Home এক দেখায় এক দেখায় পর্ব ৫৮

এক দেখায় পর্ব ৫৮

এক দেখায় পর্ব ৫৮
সুরভী আক্তার

শান্ত দের বাড়িতে গিয়ে ওকে পাওয়া যায় নি । ওর পাত্তা মেলে নি বাড়িতে । সবাই বললো , ঘরেই আছে শান্ত । কিন্তু সে ঘরে নেই । রাফি বেশ কবার ফোন করেছে , কিন্তু ফোনে পায় নি ওকে । রাফির বুঝতে বাকি নেই কিছু ।
শান্ত চৌধুরী বাড়িতে এসেছে । বাড়িতে ভাবেলাস হীন ভাবে টগবগ করতে করতে ঢুকলো সে ।
লিভিং রুমে জুবায়ের চৌধুরী , হালিমা বেগম , হেনা বেগম , সহ বয়োজ্যেষ্ঠরা সবাই । বাচ্চারা ছাদে । ওদের মাঝে যাননি কেউ । শান্ত কে দেখেই অবাক হলো সবাই । তাজ্জব বনে একাধিক দৃষ্টি নিক্ষেপিত হলো শান্তর দিকে । ডোর পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই সবার এতো গুলো দৃষ্টি দেখে হকচকিয়ে গেল শান্ত । পড়লো ইতস্তত অবস্থায় । ফ্যাল ফ্যাল করে হাসার চেষ্টা করলো । জুবায়ের চৌধুরী দাঁড়িয়ে শুধালেন রাশভারী গলায়…

“ এতো রাতে এ বাড়িতে কি করছো শান্ত ?
“ রাত কোথায় মামা ? সবে নয়টা বাজে !
“ রাত তো ! কেনো এসেছো ?
সুচালো দৃষ্টি জুবায়ের চৌধুরীর । মুখো ভঙ্গিমা নিরেট । সবাই সচকিত হয়ে চেয়ে আছে শান্তর দিকেই । ভ্যাবাচ্যাকা খেলো শান্ত । এতো কিছু তো ভেবে আসে নি ও !
এসেছে জান টাকে এক পলক দেখতে । সেই কখন থেকে রুহির ফোনে ভিডিও দিয়েও পাওয়া যাচ্ছে না মেয়েকে । তাই ছুটে এসেছে শান্ত ।
মনে মনে উত্তর সাজিয়ে উচ্ছাস নিয়ে বললো সে…
“ রাফির সাথে দেখা করতে এসেছি । ও ডেকেছ আমায় ! বললো আর্জেন্ট কাজ আছে । আমাকে সকাল থেকে দেখে নি তো , তাই দেখতে চাইছে । তাই চলে আসলাম আর কি ।
গলা ঝাড়লেন জুবায়ের চৌধুরী । হালিমা বেগম হাসি চেপে বললেন…
“ কিন্তু রাফি তো তোমার সাথেই দেখা করতে ও বাড়িতে গেলো শান্ত । ও তো বাড়িতে নেই । তোমাকে কে ডেকেছে তাহলে ?
মুখের উপর উষ্ঠা পড়লো । ফ্যালফ্যালে হাসি হাসি মুখ খানা ফাটা বেলুনের মতো ফুসস করে চুপসে গেল শান্তর । আওড়ালো সে….

“ হ্যাঁ ? রাফি , আমাদের বাড়িতে গেছে ?
“ হ্যাঁ তো । ও আর ইভান তোমার দেখা করতে গেলো । কিন্তু তুমি তো এখানে ! কার সাথে দেখা করতে এসেছো তুমি ?
ঠোঁট চেপে প্রশ্ন করলেন হালিমা বেগম । বাকিরা মুখ টিপে হাসছে । এখানে সবাই বড় । এভাবে ছেলেটা কে জব্দ করা মানায় না কারোর । কিন্তু বেমান ও লাগছে না । বেশ উপভোগ করছে সবাই । শান্তর মুখটা দেখার মতো হয়েছে পুরো । আমতা আমতা করছে বেচারা ।
“ না মানে , মামি । এ বাড়িতে বিয়ে তো , তাই মনটা বিয়েতে আসার জন্য উরু উরু করছিলো । তাই আসলাম আর কি…
“ বিয়ে তো তোমাদের বাড়িতেও শান্ত । বর তুমি নিজেই ।
লতা বেগমের কথায় আরো বেশি মিইয়ে গেল বেচারা । হঠাৎ করেই এই পরিস্থিতিতে লজ্জা লজ্জা লাগছে কেমন ‌। কপালে ঘাম জমছে ।
ওর অস্বস্তিকর পরিস্থিতি কাটিয়ে একটা কন্ঠ ভেসে আসলো পিছন থেকে….
“ আমরা নিয়ে আসলাম ওকে । আমাদের সাথে এসেছে ।
রাফির কন্ঠ । চকিতে পিছন ফিরলো শান্ত । পাশে রাফি আর ইভান এসে দাঁড়ালো । কপালে ভাঁজ রাফির । ইভান ভ্রু নাচালো শান্ত কে দেখে । পেট ফেটে হাসি আসছে ওর ।
শান্ত হাঁফ ছাড়ল । উফফফ , বাঁচা গেলো । সঠিক সময়ে হাজির হয়েছে এরা । এবার ঘাড় উঁচিয়ে বুকে দম নিয়ে টান টান হয়ে দাঁড়ালো শান্ত ।
জুবায়ের চৌধুরী প্রশ্ন করলেন…

