এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ৩০
আসিফা খান
স্নিগ্ধ শোভন পরিবেশের বুক চিরে এগিয়ে যাওয়া দ্রুতগামী গাড়ি হুট করেই থেমে যাওয়ায় কিছুটা অবাক হল ইয়ানা। পাশে তাকাতে দেখলো রিফাত এতক্ষণ গাড়ির দরজা খুলে নেমে পড়েছে।।ইয়ানা কিছু বলতে নিলেও পাড়লো না,,,নজর ঘুরিয়ে দেখলো রিফাত পাশের একটা গ্রসারি দোকানে ঢুকেছে।। ইয়ানার ভাবনার পর্ব বিশাল রূপ নেওয়ার আগেই রিফাত ফিরে এলো। গাড়ি চালকের সিটে বসে হাতে থাকা আইস ক্রিম এর মাঝারি আকৃতির বক্স ইয়ানার কোলের ওপরে রাখল।। মুহূর্তেই ঠোঁট দখল করলো বিস্তার হাসির রেখা। চোখ মেলে একবার রিফাত এর দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলো,রিফাত কি যাদু জানে! সত্যি তার আইস ক্রিম খাওয়ার ইচ্ছে হচ্ছিল কিন্তু তাহ মুখে প্রকাশ করতে পারছিল না।। ইয়ানা মিষ্টি করে বললো,,,”থ্যাঙ্ক ইউ।”
রিফাত উত্তর দিল না বরং টিস্যু পেপার এর বক্স এগিয়ে দিয়ে কড়া কণ্ঠে বলল,,,,”লিপস্টিক মুছো।”
আচানক রিফাত এর এমন গুরুগম্ভীর কন্ঠে ইয়ানা ঘাবড়িয়ে গেল। ভ্রু কুঞ্চিত করে,,অস্ফুষ্ট শব্দে উচ্চারিত করলো,,”হাআআ”
রিফাত রুদ্ধশ্বাস ছেড়ে নিজেই এগিয়ে গেলো মেয়েটির দিকে।। হাত বাড়িয়ে ইয়ান ার নরম গাল সহ ঘাড় নিজের থাবার মাঝে আবদ্ধ করে বৃদ্ধা আঙুল স্পর্শ করল ইয়ানার গোলাপী রাঙা ঠোঁটে।। আজ পুরো সময়টা রিফাত এর অশান্তিতে কেটেছে,,,মোহনীয় ইয়ানার অধর যুগল তাকে শান্তিতে থাকতে দেয়নি।। আস্তে ধীরে আঙ্গুল ঘোষে মুছে দিল অবশিষ্ঠ রং টুকু।। এদিকে কাহিল ইয়ানা,,,এইটুকু স্পর্শ ে শরীর ঝাকুনি দিয়ে ফরফর করে উঠলো। নাকের ডগা ঘেমে গেলো মুহূর্তেই।। রিফাত আলগোছে খুলে দিল ইয়ানার হিজাব,,,পিন গুলি সযত্নে রাখলো গাড়ির ফ্রন্ট ড্রয়ার এ।। চুলের খোঁপা খুলে ফেলতেই ঝরঝর করে ঝরে পড়লো অবাধ্য কেশ।। ইয়ানা সবটা সময় পুতুল হয়ে বসে ছিলো,,,রিফাত এর প্রতিটা কর্ম তাকে সুখের দেশে নিয়ে যাচ্ছিল,,,এমন দেশ যেখান থেকে ইয়ানা কখনোই বেরিয়ে আসতে চাইবে না।। এতক্ষণে শোনা গেলো রিফাত এর শান্ত নির্মল স্বর,,,,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“আজকেই লাস্ট,,,আর কখনোই তুমি সাজবে না ইয়ানা,,,এটা তোমার স্বামীর প্রথম চাওয়া কিংবা আদেশ।। তখনই সাজবে যখন সাজটা একান্ত রিফাত হোসেন এর জন্য হবে।।”
প্রথম কথা গুলি নতজানু হয়ে শুনলেও শেষের বুলিতে দৃষ্টি ওঠালো। লাজুক হলো সর্বাঙ্গ। ভালোলাগার জোশ খেলে গেলো।। রিফাত আইস ক্রিম বক্স এর ঢাকনা খুলে তাহ এগিয়ে দিল ইয়ানার দিকে।। সব ভুলে চামুচ কাটিয়ে মুখে দেওয়ার পূর্ব মুহূর্তেই মনে হলো রিফাতকে আগে দেওয়া উচিত,,,তাই ধিমে স্বরে জিজ্ঞাসা করল,,,
“আপনি খাবেন না!?”
