Home কাজলরেখা কাজলরেখা পর্ব ৪৬ (২)

কাজলরেখা পর্ব ৪৬ (২)

কাজলরেখা পর্ব ৪৬ (২)
তানজিনা ইসলাম

আঁধার সত্যিই বেপরোয়া আচরণ করেছে চাদনীর সাথে। চাদনীর কান্না, বাঁধা কিছুই ওর উপর প্রভাব ফেলেনি। অসহায়ত্বের চরম পর্যায়ে এসে চাদনী মেনে নিয়েছে। বা হয়তো বাঁধা দেওয়ার শক্তি পায়নি। ও তো কোনোদিনও আঁধারের সাথে জিততে পারেনি। আঁধার সবসময় ওর উপর নিজের সব ডিসিশন চাপিয়ে দিয়েছে।
কিন্তু আজ কেন এমন হলো? আঁধার কখনো ওর কাছে আসেনি। কখনো চাদনীকে ঘিরে কামুকতা ছিলো না ওর মধ্যে। কখনো বা দুষ্টামি করে কিছু বললেও সঙ্গে সঙ্গে ইমোশনাল অ্যাটাচমেন্ট তৈরি হয়ে যেতো। চাদনীর এসবে বড্ড ভয় ছিলো। আর আঁধার এসব জেনে কখনো ওর কাছে আসার চেষ্টা করেনি।
তাহলে কাল কেন আঁধার মানলো না? কেন ওর বাঁধা উপেক্ষা করলো?

ভোরের আলো ফুটছে সবে।পাখির কিচিরমিচির ডাকে মুখরিত হচ্ছে চারিপাশ।জানালার উপর সফেদ পর্দা দুলছে, যার দরুন কক্ষ কিঞ্চিৎ অন্ধকার।তবুও ফাঁকফোকর দিয়ে সোনালী রশ্মির প্রতিফলন ঘটছে কক্ষ জুড়ে।
কক্ষে পিনপতন নিরবতা।এসির শো শো শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দের হদিস পাওয়া যায় না।
হাঁটুতে থুঁতনি ঠেকিয়ে বসে আছে আঁধার। ওর গায়ে একটা হাফহাতা টিশার্ট। এমনিতে ঠান্ডা, তারউপর এসির বাতাসে গায়ে শীতকাঁটা দিচ্ছে। তবুও আঁধার উষ্ণ কোনো কাপড় গায়ে দিচ্ছে না।ও তাকিয়ে আছে ঘুমন্ত চাদনীর দিকে।চাদনী ব্ল্যাঙ্কেট মুড়ি দিয়ে ঘুমাচ্ছে। পুরো ব্ল্যাঙ্কেট টাই ও নিজের দখলে নিয়ে ফেলেছে। ক্লান্ত আর অসুস্থ দেখাচ্ছে ওঁকে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

এখন পাঠকরা অন্য কিছু ভাববে হয়তো, কিন্তু সত্যি কথা হচ্ছে চাদনী কাঁদতে কাঁদতে অসুস্থ হয়ে গেছে। আঁধার ওঁকে কষ্ট দেয়নি।শুধু ভালোবেসেছে। আচ্ছা ভালোবাসায় কী কষ্ট আছে?কেউ ভালোবাসায় কষ্ট পায়? আঁধার জানে না।
একটা মানুষ পুরো রাত কী করে কাদতে পারে সেটাও আঁধারের জানা নেই!ক্লান্ত লাগে না? কান্না শেষ করে ক্লান্ত হওয়ার দরকার কী?
এতো চোখের জল কী করে থাকে একটা মানুষের থাকে?শেষই হয় না।বাচ্চাদের মতো ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদে।
ওর প্রশ্রয় দেয়নি আঁধারকে। আঁধার ওর সম্মতি বা প্রশ্রয় কোনোটায় চায়নি। ওর যেটা মন চেয়েছে সেটা করে ফেলেছে। ঠিক, ভুল ভাবেনি।