“ শান্ত তোমাদের সাথে এসেছে ?
“ হ্যাঁ মামা । ওদের সাথেই এসেছি আমি । তোমরা দেখি আমাকে পর করে দিলে । এ বাড়ির জামাই হচ্ছি দেখে কি আগের মতো আর যখন তখন আসতে পারবো না নাকি এ বাড়িতে ? এখনও জামাই হই নি । শশুর বাড়ি হিসেবে নয় , মামার বাড়ি হিসেবে এখানে এসেছি আমি ।
হালিমা বেগম বললেন প্রত্যুত্তরে….
“ তাহলে এখন মামার বাড়িতে মামাতো বোনের বিয়েতে এসেছো শান্ত ?
চোখ বড় বড় করে চাইলো শান্ত । তৎক্ষণাৎ বাঁধ সেধে সোজাসুজি বললো…
“ মামাতো বউয়ের বিয়েতে এসেছি মামি । আমার বউ কই ?
হাসলো সকলে । গলা খাঁকারি দিয়ে একপাশে বসলেন জুবায়ের চৌধুরী । হেনা বেগম এবার মুখ খুললেন….
“ ওরা সবাই ছাদেই আছে । যা তোরা….
শান্ত রাফির দিকে ফিরতেই কটমটিয়ে তাকালো রাফি । দাঁত খিচে বললো….
“ চল….
ঘরে এনে ঠাস করে দরজা লাগিয়ে দিলো রাফি । শান্ত কে ধাক্কা মেরে ছুড়ে মারলো বিছানার উপর । পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে এক পা এক পা করে এগোতে লাগলো ওর দিকে !
শান্ত জড়ানো চোখে আঁতকে ওঠার ভঙ্গিতে তাকায় । অসহায়ের ন্যায় বলে ওঠে….

“ কি হচ্ছে এটা ! এভাবে এগোচ্ছিস কেনো ভাই ?
“ ফোন ধরছিলি না কেনো ?
“ ও ফোন ? ফোন তো সাইলেন্ট ছিল ! দেখি নি…
“ এ বাড়িতে কি করছিস ?
“ আমার বউকে দেখতে এসেছি ! কাল রাত থেকে দেখি নি !
রাফি কপাল কুঁচকেই এক পা এক পা করে এগোচ্ছে । ইভান পা তুলে আগ্রহী হয়ে সোফায় উঠে বসলো । এখন দেখার পালা কি হয় এই দুটোর মধ্যে ।
রাফি কে ওভাবে এগোতে দেখে ভয় পাওয়ার ভঙ্গিতে চোখ গোল করে ঢোক গিললো শান্ত ।
“ দেখ , তুই কিন্তু আমার হবু শালা লাগিস । তাও আবার বড় শালা । এভাবে এগোচ্ছিস কেনো ভাই ? তোকে দেখে ভয় লাগছে আমার ! আমি কিন্তু ছেলে , এভাবে এগিয়ে লাভ নেই । কিচ্ছু করতে পারবি না । তোর দ্বারা আমার সর্বনাশ হবে না । সো , সর সামনে থেকে ।
রাফি কটমটিয়ে চায় । ছুটতে উদ্যত হয়ে গলা উচাঁয়…
“ তোকে তো আমি ..
শান্ত খাটে হামাগুড়ি দিয়ে অপর পাশে গিয়ে আড়াল করে নিজেকে । রাফি ওর পিছু নিতে গেলে দুহাতে ডিফেন্স করে বলে ওঠে….

“ খবর দার এগোবি না । আমার বউয়ের আমানত তোর কাছে যেতে দেবো না আমি । কি করবি আমায় ? তোর মতলব ভালো ঠেকছে না আমার কাছে !
ইভান , ভাই বাঁচা আমায় ! তোর হবু বোনের , থুক্কু , বোনের হবু জামাইয়ের সাড়ে সর্বনাশ করে দিচ্ছে । প্লিজ হেল্প ভাই…
শান্ত এক লাফে ইভানের পেছনে লুকালো । ইভান হাতে ফোন ধরে বলে উঠলো…
“ কন্টিনিউ রাফি । লাইট,ক্যামেরা,আ্যকশন….
রাফি ওকে বাড়িতে না পেয়ে কমপক্ষে হাজার বার কল করেছে ওকে । আর ও ফোন সাইলেন্ট করে বিন্দাস আছে ।
রাফি ইভানের পেছনে যেতেই এক লাফে সোফা টপকে দৌড়ে দরজা খুলে বেরিয়ে গেলো শান্ত । একেবারে ছুট লাগালো ছাদের দিকে ।
পিছু পিছু ধাওয়া ধরলো রাফি । তার পেছনে ফোন নিয়ে ইভান । বাচ্চাদের ন্যায় ছুটতে ছুটতে ছাদে পৌঁছালো ওরা । ছাদের রঙিন আলোর ঝলকানি চোখে লাগতেই থামলো শান্ত । সবার আগে নজর পড়লো এক পাশের ফুলে মোড়ানো স্টেজে সোফায় বসে থাকা রুহির উপর । হাতে মেহেদি দেওয়া শেষ । অন্যদের হাতে মেহেদি পড়ানো হচ্ছে এখন । রুহি এক দৃষ্টে তাকিয়ে সবার মেহেদি পড়া দেখছে ।
কাঁচা সবুজ রঙের একখানা লেহেঙ্গা পড়নে । সেজেছে হালকা ফুলে । ওকে দেখে থমকালো শান্ত ।
আটকে গেলো দৃষ্টি যুগল । থমকে থেকে একটু পর এগোলো । ছাদে উঠে দৌড় থামিয়েছে রাফি , ইভান । শান্ত স্থির চোখে তাকিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতেই জেনি চেঁচিয়ে উঠলো….

