Home এক দেখায় এক দেখায় পর্ব ৩০

এক দেখায় পর্ব ৩০

এক দেখায় পর্ব ৩০
সুরভী আক্তার

পরদিন……
রেসাল্টের খুশিতে আজ বন্ধু বান্ধবীরা এক হয়েছে । আজ কাল মিরা আর রৌনকের সাথে তেমন দেখা হয় না । কি করে হবে ? এখন তো আর মিহি রুহি কোচিংয়ে যায় না । আলাদা করে দেখা করার মতো সময় বা সুযোগ কোনোটাই হয়ে ওঠে না ।
তার উপর নাদিয়া আর সোহেল নেই । বিয়ের দুসপ্তাহের মাথায় নাদিয়া কে নিয়ে ওর স্বামী আফাজ পাড়ি জমিয়েছে বিদেশে । যাওয়ার আগে একবার দেখা হয়েছিল মিহি রুহির সাথে । সোহেলের ও কোনো খোঁজ নেই । শোনা গেছে সেও দেশ ছেড়েছে । নাদিয়া যেদিন দেশ ছাড়ে সেদিন সেও পরিবারের সম্মতিতে দেশ ছেড়েছে । বাইরের দেশেই পড়াশোনা করবে সে । বন্ধু বান্ধবদের সাথে সকল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে ।

বন্ধুমহল ভেঙে গেছে ওদের । আগের মতো আর নেই । আগের মতো আড্ডা জমে না । মিহি,রুহি,রৌনক,মিরা বসে আছে ওদের সেই চায়ের টং দোকানের সামনে । মিরা আর রৌনকের রেসাল্ট ও মোটামুটি ভালো । আজ অনেকটা সময় বের করে চার ফ্রেন্ড মিলে ঘোরাঘুরি করেছে একটু । টং দোকানে বসে বসে টুকটাক গল্প করছে ওরা । এরপর কে কোথায় যাবে জানা নেই । আড্ডা শেষে বিকেলের দিকে যে যার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে । মিহি রুহি আজ রিকশায় চেপেছে বাড়িতে যাওয়ার জন্য । বাড়ি থেকে গাড়ি আসতে বারন করে দিয়েছে রুহি । মিহি রিকশায় বসে নিস্তব্ধ থাকলো বেশ অনেকটা সময় । হঠাৎ রুহির কাঁধে মাথা রেখে নিরস স্বরে বলে উঠলো……
” আচ্ছা পাখি , এর পর যদি আমরা আলাদা হয়ে যাই, তাহলে কি করবি ?
রুহি বুঝলো না কথাটা । সে প্রশ্ন করলো…
” আমরা আলাদা হতে যাবো কেনো ?

” যদি একই ভার্সিটিতে চান্স না পাই আমরা । তখন তো আলাদা হয়ে যাবো । তখন এভাবে প্রতিদিন দেখা হবে না আমাদের । একসাথে ও থাকতে পারবো না । তুই এক জায়গায় থাকবি আর আমি এক জায়গায় । অন্যদের মতো আমিও আলাদা হয়ে যাবো তোর থেকে । তখন কি ভুলে যাবি আমায় ?
রুহি আঁতকে ওঠে তৎক্ষণাৎ জবাব দিলো …
” কিছুতেই না । তোকে জীবনে ভুলবো না আমি । আমি নিজেকে ভুলে যাবো, তবুও তোকে ভুলবো না । আর কে বলেছে আমরা আলাদা হবো ? আমরা তো সারাজীবন একসাথে থাকবো দেখিস । একসাথে এক ছাদের তলায় থাকবো আমরা । তোকে ভাইয়ার বউ বানাবো , আমার ভাবি জান হবি তুই । আমার ভাইয়ার মিষ্টি একটা বউ হয়ে সারাদিন তুই ঘুরঘুর করবি আমাদের বাড়িতে ।
মিহি নিঃশব্দে হাসলো । কথার পরিপ্রেক্ষিতে বললো…
” আমি তোর ভাইয়ার বউ হবো ?
” হুম, হবি তো । আমার ভাবি জান হবি তুই !
” আর তুই আমার কি হবি ?
” ননদীনি !
মিহিও তাল মিলিয়ে বললো…

” তোর ও তো আবার বিয়ে যাবে । তখন তো আবার আমরা আলাদা হয়ে যাবো । একসাথে থাকবো কি করে ?
রুহি ভাবলো । ভাবুক ভঙ্গিতেই বললো…
” আমাদের কিন্তু এরপর দুদিক থেকে সম্পর্ক গড়ে উঠবে । তুই এখন আমার পাখি , পরে হবি ভাবি জান , তার পর হবি আমার জাঁ । এতে সবসময় দেখা হবে তোর সাথে । তবে আমাকে যদি বেশি মিস করিস , তাহলে প্রয়োজন হলে না হয় ওনাকে ঘর জামাই করে রাখবো । কিন্তু আমি গ্যারান্টি দিতে পারি তুই একটুও মিস করবি না আমায় ।
” কেনো মিস করবো না ?
” কারন আমার ভাইয়া তোকে অনেক বেশি ভালোবাসবে । তখন আমাকে মিস করার সুযোগই পাবি না তুই , দেখিস ।
মিহি আবারো নিঃশব্দে হাসলো । ওর হাসি টুকু দেখে রুহিও হাসলো । পরক্ষনে কৌতুহল নিয়ে অদ্ভুত স্বরে জিজ্ঞেস করলো…