রিফাত সামনের দিকে তাকিয়ে গাড়ির স্টেয়ারিং ঘোরাতে ঘোরাতে বললো,,,”নাহ আমি বাচ্চাদের জিনিস খাইনা।”
রিফাত এর এহেন কথায় ইয়ানা কিছুটা গাল ফুলিয়ে বললো,,,”আমি মোটেও বাচ্চা না,,,!”
“হ্যাঁ কিন্তু তাহ শারিরক দিক থেকে,মানসিক দিক থেকে নয়।”
রিফাত ক্ষীণ হাসলো। তার কথার সারমর্ম বুঝতে পেরে মেয়েটা নিশ্চই শরমে শেষ হবে।। হলোও তাই,ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে তাকাতেই দেখলো ইয়ানা গুটি মেরে বসে নিচের দিকে দৃষ্টি রেখে একের পর এক আইস ক্রিম ভর্তি চামুচ মুখে পুড়ছে।। রিফাত বেশ ইনজয় করলো ব্যাপার টা,,,এবার সারা রাস্তা সে মেয়েটার এই রূপ দেখবে,,,মন শিথিল করবে লজ্জায় টইটুম্বুর হওয়া তার বউ কে দেখে।।
গাড়ি যথা স্থানে পার্ক করে ঘাড় বাঁকায়।। ইয়ানার ঘুমে জর্জরিত,,,কোনরকম নিজেকে জাগিয়ে রেখেছে যেনো।। রিফাত মেয়েটার গালে আলতো হাত বুলিয়ে বলে,,,
“চলে এসেছি,,,ওঠো।”
ইয়ানা হাই তুলে মাথা ঝাঁকালো। গাড়ি থেকে নেমে দুজনে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করলো।। ড্রইং রুমে উপস্থিত ছিলেন ইয়াসমিন বেগম। ইয়ানা আর রিফাত কে প্রবেশ করতে দেখে আলতো হেসে বললেন,,,”তোমাদের অপেক্ষায় ছিলাম,,,”
রিফাত হাত উচিয় হ্যান্ড ওয়াচ এর পানে চেয়ে থেকে গম্ভীর স্বরে বলল,,,”ঘুমামনি কেনো খালামা,,,রাত হয়েছে।”
“ঘুম আসছিল না বাবা,,,আচ্ছা তোমরা যাও দেখি,,,হাত মুখ ধুয়ে ঘুমিয়ে পড়ো। আমি বাহিরের গেটে তালা দিয়ে দিচ্ছি,,,”
ইয়ানা বলে,,,,
“খেয়েছো মাম্মা?”
“হ্যাঁ,,, শাড়ী পড়েছিস অনেকক্ষণ,,,অসস্তি হচ্ছে নিশ্চয়ই!”