‘’ শান্ত ভাইয়া …
অমনি সচকিতে আঁতকে উঠলো রুহি । ধক্ করে চাইলো সে । মুহুর্তেই চোখাচোখি হলো দুজনের । ছ্যাত করে উঠলো নাজুক মেয়েটার বক্ষ স্থল । নিমিষেই এক পলকে চোখ নামিয়ে নিল সে । জড়িয়ে ফেললো নিজেকে । শান্ত তা দেখে ঠোঁট পিষে হাসে । দৃষ্টি স্থির রেখেই রুহির সম্মুখে গিয়ে দাঁড়ায় । নত জানু রুহিকে নিজের দিকে ফেরাতে গলা খাঁকারি দেয় শব্দ করে ।
রুহি গুটিয়ে যায় আরো । চিবুক ঠেকিয়ে ফেলে গন্ডদেশে । ইশশ্ , কি অবস্থা । এই লোকটা এখানে কি করছে ? শান্তর চোখে এতক্ষণে পলক পড়েছে কি না সন্দেহ । চোখে অদ্ভুত ঘোর ।
মেহজাবিন গলা ঝাড়লো ওর দৃষ্টি ভঙ্গি দেখে । বললো চাপা স্বরে….
“ উঁহুম উঁহুম …
ভাইয়া ! ভালো আছো ?
নিজেকে সামলে নিলো শান্ত । পাঞ্জাবির কলার টেনে শরীর ঝাড়া দিয়ে বললো….
“ খুউউউব ভালো আছি ব্যাহনা ! বিন্দাস একেবারে ।
তা মেহেদি পড়া হলো তোদের ?
“ হয়েছে ভাইয়া । রুহির ও হয়েছে । দেখে বলতো কেমন হয়েছে !
শান্ত সোজাসুজি রুহির ঠিক পাশেই বসলো সোফায় । ছিটকে দূরে সরে বসলো রুহি । ভাগ্যিস বড়রা কেউ নেই এখানে । কিন্তু মাহিম ভাইয়া , রাফি, ইভান, মেহজাবিন, লিনা , এরা তো আছে । এরাও তো বড় ।
রুহি কে ছিটকে সরতে দেখে শান্ত বললো…

“ দেখি কেমন মেহেদি পড়লে ?
রুহি হাত বাড়িয়ে দেয় দূর থেকেই । দুহাত ভরে মেহেদি পড়েছে মেয়েটা । পাশ থেকে মেহজাবিন বললো…
“ ভাইয়া , তোমার নামটা খুঁজে বের করো তো !
খুব ঘন মেহেদির ডিজাইন । তালুতে উপরে একই । শান্ত খুঁটিয়ে দেখলো বড় অক্ষরে ওর নাম লেখা নেই । কেনো ? কপাল গুটিয়ে বললো শান্ত…
“ আমার নাম কোথায় লেখা ?
“ খুঁজে বের করো !
রুহি হাত আলগোছে ধরলো শান্ত । উল্টে পাল্টে দেখলো মনযোগ সহকারে । কনিষ্ঠা আঙুলের পাশে ছোট্ট করে লেখা , শান্ত । তা দেখে মন ভরলো না শান্তর । মুখ শুকিয়ে বললো নামটা দেখিয়ে….
“ এতো ছোট করে লেখা কেনো ?
“ ওটাই তো টুইস্ট ভাইয়া ! ছোট করে লেখা হয়েছিল , যাতে আপনি খুঁজে বের করতে না পারেন ।
লিনার কথায় শান্ত পাশের গোল টেবিল থেকে ছোঁ মেরে একটা মেহেদির কোন তুলে নিলো ।
“ খুঁজে তো পেয়েছি । টুইস্ট খতম । এবার বড় করে ওর হাতে আমার নাম লেখা হবে । মনে তো আছেই , হাতেও ফুটুক আমার নাম । দেখুক সবাই…
বলতে মেহেদির কোন এগিয়ে দিতেই রুহি হাত সরিয়ে নিলো ! চকিতে বললো…

“ কি লিখবেন আমার হাতে ?
“ লিখবো ছিঁচকাদুনে মেয়ে !
চোখ পাকিয়ে তাকায় রুহি । হেসে ওঠে বাকিরা । শান্ত খানিক হেসে বলে…
“ শান্তর বউ ! এটাই লিখবো !
“ হাতে জায়গা নেই তো ভাইয়া , কোথায় লিখবেন ?
কনুইয়ের কাছটা ফাঁকা । শান্ত সেখানে হাত চালিয়ে মাহিমের প্রশ্নের উত্তর করলো…
“ এখানে !
বড় অক্ষরে যা বলেছিলো তাই লিখলো । শান্তর বউ…..
রাফি মুচকি হাসলো দুটোকে দেখে । আশেপাশে মিহি কে দেখা যাচ্ছে না । কপাল গুটিয়ে এদিক ওদিক চোখ বুলিয়ে মিহি কে খুঁজলো সে । না পেয়ে শুধালো….
“ মিহি কোথায় ?
সচকিতে চাইলো লিনা । প্রত্যুত্তরে মেহজাবিন বললো…
“ এতক্ষণ তো এখানেই ছিলো । এখন আম্মুর ঘরে গেছে ।
রাফি সবার দৃষ্টির অগোচরে একটা কোণ নিয়ে জায়গা ত্যাগ করলো । নিচে এসে রাবেয়া চৌধুরীর ঘরে ঢুকলো । দরজা ঠেলে ঢুকতেই বিছানার উপর নজর পড়লো । মায়ের কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে মেয়েটা । রাবেয়া চৌধুরী এক হাতে সুন্দর মতো মিহির মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন । রাফির ঘরে ঢোকার আভাস পেতেই রাবেয়া চৌধুরী ঠোঁটে আঙ্গুল চেপে সতর্ক করে দিলেন রাফি কে । যাতে শব্দ না করে ।
রাফি ও শব্দ করলো না । নীরবে খাটের পাশে দাঁড়াতেই রাবেয়া চৌধুরী চাপা ক্ষিণ স্বরে বললেন …