কিন্তু এখন যে আঁধার মস্তিষ্কের দহনে পিষ্ট হচ্ছে।ওর হৃদয় কখনোই মস্তিষ্কের সাথে জিততে পারে না।আঁধার জিততে দেয় না। কালকে কেন মনকে জিতিয়ে দিলো ও? কেন চাদনীকে এভাবে ভেঙে দিলো। ও কী করে চোখ মেলাবে এবার মেয়েটার সাথে?
ও নিজেই এখন অপরাধবোধে শেষ হয়েছে। কিন্তু ওর যা ঠিক মনে হয়েছে ও তাই করেছে। ওর মনে হয়েছিলো, চাদনীর মাইন্ড ডাইভার্ট করা দরকার। ওঁকে অন্যকিছু তে ভোলানো দরকার। অথচ আঁধার নিজেই ভুলে গেছে ও চাদনীকে শান্ত করার চেষ্টা করছিলো। কেন ও নিজেই অশান্ত হয়ে গেলো! ও তো কথা দিয়েছিলো, চাদনী ছোট তাই ওর সাথে জোর করবে না। ও নিজের কথা রাখতে পারেনি।

দরজায় টোকা পরতেই আঁধার ভাবনা ছেড়ে বেরিয়ে এলো। কে এসেছে এতো সকালে? ওর চাচ্চু? না, সে দরজা টোকা দেবে না। কিন্তু কালরাতে সে অনেকবার কল করেছে ওঁকে। আঁধার রিসিভ করেনি।রিসিভ করে ও কী বলতো? দেখো শ্বশুরবাবা তোমার মেয়ে আমাকে ভালোবাসতে দিচ্ছে না। ও কাঁদছে। ওকে কাঁদতে মানা করো আর একটু বোঝাও, স্বামী রা এমন একটু আধটু কষ্ট দেয়। যদিও কষ্টের পরিমান একটু না, বেশি ছিলো। তবুও সয়ে নিতে হয়। তুমি তোমার মেয়েকে একটু বোঝাও। এমন বলতো ও কল রিসিভ করে? এমন হলে ব্যাপারটা খুবই বিশ্রী হতো। প্রায় চার-পাঁচ বার কল করেছে সে। চাদনীর সাথে কথা বলার জন্যই করেছে আঁধার নিশ্চিত। কিন্তু দরজা বন্ধ দেখে আসতে পারেনি।
আঁধার উঠে গিয়ে দরজা খুললো। বর্ষা বেগমের উদ্বিগ্ন মুখ ভেসে উঠলো। দরজা খুলতেই সে তড়িঘড়ি করে বললো

-“দরজা খুলছিলে না কেন?”
-“ঘুমমম।”
-“দশটা বাজে। চাদনী তো এতো বেলা অবধি ঘুমায় না। ও কোথায়?চাদনী কোথায় ও কী ঠিক আছে?”
-“আছে কোনোরকম।”
-“কী হয়েছে ওর?”
-“অসুস্থ।”
বর্ষা বেগম সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকালেন। কালকে চাদনী খুব কষ্ট পেয়েছে। কেঁদেছে অনেক।স্বাভাবিক, এতো বড় সত্যি কেওই মানতে পারবে না। কিন্তু আঁধার তো সেটা বুঝবে না। ওর কথা না মানলেই ও রিয়্যাক্ট করবে,চাদনীর কষ্ট দেখবে না। বর্ষা বেগম তপ্তস্বরে বললেন
-“কী করেছিস ওর সাথে দেখি। তোরে চিনি না আমি! কী ত্যাড়ামি করেছে তোর সাথে? কাল পর্যন্ত তো ঠিকই ছিলো।”

-“রাত থেকে অসুস্থ হয়ে গেছে। বেশি কাঁদে। মাথা খারাপ গিয়েছিলো।”
-“শুধু ওর না, বাড়ির আরো দু’জন মানুষের। মেঝোভাই আসার পর, ড্রইংরুমে আলোচনা বসেছে।”
-“আচ্ছা, কী কথা হয়েছে? মিস করে ফেললাম। তোমার জা নিশ্চয়ই আমার নামে এক গাদা অভিযোগ খুলে বসেছে। আর প্রস্তাব দিয়েছে, ওনার মেয়েকে মারার অপরাধে আমাকে যাতে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়।ইশ! রাতের ঝগড়া টা মিস করে ফেললাম।
-“কুটনামি কমা আধার!ছেলেরা কী করে এমন কুটনি হয়!”
-“কেন? কুটনি হওয়ার জন্য জেন্ডার লাগে?”
-“দেখি সর সামনে থেকে।চাদনীর কী হয়েছে? আমাকে দেখতে দে।”
আঁধার বাঁধা দিয়ে বললো