” আমার ভাইয়ার বউ হবি পাখি ? আমার ভাবি জান হবি তুই ?
মিহি উত্তর করতে পারলো না । রুহি কথাটা আবদারের মতো ঠেকলো । মিহির শরীরটা কেমন যেন ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলো । ও মাথা তুললো রুহির ঘাড় থেকে । ঘন পলক ফেলে পিচ ঢালা রাস্তার দিকে দৃষ্টিপাত করলো । রুহি উত্তর না পেয়ে পুনরায় মিহির হাত ঝাঁকিয়ে শুধালো…
” কি হলো ? বল না ! হবি আমার ভাইয়ার একমাত্র বউ ? আমার একমাত্র ভাবি জান , আর একমাত্র জা, হবি তুই ? থাকবি সারাজীবন আমার আর আমার ভাইয়ার সাথে ?
মিহি এদিক ওদিক তাকিয়ে কথা এড়ানোর চেষ্টা করছে । রুহি আপ্লুত হয়ে তাকিয়ে আছে উত্তরের অপেক্ষায় । মিহি কি বলবে ? গলা দিয়ে কোন কথা বের হবে না ওর ।
মিহি হাসার চেষ্টা করে কথা ঘোরালো……
” পাখি , কাল টিউশন আছে কিন্তু । তাড়াতাড়ি আসিস…দেড় মাসের মাথায় আমাদের ভর্তি পরীক্ষা । আমরা একসাথে ঢাকায় পরীক্ষা দেবো , আর দেখিস ইনশাআল্লাহ দু’জনেই চান্স পেয়ে যাবো ‌ । একসাথে থাকবো আমরা । কখনো আলাদা হবো না ।
মিহির অস্বস্তি বুঝে রুহি কথা বাড়ালো না আর । এমনিতেই ও বেশি বেশি বলে ফেলে সবসময় । রাফি বারন করেছে ওকে এতো বাড়াবাড়ি করতে ।
রুহি মাথা থেকে বাকি কথা গুলো ঝেড়ে আলতো হাসলো ।
মিহি দের বাড়ির সামনে রিকশা থেকে নেমে রুহির থেকে হাসি মুখে বিদায় নিলো মিহি । একই রিকশা রুহিকে নামিয়ে দেবে ওর বাড়িতে । মিহি বাড়িতে ঢোকার আগে সদর দরজার কাছে মুখোমুখি হয় কিছু অজ্ঞাত লোকের । তারা বের হচ্ছিলেন বাড়ি থেকে । মিহি তাদের চেনে না । আর না কখনো দেখেছে বলে মনে পড়ছে । আজমাল হোসেনের বয়সী দুজন লোক । মিহি তাদের সাথে আব্বু কে দেখে স্বস্তি পায় । তাদের উদ্দেশ্যে সালাম দিয়ে বাড়িতে ঢুকে পড়ে সে ।

সোজা উপরে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে ঘর থেকে বের হয় । করিডোর থেকে নিচে উঁকি দিয়ে দেখে নিচে কেউ নেই । তার মানে আব্বু ঘরে আছে । মিহি উৎফুল্ল পায়ে এগোয় আব্বুর ঘরের দিকে । সাবিনা বেগম কাপড় গুছিয়ে আলমারিতে তুলে রাখছেন । পিছন ফিরে মিহি কে দেখে হাসলেন তিনি । এসেছে থেকে কিছু খায় নি মিহি । সন্ধ্যা গড়াচ্ছে, এই মুহূর্তে চা হলে জমে যাবে । এমনিতেও অনেক দিন থেকে বাবা মা আর মেয়ে মিলে আলাদা করে একসাথে বসে তেমন সময় কাটানো হয় না । সাবিনা বেগম দ্রুত নিচে চলে গেলেন চা বানাতে ।
আজমাল হোসেন ঘরে নেই । ব্যালকনিতে আছেন নিশ্চয়ই । মিহি নিঃশব্দে পা ফেলে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ালো । আব্বু কে পিছন থেকে দেখে বরাবরের মতো গিয়ে বসলো আব্বুর পায়ের কাছে । চোখ তুলে তাকিয়ে এক গাল হেসে মাথা রাখলো আব্বুর ঊরুতে । আজমাল হোসেন নিঃশব্দে হেসে হাত রাখলেন মেয়ের মাথায় । মিহি কিছু সময় চুপ থেকে জিজ্ঞেস করলো…

” তখন ওনারা কে এসেছিলেন আব্বু ? চিনলাম না তো !
আজমাল হোসেন স্বাভাবিক ভাবেই উত্তর করলেন…
” ওনারা ব্যাংক থেকে এসেছিলেন আম্মু ।
মিহি মাথা তুলে চকিতে চাইলো । বিস্মিত স্বরে পুনরায় প্রশ্ন করলো…
” ব্যাংক থেকে কেনো ? কোনো সমস্যা হয়েছে আব্বু ? কি হয়েছে ? কেনো এসেছিলেন ওরা ।
মিহির অস্থিরতা দেখে আজমাল হোসেন হাসলেন । বললেন…
” কোনো সমস্যা নেই মা । বরং আগামীর সমস্যা সমাধানের জন্যই এসেছিলেন ওনারা !
” মানে ?
” হুম ! আমার যে ব্যাংক একাউন্ট টা আছে সেটা তোমার আর তোমার আম্মুর নামে ট্রান্সফার করে দিয়েছি আমি । আমার সবকিছুই আগে থেকেই তোমাদের ছিল । এখন থেকে আরো বেশি করে লিখিত ভাবে তোমাদের নামে করে দিলাম সবটা ।
” কিন্তু কেনো ?
” করার দরকার ছিলো তাই । আমি তো সারাজীবন থাকবো না তোমাদের সাথে । আমার অনুপস্থিতিতে যাতে তোমাদের কোনো সমস্যা না হয় তাই আগে থেকেই সবটা করে রাখলাম ।
মিহি ভড়কালো । চোখ দুটো ছলকে উঠলো । স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে ঢোক গিললো । আব্বুর হাতটা আঁকড়ে ধরে বললো…

