এক দেখায় পর্ব ৩১
সুরভী আক্তার
ড্রয়ারের এক কোনায় কিছু জিনিস দেখে হৃৎপিণ্ড লাফিয়ে উঠলো মিহির । পুনরায় চোখ সরু করে তাকালো । ভালো করে দেখার চেষ্টা করলো । এক গুচ্ছ কৃত্রিম স্বচ্ছ লাল গোলাপের একটা তোড়া নজরে আসলো প্রথমে । ড্রয়ারের ভিতর একটু কালো অন্ধকার । সম্পুর্ন টা বোঝা যাচ্ছে না পরিষ্কার ভাবে । মিহি কপাল কুঁচকেই হাত বাড়িয়ে ফুলের তোড়া টা হাতে নিলো । হাতে নিতেই আরো বিস্মিত হলো সে । এগুলো কোনো আর্টিফিশিয়াল ফুল নয়,মিহি যা ভেবে ছিলো । বরং শক্ত কাঁচের মতো স্বচ্ছ আবরনের ভেতর একাধিক টাটকা লাল গোলাপ । যা এখনো যেন একটুও সতেজতা হারায় নি । প্রত্যেক টা ফুল রেজিন জেলের আবরনে এখনো তাদের সতেজতা কে ধরে রেখেছে । ফুলের সম্পুর্ন তোড়া টা রেজিন পদার্থে চোবানো হয়েছিল যেনো !
পাতা গুলো ও এখনো সবুজ সতেজ । লাল টকটকে ফুলগুলো যেন চেয়ে আছে মিহির পানে । মিহি আরো ভালো ভাবে নজর বুলিয়ে লক্ষ্য করলো । প্রায় বিশ খানেক ফুল হবে এখানে । এগুলো এতো যত্ন করে রাখার মানে কি ? মিহি ফুলের তোড়া টা দেখার মাঝেই তার মস্তিষ্ক জানান দিলো কিছু একটা । সজাগ হলো মিহি । ফুলের তোড়া থেকে চোখ সরিয়ে আবারো ড্রয়ারের দিকে তাকালো । রাফির জন্মদিনে মিহির দেওয়া ঘড়ির বক্স টাও আছে একপাশে । বক্স টা যে গিফট পেপারে মোড়ানো ছিল, সে পেপার টাও অতি যত্নে পড়ে আছে বক্সের পাশেই । তার কাছেই একটা চকচকে কিছু নজরে আসলো মিহির । চিকচিক করছে সেটা । মিহি হাত বাড়িয়ে সেটাও হাতে তুলে নিলো । হাতে পেতেই আবারো কপাল কুঁচকে আসলো মিহির । সোনালী রঙা লেডিস ব্রেসলেট একটা । মিহি আঁতকে উঠলো এটা দেখে । ভীষণ চেনা লাগছে এটা । কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকলো ওটার দিকে । এটা তো ? এটা তো ওর নিজের ব্রেসলেট ! আব্বু কিনে দিয়েছিল সতেরো বছরের জন্মদিনে । কিন্তু এটা তো হারিয়ে গেছিলো ! ঢাকায় আসার পর পরই মিহি হারিয়ে ফেলেছিল এটা । কবে হারিয়েছে, কোথায় হারিয়েছে জানা নেই মিহির । কিন্তু হারিয়েছে তো বটে । মিহি অনেক খুঁজেছে এটা । কিন্তু পায় নি । এই নিয়ে কতোই না মন খারাপ ছিলো ওর । আব্বু আম্মু কে এপর্যন্ত বলে নি হারিয়ে যাওয়ার কথা ।
রাফির কাছে এটা দেখে অবাক হলো মিহি । আন্দাজ মতো ওর দেওয়া গোলাপ গুলোও কতো যত্নে রেখেছে রাফি । কিন্তু এগুলো কি ওর দেওয়া সেই গোলাপ গুলোই ? গিফট থেকে শুরু করে গিফট পেপার পর্যন্ত গুছিয়ে রেখেছে । কিন্তু কেনো ? আর এসব না হয় বাদ , মিহির ব্রেসলেট টা কোথায় পেলো রাফি ? এটা যখন হারিয়েছিল, তখন তো মিহি রাফি কে চিনতোই না । দেখাও হয় নি তখন । তাহলে ?
