Home এক প্রণয় রাত্রি এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ৩৯

এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ৩৯

এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ৩৯
আসিফা খান

ভেজা চুল এর পানিতে কামিজের পিঠের অংশ ভিজেছে কিছুটা। মেয়েলি কাঠামোয় মোড়ানো এই মাথানষ্ট করা দৃশ্য দেখে ঢুক চিপে রিফাত। দ্রুত নজর সরিয়ে হাতে থাকা নাস্তার প্লেট টেবিলের উপর রেখে আপন নারীর সান্নিধ্যে দাঁড়ায়। মেয়েটির হাত থেকে টাওয়াল নিয়ে নিজেই সেই লম্বা কেশ মুছে দিতে থাকে।। অতঃপর নিজ দায়িত্বে টাওয়ালটা ব্যালকনিতে মেলে এসে দেখে ইয়ানা বেড থেকে সবে মাত্র ওড়না হাতে নিচ্ছে। রিফাত অকপটে বলে,,,,
“ওড়না রাখো।”

ভরকে যায় ইয়ানা। রিফাত তার সম্মুখে দাড়িয়ে ওড়না ছিনিয়ে বেডে ছুঁড়ে মারে। কাঁধে,বুকে লেপ্টে থাকা আর্দ্র কেশ ছুঁয়ে সরিয়ে দেয় রিফাত। অতঃপর খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে থাকে কিছু একটা। রক্তিম চিন্হ গুলিতে আলতো স্পর্শ দিতেই ইয়ানা ভ্রু কুঁচকে ব্যাথার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। জ্বলে ওঠে সেথায়। রিফাত টকটকে অধরে আঙ্গুল ছুঁইয়ে ত্বরিত জিজ্ঞাসা করে,,,”ব্যাথা?”
ইয়ানা মাথা নাড়ায়। না বলে ইশারায়। রিফাত বোঝে ইয়ানা মিথ্যা বলছে। সে তো জানে,কাল রাতে মেয়েটার উপর সে একপ্রকার ঝড় বইয়েছে। নিজের সর্বাধিক বল প্রয়োগ করেছে মেয়েটার উপর, যার ফল স্বরূপ পেয়েছে বোকা প্রেয়সীর অগণিত নখের আঁচড়। কিন্তু সেই আঁচড়ের হিসাব কষা বারণ। ভোরের আগ পর্যন্ত মাতাল রিফাত কে সামলানো সহজ ছিল না,তাও ইয়ানা সবটাই সমলিয়েছে নিজ দায়িত্বে। সহজ করে নিয়েছে প্রনয় অত্যাচার। কঠিন মুহূর্তেও স্বামীর মাথার হাত বুলিয়ে শান্ত করতে চায়।।আদরে আদরে মাতোয়ারা করেছে সে ইয়ানা কে। মেয়েটা তার ধমনীতে দৌড়া দৌড়ি করে। পাগল বানায় প্রতি মুহূর্তে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

ইয়ানা কে নিয়ে সোফায় বসে রিফাত। নাস্তার প্লেট নিয়ে এক চামুচ পাস্তা মেয়েটার মুখে তুলে দেয়। এতক্ষণে নেতিয়ে যাওয়া ইয়ানা রিফাত এর বুকে নিজের আধিপত্য জমিয়ে ফেলেছে। রিফাত ও এক হাতে আগলিয়ে নেয় তার বোকা প্রেয়সী কে।। ধীরে সুস্থে খেতে থাকে ইয়ানা। মাঝে মধ্যে বক্ষ পীড়ায় কেপে উঠছে সে। রিফাত সবটাই পরখ করে। তার নাজুক প্রেয়সী। মনে মনে কিঞ্চিৎ হাসে। কপালে চুমু এঁকে বলে,,,
“আজ সারাদিন রুমে থাকবে। বোর ফিল করলে আলেয়া কে ডেকে নেবে রুমে। রুম থেকে বের হবে না। প্রয়োজন পড়লেও না, আশাকরি এই দাগ দেখিয়ে আন্টি,খালাদের সামনে আমায় বিব্রত করবে না। সবাই যেনো আমায় ভালো,ভদ্র জানুক। রিফাত অভদ্র শুধুই তার আদুরে খরগোশের এর কাছে।”