” কি হয়েছে আব্বু ? এভাবে বলছো কেনো ? তোমার অনুপস্থিতি মানে ? কোথায় যাবে তুমি ?
আজমাল হোসেনের বুকটা কাঁপল উত্তর করতে । তিনি হাত রাখলেন মেয়ের মাথায় । শান্তনার সুরে বললেন…
” কোথায় আবার যাবো ? তোমাদের ছেড়ে কোথাও যাওয়ার সাধ্যি আছে আমার ? তোমাদের ছেড়ে কোথাও যাবো না আমি । কিন্তু সারাজীবন ও তো তোমাদের সাথে থাকবো না । তাই ভবিষ্যতের কথা ভেবে এটা করে রাখলাম । এখন তো আমি রিটায়ার । আলাদা করে কোনো কাজ নেই আমার । এই বুড়ো মানুষটার নামে ব্যাংক একাউন্ট থেকে কি হবে ? তুমি তো আমার মা, তাইতো আমার মা আর তার জননীর নামে সবটা করে রাখলাম । আমার নামে থাকা যে কথা, তোমার নামে থাকাও একই কথা । আমার মা কি দেখবে না আমায় ?
মিহি হাসলো । কি না কি ভেবেছিল এক মুহুর্তেই । বুকটা ছ্যাঁত করে উঠেছিল । মিহি আবারো মাথা রাখলো আব্বুর ঊরুতে । কেমন করে যেন বললো…

” দেখবে তো , তোমার মা সবসময় দেখবে তোমায় । তোমায় না দেখলে যে তোমার মায়ের চোখের প্রশান্তি আসে না আব্বু ।
আমাদের ছেড়ে কখনো কোথাও যেও না আব্বু । এক মুহুর্তের জন্যও যেও না । কে বলেছে বুড়ো হয়েছো তুমি ? আমার আব্বু একদম বুড়ো হয় নি । সবে বায়ান্ন বছর । হাজার বছর আয়ু হবে আমার আব্বুর । হাজার বছর না হওয়া অবধি বুড়ো হবে না তুমি ।
আরো হাজার বছর অবধি আমাদের সাথে থাকবে তুমি । কি হলো থাকবে না ?
হেসে ফেললেন আজমাল হোসেন ।
” হুম, থাকবো ।
বছরের পর বছর থাকবো তোমাদের ছায়ায়, তোমাদের স্মৃতিতে ।
শেষের কথাটুকু নিঃশব্দে আওড়ালেন তিনি ।
সাবিনা বেগম চা নিয়ে এসেছেন । বাবা মা আর মেয়ে মিলে চা খেতে খেতে গল্প করলো অনেকটা সময় । সেই পুরনো স্মৃতি, পুরনো সময় গুলো মনে পড়ে গেলো আজমাল হোসেনের ।

সকাল সকাল চৌধুরী বাড়ি মেয়েলি কান্নার শব্দে ভরে উঠেছে । সেই সকাল আটটা থেকে হালিমা বেগম একাধারে কেঁদেই যাচ্ছেন । এখন কান্নার বেগ কমলেও ফুঁপিয়ে কাঁদছেন তিনি । সকাল আটটার দিকে খবর এসেছে জুবায়ের চৌধুরীর শশুর অর্থাৎ হালিমা চৌধুরীর বাবা ইন্তেকাল করেছেন । অনেক দিন ধরেই অসুস্থতায় ভুগছিলেন তিনি । আজ পরলোকগমন করেছেন সকাল সাতটার দিকে । এই খবর পাওয়ার পর থেকেই একাধারে কেঁদেই যাচ্ছেন হালিমা বেগম । সেই তখন থেকে তাকে শান্তনা দেওয়ার চেষ্টায় ব্যস্ত হেনা বেগম । আটটা বাজে এখন । হালিমা চৌধুরীর বাবার বাড়ি নারায়ণগঞ্জ । সেখানে যেতে হবে এখন । রাশেদ রায়হান চৌধুরী, জুবায়ের চৌধুরী উভয়েই যাবেন । হেনা বেগম, হালিমা বেগম ও তৈরি ।
রুহি কাঁচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একপাশে । তাকে নিয়ে যাবে না কেউ । গেলেও সে যাবে না । এমনিতেই রুহি এসবে ভয় পায় । অফিসের কাজের জন্য রাফিও যেতে পারবে না । রুহি আর রাফি কে রেখে যেতে হবে বাড়ির দুই কর্তা এবং কর্তী কে । এদিকে হালিমা বেগমের বেহাল দশা । জুবায়ের চৌধুরী কোনো রকমে তাকে নিয়ে তড়িঘড়ি করে বাইরে বেরিয়ে গাড়িতে বসিয়ে দিয়েছেন । হেনা বেগম একবার রুহির কাছে আসলেন । নিরস চিন্তিত স্বরে বললেন…

” বাড়িতে একা থাকতে পারবি ? রাফি ও তো অফিসে যাবে । সমস্যা হবে না তো ?
রুহি মাথা ঝাঁকালো । অর্থাৎ সমস্যা নেই ।
মেয়ের সম্মতি পেয়ে হেনা বেগম বেরিয়ে আসলেন বাড়ি থেকে । একটা গাড়িতেই তারা রওনা দিলেন নারায়ণগঞ্জ এর দিকে । আজ হয়তো নাও আসতে পারেন তারা ।
একটু বাদ রাফি অফিসের জন্য তৈরি হয়ে নিচে নেমেছে । এদিক ওদিক চোখ বুলিয়ে রুহি কে নিচে কোথাও না দেখে আবারও উপরে উঠেছে রুহির ঘরের দিকে । রুহি পড়ার টেবিলের সামনে বসে আছে । টিউশনে পরীক্ষা আছে আজ । কাল থেকে পড়তে বসে নি রুহি । এখন এসব খবর শুনে মনটাও খারাপ হয়ে গেছে । পড়াতেও মন বসছে না । কনুই দিয়ে টেবিলে ভর করে গালে হাত দিয়ে এক মনে কিছু ভাবছে সে । রাফি গলা খাঁকারি দিয়ে ভেতরে ঢুকলো । রুহি কে আনমনে বসে থাকতে দেখে ডাকলো…
” Sissy…
রুহিও তাকালো নিরিহ চোখে । রাফি বললো…

