Home এক দেখায় এক দেখায় পর্ব ৫৬

এক দেখায় পর্ব ৫৬

এক দেখায় পর্ব ৫৬
সুরভী আক্তার

দিন‌ ক্ষন মিলিয়ে আগামী শুক্রবার শাহরিয়ার শান্ত আর ফারহানা চৌধুরী রুহির বিয়ে ঠিক করা হয়েছে । খুব তাড়াতাড়িই একটু । যেহেতু পরিবারের মধ্যেই বিয়ে , তাই আর পেছানোর প্রয়োজন হয় নি । শান্ত নিজেই বিয়ের ডেট ফিক্সড করেছে । ওর মতামত জানতে চাওয়া হয়েছিল শুধু , ও নিজের মতামতের সাথে বিয়ের তারিখ ও জানিয়ে দিয়েছে । অবশ্য কেউ দ্বিমত করে নি । আফসানা বেগম তো বেশ ফুরফুরে , তিনি কখনো ভাবেন নি এমনটা হবে । যেহেতু হয়েই গেলো , তাই তার উদ্বিগ্নতা বাড়ছে । ছোট বেলা থেকে নিজের মেয়ের আদর স্নেহে বড় করেছেন রুহি কে । সেই রুহিই কিনা তার বাড়ির বউ হবে ? ভাবা যায় ! নিজের মেয়ে নিজের কাছেই থাকবে । যদিও আগের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিভ্রান্ত তিনি । লিনার ব্যাপারটা মাথায় এসেছে এর মধ্যেই । মেয়েটা কে তো তিনিই পছন্দ করেছিলেন ছেলের জন্য । লিনার পরিবারে নিজের পছন্দের কথা জানিয়েও ছিলেন । এটাই যা । ভাগ্যিস আর বেশি দূর এগোন নি ।

শান্তর মন উরু উরু । উসখুস করছে সে । রুহি, মিহি, জেনি, আর, মেহজাবিন মিলে ঘরের দরজা আটকে দিয়েছে রাফি আর শান্ত কে বের করে দিয়ে । রুহির কানে ইতিমধ্যে পৌঁছেছে বিয়ের তারিখ ঠিক হওয়ার কথা । আগামী ১৩ মে রোজ শুক্রবার বিয়ে তার । বাড়ি জুড়ে তোলপাড় । জেনি নাচছে আপির বিয়ের খুশিতে । রুহির অবস্থা হাঁসফাঁস , কেমন অদ্ভুত লাগছে আজ নিজেকে । ভেতরটা অস্থিরতায় ছটফট করছে । এদিকে শান্তর অবস্থা ওর থেকে দ্বিগুণ উদ্বেগজনক । রাফি ওর কান্ড দেখছে সোফায় বসে পায়ে পা তুলে । নরম হাতলে কনুই ঠেসে দুই আঙ্গুল কপালের পাশে চেপে ধরে শান্ত চোখে শান্তর কারবার দেখছে রাফি । এই ছেলেটা পারেও বটে ! পুরো ঘর জুড়ে ইতিমধ্যে হাজার বার পায়চারি করা শেষ ওর । থামছে না এক মুহুর্তের জন্য । থামাতে পারছে না নিজেকে । অবশেষে বিয়ে হচ্ছে ওদের । কেমন কাল্পনিক লাগছে এখনো । আচমকা একটা অভাবনীয় ঘটনা গেলো । সত্যিই বিয়ে হবে অবশেষে ওদের । শান্তর সব কল্পনা জল্পনার অবসান ঘটবে । রুহি নামক সেই ছিঁচকাদুনে মেয়েটাকে নিজের করে পাবে সে । নিজের দখলে পাবে ,‌নিজের পাশে পাবে , নিজের সঙ্গী হিসেবে , জীবন সঙ্গী হিসেবে । শান্ত ভাবতে পারছে না , দম ছাড়িয়ে যাচ্ছে । উদ্বিগ্নতা বাড়ছে ভাবতে গেলে । নিজেকে সামলাতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে এখনই । শ্বাস প্রশ্বাস বেগতিক ভাবে ছুটছে । পায়চারি করতে করতে ক্লান্ত সে । অবশেষে থামলো । রাফির দিকে তাকাতেই রাফির সুক্ষ্ম দৃষ্টির সম্মুখীন হলো । অমনি ছলকে উঠলো খুশিতে । এক লাফে সোফায় পা তুলে উঠে বসলো । বললো উত্তেজিত হয়ে…

