Home এমপি রুশভিয়ান মির্জা এমপি রুশভিয়ান মির্জা পর্ব ২৪

এমপি রুশভিয়ান মির্জা পর্ব ২৪

এমপি রুশভিয়ান মির্জা পর্ব ২৪
ফাতেমা তুজ জোহরা

সাদা আলোয় ভেসে থাকা দীর্ঘকরিডোর জুড়ে অস্বাভাবিক ব্যস্ততা। কোথাও নার্সদের দ্রুত পায়ের শব্দ , কোথাও চিকিৎসকের নিচু স্বরের আলোচনা ভেসে বেড়াচ্ছে।জীবানুনাশক তীব্র গন্ধে বাতাস ভারি হয়ে আছে। অনু আরিয়াকে কোলে নিয়ে দ্রুত এগিয়ে গেল মাহবুবের দিকে।
অনুর পরনে পরিপাটি সাদা ডাক্তারি কোট, ভেতরে হালকা নীল রঙের স্ক্রাবস। গলায় ঝোলানো স্টোথোস্কোপ। চুল গুলো পিছনে বাঁধা । মুখে চিকিৎসকের গম্ভীর্য থাকলে ও চোখে ছিলো কোমলতা। হাতের রেগীর ফাইল আর রিপোর্ট । তার কোল জুড়ে বসে আছে ছোট আরিয়া। আরিয়ার পরনে ছিলো হালকা গোলাপি রঙের ফ্রক। ফ্রকের সামান্য নিচের অংশটা ফোলা। কোমড়ের কাছে ছোট একটা ফিতা বাঁধা । মাথার দুপাশে ছোট দুটি ঝুটি করা আছে। তার সাথে গোলাপি ফুলের ক্লিপ। মাহবুব কেবিনের দরজার সামনে। মুখে উৎকন্ঠা তার বিদ্যমান। অনুকে দেখেই মাহবুব দ্রুত এগিয়ে এসে বলল,” এই যে দেড় ব্যাটারির মা, এত দেরি করলি কেন? ভেতরের অবস্থা দেখলে বুঝবি মেয়েটা কত ভ*য় পেয়ে আছে, নার্স একটু এগিয়ে যেতেই মেয়েটা চি*ৎ*কা*৮র দিয়ে উঠছে ” মাহবুব কথাটা বলতে বলতে আরিয়াকে কোলে তুলে নেয়।

অনু ভ্রু কুচকে বলল,” নার্সকে কাছে যেতে দিচ্ছে না।
মাহবুব আরিয়াকে আদর করতে করতে বলল,” না! হাত বাড়ালেই সরে, মনে হচ্ছে কাউকে বিশ্বাস করতে পারছে না।
অনু একবার কেবিনের বন্ধ দরজার দিকে তাকালো, ভেতর থেকে অস্পষ্ট আওয়াজ ভেসে আসছে। অনু গভীর শ্বাস নিয়ে দরজার হাতলে হাত রেখে বলল,” আমি আসছি ” অনু দরজা খুলতেই কেবিনের এককোনে গুটিসুটি হয়ে বসে থাকা মেয়েটা আচমকা মাথা তুলে তাকাল অনুর দিকে। চোখ দুটো বি*স্ফো*রি*ত, চোখে এমন ভ*য়, যেন সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিও তার জন্য অজানা এক বি*প*দ।
মেয়েটা সঙ্গে সঙ্গে বিছানার একপাশে সরে গেল। দুই হাত দিয়ে চাদরটাকে বিছানাটাকে বুকের সাথে চেপে ধরলো ।
পরনে হালকা নীল রঙের ঢিলেঢালা পোশাক। পোশাকটা শরীরের সঙ্গে একেবারে মানিয়ে নেয়। কোমড় থেকে ছড়িয়ে নামা চুল গুলো একেবারে এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে। কিছু চুল কপালের উপরে এসে লেপ্টে আছে, কিছু আবার গালের দুপাশে নেমে আছে। মুখটা অস্বাভাবিক ফ্যাকাশে,কয়েকদিনের অচেনতার ছাপ স্পষ্ট তার মুখে। শুকিয়ে যাওয়া ঠোঁট দুটো তিরতির করে কেঁপে কেঁপে উঠছে।

