Home কাছে আসার মৌসুম কাছে আসার মৌসুম শেষ পর্ব

কাছে আসার মৌসুম শেষ পর্ব

কাছে আসার মৌসুম শেষ পর্ব
নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি

ইতুর ঘুম ভাঙল একটা ফ্যাচফ্যাচে কান্নার শব্দে। তখন মার খেয়ে এসে কাঁদতে কাঁদতে সেই যে ঘুমালো,আর সজাগ হলো এখন। চোখ মেলতেই দেখল ওর ক হাত দুরুত্বে বসে কাঁদছেন মা। মাথাটা বাবার বুকে নোয়ানো।
শুনতে পেলো ইউশা বলছে,
“ একটু বোঝাও না মেজো ভাইয়াকে। বোঝাও না একটু! অন্যের ওপর রাগ করে কেন রায়ানকে দূরে পাঠাতে হবে?”
অয়ন দীর্ঘশ্বাস ফেলল,
“ কী বোঝাব? ভাইয়া একবার যা সিদ্ধান্ত নেয় তা থেকে ওকে ফেরত আনা যায় না। জানোই তো ও কেমন!”
ইউশা মুখ তুলল। রুষ্ট চোখে বলল,

“ এর মানে তুমি বোঝাবে না? বলবে না কিছু!”
“ আমি কিছু বলতে গেলে যদি শুনতে হয়,ওর ছেলের ব্যাপারে যেন নাক না গলাই,তখন?”
ইউশার যুক্তিতর্ক হারিয়ে গেল এখানে। গুণগুণ করে কেঁদে গেল তাই। ইতু বড়ো আশ্চর্য হলো। ছোট্ট মাথায় ঢুকলো না,কোথায় যাবে লায়ান ভাই?
মা বাবার কথাবার্তার মাঝেই পিঁপড়ের গতিতে খাট ছেড়ে নেমে গেল সে। গিয়ে সারা বাড়ি খুঁজল,দেখল রায়ান নেই। তবে আবহাওয়া থমথমে বড্ড। কেউ কোনো কথা বার্তা বলছে না। তুশি কাঁদছে!
কেন কাঁদছে? আবার কি লায়ান ভাইয়ের জ্বর এলো?
ঘড়িতে আনুমানিক কত বাজে খেয়াল নেই। এখনো রাতের আহার নেয়নি কেউ। সার্থ ফিরল তক্ষুনি। দরজা খোলা দেখে বুঝল,সবাই ওর আশাতেই বসে আছে । তেমন ও ঢুকতেই উঠে দাঁড়াল একেকজন। সাইফুল কিছু বলতে চাইছিলেন,থেমে গেলেন পরপর। সার্থর চোখদুটো টকটকে লাল হয়ে আছে। তুশি আপোষে বুঝে ফেলল,মানুষটা কেঁদেছে। নিজের সমস্ত অনুনয় মূহুর্তে গিলে ফেলল ও। স্বামীর এমন ক্ষতবিক্ষত চেহারা দেখে ভেতর ভেতর বুকে ধড়ফড় শুরু হলো। কিন্তু সার্থ কারো সাথে কথা না বলে,সোজা চলে গেল ওপরে। ঠিক মিন্তুর ঘরের দিকটায়!
ততক্ষণে রায়ান দরজা ধাক্কানো বন্ধ করে দিয়েছে। ডেকে ডেকে ক্লান্ত । মিন্তুও ফেরেনি অফিস থেকে!
রায়ান বালিশে মুখ গুজে উপুড় হয়ে শুয়েছিল,মাথায় একটা নিবিড় হাত পড়ল তখনি। চমকে তাকাতেই,চোখদুটো কাঁপল সহসা। আর্তনাদ করে ডাকল,

“ পাপায়ায়ায়া!”
তারপর এক ঝটকায় বাবার শক্ত বুকে ঝাঁপ দেয় রায়ান। ছোট বাচ্চা তো! হাউমাউ করে বলে,
“ আমি বোর্ডিং এ যাব না পাপা। আমাকে প্লিজ কোথাও পাঠিও না।”
সার্থ ঢোক গিলল। ফের লাল চোখটা জলে ভরবে ভরবে ভাব। কিন্তু শ্বাস নিলো সে। বুকে জোর আনল। ও যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে,তাতে ওকে অটল থাকতে হবে।
ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে মোলায়েম স্বরে ডাকল,
“ রায়ান,মাই বয় লিসেন টু মি…”
রায়ান মাথা তুলে চায়। দুইহাতের বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে ওর দুই চোখের পানি মুছিয়ে দেয় সার্থ। আজোলে পুরে রাখে মুখটা।
খুব নরম সুরে বলে,

“ তুমি কখনো দেখেছ,আমার জন্যে তোমার দিদান কারো কাছে বাজে কথা শুনেছে? কেউ কখনো এসে তাকে রুডলি বলেছে, আমাকে সে ভালো শিক্ষা দেয়নি?”
রায়ান মাথা নাড়ল দুপাশে। বোঝাল, না। বলল,” সবাই তো তোমার খুব প্রশংসা করে পাপা। প্রাউড ফিল করে। তাহলে বাজে কথা কেন বলবে?”
“ এক্সাক্টলি মাই বয়,
সবাই আমাকে নিয়ে প্রাউড ফিল করে কারণ আমি সেই অবধি নিজেকে পৌঁছাতে পেরেছি। কিন্তু তুমি আজ খেয়াল করেছ,মুনের আম্মু তোমার মাম্মামকে কত আজেবাজে কথা শোনাল,তোমার জন্যে? দেখেছ,মাম্মাম কীভাবে মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে ছিল? এভাবে নতজানু তো ক্রিমিনালরা হয়,তোমার মাম্মাম কি ক্রিমিনাল?”
“ না পাপা!”
“ তাহলে কেউ কেন তোমার মাম্মাকে কথা শোনাবে? তোমার জন্যে মাম্মামের দিকে কেউ আঙুল তুলছে,রাগ দেখাচ্ছে,এটা তোমার ভালো লাগছে রায়ান?”