” আরে শালা , কি দেখছিস ? অবশেষে বিয়ে হচ্ছে আমার , কনগ্রাচুলেট কর আমায়‌ ?
রাফি দীর্ঘ একখানা শ্বাস ফেললো । বললো ওর কথায় সায় দিয়ে…
” ওয়েলকাম !
” থ্যাঙ্ক ইউ ব্রো । বিশ্বাস কর , আমি এখনো ভাবতে পারছি না । বিয়ে হচ্ছে আমার ? আমার ? ভাবা যায় , তোর বোনকে সাত দিনের মাথায় বিয়ে করছি আমি ! ও বউ হচ্ছে আমার…
” ভাবতে পারছিস না তো ভাবতে হবে না । চুপচাপ থাকবি । বিয়ে নিয়ে আর একটা কথা বলবি না । সবার আগে মনে কর , তোর যার সাথে বিয়ে হচ্ছে সে আমার বোন । যদি একটা উল্টো পাল্টা বেফাঁস কথা বলেছিস আমার সামনে, তাহলে এমন উল্টো পাল্টা কথা বলার জন্য বিয়ে ভেঙে দেবো এখনো । এমন ছেলের সাথে আমার বোনের বিয়ে দেবো না ।
শান্ত হা হয়ে চুপসে গেল ।

” ওও তেরি ,, আমি আবার উল্টো পাল্টা কি বললাম ?
” বলিস নি , তবে কখন বলে ফেলিস ঠিক নেই । লাগামহীন মুখ তোর ।
শান্ত দাঁত কেলিয়ে হাসলো ‌। ভালো হয়ে ভদ্রলোকের ন্যায় বসলো পা নামিয়ে । খানিক লাজুক মেকি ভঙ্গিতে বললো…
” উল্টো পাল্টা তোকে কেনো বলবো ! তুই বেডা মানুষ , তোর সাথে কি আমার বিয়ে নাকি । যার সাথে বিয়ে তাকে উল্টো পাল্টা বলবো । বলবো তো তোর বোনকে । বুঝলি….
রাফি কটমটিয়ে তাকায় ।
” শুরু করলি ?
” শুরু করতে চাই নি । মনেই ছিলো না আমি লাগামহীন । আসলেই কি লাগামহীন ? যাই হোক, যেহেতু বললি, মনে করিয়ে দিলি , তাই একটু চর্চা করে নিলাম । লাগাম খুলবো তোর বোনের সামনে ।
” বিয়ে দেবো না কিন্তু !
শান্ত লাফিয়ে চায় ‌।

” ভয় দেখাচ্ছিস ? ব্লাকমেইল করছিস আমায় ?
” করছি ! এর ভয়ে যদি একটু শুধরে যাস !
পকেট থেকে ফোন বের করে দায়সারা ভাবে উত্তর করলো রাফি । শান্ত ভেংচিয়ে বললো..
” যাই কর না ক্যান , বিয়ে তো হবেই । আগামী শুক্রবারই হবে ! একটা কথা কি জানিস , বিয়েটা আমার তোর আগেই হবে । এটা আমার একটা বিগ এচিভমেন্ট । তোর আগে বিয়ে করবো । বাসর ও….
” মুখ দিয়ে যদি আর একটা কথা বের করেছিস তাহলে সত্যি সত্যিই বিয়ে করতে পারবি না বলে দিলাম । বিয়ে ভাঙ্গবো না , তবে পেছাবো । দুই বছর পেছাবো । গুনে গুনে দুই বছর । আর এটা করতে যে আমার কোনো হার্ড ওয়ার্ক করতে হবে না, তা তুই খুব ভালো করেই জানিস । এক তুড়িতেই দুই বছর পিছিয়ে দেবো ! কি..? দেবো ?
শান্ত ভড়কালো । হাসলো ফ্যাল ফ্যাল করে । বললো গলা ভিজিয়ে…
” আরে ভাই , রেগে যাচ্ছিস কেনো ? কুল ব্যাবি কুল !
বিয়ে তো তোমার ও হবে ! আমার মতো ধৈর্য ধরো । আমি অপেক্ষা করলাম কতগুলো বছর ! তুই তো সবে দুই বছর । তাও পুরোপুরি নয় ।
রাফি নিঃশব্দে মৃদু হেসে বলল বিড়বিড় করে…
” এতেই ধৈর্য হারিয়ে গেছে আমার ।