ঘন ঘন পলক ফেলার সাথে সাথে শ্বাস প্রশ্বাস ও বেগতিক হয়ে পড়ছে মিহির । কপালে আর নাকের ডগায় বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে । মস্তিষ্ক শূন্য হয়ে আসছে । একহাতে গোলাপের তোড়াটা আর অন্য হাতে ব্রেসলেট । মিহির উভয় হাতই কাঁপছে । হাত পায়ের তালু শিরশির করছে । অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু আন্দাজ করতে পেরে উত্তেজিত হয়ে পড়ছে মিহির কোমল নারী হৃদয় । গাঢ় হচ্ছে শ্বাস প্রশ্বাস । অপ্রত্যাশিত অনুভূতি আর এসির শিরশিরে ঠান্ডা হাওয়ায় শিউরে উঠলো মিহি ।
হাত পা ঠান্ডা হয়ে জমে গেছে যেনো । সে বারবার চেয়ে দেখছে নিজের দুহাতের পানে । হাসি ফুটেও ফুটছে না ঠোঁটের কোণে । এক আবেশে তলিয়ে আছে মিহি । চোখের চাহনি স্থির । মিহির আবেশ কাটলো দরজায় খট করে ওঠা শব্দে । চমকে তাকালো সে । রাফি বেরিয়েছে ওয়াশ রুম থেকে । সাদা টাওয়েল এ মাথা মুছতে মুছতে বেরিয়ে এসেছে সে । পড়নে কালো রঙা একটা ট্রাউজার । গলায় টাওয়েল ঝুলছে । খালি গায়ে বিন্দু বিন্দু পানির কনা । চুল গুলো ভেজা, কপালে লেপ্টে আছে সেগুলো । উন্মুক্ত বাহুর শক্ত পেশী ঠিকরে মাংস বেরিয়ে আসার দশা । শক্ত পোক্ত মসৃণ দেহ খানায় চিকচিক করছে পানির কনা ।
রাফি মাথা মুছতে মুছতে বেখেয়ালে আয়নার সামনে দাঁড়ালো । চোখ দুটো লাল হয়ে আছে এখনো । আয়নার দিকে তাকাতেই নিজেকে দেখার আগে প্রতিবিম্বে পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা মিহি কে দেখলো সে । যে এখন স্তম্ভের ন্যায় দাঁড়িয়ে চোখ বড় বড় ওর দিকেই তাকিয়ে আছে । তৎক্ষণাৎ পিছন ফিরলো রাফি । কাবাডের সামনে মিহি কে থমকালো । খোলা ড্রয়ারের দিকে তাকালো একই সাথে । ও ভেবেছিল মিহি হয়তো চলে গেছে । কিন্তু এই মেয়ে তো এখনো যায় নি ! রাফির তাকানোতে ওকে এই অবস্থায় দেখে তৎক্ষণাৎ চোখ সরিয়ে নতজানু হলো মিহি । চোখ দুটো খিচে বন্ধ করে নিলো । তড়িঘড়ি করে হাতের জিনিস গুলো ড্রয়ারে রাখলো । শ্বাস আটকে এক মুহুর্ত অপেক্ষা না নতজানু হয়েই দ্রুত পা চালালো বাইরে বের হওয়ার জন্য । রাফি এখনো তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে আছে । মিহি পাশ কাটাতে গেলে ওর হাতটা খপ করে ধরে রাফি । আচমকা স্পর্শে অত্যাধিক অদ্ভুত অস্বস্তিতে মিহির রুহ অবধি কেঁপে ওঠে । আত্মারাম আঁতকে ওঠে । শ্বাস আটকে আসে গলায় । রাফি সবে শাওয়ার নিয়েছে , তবুও ওর স্পর্শ গরম । গায়ের তাপমাত্রা বেশি । ওর হাতের স্পর্শেই অনুভব করতে পারছে মিহি । মিহি হাত ছাড়ানোর জন্য মোচড়া-মুচড়ি করলো হাতখানা । কাজ হলো না । পরক্ষনে রাফির শীতল কন্ঠ ভেসে আসলো…
” কি চুরি করলেন ম্যাডাম ?
মিহি এই মুহূর্তে কথা বলার পরিস্থিতিতে নেই । গলায় দলা পাকিয়ে শব্দরা আঁটকে আসছে । হাত পা শিরশির করছে । হৃৎপিণ্ড লাফাচ্ছে দ্বিগুণ গতিতে । তবুও সে কথা ফুটালো…
” কিছু না !
” উহু… চুরি করেছেন আপনি !
” নাহ… আপনার ফাস্ট এইড বক্স বের করে রেখেছি শুধু । আর কিছুতে হাত দেই নি ।
ছ.. ছাড়ুন আমায় প্লিজ !!
” যদি না ছাড়ি…? চুরি করেছেন আপনি , তার শাস্তি দেবো না ?
মিহি নিশ্চুপ । রাফির কথা গুলো ওর কান অবধি পৌঁছাচ্ছে না । পৌঁছালেও কথা গুলোর অর্থ জ্ঞান বোঝার মতো শক্তি নেই ওর । আর না উত্তর করার । অবশ হয়ে আসছে পুরো শরীর ।
বক্ষ স্পন্দন বাড়ছে । সে কাঁপা গলায় বুলি ফুটালো….
” হাত ছাড়ুন প্লিজ…
তৎক্ষণাৎ ছেড়ে দিল রাফি । ছাড়া পাওয়া মাত্রই চোখ খুলে হাঁফ ছাড়ল মিহি । দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে এক ন্যানো সেকেন্ড ও অপেক্ষা করলো না । ও বেরোতেই রাফি বাঁকা হাসলো । এক হাতে মাথার ভেজা চুল গুলোতে আলতো হাত বুলিয়ে ঠোঁট কামড়ে হাসলো ।
এদিকে মিহি ঘর থেকে বেরিয়েই ছুটে এসে থমকে দাঁড়ালো রুহির ঘরের সামনে । চোখ বুজে আনমনে হাসলো । দুদিকে মাথা ঝাঁকিয়ে আবারো হাসলো । বেখেয়ালে হয়েই নাজুক চেহারায় নত মস্তিষ্কে গুটি গুটি পা ফেলে ঘরে ঢুকলো । দৃষ্টি নিজের পায়ের দিকে নিবদ্ধ । আনমনে ঘরে ঢুকে খাটের এক পাশে বসলো । কুশন জড়িয়ে ধরল নিজের সাথে । ভাবনার মাঝেই মুচকি হাসি ফুটলো ঠোঁটের কোণে । আবারো মাথা ঝাঁকিয়ে খোঁপা করা চুল গুলো এলোমেলো করে দিলো । কোমর সমান চুল গুলো ছড়িয়ে পড়লো বিছানার উপর । পুরো ঘর নিস্তব্ধ । সাঁড়া নেই কোথাও । নিস্তব্ধতা ভেদ করে হঠাৎ শ্রুতি মধুর মিষ্টি একটা মেয়েলি সুরে গানের লিরিক্স ভেসে আসলো….
