এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ২৩
আসিফা খান
রিফাতে এবার সাহেবা কে জোর করে নিজের কাছ থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে দূরে ধাক্কা দিল,,, রাগে কপালের শিরা উপশিরা ফুলে উঠেছে রিফাতের,, চোখ মুখ লাল রং ধারণ করেছে মুহূর্তেই,,, চোয়াল শক্ত তার,, হাত মুঠিবদ্ধ করে সাহেবাকে কিছু বলতে যাবে তার আগেই চোখ পড়ল দরজার দিকে। রিফাতের বুক ধক করে উঠলো ,,মাথা ফাঁকা লাগছে তার,,,দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে ইয়ানা।। মুখ মলিন, চোখের কোনে পানি রিফাতের দৃষ্টি এড়ালো না।। রিফাতের মাথা যেন কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে এই মুহূর্তে নিজেকে অত্যন্ত অসহায় লাগছে।। কিন্তু মুহূর্তে ইয়ানার কিছু বাক্য শুনে রিফাত অবাক,,
“Sorry to disturb you guys,,, আমায় নক করে আসা উচিত ছিল,,,,,আপনার জন্য দাদু নাস্তা পাঠিয়েছে,,,খেয়ে নিয়েন,,আমি আসি।”
মাথা নিচু করে তর্জনী আঙ্গুল দিয়ে নিজের চোখের পানি টুকু মুছে ,,ঠোঁটে মিছে হাসি টেনে ইয়ানা কথাগুলি বলে টিফিন বক্সটা রিফাতের ডেক্সের ওপর রেখে পিছন ঘুরে চলে যেতে নিলে তার হাতে টান পরল।। ইয়ানার বুক ছলাৎ করে উঠলো।। কান্নাগুলো দলা পাকিয়ে কন্ঠনালীতে এসে হাজির হয়েছে।। মনে হচ্ছে বুকের ওপরে কেউ পাথর চাপিয়ে দিয়েছে।। কিছুতেই নিজেকে ঠিক রাখতে পারছে না,, এই মুহূর্তে এখান থেকে তার চলে যাওয়াই উত্তম।। তার হাতের কব্জি ধরা মানুষটি কে সে চিনতে ভুল করল না পিছন ঘুরে তাকালো পর্যন্ত না শুধু ধীর কণ্ঠে বললো,,,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“হাত ছাড়ুন।”
রিফাত যেনো আরও জোরে চেপে ধরলো,,,দাতে দাঁত পিষে সাহেবার উদ্দেশ্যে বললো,,,”get lost from here,, wright now,,, otherwise I will have to call security ,,I can’t see you anymore and you are fired from this job.”
সাহেবা হাত মুঠো বদ্ধ করে ক্রুদ্ধ চোখে ইয়ানার দিকে একবার তাকিয়ে জোর কদম ফেলে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল,,, আর ধরাম করে দরজাটা চাপিয়ে গেল।।
রিফাত এবার চোখ বন্ধ করে রুদ্ধশ্বাস ছাড়লো,,, ইয়ানা কে এবার নিজের দিকে টেনে আনতে নিলে,, মেয়েটা যেন ফ্লোর এর সাথে নিজের পা কে আটকে ধরে রেখেছে,,এক চুলও এদিক ওদিক নড়লো না মেয়েটা। রিফাত বুঝলো ইয়ানা তাকে ভুল ভেবেছে। ইয়ানার দুই বাহু ধরে মেয়েটার সামনে দাঁড়িয়ে বলল,,,
