Home এক মুঠো চাঁদের আলো এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৩৬

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৩৬

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৩৬
নুসরাত ফারিয়া

সপ্তাহখানেক পর আজ ভার্সিটিতে পা রেখেছে আলো। মানুষটা তাকে এখনই আসতে দিতে চায়নি, বাড়িতে আরো কিছুদিন রেস্ট নিতে বলেছিল। কিন্তু সে শোনেনি বারণ! না জানিয়েই একা একা চলে এসেছে। কারণ বন্ধুমহলের জন্য তার মনটা ছটফট করছে। ইশশ! কতদিন হয়ে গেল কাউকে দেখে না, কথা বলে না, আড্ডা দেয় না, হাসি মজাও করে না। আচ্ছা, সবাই কী তাকে ভুলে গিয়েছে? নাকি বড্ড অভিমান করে আছে? জানা নেই আলোর। তবে তার খুব কষ্ট হচ্ছে। কারণ সে একই ক্লাসে আছে আর তার বন্ধুমহলেরা এগিয়ে গেছে। এইভাবে হুট করে তার জীবন থেকে দেড় বছর না গেলেও পারত!
আলো আড়ালে চোখের পানি মুছে, দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ব্যাগ চেপে ধরে এগিয়ে যেতে লাগল। এই ভার্সিটিতে তার কত কত পুরোনো স্মৃতি রয়েছে। অথচ আজ সবকিছু কেমন জানি নতুন নতুন লাগছে। চেনা জিনিসও অচেনা হয়ে গেছে। ক্যাম্পাসে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎই আলোর পা জোড়া শ্লথ হয়ে যায়। ওই তো তার প্রিয় মানুষজন! সবাই একসাথে বসে থেকে কিছু একটা নিয়ে কথা বলছে আর হাসাহাসি করছে। আলো দূর থেকে অপলক নয়নে সবাইকে দেখে নিল। তারপর আস্তেধীরে কাছে এগিয়ে এল।
এতদিন, এত মাস পর বান্ধবীকে দেখে সবার মুখের হাসি গায়েব হয়ে গেল। মূহুর্তেই সকলের মাঝে পিনপতন নীরবতা ছেয়ে যায়। আলো এতিওতি তাকাতে তাকাতে অস্ফুটস্বরে জিজ্ঞেস করল,

-“ক…কেমন আছিস তোরা?”
শালুক তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,
-“এত মেয়ে দেখেছি, কিন্তু তোর মতো স্বার্থপর, বেইমান মেয়ে দেখিনি।”
আলোর কান্না পেলেও সে নিজেকে সামলে নিয়ে তামান্নার দিকে তাকায়। তামান্না মুখ সরিয়ে নিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
-“আমাদের কাছে এসেছিস কেন? তোর স্বামীর কাছে যা, আর বিদেশেই থাক। আমরা কে হই তোর? কেউ না, আর না তুই আমাদের কেউ হোস। তুই যেমন বিদেশের মাটিতে পা রাখতে না রাখতে ভুলে গেছিস আমাদের, আমরাও ঠিক তেমন ভুলে গেছি তোকে।”
-“তোরা যেমনটা ভাবছিস তেমন নয়! আসলে আমি এতদিন কো…।”
আলোকে সম্পূর্ণ কথা শেষ করতে না দিয়ে ফারাহ্ বলে উঠল,
-“হয়েছে থাক, তোকে এখন আর অজুহাত দিতে হবে না। আমাদের কাছে এত ফাও টাইম নেই যে, তোর বাহানা শুনবো। আমরা অনেক আগেই তোকে ভুলে গেছি। এখন তুই থাক তোর মনে, আর আমাদেরকে থাকতে দে আমাদের মনে। এই চল!”
কথাগুলো বলে ফারাহ্ সবাইকে নিয়ে সেখান থেকে চলে যায়। নির্ঝর ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে এক জোড়া অশ্রুসিক্ত নয়নের দিকে তাকিয়ে ধীর কণ্ঠে বলল,

