Home কার্নিশে আলতা মাখানো কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ৩৯

কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ৩৯

কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ৩৯
তন্ময়ী তিতিক্ষা

পৃথিবীর সবচেয়ে নিঃস্বার্থ প্রার্থনাগুলোর একটি হয়তো প্রিয় মানুষটির সুস্থতা। হসপিটালের করিডরে বসে শত শত মানুষ সেই প্রার্থনাতেই ব্যস্ত। আজ তাদের খাতায় নাম লেখিয়েছে আর্শি নিজেও। একপাশের দেয়াল ঘেষে বসে আর্শি। পাথরের মূর্তির ন্যায় এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সামনে থাকা ওটি রুমের দরজার দিকে। কিছুক্ষণ পূর্বেই টিউশনি থেকে সবে বাসায় ফিরছিলো আর্শি। হুট করে আযরানের কল পেয়ে রিসিভ করতে ওপাশে অন্যকারো কন্ঠ পেয়ে বেশ চমকেছিলো সে। কৌতুহলী হয়ে প্রশ্ন করল,
“কে বলছেন? আর আযরানের ফোন আপনার কাছে কেন?”
এরপর অপরপাশ থেকে ভেসে আশা কথাতেই যেন দুনিয়া দুলে উঠল আর্শির। মুহুর্তে পায়ের তলার মাটি সরে গেল। ওপাশ থেকে ভেসে এলো রাশভারি কন্ঠের আওয়াজ,
“ফোনটা যার তার এক্সিডেন্ট হয়েছে। হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি আপনি উনার কে হোন দ্রুত আসুন। প্রচুর রক্তপাত হচ্ছে।”

ভাবনা থেকে বেরুতেই এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে। মুখশ্রী একদম নিষ্প্রাণ। চক্ষুদ্বয় যেন পলক ফেলতেও ভুলে গেছে। উঠে দাঁড়ানোর শক্তিটুকু পাচ্ছে না আর্শি। কষ্টে জর্জরিত বুক ফেঁটে আসছে কিন্তু কাঁদতে পারছে না সে। কাঁদবে কি করে? তাকে সামলানোর জন্য তার আযরান নেই তো তার কাছে। তাহলে সে কেন কাঁদবে? নির্জীব ভূমিকা পালন করছে আর্শি। তার থেকে কিছুটা দূরেই চেয়ারে বসে নিরবে চোখের জল বিসর্জন দিচ্ছে মিহির। বন্ধুর এমন করুণ অবস্থা দেখে কিছুতেই নিজেকে সামলাতে পারছে না। প্রহরকে জানানো হয়েছে। ইতোমধ্যে রাস্তায় আছে তারা। মিহির হুট করে উঠে দাঁড়ালো। কম্পিত পা যুগল চালিয়ে এগিয়ে এলো আর্শির নিকট। মৃদুস্বরে কাঁপা কন্ঠে বলল,

“তুই ঠিক আছিস আর্শি?”
আর্শির কোনো হেলদোল নেই। আগের মতোই অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো দরজার দিকে। ঠিক তখনই করিডর পেরিয়ে ছুঁটে এলেন আযরানের মা সিতারা হায়দার। পিছু পিছু এলো আযরানের বাবা আর নিধি। সিতানা হায়দার এসেই হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করল। মিহিরের কাছে এগিয়ে ক্রন্দনরত অস্থির কন্ঠে বলল,
“মিহির বাবা! আমার আযরান কোথায়? কি হয়েছে ওর। বল না বাপ?কি হয়েছে।”
মিহিরের চোখ বেয়ে অশ্রু গড়ালো। সিতারা বেগমকে শান্ত করতে বলে উঠল,
“ছোট এক্সিডেন্ট হয়েছে আন্টি তেমন কিছু না।”
মায়ের মন মানলো না। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো অঝরে। আকস্মিক দৃষ্টি গিয়ে থামল দেয়ালঘেঁষে নিশ্চুপ বসে থাকা আর্শির ওপর। মুহূর্তেই বুকভরা আতঙ্ক, অসহায়ত্ব আর সন্তানের জন্য জমে থাকা সব ভয় যেন ক্ষোভে রূপ নিলো। ছুটে গিয়ে সাজোরে চড় বসালো আর্শির গালে। মুখশ্রী একপাশে হেলে নিমিষেই। তীব্র ব্যথায় জায়গাটা জ্বলে উঠলেও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না আর্শি। সিতারা বেগম ক্ষোভে ফেঁটে পড়লেন যেন। চিৎকার করে বলে উঠল,

