এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ১
নুসরাত ফারিয়া
সদ্য বিয়ে হওয়া বাসর রাতে নিজের বরের জায়গায় ভার্সিটির প্রোফেসর মি. আধার খান-কে দেখে রীতিমতো চারশো চার বোল্ডের ঝটকা খেয়ে থম মে’রে বসে রয়েছে আলো। সে হয়তো স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি এমন কিছু দেখবে। মেয়েটাকে দেখে মনে হচ্ছে—তার সামনে মানুষ নয়, বরং কোনো য’মদূত দাঁড়িয়ে আছে। একটু নড়লেই খপ করে তার ছোট্ট দেহ থেকে প্রাণ পাখিটি বের করে নিয়ে যাবে। এসির মধ্যেও তরতর করে ঘামছে মেয়েটা। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে এসেছে, বার বার শুকনো ঢোক গিলছে এবং মনে মনে ভাবছে, কেন যে না দেখে বিয়ে করতে গেল? সবাই কতবার করে দেখতে বলেছিল, কিন্তু তখন তো মাথায় ভুত চেপে ছিল। যার ফলে সবাইকে বড় মুখ করে বলেছিল, একেবারে বাসর রাতেই গিয়ে স্বামীর মুখ দেখবে! কিন্তু এই সিদ্ধান্তটা যে এত বড় বাঁশ দিবে সেটা ভাবতে গেলেও গা শিউরে উঠছে। একটু শুধু একটু যদি সে টের পেত তাহলে বাস্তবে বিয়ে করা তো দূরে থাক কল্পনাতেও এই উজবুকটাকে বিয়ে করত নাহ। আলো আর সহ্য করতে না পেরে গলা ফা’টিয়ে দিল এক চিৎকার।
-“আয়ায়ায়ায়া…!”
-“এই মেয়ে এমন ষাঁড়নির মতো চেচামেচি করছো কেন? মুখ বন্ধ রাখো, না হলে এক থাপ্পড়ে রুম থেকে বের করে দিবো বেয়াদব মেয়ে!!”
ধমক খেয়ে চুপসে গেল বেচারি। কিন্তু মাথায় একটা কথা কিছুতেই ঢুকছে না, সে এর আগে ষাঁড় নাম শুনেছে, কিন্তু ষাঁড়নি এইটা আবার কোন অঞ্চলের ভাষা? আলো কিছু বলার জন্য মুখ খুলতে যাবে তার আগেই আধার খান গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠলো,,
-“কেউ একজন বলেছিল, তার মামার ছেলের বন্ধুর কাজিনের মেয়ের বড় বোনের বিয়েতে যাচ্ছে! তা মিস কালো, আপনি এখানে কি করছেন? আপনার তো অন্যের বিয়েতে থাকার কথা ছিল, রাইট?”
আলো এখন কি জবাব দিবে কিছু বুঝতে পারছে না। তার মিথ্যে বলার পর এইভাবে হাতে-নাতে ধরা পড়বে সেটা বুঝতে পারেনি। আলো মাথা নিচু করে আমতা আমতা করে কিছু বলার চেষ্টা করল,
-“ইয়ে মানে আসলে স্যার হয়েছেটা কি, মানে না ইয়ে আসলে..”
-“আপনার ইয়ে আপনার কাছেই রাখুন, মিস কালো।”
আলোকে পুরোপুরি কথা শেষ করতে না দিয়ে তার কথার মাঝেই আধার খান ফোড়ন কা’টে। সেটা শুনে মেয়েটি চোখ মুখ কুঁচকে বলে উঠলো,,
-“দেখুন স্যার, মানছি আমি মিথ্যে বলেছি। তার পিছনেও অবশ্য কিছু কারণ রয়েছে আর আমার নাম মিস কালো নয়, আলো রহমান রিক্তা।”
-“আলো না কালো আই ডোন্ট কেয়ার। আমি নাহয় বিয়ের আগে তোমাকে দেখিনি, বাট তুমি নিশ্চয়ই আমাকে দেখেছো? তাহলে এই বিয়েতে রাজি হলে কেন? জানতে না আমি তোমার শিক্ষক? নাকি জেনে শুনেই এমন করেছো?”