“ মেয়েটা ঘুমিয়েছে ! শব্দ করিস না ।
“ ঘুমিয়েছে ও ?
“ হুম ! এই দেখ আমার হাতে এসব কি লাগিয়ে দিলো ! বললো অনেক সুন্দর রং হবে এতে । লাগিয়ে দিয়ে আমার কোলে মাথা রেখে বললো , আমি যেনো মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দেই । হাত বুলিয়ে দিতে না দিতেই ঘুমিয়ে পড়লো কেমন !
নিজের অন্য হাতের দিকে ইশারা করে কথা গুলো বললেন রাবেয়া চৌধুরী । মিহি রাবেয়া চৌধুরীর হাতে একটু মেহেদি লাগিয়ে দিয়েছে । চেয়েছিল তাকে বাইরে ছাদে নিয়ে যেতে , কিন্তু পারে নি । তাই এখানেই এসেছে সে মায়ের কাছে । রাফি রাবেয়া চৌধুরীর হাতের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো । খাটের পাশে বসে ধীরে বললো…
“ ওর হাতেও লাগিয়ে দেই এগুলো ?
মাথা ঝাঁকিয়ে চিকচিকে নয়নে সম্মতি দিলেন রাবেয়া চৌধুরী । মেয়েটা কি সুন্দর কোলে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে আরামে ঘুমিয়ে আছে । বাচ্চাদের ন্যায় নিচের অধর উল্টানো খানিক । এই ভারী লেহেঙ্গা টা পড়েই দিব্বি ঘুমিয়ে আছে । যেন কত ক্লান্ত !
রাফি মুচকি হাসলো ।

সকাল সকাল ঘুম থেকে গা মুড়িয়ে উঠে বসলো মিহি । হাই তুলে সম্পুর্ন চোখ খুললো । ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে তাকাতেই নজরে পড়লো রাবেয়া চৌধুরী । এখনো ঘুমিয়ে তিনি । মিহি চমকে তড়িতে দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকালো । সাতটা বেজে গেছে । সকাল সাতটা ? আঁতকে উঠলো মিহি ! রাত পেরিয়েছে ? কখন , কিভাবে ? ও তো কাল রাবেয়া চৌধুরীর ঘরে এসেছিলো , তারপর ঘুমিয়ে গেছিলো ? এক ঘুমেই রাত কাবার ? ঠোঁট উল্টায় মিহি । কতো কি মিস করলো কে জানে ? পড়নে এখনো সেই কালকের লেহেঙ্গা । কুঁচকে জড়ো হয়ে গেছে এটা । এটা পড়েই কেমন আরামে ঘুমিয়ে ছিল ! কেউ ডাকলো ও না ওকে ?
মাথায় আদুরে পরশ পেয়ে অতটা গভীর ঘুমে কখন তলিয়ে গেছে নিজেও বুঝতে পারে নি সে ।
খাট থেকে তড়িঘড়ি করে নামলো মিহি । এলোমেলো চুল ছিলো কাল , এখন বেনি করা । কে বেনি করে দিলো কে জানে ? মাথা গুলিয়ে যাচ্ছে মিহির । সবার উপর রাগ উঠছে । ওকে কেউ কেনো ডাকলো না কেনো ? মেহেদি ও পড়া হয় নি ওর । মেহেদির কথা মনে আসতেই একটু থেমে অসহায় কাতর চোখে নিজের হাতের দিকে তাকালো সে । অমনি বিশাল বড় ঝটকা খেলো । এক হাতের উপরি পিঠ , আর অন্য হাতের তালু গাঢ় মেহেদির রঙে রাঙা । মেহেদি শুকিয়ে উঠে গেছে ঘুমের মাঝেই । রং দেখা যাচ্ছে ।

মুখ ফাঁক হয়ে আসলো মিহির । ঘন পলক ফেলে নিজের হাত নিজেই অবিশ্বাস্য নয়নে উল্টে পাল্টে দেখলো । চোখ ডলে আবারো তাকালো । ঘুমের মাঝে উল্টো পাল্টা দেখছে না তো ? নাহ ! উল্টো পাল্টা তো নয় ! ঠিকি দেখছে । দুই হাতই মেহেদিতে রাঙানো । এবার চোখ পড়লো হাতের তালুর ঠিক মাঝখানে , যেখানে ছোট্ট অক্ষরে একটা নাম লেখা – রাফি ।
আকাশ থেকে ঠাস করে মাটিতে পড়লো মিহি । কাতর অক্ষি যুগল‌‌‌ বৃহৎ আকার ধারণ করলো । কিসব দেখছে ও ?
অবুঝের ন্যায় খানিক থম মেরে তাকিয়ে রইল নিজের হাতের দিকে । নিজেই নিজেকে চিমটি কাটল । এতো সত্যি ! ভ্রোম নয় । কিন্তু , হাতে মেহেদি কি করে এলো ? তাও এতো সুন্দর ডিজাইন !
মিহি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে । টনক নড়লো রাবেয়া চৌধুরীর ডাকে…