“আসলে ইয়ানা,,,”
ইয়ানা যেন রিফাতের কথা শুনতে অত্যন্ত নারাজ মাথা নিচু করে শক্ত কণ্ঠে বললো,,,”আমি আপনার কোন কথা শুনতে চাই না,, আমার সামনে থেকে সরুন,,, আমায় যেতে দিন।”
“ইয়ানা প্লিজ,,, লেট মি এক্সপ্লেন।”
ইয়ানা চোখ মুখ কুঁচকে নিজেকে ছাড়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল রিফাতের কাছ থেকে,,, সে কোন রকম ভাবেই রিফাতের কথা শুনতে চায়না।। রাগ, কান্না, অভিমান, অভিযোগ সবমিলিয়ে ইয়ানাকে যেন অত্যাধিক বিধ্বস্ত লাগছে। অন্তরের অন্তঃস্থলে সৃষ্টি হয়েছে অসহায়হীন ব্যথা,,, সজোরে নিঃশ্বাস ফেলছে ইয়ান া ।। সে কিছুতেই এই মানুষটার সামনে থাকতে চায় না।। ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে ইয়ানা নিজেকে রিফাতের কাছ থেকে ছাড়িয়ে নিতে সক্ষম হলো ,,,ততপর এক প্রকার ছুটে রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগেই রিফাত ইয়ানার সামনে এসে দাঁড়িয়ে তার কেবিনের দরজা লক করে ইয়ানাকে পাশের দেওয়ালে শক্ত করে আটকিয়ে ধরল,,,
ইয়ানার দুই হাত নিজের এক হাতে মুঠিবদ্ধ করে তার কোমরে পিছনে চেপে ধরে,, আর মেয়েটার পিঠে আরেক হাত জড়িয়ে নিজের সাথে মিশিয়ে ফেলে রিফাত।। এখন তাদের মধ্যে কোনো ফাঁক নেই,,, রিফতের ভারি নিশ্বাস ইয়ানার কপালে এসে পড়ছে।। এদিকে ইয়ানা চোখ বন্ধ করে, দাতের ফাকে ঠোঁট চেপে ধরে আছে,,,কান্না আটকানোর ব্যার্থ চেষ্টা চালাচ্ছে সে। থেকে থেকে গভীর নিশ্বাস টানছে ইয়ানা,,, রিফাত এর এত সান্নিধ্যে থেকেও তার কোনো রকম অনুভুতি কাজ করছে না আজ।।
রিফাত ইয়ানার সমস্ত মুভমেন্ট অত্যন্ত সূক্ষ নজরে পরখ করছে।।রিফাত এবার ইয়ানার কপালে কপাল ঠেকালো,,,,এবং ভরাট কিন্তু নরম কন্ঠে বলল,,,,”ইয়ানা,,,আমায় একটু সময় দাও আমি সবটা এক্সপ্লেই করছি,,,প্লিজ ইয়ানা জাস্ট গিভ মী সাম টাইম।”
রিফাত এর এরকম কথায় ইয়ানা ফুপিয়ে উঠলো,,,মুহূর্তেই আঁখি জোড়া থেকে বেরিয়ে এলো উষ্ণ নোনা জল,,, দীর্ঘ্য প্রশ্বাস টেনে,,, কম্পনরত কণ্ঠে বললো,,,
“আমায় যেতে দিন রিফাত,,,প্লিজ আমায় যেতে দিন।। আমি এখানে আরো কিছুক্ষণ থাকলে, আমি আপনার সাথে আরো বেশি জড়িয়ে পড়বো।। আপনি কেনো এই সম্পর্ক কে এত এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন! আমায় ছেড়ে দিন।।,,,ওই আপি তো ঠিকই বলেছে,কেনো নিজেকে এই নামমাত্র সম্পর্কে জড়িয়ে রেখেছেন!!,,,আমায় ডিভোর্স দিয়ে দিন।”
