Home এক মুঠো চাঁদের আলো এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৪৯

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৪৯

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৪৯
নুসরাত ফারিয়া

​ধীরে ধীরে কুয়াশার পাতলা পর্দা ভেদ করে দিগন্তে উঁকি দিল এক টুকরো কাঁচা সোনা রোদ। সেই প্রথম আলো যখন ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশিরবিন্দুগুলোর ওপর পড়ল, মনে হলো যেন সবুজ মখমলের ওপর হাজারটা হিরে জ্ব’লজ্ব’ল করছে। শিউলি আর বকুল ফুলগুলো রাতের বেলা ঝরে পড়েছিল বাগানে, তাদের সুবাস ভোরের বাতাসে মিশে চারপাশটাকে এক স্বর্গীয় শান্তিতে ভরিয়ে দিয়েছে।
এত শান্তিময় স্নিগ্ধ সকালের মাঝেও একজন রমণী তরতর করে ঘেমে চলেছে। দু’হাতে বিছানার চাদর খামচে ধরে ঘনঘন মাথা এদিকওদিক নড়াচড়া করছে। অজানা কারণে মেয়েটার সর্বাঙ্গ থরথর করে কাপছে। অস্ফুটস্বরে কিছু একটা বিরবির করছে। তখনো বাইরে থেকে মৃদুস্বরে গানের লাইন ভেসে আসছে। গানটা হঠাৎই বন্ধ হয়ে যায় এবং সঙ্গে সঙ্গে রমণী গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল,

-“ছায়াআআআআ…..!”
এক লাফে শোয়া থেকে উঠে আলো হাঁপাতে হাঁপাতে কেঁদে উঠল। ওর চিৎকার শুনে নিচ থেকে আধার হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে। মেয়েটার এমন অবস্থা দেখে তড়িঘড়ি করে কাছে এসে দুগালে হাত রাখতেই আলো হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
-“ও…ওই লোকটা আমার বোনকে মে’রে ফেলেছে, ওই লোকটা আমার বোনের হৃদয়ে গু লি মে’রেছে। আ..আপনার বন্ধুর জন্য আ..আমার বোনটা শেষ হয়ে গেল। আমি ক..কাউকে ছাড়ব না, দুজনেই মে’রে ফেলব। ওরা আ-আমার নিষ্পাপ বোন কে মে’রে দিয়েছে।”
মেয়েটার কথা শুনে আধার চমকে উঠে বলল, -“এসব কি বলছো তুমি? মাথা ঠিক আছে? তোমার বোন ম রবে কেন, ও তো বেঁচে আছে, নিজের বাড়িতে আছে। আর কে তোমার বোনকে গু লি করবে, আশ্চর্য!”

-“আপনি মিথ্যে বলছেন, আমি নিজের হাতে আমার বোনের নিথর র’ক্তা’ক্ত শরীরটা এই বুকে নিয়েছি। ওরে কতবার ডাকলাম, কিন্তু আমার ডাকে একটুও সাড়া দিল না। ওখানে আপনিও তো ছিলেন, এখন মিথ্যে বলছেন কেন?”
আধার ব্যাপারটা বুঝতে পেরে মেয়েটাকে শান্ত করানোর চেষ্টা করে বলল, -“হঁশশ…রিল্যাক্স! তোমার বোনের কিচ্ছু হয়নি, ও একদম সুস্থ আছে। আর তুমি হয়তো কোনো বাজে স্বপ্ন দেখেছো! তাই এমন মনে হচ্ছে। তুমি একটু চারিদিকে তাকিয়ে দেখো, আমাদের রুমে আছো। আর তুমি গতকাল সন্ধ্যার দিকে সিঁড়ি থেকে পড়ে জ্ঞান হারিয়ে ছিলে, তারপর হাসপাতাল থেকে ভোর রাতে তোমাকে নিয়ে এসেছি। আর ওখান থেকে আসার সময় শুনেছিল, একজন মেয়ে নিজের ভালোবাসার মানুষটিকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেই মা’রা গেছে। হয়তো ওই ঘটনার জন্য তুমি দুঃস্বপ্ন দেখেছো। একটু মনে করার চেষ্টা করো, গতকাল কোথায় ছিলে! তাহলে বুঝতে পারবে।”
স্বামীর কথা শুনে আলো তড়িঘড়ি করে নিজের কপালে হাত রাখল, সেখানে ছোট্ট করে ওয়ানটাইম ব্যান্ডেজ করা। শরীর থেকে কম্ফোর্টার সরিয়ে ডান পায়ের প্লাজু হাঁটুতে তুলে দেখে, সেখানেও ব্যান্ডেজ করা। তারমানে লোকটা ঠিক বলছে? কিন্তু, তার বিশ্বাস হচ্ছে না। তাই সে বিচিলিত কণ্ঠে বলল,