-“তুমি নিজেই লজ্জা পাবে আম্মু।”
বর্ষা বেগম থেমে গেলেন। ছোট ছোট চোখ করে তাকালেন ওর দিকে। আঁধার স্বাভাবিক কন্ঠে বললো
-“ঘুমাক।”
-“ডেকে দে।কাল রাতে দু’জনেই কিচ্ছু খাসনি। খেয়ে আবার ঘুমাতে বল।”
-“না, ঘুমাক। উঠে খাবে। তুমি আমাকে খেতে দাও। ও নিজের সময় করে উঠুক।”
বর্ষা বেগম সম্মতি দিয়ে চলে গেলেন।

চাদনী বিষাদ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে জানালার বাইরে। অনেকদিন পর ও জানালার পাশে বসলো। ঘরটা এখনো কিঞ্চিৎ অন্ধকার। ওইতো তেঁতুল গাছের পাশে কোদাল আছে। তবুও চাদনীর ভয় লাগছে না। কোনো অনুভূতি পাচ্ছে না। ঘুম থেকে ওঠার পর ও জানালার পাশে বসেছে। বেরোতে ইচ্ছে করছে না কক্ষ ছেড়ে।আঁধার দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আছে। অনেকক্ষণ ধরে ও অবলোকন করছে চাদনীকে। কী করে কথা বলবে ও সেটা নিয়ে দ্বন্দ্বে ভুগছে। মেয়েটা এভাবে উদাস হয়ে বসে আছে। ঢোকা মাত্র কী বলবে ও? ছি! আঁধার ভয় পাচ্ছে চাদনীকে! চোখে চোখ মেলানোে ভয়! কেন? ও যা করেছে একটুও ভুল করেনি। চাদনী ভুল বুঝছে ওঁকে। ও শুধু চাদনীকে সাহারা দিতে চেয়েছে। কিন্তু সেটা ভুল করে অন্যদিকে কনভার্ট হয়ে গেছে।
আঁধার চাদনীর পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। জ্বিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে ডাকলো

-“চাঁদ!”
চাদনী তাকালো না।ও এমন ভাবে বসে থাকলো, যেন ওর পাশে কেও নেই।কেও ওঁকে ডাকেনি।
আঁধার বসলো ওর পাশে। অনুনয় করে বললো
-“আই এম সরি জান।”

-“প্লিজ, কথা বল। চুপ করে থাকিস না।”
….
-“ভাই কী এমন অপরাধ করে ফেলেছি? এমন করবি আমার সাথে? তুই আগে যেমন আমার সাথে কথা বলতি না, এখনও তেমন শুরু করেছিস!”
….
-“চাদনী, কথা বল ইয়ার।”

আঁধার অতিষ্ঠ হয়ে বললো

-“আমি তোকে র‍ে*প করেছি চাদনী?এমন ভিক্টিমের মতো আচরণ করছিস কেন?”
চাদনী তাকালো না ওর দিকে। কিন্তু এতোক্ষণে শান্ত কন্ঠে বললো
-“করোনি? ইচ্ছের বিরুদ্ধে জোর করাকে কী বলে তাহলে?”
-“তোর উপর আমার কোনো অধিকার নেই?”
-“তাই বলে এভাবে খাটাবে। আমার এমন একটা অসহায় সিচুয়েশনে।”
-“তুই কষ্ট পাচ্ছিলি,তাই আমি..
-“তাই তুমি কষ্টগুলো আরো বাড়িয়ে দিলে।”
-“তোর কোথায় কষ্ট হচ্ছে বল।”
চাদনী বুকের উপর তর্জনী ঠেকিয়ে বললো ‘এখানে।’ কিন্তু আঁধার সেদিকে তাকালো না। ও তাকালো চাদনীর গলার দিকে। অযাচিত ক্ষততে আঙুল বুলিয়ে, হুড়মুড়িয়ে বললো