ইয়ানার বলা শেষের কথা টি যেনো রিফাত কে অশান্ত করে তুললো মুহূর্তেই,,,এতক্ষণ উবে যাওয়া রাগ আবার ও মাথা চাগাঢ় দিয়ে উঠলো,,,শান্ত রিফাত যেনো এবার লৌহমানবের রং ধারণ করলো।। কপালের শিরা দৃশ্যমান,চোয়াল শক্ত। চশমার আড়ালে ডাগর ডাগর আঁখি গুলো লাল রঙের আবরণে ঢাকা পড়েছে।।,,,
ইয়ানা কে ছেড়ে এবার তার হাত দুটো দেওয়ালে ঠেসে ধরলো,,,আর নিজে ইয়ানার মুখের সামনে ঝুঁকে পড়লো।।,,,ইয়ানা চোখ বন্ধ করে আছে,,মাঝে মধ্যেই নাক টানছে মেয়েটা।। আচ্ছা ইয়ানার কথায় তার এত রাগ লাগছে কেনো? সে তো নিজেই এরকম টাই প্ল্যান করে দেশের মাটিতে পা রেখেছিলো,,,তাহলে আজ এই অনুভূতি কেনো? কেনো এই রাগ?,,,,
রিফাত একদম ইয়ানার ঠোঁটের কাছে নেমে এলো। আর দাতে দাঁত পিষে বললো,,,,”সাহস বেড়েছে? কিছু বলছিনা দেখে মাথা কিনে নিয়েছো!,,,আর একটা বার ওই শব্দ মুখে আনলে,,মেরে ফেলবো।”
কথা বলার দরুন রিফাত এর অধর বার বার ইয়ানার ওষ্ঠে আলতো ভাবে স্পর্শ করায় ইয়ানা শরীর শিউরে উঠছিল,,,সহসা ইয়ানা মুখ ঘুরিয়ে কন্ঠে দৃঢ় ভাব আর কাপা স্বরে বলে,,,”মেরে ফেলুন,,,(এই বার রিফাত এর দিকে অনিমেষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে) মেরে ফেলুন,,,আপনিও বাঁচবেন এই নামমাত্র সম্পর্ক থেকে আর আমিও,,,,
আমি আপনাকে মেনে নিলেও আপনি আমাকে কখনোই মানবেন না রিফাত,,,তার থেকে ভালো মুক্তি ।। আমি আপনার জীবনে শুধু মাত্র দায়িত্ব , কর্তব্য হয়ে থাকতে চাইনা রিফাত।। আপনি তো আমায় স্ত্রী হিসেবেই গণ্য করেন না,,,সেখানে আমাকে ভালোবাসা তো বিলাসিতা।।”
হুট করেই রিফাত ইয়ানা কে ছেড়ে দিয়ে সরে আসে।। সত্যি বলতে সে বুঝে উঠতে পারছে যে সে এখন ইয়ানা কে কি বলবে! রিফাত ভাষা হারিয়ে ফেলেছে।। বাক্য পাখি উড়াল দিয়েছে।। বাম হাত কপালে ঘোসে চলেছে।। নিজেকে খাপ ছাড়া লাগছে,,,এক আকাশ পরিমাণ ক্লেশে জর্জরিত রিফাত।। চোখ বন্ধ করে দুই চার বার রুদ্ধ শ্বাস ছাড়লো। নিজেকে সংযত রেখে আবারও ও দুই পা এগিয়ে গেলো ইয়ানার দিকে। মেয়েটি তখনও দেওয়ালের সাথে পিঠ লাগিয়ে গুটি শুটি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে,,, নতজান ু,,, চোখ দিয়ে তখনো সেই সূক্ষ্ম বাড়িকনা ঝরে পড়ছে।। রিফাত জিব দিয়ে ঠোঁট ভেজালো,,,আলগোছে ধরলো ইয়ানার দুই গাল,,,শান্ত স্বরে বলল,,,
“যা আমরা চোখে দেখি তাহ কি সব সময় ঠিক হয়!”
“আর কানে শোনা?,,,”
“শুধুই একপাক্ষিক শুনেছো!”
“একপাক্ষিক শুনলেও আরেক পেক্ষিকের উত্তর তো আমি জানি!,,,”
“কি জানো!”