“ এই মেয়ে , উঠেছিস তুই ? ওখানে দাঁড়িয়ে কি করছিস ?
সম্বিত ফেরে মিহির । রাবেয়া চৌধুরীর ঘুম ভেঙেছে । উঠে বসেছেন তিনি । মিহি কয়েক কদম এগিয়ে নিজের হাত দেখিয়ে বললো….
“ মা , আমি কাল অনেক আগেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম না ? তাহলে আমার হাতে এসব এলো কি করে ?
“ ওসব ? ওসব তো রাফি পড়িয়ে দিয়েছে তোর হাতে ! অনেক রাত অবধি জেগে ফোন দেখে দেখে এঁকে দিয়েছে । তুই তো ঘুমে ছিলি । কি ভারী ঘুম রে তোর ! তোর মাথায় বিনুনি করে দিলাম । তোর মা ডাকতে এলো তোকে , তবুও উঠলি না ! এই খসখসে জামা টা পড়ে সারারাত ঘুমালি কি করে ?
মিহি অবাক হয় । এতো কিছু ঘটেছে ? আর ,রাফিই ওর হাতে মেহেদি পড়িয়ে দিয়েছে ? তাও আবার এতো সুন্দর করে ? সত্যিই ?
আচমকা ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটলো মিহির । দুহাত নাকের সামনে ধরে শুকনো মেহেদির গন্ধ টেনে নিলো নাকে ।
অতঃপর খুস মেজাজে আর কোনো কথায় কান না দিয়ে এক ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে আসলো । রাবেয়া চৌধুরী ডাকলেন একবার । শুনলো না মিহি । রাফির ঘরে এখনো দরজা আটকানো । তারমানে এখনো ঘুম থেকে ওঠে নি সে । রুহির ঘরের সামনে যাওয়ার আগে মুখোমুখি হলো সাবিনা বেগম । মিহি কে দেখে কোমরে হাত গুজলেন তিনি । এই মেয়ে দিন দিন ঘুম পাগল হয়ে যাচ্ছে ।
সদ্য ঘুম থেকে ওঠায় চোখ মুখ ফোলা মিহির । মিহি গদগদ হয়ে আম্মু কে জড়িয়ে ধরলো…

“ গুড মর্নিং, আম্মু !
“ হলো গুড মর্নিং ? কাল কখন ঘুমিয়েছিলি খেয়াল আছে ? সবাই ছাদে, আর তুই সবার মাঝ থেকে ঘরে এসে বেঘোরে ঘুমাচ্ছিলি ?
মিহি আদুরে হলো আরো…
“ কখন ঘুমিয়ে পড়েছি খেয়ালই ছিল না । তুমি ডাকবে না আমায় ? সব মিস করে ফেলেছি আমি !
“ কিচ্ছু মিস করো নি তুমি , তোমার অনুপস্থিতির কারণে আর কিছুই হয় নি পরে । ডাকতে গেছিলাম তোমায় , রাফি ডাকতে দেয় নি ।
মিহি চোখ নামায় । রাফির প্রসঙ্গ পাল্টাতে এক হাত পেছন লুকিয়ে অন্য হাত এগিয়ে দিয়ে বলে…
“ দেখো, খুব সুন্দর হয়েছে না ?
“ হুম , রাফি পড়িয়ে দিয়েছে ।
ভ্যাবাচ্যাকা খেলো মিহি । এটাও জানেন সাবিনা বেগম ?
রুহি ঘুমিয়ে ঘরে । ওর সাথে লিনা । কাল মিহি কে ঘুম থেকে ডাকতে দেয় নি রাফি । রুহির সাথে লিনা ছিল কাল তাই । মিহি আস্তে করে নিঃশব্দে ঘরে ঢুকলো । দুটোতে এখনো ঘুমিয়ে । এই ভারী লেহেঙ্গা পড়ে আর টেকা যাচ্ছে না । মিহি চটজলদি ফ্রেশ হয়ে ড্রেস চেঞ্জ করে নিলো । খিদেও পেয়েছে ভীষণ । কাল রাত থেকে খাওয়া হয় নি । নিচে নামতেই হেনা বেগম খাবার হাজির করলেন ওর সামনে । ঝটপট খেয়ে আবার উপরে উঠলো মিহি । সাড়ে আটটা বাজতে চললো । উপরে উঠে লিনা কে বিছানায় পায় নি । উঠেছে সে , ওয়াশ রুমে হয়তো । রুহি ঘুমিয়ে এখনো । মিহি খাটে একটু আধশোয়া হয়ে রুহির মাথায় কয়েকবার হাত বুলিয়ে দিলো । অতঃপর ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ালো । পাশের ঘরের ব্যালকনিতে উঁকি দিলো একটু হেলে । পর্দার আড়ালে কিছুই চোখে পড়লো না ঘরের ভেতরের ।
হতাশ হয়ে পিছু ফিরতেই লিনা কে দেখতে পেলো ‌। স্থির চোখে তাকিয়ে লিনা । আকস্মিক অপ্রস্তুত হলেও পরমুহূর্তে নিজেকে সামলে নিলো মিহি । বললো….

“ আরে লিনা আপু , তুমি ? ঘুম হলো ?
“ হুম ? তোমার ও তো আরামে ঘুম হয়েছে না ? মায়ের কোলে মাথা রেখে ?
হাসে মিহি ।
“ কাল কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম টেরই পাইনি ।
“ হাতে মেহেদি পড়লে কখন ?
মিহি নিজের হাতের দিকে তাকায় । লিনার কন্ঠ শক্ত ঠেকলো । মিহি হাত থেকে চোখ তুলে স্বাভাবিক ভাবেই উত্তর করলো…
“ রাতে !
“ রাতে ? কখন ? কে পড়িয়ে দিলো ?
দেখি কেমন হয়েছে ?
এগিয়ে গিয়ে মিহির হাত টেনে নিজেই ওর হাত দুটো দেখলো লিনা । যা দেখার উদ্দেশ্যে ছিল সেটাই সর্বপ্রথম নজর কাড়লো । হাতের তালুতে লেখা নামটা, যা তীরের মতো বিদ্ধ হলো লিনার বক্ষ পিঞ্জরে । হাতটা তড়িতে ছাড়লো সে । মিহি খানিক অপ্রিতিকর পরিস্থিতিতে পড়লো । লিনার কাতর ভাবমূর্তি দেখে খানিক হাসার চেষ্টা করলো । হয়তো বুঝলো কিছু ।
লিনা ও হাতে মেহেদি পড়েছে । মিহি ওর হাতটা দেখে হাস্যোজ্জ্বল মুখে বললো…