“ একটুও না।”
“ মাম্মামকে ভালোবাসো?”
“ খুউউব ভালোবাসি!”
“ তাহলে মাম্মামকে ভালোও রাখতে হবে। আমি তো সব সময় থাকব না। মাম্মামের দায়িত্ব তোমাকেও নিতে হবে। আর সেজন্যে সবার আগে তোমাকে মানুষের মতো মানুষ হতে হবে,পাপা। লেখাপড়ায় মন দিতে হবে, এরকম মারপিট করা যাবে না। এত ডানপিটে হওয়া যাবে না। তোমাকে পাংকচুয়াল হতে হবে,পাপার মতো!’’
রায়ান মাথা নিচু করল।
“ মাম্মাম তোমাকে খুব বকে আমি জানি। কিন্তু কখনো কখনো বাবা মা ছেলেমেয়েদের ভালোর জন্যে বকে,মাম্মাম তোমার ভালো চায়।
তুমি যখন ম্যাচ খেলে জিতে আসো, মাম্মাম খুশি হয় না?”
“ হয়!”
“ তাহলে একবার ভাবো, তুমি যখন লেখাপড়ায় ভালো করবে,পাপার মতো বা চাচ্চুর মতো হবে মাম্মাম কত খুশি হবে তখন! কত সুন্দর ভাবে হাসবে! তুমি সেই হাসি দেখতে চাও না?”

“ চাই পাপা।”
“ বোর্ডিং খারাপ কিছু না মাই বয়। ওখানে আরো অনেক বাচ্চা আছে। তোমার মতো,তোমার থেকে ছোটোরাও থাকে। তুমি সেখানে কত বন্ধু পাবে ভেবে দেখেছ! অনেক কিছু শিখবে তুমি! সেই সাথে একটা গুড বয় হবে। আর গুড বয়দের কেউ কখনো বকে না।”
রায়ান ফের মাথা নুইয়ে ভাবল। ও ভালো ভাবে পড়লে মাম্মাম খুশি হবে,হাসবে!
আর ও অন্যায় কিছু করলে মাম্মাম দুঃখ পাবে,আজকের মতো মাথা নুইয়ে থাকবে। মাম্মামের হাসি সুন্দর না? হ্যাঁ সুন্দর তো!
রায়ান মূহুর্তে বলল,
“ পাপা,আমি যাব।”
তুশি দোনামনা করছিল ঘরের ভেতর আসা নিয়ে। সার্থর প্রতি সম্মান কিংবা ভয়ে,পা চলছিল না চৌকাঠের এপাশে।
জিভে ঠোঁট ভিজিয়ে পর্দা ঠেলবে,তক্ষুনি ও পাশ থেকে বেরিয়ে এলো সার্থ। ওর থেকেও সাথে
রায়ানকে দেখে মেয়েটা অবাক হলো বেশি। কিছু বলার আগেই দুহাত বাড়িয়ে ওর কোমর জড়িয়ে ধরল রায়ান। থুত্নি ঠেকিয়ে শুধাল,

“ আমি তোমাকে খুব জ্বালাই,তাই না মাম্মাম?”
তুশির বাঁধ ভেঙে গেল এবার।
ধপ করে বসেই ছেলেটাকে বুকে টেনে নিলো। হুহু করে কেঁদে ফেলল, আজ অনেক বছর পর।
“ না পাপা,তুমি আমাকে জ্বালাও না। একটুও না।”
রায়ান মুখ তুলে আনে। পেলব হাতে মায়ের চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বলে,
“ মাম্মাম তুমি কেঁদো না,রায়ান গুড বয় হয়ে যাব।”
তুশি বিভ্রান্ত হয়ে সার্থর দিকে চাইল। একটু হাসল মানুষটা। রায়ানের তালুর চুল নেড়ে দিয়ে বলল,
“ ও নিজেই যেতে চাইছে।”
তুশি বিস্ময় নিয়ে ছেলেকে দেখল আবার। ভেজা চোখে বলল,
“ তুমি যেতে চাও রায়ান?”
রায়ান সানন্দে মাথা নেড়ে বলল,
“ হ্যাঁ, আমি ওখানে অনেক বন্ধু পাব। অনেক কিছু শিখব। তারপর গুড বয় হয়ে ফিরে এলে তুমি আমাকে আর বকতে পারবে না।”
তুশি কী বলবে বুঝতে পারল না। নিস্তব্ধ বনে একবার ছেলে,পরেরবার
সার্থর দিকেই চেয়ে রইল শুধু। সার্থ বলল,

“ যাও রায়ান,নিচে গিয়ে সবাইকে বলে এসো।”
রায়ান ছুটল সাথে সাথে। তুশি বসে রইল,চেয়ে থাকলো ছেলের ওই দুরন্ত গতিপানে। সামনে তাকাতেই সার্থ হাত পাতল উঠে আসার জন্যে। তবে ধরল না তুশি। নিজেই দাঁড়াল। অভিমান নিয়ে বলল,
“ ছেলেটাকে দূরে পাঠাতে এমন উঠেপড়ে লেগেছেন কেন? ও গেলে তো সব চেয়ে বেশি কষ্ট আপনারই হবে। এই ছেলের জন্যে,আর বাচ্চা নিতে চাননি। বলেছিলেন,রায়ান আপনার কোলে দ্বিতীয় বাবু দেখলে কষ্ট পাবে। তাহলে এখন এসব কী শুরু করলেন বলুন তো?”
তুশির দুই চোখে পানি বর্ষার মতো ঝরছে। কথায় তেজ তাও। সার্থ ওকে টেনে ঘরে নিয়ে গেল। একটা চেয়ার দেখিয়ে বলল,
“ বসো।”
“ বসব না।”
সার্থ চ সূচক শব্দ করে বাহু ঠেলে নিজেই বসিয়ে দেয়। টেবিল থেকে পানির গ্লাস এনে বলে,
“ খাও।”
তুশি মুখ ঘুরিয়ে নিলো। সার্থ সেই আগের মতো চিবুক ধরে ফেরাল নিজের দিকে। গ্লাসটা ঠোঁটে ধরতেই তুশি অতীষ্ঠ সুরে বলল,