“এটাই যে,,,রিফাত হোসেন এর গলার কাটা ইয়ানা,,যাকে সে উগড়ে ফেলতেও পারছে না আর না পারছে গিলে ফেলতে।।,,,আমার জন্য আপনার জীবন কেনো অগোছালো হয়ে থাকবে,,,আপি টা আপনাকে ভালোবাসে তাকে একসেপ্ট করুন।”
ইয়ানার চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া এক ফোঁটা পানি রিফাতের বৃদ্ধা আঙুল স্পর্শ করল,,,মেয়েটা কথাগুলো অত্যাধিক স্বাভাবিকভাবে বললেও তার মনের ভেতরের চলছে প্রলয়।। কিছু দিনের মধ্যেই রিফাত কে সে আপন করে ফেলেছিল। যখন থেকেই সে বুঝতে পেরেছিল বিয়ে নামক বন্ধনের অর্থ,, তবে থেকেই সে রিফাতকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করেছিল।। কিন্তু রিফাত হয়তো কখনোই এই সম্পর্কের কথা ভাবিনি,,, ভাবিনি বললে ভুল হবে! ভেবেছিল কিন্তু সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার কথা না, বিচ্ছেদের কথা।। ইয়ানা কাপা কাপা হাতে নিজের গাল থেকে রিফাত এর হাত সরিয়ে ফেললো।। তত্পর দ্রুত গতিতে বেরিয়ে গেলো কেবিন থেকে।।
এদিকে রিফাত রীতিমতো হতভম্ভ,,, ইয়ানার কথা বিষফোঁড়ার ন্যায় তার শরীর স্পর্শ করেছে। রাগে ফেটে যাচ্ছে সে,,,শরীর কাপছে তার। উত্তেজনার প্রকাশ ঘটাতে পাশের টেবিলে সজোরে লাথি দেয়া মাত্রই কাচ চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে ফ্লোরে আঁচড়ে পড়লো।। তখনই কেবিনে প্রবেশ করলো আহিল।,,,ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল রিফাত এর পানে,,, কিছু মুহূর্ত আগে এসে ইয়ানাকে চোখের জল মুছতে মুছতে বেরিয়ে যেতে দেখেছ আর এখন রিফাত কে দেখছে এই অবস্থায়,, তাহলে কি তাদের মাঝে কিছু হয়েছে? আহিল প্রশ্ন করতে গিয়েও চুপ থাকলো। এখন রিফাতের মতিগতির ঠিক নেই তাই কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে নরম কন্ঠে বলল,,,
“রিফাত,,, এমার্জেন্সি?”
রিফাত ঘুরে তাকালো আহিলের দিকে রুদ্ধশ্বাস ছেড়ে ছোট্ট করে বলল,,”হুম”
গোধূলি বেলার আগমন প্রায় শেষের দিকে। সূর্যমামা ঢলে পড়েছে,,, পাখিরাও ক্লান্ত হওয়ার ফরমান জারি করে ফিরে যাচ্ছে নিজ নীড়ে।। রিফাত নিজের কেবিন এ,,,বেসিন থেকে হাত মুখ ধুয়ে নিজেকে কিছুটা ফ্রেশ লাগছে।। আজ সারাদিন ভীষণ রকম ব্যাস্ত ছিল সে,,, ইয়ানার অশ্রুসক্ত নয়ন তাকে ঝালাপালা করে রেখেছিল। নিজেকে সংযত রেখেছে পুরোটা সময়। ইচ্ছে করছিল সাহেবা কে নিজের হাতে খুন করতে। যদি রিফাতের জন্য এক খুব মাফ হত ,,,তাহলে সেই খুন রিফাত সাহেবা করতো!
জানালার পাশে দাড়িয়ে একটা সিগারেট ঠোঁটের মাঝে নিয়ে লাইটারের দ্বারা সেটা জ্বালাতে যাবেই তার আগে কেউ একজন তার সিগারেট নিয়ে জানালার বাইরে ফেলে দিল,, রিফাত ফট করে পাশে তাকাতে দেখলো আহিল,,,ছেলেটা দাঁত দেখিয়ে হেসে বলল,,,
“এই সব খেয়ে ইয়ানার চুমু থেকে বহিষ্কৃত হতে চাস?,,,মেয়েরা কিন্তু কালো ঠোটে চুমু খেতে চায় না।”
ইয়ানার কথা উঠতে রিফাত কিছুটা থমথমে খেয়ে গেল।। ততপর বুঝল আহিল তার সাথে মশকরা করছে,,, রিফাত ও বাঁকা হেসে বলল,,,”কেনো আতিকা বুঝি তোর ঠোঁট কে নির্বাসনে পাঠিয়েছে? নাকি শর্ত জারি করেছে?”