রাতে খাওয়া দাওয়া শেষে ঘুমিয়ে গেছে সবাই । ঘুমিয়ে গেছে চৌধুরী বাড়ি । শান্ত, আফসানা বেগম এবাড়িতেই আছেন । কাল থেকে পুরোদমে শুরু হবে বিয়ের কাজ । চৌধুরী বাড়িতে দ্বিতীয় বিয়ে । শপিং শুরু কাল থেকে । আনন্দবাজার লেগেছে এই আজ থেকেই । আনন্দের সীমা নেই কারোর । মিহি,রুহি নিজের ঘরে ঘুমিয়ে । একটা পেরিয়ে রাত দুইটার কোঠায় । ঘরে সবুজ রঙা ডিম লাইট জ্বলছে । হালকা সবুজ আলোতে আধো স্পষ্ট ঘর । দুই রমনী শুয়ে একে অপরকে জড়িয়ে । আর এক সপ্তাহ পর রুহি তো চলেই যাবে । শত হলেও বিয়ে হবে ওর । আর এভাবে কাছে পাওয়া হবে না ওকে । মিহির মাঝে মাঝে কান্না পাচ্ছিল । তবে প্রকাশ করে নি । দু’জনে রাজ্যের গল্প করতে করতে ঘুমিয়েছে সবে ।
সকাল সকাল হুল্লোড় জুড়েছে পুরো বাড়িতে । রুহি, মিহি এখনো ঘুমে । ওরা দেরি করে ঘুমিয়েছে । তাই উঠতে পারে নি সকাল সকাল । দরজা খোলা ছিল বিধায় জেনি হাঁক ডাক শুরু করে দিয়েছে ওদের কাছে গিয়ে । বিছানায় উঠে দুজনের মাঝে বসে ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে ডাকছে দুজনকে…

” রুহি আপি , মিহি আপি , ওঠো । সকাল হয়ে গেছে তো । উঠবে না ? রুহি আপি , ওঠো .. তোমার না বিয়ে । শপিং করতে যাবো তো আজ । ওঠো না । সবাই উঠে গেছে , আমি ছোট বাচ্চাটাও উঠে গেছি । তোমরা এখনো ঘুমাচ্ছো । বড় মেয়েরা , ওঠো…
ঘুম আচ্ছন্ন অক্ষি যুগল‌‌‌ না খুলেই বিরক্তি নিয়ে জেনি কে ঠেলে পাশ ফিরে শুয়ে বলে উঠলো রুহি…
” দেড় ফুটের বাচ্চা , জ্বালাস না । ঘুমাতে দে ।
জেনি আরো চেপে ধরলো । এবার দুই হাত চালালো মুখের সাথে । জোরে জোরে ঝাঁকিয়ে ডাকলো….
” রুহি আপি , ওঠো । শপিংয়ে যাবো আমরা ।
মিহি আপি , তুমি তো ওঠো । রুহি আপি বিয়ে করবে না । আমরা বিয়ে করবো , চলো শপিং করে এসে বিয়ে করবো আমরা । ওঠো…
এবার ঝাপিয়ে উঠলো রুহি । জেনি চমকে সরে গেলো । আচ্ছন্ন চোখে জেনির দিকে কটমট করে তাকিয়ে বলে উঠলো রুহি…

” কিহ ! বিয়ে করবি তুই ? কাকে বিয়ে করবি ?
” বরকে বিয়ে করবো ।
” বর কে তোর ?
” আমি কি জানি । তুমি বিয়ে করবে না , তাই আমি বিয়ে করবো ।
” মার খাবি কিন্তু ! বিয়ের কি বুঝিস তুই ?
ঘুম ভেঙ্গেছে মিহির । ও এদের দুটোর কথায় চোখ বুজেই হেসে উঠলো । উঠে বসলো আড়মোড়া ভেঙে । বিরাট হাই তুলে গা মুড়িয়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেললো । জেনির দিকে তাকিয়ে বলল…
” জেনি বুড়ি , এতো তাড়াতাড়ি বিয়ে করবে ?
” করবো তো । আজ শপিংয়ে যাবো । নিচে সবাই উঠে গেছে । খালি তোমরা দুজন ওঠোনি । এতো ঘুমাও কেনো তোমরা ? আব্বু বলেছে , আজ শপিংয়ে নিয়ে যাবে । চলো তাড়াতাড়ি , রেডি হবে না ?
নিচে ব্রেকফাস্ট শেষ বড়দের ‌। শান্ত,রাফি, রুহি,মিহি আর জেনির ব্রেকফাস্ট বাকি । রুহি মিহি ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমেছে । শান্ত আর রাফি বসেছে ব্রেকফাস্ট করতে । সিঁড়ি থেকে শান্ত কে দেখে এক মুহুর্তের জন্য থমকালো রুহি । বুক খানা কেমন ছ্যাঁত করে উঠলো । শান্ত খাওয়ার মাঝে চোখ তুলতেই রুহির সাথে চোখাচোখি হলো ওর । অমনি চোখ নামিয়ে নিল রুহি । ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটলো , লাজুক আভায় রাঙা হয়ে উঠলো স্নিগ্ধ মুখখানা । ওরা বসেছে টেবিলে । রুহি রাফির পাশে বসেছে ‌। মিহি ঘুরে বসেছে শান্তর পাশে । জেনি মিহির পাশে । শান্ত বারবার রুহি কে দেখছে আর হাসছে ঠোঁট কামড়ে মিটিমিটি ।
রুহি গলে যাচ্ছে একেবারে । হাত পা শিরশির করছে । এমন হচ্ছে কেনো ? অদ্ভুত উদ্বিগ্ন লাগছে নিজেকে ‌। হেনা বেগম এগিয়ে এসে স্যান্ডউইচ তুলে দিলেন তিন মেয়ের প্লেটে । সোফায়, রাশেদ রায়হান চৌধুরী, জুবায়ের চৌধুরী, আফসানা বেগম, জাকির হোসেন সকলেই বসে । শান্ত মিহির কানের কাছে ফিসফিস করলো…