-“আমাদেরকে এইভাবে পর না করে দিলেও পারতিস!”
আলোর এক চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। তার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করল—আমি তোদেরকে পর করে দেইনি, পরিস্থিতি আমাকে তোদের থেকে পর করে দিয়েছে। আমি কখনোই ভুলে যাইনি তোদেরকে। কখনোই যাইনি! আমি স্বার্থপর, বেইমান নই রে, একটুও নই।
একহাতে মাথা চেপে ধরে বেঞ্চের ওপর ধপ করে বসে পড়ল আলো। বড্ড ব্যথা করছে! আজকাল বেশি মানসিক চাপ নিতে পারে না। একটুতেই মাথা ব্যথা শুরু হয়ে যায়। এটার জন্য নিয়মিত ঔষধও খাচ্ছে। ডক্টর বলেছেন, পুরোপুরি সুস্থ হতে আরো কিছুদিন সময় লাগবে। এরমধ্যে অতিরিক্ত টেনশন কিংবা মানসিক চাপ না নিতে। তারজন্যই সে এতদিন ভার্সিটিতে আসেনি। সে সবাইকে অনেকবার কল, এসএমএস দিয়েছিল। কিন্তু কেউ রিসিভ করেনি, এমনকি সামান্য এসএমএস পর্যন্ত সীন করার প্রয়োজন মনে করেনি। এসব ভেবে হাসল আলো। তার পরিবার সবার কথা ভেবে কিছু জানায়নি, অথচ আজ তার এত বছরের বন্ধুত্ব এক মূহুর্তেই শেষ হয়ে গেল। আলো কিছুক্ষণ একা বসে থেকে পানি খেয়ে উঠে চলে গেল। তার ইয়ার লস হয়েছে। ফলস্বরূপ আগের বর্ষেই রয়ে গেছে।

-“তুমি এখানে?”
আলো অন্যমনষ্ক হয়ে ফাঁকা করিডোর দিয়ে হাঁটছিল। এইসময় তার ক্লাস থাকলেও একা এতিমের মতো ক্লাসে যেতে ইচ্ছে করছে না। এই নতুন ক্লাসে পরিচিত নেই তার! আর না কাউকে চেনে। তাই সে একা একাই ঘুরছে। তখন খুব চেনা পুরুষালী কণ্ঠস্বর শুনে মুখ তুলে সামনে তাকায়। তার থেকে কিছুটা দূরে আধার স্যার কপাল কুঁচকে দাঁড়িয়ে আছে। আলো হঠাৎই রেগে যায়। সে অদূরে পানির বোতল ছুঁড়ে মে’রে চিল্লিয়ে বলে উঠল,
-“আমি কোথায় আসব নাকি আসব না, সেটার জন্য এখন আপনাকে কৈফিয়ত দিতে হবে? নাকি আপনার থেকে অনুমতি নিতে হবে?”
আধার কিছুক্ষণ চুপ থেকে এগিয়ে এসে দু’হাতের আঁজলায় আলোর চেহারা ধরে শান্ত গলায় বলল,

-“আমি কখনোই তোমাকে বন্দী জীবন দিতে চাইনি, আর না ভবিষ্যতে দিবো। তুমি আগে যেমন মুক্ত পাখি ছিলে, এখনো তাই রয়েছো। শুধু তোমার জীবনের সাথে এখন এই আমিটা জড়িয়ে গেছি। তুমি চাও বা নাও চাও, এই পুরো তুমি-টার খেয়াল রাখার দায়িত্ব আমার। আর সেখানে শুধু একবার কেন? আমি হাজারবার কৈফিয়ত চাইবো।”
প্রতিত্তোরে আলো কিছু বলল না। শুধু স্বামীর বুকের মাঝে মুখ লুকিয়ে রাখল। আধার একহাতে আলিঙ্গন করে, অন্য হাতে মাথা বুলিয়ে দিতে দিতে জানতে চাইল,
-“শরীর খারাপ লাগছে?”
-“উঁহু৷ আমি ঠিক আছি!”
একটু থেমে পুনরায় বলল,
-“সরি! আসলে আমি এমন রিয়াক্ট করতে চাইনি।”
আধার ঝুঁকে কপালের মাঝে ঠোঁট ছুঁয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
-“ইট’স ওকে। আমি কিছু মনে করিনি।”

