এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ৩২
সেঁজুতি আক্তার
এগুলো কি মাইরা?”
— মাইরা কোনো কথা বলল না। শেহরান কিছুক্ষণ মাইরার দিকে তাকিয়ে রইল। কিন্তু একটা কথাও বলল না। মাইরা আস্তে আস্তে মাথা তুলে তাকালো। চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়ছে। শেহরান কিছু না বলে ওষুধ আর আলট্রাসনোর রিপোর্টটা নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
— শেহরান বেরিয়ে যেতেই মাইরা ধপ করে ফ্লোরে বসে হাউমাউ করে কান্না করে দিলো। মুখে হাত দিয়ে বিড়বিড় করে বলতে লাগল, “আল্লাহ, আমি এটা কি করতে যাচ্ছিলাম! আমি একজন মা হয়ে নিজের সন্তানকে শেষ করে ফেলতে চেয়েছিলাম। ও আল্লাহ, এ আমি কি করেছিলাম!” বলে কান্নায় ভেঙে পড়ল।
— শেহরান তাড়াহুড়ো করে ড্রাইভ করে হসপিটালের সামনে এসে থামলো। তাড়াতাড়ি গাড়ি থেকে নেমে হসপিটালের ভিতরে এগিয়ে গেল। শেহরানের এক বন্ধু ডাক্তার। তাই কোনো ঝামেলা ছাড়াই শেহরান কেবিনে ঢুকে পড়ল।
— “আরে শেহরান! আয় বস। আমি তোরই অপেক্ষা করছিলাম। তুই যখন বললি দরকার, তাই বসে আছি। নাহলে আমার ডিউটি টাইম শেষ।”
— শেহরান তাড়াতাড়ি এগিয়ে গেল। হাতের রিপোর্টটা এগিয়ে দিলো। আকাশ রিপোর্টগুলো কিছুক্ষণ দেখল। তারপর শেহরানের দিকে তাকিয়ে বলল, “আরে বন্ধু, কনগ্রাচুলেশন! তুই তো বাবা হতে চলেছিস। বেবির বয়স তিন সপ্তাহ।”
— কথাটা শুনে শেহরান স্তব্ধ হয়ে গেল। কি রিয়্যাকশন দেবে বুঝতে পারল না।
— আকাশ আবার বলল, “মিষ্টি খাওয়াতে হবে কিন্তু।”
— শেহরান শুধু মাথা নাড়ল। তারপর নিজের হাতের ওষুধগুলো আকাশের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “এগুলো কিসের ওষুধ দেখ তো।”
— আকাশ হাসিমুখে ওষুধগুলো হাতে নিলো। প্যাকেট থেকে ওষুধগুলো বের করতেই ভ্রু জোড়া কুঁচকে গেল। “এগুলো কোথায় পেয়েছিস? এগুলো তো বাচ্চা নষ্ট করার ওষুধ।”
— শেহরান আর কোনো কথা শুনল না। আকাশের থেকে বিদায় নিয়ে হসপিটাল থেকে বেরিয়ে আসলো। গাড়ির দরজা খুলে ওষুধের পাতা আর রিপোর্টগুলো ছুড়ে মারল পিছনের সিটে। তারপর গাড়িতে উঠে গাড়ি স্টার্ট দিলো।
— মাইরা এখনো ফ্লোরে বসে আছে। কান্না কমে এসেছে, কিন্তু এখনো ফোঁপাচ্ছে। আর একটুর জন্য বড় ক্ষতি হয়ে যেত। ভাবতেই হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে। হঠাৎ পেটের মধ্যে পাক দিয়ে উঠলো। মাইরা মুখে হাত দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। তারপর দৌড়ে ওয়াশরুমে গিয়ে বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে বমি করে দিলো। চোখে-মুখে পানি দিয়ে বেরিয়ে আসলো।
— শেহরানের গাড়িটা গেটের সামনে আসতেই দারোয়ান গেট খুলে দিল। শেহরান বাড়ির ভিতরে ঢুকে গাড়ি পার্কিং লটে পার্ক করে বেরিয়ে পড়ল। পিছনের সিট থেকে হাতের রিপোর্ট আর ওষুধগুলো নিয়ে রুমের দিকে হাঁটা দিল।
— শেহরান হনহন করে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে রুমের দরজা খুলে ভিতরে গিয়েই ঠাস করে মাইরার গালে একটা চড় বসিয়ে দিল।
— “জানোয়ারের বাচ্চা! কোন সাহসে তুই এই কাজ করেছিস? বল আমাকে, কোন সাহসে করেছিস?” রাগে শেহরানের শরীর কাঁপছে।
— মাইরা গালে হাত দিয়ে স্তব্ধ হয়ে শেহরানের দিকে তাকিয়ে রইল। কিন্তু কিছুই বলল না। চোখ দিয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে।
— শেহরান অনেক কষ্টে নিজের রাগকে কন্ট্রোল করার চেষ্টা করছে। কিন্তু পারছে না। হিসহিস করে বলতে লাগলো, “তোকে আমি বারবার বলেছি, আমি এখন বাচ্চা নিব না। তোকে কি একবারও বলেছি যে বাচ্চা হলে তুই মেরে ফেলবি? তুই তো একটা খুনি রে। জানোয়ার, তুই একটা খুনি। আমার সন্তানকে খুন করতে চাইছিলি তুই, তাই তো? ঠিক আছে। আমার সন্তানকে তুই জন্ম দিয়ে আমার চোখের সামনে থেকে সরে যাবি। আমি তোকে ডিভোর্স দিব। লাগবে না তোর মতো মানুষ। তোর মতো মানুষ এই শেহরান মির্জার লাগে না। বেইমান। আমার বাচ্চা জন্ম দিয়েই তুই চলে যাবি। তোকে আর আমার দরকার নেই। তোকে আমি চিনি না। বাস্টার্ড!”