-“আমার বোনের কাছে যাবো, আমাকে এক্ষুনি নিয়ে চলুন!”
-“তোমার শরীর ভালো নেই আর এই অবস্থায় কোথাও যেতে পারবে না।”
মূহুর্তেই আলো চেঁচিয়ে উঠল, -“তারমানে আপনি এতক্ষণ মিথ্যে বললেন? আমাকে দেখে আপনার পাগল মনে হয়?”
আধার নিজের কপাল চেপে ধরল। সে এ কোন পাগলের পাল্লায় পড়েছে? কোমা থেকে বেরিয়ে এসে মাথার তার আরো ছিঁড়ে গেছে মনে হয়। সে কিছু একটা ভেবে নিজের ফোন বের করে একজনকে ভিডিও কল দিল। কিছুক্ষণ পরই অপর প্রান্ত থেকে কল রিসিভ হতেই ফোনটা মেয়েটার মুখের সামনে ধরে বলল,

-“নাও, তোমার বোনের সাথে কথা বলো।”
ফোনের স্ক্রিনে ছোট বোনের ঘুমন্ত চেহারা ভেসে উঠতেই আলোর কান্না দিগুণ হলো। সাতসকালে বড় আপুকে কাঁদতে দেখে ছায়ার সব ঘুম হাওয়া হয়ে গেল। সে তড়িঘড়ি করে উঠে বসে চিন্তিত গলায় বলল,
-“কি হয়েছে আপু? তুমি কাঁদছো কেন? সব ঠিক আছে তো?”
আলো নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে বলল,
-“তুই ঠিক আছিস?”
-“আমার আবার কি হবে?”
আলো কিছু বলল না। আধার ফোনটা নিয়ে শালী সাহেবার উদ্দেশ্যে বলল, -“তোমার আপু তোমাকে নিয়ে একটা দুঃস্বপ্ন দেখেছে, তাই এমন করছে। আমি গাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি, তুমি আজ একটু এখানে এসো। নয়তো তোমার আপু কেঁদেকুটে পুরো বাড়ি ভাসিয়ে দিবে।”

-“ঠিক আছে ভাইয়া। আর আপু? আমি একদম ঠিক আছি, তুমি চিন্তা করো না।”
আধার আরো কিছু বলে লাইন কেটে দিয়ে বউয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, -“এখন বিশ্বাস হয়েছে?”
আলো এগিয়ে এসে দু’হাতে স্বামীকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বুকের মাঝে মুখ গুঁজে বলল, -“আমি জ’ঘন্য একটা স্বপ্ন দেখেছি, যেটা ভাবলেও আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। আমি আমার বোনকে খুব ভালোবাসি, ওর কিছু হলে আমি সইতে পারব না। ও আমার খুব আদরের!”
আধার মেয়েটার মনের অবস্থা বুঝতে পারল। কারণ সেও নিজের বোনকে হারিয়েছে, তাই হারানোর যন্ত্রণাটা জানে। সে আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মেয়েটাকে একহাতে আলিঙ্গন করে, অন্যহাতে মাথা বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
-“ভয় পেও না, কোনো খারাপ কিছু হবে না। আর তোমার বোন তোমার কাছে সবসময় থাকবে।”