” পরী ! তোর ভাবির কি হয়েছে বলতো ?
মিহিও একই ভাবে ফিসফিস করলো…
” আমি কি জানি !
রাফি আড়চোখে দেখছে ওদের ফিসফিসানি । নিজের বোনকেও দেখছে আড়চোখে । রুহির হাত কাঁপছে, কোনো রকমে স্যান্ডউইচ হাতে তুলে একটা কামড় বসালো ও । এর মাঝেই গলা খাঁকারি দিয়ে বলে উঠলো শান্ত….
” বেশি করে খাও বউ । বাপের বাড়ির খাওন ফুরিয়ে আসছে তোমার ।
অমনি থমকালো রুহি । এই লোকটার কথাও কানে বিঁধছে ভীষণ । চাহনি তো মারাত্মক । ঠোঁট উল্টায় রুহি..! নাহ , খাওয়া সম্ভব নয় এভাবে । ঝট করে বসা ছেড়ে উঠলো রুহি । পা বাড়াতে গেলে রাফি বলল…
” খাবি না ?
একটু থেমে ধীরে উত্তর করলো রুহি…
” খেতে ইচ্ছে করছে না, ভাইয়া ।
” বস , খেয়ে তার পর উঠবি !
” খাবো না ।
” বসতে বলেছি ।

কাঁচুমাচু মুখে বসলো মেয়েটা । কোনো রকমে একটু গিলে তড়িঘড়ি করে উঠলো সবার আগে । শান্ত আর মিহি নিজেদের মাঝে গুজুর গুজুর করছে । রুহির অবস্থা দেখে হাসছে ওরা ।
ছেলে মেয়েদের খাওয়া শেষ হতেই ওদের সকলকে নিজেদের কাছে ডাকলেন রাশেদ রায়হান চৌধুরী । বিয়ের অনেক ব্যস্ততা বৃদ্ধি পাবে ধীরে ধীরে । শপিং এর মধ্যেই সেড়ে ফেললে এগিয়ে থাকবে একটু । রাশেদ রায়হান চৌধুরী সেটাই বললেন । আজ যেতে বললেন শপিংয়ে । ছেলে মেয়েরাই যাবে শুধু । ওরা ওদের মতো করে নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী যা যা কেনার কিনে আনবে নিজেদের জন্য ।
তাড়াতাড়িই যেতে বললেন রাশেদ রায়হান চৌধুরী ।
সেই মোতাবেক এগারোটার পরপরই বাড়ি থেকে বেরিয়েছে ছেলে মেয়েরা । মেহজাবিন খুব সতর্ক হয়ে আছে ওদের সাথে ।