” মন খারাপ ?
উপর নিচ মাথা নাড়ালো রুহি । রাফি বললো…
” বাড়িতে একা একা থাকতে হবে না ‌। রেডি হয়ে নে তাড়াতাড়ি । অফিসের জন্য দেরি হয়ে যাচ্ছে আমার ।
” তোমার অফিসে গিয়ে আমি কি করবো ? কোচিং তো সেই দুটোয় । এতো তাড়াতাড়ি গিয়েই বা কি করবো আমি ?
” আমার অফিসে যেতে হবে না । যাওয়ার সময় তোর বান্ধবীর কাছে ড্রপ করে দিয়ে যাবো তোকে ।
তৎক্ষণাৎ রুহির চোখ মুখ চিকচিক করে উঠলো । এক লাফে উঠে পড়লো সে । রাফি এক চিলতে হেসে বেরিয়ে আসলো ঘর থেকে । কয়েক মিনিটের মাথায় রুহি একেবারে রেডি হয়ে নিচে নেমেছে । নেমেই তাড়া দেয় সে…
” চলো ভাইয়া , তাড়াতাড়ি চলো । দেরি হয়ে যাচ্ছে তো তোমার ।
অতঃপর দুই ভাই বোন বেরিয়ে আসে বাড়ি থেকে । মিহি দের বাড়ির সামনে এসে রুহি কে নামিয়ে দেয় রাফি । শান্ত স্বরে বলে…
” ওর সাথেই থাকিস । টিউশনের সময় হলে চলে আসিস । গাড়ি পাঠিয়ে দেবো আমি । কেমন ?
” আচ্ছা ভাইয়া !

রাফি অপেক্ষা না করে তাড়াহুড়ো করে চলে যায় সেখান থেকে । কলিং বেল বাজতেই দরজা খুলে দেন সাবিনা বেগম । রুহিকে দেখে আলতো হাসেন তিনি । মিহি সোফায় বসে ছিল । টিভি দেখছিলো সে । সাবিনা বেগম কিছু বলার আগে রুহি মুখে আঙ্গুল দিয়ে ইশারায় আটকে দেন তাকে । ধীরে ধীরে পা টিপে টিপে মিহির পেছনে এসে চমকে দেয় ওকে । মিহি চমকিত হয়ে অবিশ্বাস্য অবাক লোচনে তাকিয়ে আছে রুহির দিকে । সাবিনা বেগম দুই বান্ধবী কে দেখে মুচকি হেসে পাশে বসেন । সময় নিয়ে রুহি সবটা খুলে বলে । রুহিকে পেয়ে দুপুর পর্যন্ত খুশিতে গদগদ ছিলো মিহি । দুপুরের খাবার শেষে এখন টিউশনের জন্য বেরোবে ওরা । দু’জনে তৈরি হয়ে নিচে নেমেছে । রাফি আগেই গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে । বাইরে দাঁড়িয়ে কয়েক বার হর্ন দিয়ে নিজের উপস্থিতির খবর জানান দিয়েছে সেটা । রুহি উশখুশ করছে কিছু বলার জন্য । সাবিনা বেগম আজমাল হোসেন দু’জনেই বসে আছেন সোফায় । আজমাল হোসেন কে দুপুরের ঔষধ বের করে দিচ্ছেন সাবিনা বেগম । মিহি নিচে নেমেই আব্বুকে ভালো ভাবে একবার পরখ করে নিয়ে বললো…

” আব্বু, টিউশনে যাচ্ছি আমি । সাবধানে থাকবে আর বিকেলের ঔষধ ঠিক মতো খেয়ে নেবে । আম্মু , আব্বুকে খাইয়ে দেবে কিন্তু ।
আজমাল হোসেন বরাবরের মতো স্বভাব সুলভ হাসলেন । রুহি পিছন থেকে এগিয়ে এসে খানিক ইতস্তত কন্ঠে ডাকলো…
” আঙ্কেল…
” জ্বি মামুনি… চলে যাচ্ছো ? আবার এসো কিন্তু…
রুহি আলতো হাসলো । দ্বিধা কাটিয়ে বললো…
” আঙ্কেল, আপনি তো জানেন আমাদের বাড়িতে কেউ নেই । আম্মু আব্বু আজ আসবে কি না সেটাও সন্দেহ । বাড়িতে একা থাকতে হবে আমায় । আপনি যদি পারমিশন দেন তাহলে টিউশনের পর মিহি কে নিয়ে আমাদের বাড়িতে যাবো ? শুধু আজকের জন্য । আজ রাত টা থাকবে আমার সাথে । নয়তো একা একা ভয় করবে আমার । ওকে নিয়ে যাই প্লিজ !
কথা গুলো বলে মাথা নামিয়ে নিলো রুহি । মিহি ঝট করে তাকালো ওর দিকে । রুহি আগে থেকে কিছুই বলে নি ওকে । মিহি পুনরায় তাকালো আম্মুর দিকে । সাবিনা বেগমের চাহনি শীতল । হাবভাবে পরিবর্তন আসে নি । স্থির বসে আছেন তিনি । মিহির তাকিয়ে থাকার মাঝে আজমাল হোসেন বলে উঠলেন…