“ফাজিল।”(নিঝুম কণ্ঠ ইয়ানার)
হাসে অগোচরে রিফাত।। কান ঝালাপালা হয় রিফাত এর আদুরে খরগোশের এর। আরক্ত হয় গাল। কোন রকমের খাবার শেষ করে দুই জন। অতঃপর রিফাত উঠে ড্রয়ার থেকে একটা ওষুধের পাতা বের করে। একটা ট্যাবলেট হাতে নিয়ে ইয়ানার মুখের সামনে ধরতেই ভ্রু কুঁচকে যায় মেয়ের। এতক্ষণে ব্রত ভেঙ্গে রিনরীনিয়ে বলে,,,
“পেইন হচ্ছে না।”
“পেইন কিলার নয় এটা।”
“তাহলে,,,!”
“খাও ইয়ানা। প্রশ্ন নয়,,,”
“আমি খাবো না।”
“বাচ্চামি করো না ইনু,,,খেয়ে নাও।”

ঠোঁট,দাত শক্ত করে রাখলো ইয়ানা। সে বুঝেছে এটা কিসের ট্যাবলেট। জেদ ধরে বসে রইলো সে।
খাবে না মানে খাবে না। রিফাত আরো বেশ কয়েক বার নরম কন্ঠে বোঝালো। কিন্তু মানলনা তার ইনু। এবার মেজাজ বিগ্রালো রিফাত এর। চেঁচিয়ে উঠলো।দিলো এক ধমক। চোঁখ মুখের রং পাল্টালো মুহূর্তেই। এক প্রকার জোর করেই ট্যাবলেট খাওয়ালো ইয়ানা কে। বেচারি চোখের জল নাকের জল এক করে ফেলেছে। ফুঁপিয়ে কেঁদছে ইয়ানা। রিফাত নিজ কপালে আঙ্গুল ঘষে। নিজেকে সংযত রাখে। রুদ্ধ শ্বাস ছেড়ে ইয়ানা কে ধরতে নিলে মেয়ে গুটিয়ে নেয় নিজেকে। চোখের পানি আলতো স্পর্শে মুছিয়ে দেয়। গালে আদর মাখা আমর্শ দিয়ে বলে,,,

“কাঁদে না ইনু,,,আচ্ছা আর বকবো না। এই যে,,,তাকাও আমার দিকে।”
অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকায় রিফাত এর দিকে। নাক টানে। রিফাত দেখে,,,মেয়েটা সমস্ত রূপেই সুন্দর। নাকি ইয়ানার সমস্ত কিছু তার একটু বেশিই ভালো লাগে,মন কাড়ে। এরকম আদুরে মেয়েকে সে কি ভাবে ধমক দিল! এরই মাঝে ইয়ানা ভ্রু কুঁচকায়। চোখ,মুখ খিঁচিয়ে ফেলে কিছু মুহুর্তের জন্য। পীড়ায়, নিজ অবয়বের নাজুক ব্যাথায়! রিফাত বোঝে,, ঝটপট উঠে দাড়ায়। ইয়ানা কে নিজ বুকের সহিত আগলিয়ে তোলে শূন্যে। কেপে উঠলো ইয়ানা,,,ভরকে গিয়ে বললো,,,

“কি করছেন!? পড়ে যাবো,,,নামান।”
“কেনো! এই বিশাল আমি টাকে চোখে পড়ছে না?ধরো আমায়।”
তাই করে ইয়ানা। গলা,কাধ জড়িয়ে ধরে রিফাত এর। ইয়ানা কে খাটের উপর পা ঝুলিয়ে বসায়। অতঃপর রিফাত যা করে তার জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলো না ইয়ানা।চমকে উঠে বাঁধা দিতে গেলে রিফাত চোখ পাকিয়ে তাকায়। চুপসে যায় মেয়ে। কামিজের চেন খুলে দুই কাধের উপর থেকে নামিয়ে ফেলে। পুরো উপরিভাগ উন্মুক্ত করে। নরম হাতের স্পর্শ দ্বারা নব্য কায়দায় ব্যাথা নিবারণের চেষ্টা চালায় রিফাত। তবে হৃদয়ের স্বামীর আলতো স্পর্শে ও খানিক চোট অনুভব করে ইয়ানা। মেয়েলি কাঠামো অত্যাধিক নরম,,কিন্তু ইয়ানা দেহ অনন্য। তুলা মেয়েটি। আপন দুইপাশের বিছানার চাদর খামচে ধরে ইয়ানা। শ্বাস ছাড়তেও লজ্জা পাচ্ছে মেয়েটা। একটা সময় শরীর হালকা অনুভব হয়। সমস্তটা আগের মত করে,,,ললাটে দীর্ঘ চুম্বন এঁকে দেয় রিফাত। অবুঝ নারীকে বোঝায় কিছু অভিপ্রায়, যা শুনে ইয়ানা থুতনি ঠেকায় বুকে। অতঃপর রিফাত কাবাড এর দিকে অগ্রসর হতে হতে বলে,,,