“কিছুটা,,,”
“জানি তো,,,রুমে যা।”
ইয়ানা মায়ের গালে চুমু দিয়ে হেলতে দুলতে উপরে চলে গেলো।। কিন্তু রুমে ঢুকেই ইয়ানার সমস্ত ঘুম যেনো নিমিষেই উদ্বাও হয়,,,চোখ বড় বড় করে তাকালো রুমের দিকে,প্রতিটা কোনায়।।
ফোনে কটু শব্দে চমকে উঠলো ইয়াসমিন বেগম। দ্রুত পায়ে রুমে প্রবেশ করে মুঠোফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই ভুরু কুঁচকে এলো আনমনে।।অচেনা নাম্বার দেখে কিছুটা বিব্রত বোধ করল ।। ফোন তার বিশেষ প্রয়োজনে লাগেনা তাই ঘরের এক কোণে পড়ে থাকে।। সারাদিন মিসেস আসফিয়ার সাথেই রান্না বান্না,নামাজ তেলাওয়াত আরো নানান কাজেই কেটে যায়,,,এইগুলো নিয়েই তার জীবন বেশ ভালই কাটছে।। দ্বিতীয়বারের মতো ফোনের শব্দে মুখরিত হলো পরিবেশ,,, চটজলদি ফোন রিসিভ করে কানে ধরতেই ওই পাশ থেকে ভেসে এলো এক মাঝ বয়সি পুরুষকণ্ঠ,,,
“ভাবি।”
ইয়াসমিন বেগমের বুক ছলাত করে উঠলো,, এই শব্দ সে কত বছর পরে শুনছে তাহ হাতে গুনে শেষ করা যাবে না।। আজ আবারও হৃদয় ব্যাকুল হল, মনে পরল তার গত হওয়া স্বামীর কথা।। মুচরে উঠল অন্ত র।। ওপাশ থেকে আবারও শোনা গেল,,,,
“ফোন কাটবেন না ভাবি অনেক কষ্টে তোমার নাম্বার জোগাড় করেছি।। মায়ের শরীর ভালো নয় ভাবি, অবস্থা বেগতির দিকে যাচ্ছে, প্রতিদিন আব্বাকে স্বপ্নে দেখে।। বারবার তোমাদের কথা জিজ্ঞাসা করে, ইয়ানাকে দেখতে চায়।”
ইয়াসমিন বেগম স্তব্ধ হয়ে বসে রইল।। শাশুড়ির শারীরিক শচনিতার কথা শুনে খারাপ লাগলো বিশাল।। একটা সময় যাকে মা বলে ডেকেছে, যাকে মন থেকে মা বলে স্বীকার করেছিল তার স্বাস্থের বিপর্যয় শুনে আতকে উঠে চিত্ত।। কিন্তু পরক্ষণে ভারী হয়ে ওঠে দেহখানি, তীব্র অভিমানে ভরে উঠলো আঁখিকুল। এই যে ফোনের ওইপাশ থেকে ভেসে আসা পুরুষকণ্ঠ যে সম্পর্কে তার দেবর লাগে আর যেই শাশুড়ি মায়ের কথা শুনে অন্তর কুঁকড়ে উঠছে তারাই একটা সময় নয় মাসের অন্তঃসত্তা ইয়াসমিনকে ঘর থেকে বের করে দিয়েছিল।। বলে ছিল ” ছেলে নেই তো বউ রেখে কি লাভ।”
” ভাবি বিশ্বাস করুন অপরাধবোধে ভুগছি আমরা।। দিন বিষাদে কাটছে।। তোমার সাথে করা অন্যায়ের বিচার আল্লাহ নিজেই করছেন,,, সম্পত্তি চেয়েছিলাম আমি তাই হয়তো মাথার উপর থাকা শেষ সম্বলটাও ছাড়তে হবে এখন।। শারমিন এর সাথে ডিভোর্স হয়েছে আজ পাঁচ বছর,,,আফরিন কে সঙ্গে নিয়েই চলে গেছে সে।।”
ইয়াসমিন বেগম অবাক হলো।। নিজের অজান্তেই ভারাক্রান্ত হলো মন,,, জায়ের সাথে তার সম্পর্ক কখনোই খারাপ ছিল না,,,তাকে বের করে দেওয়ার পরেও যোগাযোগ করার চেষ্টা চালাতো শামরিন।।
এতক্ষণে ঠোঁট নাড়িয়ে উচ্চারণ করলো ইয়াসমিন বেগম,,,,,”এখন কি চাই আপনাদের! কি ভাবে সাহায্য করতে পারি?”
আকুল হয়ে বললো ফোনের ওই পাশের ব্যাক্তি,,,”কিচ্ছু চাইনা ভাবি,,,মাফ চাই শুধু।। মায়ের শেষ ইচ্ছে আপনাদের দেখার,,,প্রতিনিয়ত ইয়ানার কথা বলে।। আপনারা একবার আসবেন ভাবি,,,একবার!”