রিফাত এর কথায় মাথা চুলকে হাসলো আহিল,,,”ইয়ার,,,মেয়েটা একদম জেকে বসেছিল মাথায়,,,সে সিগারেট পছন্দ করে না জানতে পেরেই চেইন স্মোকার হয়েও সিগারেট খাওয়া বন্ধ করেছি।।”
আহিল এর কথায় হাসলো রিফাত।। তখনই টোকা পড়লো কেবিন এর দরজায়।।,,রিফাত রাশ ভারী কন্ঠে বলল,,,”come in…”
গরম ধোয়া ওঠানো কফি নিয়ে একজন ছেলে কর্মচারী কেবিনের ভেতরে ঢুকে,, ডেক্স এর উপরে সেটিকে রেখে চলে গেল।। আহিল এক মগ কফি নিজে নিয়ে অন্যটা রিফাতের দিকে বাড়িয়ে দিল।। সত্যি রিফাত এর এই মুহূর্তে কফির প্রয়োজন ছিল।। রিফাতের কেবিনে আসার আগে সে স্টাফকে বলে এসেছিল দুই মগ কফি রিফাতের কেবিনে পাঠাতে এতদিনের বন্ধুত্বের আহিল জানে রিফাতের এখন কি প্রয়োজন।।
কফিতে চুমুক দিয়ে অহিল এর দিকে তাকিয়ে বললো,,,”আমি জানতাম না যে তুই এতটা অধৈর্যশীল !”
আহিল বুঝলো রিফাত কিসের কথা বলছে,,,আহিল বিস্তার হাসলো,,,মুখ হা করে গভীর নিশ্বাস ফেলে বললো,,,,”হারানোর ভয় রিফাত।। প্রতিটা মুহূর্তে একটা আতঙ্কের মধ্যে থাকতাম,,, মনে হতো যদি আমি তাকে হারিয়ে ফেলি।। আসলে আমি তোদেরকে বলতে চেয়েছিলাম ,,ভেবেছিলাম পারিবারিকভাবে সমস্ত কিছু সেটেল করে তারপর তোদেরকে বলবো।। কিন্তু বিশ্বাস কর ওকে যখন দেখতে যাই তখনই মনটা কেমন আনচান করে উঠেছিল,,, তাই তো সেই দিনই বাবা মা কে রাজি করিয়ে কাজী ডেকে বিয়ে করেনি।। আসলে বিরহ কিংবা বিচ্ছেদ নিয়ে জীবন কাটাতে চাইছিলাম না।। তারপর বিয়ের বয়সও তো হয়েছে,,,কত দিন আর কোলবালিশ নিয়ে ঘুমাবো,,,”
বলেই আহিল হেসে উঠলো,,,সাথে রিফাত ও।। তত্পর আহিল পুনরায় রিফাত এর পানে তাকিয়ে কফিতে চুমুক দিয়ে বললো,,,”এবার তোর টা শুনি,,,”
“হোয়াট?”
“দেখছি আমি,,,, ইয়ানা তোর কেবিন থেকে অশ্রুসিক্ত চোখে কি ভাবে বেরিয়ে ছিল,,, আর আমি ঠিক সময় কেবিনে না আসলে,, আজ এই কেবিনের কোনো জিনিস আর আস্থো থাকতো না,,,ব্যাপার কি?,,,খুলে বল।”
আহিল এর কথায় রিফাত এক পকেটে হাত গুজে,,রুদ্ধ শ্বাস ছাড়লো,,,আকাশ পানে তাকিয়ে বলতে আরম্ভ করলো আজকের সমস্ত ঘটনা।। আহিল খুব গভীর ভাবে রিফাত এর সমস্ত কথা শোনে।।,,,
“মেয়েটা আমার কোনো কথাই শুনতে চায়না আহিল,,,”
এই কথাটি বলেই থামলো রিফাত,,, আহিল রিফাত এর সব কিছু শুনে মুচকি হাসে,,,রিফাত এর কাধ চাপড়িয়ে বলে,,,”Boss,,,she is in love with you.”
রিফাত চমকিয়ে তাকায় আহিল এর দিকে,,,তার চোখ সাভাবিক এর তুলনায় বড়ো আকার ধারণ করলো,,,ভ্রু কুঁচকে বললো,,,”are you kidding me!”