“শ্বাস ছাড়ো স্টুপিড।”
পরনে টি শার্ট খুলে প্রশস্ত পেটানো শরীরে অফ হোয়াইট রঙের শার্ট জোড়ায়। ইয়ানা চোরা চোখে দেখে তার প্রিয় পুরুষের চোখ ধাঁধানো দেহ। রেগুলার শরীর চর্চার ক্ষেত্রে এই সুঠাম স্বাস্থ্য তার। লম্বা লম্বা চিকন রক্তিম চিহ্নে নজর পরলে ইয়ানা চোখ সরায়। ওই চিহ্নের মালিক নিজে ইয়ানা। রিফাত ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে আয়নার মাধ্যমে ইয়ানা কে একবার পরখ করে বলে,,,
“এদিকে আসো,,,বোতাম গুলো লাগিয়ে দাও।”
বাধ্য মেয়ের মত গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে আসে তার সুদর্শন স্বামীর কাছে। রিফাত নিকটে আনে তাকে। ইয়ানা মাথা নিচু করে এক মনে বোতাম লাগাতে ব্যাস্ত। মনোহরী এই নারী। এই নারীই তার সর্বনাশ।
অস্থির রিফাত এবার সুদৃঢ় হাতে ইয়ানার চিবুক ধরে আদল তোলে।

“রেগে!?”
ইয়ানা মাথা নাড়িয়ে না বোঝায়। রিফাত হাঁফ ছাড়ে। টকটকে অধরে পর পর চুমুর বর্ষণ ঘটায়। জড়িয়ে ধরে বুকের মধ্যে।
“ইনু,,,সর্বহারা দেখেছো কখনো! সমস্ত কিছু হারিয়ে মানুষ খড় কুটো আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার তাগিদে। তুমি আমার কাছে সেই খড় কুটো,,,”
সর্বাঙ্গ কেপে উঠলো নিমিষেই। রিফাত এর হৃদয় নিংড়ানো কথায় চমকে উঠে। কিছু ভালোবাসা স্বীকারোক্তির প্রয়োজন হয় না। ভালোবাসা তো একটা অনুভব। ইয়ানা প্রতিমুহূর্তে অনুভব করে রিফাত তাকে কতটা ভালোবাসে,, অবশ্য রিফাত তাহ কখনো মুখে প্রকাশ করেনি ,,কিন্তু ইয়ানা বোঝে। এই সামান্য কথাতেই প্রকাশ পায়, সে রিফাত এর জন্য কতটা মূল্যবান। সুদর্শন গম্ভীর স্বামীর অব্যক্ত ভালোবাসায় ইয়ানা সিক্ত। স্বামীর ভালোবাসা গুপ্ত খাজানা যে, খাজানার মালিক ইয়ানা কবেই হয়ে গেছে।। ইয়ানা গভীর নয়নে তাকায় রিফাত এর পানে।
রিফাত হালকা হেসে বলে,,,,
“নার্সিং হোম যাচ্ছি,,,,আজ ফিরতে হয়তো লেট হবে।। সময় মত খেয়ে নেবে। টেক কেয়ার বউ।”
শেষের কথাটি বলে চুমুর ভঙ্গিমা করে রিফাত। রুম থেকে বেরিয়ে যায়।

“বউ লাগবে,,,আব্বু।”
দরজার আড়ালে দাড়িয়ে থাকা আতিকা বিস্ফোরিত চোখে তাকায় ড্রইং রুমে,সোফায় বসে থাকা আহিল এর দিকে।। সন্ধ্যা সাতটায় ঘরের একমাত্র জামাইয়ের আগমনে সবাই বেশ বিচলিত হয়। আতিকার মা-বাবা লেগে পড়ে জামাইয়ের আদর আপ্যায়নের তাগিদে। হঠাৎ করে আহিলের আগমনে আতিকা ও চমকায়। সকাল থেকে লোকটার সাথে সেরকম কথা না হলেও চ্যাট হয়েছে দুই একবার কই তখনও তো কিছু বলেনি যে সে আসবে।। ড্রয়িং রুমে সবাই বসে উশখুশ করছে,, আতিকার আব্বু আহিল সামনে নাস্তার সমাবেশ রেখে কিছু খাওয়ার ফরমায়েশ করতেই আহিল কথাটি বলে ওঠে।।
কথাটি বলে আহিলও কিছুটা লজ্জিত হয়। কিন্তু এখন লজ্জার পরোয়া করলে হবে না,,তার বউ লাগবে। আতিকা লজ্জায় পানি পানি হওয়ায় উপক্রম। কান গরম হয়ে গেছে। আতিকার মা এদিকে মুখে শাড়ির আঁচল চেপে দৌড় দেয় রান্নাঘরে,, আতিকার বাবা খুকখুক করে কেশে ওঠে,, পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ভাই মাথা চুলকায়।। আহিল টেবিলে রাখা পানির গ্লাস তুলে এক নিশ্বাসে শেষ করে সব টা। মিনিট ব্যায় করে আতিকার বাবা শান্ত কন্ঠে আমতা আমতা করে বলে,,,