-“এখানে এতো দাগ।”
-“তোমারই দান।”
-“ইশ! ব্যাথা করছে তোর?”
চাদনী কিছু বললো না। আঁধার অয়েন্টমেন্ট নিয়ে এসে, লাগিয়ে দিলো। মিনমিন করে বললো
-“খারাপ লাগছে তোর?”
-“না।”
-“খেতে আয়! খিদে লাগেনি?”
-“না।”
-“কিন্তু তোকে দেখেই অসুস্থ লাগছে।”
-“তারপরও তো পাষাণের মতো আচরণ করেছো।”
-“নাহ, ওটাকে পাষাণের মতো আচরণ বলে না। ওটাকে বলে স্বামীর মতো আচরণ। প্রত্যেক স্বামীই তাঁদের বউয়ের সাথে এমন আচরণ করে।”

-“আমার খারাপ লাগছে এসব শুনতে।”
-“আমি খাবার নিয়ে আসছি।এখানেই বসে খা। নিচে নামতে হবে না।”
আঁধার বুঝতে পারছে চাদনী ডিপ্রেশনে চলে গেছে।ওর নিজস্ব একটা জগৎ আছে, সেটার নাম ডিপ্রেশন।
এ ডিপ্রেশন কাটতে বেশ কয়েকটা দিন সময় লাগবে। ততদিন চাদনী আঁধারের সাথে কথা বলবে না। যতটা সম্ভব ইগনোর করবে। জীবনের বেশিরভাগ সময়ই ও ডিপ্রেশনে কাটায়।হুদাই ডিপ্রেশনে চলে যায়। সেখানো তো দু’টো বড় বড় ঘটনা ঘটে গেছে ওর সাথে। ছোটবেলায় ও রাফিয়া বেগম আর জবা বেগমের কথা শুনে ডিপ্রেশনে চলে যেতো। অনেকদিন কক্ষ ছেড়ে বের হতো না। ওর বাবা ব্যাতিত বাড়ির কারো সাথে কথা বলতো না।আঁধার এসব অনেক আগে থেকেই দেখে আসছে। দিন বদলেছে, চাদনী এখন ওঁদের কথায় ডিপ্রেশনে যায় না। কথার পিঠে উত্তর দেয়। কিন্তু এখন ওর ডিপ্রেশনে যাওয়ার মানুষ বদলেছে। এখন আঁধার ওর সাথে ওর মতের বিরুদ্ধে কিছু করলেই ও ডিপ্রেশনে চলে যায়।

একটা মানুষ কতোটা নির্লজ্জ হলে, এতো বাজেভাবে অপমানিত হওয়ার পরও বাড়ি ছেড়ে যায় না! সেটা অর্পিতার জামাইকে না দেখলে, আঁধার জানতো না। আচ্ছা ছেলেটার মেইল ইগো নেই? সেটা হার্ট হয় না! না শুধু ওর ইগোই এতো বেশি সেন্সিটিভ! তবে এখন প্রায়ই অর্পিতা আর ওর জামাইয়ের মধ্যে ঝগড়া বাঁধে। আঁধার খুব পুলোকিত হয় এসব দেখে। বাড়ি থেকে চলে গেলে তো আর এসব মেলোড্রামা দেখতে পেতো না। তার চে চোখের সামনেই ওঁদের পুড়তে দেখুক। চাদনী এখনো ডিপ্রেশনে আছে। আঁধারের সাথে কথা বলছে না। ওর কক্ষে থাকছেও না। আঁধার জোর করছে না ওঁকে। থাকুক নিজের মতো। একবার জোর করেই বড্ড অপরাধবোধে ভুগেছে ও।

চাতনী আকিব শিকদারের সাথেও কথা বলছে না। আকিব শিকদার কীভাবে কথা বলবে ওর সাথে সেটাও বুঝতে পারছে না। কথা বলতে গেলেই চাদনী দুনিয়ার সকল অসহায়ত্ব নিয়ে তাকাবে ওনার দিকে। সে অসহায়ত্ব দেখেই ওনার কথা বন্ধ হয়ে যায়। বুকে চাপ পরে। ওনি কী করে বোঝাবে মেয়েটাকে, সে কোনোদিন চাদনীকে নিজের মেয়ে ব্যাতিত অন্য কেও ভাবেনি।চাদনী ব্যাতিত এ দুনিয়ায় আর কোনো আপনজন নেই ওনার। হ্যাঁ ওনার একটা পরিবার আছে, যাদের দরকারের সময় ওনাকে দরকার হয়। কিন্তু আপন বলতে শুধু চাদনীই।