“আপনার বড় ভাই গত হয়েছে উনিশ বছর। ভাবি,ভাইজির কথা এত তাড়াতাড়ি মনে পেরেছে আপনাদের! লজ্জা করা উচিত,,,আমায় ফোন করার আগে বুক কাপলনা! মনে হয়নি আমায় ভাবি বলার অধিকার হারিয়েছেন উনিশ বছর আগেই।। কোন মুখ নিয়ে ফোন করেছেন আপনি! দ্বিতীয় বার আমার ফোনে যেন আপনার কল না পাই,, নাহলে আমায় অন্যরকম ব্যবস্থা নিতে হবে।”
কত রকম কোন রকম বলেই ফোনটা কট করে কেটে দিল ইয়াসমিন বেগম ।তীব্র যন্ত্রণা, অভিমান আত্ম সম্মানবোধে খলবলিয়ে উঠল হৃৎযন্ত্র।। ডুকরে কেঁদে উঠলো। আজ তার স্বামীর কথা ভীষণভাবে মনে পড়ছে,, যদি সে সামনে থাকতো হয়তো ইয়াসমিন বেগম তার বুকের মাথা রেখে লুটোপুটি খেত,, জাহির করতো অভিযোগ।। ক্রন্দনরত কন্ঠে বিড়বিড় করে আড়ালো কিছু কথা,,,
“কেন চলে গেলে আমায় এত তাড়াতাড়ি ছেড়ে! দেখো না তোমায় ছাড়া আমরা কত অসহায়।। তুমি চলে যাওয়ার পর বুঝেছি এই দুনিয়া একটা যুদ্ধক্ষেত্র,,, যে যুদ্ধক্ষেত্রে আমি বিনা অস্ত্রে লড়েছি।”
প্রখর লাজুকতার তেজে মীহিয়ে পড়েছে ইয়ানার চিকন দেহাবশেষ।। তরতর করে উঠছে বদন। কাঁচা ফুলের মনমাতানো সুঘ্রান নাসা গ্রন্থিতে এসে বাড়ি খাচ্ছে,,, চেনা অচেনা ফুলের মাঝে স্থির হয়ে পড়েছে ইয়ান া । অস্বস্তি ,দ্বিধা সব যেন তাকে জেগে ধরেছে। কক্ষে প্রবেশ করে এমন এক অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিতে পড়তে হবে আগে জানা থাকলে গাড়িতেই এই রাতটা কাটিয়ে ফেলত সে।। বিস্ময়ে ভাবলেশহীন মনোভাব দুই নরনারীর।। শারীরিক শোচনীয় ইয়ানার,,, লজ্জায় একাকার হয়েগেছে মেয়েটা।। আরো বেশি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হলো যখন সাদা বিছানার চাদরের উপর লাল গোলাপের পাপড়ি দিয়ে ইংরেজি অক্ষরের লেখা দেখতে পেল আই+ আর (I + R)।। ভেবাচেকা খেলো রিফাত নিজেও,,কিন্তু তাহ একদম অগোচরে। ইয়ানার সামনে কোনো রুম প্রতিক্রিয়া দেখলো না সে।। মেয়েটার অবয়বে স্পষ্ট যে, মেয়েটা ভীষণ নাজুক হয়ে পড়েছে।। হয়তো রিফাত ের ছোট্ট কোন শব্দ ইয়ানা কে কোমার পেসেন্ট বানিয়ে দেবে,,,তাই চুপ থাকাই শ্রেও ভেবেই নিবর থাকলো।।
রুমের প্রতিটি কোনায় ছোট্ট ছোট্ট মোমবাতি সাজানো,, ফ্লোর জুড়ে বিছিয়ে আছে বিভিন্ন ফুলের পাপড়ির পরদ।। এক কথায় যাকে বলে ‘ বাসর ঘর ‘ ।। রিফাত আর শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। তাই রুমের দরজা বন্ধ করলো, ছিটকিনি তুলল আওয়াজ হলো খট করে,,কেঁপে উঠল ইয়ানা,, শরীর দুলে উঠল প্রবল। বাঁকা চোখে তাকাতেই দেখল রিফাত খুবই স্বাভাবিক ভঙ্গিতে নিজের হাতের ওয়াচ, চোখের চশমা,ফোন , ওয়ালেট সব বেড সাইট টেবিলের উপরে রাখছে।। ইয়ানা ফস করে নিশ্বাস ছাড়লো। নিজেকে সাভাবিক রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালালো।। ইয়ানা কে জোড় বস্তুর ন্যায় দাড়িয়ে থাকতে দেখে রিফাত গলা ঝেড়ে বললো,,,
“ইয়ানা,,,,”
ঘুরে তাকালো মেয়েটা। দেখতে পেল রিফাত নিজের শরীর থেকে ব্লেজার ছড়াচ্ছে,,এবার যেনো ইয়ানার অন্তর কেঁপে উঠল গলা কাঁপিয়ে বলল,,,”বে…ব্লেজার খুলছেন কেন আপনি!”