“ তোমার হাতের মেহেদির ডিজাইন ও খুব সুন্দর হয়েছে আপু ।
“ তোমার টা আরো বেশি সুন্দর হয়েছে । আর্টিস্ট কে ?
উত্তর জানা । তবুও প্রশ্ন । মিহি চোখ নামায় । স্মিথ হাসে লিনা ।
“ আর্টিস্ট কি রুজান রাফি চৌধুরী ?
চকিতে চায় মিহি । উত্তরে দ্বিধাগ্রস্ত সে । ওর আমতা আমতা দেখে লিনা নিজে থেকেই আবার বললো….
“ বেশ ভালো । পার্সোনাল আর্টিস্ট সে তোমার ।
ক্যারি অন….
কথাটা বলেই এক মুহুর্ত অপেক্ষা না করে পিছু ফিরে বড় ধাপে জায়গা ত্যাগ করলো লিনা । মিহি আহত চোখে ওর যাওয়া দেখলো । কেনো যেনো খারাপ লাগার সৃষ্টি হলো মনে । অথচ লিনা কে কাল অবধি ও হিংসে হচ্ছিল । তাহলে আজ কেনো খারাপ লাগলো ?
বড় শ্বাস ফেললো মিহি । ঠিক পেছনে কারোর উপস্থিতি টের পেতেই চমকে তাকালো পেছনে । রাফি ঠিক পেছনেই দাঁড়িয়ে , নিভু চোখে তাকিয়ে সে ।
মিহি হাঁফ ছেড়ে বললো…

“ আপনি ?
“ হুম ! ডাকলে কেনো ?
রাফির গভীর কন্ঠে কপাল কুঁচকায় মিহি ।
“ কখন ডাকলাম ?
“ একটু আগেই তো ডাকলে ! উঁকি ঝুঁকি দিচ্ছিলে , সংকেত দিলে আসার । তাইতো আসলাম ! ডাকলেন কেনো ম্যাডাম ?
ঘুমে কাত অক্ষি যুগল‌‌‌ । সেই কাত চোখেই খাট থেকে পর্দা ঠেলে মিহির অবয়ব দেখা মাত্রই ঘুম ছুটিয়ে উঠে এসেছে রাফি । কি কানেকশন ! মিহি স্মিথ হাসে । দুহাত রাফির সম্মুখে ধরে বলে…
“ আপনি পড়িয়ে দিয়েছেন ?
রাফি চায় হাতের দিকে । অমনি কাত অক্ষি যুগল‌‌‌ স্বাভাবিক হয় । হাতে এখনই গাঢ় রঙ এসেছে । রং দেখে মুচকি হাসলো রাফি । মিহি আগের বার বলেছিল না , যার মেহেদির রঙ যতো গাঢ় হয় , তার জীবন সঙ্গী তাকে তত বেশি ভালোবাসে । রাফি কি মিহিকে কম ভালোবাসে নাকি ! কাল মেহেদি পড়িয়ে দেওয়ার পর থেকেই রং দেখার জন্য তর সইছিলো না ওর ।
মিহি প্রশ্নের উত্তরে ছোট্ট জবাব দিলো রাফি…

“ হুম ।
“ আপনি এসব ও পারেন ?
“ পারি না , কাল পেরেছি !
“ কিভাবে ?
“ ইউটিউব দেখে !
“ খুব সুন্দর হয়েছে !
“ থ্যাঙ্ক ইউ ম্যাডাম !
“ সাড়ে আটটা বেজে গেছে । এখনো ঘুম হয়‌নি আপনার ?
“ আপনাকে দেখে ঘুম ছুটে গেছে ।
মিহি লাজুক হাসে । হাতের তালুতে লেখা নামটা দেখিয়ে নাক ফুলিয়ে বলে….
“ এখানে নিজের নাম লিখে দিয়েছেন কেনো ?
“ আমি তো আপনার , আমার নাম হাতে থাকলে ক্ষতি কিসে ?
“ যদি কেউ দেখে ফেলে ?
“ দেখলে দেখবে !
“ কি ভাববে দেখলে ?

“ ভাববে আপনার আর আমার উঁহুম উঁহুম চলছে ! তাই আপনি আমার নাম নিজের হাতে লিখেছেন ।
“ আমার হাতে দেখলে , আমাকে সন্দেহ করবে সবাই । আপনাকে তো আর করবে না !
“ তাহলে আমার হাতেও লিখে দিন আপনার নাম । হৃদয়ে তো আপনি পুরোটাই খোদাই হয়ে গেঁথে আছেন । হাতে আর কি এসে যায় ? লিখে দিন…
হাত বাড়িয়ে দিলো রাফি । মিহি তড়িতে বললো…
“ ওয়েট । আমি আসছি ।
বলেই দৌড় লাগালো ঘরের দিকে । এক মুহুর্তেই ফিরে আসলো আবার । হাতে একটা মেহেদি । ও খানিক ইয়ার্কি করে ঠোঁট কামড়ে বললো….
“ আপনার কপালে লিখে দেই আমার নাম ? যাতে সবাই বুঝতে পারে আপনি আমার !
“ দিন …
স্পস্ট সায় রাফির । মিহি মুখ বাঁকালো । রাফির বাড়ানো হাতের তালুতে বড় করে লিখে দিলো নিজের নাম । একটা হার্ট সেইপ ইমোজি নামের পাশে ।
লিখেই গদগদ হয়ে হাসলো । বললো…
“ বিয়ে বাড়িতে হোক বা বাইরে , কোনো মেয়ে আশেপাশে আসলে হাত বাড়িয়ে এটা দেখাবেন । বলবেন আপনি অন্য কারোর মালিকানায় বন্দি । মনে থাকবে ?
কন্ঠে শাসন ! রাফি বাধ্যের ন্যায় মাথা ঝাঁকায়…
“ জ্বি ম্যাডাম ! খুব করে মনে থাকবে !!