“ আমার তেষ্টা পায়নি।”
“ তাও খেতে হবে। ঝগড়া করতে করতে গলা শুকিয়ে গেলে কী করবে? খাও।”
মহাবিরক্ত হয়ে গ্লাসে এক চুমুক দিলো তুশি। দুম করে সেটা রাখল নিজের পাশে। কিছু বলবে,এর আগেই সার্থ ফ্লোরে এক হাঁটু ভেঙে বসল ওর সামনে। হাতদুটো ছুঁতেই তুশির সব রাগ শেষ। বরং,শীতল চোখে চাইল সে।
সার্থ স্ত্রীর দুইহাতে ঠোঁট নামিয়ে চুমু দেয়। মাথা তুলে বলে,
“ তুশি,আমি এতটা সময় ধরে অনেক ভেবেছি! সত্যিই অনেক প্রশ্রয় দিয়ে দিয়ে রায়ানকে বখে ফেলছিলাম। এই বয়সে একটা ছেলের মাথা ফাটাতে ওর এক ফোঁটাও হাত কাঁপেনি, কারণ ও জানে ওর সাথে ওর পাপা আছে। আর এই সত্তাটাই ওর মধ্যে আমি বড়ো হতে দিতে চাই না।
আমি চাই ও তেজি হোক,কিন্তু নমনীয়ও হোক। মানুষের প্রতি ওর মায়া হোক। ও পড়াশোনায় ভালো করুক। একটা প্রপার ডিসিপ্লিন দরকার ওর। আর সেজন্যে ওর আদরের পাশাপাশি শাসনও দরকার। যেটা আমি পারব না! ওকে
একটা থাপ্পড় মারায় আমি কতগুলো রাত ঘুমোতে পারিনি। আমি রুড হলে ও সেটা নিতে পারবে না। আবার অন্য কেউ আমার সামনে ওর ওপর রুড হবে,আমি সেটাও টলারেট করতে পারব না। আমিই যত সমস্যার মূল! তাই ভাবলাম, এর চেয়ে ও আমার সীমানার বাইরে গিয়ে বড়ো হোক। একটা নিয়ম-কানুনের মধ্যে থাকুক। বেড়ে উঠতে উঠতে ওর দুষ্টুমি, অমনোযোগী ব্যাপার স্যাপার সব চলে যাবে।”
তুশি বলল,

“ এটাই একমাত্র কারণ,নাকি ওই মহিলা আমাকে ওভাবে বলল বলে?”
সার্থ ফোস করে শ্বাস ফেলে হাসল।
“ দুটোই। উনি তোমাকে ওভাবে বলায় আমি নিতে পারিনি। তোমাকে আমার পরিবারের কেউ কিছু বললেই যেখানে আমার পায়ের রক্ত মাথায় উঠে যায় সেখানে একটা বাইরের লোক কেন ওসব বলবে! যেখানে তোমার কোনো দোষই নেই? রায়ান আজ যা কিছু তৈরি হয়েছে,সেসব আমার জন্যে। আমার প্রশ্রয়ের জন্যে। আমি ভেবেছিলাম,আমার নিজের বাবার থেকে আমি যা পাইনি,সেসব আমি ওকে দুহাত ভরে দেব। আমার শৈশব নষ্ট হয়েছে,ওরটা হতে দেব না। ও দেখবে, ভালো বাবা কাকে বলে! কিন্তু কী জানো?
একটা সন্তানের পেছনে যেমন শাসনই মূল হয় না,তেমন আদরও না। সন্তানকে আদর্শ ভাবে মানুষ করতে আদর-শাসন দুটোই প্রয়োজন। আমার শাসন অনেক বাজে হয়ে যায়,এক চড়ে ছেলের জ্বর এসছিল। আমার দ্বারা সম্ভব হবে না। আবার আমি তোমাকেও কিছু বলতে দেব না। তাই চাইছি ও বোর্ডিং-এ থাকুক। আমার থেকে দূরে।”

“ কিন্তু সেখানে গিয়ে যদি উলটো হয়? যদি স্কুলটা ভালো নাহয়!”
“ আমি খোঁজ নিয়েছি। আমার চেনা কলিগের আত্মীয় আছেন,উনি ওখানকার ওয়ার্ডেন। রায়ান সব রকম ফেসিলিটি পাবে।”
“ আর যদি ওকে কেউ মারে?”
“ ও সার্থর ছেলে ম্যাডাম,কে মারবে? সাহস কার!”
তুশির চোখ দুটো ফের ভিজে এলো।
“ কিন্তু ওকে ছাড়া আমি থাকব কী করে? আপনিই বা কী করে থাকবেন?”
“ আমরা পারব তুশি,ছেলের ভালোর জন্যে আমাদের পারতে হবেই!”
রায়ানের বোর্ডিং গাজীপুরে।
আজ ওর যাওয়ার কথা। বাড়িময় এ নিয়ে শোকের শেষ নেই।
তুশি ব্যাগ গোছাতে গোছাতে ফোঁপাচ্ছে। তনিমা,রেহণূমা,ইউশা এদের কথা আর কী বলব! কারো দিকে তাকানোর জো নেই যেন। সার্থ এসব আর নিতে পারছিল না।
তাই একটা কড়া ঘোষণায় বলল,