আকিব শিকদার আজ আবারও চাদনীর সাথে কথা বলতে এসেছেন। ও তখন বিছানায় উপুড় হয়ে জলরঙ দিয়ে আর্ট করছিলো। ও এখন সময় কাটানোর জন্য চিত্র আকাটা কেই অবসরে বেছে নিয়েছে। অনেকগুলো আর্ট করেছে ও এই কয়েকদিনে। যেহেতু বাড়ির কারো সাথে ও কথা বলে না, তাই ছবি আকতে আকতেই সময় কেটে যায়। আর এসবে ব্যস্ত থাকে বলে, উল্টাপাল্টা চিন্তাও মাথায় আসে না। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এসবও আধারই ওঁকে এনে দিয়েছে। যাতে ও সময় কাটাতে পারে।একটু একটু করে ওর ডিপ্রেশনের জগৎ থেকে বেরিয়ে আসতে পারে।
আকিব শিকদার চাদনীকে ডাকলো

-“আম্মা।”
চাদনী বিষাদ হাসলো। না তাকিয়ে বললো
-“কিছু বলবে?”
-“আমি জানি তুমি অনেক কষ্ট পেয়েছো..
-“না, আমি কষ্ট পাইনি। ছোটবেলা থেকেই ওঁদের যে ব্যবহার পেয়ে এসেছি, তাতে ওঁদের কেও না জেনে আমার কষ্ট পাওয়ার কথা না। কষ্ট শুধু পেলাম এটা ভেবে, আমি যাকে নিজের সবকিছু ভেবেছি,নিজের দুনিয়া মেনেছি তার সাথে আমার রক্তের কোনো সম্পর্ক নেই।”

-“তাতে কী যায় আসে, আম্মা! রক্তের সম্পর্কটাই সবকিছু? ভালোবাসাটা কিছু না? এতোদিনের বাবা-মেয়ের সম্পর্কটাও মিথ্যা?”
-“ভালোবাসো?”
-“না? মনে হয়নি কোনোদিন তোমার?”
-“বাবারা তো ভালোবেসে আগলে রাখে? তুমি তো পারোনি।আমার এতো কষ্টের জন্য কোথাও না কোথাও তুমিও দ্বায়ী।”

-“আমি নিজের দ্বায় এড়াচ্ছি না। আমি জানি আমি তোমার কাছে কতোটা অপরাধী। তোমার আম্মুকে আমি যে কথা দিয়েছিলাম আমি সে কথা রাখতে পারিনি। কিন্তু তাই বলে, তুমি আমাকে নিজের বাবা ভাববে না,সেটা তো আমি মেনে নেবো না।আমি তোমাকে ছোটবেলা থেতে বড় করেছি না।ভেবে নাও, অর্পিতা আর ওর মা যা বলেছে সব মিথ্যা।”
-“হাহ! আমার জন্মপরিচয় মিথ্যে হয়ে গেছে,সেখানে ওঁদের কথা আমি মিথ্যে কী করে ভাববো!”
চাদনী একটু থেমে বললো
-“আমার কথা বলতে ইচ্ছে করছে না।আর না, তোমার কথা শুনতে ইচ্ছে করছে।”
-“এভাবে বললে?কতোটা নিষ্ঠুর তুমি!”
-“সবাই নিজেদের ব্যবহারে, আমাকে ভেঙে দিয়ে বলছো আমি নিষ্ঠুর। আমাকে এখনো সে পরিবারে থাকতে হচ্ছে বাবা, যারা আমাকে আমার রক্ত নিয়ে খোঁটা দিয়েছে। তুমি কিছু বলেছো ওঁদের?”