“কিন্তু,,,বাবা,,,এখনও তো,,,”
আহিল তার শশুরের কথা এক প্রকার ছিনিয়ে নিয়ে ত্বরিত বলে,,,,”একেবারে নিয়ে যাচ্ছি না আব্বু। অনুষ্ঠান যেমন হওয়ার কথা তেমনি হবে,, আসলে মা খুব দেখতে চাইছে আতিকা কে। বাড়িতে আমার ফুপির ছেলেমেয়েরা এসেছে তারাও তাদের ভাবীকে দেখার জিদ ধরেছে। না হলে এভাবে নিয়ে যাওয়ার কোন ইচ্ছা ছিল না যদিও। এবার আপনি যা ভালো বুঝেন,,,,না হলে,,,”
আহিলের কথা শেষ করার আগে আতিকার বাবা বলে উঠলেন,,,,” না না না বাবা আমাদের কোন অসুবিধা নেই ,,,তোমাদের বাড়ির বউ তোমরা যখন ইচ্ছা নিয়ে যাও। আসলে এখনো অনুষ্ঠান হয়নি তো তাই একটু চিন্তিত,,, না হলে ধর্মমতে আর সামাজিক মতে বিবাহিত দম্পতি তোমরা।”
আহিলের মনে লাড্ডু ফুটে ওঠে। যাক বউয়ের জন্য মিথ্যে বলেছে,, একটু মিথ্যা।। এটা ঠিক বাড়িতে মেহমান এসেছে তাদের,,, কিন্তু তারা কেউই আতিকা কে দেখার কথা বলেনি । তারা সবাই জানে অনুষ্ঠানের পরেই বউ তোলা হবে বাড়িতে। কিন্তু এদিকে আহিল এর বউ চাই। তাই সামান্য মিথ্যে বলে সুযোগের সদ্ব্যবহার করল সে।।
এদিকে আতিকার মনে হাতুরি পেটাচ্ছে কেউ। প্রথমবার নিজের স্বামীর বাড়ি যাচ্ছে সে। মনের নব্য অনুভূতি গ্রাস করেছে। এদিকে আতিকার বাবা আতিকাকে তার শ্বশুর বাড়ি যাওয়ার কথা জানায়। রেডি হতে বলে বেরিয়ে যায় রুম থেকে।।

রাত তখন এগারোটা। ক্লান্ত শরীর নিয়ে রুমে প্রবেশ করলো রিফাত। বেডে ইয়ানা তখনও বইয়ে মুখ গুঁজে বসে এক মনে পড়ে যাচ্ছে।রিফাত দরজা লাগিয়ে এগিয়ে এলো তার দিকে। কারোর আভাস পেয়েই চমকে মাথা তুলে তাকায় মেয়ে। ব্যাক্তিগত পুরুষকে দেখে কিছুটা নমনীয় হয়। বই রেখে উঠে দাঁড়ায়। ক্লান্ত রিফাত কে দেখে মৃদু ব্যাধি অনুভব করে ইয়ানা। রিফাত কে শার্ট খুলতে সাহায্য করে ইয়ানা। হাত উচিয়ে রিফাত এর চোখ থেকে চশমা খুলে দেয়। রিফাত শুধুই দেখে ইয়ানার যত্ন ময় সেবা। আহা,,,কি সুখ,কি শান্তি। এই মেয়ের মাঝেই তার স্বর্গসুখ,সর্বস্বস্তি।।
রিফাত ওয়াশরুমে যায়। ইয়ানা তার টি শার্ট,ট্রাউজার বের করে বিছানায় রাখে। নিচে গিয়ে খাবারের প্লেট সাজিয়ে রুমে প্রবেশ করে। দেখে রিফাত টাওয়াল দিয়ে চুল মুছতে ব্যাস্ত। ইয়ানা এড়িয়ে এসে ভ্রু কুঁচকে বলে,,,