” প্রেমে পড়েছে মন প্রেমে পড়েছে…
অচেনা এক মানুষ আমায় পাগল করেছে..(২)
সে যেন আমায় ডাকে, দেখিনা কোথায় তাকে..
ভালোবাসায় জড়িয়ে সে আমায় ধরেছে..
প্রেমে পড়েছে মন প্রেমে পড়েছে…
প্রেমে পড়েছে মন প্রেমে পড়েছে…
সে আমার সাথে চলে, কখনো কথা বলে..
কখনো অনুভবে মিশে আছে মনে হয়…
উমমমম… ভাবে মন আবোল তাবোল..
লাগে রে পাগল পাগল..
কবে যে করবো আমি, ভালোবেসে তাকে জয়..”
হঠাৎ এমন গান শুনে ধ্যান ভাঙ্গলো মিহির । চমকে পিছন ফিরলো সে । রুহি ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ভ্রু উঁচিয়ে মাথা দুলিয়ে গানের ভঙ্গিতে তাল মেলাচ্ছে । মিহি ভ্যাবাচ্যাকা খেলো খানিক । থতমত খেয়ে ঘন পল্লব ঝাপটালো । এতোক্ষণ এক ঘোরের মধ্যে ছিলো, কি সব ভাবছিলো কে জানে ! এখন রুহিকে দেখে ঘোর কাটতেই তৎক্ষণাৎ চোখ সরিয়ে জিভে কামড় বসালো । নিজের মাথায় নিজেই গাট্টা মারলো আলতো হাতে । রুহি গান বন্ধ করে মিহি কে দেখে ঠোঁট কামড়ে ফিক করে হাসলো । এগিয়ে এসে ওর কাঁধে থুতনি বসিয়ে কোমল কন্ঠে শুধালো….
” কফি কোই ভাবি জান…?
মিহি অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো । রাফির ঘর থেকে বেরিয়ে কোন রকমে এই ঘরে এসেছে । কফির কথা বেমালুম ভুলে গেছে সে । কফি বানানোই আছে । এতক্ষণে ঠান্ডা হয়ে গেছে হয়তো ।
মিহি নতজানু হয়ে ঢোক গিলে মিহি স্বরে বলল…
” দাঁড়া, নিয়ে আসছি…
” এতক্ষণ কোথায় ছিলি ? কফি বানাতে এতো সময় লাগে নাকি ?
” বানিয়েছি কফি, নিয়ে আসছি..
” ভাইয়া এসেছে ?
মিহি উঠে দাঁড়াতেই প্রশ্ন করলো রুহি । মিহি থমকালো আবার । অদ্ভুত শিহরণে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো । রুদ্ধ স্বরে কোনো রকমে বললো..
” হুম…
” তা এতক্ষণ কি করছিলি ভাইয়ার ঘরে ?
রুহি মুখ চেপে প্রশ্নটা করলো । তৎক্ষণাৎ ওর দিকে তাকালো মিহি । ভড়কালো খানিক । ও ভেবেছিল রুহি হয়তো জানে না । মিহি জিভ দিয়ে অধর ভিজিয়ে চোখ নামিয়ে আমতা আমতা করতে লাগলো….
” ক.. কোই , কিছু না তো । তোর ভাইয়া কফি চেয়েছিল , স..সেটাই দিতে গেছিলাম শুধু ।
মিহির অবস্থা দেখে রুহির পেট ফেটে হাসি আসছে । ঠোঁট চেপে কোন রকমে আটকে রেখেছে হাসি । মিহির ঘরে আসতে দেরি হওয়ায় রুহি নিচে নেমেছিল । কিচেনে মিহি কে না দেখে আবারও উপরে উঠেছে । ঘরে ঢোকার আগে রাফির ঘর থেকে মিহির কন্ঠ শুনতে পায় সে । একটু উঁকি দিয়েছিল ঘরে । রাফি মিহি কে একসাথে দেখে আর এগোয় নি ।
এক গাল হেসে নিজের ঘরে এসেছে । এসে থেকেই অপেক্ষা করছে মিহির জন্য ।
মিহি অস্বস্তিতে হাত কচলাচ্ছে । রুহি মেকি স্বরে বলল….
” ভাইয়া তোর মিষ্টি মিষ্টি হাতে বানানো মিষ্টি কফি খেলো । হায়.. সেদিন আবার তোর হাতে মিষ্টি ও খেলো । অথচ ভাইয়া মিষ্টি মোটেও পছন্দ করে না । এর মানে কি বুঝলি ?
” কি আবার ?
” মেরা ভাইয়া কা দিলকি রানি হো তুম । ” চুরালিয়া হে তুমনে মেরি ভাইয়া কা দিলকো” । তাইতো এসব করছে ভাইয়া ।
আমার ভাইয়ার মিষ্টি বউ জান তুমি । তোমার মতো মিষ্টি বউ জানের জন্য এই টুকু তো করাই যায় । কি বলো ভাবি জান ?
