর মধ্যে সাবিনা বেগম কল করছিলেন একবার । রাবেয়া চৌধুরী মিহি কে না ছাড়তে চাইলেও মিহি থাকতে পারবে না আজ । সে আম্মু কে কথা দিয়েছে সে বাড়ি ফিরবে । তবে রাবেয়া চৌধুরী কেও কথা দিয়েছে সে আবারো আসবে । এবার আসলে থাকবে তার কাছে । প্রতিবারের মতো আজ ও রাফির উপর দায়িত্ব পড়েছে মিহি কে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার । যে দায়িত্ব পালনে সে সর্বদা সজাগ ।
পুরো রাস্তায় জড়তায় কথা বলতে পারে নি মিহি । হাত পা কেমন গুটিয়ে রেখেছে । কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছে রাফির সামনে । বুক ঢিপঢিপ করছে । জোরালো হচ্ছে নিঃশ্বাসের গতি । হাত পা শিরশির করছে অদ্ভুত অনুভূতিতে । চোখ তুলে তাকাতেও পারছে না সে । রাফিও আপন মনে গাড়ি চালাচ্ছে । বাঁকা চোখে লক্ষ্য করছে তার প্রেয়সীকে । আচমকা হিমশীতল কন্ঠে ডাকলো……
” ম্যাডাম…
শিহরিত হলো মিহি । শিহরণে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো । বক্ষ স্থল ধক্ করে উঠলো । জানালার দিকে মুখ করে তৎক্ষণাৎ চোখ বন্ধ করলো সে । রাফির সামনে তো সবসময় এমন হয় না । তবে মাঝে মাঝে কেনো এমন হয় ? কি হয় মিহির? এই অনুভূতির অর্থ উপলব্ধি করতে পারে না সে ।
রাফি এক পলক চেয়ে মুচকি হাসলো । আবারো ডাকলো…
” শুনছেন ম্যাডাম…?
সম্বিত ফিরল মিহির । আবারো কেঁপে উঠলো । মৃদু স্বরে বলল…
” হুম…
রাফিও একই স্বরে বলল……
” Congratulations blossom…
মিহি নরম স্বরে আওয়াজ তুললো…
” থ…থ্যাঙ্ক ইউ ।
রাফির ‘blossom’ শব্দটা ওর কানে পৌঁছেছে কি না সন্দেহ । রাফি ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বুঝেও না বোঝার ভান করে জিজ্ঞেস করল……
” কি হয়েছে ?
” কিছু না !
” এভাবে কথা বলেছেন কেনো ? কথা বেরোচ্ছে না গলা দিয়ে ?
” না , তেমন কিছু না ! আপনি চুপ করুন প্লিজ ।
রাফি ডেবিল হাসলো । ওর অস্বস্তি বাড়াতে ইচ্ছে করছে । কিন্তু আর বললো না কিছু । বাড়ির সামনে গাড়ি থামতেই মিহি চটজলদি নেমে পড়লো । একটা বারের জন্যেও রাফির দিকে তাকায় নি এ পর্যন্ত । এবার আর দৃষ্টি সংযত করতে পারলো না । তাকালো এবার । জোর পূর্বক হাসার চেষ্টা করলো । মোলায়েম কন্ঠে বলল…
” আসি ? সাবধানে যাবেন !
রাফি আবেশিত নয়নে চেয়ে থেকেই মাথা নাড়লো । মিহি হাঁফ ছেড়ে পা বাড়াতে পারলেই বাঁচে । সে দ্রুত পা চালালো । রাফি এখনো চেয়ে আছে আবেশে । সিটে মাথা এলিয়ে দিলো সে । মিহির হাঁটার পানে তাকিয়ে বুকে হাত রাখলো । অদ্ভুত ভাবে বুক চিনচিন করছে তার । রাফির গায়ক সত্তা আচমকা গেয়ে উঠলো…
এক দেখায় পর্ব ২৮
” কি আবেশে,তারে বারে বারে…
দেখি তবু যেন মেটে না যে তৃষ্ণা …
সে যে পথ চলে, বুকে ঝড় তুলে …
জেগে ওঠে ঘুমোনো আশা…