“এই রাতে গোসল করলেন কেনো! ঠান্ডা লেগে যাবে তো নাকি।”
রিফাত বিছানায় বসে ফটাফট। ইয়ানার হাত টেনে সামনে দাঁড় করিয়ে নিজে তার কোমড় জড়িয়ে পেটে মুখ গুজে দেয়। সেই অবস্থায় বলে,,
“দুইটো ওটি ছিল আজ ইনু। গোসল না করলে খারাপ লাগতো।”
ইয়ানা আর কিছু বলে না। নিজে রিফাত এর চুল মুছে দিতে থাকে। অতঃপর রিফাত এর মাথার হাত রেখে বলে,,,
“ডিনার করবেন না!?”
রিফাত মাথা ঝাঁকায় একই অবস্থা থেকে। হ্যাঁ বলে। হুট করে কামিজের ফালি সরিয়ে উন্মুক্ত মেদহীন পেটে অদূরে ছোঁয়া দিতেই, ইয়ানার দম আটকায়। লোকটা বড্ডো বেসামাল। সদ্য গোসল করা রিফাতের শরীর থেকে ভেসে আসছে স্নিগ্ধ আবহ।
এবার ঠোঁটের গাঢ় চুমু। ইয়ানা কোনরকম মিহি সুরে আওড়ায়,,,

“খাবার ঠান্ডা হয়ে যাবে। আমি খাইয়ে দিই!”
কি নিদারুণ সহজ আবদার। রিফাত কি আর এই চান্স ছাড়া করে! না একদমই না। কামিজ ঠিক করে ইয়ানার হাত টেনে সোফায় বসল। চশমা ছাড়া রিফাত এর চোখ দেখলে অন্তর কাপে ইয়ানার। কেমন গভীর চোখ তার। এই যেমন এখন রিফাত তার দিকে একভাবে তাকিয়ে আছে যার জন্য ইয়ানার ধড়্ফড়্ করছে অন্তর। নিজের ছোটো ছোটো আঙ্গুলের মাঝে মাখানো ভাত তুলে রিফাত এর মুখের সামনে ধরে। রিফাত একবার ইয়ানার হাতে থাকা মাখানো ভাতের পরিমাণের দিকে তাকায়,, এই টুকু ভাত তার মুখের মধ্যে গিয়ে মিলিয়ে যাবে। মনে মনে হেসে, ইয়ানার দিকে তাকিয়ে মুখে নেয় লোকমা।। দুই জনেই একসাথে রাতের খাবার শেষ করে অতঃপর ইয়ায়ানা প্লেট গুছিয়ে নিচে রান্না ঘরে গিয়ে রাখে। খাবারের পুরোটা সময় রিফাত তার বউ কে উত্ত্যক্ত করতে ভুলিনি। বিভিন্ন রকম রোমান্টিকতা দেখিয়েছে সে নিজের বউকে।।
রুমে এসে ইয়ানা আগেই বিছানার উপর থেকে বই পত্র সরায়। ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে ধির পায়ে ব্যালকনিতে যায়। রিফাত আকাশের দিকে মুখ করে তাকিয়ে আছে। ইয়ানা কিছু বলতে যাবে তার আগেই রিফাত তার দিকে না তাকিয়ে বলে ওঠে,,,

“এদিকে আসো।”
ইয়ানা ভরকায়। রিফাত তাকে দেখিনি, তাহলে কিভাবে বুঝলো সে তার পিছনে দাঁড়িয়ে।। ইয়ানা এগিয়ে যেতে রিফাত তাকে টেনে নিয়ে সামনে দাঁড় করায়। কাপড়ের আড়ালে উন্মুক্ত অবয়বের হাত রেখে নিজের বুকের সহিত জড়িয়ে নেয়। থুতনি ঠেকায় ইয়ানার মাথার পাশে।। ইয়ানা মাথা ঘুরিয়ে রিফাতের দিকে তাকানোর চেষ্টা করে বলে,,,
“ঘুমাবেন না!?”
রিফাত উত্তর দেয় না। ইয়ানার কানের নরম লতিতে আলতো চুমু খায়।।শিহরিত হয় ইয়ানা।। মনের মানুষদের ওপর শারীরিক টান থাকবেই এটাই নিয়ম। ভালোবাসার মানুষদের আমরা সব সময় কাছে পেতে চাই। কাছাকাছি রাখতে চাই। নিজের বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরতে চাই,,, এগুলি কোনটাই দোষ নয়, এগুলিই সৃষ্টির নিয়ম।। ইয়ানা আবারও একই প্রশ্ন করতে রিফাত শীতল কন্ঠে বলতে লাগে,,,