” আচ্ছা মামনি । মিহি যেতে চাইলে নিয়ে যাও ওকে । আমাদের কোনো আপত্তি নেই এতে । ও তোমার বোনের মতোই । একসাথে দুজনে থেকো আজ । এতে তোমাদের আলাদা করে একটা গ্রুপ স্টাডি করে নিও ।
সাবিনা বেগম তৎক্ষণাৎ তাকালেন । প্রকাশ করলেন না কিছু । আজমাল হোসেন ও চাইলেন না । ভাবান্তর দেখালেন না । রুহি চোখে মুখে হাসি ফুটলো সহসা । মিহি আম্মুর দিকে তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করলো । সাবিনা বেগম এতে খুশি হননি মিহি খুব ভালো করেই আন্দাজ করতে পারছে ।
তবে রুহির কথা ভেবে মিহিও আর না করতে পারলো না । দু’জনে বেরিয়ে আসলো বাড়ি থেকে । ওরা বেরোতেই সাবিনা বেগম দরজা আটকে ধুপধাপ পা ফেলে উপরে চলে গেলেন । করিডোর থেকে একবার নিচে বাঁকা চোখে দেখলেন আজমাল হোসেন কে । সাবিনা বেগম উপরে যেতেই আজমাল হোসেন তপ্ত শ্বাস ফেললেন । নিস্তেজ হয়ে বসে থেকে উঠে দাঁড়ালেন । দুর্বল পা দুটোকে টেনে টুনে উপরে তুললেন । ঘরে গিয়ে থামলেন । সাবিনা বেগম ঘরে নেই । বারান্দায় আছে । আজমাল হোসেন পা বাড়ালেন সেদিকে । ব্যালকনিতে সাবিনা বেগম কে দেখে আচমকা বলে বসলেন…

” হাতিরঝিল যাবে ?
তৎক্ষণাৎ চকিতে পিছন ফিরলো সাবিনা বেগম । চোখে ঝিলিক বয়ে গেল তার । তিনি অবিলম্বে শুধালেন…
” ক… কি বললেন …?
আজমাল হোসেন রকিং চেয়ারে বসতে বসতে বললেন…
” বললাম, হাতিরঝিল যাবে ? আর তো যেতে চাইলে না একবার ও ?
” যেতে চেয়ে লাভ কি ? আপনি তো বলেছিলেন , যেনো পুরনো স্মৃতি না ঘাঁটি !
” একবার বললাম আর মেনেও নিলে ?
” আপনাকে অমান্য করেছি কবে ? আর আপনাকে অমান্য করার কোনো ইচ্ছে বা সাধ্যিও নেই আমার ।
” আমাকে মান্য করতে গিয়ে নিজের সবকিছুই অমান্য করেছো । আজ আমি বলিই , চলো একবার নিয়ে যাই তোমায় । ছাব্বিশ টা বছর তো পেরোলো । তাদের দেখার ইচ্ছে নেই ? নিশ্চয়ই পাল্টেছে সবকিছু !
সাবিনা বেগমের দৃষ্টি কাতর হয়ে আসলো এ পর্যায়ে । নিজের চোখ কানকে বিশ্বাস হচ্ছে না তার । তিনি অবিশ্বাস্য নয়নে চেয়েই বললেন…

” আমি তাদের কাছে মৃত । সেই ছাব্বিশ বছর আগেই আমার মতো জলজ্যান্ত মানুষ টাকে নিজেদের কাছে মৃত বলে ঘোষণা করেছে ওরা । ওদের কাছে যাওয়ার ইচ্ছে থাকলেও গিয়ে লাভ নেই ।
” লাভ লসের হিসেব করো না । ওনারা তোমাকে আর তুমি ওনাদের ছেড়েছিলে আমার জন্য । আমিই বলি , চলো নিয়ে যাই একবার ।
সাবিনা বেগম আজমাল হোসেনের সামনে এসে বসলেন । অদ্ভুত স্বরে বললেন…
” এভাবে বলছেন কেনো ? মিহিকে যেতে দিয়েছেন বলে ভেবেছেন আমি রেগে আছি ? আমি রেগে নেই । একদম রেগে নেই ।

” মিহির প্রসঙ্গ আসছে না এখানে সাবিনা । মিহি ও বাড়িতে যাবে । তুমি বা আমি, আমরা কেউই আটকাতে পারবো না ওকে । আজ মিহিকে যেতে দেওয়ার পেছনে একটা কারন আছে । আজ মিহি গেলো, কদিন পর রুহি আসবে । আমরা যখন হাতিরঝিল যাবো তখন মিহির সাথে রুহি থাকবে । ওকে তো আর একা রেখে যেতে পারি না ।
” কিন্তু আমরা হাতিরঝিল যাবো কেনো ?
আজমাল হোসেন নিঃশব্দে হাসলেন । শীতল কন্ঠে বললেন…
” যখন ঢাকায় এসেছিলাম তখন কি বলেছিলে মনে নেই ? আমার কাছে কখনো কিছু চাও নি তুমি , সেদিন যখন চেয়েছিলে তখন দিতে পারি নি । হাতিরঝিল যেতে চেয়েছিলে তুমি । আজ বলছি , চলো নিয়ে যাই । এক সপ্তাহের মধ্যে নিয়ে যাবো তোমায় । দু-তিন দিন এর মধ্যে আবার ফিরে আসবো । মিহি কে‌ নিয়ে যেতে পারবো না । ও বাড়িতেই থাকবে । রুহি থাকবে ওর সাথে । সাফিও আছে, সমস্যা হবে না ।
” এতো বছরে ওনারা হয়তো ভুলে গেছেন আমায় । আমি আপনার অসম্মান চাই না । আমি সুখি আছি আমার স্বামী সন্তান নিয়ে ।

” সেই সুখের বার্তা ওনাদের কাজ জানিয়ে আসি একবার ? নয়তো ওনারা ভাববেন আমি ওনাদের মেয়েকে সুখি রাখতে পারিনি । মনের ইচ্ছে মনে রাখতে নেই সাবিনা । আমি জানি তুমি কষ্ট পাও তাদের জন্য । তাদের এক পলক দেখার জন্য । তোমার কষ্ট আমি দেখবো কি করে ? তোমাকে ভালোবেসেছি, আমার সামনে কাঁদো না বলে কি তোমার চোখের পানি দেখি না আমি ? আমি আজ আছি কাল নাও থাকতে পারি… তোমার এই ইচ্ছেটা অপূর্ন রাখতে চাই না । প্রস্তুত করো নিজেকে তাদের মুখোমুখি হওয়ার জন্য । এক সপ্তাহের মাথায় নিয়ে যাবো তোমায় ।