আজ হলুদের অনুষ্ঠান । ফারহানা চৌধুরী রুহির গায়ে হলুদ আজ । ঘুম থেকে উঠতে উঠতে নয়টা বাজিয়েছে রুহি ।
মিহির মুখ ভার হয়ে আসছে ওকে দেখলেই । কান্না আসছে কোটর ফেটে । রুহির মুখের দিকে তাকাতে পারছে না সে । রুহি টা চলে যাবে কাল ওকে ছেড়ে ? এই বাড়ি ছেড়ে ? একা হয়ে যাবে মিহি !
নিজের একা হয়ে যাওয়ার কথা ভাবতেই পারছে না সে । সন্ধ্যায় হলুদ ছোঁয়া হবে । বাড়িতে বেশি হুটোপাটি পড়েছে আজ । মেহমান বেড়েছে । মেহজাবিনের শশুর বাড়ি থেকে আজ সবাই এসেছেন ।
পুরো বাড়ি ভর্তি লোক । রুহির ঘরে সবসময় এর‌ ওর আনাগোনা লেগেই আছে । ঘুম থেকে উঠেছে থেকে এসবে এখন বিরক্ত প্রায় রুহি । আজব, ওকে সবাই দেখতে আসছে কেনো ? আজ নতুন করে দেখার কি আছে ? ওর তো এখনো বিয়ে হয় নি ।
এসবে মাথা ধরেছে রুহির । দাঁত চেপে সহ্য করছে সবটা । দুপুরের পর একটু ফাঁকা হয়েছে ওর ঘর । খেতে গেছে সবাই । তবুও একা নয় রুহি । জেনি সবসময় সাথে । বিয়ে ঠিক হয়েছে থেকে রুহির সাথে সঙ্গ বেড়েছে জেনির । রুহি যেখানে সেও সেখানে । আপি কে ছাড়া ভালো লাগেনা । জেনি ওকে একা ছাড়ে নি । গোসল সেরে বিছানায় ব্যাক বোর্ডে মাথা এলিয়ে একটু বসেছে রুহি । চোখ বুজেছে মাথা যন্ত্রণায় । মিহি ওয়াশ রুমে ।
জেনি বকর বকর করছে । রুহির হাত নেড়ে নেড়ে দেখছে সে । মেহেদির রঙ, ডিজাইন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে বারবার । ধীরে ধীরে গাঢ় হচ্ছে রঙ । জেনি ওর বাচ্চা সুলভ আচরণে রুহির হাতে থাকা শান্তর নামটা বেশ কবার উচ্চারণ করেছে । রুহি চুপচাপ সহ্য করছে ওকে । জেনি রুহি কে চুপ দেখে ঝাঁকালো রুহি কে…

“ রুহি আপি ! তোমার সাথে শান্ত ভাইয়ার সত্যিই সত্যিই বিয়ে হবে ? তোমার হাতে শান্ত ভাইয়ার নাম লিখেছো তুমি । কাল বিয়ে হবে তোমাদের ? তুমি শান্ত ভাইয়া দের বাড়িতে চলে যাবে এর পর ? আর থাকবে না আমাদের কাছে ? এই বাড়িতে থাকবে না আর ?
রুহি নিশ্চুপ । জেনি কোন উত্তর না পেয়ে রুহির কাছ ঘেঁষে বসলো । আবার ঝাঁকিয়ে নিচু স্বরে ডাকলো ওকে…
“ রুহি আপি ! বলো না ! সত্যি সত্যিই চলে যাবে তুমি ? ও আপি….
চরম বিরক্ত হলো রুহি ‌। মাথা যন্ত্রণা বাড়ছে রি রি করে । চোখ এক ঝটকায় খুলে জেনি কে ঝাড়া মেরে তপ্ত স্বরে খেকিয়ে উঠলো রুহি….
“ দেড় ফুটের বাচ্চা , যাবি আমার চোখের সামনে থেকে ! কি তখন থেকে প্যাক প্যাক করে মাথা খাচ্ছিস আমার ! মাথা যন্ত্রণা করছে আমার ! যা এখান থেকে….
জেনি চমকায় । ঠোঁট উল্টায় । আজ রাগ অভিমান করে না । বরং কন্ঠ আরো খাদে নামিয়ে বলে সে….
“ মাথা যন্ত্রণা করছে আপি ? মাথা টিপে দেবো ?
জেনির কম্পিত স্বর । রুহির শক্ত মুখশ্রী নিমিষেই শিথিল হয়ে আসলো । পূর্ন দৃষ্টিতে জেনির পানে তাকাতেই বাচ্চা মেয়ে টার ছলছলে দৃষ্টি নজরে পড়লো । অমনি ধক্ করে উঠলো রুহি । দৃষ্টি কাতর করে জেনি কে টেনে নিলো নিজের কাছে…বললো শীতল স্বরে….