” ধ্যাত.. সবসময় তোর বাজে কথা !
কথা টা বলেই মাথা নামিয়ে নিলো মিহি । গাল দুটো লাল হয়ে গেছে লাজুকতায় । রুহি ওর গালে আলতো টোকা মেরে বললো…
” ভাইয়া কে ভালোবাসিস পাখি ? পছন্দ করিস ভাইয়া কে ? শুধু একবার বল .. তোর ভালোবাসার অমর্যাদা হবে না । তুই হবি আমার ভাইয়ার বউ ! আর আমার ভাবি জান ।
মিহি খচখচ করছে । ঢোক গিলছে বারবার । বুক ঢিপঢিপ করছে রুহির বলা কথা গুলো আর অনুভূতিতে । রুহি কেনো বলছে এসব ? আর মিহির এই অনুভূতি গুলোরই বা মানে কি ? কেনো হয় এমন ? আগে তো কখনো এমনটা হয় নি । কোনো ছেলে দৃষ্টি কাড়তে পারলেও কখনো দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে নি । তবে রাফির ক্ষেত্রে আলাদা । প্রথম দেখাতেই রাফি মিহির দৃষ্টি কেড়েছিল , আকর্ষণ করেছিল ওর দৃষ্টি কে । রাফি অত্যাধিক সুপুরুষ, সুঠাম দেহি হ্যান্ডসাম একজন যুবক । যেকোনো নারীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম ওর পুরুষালি সৌন্দর্য । তাই তো লক্ষ লক্ষ রমনীরা পাগল প্রায় ওর জন্য । মিহি সেই কাতারে পড়ে না । কারন রাফির প্রতি অনুভূতি সম্পর্কে ও নিজেও অজ্ঞাত । বেশিরভাগ সময়ই রাফি কে দেখলে অদ্ভুত শিহরণ জাগে মনে । যা সপ্তদশী হৃদয়ে প্রথম হানা দিয়ে তোলপাড় করেছিল । এখন অষ্টাদশী হৃদয়ে এর প্রখরতা বেড়েছে । অনুভূতিরা চওড়া হয়েছে । যা এখন অবাধ্য হচ্ছে দিনকে দিন । নিজের এই অবাধ্য অনুভূতি সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই মিহির । এই অনুভূতি গুলোর কি নাম দেওয়া যায় ? ভালোলাগা নাকি রুহির ভাষ্যমতে ভালোবাসা ? ভালোলাগা থেকেই ভালোবাসার সৃষ্টি হয় । মিহির ক্ষেত্রে কি তবে এটা ভালোবাসা ? তাহলে কি ভালোবাসার বাঁশি বাজলো মিহির মনে ? অষ্টাদশীর কোমল হৃদয়ে এই নিয়ে প্রথম বার কাউকে নিয়ে ভালোলাগার জাগরণ ঘটেছে । কাউকে নিয়ে ভিন্ন স্বাদের অনুভূতি জেগেছে এই প্রথম । যে অনুভূতি গুলো দোলা দিচ্ছে বারংবার । ছোট্ট হৃদয় ছাপিয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে তা । আটকে রাখা দায় হয়ে পড়েছে ।
জোরে জোরে শ্বাস টানছে মিহি । নিজের মনকে বোঝাচ্ছে , এসবের কোন মানে নেই । মিহি সাধারণ , ওর থেকেও হাজারো রূপবতী নারী আছে যারা রাফির জন্য উন্মাদ । লিনা আপুও তো আছে , উনি ও তো পছন্দ করেন রাফি কে । তার উপর আবার সেই দিন অফিসের নিচে মেয়ে টাকে দেখলো , তিথি নাম – সেও তো কতো সুন্দর ! ফর্সা চেহারা । উচ্চবিত্ত পরিবারের মেয়ে । ওকে তো বাড়ির সবাই পছন্দ করে । বউ বানাতে চায় চৌধুরী বাড়ির । এসবের মাঝে রাফি কে নিয়ে নিজের মনে কোনো প্রকার আলগা অনুভূতি তৈরি করে পিছুটান বাড়াতে চায় না মিহি ।
মিহি ভঙ্গিমা বদলে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করলো । অনুভূতি গুলো ঝেড়ে ফেলার বৃথা চেষ্টা চালালো মন থেকে । স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কিছু বলার আগেই মনে পড়লো রাফির ঘরের কথা । ড্রয়ারে ও যা যা দেখলো , এসবের মানে কি ? মিহির দেওয়া জিনিস গুলো ওভাবে যত্ন করে রাখার মানে কি ? আর মিহির ব্রেসলেট ? ওটাই বা কোথায় পেলো রাফি ?
ভাবনার মাঝেই কপাল কুঁচকে আসে মিহির । ওর উত্তর না পেয়ে রুহি ওকে আলতো হাতে ঝাঁকায় । শীতল কন্ঠে বলে…
” কি হলো পাখি ? বল না ?
মিহির ভাবনার ছেদ ঘটে । নড়েচড়ে ওঠে ও । এদিক ওদিক তাকিয়ে কথা এড়ানোর চেষ্টা করে…
” রাত হয়েছে অনেক , ক্ষিদে পেয়েছে আমার । চল খাবো… । আর আন্টি ? উনি জেগেছেন কি না দেখে আসি চল !
” বললি না তো ?
” কি বলবো ?