অনুর মেয়েটার দিকে তাকাতেই মনে পড়লো সেদিন রাতের কথাটা, অনু গিয়েছিলো তার মামার বাড়ি ফিরতে ফিরতে প্রায় অনেক রাত। হঠাৎ কাঁচা রাস্তা পেরিয়ে মেন রোড উঠতেই মেয়েটা আচানাক তার গাড়ির সাথে ধা*ক্কা লেগে নিচে পড়ে অ*জ্ঞা*ন হয়ে যায়। অনু কোনকিছু না ভেবেই তাড়াতাড়ি করে মেয়েটা নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরে ঢাকায় নিয়ে আসে জ্ঞান না ফেরার জন্য।
না…. না কাছে আসবেন না? কথাটুকু শোনার পর অনু সম্বিত ফিরলো। সে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল,” ভ*য় পেয়ো না, আমি তোমার কোন ক্ষ*তি করবো না। মেয়েটা অনুর দিকে অ*বি*শ্বা*স্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো । তার চোখ বারবার ঘুরে ঘুরে কেবিনের দিকে তাকাচ্ছে । হঠাৎ কপালে হাত রেখে ফিসফিস করে বলল,” আমি … আমি … কোথায়?
অনুর ওখান থেকেই বলল,” তুমি হাসপাতালে আছো? মেয়েটা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর খুব ধীরে ধীরে প্রশ্ন করেলো

—হাসপাতাল!
—হ্যাঁ!
—আমি এখানে কেন? আমি তো …. বলেই মেয়েটা চুপ করে গেল!
অনু বলল,” তোমাকে তিনদিন আগে আ*হ*ত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিলো। তুমি অ*চে*তন ছিলে। আজ তোমার জ্ঞান ফিরেছে। কথাগুলো শুনে মেয়েটার চোখের মনি কেঁপে উঠলো, সে বিরবির করে বলল,” তিনদিন! কথাটুকু বলেই আচমকাই মাথাটাকে শক্ত করে চে*পে ধরে বলল,” আমি কিছু মনে করতে পারছি না? তার শ্বাস দ্রুত উঠতে লাগলো, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমা হলো তার।
অনু এগিয়ে এসে বলল,” চেষ্টা করো না ” এখনই কিছু মনে করার দরকার নেই। তুমি নিরাপদে আছো এখন।
মেয়েটা নিরাপদ শব্দটা শুনে স্থির হয়ে গেল। অনু এক পা এগিয়ে গিয়ে মেয়েটার ডানহাতটাকে আলতো করে চেপে ধরলো । মেয়েটা এবার কোন ঝামেলা করল না, পরিবর্তে তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো গালে। মেয়েটা বুঝতে পারলো না কেন তার চোখ দিয়ে পানি পরছে।

মেয়েটাকে কিছু বলতে না দেখে অনু বুকে সাহস পেল, সে এগিয়ে গিয়ে মেয়েটার পাশে বসে চোখের পানি গুলো মুছিয়ে দিয়ে আদুরে স্বরে বলল,’ কি হয়েছে কাঁদছো কেন?
মেয়েটা মুখ দিয়ে কোন কথা বের হলো না, সে কান্নাভেজা চোখ নিয়ে অনুর দিকে তাকিয়ে রইলো। অনুর তার এলোমেলো চুল গুলো হাতের মাধ্যমে গুছিয়ে দিয়ে বলল,” তোমার নাম কি?
মেয়েটা অনুর চোখে চোখ রেখে বলল,” ই…. ইনান তালুকদার !
অনু বলল,” তুমি ওতো রাতে কি করছিলি ওই গ্রামে?
ইনানের মনে পড়লো রকির কথা, হ্যাঁ সে তো রকিকে খু*ন করে পালিয়েছিল। সেটা কোন জায়গা ছিলো সেটাও মনে নেয়। ইনান এই পর্যায়ে কিছু বলল না, সে চুপ করে মাথা নিচু করে রাখলো। কিন্তু তার চোখ দিয়ে পানি পরছে আজকে পালিয়ে না আসলে কি হতো সেটাই ভেবে।
অনু আর কিছু বলল না, হাতের ইশারায় একজন নার্সকে ইনজেকশন আনতে বলেই, ইনানের হাতে খুব সন্তোর্পনে পুশ করে দেয়। ইনান মুহুর্তের মধ্যে ঢ*লে পড়লো অনুর শরীরের উপরে। অনু সযত্নে তাকে আগলে নিয়ে বিছানায় শুয়েই কেবিন থেকে বের হয়ে গেল। আর পিছনে পড়ে রইলো ইনান।