“বি ইজি ইয়ান া,,, ফ্রেশ হব আমি আর তুমিও এভাবে দাঁড়িয়ে আছো কেন! যাও ফ্রেশ হও।”
সস্থির নিঃশ্বাস ছাড়লো ইয়ানা।। দ্রুত পায়ে হেঁটে আলমারির সামনে গেল,,, মৃদু কম্পনরত হাতে পাল্লা খুলে বের করল নিজের প্রয়োজনীয় কাপড়। প্লাজো এবং হালকা ঘিয়া রঙের ঢিলা ঢালা কুর্তি নিয়ে একপ্রকার ছুটে যায় ওয়াশরুমে,,,ধরাম করে দরজা আটকায়।। ইয়ানার আচরণে রিফাত দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে,, চোখ বন্ধ করে এক হাত কোমরে রেখে অন্য হাত দ্বারা কপাল ঘষে।। পরিস্থিতি বয়ান করছে এই কাজ কাদের। রিফাত আর ইয়ানা কে এক করার সর্বোচ্চ চেষ্টা লাগিয়েছে দুই ভাই বোন,,,তাহ আর বোঝার বাকি থাকলো না।।
মিনিট ১৫ পর বেরিয়ে এলো ইয়ান া,,,পূর্ণদৃষ্টি মেলল রিফাত।। এই মুহূর্তে প্রচন্ড স্নিগ্ধ লাগছে ইয়ানাকে,,, তরল পানি বেহায়া ভাবে ইয়ানার গলা থেকে নিচের দিকে গড়িয়ে পড়ছে,, চোখ মুখ ঠোটে বিন্দু বিন্দু পানিও ফোঁটা রিফাতকে অস্থির করছে।রিফাতের ঘাড় বেয়ে বয়ে গেল এক শীতল শিহরণ,,, হুট করেই নিজের অবস্থার বেগতির কথা বুঝল রিফাত নিজেও,,, চোখ নামিয়ে শুকনো ঢক গিলল।। কোনরূপ ভুল সে করতে চায় না। নিজের পৌরসত্ত্বা এই অবকাশে তীব্র বেইমানি করছে তার সাথে।। প্রণয় ঝড় তুলছে অন্তস্থলে।। বয়স অনুযায়ী এই অনুভূতি অবাঞ্চিত নয়।।
ইয়ানা তার বিবাহিত স্ত্রী হলেও তাদের মাঝে রয়েছে এক চিকন কাচের দেওয়াল। যা রিফাত এখনো ভাঙতে পারেনি,, শতবার ভাঙার চেষ্টা করেও বিফল হয়েছে তার সত্তা। নিজের অতীতের কাছে বারবার হার মানছে তার বর্তমান,, আর নয়। এবার আর লুকোচুরি নয়,,, স্ত্রী অনুযায়ী ইয়ানার পূর্ণ অধিকার আছে রিফাতের অতীত সম্পর্কে জানার,,,আর রিফাত সেটাই করবে।।
এই এখন তার মস্তিষ্কে খোলবলিয়ে ইয়ানা কে কাছে পাওয়ার আশা কে ধামা চাপা দিল,,,রিফাত কোনভাবেই নিজের ব্যক্তিত্বকে মাটি ছোঁয়াতে পারেনা, কোনভাবেই না।। এই শিহরণ, এই অনুভূতি ,এই চাওয়ার নাম ভালোলাগা, মুগ্ধতা, অনুরাগ।। চৈতন্য ফিরলো হঠাৎ ইয়ানার ব্যথার্থ কন্ঠে,,,”আহ্হঃ,,,”
চোখ মুখ কুঁচকে ইয়ানা পা ধরে খাটের উপর বসে পড়ল।। অসাবধানতার কারণে টেবিলের কোন া লেগেছে পায়ের পাতার কিছুটা উপরে।। রিফাত দ্রুত পায়ে এগিয়ে এলো হাঁটু গেড়ে বসলো ইয়ানার সামনে। কোনরূপ- জড়তা ছাড়াই ইয়ানার পা তুলে নিল নিজের হাতে,,,যত্ন সহকারে নিজের ঊরুদেশে ইয়ানার পা রাখতেই মেয়েটি ভরকে গেল। পা সরিয়ে নিতে চাইলে ও,,,রিফাত জেদ দেখলো,,, দাতে দাঁত পিষে বললো,,,
“সমস্যা কি তোমার!”