“আজ কতদিন পর কারুর হাতে খেলাম ইনু। মা ছেড়ে চলে যাওয়ার পর আমি যেন হুট করেই বড় হয়ে গেলাম,, যদিও তখন কিশোর বয়স আমার।তার পরেও কেমন আত্মনির্ভর হলাম। আব্বু খাইয়ে দিতে চাইতো। কিন্তু আমি খেতাম না।। ছোটবেলা থেকে প্রচণ্ড দুরন্ত ,চঞ্চল আমি। মা শাসনে রাখলেও আব্বু ছেড়ে দিত। একটা সময় সব মিলিয়ে গেল। মায়ের সাথে ভীষণ ক্লোজ ছিলাম আমি। মৃত্যু কি আমি জানতাম না। কিন্তু মায়ের বেলায় জানতে পারলাম। রাগ হয়েছিল মায়ের উপর ,,,কষ্ট হয়েছিল প্রচুর। কিন্তু কাউকে বলতে পারিনি। কিংবা বোঝাতে পারিনি।। এদিন দেখলাম আমাদের বাড়িতে আব্বুর সাথে একটা মহিলা,,,রঙচঙে শাড়ি তার পরনে। আব্বুর দেহে সুন্দর পাঞ্জাবি। আব্বু মায়ের রুমে সেই কাঙ্ক্ষিত মহিলাটিকে নিয়ে গেলো। আমি দেখলাম,,,তখন কেউ যেনো আমায় বললো,,,’ রিফাত এটা তোর নতুন মা। ‘,,,আমি মানতে নারাজ,,,মা একটাই হয়। সে কি করে নতুন,পুরাতন হয় ইনু! আমার মা তো আল্লাহর কাছে,,,ফিরে আসবে না আমি জানি।”

ইয়ানার চোখে অশ্রু। হালকা চোখ নাড়াতেই গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে। এই প্রথম রিফাত তাঁর মাকে নিয়ে এত খোলামেলাভাবে কথা বলল,, জাহির করল নিজের কষ্ট। সে জানে রিফাত তার আন্টি মায়ের কথা বলছে। ইয়ানা নিজের জ্ঞান থেকে দেখে এসেছে রিফাত কখনোই মিসেস আসফিয়া কে মা বলে সম্বোধন করেনি। ইয়ানা বোঝে রিফাতের কষ্ট ,,সেও যে বাবা হারা। রিফাত মায়ের ভালোবাসা পেলেও ইয়ানা সেই ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত।। রিফাত এর বলা প্রতিটা কথা ইয়ানার বুকে ভেদ করে।। ইয়ানা ঘুরে ঝাঁপিয়ে পড়ে রিফাত এর বুকে।।রিফাতও মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় তার প্রিয় নারীর।
“কাঁদে না ইনু,,,”
ইয়ানা ফুপিয়ে বলে,,,”আন্টি মা আপনাকে ভীষণ ভালোবাসে রিফাত।”
রিফাত ফোঁস করে শাস ছাড়ে,,,বলে,,,”জানি আমি। আমি আন্টিকে ভীষণ সম্মান করি,,, আব্বুর কঠিন সময় আমি তাকে তার পাশে দেখেছি। কিন্তু আমি আমার মায়ের জায়গা, আর কাউকে দিতে পারবো না ইনু।”
“আমিও তো কারোর জায়গা,,,,,”

ইয়ানার কথা তার মুখে রয়ে গেল। রিফাত আঁকড়ে ধরল তার প্রেয়সীর নরম অধর। রিফাত বুঝেছে ইয়ানা কি বলতে চাইছে।। দীর্ঘ চুম্বনে হাপিয়ে ওঠে ইয়ানা। রিফাত কপালে কপাল ঠেকিয়ে ভারিক্কি নিঃশ্বাস নিতে নিতে বলল,,,,
“আর কখনো এরকম কথা বলবেনা ইয়ানা। তুমি আমার শেষ নারী। আমার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার অবলম্বন। আমার আধাঁর রাতের ধ্রুবতারা। আমার মন পিঞ্জরে তোমাকে কোবেই বন্ধি করেছি,,,ছাড়া পাবে না কখনোই।”
“আমি ছাড়া পেতে চাই না।”
রিফাত হাসে। মনে মনে বলে,,,”হারাতে দেবো না তোমায়। কখনোই না। তার জন্য কঠিন পদক্ষেপ ও আমি নিতে পারি। নিয়ে ফেলেছি।”