বিকেল গড়িয়েছে । আজ টিউশনে পরীক্ষা ছিল কয়েকটি টপিক মিলিয়ে । পরীক্ষা শেষে কিছুক্ষণ ক্লাস শেষে ছুটি হয়েছে । বাইরে বেরিয়ে রুহি মিহি ড্রাইভার সহ গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে । রাফি ফোন করে জানায় ড্রাইভার পৌঁছে দেবে ওকে । সে আটকে পড়েছে জরুরি মিটিংয়ে । আজ আবার রাশেদ রায়হান চৌধুরী আর জুবায়ের চৌধুরী আসেন নি । তাদের জন্য প্রেরিত সকল দায়িত্ব রাফির কাঁধে । তবে সন্ধ্যার আগে আগে ফেরার চেষ্টা করবে সে ।
এমনিতেই দুপুরে বাড়িতে ফিরতে হয়েছিল ওকে । রাবেয়া চৌধুরী বাড়িতে একা । তাকে দুপুরের খাবার খাইয়ে ঘুমের ঔষধ দিয়েছিল রাফি । এটা প্রয়োজন ছিল,বাড়িতে কেউ নেই । তার কোনো সমস্যা হলে দেখারও কেউ নেই । ঘুমের রেশ কাটতে কাটতে সন্ধ্যা গড়াবে । ততক্ষণে রাফি ফিরবে বাড়িতে ।
রাফির কথা অনুযায়ী রুহিও মিহি কে নিয়ে ড্রাইভারের সাথে বাড়িতে চলে আসে ।
এর মধ্যে রাফির সাথে আর কথা হয় নি । মিহি চৌধুরী বাড়িতে এসেই ফ্রেশ হয়ে রাবেয়া চৌধুরীর ঘরে গেছিলো । তখনো ঘুমিয়ে তিনি । তাই আর ডাকে নি ।

মিহি রুহি দু-বান্ধবী মিলে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘোরাঘুরি করেছে ছাদে । আঁধার নামতেই নিচে নেমেছে দু’জনে । এতক্ষণ বকবক করতে করতে গল্প করার মতো আর কোনো টপিক নেই । সব কথা শেষ । দু’জনে এবার গল্পের বই নিয়ে বসেছে । খাটের উপর একে অপরের পিঠে পিঠ ঠেকিয়ে হেলান দিয়ে নিঃশব্দে চোখ বুলিয়ে যাচ্ছে বইয়ের পাতায় । রাফির আসার নাম নেই এখনো । সন্ধ্যার এই সময়টাতে গল্পের বইয়ের সাথে এক কাপ কফি হলে খারাপ হয় না । মিহি বসা থেকে উঠে দাঁড়ায় । ত্বরান্বিত কন্ঠে বলে…
” তুই বোস , আমি তোর আর আমার জন্য কফি বানিয়ে নিয়ে আসছি ।
রুহি বই থেকে চোখ সরিয়ে সরু চোখে তাকায় । ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করে…
” তুই কফি বানাবি ?
” হুম , পারি আমি !
খানিক ভাব নিয়ে বলে মিহি । রুহি ঠোঁট চেপে বলে ওঠে…
” যাও যাও ভাবি জান , শিখে রাখো সবটা । শশুর বাড়ির কিচেনে কোথায় কি আছে দেখে নাও । পরে কাজে আসবে ।

মিহি এগোতে এগোতে নাক শিকেয় তুলে বলে…
” ধ্যাত… তোর সাথে কথা বলে লাভ নেই ।
রুহি ফিক করে হাসে । গলা উঁচিয়ে বলে…
” এমনিতেও না শিখলেও চলবে । আমার ভাইয়া কিন্তু তোকে এসব করতে দেবে না কখনো ।
মিহি পাত্তা না দিয়ে বেরিয়ে আসে । নিচে নেমে কিচেনে যায় । এ বাড়িতে আসার পর দু-একবার কিচেনে ঢুকেছিল সে । কফি বানাতে পারে মিহি । কিচেনে এদিকে ওদিক তাকিয়ে কফির সমস্ত উপকরণ পেয়ে গেল সে । খুশি মনে মনযোগ দিলো নিজ কাজে । খানিক টুকটাক শব্দ হচ্ছে ।
আচমকা একটা পুরুষালি ক্লান্ত কন্ঠ ভেসে আসলো কানে…
” আম্মু , তাড়াতাড়ি এক কাপ কফি দেবে ? টায়ার্ড লাগছে ভীষণ…
কন্ঠের মালিক কে ঠাহর করা মাত্রই মিহি সবেগে বেরোলো কিচেন থেকে । সিঁড়ির দিকে নজর যেতেই রাফি কে দেখতে পেলো । কাঁধে ব্লেজার ঝুলিয়ে নিস্তেজ পা দুটোকে টেনে টুনে তুলছে সিঁড়ি দিয়ে । পড়নের সাদা শার্ট টা এলোমেলো । পিছন থেকে দেখলো মিহি । এ অবস্থাতেই রাফি কে ক্লান্ত দেখাচ্ছে ভীষণ । মিহি পরক্ষনে তাকালো দরজার দিকে , দরজা লক । তারমানে চাবি দিয়ে দরজা খুলে ভেতরে এসেছে রাফি । ক্লান্ত মস্তিষ্কে হয়তো ধ্যানে নেই বাড়িতে কেউ নেই ।

মিহি আরো তড়িঘড়ি কফি বানালো । পাঁচ মিনিটের মাথায় প্রথমেই এক কাপ কফি নিয়ে উঠলো সিঁড়ি বেয়ে । রাফির ঘরের সামনে গিয়ে থমকে দাঁড়ালো । এই এতো দিনে ও রাফির ঘরে ঢোকে নি মিহি । ঢোকার কথাও নয় ।
মিহির মন অস্বস্তিতে খচখচ করছে । সে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ । একবার ভাবলো রুহিকে ডাকবে । সেই মোতাবেক পা বাড়ালো , আবারো থেমে গেল । এক কাপ কফিই তো দিতে হবে । এতে এতো ভাবনা চিন্তার কি আছে ? মিহি লম্বা শ্বাস টেনে আলতো শব্দ করে কড়া নাড়লো দরজায় । দরজা চাপানো ছিল । প্রথমে সাঁড়া এলো না । মিহি আবারো কড়া নাড়লো । এবার সাঁড়া এলো । সেই নিস্তেজ স্বর…
” এসো…