-“আমি যদি জানতাম, আমার বিয়ে যার সাথে হচ্ছে সেটা আপনি! তাহলে আপনাকে বিয়ে করা তো দূরে থাক, দরকার হলে সারাজীবন কুমারী থাকতাম! তবুও আপনার মতো লোককে বিয়ে করতাম নাহ।”
আলো মিনমিন করে কথাগুলো বলে আড়চোখে তাকায়, তার বর রূপে বদমেজাজি স্যারের দিকে। আধার খান কিছু সময় গম্ভীর মুখে আলোকে পর্যবেক্ষণ করে ওয়াশরুমে চলে যায়। পরনের সাদা শেরওয়ানি খুলে ছু’ড়ে মে’রে ঝর্ণা ছেড়ে দিয়ে পানির নিচে দাঁড়িয়ে মাথার চুল দু’হাতে খামচে ধরল। মাথায় তার দাউদাউ করে আগুন জ্ব’লছে। একে তো তার দাদাজান তাকে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেল করে বিয়েতে রাজি করিয়েছে, তারওপর যে মেয়েটিকে দু’চোখে সহ্য করতে পারে না, আজ সেই মেয়েটিই কি-না তার বিয়ে করা বউ, আবার তারই ছাত্রী!! ব্যাপারটা হাস্যকর না?
আধার নিজের ভাগ্যের উপর তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে। সে যখনই ভাবে নিজের জীবনটা একটু গুছিয়ে নিবে, ঠিক তখনই কোনো না কোনো ঝড়, তুফান এসে সবকিছু এলোমেলো করে দিয়ে যায়। তার নিষ্ঠুর ভাগ্যটা বড়ই অদ্ভুত। যেটা চায় না, সেটাই পায়! আর যেটা খুব করে চায়, সেটাই হারিয়ে যায় তার একাকীত্ব জীবন থেকে। আধার এসব ভেবে শব্দ করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। অতঃপর একটু সময় নিয়ে গোসল ছেড়ে বেরিয়ে এল।
আলো নিজের মতো বকবক করতে করতে গলায় জড়ানো গহনাগাঁটি খুলতে ব্যস্ত। নিজের ভাগ্যকে দোষ দিবে নাকি নিজেকে দোষ দিবে বুঝতে পারল না। তবে দোষ তার নিজেরই! বিয়ে করবে, বিয়ে করবে বলে লাফাচ্ছিল সে। আর এখন বিয়ে করার পর সব লাফালাফি গাড়ির চাকার মতো পাম্চার হয়ে, ফুঁস করে সব হাওয়া বেরিয়ে গেল! সাথে বিয়ে করার শখও।
-“শা’লার কপাল আমার। কোথাই ভাবলাম বিয়ের পর লাল টুকটুকে সোয়ামির সাথে বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে সুখে শান্তিতে সংসার করব, ঘুরবো-ফিরবো, শপিং করব, কোনো লেখাপড়ার ঝামেলা থাকবে না! কিন্তু নাহ, তা আর হলো কই? ঘাড়ে তো ওই বদমাইশ, বদমেজাজি, উজবুক, শালা বুইড়া স্যার জুটলো! উফফফ…..এখন ভার্সিটির মতো নিশ্চয়ই এখানেও জীবনটা জ্বা’লিয়ে খাবে। ধুর বা’ল ভাল্লাগেনা।”
আলো এইসব বিরবির করে পিছনে ফিরতেই ভুত দেখার মতো চমকে উঠে দুই পা পিছিয়ে যায়। তাড়াহুড়ো করার ফলে ড্রেসিং টেবিলের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে, ধপাস করে চিৎ হয়ে ফ্লোরে পড়ে গেল। লজ্জায় ম’রিম’রি অবস্থা মেয়েটার। শেষে কি-না বাসর ঘরে বরের সামনেই চিৎপটাং। ইশশশ….কি লজ্জার ব্যাপার-স্যাপার! ধ্যাৎ…
মেয়েটি মাথা নিচু করে ধীরে সুস্থে উঠে দাঁড়ায়। লজ্জায় পুরো চেহারা লাল স্ট্রবেরির মতো হয়ে আছে। মনে মনে নিজেকে ভয়ানক একটা গালি দিয়ে ভাবে, “আচ্ছা লোকটা কি সব কথা শুনে নিয়েছে তার?” ইয়া আল্লাহ, যদি তাই হয় তাহলে তার কপালে আজ দুঃখ আছে। আলো সামনে তাকিয়ে দেখে আধার স্যার ভ্রু কুঁচকে তার দিকেই চেয়ে আছে।
-“মুখের ভাষা ঠিক করো। নয়তো চড়িয়ে ঠিক করে দিবো, অসভ্য মেয়ে কোথাকার!”