জীবন,মৃত্যু আল্লাহর হাতে,এই কথাটি রিফাত জানে,বোঝে তার পরেও ইয়ানাকে নিয়ে তার অসীম রয়েছে ভয়। ভালোবাসার মানুষ কে হারিয়ে ফেলার শঙ্কা। অচেনা,অজানা অতঙ্ক। বুঝদার রিফাত ও যেন ভালোবাসার চোটে অবুঝ হয়ে গেল।
কোলে তুলে নেয় ইয়ানা কে। বাতি নিভিয়ে দেয়। ইয়ানা গুটি শুটি মেরে লুকিয়ে আছে রিফাত এর বুকে। একটা সময় পিঠ ঠেকে বিছানায়। ইয়ানার দেহের অধিকারী হয়ে চাদর গায়ে টানে রিফাত। পুরোপুরি কামিজ উন্মুক্ত করে গলায় ঠোট ছোঁয়ায়।
হাতের নৃত্য অস্বাভাবিক তার। ইয়ানা অসফুষ্ট শব্দ করলে থামে রিফাত। আজ বেসামাল হতে গিয়েও হলো না। সামলে নিলো নিজেকে। ইয়ানার ছোট্ট বুকে মাথা রেখে আঁকড়ে ধরে উন্মুক্ত কোমড়। ক্লান্ত রিফাত যেনো আরাম পেলো। ইয়ানা স্বামীর চুলের ভাঁজে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো।

“বউ এনেছি নিজের জন্য। তোদের সাথে গল্প করাতে নয়,,,বউ দে আমার।”
আতিকা লাজে একাকার। আহিল এর এহেন বেফাঁস মন্তব্যে সে ভড়কায়।। সন্ধায় আহিল এর সাথে আতিকা কে দেখে অবাক হয় আহিল এর পুরো পরিবার,,,সাথে তার ফুপাতো ভাই বোনেরা। কিন্তু অবাক এর চেয়ে আনন্দিত বেশি হয় সবাই। বাড়ির বউ প্রথম বার শ্বশুর বাড়ি এসেছে বলে কথা,,, একপ্রকার রান্নার তোড়জোড় শুরু হয়। আতিকার সাথে সবাই কুশল বিনিময় করে। আহিল এর মা বৌমা কে বুকে জড়িয়ে ধরে। মাথায় চুমু এঁকে দেয়।। ছেলের মনের অবস্থা বুঝে ফেলে আহিল জন্মদাত্রী।। আতিকা কে একপ্রকার টেনে নিয়ে যায় আহিল এর ফুপাত ভাই বোনেরা। ফোঁস করে শাস ছাড়ে আহিল,,,নিজে রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নেয়। সেই যে আতিকা বেপাত্তা হলো একেবারে খাওয়ার টেবিলে তাদের দেখা হলো। আহিল একপ্রকার অস্থির। খাওয়া দাওয়া শেষে আতিকা কে রুমে আসতে বললো। কিন্তু তাতেও কাজ হলো না। ভাই বোনেরা ভাবি কে পেয়ে বেতাল। রাত বারোটা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে যখন বউ পেলনা তখন একপ্রকার তেড়ে নিচে এসে কথাটি বললো আহিল।।
আতিকা কে টেনে নিয়ে আসলো রুমে। রুমের দরজা বন্ধ করে এগিয়ে আসলো বউ এর দিকে।
আতিকা ভ্রু কুঁচকে বললো,,,,”এই ভাবে আনলেন কেনো!? তারা কি ভাবছে?,,,সকালে তাদের সামনে যেতে লজ্জা পাবো তো নাকি।”