দশটার দিকে ছায়া খান বাড়িতে হাজির। ছোট বোনকে কাছে পেয়ে আরেকদফা কেঁদেছে আলো। সে ভীষণ ভয় পেয়েছে, নিজের বোনকে হারানোর ভয়। এত জঘ’ন্যরকম একটা স্বপ্ন কীভাবে দেখতে পারল, বুঝতে পারছে না। তার সাধ্য থাকলে, সে ওই নিকৃষ্ট কল্পনাকে স্মৃতির পাতায় থেকে মুছে দিত। কী ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন ছিল! এমন স্বপ্ন কোনো শত্রুকেও যেন না দেয়।
মেয়েটা গতকাল সিঁড়ি বেয়ে পড়ে যাওয়াতে আজ পুরো সিঁড়িতে কার্পেট বিছিয়ে নিয়েছে আধার। এই তিড়িংবিড়িং করা মেয়েটার হাতপা এখনো কন্ট্রোল করতে পারল না। সবসময় কিছু না কিছু অঘটন ঘটিয়ে বসে থাকবে। আজ খুব সকাল বেলায় তিথি এসেছে মাকে দেখতে। আর সে-ই রুমে বসে গান শুনছিল। আর সেগুলো মেয়েটা কল্পনা করছিল।
ছায়া নিজ হাতে আপুকে খাবার ও ঔষধ খাইয়ে দিল। আলো মুখ মুছে ধীর কণ্ঠে বলল,

-“গায়ক মৃন্ময় আহমেদ রাজের অনুষ্ঠানে যাবি না তুই।”
বড় বোনের কথা শুনে ছায়া চমকে উঠল। অবাক কণ্ঠে শুধাল, -“কেন আপু?”
-“আমি না করছি তাই।”
-“কিন্তু…!”
-“কোনো কিন্তু নয়, ছায়া। তুই ওই লোকটার থেকে দূরে থাকবি।”
আলো শুনেছে, ভোরের স্বপ্ন মাঝেমধ্যে সত্যি হয়! তাই সে নিজের বোনকে নিয়ে কোনোরকম ঝুঁকি নিতে চায় না।
-“আমার খুব ইচ্ছে ছিল আপু, উনার সাথে আবারো দেখা করার।”
ছায়ার কথা শুনে আলো গম্ভীর কণ্ঠে বলল, -“উনাকে ভুলে যা।”
-“সম্ভব নয়!”
-“উনি কখনোই তোর হবে না, তোদের মাঝে বয়সের অনেক তফাৎ।”
ছায়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, -“মাত্র বারো-তেরো বছরেরই তো গ্যাপ।”
আলোর রাগ হলো ভীষণ। এমনিতেই অশান্তিতে আছে, তারওপর এই মেয়েটা আবার ত্যাড়ামি শুরু করেছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

-“ওই লোকটাকে হাজারো মেয়ে চায়, এত এত বড়লোক পরিবারের সুন্দরী মেয়েদের রেখে তোর মতো একটা সাধারণ মেয়েকে উনি ভালোবাসবেন? এটা ভাবাও বোকামি। গিয়ে দেখ, উনার ভালোবাসার মানুষ অলরেডি আছে। তাই তো নিজের ফ্যানদের দিকেও তাকায় না। আর আমি শুনেছি, উনি অন্য একজনকে ভালোবাসেন। সেখানে তোর কোনো অস্তিত্ব নেই। বেশি বাড়াবাড়ি করলে, বাবাকে বলে তোর বিয়ের ব্যবস্থা করব, তখন এমনিতেই সব আবেগ বেরিয়ে যাবে।”
ছায়া মাথা নিচু করে ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকিয়ে রাখার বৃথা চেষ্টা করছে। একই সাথে আপু কথাগুলো শুনে বুকটা ফেটে যাচ্ছে। তারমানে তার প্রিয় মানুষটারও ভালোবাসার মানুষ আছে? একতরফা ভালোবাসা এত কষ্টদায়ক কেন? সে কেন ওই মরীচিকাকে নিজের মন দিতে গেল? তার আপু তো ঠিক কথায় বলেছে, এত এত মেয়ে থাকতে কেন তাকে পছন্দ করবে? কি আছে তার? কিছুই নেই। সে তো খুবই সাধারণ একজন মেয়ে, বেশি স্মার্টও নয়। ওই লোকটার সাথেও তাকে মানাবে না। সে শুধু শুধু এতগুলো বছর ধরে চাঁদকে পাওয়ার স্বপ্ন দেখে এসেছিল। যেটা বাস্তবে কখনো সম্ভব নয়।
ছায়া দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তারপর ধীর কণ্ঠে বলল,