“ রায়ান যাওয়ার সময় ওর সামনে যদি কেউ কাঁদো,আমি ওকে বাড়িতে আনবই না। কাউকে ওখানে গিয়ে দেখাও করতে দেবো না।”
তনিমা একটু রেগে রেগে বললেন,
“ তো কান্না এলে মানুষ কী করবে?”
“ চোখে ঢুকিয়ে রাখো।”
“ রক্তের মতো বদমাইশই হয়েছিস।”
শওকত চুপ করে পত্রিকায় মুখ গুজে রইলেন। চেহারার দশা ভালো না। মন তো চায় সার্থকে যখন তখন মেরে গালটা ফাটাতে। তার রাজামিয়াঁকে বাড়ি ছাড়া করছে। বাপের গায়ে এখন জোর নেই,তাই দামও নেই। অবশ্য দাম তো ছেলেটা কোনোকালেই দিত না।
এখনো কথা বলে না,হয়ত আর কোনোদিন বলবেই না। এক পরকীয়ার শাস্তি যে কত ভয়ানক,শওকত তার জীবন দিয়ে হাড়েহাড়ে বুঝছেন!
এখন সকাল আটটা বাজে!
ইতু ছাড়া গোটা বাড়ি সজাগ। ইতু ওঠে দশটার পরে। রায়ান উঠতো বারোটায়। আজ চোখ কচলে কচলে উঠেছে, তৈরি হচ্ছে। মিন্তু জুতো,মোজা সব পরিয়ে দিলো। গলায় একটা টাই বেধে দিলো ওর সাদা শার্টের ওপর। দুই বাহু ধরে ঝাঁকিয়ে বলল,

“ অল দ্য বেস্ট ভাগ্নে। জীবনে তুমি খুব বড়ো হও!”
“ মামু,পাপা বলেছে বোর্ডিং এ অনেক বন্ধু পাব। পাব কী?”
“ অবশ্যই পাবে। আমার ভার্সিটির হলে একবার তোমাকে নিয়ে গেলাম না? আমার কত ফ্রেন্ডস ছিল দেখোনি?”
রায়ান ঘাড় নাড়ল।
টাইটা হালকা ঢিলে করলে ভালো হতো। গলায় লাগছে। কিছুক্ষণ টানল ও। তবে বলার আগেই মিন্তু ওর হাত ধরে বেরিয়ে এলো বাইরে। বসার ঘরে লাগেজ থেকে শুরু করে রায়ানের সব জিনিস হাজির। বাকি যা লাগবে ওখানে গিয়ে কিনে দেয়া হবে।
রায়ান এলো হাসিমুখে,তবে দেখল কেউ হাসছে না। সাইফুল এগিয়ে এসে ওকে আদর করলেন। কপালে চুমু দিলেন। হাতে টাকা দিতে গেলে,সার্থ দুপাশে মাথা নাড়ল। বোঝাল,না দিতে।
সাইফুল আজ কথা শুনলেন না। ওর পকেটে ভরে দিয়ে বললেন,

“ চকলেট খেও নানাভাই!’’
কিন্তু রায়ান আজ একটা কাজের কাজ করল,টাকাটা পকেট থেকে বের করে ফের নানার হাতে দিয়ে বলল,
“ টাকা নিতে নেই নানাভাই,মাম্মাম বলেছে শুধু বড়োদের দোয়া নিতে হয়!”
তুশির এত কান্না পেয়ে গেল এতে। ঠোঁটের গায়ে ঠোঁট টিপে ধরে চিবুক নুইয়ে নিলো অমনি। সার্থ এসে ছেলের গলার টাই ঢিলে করে দেয়। রায়ান উদ্বেল হয়ে তাকায় বাবার পানে।
পাপা ঠিক বুঝল,ওর সমস্যা হচ্ছিল এটাতে?
অয়ন লাগেজ তুলতে গেলে,সার্থ বলল,
“ তুই যাবি?”
“ এগিয়ে দেই!”
“ আমি যাচ্ছি। অতটা পথ,তুই থাক। বিশ্রাম নে। কিছু লাগলে আমি তো জানাব।”
“ ওকে।”
রায়ানকে সবাই চুমু দেয়,জড়িয়ে ধরে। আদর করে করে কত কী বোঝায়!
ইউশা তো পারছিল না হাত-পা গড়িয়ে কাঁদতে। শুধু সার্থর জন্যে, কান্না চাপাতে গিয়ে নাকের ডগা ফুলছিল বারেবার। এদিকে রায়ান বারবার আশেপাশে দেখছে। ইতু কোথাও নেই! জিজ্ঞেস করল,

“ মিমি,ইতু কই?”
ইউশার খেয়াল এলো মাত্র।
“ ও তো ঘুম। আমি ডেকে নিয়ে আসি!”
যেতে নিলেই আটকাল অয়ন।
“ না,রায়ানকে যেতে দেখলে কেঁদে ভাসাবে। ওর সাথে যেতে চাইবে। আমি এক সাথে দুটো বাচ্চা সামলাতে পারব না।”
ইউশা ঠোঁট উলটে বলল,
“ তাই বলে রায়ান যাচ্ছে ও থাকবে না?”
তুশি বলল,
“ ডেকো না,থাক। বাচ্চা মানুষ অনেক কষ্ট পাবে!”
মাথা নাড়ল ইউশা। এরপর সবাই রায়ানকে নিয়ে লনের দিকে এগোয়। তবে গাজীপুর মিন্তু,তুশি আর সার্থ যাবে।
রায়ান মনে পড়েছে এমন ভাবে বলল,
“ মাম্মাম,আমার ব্যাটটা দিয়েছিলে!”
“ না পাপা। রুমে পাইনি।”
রায়ান দাঁড়িয়ে যায়।
“ কেন মাম্মাম? খাটের কোণায় ছিল। দেওয়ালের সাথে। তুমি দেখোনি?”
“ ছিল না বাবা।”
“ আমি খুঁজে নিয়ে আসছি।”