” পছন্দ করিস ভাইয়া কে ? ভালোবাসিস ?
মিহি শ্বাস টেনে শুল্ক ঢোক গিলে মাথা ঝাঁকিয়ে বলে…
” উহু… এসবের কোন মানে নেই । আমি এসব ভাবতে চাই না । চল …
আটটা পেরিয়েছে । নিচে নেমে ফ্রিজ থেকে খাবার বের করে গরম করে নিয়েছে রুহি আর মিহি । টেবিলে খাবার সাজিয়ে রুহি উপরে উঠেছে রাফি কে ডাকতে ।
রাফির ঘরে আবছা অন্ধকার । হলদে রঙা ডিম লাইট জ্বলছে একটা । চাপানো দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকে রুহি । সুইচ বোর্ড হাতড়ে লাইট অন করে । বেডের দিকে নজর যেতেই কপাল কুঁচকায় রুহি । রাফি কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে । ঘুমিয়েছে বোধহয় । কিন্তু এ সময় তো রাফি ঘুমোয় না । তাও আবার এই গরমে এসি অফ করে কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়েছে ? সন্দিহান হয়ে এগিয়ে যায় রুহি । শান্ত কন্ঠে রাফি কে ডাকে । কয়েক বার ডাকার পরেও সাঁড়া নেই রাফির । রুহি হাত বাড়িয়ে আলতো হাতে ঝাঁকাতেই আঁতকে ওঠে সে । রাফির শরীরের তাপমাত্রা অত্যাধিক গরম । গাঁ পুড়ে যাচ্ছে জ্বরে । রুহি হুমড়ি খেয়ে ভাইয়ার পাশে বসে । উত্তেজিত কন্ঠে ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে ডাকে…
” ভাইয়া , এই ভাইয়া । তোমার তো জ্বরে গাঁ পুড়ে যাচ্ছে । শুনছো তুমি ? ওঠো ভাইয়া.. ভাইয়া ?
রাফি চোখ খোলে পিটপিট করে । রুহি কে দেখে আলতো হাসে । রুহি ঠোঁট উল্টে আহত স্বরে বলে…
” তুমি আমায় ডাকবে না একবারও ? দেখো তো কতটা জ্বর এসেছে তোমার ! ঔষধ খেয়েছো ? আমি ডাকবো ডাক্তার কে ? ওনাকে ডাকছি দাঁড়াও ! কিচ্ছু হবে না তোমার !
রাফি কে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে রুহি । দরজার কাছে মুখোমুখি হয় মিহির । রুহির উত্তেজিত উঁচু কন্ঠ নিচ অবধি ওর কানে পৌঁছে গেছিলো । উপরে উঠতে এক মুহুর্ত অপেক্ষা করে নি মিহি । মিহি কে সামনে দেখে রুহি চিন্তিত উদ্বিগ্ন স্বরে বলে…
” পাখি , ভাইয়ার জ্বর এসেছে । তুই একটু বস ভেতরে , আমি এক্ষুনি ওনাকে কল করে আসছি ।
কথা শেষ হতেই এক মুহুর্ত অপেক্ষা না করে বেরিয়ে আসে রুহি । মিহি এক পলক তাকায় ভেতরে । অতঃপর দ্রুত পায়ে ঘরে ঢোকে । অবস অসার হয়ে শুয়ে আছে রাফি । চোখ আধো আধো খোলা । মিহি দূরত্ব বজায় রেখে চিন্তিত স্বরে বলে…
” আপনি ঔষধ খান নি ? আপনাকে তো বললাম ঔষধ খেয়ে নিতে ।
তখন তো জ্বর কম ছিলো । এখন নিশ্চয়ই বেড়েছে ! দেখি…
বলতে বলতে কপালে হাত ছোঁয়ালো । গাঁ অত্যধিক গরম । মিহির স্পর্শে রাফি আধো খুলে রাখা চোখ দুটো আবেশে বুজে নিলো । রুক্ষ অধর দ্বয় ভেজালো জিভ দিয়ে ।
মিহি হাত সরিয়ে পিছনে তাকালো । ফাস্ট এইড বক্স যেভাবে রেখে গেছিলো সেভাবেই কাবাডের উপর পড়ে আছে । মিহি এগিয়ে গিয়ে বক্স হাতে নিলো । আবারো রাফির সম্মুখে এসে চেয়ার টেনে বসলো । থার্মোমিটার বের করে আদেশের সুরে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল….
” হাঁ করুন..
রাফি তাকালো । চোখের চাহনি চিকন । লাল হয়ে আছে চোখ দুটো । চাহনিতে অদ্ভুত ঘোর । বাধ্যের মতো হাঁ করলো সে । ১০৪° জ্বর তার ।
রুহি ঘরে গিয়েই ফোন লাগিয়েছে শান্তর নাম্বারে । এমনিতেই রাফির সাথে রোজ রোজ আসে সে । আজ উল্টো দিকে চাঁদ উঠেছে , তাই হয়তো দেখা মেলে তার । এতে রুহি বিরক্ত হয়েছে খানিক । রুহি গজগজ করতে করতে ফোন লাগায় ওর নাম্বারে । ফোন রিসিভ করছে না শান্ত । রুহি দরজার সামনে পায়চারি করতে করতে আবারো ফোন লাগায় । রিং হয়েই যাচ্ছে , তবে রিসিভ হচ্ছে না । নয়টা পেরোলো বোধহয় । রুহি বেশ কয়েকবার পরপর কল করলো । রাফির জ্বর অনেক , এই মুহূর্তে মাথায় কিছু আসছে না । শান্ত আসলে কিছু একটা করতে পারবে । ডাক্তার ডাকতেও হতে পারে । রুহি মিহি একা, কি করবে ওরা ।
ফোন রিসিভ না হওয়ায় রুহি রাগে সেটা ছুড়ে মারে টেবিলের উপর । খট করে শব্দ হয় একটা । আচমকা বাস্তবে শান্তর হেঁয়ালি কন্ঠ ভেসে আসে…
” কি হলো জান , মিস করছিলে আমায় ?