“সকাল হতে এখনও ঢের দেরি। সকাল হওয়ার আগে একটা দীর্ঘ রাত আছে। বোঝো কিছু!?”
আহিল এর কণ্ঠ ঘোর লাগা। আতিকা একটা শুকনো ঢুক গিলে। কাঁটা লাগে বদন জুড়ে। এরই মধ্যে লাইট অফ করে আহিল। আতিকা ঘাবড়িয়ে যায়,,,কম্পিনরত সুরে সুধায়,,,
“অন্ধকার…. ভয় করে।”
আহিল ধির পায়ে এগিয়ে এলো,,, আতিকার গালে হালকা হাত রেখে বলে,,, “অন্ধকারে ভয় লাগছে! নাকি অন্ধকারে আমাকে ভয় লাগছে?”
আতিকা ভাষা হারায়। আহিল হারায় খেই। একজন নিজের অনুভূতি লুকাতে ব্যস্ত তো অপরজন নিজের অনুভূতিকে উজাড় করে ব্যক্ত করতে ব্যস্ত। নিস্তব্ধ রাতে, অন্ধকারাচ্ছন্ন কক্ষে, দুই হালাল কপোত কপোতী প্রেম জোয়ারে ভাসতে চাইছে।।
আতিকা সরে যেতে নিলে আপন উদরে নিজ অর্ধঙ্গের হাতের ছোঁয়া পায়। শাড়ীর আড়াল হতে উন্মুক্ত অবয়বে বিরাজ করে হাতের স্পর্শ। দেহ ভারী হয় আতিকার। গলা শুকিয়ে আসছে। থরথর করে কাপছে শরীর। পর পর চুলের গোছা এক পাশে করে আহিল। ঠোটের বর্ষণ ঘটায় কাঁধে, ঘাড়ে। আতিকা যেনো এবার নিস্তেজ হবে। শরীর অবশ হয়ে পড়ে যেতে নিলে আহিল সামলায় তার বউ কে।। কোলে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল।। আঁখি তুলে তাকায় আতিকা। মরণ ফাঁদ পাতে আহিল এর জন্য।

“আতিকা,,,”
উফ্,,,,এই মাতাল কন্ঠে আতিকা বুঝি উপেক্ষা করতে পারে! কান্না পাচ্ছে তার,,,ভয় জান যায় যায় অবস্থা।
“ভয় পাচ্ছো!?
আতিকা দ্রুত মাথা নাড়ায়। নাক টানে। ঠোঁট কাপছে তার।। সেই কম্পনরত অধরে নিজের রুক্ষ অধর মিলিয়ে মিশিয়ে একাকার করে আহিল।। প্রনয়ের সুখ ব্যাথায় অস্পষ্ট শব্দ করে ওঠে আতিকা, হাত রাখে আহিলের পিঠে ঘাড়ে।।
“ভয়ের কি আছে! আমি আছি তো।”

ইশ,,,এই ভরসার আহ্বান না চাইতেও আতিকা ফিরিয়ে দিতে পারেনি। সম্পর্ক তাদের হালাল। শরীরের মেলবন্ধন আজ না হলে কাল হবেই,, কিন্তু তাদের হৃদয়ের মেলবন্ধন তো অনেক আগেই হয়ে গিয়েছে।। শরীর চিনচিনে ব্যাথাটা বাড়তে থাকে সময়ের সাথে। আহিল পাগল প্রায় হয়ে প্রিয়তমা কে আদর দিতে ব্যাস্ত। আতিকা পারে না সামলিয়ে উঠতে,,,তার জন্য এই সব কিছু নব্য। নাজুক মুহূর্তে এসে যখন আতিকা গভীর সুরে কেঁদে উঠলো তখন যেনো আহিল উন্মাদ হলো। বউ এর মাথায় হাত বুলিয়ে দিল,,,বোঝালো,,,
“সমস্তটা স্বাভাবিক আতিকা। সহ্য করো সবটাই ঠিক হয়ে যাবে,,,ভরসা রাখো জান। ডোন্ট প্যানিক,,, টেক আ ডিপ বৃথ। লুক অ্যাট মি,,, আই লাভ ইউ।”

এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ৩৮

স্বচ্ছ, সাধারন ভালোবাসা স্বীকারোক্তি শুনে এই পৃথিবীর কোন নারী প্রত্যাখ্যান করে! স্বামীর ভালোবাসা পাওয়া স্ত্রীর সৌভাগ্য। আর স্ত্রীর ভালোবাসা পাওয়া স্বামী ভাগ্যবান।। আতিকা সমস্ত ভয়,ব্যাথা,লজ্জা উপেক্ষা করে আহিলের ডিসিশান মেনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।। আহিল এর পিঠে হাত রাখে,,, মিন মিন করে বলে,,,”আমিও,,,আপনাকে,,অনেক… ভালো,,,,,”
“জানি আমি।”
ব্যাস এবার কে পায় আহিল কে। আতিকা কে নিয়ে যায় প্রনয় দেশে।

এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ৪০