কিছু বলার আগেই রায়ান উল্টো ঘুরে বাড়ির দিকে ছুটল।
হাসনা সহ সবাই লনে, অন্তঃপুর ফাঁকা। জ্বিনের ভয়ে ভয়ে থাকা সেই আসমার বিয়ে হয়ে গিয়েছে। নতুন একজন কাজের লোক রাখা হয়েছিল তারপর। তখন তিনি রান্নাঘরে ছিলেন। রায়ান দুরন্ত পায়ে নিজের ঘরের পথ ধরল। ছুটতে ছুটতে ঢুকল। কিন্তু সত্যিই ব্যাটটা জায়গা মতো নেই।
রায়ান অস্থির হয়ে ফার্নিচারগুলোর এপাশ ওপাশ দেখে। ব্যাটটা ওর পছন্দ, শখেরও। ওই ব্যাট দিয়ে বলে বাড়ি দিলে কখনো ফাঁকা যায়নি। খুঁজতে গিয়ে রায়ানের মেজাজ প্রায় খারাপ হয়েই যাচ্ছিল, তক্ষুনি পাওয়া গেল ওটা। খাটের নিচে,তবে একদম ওই দিকে ঠেসে রাখা। এখানে আবার কে রাখল? হাতে তুলে দাঁড়িয়ে শ্বাস ফেলতে ফেলতেই বিজয়ী হাসল রায়ান। যাক,পেয়েছে।
কামরা ছেড়ে বের হয়ে,নিচে নামতে গিয়েও থামল হঠাৎ। ঘাড় ভেঙে ইউশাদের ঘরের দিকে তাকাল। তারপর ঠোঁট কামড়ে কিছু একটা ভেবে আস্তেধীরে দরজা ঠেলে ভেতরে এলো ছেলেটা। ইতু বিভোর হয়ে ঘুমোচ্ছে। ঠিক খাটের মাঝামাঝি,দুপাশে দুটো কোলবালিশ।
দুইহাত গালের নিচে, কাত হয়ে শোয়া। পরনের জামা পেটে উঠে আছে। রায়ান কাছে এসে ওর জামা নামিয়ে দেয়। গায়ে কাঁথা টেনে রাখে। একটা চুমু দেবে ভেবে,মাথা নামিয়েও ফেরত আনল আবার। নাহ,উঠে যায় যদি? ও ফিরে আসতে নেয়,তক্ষুনি জেগে যায় ইতু। পেছন হতে উদ্বেগ নিয়ে ডাকে,

“ লায়ান ভাইয়া!”
চোখ খিচে দাঁড়িয়ে গেল রায়ান। এই রে,জেগেই গেল?
ফিরল সে। ওর গায়ে নতুন জামাকাপড় দেখে ইতু ত্রস্ত নেমে এসে বলল,
“ বাইলে যাচ্ছো?”
“ হ্যাঁ।”
“ কোথায় যাবে?”
“ বেড়াতে।”
“ আমাকে নেবে না?”
“ ওখানে ফোঁকলাদাঁতিরা যায় না। তাহলে ওদের দাঁত ভেঙে দেয়!”
ইতু ভয়ে নিজের মুখ চেপে ধরল। আড়াল করল দাঁত। চোখ বড়ো বড়ো করে বলল,
“ সত্যি? এত খালাপ!”
মনে মনে হাসল রায়ান। খুব কষ্ট হচ্ছিল ওর! খারাপ লাগছিল। ইতুটাকে রেখে ও থাকবে কী করে? তাও বলল,
“ তুই আরেকটু ঘুমা,আমি যাই এখন।”
ইতু আবার বলল,
“ লায়ান ভাই,কবে আসবে তুমি?”
“ কাল আসব।”
“ আচ্ছা, তাহলে যাও। ও শোনো শোনো…”
রায়ান ফের দাঁড়াল।
“ যেখানে যাচ্ছো সেটা কি সুন্দল জায়গা?”
“ হ্যাঁ। পাপা বলেছে খুব সুন্দর!”
ইতু কী যেন ভাবল। তারপর ঝড়ের বেগে ছুটে গেল নিজের ডল হাউসের দিকে। ঝাঁকড়া বড়ো চুলের একটা মেয়ে পুতুল তুলে এনে বলল,

“ লায়ান ভাই,ওকে নিয়ে যাবে?”
এইবার রায়ান কপাল কুঁচকে ফেলল।
“ তোর পুতুল আমি নেব কেন?”
“ পিজ, নিয়ে যাও না। ও আমাল মেয়ে,মিনি।
আমি ওকে বলেছি ঘুলাব। কিন্তু ঘুলাতে পালিনি। ও খুব লেগে আছে, তুমি ওকে ঘুলিয়ে আনো।”
রায়ান রেগে গেল। কিছু বলার আগেই ইতু খুব নিষ্পাপ মুখে বলল,
“ লায়ান ভাই,আল কিছু চাইব না। শুধু ওকে ঘুলাও পিজ। ওল তো দাঁতে পোঁকা নেই দেখো।”
নিচ থেকে বাড়ির লোক ডাকছিলেন। ব্যস্ততা খুব! রায়ান এই সময় ইতুপিতুর সাথে ঝামেলায় যেতে চাইল না। কান্না জুড়ে দিলে সবাই তো ওকেই বকবে। বলবে,তুমিই ওর ঘুম ভেঙেছ। রায়ান অনীহায় হাতে নিলো পুতুলটা। ফেরার সময় মামুকে দিয়ে দেবে। বেরিয়ে আসতে আসতে ইতু পেছন পেছন আসছিল।
বলছিল খুব হড়বড়িয়ে,
“ ওকে কিন্তু মেলো না। তালাতালি এসো। আমি অপেক্কা কলব।”
রায়ান থমকায়, ফিরে চায়। হেসে দেয় পরপর।
বলে,
“ আচ্ছা,করিস। যাই….”
দ্রুত পায়ে নামতে নিলো রায়ান। আবার থামল। ইতু এত তাড়াতাড়ি সিঁড়ি বেয়ে নামতেও পারে না,উঠতে তো আরো আগেই পারে না। আজ নিজেই রায়ান পিঠ বাড়িয়ে বসল ওর সামনে। বলল,
“ ওঠ।”
ইতু খুশি হয়ে গেল। দুহাতে জড়িয়ে ধরল গলা। এক হাতে ব্যাট,পুতুল,আরেক হাত দিয়ে ইতুকে আগলে নিচে নামল রায়ান।
বাইরে এসে রায়ান সবার থেকে বিদায় নিলো। এরপর মা-বাবার সাথে উঠে বসল গাড়িতে। জানলা থেকে চেয়ে হাত নেড়ে বাই বাই বলল সকলকে। ইতু একইসাথে দুই হাত নাড়ল। উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল,