-“অবশ্যই বলেছি। আমার মেয়েকে এতো কষ্ট দেওয়ার পর আমি ওঁদের কিছু বলবো না!”
-“তারপরও তো আমার ওঁদের সাথে এক বাড়িতে থাকতে হচ্ছে। একটা কথা বলি বাবা, আমি ওঁদের অনেক ভালোবাসতাম জানো। এখনো বাসি। কিন্তু আমি ওদের সাথে থাকতে চাইনা। যেদিন আমি আমার পরিচয় নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছি, সেদিন থেকেই আমার ওঁদের সাথে থাকার স্পিরিটটা মরে গেছে। যেদিন তুমি তোমার এই টক্সিক ফ্যামিলিটাকে ছাড়তে পারবে, সেদিন নিজেকে আমার আসল বাবা দাবি করবে। এর আগে না। এর আগে আমি তোমার পালিত মেয়ে। যার থাকা না থাকায় তোমার কোনো যায় আসবে না।৷ চলে যাও। একা থাকতে দাও আমাকে। মানুষের আনাগোনা এখন আর ভালো লাগে না আমার।”

চাদনী স্বাভাবিক কন্ঠেই বড্ড কঠিন কঠিন শব্দ শুনিয়ে দিলো।
আকিব শিকদার টলমলে দৃষ্টিতে তাকিয়ে বেরিয়ে গেলেন কক্ষ ছেড়ে। ওনি চলে যাওয়ায় পর, চাদনী কাঁদতে বসলো। কতোটা কঠিন কঠিন শব্দ শোনালো ও নিজের বাবাকে। অথচ ও তো জানে ওর বাবা কতোটা নরম একজন মানুষ। সাথে এটাও জানে এ দুনিয়ায় ওর বাবা ওঁকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে।কোনোদিন ওঁকে বুঝতে দেয়নি ও যে ওনার নিজের মেয়ে না।নিশ্চয়ই অনেক কষ্ট পেয়ছে। চাদনী নিজে কষ্ট পাচ্ছে বলে ওনাকেও কষ্ট দিয়ে দিলো।

আঁধার, চাদনীকে নিজের কেনাকাটা দেখাচ্ছে। ও এসব নিয়ে এসেছে চাদনীকে জ্বালানোর জন্য। চাদনী দুঃখে মরে যাচ্ছে। আর ওদিকে আকিব শিকদার আর আঁধারের মনে রঙ লেগেছে। ওরা দু’জন আজ আবার শপিং করতে গিয়েছিলো। আঁধারের শপিং শেষই হচ্ছে না। তারপর ও এসব চাদনীকে দেখাতে এসেছে। চাদনী দেখতে চায়নি।আঁধার জোর করে দেখাচ্ছে। না দেখে কোথায় যাবে!

চাদনী নতুন কাপড় দেখতে খুব পছন্দ করে। আর নিজের জামা-কাপড় আরেকজনকে দেখাতেও। আমাদের সবারই বোধহয় ছোটবেলায় এমন একটা অভ্যাস ছিলো, নতুন কেনাকাটা করলে উৎফুল্ল হয়ে অন্য একটা মানুষকে দেখানো। চাদনীর এখনো সে অভ্যাস যায়নি। আঁধার জানে বলেই ওঁকে দেখাতে এসেছে। দেখতে না চায়লে জোর করে দেখাচ্ছে, কারণ চাদনীর মন খারাপ।
আঁধার কমপক্ষে বিশটার মতো শার্ট কিনেছে। প্রায় শার্টই একই রকমের দেখতে। ব্ল্যাক কালার।কিন্তু ডিজাইন, বোতাম আলাদা।
আঁধার শার্টগুলো উল্টেপাল্টে দেখিয়ে বললো

-“এটা সুন্দর না, দেখ তুই।”
-“হুম, সুন্দর।”
-“আর এটা?”
-“এটাও সুন্দর।”
-“সবই সুন্দর লাগছে তোর? কোনোটা অসুন্দর লাগছে না? শুধু সুন্দর সুন্দর বলেই যাচ্ছিস।”
-“সব শার্টই তো প্রায়ই এক।”
-“কই এক? এক হলে এতোগুলো কেন কিনবে? ভিন্নতা আছে। বুঝতে পারছিস না তুই।বোঝার জন্য ফ্যাশন সেন্স থাকতে হয়। তোর নেই।”

-“তাহলে আমাকে দেখাচ্ছো কেন? আমি তো দেখতে চাইনি।”
-“আমার দেখাতে ইচ্ছে করছে তাই।”
আঁধার একটা প্যাকেট থেকে একটা স্বর্ণের চেইন বের করলো। চেইনের লকেটে এ লেখা।চাদনী বললো
-“এ দিয়ে কী?”
-“আঁধার!”
-“ছেলেদের স্বর্ণ পরলে গুনাহ হয়!”
-“জানি তো৷ এটা তো আমার জন্য না, তোর জন্য!”
-“আমার জন্য?”
-“হ।”
-“আমি তোমার নামের লকেট পরবো কেন?”