“হুম হু,,,একদমই না।। জানিস মেয়েরা হয় একটু চাপা সভাবের,,,বরং একটু না অনেক টাই।। অনেক মেয়েরা নিজের ফিলিংস বুঝে গেলেও তাহ প্রকাশ করতে পারেনা,,,আর অনেক মেয়ে বুঝেই উঠতে পারে না যে তাদের অনুভূতি সামনের মানুষটার জন্য আসলে কী!,,,ইয়ানা এই সব মেয়েদের মাঝেই পরে।। তোকে অন্য মেয়ের সাথে আলিঙ্গনে আবদ্ধ দেখে তোর জন্য এক প্রকার এর রাগের সৃষ্টি হয়েছে,,,অত্যাধিক জেলাস ফিল করে তোকে ওই ধরনের কথা বলেছে।।”
“এমন ভাবে বলছিস যেনো তুই মেয়েদের ওপর পি.এইচ.ডি করেছিস।”
আহিল একটু হাসলো থেমে বললো,,,”মা বলে,,,পুরুষ মানুষ দের যেরোকম ভালোবাসা ভয়ংকর তেমনি নারীদের ভয়ংকর ঘৃনা।। পুরুষ মানুষেরা যেরকম সহজে কাউকে ভালবাসতে পারে না তেমনি নারীরা কাওকে সহজে ঘৃনা করতে পারেনা,,,আর তারা যখন কাওকে ঘৃনা করতে শুরু করে তখন পুরো কায়েনাত লন্ডভন্ড করে দেয়।।,,,
রিফাত,,, ইয়ানার ঘৃণার পাত্র হওয়ার আগে,তাকে হারিয়ে ফেলার আগে,,মেয়েটাকে আকড়ে ধর।। ভুলে যাবি না আল্লাহ সবাইকে সেকেন্ড চান্স দেয়,,আর সেই সুযোগ পেয়েও যদি কেও কাজে লাগাতে না পারে তাহলে তার থেকে বড়ো অভাগা দ্বিতীয় কেও নেই।।”
“আহিল,,,তুই ভালো করেই জানিস,,,ভালোবাসা আমার দ্বারা আর সম্ভব নয়।”
“আমিতো তোকে ভালোবাসতে বলিনি,,,বলেছি মেয়েটার অপ্রকাশ্য ভালোবাসা কে স্বীকার কর।।,,, যাহ,,,বাড়ি গিয়ে মেয়েটার রাগ ভাঙ্গা,,,অত্যাধিক দেরি হওয়ার আগে সব ঠিক কর,,,আফসোস করার আগেই কাছে টেনেনে।। পরে কিন্তু পচতানো ছাড়া উপায় পাবি না।”
এতক্ষণে রিফাতের কফিটা ও শেষ,, বাহিরের অর্ধ চাঁদের দিকে তাকিয়ে রিফাত এক গভীর নিঃশ্বাস ছাড়লো,, সে যে কোন একটা গোলকধাঁধায় ফেসেছে সেটা সে খুব ভালো করে উপলব্ধি করতে পেরেছে। মেয়েটা তার জীবনযাত্রায় এক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে,,, হ্যাঁ অভ্যাস! কারণ তার দ্বারা যে দ্বিতীয়বার ভালোবাসা হবে না!,,, আহিল এর সমস্ত কথা ফেলার মত নয়।।,,, ইয়ানার জন্য মন টা কেমন অশান্ত হয়ে আছে তার,,,একটা পলক মেয়েটা দেখার জন্য আঁখি বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে।।,,, কারা বলে বন্ধুই নাকি চরম শত্রু,,,তারা হয়তো আহিল কে দেখিনি! আজ রিফাত সন্তুষ্ট আহিল এর মত একটা বন্ধু পেয়ে।।
আহিল রিফাত এর হাতে গাড়ির চাবি ধরিয়ে দিয়ে বললো,,,”শুনেছি আতিকা আর ইয়ানা একে অপরের জান,,, আতিকা সুখে থাকলে ইয়ানা সুখে থাকবে আর ইয়ানা সুখে থাকলে আতিকাও সুখে থাকবে।। আর তাদের সুখে রাখার দায়িত্ব আমাদের।”
“তার মানে এত গুলো কথা বললি আতিকার সুখের জন্য?”