“ লায়ান ভাই,মিনিকে নিয়ে তালাতালি এসো। ওল বিয়ে দিতে হবে।”
রায়ান নাক কুঁচকে চ সূচক শব্দ করে বলল,
“ বেশি কথা বলিস না,ফোঁকলাদাঁত খুলে যাবে।”
ইতুর হাসিটা দপ করে বন্ধ হয়ে যায়। অভিমানে নামিয়ে নেয় টাটা দিতে থাকা দুইহাত। রায়ান মজা পেয়ে হেসে ফেলল তাতে। কিন্তু
গাড়ির ইঞ্জিন চালু হতেই নারীমহল আর চোখের পানি আটকে রাখতে পারলেন না। হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন।
ইতু বেশ ঘাবড়ে গেল সবাই একসাথে কাঁদায়। নিজেও ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলল অমনি। গাড়ি তখন গেইট পেরিয়ে গেছে। অয়ন তাড়াহুড়ো করে কোলে তুলল মেয়েকে। গায়ে মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে ভেতরে যেতে নিলো,দেখল ইউশাও হেচকি তুলে কাঁদছে। অয়ন পোড়া শ্বাস টানে। সবার মধ্যে আচমকা এসে ইউশার কনুই ধরে কোথাও টেনে নিয়ে যায়।
মেয়েটা প্রশ্ন করেনি,কাঁদছিল তবে। অয়ন ওকে আর ইতুকে নিয়ে বাড়ির পেছনের পথ ধরল। সেই পুলের দিকটায়। স্বচ্ছ টলটলে জল,যেখানে ইতুকে আসতেই দেয়া হয় না সেখানটা দেখে ইতুর চোখদুটো আনন্দে জ্বলে ওঠে। কান্না ভুলে যায়। তড়িৎ বাবার কোল থেকে নেমে ছুটে যায় সে। ইউশা নাক টানতে টানতে চারপাশ দেখল। চোখ মুছে বলল,

“ এখানে এলাম কেন?”
অয়ন কথা বলে না। টাকনু থেকে প্যান্ট একটু ওপরে ভাঁজ করে,আচমকা পুলের মধ্যে পা ডুবিয়ে বসে পড়ে। ইউশা চমকাল কিছু!
বড়ো বড়ো চোখদুটোয় চেয়ে অয়ন পাশের জায়গা দেখাল। ইউশার ভালো লাগছিল না! বসল তাও। সুতির কফি রঙের শাড়িটা মূহুর্তে নিচ থেকে ভিজে ডুবুডুবু হলো।
ওর মলিন মুখে চেয়ে অয়ন বলল,
“ এত দুঃখ পাওয়ার কী আছে,ইউশা? রায়ান তো প্রায়ই আসবে। ছুটিতে আসবে,আমরাও যাব। তাহলে?”
“ তাও,চোখের সামনে থাকা,আর এভাবে দূরে থাকা কেমন না? তুমি বুঝবে না,বাচ্চাটাকে তো ওর মায়ের আগে আমিই কোলে নিয়েছিলাম!”
“ আচ্ছা, কষ্ট পেও না। প্রতি সপ্তাহে গিয়ে দেখা করিয়ে আনব।”
ইউশা ভ্রু কুঁচকে চাইল,
“ মজা করছো? তুমি যা ব্যস্ত! কীভাবে যাবে?”
“ বউয়ের খুশির জন্যে সময় বের করতে না পারলে,কেমন স্বামী হলাম?হু?”
ইউশার চেহারায় আলো ফিরল। লজ্জা পেলো একটু। দুটো গালের ফেঁপে ওঠা দেখেই স্বস্তির শ্বাস ফেলে হাসল অয়ন।
চিবুকে আঙুল রেখে বলল,
“ এই তো,আমার বউ এভাবেই হাসবে। তাকে মুখ কালোতে একদম মানায় না।”
ইউশা ওর বাহুতে হাত ঢুকিয়ে কাঁধে মাথা রাখল। জলের ভেতর পা নাড়তে নাড়তে বলল,

“ জানো,এই পুলের সাথে আমার অনেক স্মৃতি আছে।”
“ কীরকম?”
“ তুমি যখন আমাকে ভালোবাসতে না,তখন আমি এখানে বসে বসে কাঁদতাম।”
অয়নের খারাপ লাগল শুনে। মেয়েটা ওর সামনেই কত কষ্ট পেয়েছিল,অথচ ও বুঝতেও পারেনি!
পরপর ঠোঁট টেনে হাসল ও। একটু নুইয়ে ওইভাবেই ইউশার চুলে চুমু খেয়ে বলল,
“ কিন্তু এখন যে খুব ভালোবাসি! তাহলে?”
ইউশা উচ্ছ্বল চিত্তে বলল,“ তাহলে আর কী? আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী নারী!”
ইতু অদূরে একটা প্রজাপতির সাথে খেলছিল। বাবা-মাকে এমন কাছাকাছি দেখে সব ফেলে ছুটে এলো অমনি।
“ মাম্মা,বাপি!” ওর এমন চিৎকারে ইউশা মাথা তুলল অয়নের কাঁধ থেকে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“ ওই,আসছেন!”
ইতু দৌড়ে এসেই পেছন থেকে বাবার গলায় ঝুলে পড়ল। অয়ন হেসে আকড়ে ধরল ওর দুইহাত। গালে চুমু দিয়ে
ডাকল,
“ আমার মা!”
তারপর অন্য হাত দিয়ে ইউশার কাঁধ প্যাঁচাল।
ওর গালেও একইরকম চুমু দিয়ে বলল,
“ আমার স্ত্রী,মাই লিটল চেরি…”
ইউশা কানে চুল গুঁজতে গুঁজতে হাসল নিঃশব্দে,তবে লাফিয়ে চড়িয়ে খিলখিল করে হেসে উঠল ইতু। বাবা মায়ের এমন সুন্দর দৃশ্যে খুব আনন্দ পায় সে। মেয়ের উচ্ছ্বাসে হাসল অয়ন,ইউশাও।
ওদের তিনজনকে দেখে বোঝা গেল,ভাঙা মন নিয়েও কখনো-সখনো কারো শুরু করা সংসারের সমাপ্তিটা সুখের গল্পে মোড়া হয়! সাথে উল্টোপাশের মানুষ সঠিক হলে,অতীতের ব্যথা ভুলেও ভালো থাকা যায়!