রুহি ভড়কে পিছন ফেরে । শান্ত কে দরজার কাছে বুকে হাত গুটিয়ে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে থাকতে দেখে থতমত খেয়ে যায় একটু । রুহির চাহনি দেখে ঠোঁট কামড়ে ভ্রু নাচায় শান্ত । আবারো বলে…..
” এতো বার ফোন করছো যে ? একলা বাড়িতে, আমাকে মিস করছিলে বুঝি ?
রুহি ফোঁস করে এক ঝটকায় এগিয়ে যায় । আকস্মিক কয়েকটা কিল ঘুষি বসিয়ে দেয় শান্তর বাহুতে । চোখ দুটো টলমল করছে । নাক টেনে সে বাচ্চাদের মতো করে বলে….
” কতো বার ফোন করলাম আপনাকে । ধরলেন না কেনো ? আমাকে জ্বালাতে খুব ভালো লাগে আপনার তাই না..?
রুহির চোখে পানি দেখে সিরিয়াস হয় শান্ত । আঁতকে উঠে ব্যতিব্যস্ত কন্ঠে বলে…
” কি হয়েছে ? কাঁদছো কেনো তুমি ? আমি তো ফোন ধরি ইচ্ছে করে , ভেবেছিলাম একেবারে এসে তোমায় সারপ্রাইজ দেবো । খুশি হও নি তুমি ? আমি ভুল করেছি কিছু ? সরি জান , আর এমনটা করবো না ।
ভয় পেয়েছো তুমি ? একা ছিলে কেনো ? রাফি কোথায় ?
রুহি শান্তর হাত দুটো চেপে ধরলো শক্ত করে । ভেজা কন্ঠে বলল…
” ভাইয়ার জ্বর এসেছে । অনেক জ্বর । সেই জন্য কখন থেকে ফোন দিচ্ছি আপনাকে, রোজ রোজ তো বাড়ি না গিয়ে ঢ্যাং ঢ্যাং করে এখানেই আসেন । আজ কেনো আসলেন না আগে ? আপনি তো জানেন বাসায় কেউ নেই ।
” সরি জান ….
রাফির জ্বর এসেছে ? চল দেখি ওর কাছে….
রুহির হাত ধরে টেনে রাফির ঘরে নিয়ে আসলো শান্ত । মিহি জ্বর মেপে এখনো পাশেই বসে আছে চিন্তিত মুখে । মিহি কে দেখে শান্ত এক পলক তাকালো রুহির দিকে । পরমুহূর্তে রাফির দিকে । যে এখন চোখ বুজে শুয়ে আছে । শান্ত এগিয়ে গিয়ে ওর গায়ে হাত ছোঁয়ালো । মিহি বললো তাপমাত্রার কথা ।
সকাল থেকে কিছু খায় নি রাফি । শান্ত জানে , দুপুরে বাড়িতে এসেও কিছু খায়নি । শান্ত জোর করেছিলো খাওয়ার জন্য । কিন্তু লাভ হয়নি । খায়নি রাফি ।
রুহি মিহি দু’জনে মিলে সুপ বানিয়ে নিয়ে আসলো রাফির জন্য । এতক্ষণ ওর মাথায় জ্বর পট্টি দিয়ে দিয়েছে শান্ত । রাফি নিস্তেজ হয়ে শুয়ে আছে শুধু ।
চোখ খুলতে পারছে না সে । শান্ত নিরেট কন্ঠে আদেশের সুরে বললো…
” ওঠ , খেয়ে নিবি । তারপর মেডিসিন নিতে হবে ।
” কিছু খাবো না আমি । খেতে ইচ্ছে করছে না । আমাকে একা থাকতে দে । এখান থেকে যা তোরা….
মুখ ফিরিয়ে আলতো স্বরে বলল রাফি । শান্ত কপাল কুঁচকালো । আরো দ্বিগুন ভারী গলায় বলল…
” মাথা গরম করাস না , সকাল থেকে তোর কথা শুনে যাচ্ছি । খাসনি তো সকাল থেকে । এখন খালি পেটে ঔষধ খাবি ? আরো বেশি অসুস্থ হতে চাস ? তিন দিন পর ফ্লাইট আছে , বাতিল করবো সেটা ?
শান্তর শেষ কথায় রুহি অবাক স্বরে জিজ্ঞেস করল…..
” ফ্লাইট আছে মানে ? কোথায় যাবে ভাইয়া ?
রুহির সাথে সাথে উত্তরের অপেক্ষায় মিহিও প্রশ্ন সূচক নয়নে তাকালো শান্তর দিকে । শান্ত শ্বাস ফেলে শান্ত কন্ঠে বললো….
” শুধু রাফি নয় , আমিও যাবো । বিজনেসের একটা আর্জেন্ট কাজের জন্য সুদানে যেতে হবে আমাদের । মাস খানেক থাকতে হতে পারে….