— কথাগুলো বলেই শেহরান হাতে রাখা ওষুধ আর প্রেসক্রিপশন ছুড়ে মারল বিছানায়। তারপর হনহন করে বাইরে বেরিয়ে গেল।
— মাইরা কিছুই বলল না। স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। কি বলবে? উনি যা বলেছে এটা তো সঠিক। উনি তো এখন বাচ্চা নিতে চাননি। কিন্তু হয়ে গেলে তো আর নষ্ট করতে বলেননি। এ জায়গায় মাইরারই তো ভুল। আবেগে একটা বড় ভুল করে ফেলতে যাচ্ছিল। ভাবতেই আবার কান্না চলে আসলো। গালটা ব্যথায় টনটন করছে। জ্বলে যাচ্ছে।
— শেহরান সোজা ছাদে চলে আসলো। বুকের ভিতর ঝড় বইছে। দরজাটা ঠাস করে বন্ধ করে দিলো। পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা বের করলো। হাত দুটো কাঁপছে।
— লম্বা একটা টান দিলো। ধোঁয়াটা ছেড়ে দিলো আকাশের দিকে। মাথার ভিতর শুধু একটাই কথা ঘুরছে। ও নিজের হাতে শেষ করে দিতে চেয়েছিল। যে সন্তানটার অস্তিত্বের খবর সে মাত্র কয়েক মিনিট আগে পেয়েছে। যার ছোট্ট হার্টবিটটা সে এখনো শোনেনি। যার মুখটা সে কল্পনাও করেনি। সেই সন্তানকে তার নিজের স্ত্রী পেটের মধ্যেই মেরে ফেলতে চেয়েছে।
— শেহরান রেলিংটা খামচে ধরলো। কপালের রগ দপদপ করছে। চোখ দুটো লাল হয়ে গেছে।
— আমি কি করেছি ওর সাথে. বিড়বিড় করে বললো। “আমি তো কখনো বলিনি বাচ্চা চাই না। আমি শুধু বলেছিলাম এখন না। সময় হলে নিব। আর ও সোজা ওষুধ নিয়ে আসলো?”