একথা বলে আলোর পাশ কাটিয়ে ড্রিম লাইট জ্বা’লিয়ে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল। মেয়েটা স্যার নামক বরের দিকে একবার আড়চোখে তাকিয়ে মনে মনে বিরবির করতে করতে নিজের কাজে মন দিল।
শরীরের সব গহনা খুলে পরণের লাল টুকটুকে জামদানী শাড়িটাও টেনেহিঁচড়ে খুলে সোফায় রেখে দেয়! তার আবার শাড়ি-টাড়ি পড়ার অভ্যেস নেই। বিয়ের জন্য খুব শখ করে পার্লারে গিয়ে টানা চার ঘন্টা ধরে সেজেছিল। উদ্দেশ্য ছিল, নতুন বউয়ের মারাত্মক সৌন্দর্য দেখেই যেন বাসর ঘরে বর জ্ঞান হারায়! কিন্তু এখন বরকে দেখে নিজেরই জ্ঞান হারিয়ে উগান্ডায় চলে যেতে ইচ্ছে করছে। লোকটা মাত্রাতিরিক্ত সুদর্শন পুরুষ হলেও উনার শরীরে র’ক্তের চেয়ে অহংকার, জেদই বেশি। সরু নাকের ডগায় সবসময় ইগো লেগেই থাকে। তার মাঝেমধ্যে ইচ্ছে করত—ওই স্যারনামক ইগোওয়ালা ড্রামের সুন্দর নাকের আগা চাপাতি দিয়ে কেটে দিতে। তাহলে হয়তো, একটু ভালো হত!
আলো এসব ভাবতে ভাবতে ব্যাগ থেকে টিশার্ট, প্লাজু বের করে সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। তার আজ মনমেজাজ একটুও ভালো নেই। কোথায় একটু মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে তাকে বোঝাবে, এই বিয়েটা মেনে নেওয়ার জন্য! কিন্তু নাহ, উল্টো তারউপর-ই চিল্লাফাল্লা করছে। এই জন্যই বলে অতি আশা করতে নেই। নাহলে এইভাবেই মুখ থুবড়ে পড়তে হয়। তাও স্যার ওরফে পঁচা গোবরের মধ্যেই!
ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এসে পিঠ পর্যন্ত কার্ল করা চুলগুলো ছেড়ে দিয়ে সোফায় গিয়ে শুয়ে পড়ল। ওই লোকটার সাথে একই বিছানায় শোয়ার কোনো ইচ্ছে নেই তার। তবে, এর পিছনেও একটা কারণ রয়েছে। তার শুয়ে থাকার কোনো ছিঁড়ি নেই! ঘুমের ঘোরে মুখের থেকে হাতপা বেশি চলাচল করে। একবার তো ঘুমের মধ্যে তার কাজিনের নাক ফাটিয়ে দিয়েছিল ঘুষি মে’রে। তারপর থেকে তার সাথে একি বিছানায় কেউ-ই থাকতে চায়না। বিশেষ করে তার ছোট বোন ছায়া। তার থেকে তিন বছরের ছোট হবে। এইবার ছায়া ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে আর সে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। যৌথ পরিবারের খুব আদরের সন্তান সে। বড় মেয়ে হয়েও ভীষণ চঞ্চল! আর হবেও না কেন? সবার এত এত ভালোবাসায় নিজেকে সবসময় খোলা আকাশের মুক্ত পাখি ভেবে এসেছে। যেটা মন চায়, সেটাই করে। আর যেটা করতে ইচ্ছে করবে না, সেটা অন্যরা হাজারবার বললেও করবে না। আফটার অল সে নিজ মর্জিতে চলতে বেশি পছন্দ করে। আর এটাই আজ তার জীবনের কাল হয়ে দাঁড়াল! ভবিষ্যতে আরো কি কি দেখতে হবে, খোদা জানে। আলো এসব আকাশপাতাল ভাবতে ভাবতে একসময় ঘুমিয়ে যায়।
হঠাৎ করে মাঝরাতে কিছু ধপাস করে পড়ে যাওয়ার শব্দে আধারের ঘুম ভেঙ্গে গেল। সে তড়িঘড়ি করে উঠে বসল এবং আশেপাশে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করল কোথায় থেকে শব্দটি এসেছে। ড্রিম লাইটের ঝাপসা আলোয় সবকিছু স্পষ্ট দেখতে না পেয়ে বিছানায় থেকে নেমে রুমের বড় লাইট অন করে দিল। ঠিক তখনই তার চোখ গেল, অদূরে সোফার নিচে সাদা টাইলসের মেঝেতে উবুড় হয়ে বেঘোরে ঘুমিয়ে থাকা মেয়েটির দিকে।
লাল প্লাজু হাঁটুর ওপর উঠেছে, সঙ্গে কালো টিশার্টও কোমরের উপর উঠে রয়েছে। ফলস্বরূপ, ফর্সা দুটো পা ও ধনুকের মতো বাঁকানো সাদা কোমর উন্মুক্ত হয়ে আছে। এই দৃশ্যটা দেখে ভ্রু কুঁচকে গেল আধারের! এতো বড় দামড়ি মেয়ের ঘুমানোর স্টাইল দেখে অবাক না হয়ে পারল না। রীতিমতো তার হাসি পাচ্ছে। সোফায় থেকে ফ্লোরে পড়ে গেছে, অথচ ঘুম ভাঙ্গলো না ম্যাডামের।
আধার দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ধীর পায়ে এগিয়ে এসে নিচে পড়ে থাকা রমণীর পাশে হাঁটু গেড়ে বসল। ঘুমন্ত মেয়েটির টিশার্ট ও প্লাজু ঠিক করে দিতে চেয়েও কিছু একটা ভেবে উঠে দাঁড়াল। পিছনে ফিরে বিছানার পাশে থাকা টি-টেবিলের উপর থেকে পানি ভর্তি জগটা নিয়ে এসে সব পানি রমণীর মাথার ওপর ঠাস করে ঢেলে দিল।
আচমকা এমন হওয়ায় মেয়েটি ভয় পেয়ে হুড়মুড় করে লাফ দিয়ে উঠে বসতে বসতে চেঁচিয়ে উঠলো,
-“বৃষ্টি, বৃষ্টি, বৃষ্টি! আমি ভিজে গেলাম বৃষ্টির পানিতে।”
পর মূহুর্তে ভাবল—বৃষ্টির পানি কই থেকে পরবে? সে তো রুমে শুয়ে আছে, তাহলে? আলো মনে মনে এসব ভেবে একহাতে মুখের পানি মুছে সামনে তাকাতেই ভরকে গেল। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে অবাক কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,,
-“পানি কেন দিয়েছেন?”
-“নিচে পড়ে গিয়েছিলে, তাই উঠানোর জন্য ঘুম ভাঙালাম!”
স্যারের সোজাসাপটা উত্তর শুনে আলো আহাম্মক,
হতবাক, হতবিহ্বল, নির্বাক হয়ে গেল। একজন ঘুমন্ত মানুষকে জাগিয়ে তোলার জন্য কি-না মুখে পানি ছুঁ’ড়ে মা’রবে? তাও এই মধ্য রাতে? এটা কোন ধরনের কথা?