আলোর ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল। অথচ তার চোখদুটো টলমল করছে। আধার হয়তো মেয়েটার চোখের ভাষা বুঝতে পারল। তাই তো সে কথা ঘুরানোর জন্য গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
-“এখানে এসেছো ভালো কথা! তাহলে ক্লাস না করে টইটই করে ঘুরছো কেন? লিসেন, মিস কালো! ক্লাস ফাঁকি দিলে সোজা পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দিবো৷ তখন বসে থেকে বাদাম খেও আর আফসোস কইরো।”
অন্য সময় হলে আলো এটা নিয়ে ঝগড়া শুরু করত। কিন্তু এখন তার কিছু ভালো লাগছে না। তাই সে কথা না বাড়িয়ে বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নাড়িয়ে বলল,
-“ঠিক আছে স্যার। আমি ক্লাসে যাচ্ছি! আপনাকে কষ্ট করে আর ফেল করাতে হবে না।”
আধার ঠোঁট কামড়ে হেঁসে বলল,

-“দ্যাটস লাইক আ গুড গার্ল!”
আলো মলিন হেঁসে পিছনে ঘুরে চলে গেল ক্লাস রুমের দিকে। আর আধার কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে সেও চলে গেল একটা ক্লাসের দিকে।
-“স্টপ গাইস!”
শালুক, তামান্না, ফারাহ্, নির্ঝর ও মারুফ ক্লাস শেষ করে একসাথে সিঁড়ি বেয়ে নামছিল। তখন পিছন থেকে স্যারের গম্ভীর কণ্ঠস্বর শুনে সবাই থেমে যায় এবং ঘুরে দাঁড়ায়। তামান্না শান্ত গলায় বলল,
-“জ্বি স্যার? কিছু বলবেন?”
আধার দু’হাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে ধীর কণ্ঠে বলল,
-“তোমরা আলোকে ভুল বুঝছো। তোমাদের ধারণারও বাইরে, তার সাথে কী ঘটেছিল!”
স্যারের কথা শুনে সবার কপাল কুঁচকে যায়। শালুক তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল,
-“স্যার আপনি হয়তো আসল ঘটনা জানেন না। তাই এমন কথা বলছেন! ওই স্বার্থপর মেয়ে তার বিদেশি স্বামীর কাছে গিয়ে আমাদেরকে ভুলে গেছে। সামান্য একটা ফোনকলও দেয়নি। আমরা কতটা ছটফট করেছি জানেন? ওর পরিবারকে কল দেওয়ার পর এসব জানতে পারি। আমরা যেতে চেয়েছিলেন ওর বাড়িতে, কিন্তু যখন জানলাম ও দেশেই নেই তখন আর যাইনি। শুধু শুধু ওর পরিবারকে হয়রানি করে কি লাভ?”

-“তোমাদের এটা সত্যিই মনে হয়, আলো এমনটা করবে? অন্তত তোমাদের সাথে?”
পাশ থেকে ফারাহ্ বলল,
-“মনে হয় না স্যার! কিন্তু ও নিজেই এমনটা মনে করাতে আমাদেরকে বাধ্য করিয়েছে। দেশের বাইরে থাকাকালীন প্রতিদিন না-হয়, সপ্তাহে একবার করে আমাদেরকে কল দিত! কিন্তু ও সেটাও করেনি। তাহলে কেন এখন ওর কথা আমরা ভাববো? যেখানে আমাদের কথাই ও ভাবেনি। দিনশেষে স্বামীকে পেয়ে আমাদের বন্ধুত্ব ভুলে গেছে।”
আধার দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে উঠল,
-“তোমরা ভুল করছো! আই রিপিট ভুল করছো। আলো কখনোই তোমাদেরকে ভুলেনি, শুধু পরিস্থিতিটা খারাপ ছিল। আর তোমরা যেটা জানো, সেটা সম্পূর্ণই ভুল। মেয়েটা কখনো দেশের বাইরে যায়নি। সে এই দেশেই ছিল!”
স্যারের কথা শুনে সবাই চমকে উঠল। মারুফ কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,