বাড়ি থেকে ত্রিশ মিনিটের ব্যবধানে সকলে পৌঁছালো যমুনা ফিউচার পার্কে । গ্রাউন্ড ফ্লোরেই বিয়ের সব শপিং মিলে যাবে । প্রথমেই রুহির লেহেঙ্গা । সে শাড়ি পড়বে না । শাড়ি পড়ে হাঁটতে পারে না । পায়ে বাঁধে । হেনা বেগম কড়া ভাবে বলে দিয়েছেন শাড়ির বদলে লেহেঙ্গা কিনতে । রুহি দ্বিমত করে নি । সে বিয়ের দিন অস্বস্তিতে পড়তে চায় না শাড়ি পড়ে । গ্রাউন্ড ফ্লোরের লেভেল-২ , ব্লক – সি ও ডি তে প্রিমিয়াম ডিজাইনের সব ব্রাইডাল লেহেঙ্গার বুটিক শপ । একটাতে ডুকলো ওরা । এরমধ্যে রুহি একটা বারের জন্যেও শান্তর দিকে তাকায় নি । শান্ত খচখচ করছে । অনেক গুলো লেহেঙ্গা দেখেও একটাও পছন্দ হয় নি রুহির । বেশ কটা দোকান ঘুরলো ‌। এমনিতেই ও ভীষণ খুঁতখুঁতে । সহজে সব জিনিস পছন্দ হয় না । নিজে পছন্দ করতে গেলে পুরো দিন কাবার হয়ে যাবে ‌। সবসময় হয় রাফি নয়তো শান্ত , এই দুজনের মধ্যে একজন সবকিছু চুজ করে দেয় ওকে । ওদের পছন্দ টাই বেশি পছন্দ হয় রুহির কাছে । সেটা যেমনই হোক না কেনো । ওদের সিলেকশন বেস্ট । আজ রুহিকেই পছন্দ করতে দিয়েছে রাফি । ওর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটা অধ্যায় । এই অধ্যায়ের সাথে জড়িত মানুষ টাকে যেমন রুহি নিজে সিলেক্ট করে নিয়েছে , তেমন সাজপোশাক ও ওকেই সিলেক্ট করতে হবে । অনেক ক্ষণ যাবৎ অনেক পোশাকই দেখলো । একটাও নজর কাড়লো না । রুহি হাঁপিয়ে আহত চোখে চাইলো রাফির দিকে । রাফি শুধালো..

” পছন্দ হয় নি ?
ঠোঁট উল্টে দুদিকে মাথা নাড়ালো রুহি । বললো…
” তুমি সিলেক্ট করে দাও ।
রাফি তিনটে ড্রেস এক পাশ করলো । আগে থেকেই নজর রেখেছিল এই তিনটেতে । বোনকে খুব মানাবে এই তিনটেই । রাফির সাইড করা তিনটে লেহেঙ্গা দেখে লাফিয়ে উঠলো রুহি । কি সুন্দর এগুলো । অথচ ও এতক্ষণ এসবই নাড়াচাড়া করছিলো । কিন্তু মন বসে নি একটাতেও । রাফি ঐ তিনটে একপাশ করে একজন স্টাফ কে বললো রুহিকে ট্রায়াল রুমে নিয়ে যেতে । ট্রায়াল দেওয়া হবে এগুলো । রুহি সেই স্টাফের সাথে ট্রায়াল রুমের দিকে এগোলো । মিহি কাঁচুমাচু হয়ে বসে । মাহিম এসেছে খানিক আগে । মেহজাবিন ওর সাথে পাশের শপে ঢুকেছে । এক জায়গায় সবাই বসে থাকলে টাইম ওয়েস্ট হবে অনেক । জেনি আছে ওদের সাথে । রুহি চলে যেতেই শান্ত ও ওর পিছু নিয়েছে । বাইরে অপেক্ষা করবে সে । রুহি কে একা ছাড়বে না । আর একটু বোঝা পড়াও আছে এই ছিঁচকাদুনে মেয়েটার সাথে । সে তো খেয়ালই দিচ্ছে না শান্তর দিকে ।
ওরা সব ফাঁকা হয়ে আসতেই এবার রাফি পুরোপুরি মনযোগ দিলো মিহির দিকে । বললো খানিক হেসে….
” ম্যাডাম , শুনছেন ? আপনি এভাবে বসে আছেন কেনো ?
মুখ বাঁকালো মিহি । অন্যদিকে ফিরে বললো…

” আপনি তো পাত্তাই দিচ্ছেন না আমায় !
” আচ্ছা ! পাত্তা দিচ্ছি না ? নাকি আপনি আমায় পাত্তা নিচ্ছেন না ?
মিহি একই ভাবে বললো ভেংচিয়ে…
” আগেই ভালো ছিলেন আপনি । যখন আমি পাত্তা দিতাম না , ত্যাড়ামো করতাম ,তখন পিরিত উতলে পড়তো । পিছু পিছু ঘুরতেন , কোটি টাকা দিয়ে ক্যাফেও কিনেছিলেন । আর এখন ? এখন কাছে আছি বলে ফিরেও চাইছেন না আমার দিকে । মানুষ ঠিকি বলে , কাছের জিনিসের কদর কেউ বোঝে না ।
রাফি সুক্ষ্ম করলো চোখের চাহনি । বললো হীম শীতল স্বরে…
” এইতো ফিরে চেয়েছি , আপনিই তো মুখ ফিরিয়ে আছেন । একটু ফিরে চান আমার দিকে ।
” তাকাবো না আমি আপনার দিকে । আপনি আমাকে ইগনোর করেছেন ।
অভিমানী নোয়ানো স্বর মিহির । রাফি আলতো হাসলো । কাল থেকে মিহির সাথে আলাদা করে কথা হয় নি , সময় স্পেন্ড করা হয় নি । এজন্যই অভিমান করেছে তার ব্লোসোম ।