“তোর জন্য! সব তোর জন্য হয়েছে মুখপুরী। আমার ছেলেকে বশ করে এখন মারতে বসেছিস।”
কথাটা বলেই পুনরায় আঘাত করতে চাইলে মিহির আর নিধি ছুটে এলো। নিধি মাকে আগলিয়ে স্বশব্দে কেঁদে উঠল।
“মা, প্লিজ! তুমি শান্ত হও। এমন করো না। হাসপাতাল এটা।”
কাঁদতে কাঁদতে সিতারা হায়দারকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল নিধি। মিহিরও এগিয়ে এসে আর্শির সামনে দাঁড়াল। কন্ঠে নমনীয়তা মিশিয়ে বলে উঠল,
“আন্টি, আর্শির কোনো দোষ নেই। যা হয়েছে, সেটা একটা দুর্ঘটনা।”
“চুপ!”
ক্ষোভে কাঁপতে কাঁপতে চিৎকার করে উঠলেন সিতারা হায়দার। পুনরায় বলে উঠল,
“ওইদিন এই মেয়ের জন্য আমার ছেলে বাড়ি না ছাড়লে এমন হতো? হতো না। এই মেয়ের জন্য আজ এত কিছু।”
কথাটা বলেই ওড়নায় মুখ গুঁজে কাঁদতে শুরু করলেন তিনি। করিডরে উপস্থিত কয়েকজন স্বজন আর রোগীর লোকজন কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তাদেত পানে। এত কিছুর পরও আর্শির কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। চড়ের দাগটা গালে স্পষ্ট জ্বলজ্বল করছে কিন্তু আর্শি যেন কোনো ব্যথাই অনুভব করছে না। তার সমস্ত অনুভূতি আটকে আছে অপারেশন থিয়েটারের দরজার ওপারে থাকা আযরানের কাছে। এর মাঝে উপস্থিত হলো নীলা, প্রহর আর রাইসা। সকলের মুখশ্রী আতঙ্কিত।
প্রায় কেটে গেল ঘন্টাখানেক সময়। আকস্মিক অপারেশন থিয়েটারের ওপরে জ্বলে থাকা লাল বাতিটা নিভে গেল। বন্ধ দরজাটা খুলতেই করিডরে উপস্থিত প্রত্যেকটি মানুষের বুক ধক করে উঠল। সবাই একসঙ্গে দরজার দিকে ছুটে গেল। আর্শিও অনেক কষ্টে উঠে দাঁড়াল। কাঁপা পায়েই দ্রুত এগিয়ে গেল ডাক্তারের নিকট। কাঁপতে থাকা ওষ্ঠে একটাই প্রশ্ন,

“আয..আযরান কেমন আছে?”
ডাক্তার একবার উপস্থিত সবার মুখের দিকে তাকালেন। ক্লান্ত মুখে মাস্কটা নামিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
“আপাতত কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে মাথায় আঘাতটা বেশ গুরুতর ছিল। প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে। আমরা রক্তপাত নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছি। এখন পরবর্তী চব্বিশ ঘণ্টা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের মধ্যে উনার জ্ঞান ফিরলে আমরা অনেকটাই নিশ্চিন্ত হতে পারব। নাহলে পেশেন্ট কোমায় চলে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।”
ডাক্তারের শেষ কথাটা যেন বজ্রপাতের মতো আঘাত করল সবার বুকে।
“নাহলে পেশেন্ট কোমায় চলে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।”
কথাটা শুনেই মুহূর্তের জন্য করিডরজুড়ে নেমে এলো পিনপতন নীরবতা। কারও মুখে কোনো শব্দ নেই। শুধু সিতারা হায়দারের চাপা কান্না শব্দ প্রতিধ্বনি হতে লাগল। হুট করে কিছু একটা পড়ার শব্দে পিছু ফিরে চাইলো সকলে। আর্শি পরে আছে মেঝেতে। ফ্যাকাশে মুখটা একপাশে কাত হয়ে আছে। চোখ দুটো বন্ধ। শরীরটা সম্পূর্ণ নিস্তেজ। হয়তো জ্ঞান হারিয়েছে। সকলে একপ্রকার আঁতকে উঠল। রাইসা এসে আর্শির মাথাটা কোলে তুলে নিলো। তাকেও শিফট করা হলো অন্য কেবিনে।