-“আমি বিয়ে করতে চাই আপু, তুমি বাবাকে বলে আমার বিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করো। স্বামী, সংসার পেলে নিশ্চয়ই ভুলে যাবো নিজের অবাধ্য অনুভূতিকে।”
আলো আনমনে বলল, -“রাত ভাইয়া যদি ভালো হতো, তাহলে তোকে আমার জা বানিয়ে এই বাড়িতেই নিয়ে আসতাম। তখন দুবোনে একসাথে থাকতে পারতাম।”
ছায়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, -“তুমি চাইলে বাবার কাছে রাত ভাইয়ার কথা বলতে পারো।”
-“অসম্ভব! বাবা যদি ওই লোকটার ব্যাপারে জানে, তাহলে আমাকে মে’রে ভর্তা বানিয়ে দিবে। আমি চাই, আধার স্যারের মতো কেউ তোর জীবনে আসুক। যার প্রথম ও শেষ ভালোবাসা শুধুই তুই হবি। তোর দুলাভাইয়ের মতো ত্যাড়া, গুরুগম্ভীর, বদরাগী, হিটলার স্বভাবের না হলেই হবে। তোর জীবনে এমন কেউ আসুক, যে শুরু থেকেই তোকে চাইবে এবং ভালোবাসবে। কোনোরকম কষ্ট যেন তোকে ছুঁতে না পারে। আর এমন একটা মানুষকে আমি চিনি, যে তোকে ছোট বেলা থেকেই ভালোবাসে। কিন্তু কখনো প্রকাশ করেনি!”

বড় বোনের বলা শেষের কথাটা শুনে ছায়া চমকে উঠল। অস্ফুটস্বরে জানতে চাইল, -“কে?”
আলো হেঁসে বলল, -“উমমম…সিক্রেট। আগে বাবা, মা’কে তোর বিয়ের বিষয়ে বলি, তারপর এটা নিয়ে কথা বলব। উনারা যদি রাজি হোন, তার পরেই তোকে বলব।”
ছায়া কিছু বলল না। শুধু আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তার সারাজীবন একটা আফসোসই রয়ে যাবে, সে তার প্রথম প্রেম, প্রথম ভালোবাসার মানুষকে পেল না। তবে সে মন থেকে দোয়া করে, তার না পাওয়া প্রিয় মানুষটা উনার ভালোবাসার মানুষটির সাথে সুখে থাকে। এবং সংসার করুক। যেখানে দুই তরফার ভালোবাসায় অনেক পূর্ণতা পায় না, সেখানে তার তো একতরফা ভালোবাসা। ওখানে পূর্ণতা পাওয়াও বিলাসিতা! আর যদি মানুষটা হয় সামর্থ্যের বাইরে, তাহলে তো কোনো কথাই নেই।
বোনকে চুপ করে থাকতে দেখে আলো মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, -“একটা কথা জেনে রাখ, তোর আপু কখনো তোর খারাপ চাইবে না। আমি যা করব, সবটা তোর ভালোর জন্যই।”
ছায়া হাসল। আপুকে জড়িয়ে ধরে কাঁধে মুখ গুঁজে ফিসফিসিয়ে বলল, -“নিজের থেকেও বেশি তোমাকে বিশ্বাস করি আপু।”

আলো মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে বোনকে আদর করে দিল। ছায়া কিছুক্ষণ বসে থেকে গল্প করে বাইরে চলে গেল এবং তখনই আধার ভেতরে প্রবেশ করে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
-“তুমি কিন্তু এটা ঠিক করছো না।”
আলো কপাল কুঁচকে বলল, -“কি করলাম?”
-“আমি জানি, ছায়া মৃন্ময়কে ভালোবাসে।”
-“তো? ছায়ার মতো হাজারো মেয়ে আপনার বন্ধুকে ভালোবাসে। সেখানে এটা স্বাভাবিক।”
-“আমি চাই মৃন্ময়ের জীবনে ছায়া আসুক।”
-“কিন্তু আমি চাই না।”
-“কেন? মৃন্ময় কোনদিক দিয়ে খারাপ?”