ইয়ানা মিন মিন করে বললো,,,
“আপনি আমার পা ধরেছেন কেনো?”
“ব্যাথা পেয়েছো কোথায়?”
“প পায়ে।”
“তাহলে পা ধরবো না তো কি ধরবো!”
বোকা বোনে গেলো ইয়ানা।। রিফাত ইয়ানার প্লাজু ওঠালো,,,সাদা চামড়ায় গভীর লাল নিশানি চোখ এড়ালো না।। এর আগেও এরকম একই অবস্থার সম্মুখীন হয়েছিল দুই জন।। কিন্তু তখন এর পরিস্থিতি আর এখনের পরিস্থিতি আকাশ পাতাল সমান।।
“দেখে হাঁটাচলা করতে পারো না! স্টুপিড।”
“দেখেই তো হাঁটছিলাম।”
কথাটি বিড়বিড় করে বললেও তাহ ঠিক রিফাত এর কান পর্যন্ত গেলো। শুনেও উত্তর করলো না।। আলতো ভাবে ইয়ানার পা বিছানার উপর রাখলো। মিনিট পাঁচেক এর মধ্যেই নিচ থেকে বরফ নিয়ে এলো,,,, সুতির রুমালে বরফ মুড়িয়ে এসে বসলো ইয়ানার কাছে।। মেয়েটার পা কোলের উপর রেখে আস্তে ধীরে বরফ ছোঁয়াতে লাগলো ক্ষত চিহ্নে।। ইয়ানা শুধুই দেখলো রিফাত কে,,,এক রাশ ভালোলাগার তরঙ্গ খেলে গেলো মন মাঝারে।।
“আমাকে দিন আমি করছি,,,,।”
“আমি করলে অসুবিধাটা কোথায়!”
” না ,,, মানে,,,,”
“স্বামীকে খুশি রাখার মূল মন্ত্র কি জানো ইয়ানা?”
ভাবনায় ছেদ করলো রিফাত এর কথায়।। ভ্রু খুঁচিয়ে ফেললো,,,কৌতুহলী হলো আঁখি জোড়া,,,বললো,,,” কি?”
“তাদের কথা শোনা,তাদের কে বোঝা।। একজন পুরুষ কে শারীরিক দিক থেকে খুশি করা একটা নারীর পক্ষে যতটা সহজ ঠিক ততটাই কঠিন একজন পুরুষকে মানসিক দিক থেকে খুশি রাখা।। এই কঠিন ক্ষেত্রে অনেক নারীই হেরে যায়,পরাজিত হয়। কিন্তু আমি চাই আমার ইয়ানা বিজয়ী হোক,,,”
থমকে যায় ইয়ানা। রিফাত এর কথার পরিপ্রেক্ষিতে কোনো সঠিক শব্দ মাথায় আসে না।। রিফাত এর কথা ফেলে দেওয়ার মত মোটেই নয়।।
“আত্মার সাথী তারাই যারা মানসিক শান্তি দিতে পারে। হাজারো ক্লেশের মাঝে সুখ বয়ে আনে।। ভালোবাসা তো শুধুই একটা শব্দ ইয়ানা,,, অসল ভালোবাসা তখনই কবুল হবে যখন তাহ কথায় নয় কাজে প্রকাশ পাবে।।”
এতক্ষণে রিফাত ব্যথা নাশক জেল লাগিয়ে পাতলা সুতির কাপড়ে মুড়িয়ে ফেলেছে সেই কাঙ্ক্ষিত ক্ষত স্থান।। ইয়ানা শুধুই চুপ চাপ শুনলো রিফাত এর কথা।।রিফাত টি শার্ট,ট্রাউজার হাতে নিয়ে ওয়াশরুমে প্রবেশ করার আগেই পুনরায় ফিরে এলো ইয়ানার কাছে। মেয়েটার ভাবুক বোধ দেখে হাসলো,,,স্পষ্ট হাসি। দাত দেখা না দিলেও মুচকি হাসলো দৃঢ় ভাবে।। এগিয়ে এসে ইয়ানার ললাটে এক শক্ত চুম্বন এঁকে দিলো। চোখ বন্ধ অনুভব করলো সেই ছোঁয়া।। রিফাত এর প্রতিটা ছোঁয়া ইয়ানার কাছে একটুকরো প্রশান্তি,,,ভালোলাগার সমাহার।।