-“ও যদি এখানেই থাকত, তাহলে আমাদের সাথে যোগাযোগ রাখেনি কেন? আর ওর পরিবার কেন মিথ্যে বলল?”
-“তোমাদের কথা ভেবে সত্যি কথা বলেনি। আর এটাই ভুল হয়েছে উনাদের। শুরু থেকে যদি তোমরা আসল কথা জানতে, তাহলে হয়তো এখন এমন ভুল বুঝতে না। যাইহোক! যা হবার তাই হয়ে গেছে। আমি জাস্ট এটা বলতে এসেছি, তোমাদের বান্ধবী এক বছর কোমায় ছিল এবং ছয় মাস রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারে ভর্তি ছিল। এই তো কিছুদিন আগেই বাড়িতে ফিরেছে। তোমাদের জন্য আরেকটা নিউজ রয়েছে! আলোর ভাই রহিত ও তার ওয়াইফ মেঘলা আর এই দুনিয়ায় নেই। দেড়বছর আগে কার এক্সিডেন্টে মা’রা গিয়েছে এবং তোমাদের বান্ধবী সোজা কোমায় যায়। তোমরা ঠিকই বলেছো, মেয়েটা খুব স্বার্থপর! নাহলে কি সবাইকে ছেড়ে একা হাসপাতালের বেডে দিনের পর দিন জীবন্ত লা’শের মতো থাকতে পারত?”
স্যারের বলা কথাগুলো শুনে পাঁচজনের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল। তারা অবিশ্বাস চোখে স্যারের দিকে তাকিয়ে আছে। একটু আগের বলা বাক্যগুলো ঠিক হজম করতে পারছে না। তারা এটা কল্পনাও করতে পারেনি। মেয়েটা এতদিন কোমায় ছিল, অথচ তারা ভুল বুঝে কতকিছুই না বলেছে।
তামান্না তো মুখ চেপে ধরে নীরবে কেঁদে দিয়েছে। সবার চোখেই অশ্রু টলমল করছে। কারণ কেউই এমনটা ভাবতে পারেনি৷ নির্ঝর কোনোমতে নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
-“কিন্তু, আপনি এতকিছু কীভাবে জানলেন?”
আধার পাশ কাটিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে যেতে যেতে বলে উঠল,
-“আমিই ওর হাসব্যান্ড! অ্যান্ড শি ইজ মাই ওয়াইফ।”

আলো ক্লাস শেষে বাগানে বসে থেকে বই পড়ছিল। তখন খেয়াল করল তার বন্ধুমহলের সবাই এসে পাশে বসেছে। তবুও সে কিছু বলল না, চুপচাপ বই পড়তে থাকল।
-“আলো?”
তামান্নার ডাকে আলো সাড়া দিল,
-“বলুন সিনিয়র আপু।”
তামান্না, শালুক, ফারাহ্ কিছু না বলে হঠাৎই মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরে ফুপিয়ে কেঁদে উঠল। এতে আলো হকচকিয়ে গেলেও পরক্ষণে নিজেকে সামলিয়ে নিল। মারুফ ধরা গলায় বলল,
-“আমরা কখনো ভাবতে পারিনি এমন কিছু ঘটে যাবে। তবুও আমাদের ব্যবহারের জন্য সরি, খুব সরি।”
আলো ফিচেল হেঁসে বলল,
-“একজন স্বার্থপর, বেইমান মেয়ের কাছে সরি চাইতে হবে না। নয়তো দেখা যাবে, সে আবারো আপনাদেরকে ভুলে গিয়েছে।”
শালুক শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ফিসফিসিয়ে বলল,

-“সরি, আমি খুব সরি। হুট করে আমাদের এই দূরত্ব মানতে পারিনি, তোর ওপর ভীষণ অভিমান হয়েছিল। তাই তখন রাগের মাথায় উল্টাপাল্টা কথা বলে ফেলেছি। তুই তো জানিস, আমি বুঝি কম আর চিল্লাই বেশি। প্লিজ আমাকে ক্ষমা করে দে। আমি আর কখনো তোকে ভুল বুঝবো না, কখনোই না।”
আলো চোখের পানি মুছে হেঁসে বলল,
-“ঠিক আছে, দিলাম ক্ষমা করে। এখন তিন মটকি ছাড় আমাকে। নয়তো তোদের চাপে আবারো কোমায় চলে যাবো।”
তিনজন ছেড়ে দিল আলোকে। ফারাহ্ চোখমুখ মুছে অভিমানী কণ্ঠে বলল,
-“আধার স্যার যে তোর স্বামী হয়, সেটা আমাদেরকে বলিসনি কেন?”
আলো মাথা চুলকিয়ে হাসার চেষ্টা করল। সে আগেই বুঝতে পেরেছে, ওই লোকটাই সবকিছু বলে দিয়েছে৷ কিন্তু এটাও যে বলেছে সেটা বুঝতে পারেনি। সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে সবটা বুঝিয়ে বলল। সবকিছু শুনে নির্ঝর আফসোসের সুরে বলল,