-“উনি ভক্তদের সাথে সাথে নিজের জীবনে কম শত্রু তৈরি করেননি! আমি আমার বোনকে এমন কারোর হাতে দিবো না, যেই মানুষটা আগে থেকেই অন্য কাউকে ভালোবাসে। আর আপনার বন্ধুর সাথে আমাদের পরিবার যায় না। দেখা যাবে, আমার মতো আমার বোনটাও সমাজে শুনতে পাবে, নিজের রূপ দেখিয়ে বা কালা জাদু করে বড়লোক পরিবারের ছেলেকে ফাঁসিয়ে বিয়ে করেছে। আমি যেসব সহ্য করেছি, সেসব আমার বোনটাও সহ্য করুক, এটা আমি চাই না। ও যেমন সাধারণ, তেমন সাধারণ মানুষের কাছেই দিবো। তখন কেউ খোঁটা দিতে পারবে না। আর আপনার বন্ধুর পরিবারও আমার বোনকে মেনে নিবে না। ওদের মধ্যে বয়সেরও তফাৎ রয়েছে। তাই আমি সবদিক থেকে বিবেচনা করেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আশা করছি আপনি শুধু আপনার বন্ধুর দিকটা দেখবেন না, আমার বোনের দিকটাও দেখবেন।”
আধার কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

-“তুমি কবে থেকে সমাজ মানতে শুরু করলে? আর এতোই যদি মানতে, তাহলে কেন আমার কাছে ছিলে? যেখানে শুরুতে তোমাকে আমি নিজের বউ হিসেবে মেনে নেইনি। আমি তো তোমাকে আগে ভালোবাসিনি, তুমি আমাকে আগে ভালোবেসেছো, সবকিছু সহ্য করে আমার কাছে থেকে গিয়েছো! ভালোবাসার জন্য যদি নিজের আত্মসম্মান ত্যাগ করে বেহায়ার মতো পড়ে থাকতে পারো, তাহলে তোমার বোনের বেলায় এত সমস্যা হচ্ছে কেন? আমাদের মধ্যেও তো বয়সের ব্যবধান রয়েছে। কই এতে তো তোমার সমস্যা হয়নি? আমি মানছি, মৃন্ময় অন্য কাউকে ভালোবাসত, কিন্তু ওর লাইফে ছায়ার মতো মেয়ে গেলে ও নিজের অতীত ভুলে বেরিয়ে আসবে। যেমনটা আমি এসেছি। কিন্তু তুমি সবকিছু জেনেশুনেও স্বার্থপরের মতো বিহেভ করছো।”
আলো অপলক নয়নে স্বামীর রাগান্বিত চেহারার দিকে তাকিয়ে আছে। মূহুর্তেই এক গাল বেয়ে একফোঁটা নোনাজল গড়িয়ে পড়ল। পরক্ষণেই সে চোখের পানি মুছে তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল,

-“ঠিকই বলেছেন আপনি, একদম ঠিক। এই আমিই তো আপনার কাছে বেহায়া, নির্লজ্জ, কুকুরের মতো পড়ে ছিলাম। যেখানে আপনি আমাকে সামান্য বউয়ের অধিকার প্রথমে দেননি। এই বাড়িতে পা রাখার পর কম কষ্ট, আঘাত, অপমান, অপবাদ সহ্য করিনি। তবুও পড়ে ছিলাম এখানে। আরে আপনি তো আমাকে ডিভোর্সও দিতে চেয়েছিলেন, এটা নিয়ে তো দাদাজানের সাথে আপনার কম যুদ্ধ হয়নি! একসময় আমিই ডিভোর্স দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম, কারণ এই বাড়িতে থাকতে থাকতে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। আমি ছিলাম মুক্ত পাখি, মা-বাবার ভীষণ আদরে! কিন্তু এখানে এসে এতিমের মতো জীবনযাপন করেছি। বিশ্বাস করুন, আমি মুক্ত হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এই জঘ’ন্য ভালোবাসার কাছে আমি হেরে গিয়েছি একসময়।
আপনি ঠিকই বলেছেন, আমিই আগে আপনাকে ভালোবেসেছি। তাই তো বেহায়ার মতো ছিলাম আপনার কাছে এবং সবকিছু সহ্য করে গেছি। আমি যদি নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে আপনার কাছে না থাকতাম, তাহলে আপনি আমার দিকে ফিরেও তাকাতেন না। আপনি ভালোবাসায় বিশ্বাস করেন না জেনেও আমি নিজের মনটা দিয়েছি আপনাকে, আপনি আর পাঁচটা মানুষের মতো স্বাভাবিক না জেনেও আপনাকে ভালোবেসেছি। কারণ দিনশেষে আপনাতেই আমার শান্তি ছিল।