“আমার কথায় বেশি ভাবতে হবে না ইনু। ঘুমাও রাত বাড়ছে।। বিচানার ওপর থেকে এই ফুল ঝেড়ে ফেলো নাহলে অসুবিধে হবে,,,আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।”
“উম।”
“আমি এসে বাকি ফুল সরিয়ে ফেলবো,,,”
“নাহ থাক,,,ভালই লাগছে দেখতে।”
“আচ্ছা ঘুমাও,,,,”
ইয়ানা মাথা নাড়ায়।। লেখাটার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট ফুলিয়ে হাতের তালু দিয়ে সবটাই নিচে ফেলে দেয়।। প্রথমবার রুম টা দেখে যে তীব্র অস্বস্তি কাজ করছিল ইয়ানার মাঝে তা এখন অনেকটাই কমে গিয়েছে,,, রিফাতের স্বাভাবিক সুলভ আচরণ ইয়ানাকে শান্তি দিয়েছে।।
“এটা বাসর ঘর হলেও আজ আমাদের সত্যির বাসর নয় ইয়ানা। আসল বাসর সেই দিনই হবে যে দিন তুমি চাইবে।”
আচানক রাশভারী কন্ঠে ইয়ানা চমকালো,,,কথার অর্থ বুঝে আসতেই গাল দুটো টকটকে লাল হয়ে এলো। চনমনে হলো হৃদয়।।মাঝে মধ্যে রিফাত কে তার ভীষণ অসভ্য লাগে,,,এখন যেমনটা লাগছে।।
মিশে যেতে মন করলো মাটির সাথে,,এই লাজ সে রাখবে কোথায়! এই শরম সে লকাবে কোথায়! দেহশ্রী ডুবে গেলো লজ্জার সাগরে যেখানে হাবুডুবু খাচ্ছে লাজুক ইয়ানা।। ক্যাথার তলায় নিজেকে মুড়িয়ে ফেললো।চোখ বুজে নিলো আর চোখের সামনে ভেসে উঠলো রিফাত এর চেহারা।।
“জানিয়েছিস ইয়ানা কে সবটা!”
“নাহ,,,জীবনের প্রথমবার নিজের মাঝে ভয়ের আভাস পাচ্ছি আহিল।। মেয়েটাকে হারিয়ে ফেলার তীব্র আশঙ্কা কাজ করছে আমার মাঝে।।”
“কি ভেবেছিস,,, অতিথের সামনে বর্তমান হারাবি?”
“বর্তমানের কাছে অতীতকে স্মৃতির পাতায় জায়গা দেবো।”
“তাহলে ভাবছিস কেনো এতো! বলেই দেখ ইয়ানার রিয়াকশন কেমন হয়।। মেয়েটা তোকে ভালোবাসে রিফাত,,,ভুল বুঝবে না তোকে।। আর যদি একান্তই মনে হয় চেপে যাবি সবটা তাহলে মেয়েটাকে আর অপূর্ন রাখিস না,, নাহলে যে মেয়েটার সাথে অন্যায় হবে,,,তোদের বিয়ের সাড়ে চার বছরের ও বেশি হতে যায় রিফাত। ইউ নো হোয়াট আই মিন।”
“অতীত না জানালেও তো অন্যায় হবে আহিল,,,তার অধিকার আছে আমার সম্পর্কে সবটা জানার।”
“তাহলে দেরি কিসের! অধিকার কাজে লাগা,,,”
রিফাত উত্তর করলো না ,,,আহিল এবার শান্ত কন্ঠে বলে উঠলো,,,”ভালবাসিস ইয়ানা কে?”