সম্মতি পেতেই মিহি চাপানো দরজা ধাক্কা দিলো । দরজা খুলতেই এসির তীব্র ঠাণ্ডা হাওয়া ছুঁয়ে দিলো মিহি কে । ঘরে কয়েকটি ডিম লাইট একসাথে জ্বলছে । সমস্ত ঘর কেমন রঙিন দেখাচ্ছে । মিহি এক পা ভেতরে রাখতেই একটা তীব্র স্মেল বিধলো নাকে । অদ্ভুত সুন্দর একটা গন্ধ । মিহি চোখ বন্ধ করে শ্বাস টানলো । এই রঙিন আলোতে চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে । ঠাহর করা যাচ্ছে না আশপাশটা । মিহি আর এক পা এগোলো । ওর পায়ের নুপুর অতি ক্ষীণ রিনিঝিনি শব্দ করছে । দু’পা এগোনোর ফলে দুবার শব্দ হলো । যা রাফির তীক্ষ্ণ মস্তিষ্কে আঘাত হানলো ।
আচমকা জ্বলে উঠলো ঘরের সমস্ত লাইট । মিহি ভড়কালো তৎক্ষণাৎ কান্ডে । চমকে তাকালো এদিক ওদিক । পুরো ঘর এখন পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে । অফ হোয়াইট আর স্কাই ব্লু রঙের মিশ্রণের পেইন্ট চার দেয়ালে । মিহি অবাক লোচনে চোখ ঘোরালো এদিক ওদিক । হাঁ হয়ে গেছে মিহির মুখ । সে কখনো এই ঘরে আসে নি , তার আন্দাজ ও ছিলো না এই ঘরটা এতোটা গোছানো হবে ! একটা ছেলের ঘর এতোটা গোছানো পরিপাটি থাকে কিভাবে ? পুরো ঘরে অদ্ভুত সুন্দর মাদকিয় একটা গন্ধ ।যা আকর্ষণ বাড়াচ্ছে ‌। এসির শিরশিরে ঠান্ডা হাওয়া বইছে । চারদিকের দেয়ালে একাধিক পেইন্টিং । একপাশে রাফির সেই গিটার ও আছে । বিছানা টানটান করে গোছানো । পুরো ঘর একদম ফিটফাট পরিপাটি ।
মিহির পুরো ঘর দেখার মাঝেই পুনরায় রাফির জিজ্ঞাসু কন্ঠ শোনা গেল…

” আপনি ?
তড়িতে পিছন ফিরলো মিহি । পিছনে একটা সিঙ্গেল সোফায় গাঁ এলিয়ে বসে আছে রাফি । ফ্রেশ হয় নি এখনো । পড়নে এখনো সেই সাদা শার্ট । চুলগুলো এলোমেলো । কপাল ঢেকে আছে চুলে । চোখের চাহনি সরু । মুখটা কেমন মলিন ক্লান্ত দেখাচ্ছে । মিহি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো খানিক । চোখ নামিয়ে দ্বিধা জড়িত কন্ঠে মিনমিন করলো…
” হুম…রুহির সাথে এসেছি । আর..
আপনি বোধহয় ভুলে গেছেন, বাড়িতে কেউ নেই । তখন কিচেনে আমি ছিলাম । কফি বানাচ্ছিলাম , আপনিও তো কফি চাইলেন , তাই নিয়ে আসলাম ।
রাফি দৃষ্টি সরালো । স্বাভাবিক কন্ঠেই বলল…
” ওও…

বলেই মাথাটা এলিয়ে দিলো সোফায় । চোখ দুটো খুলে রাখা দায় হয়ে পড়েছে ওর কাছে । ক্লান্তিতে বুজে আসছে আপনা আপনি । তার উপর সারাদিন তেমন কিছু খাওয়া হয় নি । ক্লান্তি , অস্বস্তিতে মাথা যন্ত্রণা করছে ভীষণ । চোখ দুটো অস্বাভাবিক ভাবে জ্বলছে । মিহি হয়তো বুঝলো কিছুটা । সে এগিয়ে গিয়ে কফির মগটা এগিয়ে দিয়ে বললো…
” আপনার কফি….
রাফি মাথা তুলে চোখ খোলার চেষ্টা করলো । হাত বাড়িয়ে কফির মগটা হাতে নিয়ে আলতো হাসলো ।
” থ্যাঙ্ক ইউ…
এবার পূর্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো মিহি । রাফি এক চুমুক দিতেই মিহি কৌতুহল বশত উদ্বিগ্ন স্বরে শুধালো…
” কেমন হয়েছে…?
রাফি এক পলক তাকিয়ে চোখ সরালো । শীতল কন্ঠে বলল…
” মিষ্টি মিষ্টি দুহাতে বানিয়েছেন তো , তাই বোধহয় একটু বেশি মিষ্টি হয়েছে ।
মিহি অপ্রস্তুত হয়ে বললো…
” ইশশশ , বেশি মিষ্টি হয়েছে বুঝি ? আমি তো জানতাম না আপনি কতটুকু চিনি খান । এক চামচ দিয়েছি শুধু । দিন আমি চেঞ্জ করে আনছি !
” আমি কফিতে চিনি খাই না । তবে আজ না হয় খেলাম । আপনাকে আর কষ্ট করতে হবে না । ধন্যবাদ কফির জন্য…