হ্যাঁ আমি স্বার্থপর, নিজের স্বার্থের জন্যই আপনাকে আমি চেয়েছি। লাজলজ্জা ভুলে আপনার কাছে অসভ্যের মতো গেয়েছি, যেখানে আমার সামান্য ছোঁয়াতেও আপনি বিরক্ত অনুভব করতেন। তবুও কুকুরের মতো আপনার একটু ভালোবাসা পাওয়ার জন্য সারাক্ষণ পিছু পিছু ঘুরেছি। আমি খুব করে চেয়েছিলাম আপনিও আমাকে ভালোবাসুন। কিন্তু আপনি তো আমাকে দূর দূর করতেন। আমি সবসময় হাসিখুশি ছিলাম বলে এই নয়, আমার কষ্ট হয়নি। আমারো কষ্ট হয়েছিল, খুউউউউব কষ্ট হয়েছিল। কিন্তু কখনো আপনাকে অভিযোগ করিনি। আর না জোর করে স্ত্রীর অধিকার নিয়েছি। আমি যখন ম’রতে বসেছিলাম, তখন আপনার অনুভূতি জেগেছিল। ওই যে কথায় আছে না? দাঁত থাকতে আমরা দাঁতের মর্যাদা বুঝি না। ঠিক তেমন আপনিও।
বিয়ের আগে আপনার ব্যাপারে আমি কিছুই জানতাম না। বাবার সিদ্ধান্ত ও আপনার দাদুর কথাতে রাজি হয়ে যাই। আপনার মতো আমিও কখনো আমার স্বামী হিসেবে আপনাকে কল্পনা করিনি। কিন্তু কি করতাম? বিয়ে তো হয়ে গেছিল, আর আমার বারো ঘাটে কেন? কখনো দুই ঘাটে পানি খাওয়ার মতো স্বভাব নেই। তাই আপনাকে আমি শুরুতেই স্বামী হিসেবে মেনে নিয়েছিলাম। মুক্ত পাখি ছিলাম আমি, আর সেই আমিই আপনার খাঁচায় বন্দী হয়েছি। এতেও আমার কোনো আফসোস ছিল না। কারণ এক জীবনে শুধু আমি আপনাকেই চেয়েছি।

আচ্ছা, সবসময় শুধু আমরা মেয়েরায় কেন সবকিছুতে মানিয়ে নিবো? আমাদের মন, হৃদয় বলে কিছু নেই? আমাদের কষ্ট হয় না? শুধু আমরাই কেন স্যাক্রিফাইজ করে যাবো? নিজের মা-বাবা, জন্মস্থান ছেড়ে নতুন সংসারে আসার পর যদি শুনতে হয়, নিজের স্বামী তাকে বউ হিসেবে মেনে নেয়নি, তখন একটা মেয়ের কেমন লাগবে? আমি শুরু থেকে যা যা কষ্ট করেছি, সেগুলো আমার বোন করুক ওটা একটুও চাই না। আমি চাই না, আমার মতো আমার বোনটাও নির্লজ্জ, বেহায়া হোক। এটাও চাই না, আমার মতো শ্বশুর বাড়িতে গিয়ে ছায়া কথা শুনুক। আমি চাই না আমার বোন আমার মতো স্বার্থপর হোক এবং নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিক। নয়তো দিনশেষে তাকেও আমার মতো স্বামীর কাছ থেকে শুনতে হবে, “স্বার্থপর”! এবং এটাও শুনতে হবে, “কেন আমাকে ভালো বেসেছিলে? আমি তো তোমাকে আগে ভালোবাসি নি? তাহলে কেন বেহায়ার মতো ছিলে?” আমি আমার জীবনে যতটা কষ্ট পেয়েছি, তার একভাগও আমার বোনকে পেতে দিবো না৷ এতে আপনি আমার পাশে না থাকলেও চলবে!”

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৪৮

একনাগাড়ে কথাগুলো বলে আলো দু’হাতে চোখের পানি মুছে, বালিশে মাথা রেখে অন্য পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল। কম্ফোর্টার টেনে মাথা পর্যন্ত ঢেকে নীরবে কেঁদে উঠল। সে কখনো ভাবেনি, এই মানুষটাও দিনশেষে তাকে ভালোবাসা নিয়ে খোঁটা দিবে। এবং স্বার্থপর বলবে। সে দিনশেষে এতটা বেহায়া না হলেও পারত! অন্তত আজকের দিনটা দেখতে হতো না। আর কেউ বলতেও পারত না—আমি তোমাকে আগে ভালোবাসি নি…..

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ৫০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here