” সরি বনু ! রাগ দেখিয়েছি ? আই এম সরি ! আসলে মাথা ব্যথা করছে একটু । রাগ উঠেছিল । সরি জেনি । কাঁদছিস তুই ? আর রাগ দেখাবো না প্রমিস ! কাঁদিস না প্লিজ !
জেনি আদুরে হয়ে ঠোঁট উল্টে কেঁদে ফেললো । ফিকড়ে উঠে শক্ত করে ছোট্ট দুহাতে রুহিকে জড়িয়ে ধরলো…
“ তুমি রাগ করো না আপি । আমি আর জ্বালাবো না তোমায় ! তুমি তো চলেই যাবে, আর কাকে জ্বালাবো আমি ? আমাকে আর কেউ বকবে না তোমার মতো । তুমি কাল চলে গেলে , তোমাকে খুব বেশি মিস করবো আমি ।
রুহির ভেতরটা কেমন মুচড়ে উঠলো । পানি জমলো অক্ষিপটে । গড়িয়ে পড়লো তা , সময়‌ লাগলো না । ওয়াশ রুমের দরজার কাছে থম মেরে দাঁড়িয়ে ওদের দুটোকে দেখলো মিহি । জেনির মতো ওরো কান্না পেলো ভীষণ ।
তবে নিজেকে ধাতস্থ করে নিলো মিহি । বেরিয়ে এলো ওয়াশ রুম থেকে ।

সন্ধ্যার পর বাড়ি জমজমাট । পকটা ফুটছে ক্ষণে ক্ষণে । ফেইরি লাইট দূরদূরান্ত পর্যন্ত । সেগুলোর আলোতে ঝলসে যাচ্ছে চোখ । চৌধুরী বাড়ি উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত । অনেক দূর পর্যন্ত আলোর ঝলকানি পৌঁছেছে ।
বোঝাই যাচ্ছে , চৌধুরী বাড়ির মেয়ের বিয়ে । গার্ডেনে ডেকরেশন হয়েছে আজ ।
রুহিকে সাজিয়ে বসানো হয়েছে স্টেজে । বেচারির চোখ টলটল করছে । আব্বু কে দেখলো এই একটু আগে । মুখটা শুকিয়ে গেছে তার । হেনা বেগম ও কেঁদেছেন আড়ালে । রুহি দেখেই বুঝতে পেরেছে । রাফি আশেপাশে নেই । রুহির হন্যে দুচোখ রাফি কে খুঁজছে । মিরা এসেছে বিকেলের পর । মিহির সম্পর্কে এখন জ্ঞাত সে । এক থিমে আজ একই সেজেছে সবাই । রুহি হলুদে হলুদ । আর বাকিরা বেগুনি রঙের শাড়িতে । ছেলেদের পাঞ্জাবি একই রঙের । কোনো কালেই শাড়ি সামলাতে অসুবিধা হয় নি মিহির । আজ ও হচ্ছে না । কাঁচা ফুলে সেজেছে সকলে ।
রুহি একা বসে স্টেজের সোফায় । রুহি কে একা দেখে মিহি ওর পাশে গিয়ে বসলো । রুহির হাত দুখানা আগলে নিয়ে নিজের দিকে ফিরিয়ে বললো….

“ কি হয়েছে পাখি ? মন খারাপ ?
হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়ায় রুহি । কেঁপে কেঁপে বলে…
“ ভাইয়া কোথায় পাখি ?
“ আমি এখানে !
চট করে ডান দিকে ফিরলো রুহি । রাফি কে দেখে তৎক্ষণাৎ ছলছল চোখেই এক গাল হাসলো । রাফি এসে দাঁড়াতেই অভিমানী স্বরে বলল…
“ আমার কাছে আসছোই না তুমি ! এখনি ভুলে যাচ্ছো আমায় ?
রাফি চোখ সরু করে । পাশে বসে বোনের । এখনো ওকে হলুদ লাগায় নি কেউই ।
রাফি রুহির নাক টেনে বললো…
“ তোকে ভুলবো আমি ? তোকে ভুলে যাওয়ার চিন্তাও যাতে মাথায় না আসে , তাইতো শান্তর সাথে বিয়ে দিচ্ছি তোকে ! আমার বোনকে আমি কখনো ভুলতে পারি ?
রুহি মাথা নিচু করে টলটল চোখ আড়াল করে ।
ওকে এখনো কেউ হলুদ লাগায় নি । রাফি দুই আঙ্গুলে হলুদ তুলে একটু গালে ছোঁয়ালো রুহির । আহ্লাদ করে নাকের ডগায় হলুদ ছোঁয়াতেই না চাইতেও নাক টেনে ফিক হেসে উঠলো রুহি । হাসলো রাফি ও । সাথে মিহিও । হেনা বেগম কে টেনে নিয়ে আসা হলো রুহি কে হলুদ লাগানোর জন্য । ভেজা চোখ বারবার শাড়ির আঁচলে মুছে ফেলেছেন তিনি । সাবিনা বেগম রুহির দুই পাশে রাফি আর মিহি কে দেখে বললেন…

এক দেখায় পর্ব ৫৭

“ মিহি , ওঠ । রুহিকে বড়রা হলুদ লাগাবে এখন ।
“ আমি হলুদ লাগাবো না । আমার পাখি , সবার আগে আমি । কিন্তু উনি তো আগেই লাগিয়ে দিয়েছেন । এবার আমি লাগাবো ।
বলতে বলতে হলুদের বাটি থেকে এক চিমটি হলুদ নিয়ে রুহির গালে ছুঁইয়ে দিলো মিহি । মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি চেপে বসতেই , ঠোঁট কামড়ে বাটি থেকে আরো একটু হলুদের মিশ্রণ তুলে হুট করে রাফির গালে মাখিয়ে দিল । আকস্মিক কান্ডে চমকালো রাফি । সবাই সচকিত হয়ে তাকালো ।
শব্দ করে হাসলো মিহি । তড়িতে উঠে দাঁড়িয়ে হাসি চেপে বললো….
“ পাখির ভাইয়া । আপনাকেও একটু হলুদ লাগিয়ে দিলাম , ডোন্ট মাইন্ড প্লিজ ।

এক দেখায় পর্ব ৫৯