-“আহ! দিনশেষে কি-না তোর কপালে ওই নিরামিষ, বদমাইশ স্যারটাই জুটলো? নিশ্চয়ই বাড়িতেও তোর পায়ে সাথে পা মিলিয়ে ঝগড়া করে। আস্ত একটা নিমপাতা রসের মতো খাট্টাশ লোক! তুই এইটাকে সহ্য করিস কীভাবে? আমি তোর জায়গায় থাকলে, নির্ঘাত পাগল খানায় ভর্তি হয়ে যেতাম।”
আলো শব্দ করে হেঁসে উঠে বলল,
-“ওই লোকটা যদি বুনো ওল হয়, তাহলে আমিও বাঘা তেঁতুল হুহ্।”
-“বুনো ওল নয়, বল—করলা, নিমপাতার রস। সাথে মাছ, মাংস ছাড়া নিরামিষ তরকারি।”
আলো তামান্নার পিঠে চাটি মে’রে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
-“একদম আমার স্বামীকে নিয়ে মজা করবি না। নয়তো উনাকে বলে পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দিবো তোদেরকে।”
ফারাহ্ হেঁসে উঠে বলল,
-“দেখা যাবে তোকেই ফেল করে দিয়ে বসে আছে, তোর ব্যক্তিগত পঁচা স্যার।”
আলো হেঁসে আনমনে বলে উঠল,
-“উনি পঁচা নয়! খুব, খুউউউব ভালো। আর আমার বেস্ট স্যার, উঁহু…বেস্ট হাসব্যান্ড!”

অনেকদিন পর আজ সবার সাথে একটু আড্ডা দিয়ে বাড়িতে ফিরে এসেছে আলো। গোসল করে, নামাজ পড়ে নিচে নেমে এল। বাইরে থেকে খেয়ে আসায় খিদে নেই তার। শুধু এক মগ কফি বানিয়ে নিল। দাদাজানের সাথে দেখা করে এসে দোতলায় উঠার সময় তাহমিনা খান এসে বলে উঠলেন,
-“আজ সন্ধ্যায় তিথিকে পাত্রপক্ষ দেখতে আসবে। সব রান্নার দায়িত্ব তোমাকে দেওয়া হলো। আশা করছি পালন করবে।”
আলো পিছনে ফিরে মাথা নাড়িয়ে বলল,
-“ঠিক আছে মা। আমি সবকিছু দেখে নিবো।”
তাহমিনা খান আর কিছু না বলে চলে গেলেন। রাত সকালেই বোনকে আনতে গিয়েছে। সে আপাতত একটা কোম্পানিতে জব করছে। তবে বেতন দিয়ে তার হচ্ছে না। আগের হাত খরচের কাছে এই সামান্য বেতন তার কাছে কিছুই না। তবুও বড় ভাইয়ের থেকে আর একটা টাকাও নেয়নি। এখন থেকে নিজের খরচ নিজেই চালাবে। হাজার কষ্ট হলেও আর কখনো বড় ভাইয়ের কাছে হাত পাতবে না।

আলো বিকেল থেকেই রান্নার কাজে নেমে পড়েছে। তাকে সাহায্য করছে শেফালি চাচি। এতগুলো রান্না করার সময় কয়েকবার ছ্যাঁকা খেয়েছে, আবার গরম তেলও ছিটকে পড়েছে। তবুও মেয়েটা মুখ বুঁজে নিজের দায়িত্ব পালন করে গিয়েছে। কারণ সংসারে এমন হবেই৷
সন্ধ্যার দিকে সবকিছু কমপ্লিট করে নিজের রুমে যায় আলো। এতক্ষণ রান্নাঘরে থাকার ফলে ঘেমে একাকার হয়ে গেছে। মাথায় থেকে পেঁচিয়ে রাখা ওড়না খুলে জামাকাপড় নিয়ে দ্রুত ওয়াশরুমে ঢুকে গেল৷ গোসল না করলে আর সে শান্তি পাবে না।
অন্যদিকে, সবে ফিরেছে আধার। দোতলায় উঠার সময় রান্নাঘরে একবার উঁকি দিয়েছে। মেয়েটাকে দেখতে না পেয়ে সোজা রুমে চলে এল। ব্যাগ, কোট রেখে হাতের ঘড়ি খুলে ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখল। এখানেও আলোকে দেখতে না পেয়ে ভাবল, হয়তো দাদাজানে কাছে আছে। তাই সে টি-শার্ট, ট্রাউজার নিয়ে শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে ওয়াশরুমের ভেতর ঢুকে গেল। এবং সঙ্গে সঙ্গে স্তম্ভিত হয়ে যায়।
আলো নিজের মতো করে শাওয়ার নিয়ে, চেঞ্জ করে তোয়ালে দিয়ে মাথার চুল পেঁচিয়ে, পিছনে ফিরতেই চারশো চার বোল্ডের ঝটকা খেল। কৌটার ভেতর থেকে চক্ষুদ্বয় বেরিয়ে আসার উপক্রম তার। সে কয়েক কদম পিছিয়ে গিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,