আশেপাশে কেউ নেই । মিহি যে তুলটাতে বসে আছে , রাফি সেটা এক টানে নিজের দিকে টেনে আনলো । ভড়কালো মিহি । তৎক্ষণাৎ ওকে সামলে ওর কোমর চেপে ধরল রাফি । আঁতকে ভয়ার্ত চোখে চাইলো মিহি ‌। অসাবধান হলেই এক্ষুনি পড়ে যেতো । মিহির ভয়ার্ত চোখে চোখ রেখে রাফি হিসহিসিয়ে বললো..
” আপনাকে ইগনোর করার ক্ষমতা আছে আমার ? শত উপেক্ষায় নিজেই নিজেকে উপেক্ষিত করতে পারবো , কিন্তু এই মাহিতা ইসলাম মিহি কে এক মুহুর্তের জন্য উপেক্ষা করার সাধ্যি আমার নেই ।
কাল থেকে তো আপনি আমার কাছে আসেন নি । আমার ত্রিসীমানাতেও আসেন নি । কি করে পিরিতি দেখাবো ?
” হুহহহহ , দেখাতে হবে না এমন পিরিতি ! আজ থেকে আগের মতো হয়ে যাবো আমি , চিনবো না আপনাকে । তাহলে আপনিও আগের মতো এটেনশন দেবেন আমায় ।

” এটেনেশন চাই আমার ?
” চাই !
” কতটা ?
” যতটা আর কাউকে দেবেন না ততটা !
” ততটাই তো দেই আপনাকে ! নিজেকেও অতটা এটেনশন দেই না ।
” হয়েছে , অতো বয়ান দিতে হবে না ।
হাসলো রাফি । দূরত্ব বাড়িয়ে বললো…
” আপনার কি কি কেনার আছে ?
” কিছু না !
” কেনো ?
” বিয়ে কি আমার নাকি ?
” আপনার ননদের !
ভ্রু গুটিয়ে তীক্ষ্ণ করলো মিহি । ঠোঁটের এক কোণা কামড়ে ধরে তাকালো রাফির দিকে । রাফির হাসি হাসি মুখ খানা দেখে খানিক বাদ স্বাভাবিক করলো নিজেকে । হাসলো চোখ নামিয়ে । রাফি উঠে দাঁড়ালো , মিহির হাত টেনে ওকেও দাঁড় করালো । রুহি আছে , ওর সাথে শান্ত ও আছে ।
নির্দ্বিধায় মিহি কে নিয়ে বুটিক থেকে বেরোলো রাফি । মিহি চাপা স্বরে বলে উঠলো…

” আরে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন ?
” পিরিতি করতে , এই পিরিতে পোষাচ্ছে না আপনার । একটু বড় বড় পিরিত করবো এবার আপনার সাথে ।
মিহি টাস্কি খেয়ে থমকে দাঁড়ালো । রাফি ফিরে কিছু বলার আগেই পকেটে থাকা ফোনটা বেজে উঠলো । মিহির হাত এক হাতে ধরেই অন্য হাতে ফোন বের করলো রাফি ‌। অফিস থেকে ফোন এসেছে ‌। নিশ্চয়ই জরুরি ‌। মিহির হাত ছেড়ে রাফি বললো…
” ওয়েইট , জাস্ট ওয়ান মিনিট । আমি ফোনটা এটেইন করে আসছি ।
একটু দুরে দাঁড়িয়ে ফোন রিসিভ করলো রাফি । ও সরে যেতেই মুচকি হাসলো মিহি । পাশে বেবি শপ । বেবিদের ড্রেস জোন এদিকে । মিহি এক পা দু’পা করে এগোলো । কাঁচের দরজা ভেদে বাইরে থেকে সবকিছু দেখা যাচ্ছে । মিহি থম মেরে দাঁড়ালো বুটিকের সামনে । হাঁ হয়ে আসলো মুখ । এই দোকানে সব আন্ডার ফাইভ বেবিদের ড্রেস । কি সুন্দর সুন্দর ছোট্ট ছোট্ট ড্রেস ঝোলানো হ্যাঙারে । রঙিন,বেরঙিন, উজ্জ্বল,কতশত পোশাক ‌। চোখ আটকে যাচ্ছে ছোট ড্রেস গুলোতে । যেকোনো বাচ্চা কেই দারুন মানাবে এগুলো ‌। মিহি উজ্জ্বল প্রগাঢ় চোখে তাকিয়ে রইল । ড্রেস গুলো দেখে লোভ লাগছে ভীষণ । মিহি হাঁ হয়ে মূক বনে তাকিয়ে দেখছে বুটিকের ড্রেস গুলো । ইশশ্, ও যদি ছোট হতো ! কতোই না ভালো হতো !
এর মধ্যেই ফোনে কথা শেষ করে ওর পাশে এসে নিঃশব্দে দাঁড়িয়েছে রাফি । মিহি কে অপলক বুটিকের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে নিজেও একবার তাকালো সেদিকে । অতঃপর ধীরে ডাকলো আবেশে…