প্রায় ১০ একর জায়গাজুড়ে বোর্ডিং এর ক্যাম্পাস অবস্থিত। একটা চারতলা ক্রিম রঙের একাডেমিক ভবন, বড়ো কাচের জানলা, লম্বা গাছের সারি দিয়ে ঘেরা মাঠ সাথে আবাসিক সুবিধাও আছে। মূলত জাপানের শিক্ষা-দর্শন অনুসরণ করে স্কুলটি পরিচালিত হয়।
সামনে জাতীয় পতাকা ও অ্যাসেম্বলি গ্রাউন্ড।
মাঠের একপাশে বাস্কেটবল কোর্টটা দেখেই রায়ানের দুই চোখ চকচক করে উঠল। , অন্য পাশে বিশাল খেলার মাঠ। হোস্টেল ভবন এক পাশে, যেখানে ছেলে-মেয়েদের আলাদা আলাদা থাকার জায়গা।
ও মুগ্ধ হয়ে দেখল চারিপাশ। বিশাল লাগেজটা ওর নির্ধারিত রুমে ড্রাইভার তুলে দিয়ে আসছেন। মাঠে কয়েকটা বাচ্চারা খেলছিল। রায়ান ফিরল পাপার দিকে।
সার্থ বলল- যাও।
অমনি হাতের ব্যাট রেখে পাখির মতো ছুটল রায়ান। তুশি এতক্ষণে স্বস্তির শ্বাস ফেলল। ছেলে খেলছে- ছুটছে, যাক! মানিয়ে নিতে অসুবিধে হবে না। রায়ান কিছুক্ষণ খেলে ফিরে এলো। হাঁপাতে হাঁপাতে দাঁড়াতেই পানির বোতলের ছিপি খুলে দিলো তুশি।
সার্থ রুমাল বের করে রায়ানের ঘাম মুছে দেয়। তুশি ফোস করে শ্বাস ফেলে। সার্থর হাতে ওর সেই নকশা করে দেয়া রুমাল। আর এটা নিয়ে লোকটা ওকে এক সময় কী যে বোকা বানিয়েছে। বিয়ের তিন বছর অবধি তুশি ধরতেই পারেনি রুমালটা সার্থর কাছে ছিল। যেদিন দেখল,আকাশ থেকে পড়ল ও। সার্থ ধরা পড়ায় বোকার মতো একটু হাসল শুধু। কোনো জবাবদিহি করল না,সাফাইও গাইল না। রুমাল ফের পকেটে ভরে থানায় চলে গেল।
ওর ধ্যান ভাঙল মিন্তুর কথায়।

“ চলো ভাগ্নে,তোমার রুম সেট। এবার তাহলে তুলে দিয়ে আসি।”
রায়ান মাথা ঝাঁকায়। হাতের উল্টোদিক দিয়ে ভেজা ঠোঁটটা ডলে-মুছে হাঁটা ধরে জলদি। হঠাৎ থেমে চাইতেই, সার্থ এগিয়ে দেয়
“ ব্যাট!”
রায়ান হাসল। পাপা ওর সব খেয়াল রাখে। মিন্তু আর মায়ের সাথে সে ওপরে চলে গেলেও,
হোস্টেলের মেন গেইট অবধি এসে থেমে রইল সার্থ । বড়ো করে শ্বাস নিলো ঝকঝকে দেওয়ালগুলো দেখে। একটু পরেই তুশি নেমে এসে বলল,
“ কী হলো,এলেন না যে?”
“ ভালো লাগছে না!”
তুশির চোখ ভিজে এলো মূহুর্তে।
“ তাহলে কেন দিলেন?”
“ ওর ভালোর জন্যে!”
“ এখন থাকতে পারবেন তো ছেলে ছাড়া?”
সার্থ পাশ ফিরে চায়। ভ্রু কুঁচকে বলে,

“ কাঁদছো কেন?”
“ জানি না,খুব কান্না পাচ্ছে!”
“ সারাপথ তো ঠিক ছিলে।”
“ ওটাতো আপনার ভয়ে! মাকে যেই ঝারি দিলেন…”
সার্থ হেসে ফেলল। হাত বাড়াল লম্বা করে,
“ বুকে এসে কাঁদো তাহলে।”
তুশি বুকে এলেও,সামলাল নিজেকে। পরপর বলল,” রায়ানের রুম সুন্দর হয়েছে। আলোবাতাস আসবে।”
সার্থ প্র‍তাপ সমেত বলল,
“ তুশি,আমি কাল এসে সব দেখে গেছি। আমার ছেলের জন্যে বেস্টটা রাখব আমি, এটা নিশ্চয়ই জানো!”
রায়ানের ঘর দোতলায়। করিডোরের রেলিং থেকে নিচে তাকিয়ে ডাকল,
“ মাম্মাম,পাপা!”
ওরা মুখ তুলে চাইল। হাসল সাথে সাথে। রায়ান হাত নেড়ে বলল,
“ ওপরে অনেক বড়ো ইনডোর প্লেগ্রাউন্ড আছে। আমি এখানে সারাদিন খেলব। না না,পড়বও।”
সার্থ হাসে। তুশির পানে চায়। রায়ান বলল,
“ আমি এখন রুমে যাব। তোমরা বাসায় যাও,সন্ধ্যে হয়ে যাবে।”
দুজন মাথা নাড়ল,আর রায়ান ছুটল কোনোদিকে। সার্থ ফোস করে শ্বাস ফেলে তুশিকে বুকের সাথে আকড়ে ধরল আরেকটু। মেয়েটা ফোঁপাচ্ছে। কাঁদছে ঠিকই! মিন্তু নেমে এলো তখনই। দুহাত ঝেরে বলল,
“ তুশিপু কেঁদো না। রায়ান মজাতেই আছে। আমাকেও কেমন ঠেলেঠুলে পাঠাল দেখো।”
তুশি শান্তি পায়।
মাথা নাড়ে। মিন্তু বলে,