-“আ-আপনি! আপনি কখন এলেন? আর এখানে কী?”
আধার দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে চোখ বুজে নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে বিরবির করে বলল,
-“ওয়াশরুমের দরজা খুলে যদি শাওয়ার নাও, তাহলে এতে আমার কী দোষ?”
-“ত…তাই বলে এইভাবে দাঁড়িয়ে থাকবেন?”
-“তো কী তোমার সাথে শাওয়ার নিতাম?”
আলো দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
-“অসভ্য লোক কোথাকার।”
আধার বৃদ্ধা আঙুল দিয়ে কপাল স্লাইড করতে করতে বিরবির করল,
-“অসভ্য যদি হতাম, তাহলে এতক্ষণ নিজ পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারতে না।”
আলো শুনতে না পেয়ে জিজ্ঞেস করল,
-“কী বলছেন বিরবির করে?”
আধার সোজা হয়ে নিচ থেকে টিশার্ট, ট্রাউজার তুলে নিয়ে বলল,

-“নাথিং! তুমি একবার আমাকে গোসল করতে দেখেছিলে আর আজ আমি দেখলাম। হিসাব বরাবর মিসেস খান!”
আলোর শরীরটা জ্বলে উঠল। সে রাগে, লজ্জায় গজগজ করতে করতে বেরিয়ে আসার সময় শুনতে পেল,
-“নেক্টস টাইম যদি এমন ভুল করো, তাহলে তোমাকে সাগরে নিয়ে গিয়ে চুবানি দিবো মিস. কালো!”
আলো চট করে পিছনে ফিরে মাথার তোয়ালে খুলে লোকটার মুখের ওপর ছুঁড়ে মে’রে ঝাঁঝাল কণ্ঠে বলল,
-“আপনিও যদি আবার এমন করেন, তাহলে আপনার ওই সুন্দর চোখদুটো তুলে নিবো আমি।”
আধার কিছু না বলে হ্যাচকা টানে আলোকে নিজের কাছে নিয়ে এসে দরজার সাথে চেপে ধরল। এবং কানের লতিতে ঠোঁট ছুঁয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,

-“আজ শুধু দেখেছি, পরেরবার এমনটা নাও করতে পারি। তাই আগে থেকেই সাবধান করে দিলাম। বাই দ্য ওয়ে…এত সুন্দর একটা সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য থ্যাংকস জান!”
বলেই রক্তিম গালে দুটো চুমু খেল। আলো লজ্জায় পারছে না মাটির নিচে ঢুকে যেতে। সে কোনোমতে লোকটাকে দূরে সরিয়ে দিয়ে তড়িঘড়ি করে চলে আসার সময় কার্পেটে পা লেগে ধপাস করে উল্টে পড়ল। আলো বিরক্তিতে চোখমুখ কুঁচকে একটা গালি দিল। সব অঘটন আজ তারই সাথে ঘটছে, ধ্যাৎ!
আলোকে পড়ে যেতে দেখে আধার ছুটে এসে বাহু ধরে তুলে জিজ্ঞেস করল,
-“ব্যথা পেয়েছো?”
আলো মুখ সরিয়ে নিয়ে বলল,
-“না।”