কেটে যায় মাঝে আরো দুইদিন,,
দেখুন ডাক্তার আমার ভাগ্নিকে আমি বাড়িতে নিয়ে যেতে চায়, আমার এতটুকু আপত্তি নেই কিন্তু ও আমার বাড়িতে ওর জন্য নিরা*পদ না…. কথাগুলো বলল ইনানের মামা ইউসুফ। অনু ইনানের কাছ থেকে তাদের বাড়ির ঠিকানাটা জেনে তাকে খবর পাঠানো হয়। অনুর কপালে ভাঁজ পড়লো ইউসুফের কথা শুনে। সে বুঝতে পারলো না নিজের বাড়িতে সবাই নিরা*পদ থাকে তাহলে ইনান কেন থাকবে না। ইউসুফ অনুর ভাবভঙ্গি বুঝতে পেরে একটু শান্ত গলায় বলল,” আপনি হয়তো ভাবছেন কেন আমি এই কথাটা বললাম, আসলে কি বলুন তো এটাই সত্য কথা। আমার স্ত্রী ওর উপর বেজায় ক্ষি*প্ত হয়ে আছে।আমার ভাগ্নি, আর আমার স্ত্রীর ভাতিজা মানে রকি ওরা একসাথে বের হয় বাড়ি থেকে । কিন্তু পাঁচদিন কেটে যাবার পর যখন তাদের খোঁজ পায়নি তখন আমরা পুলিশে খবর দি। আর তার কয়েকদিন পর রকির নৃ*শং**স লা* পায় ব্রিজে ঝু*ল*ন্ত অবস্থা , যার পুরো শরী*র পু*ড়ি*য়ে দেওয়া হয়েছিলো আর মুখটা অ*ক্ষ*ত ছিলো। আমার স্ত্রীর এর সব দায়ভার ইনানের উপরে দিয়ে তার নামে মা*ম*লা করে। আর পুলিশ ইনানকে হাতের কাছে পেলে তাকে নিশ্চিত মৃ*ত্যু*দ*ন্ড দিবে তাই আপনার কাছে আমার অনুরোধ আমার ভাগ্নিটাকে কিছুদিনের জন্য আশ্রয় দিন আমি ওর আসল মামাদের কাছে ওকে পাঠিয়ে দিবো? কথাগুলো বলেই ইউসুফ কান্নায় ভেঙে পড়লেন।

অনুর সারা শরীরে কা*টা দিয়ে উঠলো ইউসুফের কথা শুনে, অনু একবার জানলা দিয়ে বাগানের দিকে তাকালো যেখানে ইনান আরিয়া খেলা করছে, সে বিশ্বাস করতে পারলো এই নিষ্পাপ মেয়েটা কাউকে মা*র*তে পারে। অনু দৃষ্টি সরিয়ে ইউসুফের দিকে তাকিয়ে বলল,” আপনি কান্না করবেন না! তার আগে এটা বলুন ওর আসল মামা মানে আপনি কি ওর আসল মামা নন।
ইউসুফ মাথা নাড়িয়ে না বোঝালো, তারপর চোখ থেকে পানি টুকু মুছে বলল,” আমি ইশিতা আসল ভাই না, ইনানের বাবা মা পালিয়ে বিয়ে করে , আর একদিন আমার সাথে পরিচয় হয় তারপর থেকে ইশিতা আমাকে বড় ভাইয়ের মতো মেনে চলতো। আর ওর আসল মামার বাড়ি রুপনগরে … কথাটা বলেই নাক টানলো সে।
এদিকে অনু রুপনগর নাম শুনেই তার আত্মাটা কেঁ*পে উঠলো, চোখ দুটো আচানাক বড় হয়ে গেল, চোখের কোনে হালকা পানি জমলো অনুর। কানের কাছে বাজতে লাগলো, ” তুমি জানো অনু ওই রুপনগরের সবথেকে বড় বাড়ি হলো আমাদের মির্জা মহল, আর তুমি সে মির্জা মহলের বড় বউ হবে…।