মিহি তৎক্ষণাৎ চাইলো রাফির পানে । দৃষ্টি কাঁপল বোধহয় । মনে হলো ওর তাকানোর সাথে সাথে রাফি চোখ সরিয়ে নিল । এতক্ষণ রাফির দৃষ্টি স্থির ছিল মিহির ভাবাবেগ লক্ষনের জন্য । মিহির দৃষ্টি কাতর হয়ে আসলো অজানা কারণে । রুহি আঁতকে উঠে বললো….
” সুদানে যাবেন মানে ? আর , তিন দিন পর যাবেন , আগে বলেন নি কেনো আমায় ? ভাইয়া অসুস্থ, কি দরকার এই অবস্থায় যাওয়ার ? ভাইয়া তুমি যাবে না কোথাও !
রাফি ক্ষীন স্বরে বলল….
” আমি কোথায় অসুস্থ ? একটু জ্বর এসেছে, ঠিক হয়ে যাবে ।
শান্ত বললো…
” যাওয়া টা দরকার । বড় মামা আগেই বলেছিলেন যাওয়ার কথা । রাফি অনেক চেষ্টা করেছে দেশে থেকেই প্রজেক্ট কমপ্লিট করার, কিন্তু পারে নি । যেতেই হবে….
রুহি কাঁদো কাঁদো হয়ে চোখ নামালো । মিহি ঢোক গিলে নিচু স্বরে বলল….
” পাখি,আমি ঘরে গেলাম…
বলেই পা বাড়ালো সে । কয়েক পা এগোতেই রাফির শান্ত কন্ঠ ভেসে আসলো…
রুহি মিহি দুজন কে উদ্দেশ্য করে বললো…
” রাতে খেয়েছ তোমরা ?
দাঁড়িয়ে গেল মিহি । রুহি উত্তর করলো…
” না !
” মামনি খেয়েছে ?
” হুম, পাখি খাইয়েছে !
” তাহলে এখন দুজনে গিয়ে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ো ।
রাফির কথার প্রতি উত্তরে আর কথা বাড়ালো না কেউ ।
সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে বাইরে থেকে খাবার নিয়ে এসেছে শান্ত । রাফির জ্বর কমেছে । ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমে সোফায় বসে আছে ও । শান্ত বিরিয়ানি নিয়ে এসেছে । ডাইনিং এর উপর প্যাকেট গুলো রেখে উঁচু স্বরে রুহিকে ডাকলো সে । ওর ডাকে ঘর থেকে বেরিয়ে করিডোর থেকে নিচে তাকিয়ে এক পলক দেখলো রুহি । মুখ বাঁকিয়ে আবারো ঘরে ঢুকলো সে । মিহি নিচে নেমে এক গাল হেসে চাপা স্বরে বললো….
” রুহি রাগ করেছে ভাইয়া । যান , গিয়ে রাগ ভাঙান ।
শান্ত ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে একই চাপা স্বরে বললো….
” বুঝলে পাখি – তোমার পাখির রাগ অভিমান ভাঙাতে ভাঙাতে আমার এ জনমটা যাবে বোধহয় । যে পরিমাণ রাগ অভিমান ওর মাঝে আছে, সেই পরিমাণ রোমান্টিকতা থাকলে এতদিন আর এভাবে সিঙ্গেল থাকতে হতো না আমায় ! বুঝলে…?
বলেই ঠোঁট কামড়ে ছুট লাগালো রুহির ঘরের দিকে । মিহি ওর যাওয়ার পানে তাকিয়ে ফিক করে হাসলো । পিছন ফিরে রাফি কে দেখে ওর হাসি টুকু নিমিষেই মুছে গেলো । কয়েক পলক চেয়ে থেকে চোখ নামালো । প্রস্থানের জন্য পা বাড়াতেই রাফি ডাকলো….
” ম্যাডাম , একটু এদিকে আসবেন ?
বরাবরের মতো সর্বাঙ্গে শিহরণ বয়ে গেল মিহির । শিরশির করে উঠলো পা দুটো । চোখ তুলে তাকালো সে । চোখাচোখি হতেই আবারো চোখ নামালো । এগিয়ে গিয়ে বললো….
” জ্বি, বলুন !
” এক গ্লাস পানি দিন তো !
মিহি পানি এগিয়ে দিলো । পানি খাওয়া শেষে গ্লাস আগের জায়গায় রেখে আবারো প্রস্থানের জন্য পা বাড়াল । ফের ডাকলো রাফি…
” শুনুন…
আবারো থমকালো মিহি । পিছন ফিরে বললো…
” হুম, বলুন !
” এদিকে আসুন তো !
এগোলো মিহি । রাফি বললো…
” একটু বসবেন ?
পাশে ইশারা করে বসতে বললো রাফি । মিহি স্থির স্তম্ভের ন্যায় দাঁড়িয়ে রইল । কয়েক মুহূর্ত এভাবেই দাঁড়িয়ে থেকে বসলো । রাফি এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বললো….
” বাসায় যাবেন কখন ?
” দুপুরে , টিউশন থেকে একেবারে বাসায় যাবো ।
” ওও..
” হুম !
রাফি কি যেন বলতে গিয়েও পারছে না । খচখচ করছে । মিহি নিজে থেকেই বললো…
” কবে যাচ্ছেন ?