ঘড়িরকাঁটায় টিকটিক শব্দ তুলে পেরিয়ে গেছে আঠারো ঘন্টা। নিজের হাতের ক্যানোলা খুলে ধীরে সুস্থে নেমে দাঁড়ালো আর্শি। আযরানের কথা মনে আসতেই দ্রুত গতিতে পা চালানোর পূর্বেই বাঁধা হয়ে দাঁড়ালো নীলা। অসহায় চোখে তাকিয়ে মৃদুস্বরে বলল,
“কোথায় যাচ্ছিস আর্শি? আযরানের জ্ঞান ফিরেনি যাস না।”
আর্শি হাসল। যন্ত্রণাদায়ক হাসি। অস্ফুটস্বরে আওড়ালো,
“ওর আমাকে ছাড়া কষ্ট হচ্ছে নীলা। আম…আমাকে যেতে হবে। নাহলে আযরান কষ্ট পাবে যে।”
“কষ্ট পাবে না তুই আগে সুস্থ হয়ে নে। আর আযরানের কাছে আন্টি আছে। অনেকরাত হয়েছে তুই এখন একটু ঘুমা আর্শি।”
বারবার চেষ্টা করেও বন্ধুদের বাঁধার মুখে আযরানের কাছে যেতে পারলো না আর্শি। কেবিনে বসেই ছটফট করতে লাগলো আপনমনে।

মধ্যরাত। কাঁপা কাঁপা হাতে আযরানের কেবিনের দরজা ঠেলে ঢুকলো আর্শি। নিরবতার ছড়াছড়ি কক্ষজুঁড়ে। কেউ নেই। তাই একপ্রকার লুকিয়ে এসেছে সে। আর্শির বুকের যন্ত্রণা বেড়ে গেল। এতগুলো ঘন্টা পেরিয়ে গেলেও জ্ঞান ফেরেনি আযরানের। এলোমেলো পায়ে এগোলো আর্শি। দূর্বল, ক্লান্ত, অভুক্ত শরীরটাও যেন চলতে সাঁই দিচ্ছে না। জানালার পর্দা গুলো উড়ে চলেছে বাঁধাহীন। আকাশ হুট করে ঢেকে গেছে কালো মেঘে। বর্ষণ হবে হয়তো। তীব্র বর্ষণ! মেঘেরও কি তবে আর্শির মতো দুঃখ জমলো? নাহলে কেন হুট করে নিজেকে এমন বিষাদের ছায়ায় মোড়ালো? উত্তর জানা নেই আর্শির শুধু জানে সে ভালো নেই। আযরানের এই অবস্থায় সে একদমই ভালো নেই। হাতের সাহায্যে চোখের কার্নিশ মুছে আর্শি এগিয়ে গেল। আযরানের দিকে তাকাতেই বুক ধ্বক করে উঠল তার। আযরানের পুরো শরীর ব্যান্ডেজে মোড়া। মাথায় ব্যান্ডেজের উপর দিয়েই রক্তের ছোপ ছোপ দাগ স্পষ্ট হয়ে আছে। সহ্য হলো না আর্শির। এমন দৃশ্য প্রচন্ডভাবে আঘাত করলো মনে। মুহুর্তে কান্না ভেঙে পড়লো সে। যন্ত্রণাদায়ক পীড়ন ছড়িয়ে পড়লো সমস্ত দেহজুঁড়ে। একহাতে আযরানের হাত আঁকড়ে ধরে আহাজারি করে বলে উঠল,
“আযরান এই আযরান। উঠ না! দেখ আমি এসেছি। উঠ না আযরান। এভাবে শুয়ে আছিস কেন? আমাকে জড়িয়ে ধর। দেখ না তোর মুটি কাঁদছে। তুই তো বলেছিলি আমাকে কখনো কাঁদতে দিবি না। তাহলে আজ কেন এভাবে কাঁদাচ্ছিস? জবাব দে না।”