” ম্যাডাম , কি দেখছেন ?
মিহি দৃষ্টি সরালো না ‌। বরং আচমকা রাফির হাত খানা টেনে ধরলো । বাহু জড়িয়ে একই ভঙ্গিতে থেকে বেখেয়ালি হয়ে বলে বসলো…
” দেখুন ! বেবিদের ড্রেস গুলো কি কিউট না ? একদম কুটু কুটু ! দেখতে ভালোই লাগছে , না ? আমাদের বেবি হলে এখান থেকে এরকম অনেক গুলো ড্রেস কিনবো , কেমন ?
রাফি আচমকা ওর কথা গুলো শুনে বড়সড় নজরে তাকালো । মিহির বেখেয়ালে ভাবমূর্তি বুঝতে বাকি নেই । ঠোঁটের কোণা কামড়ে ফিচেল হাসলো রাফি । বললো একটু ঝুঁকে…
” আচ্ছা ! আমাদের বেবি হলে ? বেবির চিন্তা ভাবনা চলছে তাহলে আপনার মাথায় ? এতো কিছু ভেবেছেন ? আপনি তো খুব ফাস্ট দেখছি ? বেবি চাই আপনার ? আগে বললেই পারতেন বেবি প্রয়োজন ! এখনো কিন্তু বিয়ে হয় নি আমাদের ! এতো যেহেতু বেবি নেওয়ার সখ, তাহলে না হয় বিয়ে করে ফেলি আপনাকে ? চলুন আজই বিয়ে করে নেই ।
তার পর বেবি ডাউনলোড দেবো না হয়….
রাফির ফিচেল স্বরে সম্বিত ফিরল মিহির । রাফির দিকে ঝট করে চাইতেই রাফির ঠোঁট কামড়ে হাসি টুকু নজরে ঠেকলো । মিহি ঘোরের বশে বেখেয়ালে কি বলে ফেলেছে এটা বোধগম্য হতেই ছ্যাঁত করে উঠলো সে । তড়িতে রাফির জড়ানো হাত টা ঝটকা মেরে ছাড়লো । ছিটকে দূরে এসে জিভে কামড় বসালো । ইশশ্ , কি বেফাঁস কথা বেরিয়ে গেছে মুখ দিয়ে ! কোন ধ্যানে ছিলো সে ?
মিহি চোখ তুলে আধো চোখে ফ্যাল ফ্যাল করে চাইলো । রাফির তাকিয়ে থাকার ভঙ্গি এখনো এক । কেমন ধারালো চাহনি । মিহি তাকাতেই রাফি আবার বললো…

” ম্যাডাম , বেবি ডাউনলোড দেই চলুন । সখ যেহেতু , একটা কিছুই তো চেয়েছেন আমার থেকে । আমি কি সেটা না দিয়ে পারি । চলুন একটা বেবি দেই আপনাকে ।
” ধ্যাত , ক…কিসব কথা বার্তা ?
” কি আবার বললাম ! আপনি যা বললেন তাই রিপিট করলাম !
” আ..আমি মেহজাবিন আপুর বেবির কথা বলেছি । আপুর বেবি হলে এখান থেকে ড্রেস কিনবো , কেমন ? খুব সুন্দর ড্রেস গুলো । পছন্দ হয়েছে আমার । আমি আপুর বেবি কে গিফট করবো ,সেটাই বলছিলাম আরকি । আপনি কি না কি ভাবেন….
” আচ্ছা ? আমি তো শুনলাম , আপনি আমাদের বেবির কথা বলছিলেন । আমার কাছ থেকে বেবি গিফট চাচ্ছিলেন একটা….! এখন পাল্টি খাচ্ছেন কেনো ? আমি তো গিফট দিতেই চাইলাম । আপনি শুধু গ্রহণ করবেন….
বান্ধবীর ভাই হিসেবে আপনাকে একটা বেবি দেওয়া আমার দায়িত্ব….
বলেই ঠোঁট কামড়ে ধরলো রাফি । মিহি কাঁচুমাচু হয়ে আমতা আমতা চোখ নামিয়েছে ।
এদিকে রুহি ট্রায়াল রুম থেকে বেরিয়েই মুখোমুখি হয়েছে শান্তর । শান্ত ওর জন্যই হাঁসফাঁস করে অপেক্ষা করছিল যেনো । এটা ওটা দেখছিলো নাড়াচাড়া করে । রুহি বেরোতেই অধৈর্য হয়ে তাকালো শান্ত । ভ্যাবাচ্যাকা খেলো রুহি । শান্ত এক মুহুর্তেই স্তব্ধ হয়ে গেলো । চোখ আটকে গেল সামনের রমনীর পানে । ঝলমলে গাঢ় সবুজ আর খয়েরী রঙের মিশ্রণের চিকচিকে সুক্ষ্ম কাজের লেহেঙ্গা পড়নে । মসৃণ সিল্ক আর নেটের উপর জরি আর জারদৌসির কাজ । ঝিকঝিক করছে রুহির ফর্সা শরীরের উপর ।
সিল্কের হালকা কাজের খয়েরী ওরনাটা ঘোমটার ন্যায় মাথায় টেনে রাখা ‌।
শান্ত পুরো স্তব্ধ । উতলা ভেতর ভেতর । শান্ত কে ওভাবে নিজের দিকে অপলক দৃষ্টিতে ড্যাপ ড্যাপ করে তাকিয়ে থাকতে দেখে চোখ নামালো রুহি । শান্ত যন্ত্রের ন্যায় কয়েক পা এগিয়ে রুহির ঠিক সামনে দাঁড়ালো । একটু ঝুঁকে বললো ফিসফিসিয়ে….