— আরেকটা সিগারেট জ্বালালো।
— মাইরা এখনো দাঁড়িয়ে আছে। গালটা জ্বলছে। কিন্তু গালের ব্যথার চেয়ে বুকের ভিতরের ব্যথাটা হাজার গুণ বেশি। শেহরানের বলা প্রতিটা কথা কানে বাজছে। মাইরা ধীরে ধীরে মেঝেতে বসে পড়ল। হাঁটুতে মুখ গুঁজে দিলো।
— “আমি কি করে ফেলতে যাচ্ছিলাম? নিজেকেই প্রশ্ন করল।
বিছানার উপর রাখা ওষুধের পাতাটা চোখে পড়ল। মাইরা উঠে গিয়ে ওগুলো হাতে তুলে নিলো। হাত দুটো কাঁপছে।
— পেটের উপর হাত রাখল। এখনো কিছুই বোঝা যায় না। কিন্তু ওখানে একটা প্রাণ আছে। ভাবতেই দম বন্ধ হয়ে আসছে। পানি খেতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু ওঠার শক্তি নেই।
— “আমি মা হব। কথাটা মাথায় আসতেই আরও বেশি কষ্ট হচ্ছে। মা হয়ে কিভাবে এমন সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছিল? নিচ থেকে কোনো শব্দ আসছে না। শেহরান উপরে নেই। ছাদে গেছে বোধহয়। মাইরা জানে এখন গেলে ধমক খাবে। তবুও পা দুটো ছাদের দিকে চলে যাচ্ছে। সিঁড়ির দরজার কাছে গিয়ে থেমে গেল। উপরে যাবে কি যাবে না বুঝতে পারছে না।
— মাইরা দরজার ফ্রেম ধরে দাঁড়িয়ে রইল। ভিতরে যাওয়ার সাহস নেই। নিজের উপর নিজের ঘৃণা হচ্ছে। একটা ভুল সিদ্ধান্ত সবকিছু কেমন এলোমেলো করে দিলো।
— শেহরান একটার পর একটা সিগারেট জ্বালিয়েই যাচ্ছে। একবারও পেছনে ফিরে তাকাচ্ছে না। রেলিং ধরে শক্ত করে দাঁড়িয়ে আছে।
— মাইরা আস্তে আস্তে পিছনে গিয়ে দাঁড়ালো। “আমার ভুল হয়ে গেছে। আমাকে প্লিজ মাফ করে দিন।”
— শেহরান কোনো উত্তর দিলো না। শুধু সিগারেটে লম্বা টান দিলো।
— “আমি ইচ্ছা করে করিনি।” মাইরা আবার বলল। চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। “আপনি তো চাইতেন না এখন বাচ্চা নিতে। যার জন্য সেদিন আমাকে মেরেছিলেন না? ওইজন্য আমি ভয়ে এমন একটা কাজ করে ফেলেছি। আমাকে প্লিজ মাফ করে দিন।”
— কথাটা শেষ করেই মাইরা কাঁপা হাতে শেহরানকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলো। একদম শক্ত করে। মুখটা শেহরানের পিঠে গুঁজে দিলো।
— “ছাড়ো।
— মাইরা ছাড়ল না। আরও জোরে আঁকড়ে ধরলো। “একটু একটু সময় দিন। প্লিজ।”
— শেহরান হঠাৎ করে ঝাড়া দিয়ে মাইরার হাত দুটো সরিয়ে দিলো। এত জোরে যে মাইরা টাল সামলাতে না পেরে দুই পা পিছিয়ে গেল।
— হিসহিস করে বলল, খবরদার আমাকে ছুবি না।
— মাইরা কেঁপে উঠল। হাত দুটো বুকের কাছে নিয়ে নিলো। যেন খুব ব্যথা পেয়েছে।
— “তোর ছোঁয়া আমার গা জ্বালা করে এখন।” শেহরান আবার সিগারেট ধরালো।
— মাইরা কিছু বলতে পারল না। শুধু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। বুকের ভিতরটা ফেটে যাচ্ছে। কিন্তু কান্নার শব্দ করল না।
— শেহরান আকাশের দিকে ধোঁয়া ছাড়ল। “ভয় পেয়েছিলি? তাই আমার সন্তানকে মারতে চেয়েছিলি? বাহ। খুব ভালো যুক্তি।”
— “আমি” মাইরা বলতে গিয়েও থেমে গেল। কি বলবে? সব অজুহাতই তো এখন মিথ্যা লাগবে।
— অনেকক্ষণ পর মাইরা খুব আস্তে বলল, আমি আর কখনো এমন ভুল করব না। কখনো না।
— শেহরান পেছন ফিরল না। শুধু বলল, “রুমে যা। আমার একা থাকতে দে।”
— মাইরা আর দাঁড়াল না। পা টিপে টিপে দরজার দিকে চলে গেল। যাওয়ার সময় একবার পেছন ফিরে তাকালো। শেহরান আগের মতোই রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে। একটার পর একটা সিগারেট খেয়েই যাচ্ছে।
এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ৩১
— মাইরা দরজাটা আস্তে করে বন্ধ করে দিয়ে নিচে নামতে লাগলো। প্রথম সিঁড়িতে পা দেওয়ার সাথে মাথাটা কেমন ঘুরে উঠলো। চোখ দুটো কেমন ঝাপসা হয়ে উঠল। সাথে সাথে মাইরা পড়ে গেল নিচে।
— শেহরান চমকে উঠলো। ভারী নিস্তবতার মাঝে হঠাৎ ধপ করে পড়ার শব্দটা কানে এসে বাজলো। হাতের সিগারেটটা ছুড়ে ফেলে দৌড়ে গেল সিঁড়ির দিকে।