“ভালোবাসতে চাইনি আহিল। আচমকা বেসে ফেলেছি। মেয়েটা হুট করেই খুঁটি গেড়ে আস্তানা জমিয়েছে আমার বুকে।। অজান্তেই নিজের সিদ্ধান্ত বালুর ন্যায় হাত হতে ঝড়ে পড়লো।। ভালোবাসা হতে গেল আর আমি সেটাকে আটকাতে পারলাম না।”
“তাহলে ভয় কি ডক্টর রিফাত হোসেন,,,প্রেমিক পুরুষ ভয় পায় না।। আর স্বামী দের ভয় পেতে নেই নাহলে বউ এর কথায় উঠবস করতে হবে।।”
“আমি ফেঁসে গেছি আহিল,,,মেয়েটা আমায় বশ করে ফেলেছে।। এ যে স্বয়ং আল্লাহর পাঠানো অমূল্য উপহার,,,তাই চেয়েও অবহেলা করতে পারিনি।”
গভীর রাতে নির্ঘুম আখি আকাশ পানে চেয়ে থেকে রিফাত ভাবলো এই সমস্ত কথা,, যাহ আজ রাতে ডিনার শেষ করে যখন দুই বন্ধু পার্কিং লটে যায় গাড়ি বের করতে, ঠিক সেই সময়ে আহিল এর সাথে ঘটে যাওয়া কথোপকথন।। ছেলেটা কি ভাবে যেনো রিফাত কে পড়ে ফেলে,,,দীর্ঘ দিনের এই বন্ধুক্তের মজবুত বন্ধনের দৃঢ়তার প্রমাণ আহিল দেয়,,,প্রতিটা পদক্ষেপে।। রিফাত রুদ্ধশ্বাস ছাড়লো এই অবকাশে নিজেকে অত্যাধিক অসহায় লাগছে। কিন্তু অতীত দিয়ে বর্তমান বিচার করতে চায় না সে।। এখানে দাঁড়িয়ে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো রিফাত যে সে সবটা জানাবে,,, তারপর ছেরে দেবে ভাগ্যের উপর।। না ঠিক ভাগ্য না সময়ের উপর।। আচ্ছা সবকিছু শুনে কি ইয়ানার কষ্টে বুক ফাটবে ? চোখ থেকে কি বইবে জলধারা?।। যদি সবকিছু শুনে ইয়ানা তাকে মেনে না নেয় তাহলে?,,,
“বি পজিটিভ রিফাত,,, ইয়ানা তোকে মেনে নিক আর না নিক মেয়েটা শুধুই তোর। আমার বাকিটা জীবন তার নামে আমি কবেই লিখে দিয়েছি। নিজের সর্বস্ব দিয়ে শক্ত করে ধরে রাখবো আমি তাকে কোথাও যেতে দেব না।।”
কথাগুলো নিজের মনে মনে উচ্চারণ করে নিজের মনকে বুঝ দেওয়ার চেষ্টা করলেও,,, তীব্র আশঙ্কা এখনো তার অন্তর দখল করে আছে।। সব কিছু কি এতই সহজ!!
“এখানে কি করছেন?”
চিরচেনা মৃদু ঘুমে আচ্ছন্ন কন্ঠ রিফাতের কানে আসতে চোখ ঘুরিয়ে তাকালো।। উসকো খুসকো লম্বা চুল ছড়িয়ে আছে পিঠবুকে,, হালকা তন্দ্রায় ফোলা চোখ, দুই হাত দ্বারা চোখের সামনে আসা
চুল কানের পিছনে গুজে,,,,গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে এলো কিছুটা ।।
“ঘুমাওনি তুমি?”
রিফাত কিছুতো আন্দাজ করেছিল যে ইয়ানা ঘুমায়নি। বিছানায় উস পাষ করা মেয়েটাকে দেখেই বুঝা যাচ্ছিল এই অবাঞ্চিত ভাবে সাজানো কক্ষে তার ঘুম ধরা দিচ্ছে না।। তারপরেও জিজ্ঞাসা করলো রিফাত,,,অবশ্য উত্তরের আসা করলো না।।
এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ২৯
“আপনিও তো ঘুমাননি।”
রিফাত মাথা নিচু করে মৃদু হাসলো,,,একদম স্পষ্ট সেই হাসি। কারোর মুচকি হাসি বুঝি এত সুন্দর হয়?এত মন কারা,এক উজ্জ্বল! যেনো রংধনুর ঝলকানি,,, ইয়ানার কে কাবু করার মত মোহনীয় দৃশ্য।।তত্পর আবার মাথা তুলে ইয়ানার দিকে তাকিয়ে বলল,,,”কাছে এসো।”