আধার কিছু না বলে আলোকে ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসিয়ে দেয়। তারপর খুব যত্নের সাথে ভেজা চুলগুলো মুছে দিতে লাগল। হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে শুকিয়েও দিল। এত সময়ের মধ্যে আলো ভুলেও মুখ তুলে আয়নায় তাকায়নি। আধার নিজের কাজ শেষ করে এইড বক্স থেকে মলম নিয়ে এসে, আলোকে ঘুরিয়ে তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। কোমল দু’হাত নিজের হাতের মাঝে নিয়ে শান্ত গলায় বলল,
-“তোমাকে রান্না করতে মানা করেছিলাম।”
আলো একপলক নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেঁসে বলল,
-“আমি ঠিক আছি, আর সংসার করতে গেলে এমনটা হবেই। আপনি চিন্তা করবেন না!”
আধার দু’হাতে মলম লাগিয়ে দিয়ে বলল,
-“রান্না করার সময় সর্তক থাকবে এবং সাবধানে কাজ করার চেষ্টা করবে, ঠিক আছে?”
আলো ভদ্র মেয়ের মতো মাথা নাড়িয়ে বলল,
-“ঠিক আছে।”

সময় অতিবাহিত হয়ে যায়। তিথিকে দেখতে পাত্রপক্ষরা চলে এসেছে। তাদেরকে আপ্যায়ন করতে ব্যস্ত তাহমিনা খান। ড্রয়িংরুমে সকলে বসে আছে। সোবহান খান টুকটাক কথা বলছেন! আধার, রাতও মাঝেমধ্যে শুধু হু, হ্যাঁ করছে।
শেফালি চাচি নাস্তার প্লেটগুলো নিয়ে এসে টি-টেবিলের ওপর সাজিয়ে রাখেন। তাহমিনা খান আলাপআলোচনা করার সময় খেয়াল করলেন, আলো তিথিকে নিয়ে আসছে। মেয়েকে দেখে হাসিমুখে বললেন,
-“ওই তো আমার মেয়ে আসছে।”
উনার কথা শুনে সবাই দোতলায় তাকায়। তিথির পরণে বেবি পিংক রঙা জামদানী শাড়ি। ফর্সা চেহারায় তেমন কোনো আহামরি সাজ নেই, মাথায় এক হাত ঘোমটা দেওয়া। আধার আলোকে যেভাবে চলতে বলেছিল আলো ঠিক ওইভাবেই চলছে৷ সুতির বড় ওড়না হিজাবের মতো করে পরে আছে। শুধু ফর্সা চেহারা উন্মুক্ত!
ভদ্রমহিলা মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থেকে অস্ফুটস্বরে বলে উঠলেন,
-“মাশাআল্লাহ, মাশাআল্লাহ।”

আলো তিথিকে নিয়ে সবার সামনে সোফায় বসিয়ে দিল। তারপর দুজনেই সুন্দর করে সালাম করল। পাত্রসহ তার ভাই, মা-বাবা ও চাচা চাঁচি এসেছে। সাথে উনাদের একমাত্র মেয়েও আছে। যে কি-না ঘুরেফিরে শুধু এ বাড়ির বড় ছেলের দিকে তাকাচ্ছে। যেটা আলো অনেকক্ষণ ধরেই লক্ষ্য করছে!
সোবহান খান যখন আলোকে সবার কাছে পরিচয় করে দিল, তখন অজান্তেই দু’জন ব্যক্তি চমকে উঠল। আলোর অন্য দিকে খেয়াল না থাকলেও সে ওই মেয়েটার চেহারা দেখে বেশ মজা নিচ্ছিল। কোনোমতে হাসি চেপে রেখে দ্রুত পায়ে রান্নাঘরে এসে খিলখিল করে হেঁসে ওঠে। ইশশ, বেচারি মেয়েটার দিল টুট গেয়া!
বিয়ে নিয়ে কথাবার্তার একপর্যায়ে এসে ঠিক হলো আগামী মাসে দিন-তারিখ ঠিক করা হবে। তারপর অনিমেষ ও তিথির বিবাহ। আলো হাসিমুখে মিষ্টি নিয়ে গিয়ে সবাইকে মিষ্টিমুখ করালো। তারপর প্লেটে করে মিষ্টি নিয়ে করিডোরে গেল।
ফোনকল আসায় আধার এখানে এসে কথা বলছিল। তখন পাশে কারোর অস্তিত্ব অনুভব করে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই আলো টুপ করে মুখের ভেতর মিষ্টি পুরে দিল। মেয়েটার এহেন কাজে আধারের চোখদুটো বড়বড় হয়ে যায়। আলো স্যারের থমথমে চেহারা দেখে ফিক করে হেঁসে দেয়। সে হাসতে হাসতে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই আধার কোমর চেপে ধরে নিজের সামনে নিয়ে এল। আলোর মুখের হাসি গায়েব হয়ে গেল, সে ড্যাবড্যাব করে মুখ তুলে সামনে তাকায়। আধার মাথা নিচু করে আলোর মুখের সামনে মুখ নিয়ে এসে ইশারায় মিষ্টি নিতে বলল! অন্যদিকে, ফোনের অপর প্রান্ত থেকে একজন ব্যক্তি হ্যালো, হ্যালো করেই যাচ্ছে। আলো উপায় না পেয়ে মুখ বাড়িয়ে এক বাইটে অর্ধেক মিষ্টি নিয়ে সেখান থেকে চলে যায়। আর আধার আনমনে হেঁসে ঠোঁট মুছে, অর্ধেক মিষ্টি খেয়ে ফোনে কথা বলতে শুরু করল।