আর্শি মাথাটা আলতো করে আযরানের হাতের ওপর রেখে পাগলের মতো কাঁদতে লাগল। ঠিক তখনই বাইরে প্রবল শব্দে বজ্রপাত হলো। মুহূর্তের মধ্যেই ঝমঝম করে নেমে এলো বৃষ্টি। জানালার কাঁচ বেয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল বৃষ্টির ফোঁটা। পুরো কক্ষজুড়ে যেন এক অদ্ভুত বিষাদের আবহ ছড়িয়ে পড়লো নিমিষেই। আর্শির দুঃখে বুঝি আকাশও দুঃখী হয়ে পড়ল। নিজের অশ্রুতে ভিজিয়ে দিতে শুরু করল ধরনী। আর্শির শত ডাকেও সাড়া দিলো না আযরান। নিষ্প্রাণ হয়ে বিছানাতেই পরে রইলো নিস্তেজের ন্যায়। আর্শি উঠে দাঁড়ালো। আর্শি কাঁপা হাতে ওজু করে এসে কেবিনের এক কোণে রাখা জায়নামাজটা বিছিয়ে নিল। সারা শরীর কাঁপছে, চোখ দুটো কান্নায় ফুলে রক্তিম আকার ধারন করেছে। তাকবির বলে নামাজে দাঁড়াতেই বুকের ভেতর জমে থাকা সব যন্ত্রণা যেন আল্লাহর দরবারে উজাড় করে দিতে লাগল সে। নিঃশব্দে অশ্রুকণা ঝরতে লাগলো অনবরত। শেষ সিজদায় গিয়ে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না আর্শি। দু’হাতে জায়নামাজ আঁকড়ে ধরে শিশুর মতো হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। কান্নার শব্দ চাপা দেওয়ার চেষ্টা করলেও পারল না। বুকভাঙা সেই আর্তনাদ নিস্তব্ধ কেবিনজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল।

কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ৩৮

ঠিক তখনই কেবিনের দরজার সামনে এসে থমকে দাঁড়ালেন সিতারা হায়দার। ছেলেকে একনজর দেখে বেরিয়ে যাওয়ার জন্যই এসেছিলেন তিনি। কিন্তু সামনে দেখা দৃশ্যটা তাঁকে স্থির করে দিল। যে মেয়েটাকে কিছুক্ষণ আগেও সমস্ত দোষের জন্য দায়ী করেছিলো সেই মেয়েটাই এখন সিজদায় মাথা রেখে নিজের সবটুকু ভেঙে আল্লাহর কাছে তাঁর ছেলের জীবন ভিক্ষা চাইছে। সিতারা হায়দারের বুকটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠল। চোখের কোণ ভিজে এল অজান্তেই। মাতৃত্বের কষ্ট বড় নির্মম। কি হলো কে জানে। চোখের জল মুছে ধীরে ধীরে সুস্থে এগিয়ে এলেন সিতারা হায়দার। ওজু করে এসে আর্শির একপাশে আরেকটি জায়নামাজ বিছিয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে গেলেন নামাজে। একই কক্ষে, একই কিবলার দিকে মুখ করে দুজন অসহায় মানুষ একই মানুষের জীবনের জন্য প্রার্থনা করতে লাগল। বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি। ভেতরে ঝরছে দুই নারীর অশ্রু।

কার্নিশে আলতা মাখানো পর্ব ৪০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here