“ আমি একটু আসছি,ভাগ্নেকে কিছু খাবার দিয়ে যাই। বাচ্চাটা আলুজ ছাড়া তো থাকতেই পারে না।”
বলতে বলতে চলেও গেল সে।
সার্থ তখনো চেয়ে রইল ওপরে,রায়ানের ছুটে যাওয়া পথটায়। মনে মনে ভাবল,
“ দোয়া করি বাবা,যে জন্যে তোমাকে দিয়ে গেলাম তা যেন পূরণ হয়। মানুষের মতো মানুষ হও! সেদিন যেমন তোমার জন্যে তোমার মায়ের দিকে মানুষ আঙুল তুলেছিল এরপর যেন তোমার জন্যেই সবাই তোমার মাকে বাহবা দিতে পারে!”
তুশি তক্ষুনি ভেজা গলায় বলল,
“ ছেলেটাকে ছাড়া আমি এখন কীভাবে থাকব? আমার খুব একা একা লাগবে!”
সার্থ দুষ্টুমি করে ফিসফিস করল,
“ তাহলে চলো আরেকটা নিয়ে নিই।”
“ আপনিই তো চাইলেন না।”
“ এখন চাইলাম তো।”
“ এখন আমার বয়স হয়েছে না?”
“ হয়েছে? মনে তো হয় না। এখনো দেখতে আমাকে সিডিউস করার মতোই আছো।”
বলতে বলতে তুশির মুখ হতে কোমর অবধি সার্থ নজর বুলিয়ে আনল। মেয়েটা মৃদূ স্বরে আর্তনাদ করল,
“ ইয়া আল্লাহ,কীসব কথাবার্তা! “
“ ভালোবাসার কোনো বয়স নেই তুশি। বলো, আবার মা হতে চাও?… “
তুশি মুখ গোজ করে বলল,

“ কীভাবে জিজ্ঞেস করছে দেখো,যেন হ্যাঁ বললে এক্ষুনি এনে দিতে পারবেন?”
“ তা হয়ত পারব না। তবে প্রসেসিং তো শুরু করাই যায়। আমার বয়স বাড়লেও,ডিএনএ-তে এখনো একইরকম জোর।”
তুশি অমনি ওর বাহুতে একটা ঘুষি মারল।
চাপা কণ্ঠে বলল,
“ ছিহ বিটকেল একটা!”
সার্থ শব্দহীন হাসে। লজ্জায় রাঙা হয়ে থাকা স্ত্রীকে আড়াল করতে বাহুতে টেনে নেয়। পেশিবহুল দুইহাত দিয়ে আষ্ঠেপৃষ্ঠে রাখে। তুশি সেখানে মিশে থেকে থেকেই সুখ নিয়ে হাসল। বিড়বিড় করল মিনমিন করে,
“ আপনি কিন্তু সত্যিই একটা বিটকেল!”
সার্থ বুক ভরে দম নিয়ে বলল,
“ আর তুমি তুশি,আমার তুশি…আর…”
তুশি মুখ তুলে বলল,
“ আর আপনার অ্যাই চোর!”
সার্থ হেসে ফেলল। স্ত্রীর নাকে নাক ঠুকে বলল,
“ ঠিক তাই! আর আমি আমার অ্যাই চোরটাকে ভীষণ ভালোবাসি!”
তুশি তার চেয়েও প্রশান্তি নিয়ে বলল,
“ আমিও বাসি। আমাকে জেলে আটকাতে গিয়ে,ভালোবাসায় আটকে ফেলা বিটকেলটাকে আমিও খুব ভালোবাসি!”

এখানকার ছেলেপেলে ভালো,মিশুকে। রায়ানকে দেখেই কেমন খেলতে ডাকছে,মিশতে আসছে। রায়ানের ঘর সাজানোই ছিল। ও দৌড়ে এলো টেবিলের ওপর ব্যাটটা রাখতে। এত ছোটাছুটিতে এটাকে আর বয়ে বেড়ানো যাচ্ছে না। কিন্তু রাখতে গিয়ে পড়ে গেল নিচে। রায়ান চ সূচক শব্দ করে ব্যাট আবার তুলতে গেল,হাতে নিতেই হঠাৎ চোখ পড়ল সেটার গায়ে। ব্যাটের একদম নিচের অংশে মার্কার দিয়ে কুটিকুটি করে লেখা,
“ রায়ান-ইতু!”
এটা যে ইতুর কাজ বুঝল রায়ান। ওর বইপত্রেও এসব লিখে রাখে। কত মার খায়,তাও কাজ হয় না। এজন্যেই ব্যাট খাটের নিচে পেয়েছিল তখন? রায়ানের এতে রাগ হওয়ার কথা, ব্যাটে হাত দিলে যে ওর মেজাজ খারাপ হয়! কিন্তু কেন যেন হেসে ফেলল আজ।

কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৮৮

ব্যাটটা কাঁধে তুলে চুল ঠেলল। তৎক্ষনাৎ মনে পড়ল ইতুর পুতুলের কথা। এটাকে তো মামুর কাছে দেয়া হলো না। প্যান্টের লম্বা পকেট হাতিয়ে ছোট সাইজের পুতুলটা বার করে টেবিলে রাখল রায়ান। কপাল কুঁচকে বলল,
“ ফোঁকলাদাঁতি,আমার ব্যাটে আঁকাআঁকি করা?
দাঁড়া ফিরব আমি, তোর কান মলে দিতে!”
রায়ান তো ফিরবে,কিন্তু ইতু; একইরকম থাকবে কিনা কে জানে!

সমাপ্ত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here