ডিনার শেষে সব মেহমানরা বিদায় নিয়ে চলে যায়। তাহমিনা খান আজ বেশ খুশি৷ তিনি মনের মতো মেয়ের জন্য পাত্র পেয়েছে, সাথে বড়লোক পরিবারও। আলো রান্নাঘরের সবকিছু গুছিয়ে রেখে ভেজা হাত ওড়নায় মুছতে মুছতে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠল। নিজের রুমের দিকে যেতে চেয়েও কিছু একটা ভেবে তিথির রুমের দিকে গেল। সে শুরু থেকে খেয়াল করেছিল, মেয়েটার মন খারাপ! আর কিছু জিজ্ঞেস করার সুযোগও হয়ে ওঠেনি। তাই এখন যাচ্ছে একটু কথা বলতে।
রুমের দরজা চাপানো ছিল। আলো আস্তে করে দরজা খুলে ভেতরে মাথা ঢুকিয়ে উঁকি দিল। এবং সঙ্গে সঙ্গে চমকে উঠল। ফ্লোরের মাঝে শাড়ি, চুড়ি, জুয়েলারি এলোমেলো ভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। বিছানার মাঝে তিথি উবুড় হয়ে বালিশে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। আলো দ্রুত ভেতরে প্রবেশ করে তিথির পাশে বসে মাথায় হাত রেখে অস্থির গলায় জানতে চাইল,

-“কি হয়েছে তিথি? তুমি এইভাবে কাঁদছো কেন?”
ভাবীর কণ্ঠস্বর শুনে তিথি উঠে বসে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
-“আ…আমি এই বিয়ে করব না ভাবী। কিছুতেই করব না।”
মেয়েটার কথা শুনে আলোর কপাল কুঁচকে গেল। সে জিজ্ঞেস করল,
-“কেন করবে না? আর পাত্রসহ পরিবারও বেশ ভালো। তাহলে?”
তিথি কিছু না বলে নীরবে চোখের পানি বিসর্জন দিতে থাকল। আলো কাঁধে হাত রেখে শান্ত গলায় বলল,

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৩৫

-“আজ হোক বা কাল, তোমাকে বিয়ে দিতেই হবে। সেখানে এখন করলে কী সমস্যা? তুমি ওই শাহ্ পরিবারে সুখী হবা। এই বিয়েতে সবারই মত রয়েছে। এমনকি তোমার বড় ভাইয়ারও। তবুও যদি তোমার আপত্তি থাকে, তাহলে এইভাবে না কেঁদেকুটে সবাইকে বলো। আশা করছি সবাই তোমাকে বুঝবে। আর লেখাপড়া নিয়েও কোনো সমস্যা নেই৷ ভাইয়া ও উনার পরিবারের সবাই তোমাকে পড়াশোনা করাতে রাজি আছে। তুমি যতদূর পর্যন্ত চাও ততোদূর পর্যন্ত পড়তে পারবে। আর এমন ভালো পরিবার কিছু সহজে পাওয়া যাবে না। তাই বলছি, একটু ভেবে দেখো!”
কথাগুলো বলতে বলতে মেয়েটার চোখমুখ মুছে দিল। তিথি জোরে জোরে শ্বাস নিতে নিতে একসময় কাঁপা কাঁপা গলায় বলে উঠল,
-“আ…আমি! আমি একজনকে ভালোবাসি ভাবী। আর তাঁকেই বিয়ে করতে চাই।”

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৩৭