” আর ট্রায়াল দিতে হবে না , এটাই সিলেক্টেড ।
রুহি খানিক চোখ তুলে চায় । চোরা দৃষ্টি ওর । শান্ত এতক্ষণে কপাল কুঁচকালো । বললো সেই নরম স্বরেই….
” কাল থেকে আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছো কেনো ? দুপুরে তো কেঁদে কেঁদে বলছিলে আমাকে আর এভয়েড করবে না । ভুলে গেলে এর মধ্যেই ?
রুহি গলা নামিয়ে উত্তর করলো…
” এমনি…
” এমনি কি ?
কথা আসছে না রুহির মুখে । বুক ঢিপঢিপ করছে । হাত কচলাচ্ছে ও । শান্ত ওকে পুরোপুরি দৃষ্টিতে পরখ করলো । ওর অবস্থা টুকু ঠাহর করে ঠোঁট চেপে বললো….
” লজ্জা পাচ্ছো ?
চিবুক আরো বেশি নামিয়ে ফেললো রুহি । ইচ্ছে করছে এক ছুটে এখান থেকে পালিয়ে যেতে । এই লোকটার সামনে কি করলে আর পড়বে না ও ? এই লোকটার মারাত্মক চাহনিতে না তাকিয়েই অনুমানে ঘায়েল সে ! এই মুহূর্তে অলৌকিক কিছু ঘটুক , যেনো রুহি ছাড়া পায় এনার দৃষ্টি থেকে !
কিন্তু হলো কি ? সেই একই ভাবে নুইয়ে থাকতে হচ্ছে এই লোকটার সামনে !
শান্ত আবারো বলল…

” কি হলো ? লজ্জা পাচ্ছো ? বিয়ে না হতেই লজ্জা ? পাও,পাও, এখন লজ্জা পাও । বিয়ের পর লজ্জা ভাঙ্গাবো ।
রুহি ঝট করে পিছু ফিরলো । কম্পিত বিচলিত গলায় উচ্চারণ করলো….
” আপনি যান তো এখান থেকে ! এখানে লেডিস ট্রায়াল রুমের সামনে কি করছেন আপনি ?
” তোমার ট্রায়াল দেখতে এসেছি !
” যান এখান থেকে !
শান্ত আগের প্রসঙ্গে বললো আবার…
” লজ্জা পেলে তোমাকে কিন্তু হেব্বি লাগে জান । একেবারে আমার বউ বউ ।

এক দেখায় পর্ব ৫৫ (২)

আড়ষ্ট রুহি আরো বেশি জড়িয়ে গেলো আড়ষ্টতায় । শান্ত ওর পিছে দাঁড়ালো । পেছনে হাত গুটিয়ে রুহির কাঁধ টপকে সামনের দিকে ঝুঁকে ওর লজ্জায় রাঙা লালিত মুখ খানা দেখে বললো….
” এমনে বেকার বেকার লজ্জা পাচ্ছ কেনো ? লজ্জা পাওয়ার মতো কি এমন করলাম ?
রুহি তড়িতে ঘুরে দাঁড়ালো । না তাকিয়ে বললো তৎক্ষণাৎ…
” আ..আমি চেঞ্জ করে আসছি ।

এক দেখায় পর্ব ৫৭