মিহির পা দুটো যেন আটকে আছে । সরাতে পারছে না । এদিকে রাফি কেও অবসন্ন দেখাচ্ছে ভীষণ । চোখ দুটো লাল হয়ে আছে ওর । মিহি ধীর কন্ঠে শুধালো…
” আপনাকে টায়ার্ড দেখাচ্ছে । চোখ দুটোও কেমন লাল হয়ে আছে ।
আপনি কি অসুস্থ ? মাথা যন্ত্রণা করছে ?
রাফি চোখ তুললো । এবার স্থির হলো ওর দৃষ্টি । কয়েক পলক চেয়ে থেকে বললো…
” হুম, একটু ।
বলেই আবারো মাথা এলিয়ে চোখ বন্ধ করে নিলো । মিহি দাঁড়িয়ে থাকলো সেভাবেই ‌। রাফির কাতর মুখটা দেখে মায়া লাগছে ভীষণ । সে আবারো বলল…
” খেয়েছেন কিছু ? আমি খাবার নিয়ে আসবো ? খেয়ে তারপর ঔষধ খেয়ে নেবেন !
” উঁহুম… ক্ষিদে নেই ।
” তাহলে বাম লাগিয়ে নিন আপাতত !

কথা বলতে ইচ্ছে করছে না রাফির । কথা বলার শক্তি টুকুও পাচ্ছে না । তবুও চোখ বুজেই জোরপূর্বক বললো…
” প্রয়োজন হবে না । আমি ঠিক আছি । আপনি যান , রুহি একা আছে ।
বলেই উঠে দাঁড়ালো । পা দুটো টলছে । টলমল পায়ে দু’পা ওয়াশ রুমের দিকে এগোতেই অসাবধানতাবশত পাশের টেবিলের সাথে পা জড়িয়ে সামনের দিকে পড়তে নিলো । মিহি তৎক্ষণাৎ তাকিয়ে ভাবাবেগ হারিয়ে ওকে ধরতে নিলে টাল সামলাতে না পেরে উভয়ই হুমড়ি খেয়ে পড়ল সামনের বড় ডিভানের উপর । রাফির বুকের উপর আছড়ে পড়লো মিহি । অকস্মাৎ চোখ খিচে বন্ধ করে নিয়েছে ও । দুজনের মস্তিষ্ক সম্পুর্ন কার্যকর হওয়ার আগে অল্প সময়ের ব্যবধানে আবারও ছিটকে দূরে সরে এসেছে মিহি । রাফি হতচকিত হয়ে ঘন পল্লব ফেললো । মাথাটা ঝিমঝিম করে চক্কর দিয়ে উঠলো । এক হাতে মাথা চেপে নিজেকে সামলে নিলো সে । নিজেকে সামলে তৎক্ষণাৎ উদ্বিগ্ন স্বরে বলল সে…

” আ’ম সরি মিহি…
ঠিক আছো তুমি ? লাগে নি তো ?
মিহি উত্তর করলো না । কপালে কয়েক স্তর ভাঁজ পড়েছে ওর । ও কোনো প্রকার সংশয় বিহীন একটু এগিয়ে হাত ছোঁয়ালো রাফির কপালে আর হাতে । হাত সরিয়ে চিন্তিত উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল…
” আপনার তো জ্বর আসবে । গাঁ গরম হয়ে গেছে আপনার । আর আপনি বলছেন আপনি ঠিক আছেন ! বসুন আপনি ,, ঔষধ কোথায় আছে বলুন, আমি বের করে দিচ্ছি ।
মিহির ঠান্ডা স্পর্শে শিরশির করলো পুরুষালি উষ্ণ গরম দেহ খানা । রাফি চোখ ফিরিয়ে দ্রুত সরে আসলো । মাথাটা সেই প্রথম থেকেই ভার হয়ে আছে । নিঃশ্বাস জোড়ালো হচ্ছে । বক্ষ স্পন্দন বেড়ে গেছে । সে কোনো রকম বললো…
” আপনি এখান থেকে যান, প্লিজ । আমাকে নিয়ে ভাবতে হবে না । আমি মেডিসিন খেয়ে নেবো ।
মিহি পাত্তা দিলো না । জোর খাটিয়ে বললো…
” আমার সামনে খাবেন । কোথায় আছে বলুন ? আমি নিয়ে আসছি…
রাফি আর পারলো না । উঠে দাঁড়ালো । শ্বাস টেনে পা বাড়াতে বাড়াতে বললো…

” কাবাডে আছে , বের করে রাখুন । আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি । আর হ্যাঁ বের করে ঘরে চলে যাবেন… এখানে থাকাটা আপনার জন্য ঠিক হবেনা ।
বলেই ওয়াশ রুমে ঢুকে পড়ল সে । মিহি কিছু বুঝলো না ।
বোঝার চেষ্টাও করলো না । এদিক ওদিক তাকিয়ে পুরো ঘর টা আবারো ভালো করে দেখে নিলো বিস্ময় চোখে । সে এগোলো কাবাডের দিকে । একেকটা ড্রয়ার খুলে দেখলো ফাস্ট এইড বক্স নেই কোথাও । অতঃপর নিচের ড্রয়ারে হাত দিলো । সেটা খুলতেই সামনে পড়লো ফাস্ট এইড বক্স । শ্বাস ছেড়ে আলতো হাসলো মিহি । বক্সটা বের করে পাশে রাখলো ।

এক দেখায় পর্ব ২৯

ড্রয়ার লাগানোর ঠিক পূর্ব মুহূর্তে চোখ গেলো ড্রায়ারের একপাশে । মিহির চোখ আটকে গেলো সেখানেই । ভ্রু যুগল জড়ো হয়ে আসলো নাক বরাবর । পুনরায় পুরোপুরি ড্রয়ার টা খুললো । মিহির ওষ্ঠ জোড়া ফাঁক হয়ে গেলো আপনা আপনি । কুঁচকানো ভ্রু শিথিল হলো । হাঁ বনে গেলো সে । চোখ দুটোতে অবিশ্বাস ঘিরে ধরলো । অস্বাভাবিক ভাবে গোল গোল হয়ে গেলো অক্ষি যুগল ।

এক দেখায় পর্ব ৩১