রাফি বুঝলো । আলতো হেসে বলল…
” পরশু দিন ।
” আবার আসবেন কবে ?
” ফিরতে মাসখানেক লাগবে ।
” ওও ! এখন কেমন লাগছে ?
” আমি ঠিক আছি ! আপনি ঠিক আছেন তো ?
” আমার আবার হবে ?
রাফি নিঃশব্দে হাসলো ।
এদিকে শান্ত হেলে দুলে রুহির ঘরের ভিতর ঢুকেছে । ঘরে আলো নেই । ব্যালকনি দিয়ে আসা মৃদু আলোয় আলোকিত পুরো ঘর । কেমন ঠান্ডা হাওয়া আসছে ব্যালকনি দিয়ে । পর্দা গুলো উড়ছে । ঘরে নেই রুহি । ব্যালকনিতেই দাঁড়িয়ে আছে । শান্ত ধীরে সুস্থে নিঃশব্দে পা বাড়ালো সেদিকে । পিছন থেকে রুহিকে দেখে ভ্যাঙ্গানো ঘ্যাসঘ্যাসে গলায় বলল…
” হাউ মাউ খাউ, মানুষের গন্ধ পাউ…”
শান্ত এহেন কথায় না চাইতেও ফিক করে হাসলো রুহি । শান্তর নিঃশব্দ উপস্থিতির আভাস পেয়েছিল সে । নড়চড় করে নি । এখনো করলো না । স্থির হয়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইল, হাসি টুকু প্রকাশ করলো না । শান্ত ফের বললো….
” হাউ মাউ খাউ, মানুষের গন্ধ পাউ…”
রুহি কথা চেপে না রাখতে পেরে পিছন ফিরে ভ্যাংচি কেটে মেকি স্বরে বললো….
” ওসব ভয় দেখানো ভুতের ডায়ালগ পুরনো হয়ে গেছে । পারলে নতুন কিছু ট্রাই করুন ।
হেসে ফেললো শান্ত । কাছাকাছি দাঁড়িয়ে মিহি স্বরে বলল….
” রেগে আছো কেনো ? শুধু একটা মাস , তারপর তো আবার আসবো ।
” আমাকে আগে বললেন না কেনো ?
” কালই তো সব ঠিক হলো । আমার না গেলেও হতো , কিন্তু তোমার ভাইয়া কে একা ছাড়ি কি করে ?
” একা ছাড়তে হবে না , আপনি যাবেন ভাইয়ার সাথে । কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসবেন কথা দিন , আগের বারের মতো দেরি করলে আপনার সাথে জীবনেও কথা বলবো না আমি ।
শান্ত মুচকি হাসলো । রুহি কে পিছন ফিরিয়ে ওর কাঁধে থুতনি রেখে আলতো জড়িয়ে ধরে বললো….
” মিস করবে আমায় ? আচ্ছা, এই একটা মাস কতটা মিস করবে আমায় ?
রুহি লাজুক হাসলো । গলা নামিয়ে বলল….
” অনেক বেশি ! অনুভূতি মাপার মেশিন থাকলে মেপে দেখাতাম আপনাকে কতটা মিস করবো !
” আমি তোমাকে কতটা মিস করবো বলো তো ?
” আমার থেকে হাজার গুণ বেশি !
” কি করে বুঝলে ?
” কারন আপনি আমাকে আমার থেকেও হাজার গুণ বেশি ভালোবাসেন, তাই ! যে যাকে যত বেশি ভালোবাসে সে তাকে তত বেশি অনুভব করে । কাছে থাকলে যতটা অনুভব করে দূরে গেলে ততটাই মিস করে ।
” তাহলে বলছো আমি তোমাকে তোমার থেকেও বেশি ভালোবাসি ?
” হুম !!
শান্তর দিকে ফিরে ওর চোখে চোখ রেখে কথাটা বললো রুহি । শান্ত বাঁকা হাসলো । হাস্কি স্বরে বলল….
” আমি তোমাকে কতটা ভালোবাসি তা কিন্তু আমি জানি ! পরিমাপ করে রেখেছি আমি , হিসেবে ভুল নেই । তোমার প্রতি ভালোবাসা দিন দিন বাড়ছে আমার । তবে যতটুকু ভালোবাসি , ততটুকু দিয়েই চলবে সারাজীবন ।
রুহি বিস্ময় স্বরে শুধালো….
” কতটুকু ভালোবাসেন শুনি ?
শান্ত এক নাগাড়ে বললো…
” 99×99-999+99÷0= ? যদি পরিমাপ করো তাহলে এতটা ভালোবাসি তোমায় । এবার হিসেব করার দায়িত্ব তোমার , হিসেব করে নাও ।
রুহি চোখ বড়বড় করে তাকালো । অংক দিয়ে ভালোবাসা ? মাথা চুলকালো সে । রুহির অবস্থা দেখে শান্ত হেসে ফেললো । হাসি থামিয়ে তাড়া দিয়ে বলল….
এক দেখায় পর্ব ৩০
” পরে ঘরে এসে ক্যালকুলেটর দিয়ে হিসেব করে নিও । আশা করি আমার ভালোবাসায় কমতি নেই । এখন চলো, বিরিয়ানি ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে , এদিকে আমারো ক্ষিদে পেয়েছে ভীষণ । চলো জান….
রুহির ভাবনার মাঝেই ওকে টেনে নিয়ে ঘর থেকে বের হলো শান্ত ।