কথাগুলো মনে পড়তেই অনু নিজের উপর ত্যা*চ্ছিল্য হাসলো । এগুলো সব মিথ্যা কথা, সব স্বপ্ন, সব ভালোবাসা সব মিথ্যা। শুধু দিনের পর দিন তার শ*রী*র*টা*কে পাওয়ার জন্য আরিয়ান এগুলো মিথ্যা কথা বলেছিলো। অনু আলগোছে চোখের পানিটুকু মুছে নেয়। যে মানুষটা তাকে ঠ*কি*য়ে পর*না*রী*র সাথে একবিছানায় শুয়েছে তার জন্য কান্না করা কোন মানে নেই।অনু চোখ মুখ শক্ত করে বসে রইলো।
ইউসুফ আর কিছু বলল না বেরিয়ে গেল, তাকে রুপনগরে গিয়ে ইনানের মামাদের খোঁজ নিতে হবে, তাহলে মেয়েটাকে হয়তো একটু হলেও সু*র*ক্ষা দিতে পারবে।
আর অনু একভাবে বসে রইলো। এমন সময় ঘাড়ে কারো স্পর্শ পেয়ে হকচকিয়ে গেল অনু সে পিছন ফিরে দেখলো ইনান ঘুমন্ত আরিয়াকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, পরনে কালো থ্রিপিচ, ভেজা চুল গুলো পিঠে ছড়িয়ে পড়ে আছে। ইনায়া মিনমিনে কন্ঠ বলল,” মামা চলে গেল, আমায় নিয়ে গেল না?
অনু তড়িঘড়ি করে উঠে আরিয়াকে কোলে নিয়ে ইনান কে বলল,” উনার একটা কাজ পড়ে গিয়েছে ইনান? আবার আসবে কয়েকদিন পর ততদিনে তোমার অনেকগুলো চিকিৎসা আছে সেগুলো করতে হবে তোমাকে। এখন চলো টেবিলে বসো কিছু খেয়ে নিবে তারপর ওষুধ খেয়ে খেতে হবে অনেক গুলো। ইনান কিছু বলল না সে এগিয়ে গেল টেবিলের দিকে। আর অনু আরিয়াকে কোলে নিয়ে এগিয়ে গেল ঘরের দিকে

একটা একটা করে দিন পেরিয়ে গেল। তারপর সপ্তাহ, তারপর আরেক সপ্তাহ, দেখতে দেখতে কেটে গেল পুরো একমাস। হাসপাতালের সেই কেবিনটা যেন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও নীরব হয়ে উঠেছিলো। প্রতিদিন একই সাদা দেয়াল, একই মেশিনের আলো , নিয়মিত বিপ বিপ শব্দ। জানলার পর্দা দিয়ে দিনের আলো ঢুকতে, আবার সন্ধ্যা নামলে কেবিনটা ডুবে যেত মূদু হলুদ আলোয়। কিন্তু রুশভিয়ান সে এখনো গভীর অ*চে*ত*নতা*র মধ্যে ডুবে আছে।

সাদা বিছানার উপরে নি*থ*র হয়ে পড়ে থাকে তার বিশাল দেহী শরীরটা।একসময় যে মানুষটার উপস্থিতিতে আশেপাশের মানুষ সর্তক হয়ে যেত, সেই মানুষটাই এখন অসহায় অবস্থায় কেবিনে শুয়ে আছে। একমাসে মধ্যে তার শরীরটা অনেকখানি শুকিয়ে গিয়েছিলো। গালের ধারগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, দাঁড়ি বেড়ে গিয়েছে। চুলগুলো আর আগের মতো গোছানো নেয়। কপালের ক্ষ*ত*টা শুকিয়ে গেলেও দা*গ*টা এখনো স্পষ্ট হয়ে আছে।

এমপি রুশভিয়ান মির্জা পর্ব ২৩

ডান হাতের পোড়া জায়গা গুলো চিকিৎসার পর ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠেছে।নাকের সাথে অক্সিজেন ব্যবস্থা,হাতে ক্যানুলা লাগানো রয়েছে তার। প্রতিদিন সায়েরা বেগম তাকে কাঁচের ওপার থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে। আর আমিরের তো একটাই প্রশ্ন তার ভাই বাঁচবে তো। কেউ কোন উত্তর দিতো না, কিন্তু সায়েরার বিশ্বাস রুশভিয়ান একদিন ফিরবে।

এমপি রুশভিয়ান মির্জা পর্ব ২৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here