-“যাতে কেও জিজ্ঞেস করলেই বলতে পারিস, এটা আমার জামাইয়ের নাম। তোকে যাতে কেও অবিবাহিত না ভাবে। আর নাকফুল দিবি না। বিবাহিত মেয়েরা নাক ফুল দেয়। চুড়িও পরিস না তুই।”
-“আমি নাক ফোঁড়ায়নি।”
-“চুড়ি কেন পরিস না? বিবাহিত মেয়েরাতো চুড়ি পরে।”
-“সব কুসংস্কার!”
-“জানি।তারপরও।একদিন অন্তত তুই চুড়ি আর গলার চেইন পরিস একসাথে। আমি দেখবো, আসলেই বউ বউ লাগে কি-না। এখন এটা পর।”
-“আমি এটা পরবো না।”
-“অবশ্যই পরবি।আনতারার সাথেও ‘এ’ মিলে যায়। যদিও সে নামে তোকে কেও ডাকে না।কিন্তু আমি আমার নাম ভেবেই এই চেইনটা কিনেছি।সুন্দর না?”

আসলেই ডিজাইনটা সুন্দর।লকেটের মধ্যে ‘এ’ অক্ষরটা ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে লেখা।
আঁধার সবসময় সুন্দর সুন্দর জিনিসগুলো বেছে বেছে কিনে।ওর চয়েস খুব ভালো।
অনেক মোটা একটা চেইন।কমপক্ষে ২-৩ ভরি হবে। কিন্তু চাদনী না পরার জন্য মিথ্যে বললো।
-“সুন্দর লাগছে না আমার।”
আঁধার পাংশুটে মুখে বললো
-“পছন্দ হয়নি তোর? আমার তো সুন্দরই লাগলো।”
-“নাহ একটুও সুন্দর না।”
-“আচ্ছা, কয়েকদিনের জন্য পর। ঢাকায় গিয়ে আরো সুন্দর একটা চেইন কিনে দেবো কেমন!”
-“লাগবে না।”

আঁধার জোর করে চাদনীর গলায় পরিয়ে দিলো। চাদনী চোখমুখ কুঁচকে তাকালো।আঁধার মিষ্টি করে হেঁসে বললো
-“এইতো কত্তো সুইট লাগছে। একদম আমার বউ বউ।জানিস, আমি চেয়েছিলাম চুড়ি সহ নিয়ে আসতে। আমি চেয়েছিলাম চুড়ি সহ নিয়ে আসতে। আবার আনিনি। এখন মনে হচ্ছে আনলেই ভালো হতো। তুই তো চুড়ি পরে কলেজে যেতে পারবি না।সবাই পিঞ্চ মারবে তোকে। এই ভেবেই আনিনি। বাট ঘরে তো পরতে পারতি।
যাক গে ওটা। এবার থেকে যদি কেও জিজ্ঞেস করে তোমার নাম তো চাদনী, সে হিসেবে লকেটে সি হওয়ার কথা ছিলো। ‘এ’ কেন?খবরদার তখন আনতারা বলবি না। বলবি আমার জামাইয়ের নাম এ দিয়ে শুরু।”

কাজলরেখা পর্ব ৪৬

চাদনী কপাল কুঁচকে মুখ ফেরালো। বিরক্তিতে কিছু বলতে পারলো না। আঁধার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো
-“তুই আমার সাথে সারাজীবন এরকমই করে যাবি চাঁদনী! এতোটা বিদ্বেষ আমার প্রতি, তোর! মাঝে মাঝে আমার খুব খারাপ লাগে জানিস। নিজের খারাপ লাগে বলেই বোধহয় কষ্ট দিই তোকে। কোনো একদিন তো তুই আমার সাথে ভালো ভাবে থাক। আর কতো অনুশোচনা করতে হবে আমাকে বল। তুই কী আমাকে কোনোদিন বুঝবি না?”

কাজলরেখা পর্ব ৪৭