“উম হুঁ,,,বন্ধুর ক্লেশ কমানোর জন্য।”
রিফাত আহিলের কথায় মুচকি হাসি দেয়।। ছেলেটা যে আতিকার মায়ায় গভীরভাবে লিপ্ত হয়েছে তাহ রিফাত খুব ভালোভাবে বুঝতে পারল।।
রিফাত আর দাড়ালো না,,, আহিল কে বাই বলে বেরিয়ে গেলো নার্সিংহোম থেকে।। এদিকে আসিল সামান্য হেসে রিফাত এর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বললো,,,
“চান্দু তুমিও যে ইয়ানার ভালোবাসায় ডুব দিয়েছো,,, শুধু উপলব্ধি করতে বাকি।। ব্যাপার না সেটাও হয়ে যাবে।।”
“বউ একটু নিচে আসবে,,তোমার স্বামী অধীর আগ্রহে তোমার অপেক্ষায় আছে।”
মুঠো ফোনের ওপাশ থেকে আহিল্ এর এই রকম কথা শুনে আতিকা চমকে উঠলো,,, গাল লাল হয়ে গেলো মুহূর্তেই। ছুটে গিয়ে ব্যালকনি থেকে দেখলো আহিল গাড়ির ভেতরে বসে তার দিকেই তাকিয়ে আছে,,,কানে ফোন উস্ক খুস্কো চুল,,,চোখে মুখে পরিশ্রান্ত এর ভাব।।,,, আতিকা নিজেকে সামলে বললো,,
“ভিতরে আসুন,,,মা আব্বু খুশি হবে।”
“নাহ,,,আজ না পরে।। তুমি আসো,,, আম ওয়েটিং।”
আহিল ফোন কেটে দিলো।। আতিকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আয়নায় নিজেকে একবার দেখে,,দৌড়ে নীচে চলে গেল।। মেন দরজা খোলার আগেই পিছন থেকে আতিকার মা বলে উঠলো,,,
“কথায় যাচ্ছিস এখন,,,”
আতিকা ভরকে গেল,,,আমতা আমতা করে বলল,,,”আসলে উনি,, মানে আহিল এসেছে,,,বাহিরে।।,,,”
“আল্লাহ,,,তাহ ভিতরে ডাকবি না!,,,জামাই মানুষ এই ভাবে বাহিরে থেকেই চলে যাবে,,,ব্যাপার টা কেমন নয়।”
“আমি বলেছি,,,বলেছে পরে আসবে।”
আতিকার মা কিছু বুঝে বললো,,”আচ্ছা,,,তুই যা তাহলে।”
এতক্ষণ লজ্জায় মরে যাচ্ছিলো আতিকা,,,মায়ের সামনে কি ভাবে বললো সে এই ধরনের কথা।। ছুটে বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে।। গুটি গুটি পায়ে গাড়ির কাছে আসতেই আহীল দরজা খুলে আতিকা কে টেনে নিজের কোলে বসিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলো।। আতিকা চমকে উঠে আহিল এর গলা জড়িয়ে ধরলো,,, আহীল ঠোঁট কামড়িয়ে হেসে আতিকার কোমর জড়িয়ে টেনে ধরলো নিজের সাথে।।,,
“এরকম কে করে,,,ভয় পাইয়ে দিয়েছিলেন।”
“দেখছিলাম ভয় পেলে তোমায় কেমন লাগে।”
আতিকা নতজানু হয়ে থাকলো কিছুক্ষন,,,তত্পর আহিল এর দিকে আবেগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,,
এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ২২
“বেশি ক্লান্ত?”
“ক্লান্তি দুর করতেই তো এখানে আসা।”
“আপনি ডক্টর,,,আর ক্লান্তি দুর করতে এসেছেন আমার কাছে?”
আহিল উত্তর দিলো না। চোখে মুখে এক আলাদা একটা ভাব তার। প্রিয়তমা কে কাছে পেয়ে কোন পুরুষ নিজেকে সামলে রাখতে পারে?,,, আহিল এক হাত দিয়ে আতিকার ঘাড় সমেদ গাল স্পর্শ করতেই আতিকা চোখ নামিয়ে আহিল এর কলার খামচিয়ে ধরে।। মুহূর্তেই অনুভব করতে পারে তার অধর জোড়ায় স্নিগ্ধ ছোঁয়া।। সেই ছোঁয়া পর মুহূর্তেই আতিকার গলায় নেমে আসে,,,আতিকা নেতিয়ে যাচ্ছে,, অবস হয়ে আসছে তার শরীর।। ছোটো ছোটো ব্যাথায় আতিকা কেপে উঠছে বার বার।।
রিফাত ড্রইং রুমে প্রবেশ করতেই দেখলো,,,তার বউ এর জন্য বিয়ের সমন্ধ এসেছে
